ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক টুকরো মিশ্র ভালোবাসা

৩য় পর্ব

লেখক: আপন চৌধুরী

#এক_টুকরো_মিশ্র_ভালোবাসা 

#আপন_চৌধুরী
#পর্ব_০৩
আদ্র তখনো দূর আকাশের নীলিমার দিকে তাকাই ছিল পরে সেই দৃষ্টি ধীরে ধীরে ফিরিয়ে নিয়ে। এখন তার চোখের মনি জোড়া কিছুক্ষণের জন্য জিহান এর উপর রাখল তার অভিব্যক্তি বোঝার জন্য।ছেলেটা তাকে অনেকদিন থেকেই তার অতীত সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু সে কখনো বলেনি। আজকে এসে সবকিছু জিহানকে বলতে চায়। জিহানের অভিব্যক্তিতে অস্থিরতা ফুটে উঠেছে। তার চোখে মুখে ফুটে ওঠেছে কিছু জানার তীব্র আগ্রহ। জিহানের এই অস্থিরতা দেখে আদ্র মৃদু হাসলো। পরে তার দৃষ্টি দূর আকাশে রাখল তারপর সে নীরবতা ভেঙ্গে কিছুটা নরম স্বরে বলা শুরু করলো : 
 
............................ফ্ল্যাশব্যাক.............................
১৪ বছর আগের এক তপ্ত বুধবার। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটা সাধারণ মনে হলেও, আমার ১৫ বছর বয়সী জীবনে তা ছিল এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা। ​তখন আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী। বই-খাতার চাপে দম ফেলার সময় নেই, অথচ সেই ব্যস্ততার মাঝেই হুট করে আমার কিশোর মনে এক অদ্ভুত ঝড় বয়ে গেল। যে চাচাতো বোন মেহজাবিন চৌধুরী সুখ কে এতদিন আমি শুধুই খেলার সাথী বা আদরের ছোট বোন হিসেবে জেনে এসেছি, সেই বিকেলেই যেন তার রূপটা সম্পূর্ণ বদলে গেল আমার চোখে।
সেদিন ছিল সুখের স্কুলের নবীন বরণ অনুষ্ঠান। সুখের বয়স তখন নয় কি দশ হবে। ক্লাস সিক্সে পড়া সেই ছোট্ট মেয়েটা প্রথমবারের মতো শাড়ি পরেছিল— ধবধবে সাদা শাড়ি, তার পাড় জুড়ে লাল রঙের ছোঁয়া। ওর হাঁটু অবধি লম্বা ঘন চুলগুলো আজ আর বিনুনি করা নেই, বরং পিঠের ওপর ছাড়া ছিল। কপালে ছোট একটি মেরুন রঙের টিপ, চিকন ওষ্ঠে ডার্ক মেরুন লাইনার দিয়ে লাইন টেনে হালকা পিংক ও নুড মিশ্রণ করে সমস্ত ঠোঁটে প্রসাধনী লেপ্টে দেওয়া — ব্যাস, এই সাধারণ সাজেই সুখকে লাগছিল অপ্সরীর থেকে কম না।
​আমি যখন সুখকে দেখলাম, মনে হলো বুকের ধড়ফড়ানিটা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। যাকে চিরকাল ‘পিচ্চি’ বলে খ্যাপাতো, তাকে এমন স্নিগ্ধ রূপে দেখে আমি যেন কিছুক্ষণের জন্য নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেলাম। অবচেতন মনেই সে অনুভব করল, আমার কিশোর হৃদয়ের দোলা দিলো ভালোবাসা আর সেই ভালোবাসা অজান্তেই ওই লাল-সাদা শাড়ি পরা মেয়েটির নামে জমা হয়ে গেলো।
​আমি তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে, সেই মুহূর্তের থমকে যাওয়াই একদিন আমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াবে। ওর জন্য আমি আজ সব থাকতেও আমি নিঃস্ব। 
স্মৃতির পাতা উল্টানোর মাঝেই হঠাৎ জিহানের ফোনটা বেজে উঠল। এই গভীর নিস্তব্ধতায় রিংটোনের শব্দটা যেন অদ্ভুত কর্কশ শোনাল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে জিয়ানের চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল। ফোনের শব্দে আদ্রও সম্বিত ফিরে পেল, তার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। সে কথা থামিয়ে জিয়ানকে ফোনটা ধরার জন্য ইশারা করল।।
তারপর জিহান কথা শেষ করে। ​ফোন টা পকেটে রেখে জিয়ান আদ্রের উদ্দেশ্যে বলল, যেটুকু বললি তাতে আমি যা বুঝলাম যে তুই সুখকে অনেক ভালোবাসিস। এখন তুই কি চাইতেছি, সুখকে কি ভুলে যাবি। নাহ আগের মতো ভালোবাসবি। কোনটা করবি এহন??
​আদ্র মৃদু স্বরে বলল, "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উক্তি ছিল—
পেয়ে হারিও না, পরম যত্নে রাখো, তুমি যেটা তুচ্ছ মনে করো তা পাওয়ার জন্য মানুষ দুহাত তুলে কাঁদে..!! ( জীবনে যেটা তুমি পেয়ে গেছো মানুষ, ভালোবাসা, সুযোগ সেটা অবহেলায় হারিয়ে ফেলো না। যত্ন করে ধরে রাখো। অনেক সময় আমরা যেটাকে গুরুত্ব দিই না, ছোট করে দেখি…সেই একই জিনিস পাওয়ার জন্য অন্য কেউ খুব কষ্ট করে, প্রার্থনা করে, কান্না করে )
​"আমি ওকে ভালোবাসার সুযোগটুকু পেয়েছি, এতেই আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি যে সুখকে অনুভব করতে পেরেছি, এই সুযোগটা হয়তো পৃথিবীর অনেকেই পায় না। আমরা যাকে অনেক সময় গুরুত্ব দেই না, ঠিক তাকেই পাওয়ার জন্য অন্য কেউ হয়তো দিনরাত প্রার্থনা করে, চোখের জল ফেলে। ​তাই আমি ওকে কোনোভাবেই ভুলতে পারবো না। ও আমাকে ভালোবাসুক আর না-ই বাসুক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার ভালোবাসা তো একান্তই আমার। ভালোবাসা পাওয়াটা যেমন ভাগ্যের ব্যাপার, কাউকে মন থেকে ভালোবাসতে পারাটাও তো এক পরম পাওয়া। এই সামান্য তুচ্ছ অভিমান বা না পাওয়ার কারণে আমি তাকে ভুলে যাব—এমন মানুষ আমি নই।"
​আদ্রের সব কথা জিহান মন দিয়ে শুনল। তার শান্ত চোখের গভীরতা আর কথার ওজন জিহানকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল। জিহান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা ফোনটা আবার উচ্চশব্দে বেজে উঠল। ​স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে জিয়ানের মুখভঙ্গি পালটে গেল। হসপিটাল থেকে ফোন এসেছে—জরুরি একজন রোগী ভর্তি হয়েছে, তাকে এখনই পৌঁছাতে হবে। একজন ট্রমা সার্জন হিসেবে এই ডাক উপেক্ষা করার উপায় নেই তার। 
সে আদ্রের দিকে অপরাধবোধ মাখানো সুরে বলল, "আদ্র, আমাকে ইমিডিয়েটলি হসপিটালে যাইতে হবে। আজ বোধহয় তোর আর অতীতের বাকিটুকু শোনা হলো না রে, শা*লা আমার ভাগ্যটাই খারাপ। এতদিন পর তুই তোর অতীত বলতে ধরছিলি আর মরা ফোন আজকে রাতেই দেওয়া লাগে। এই বলে জিহান প্রস্থান করল। 
​আদ্র তাকে আটকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না। সে জানে, জিহানের পেশা আর দায়িত্বের কাছে ব্যক্তিগত আবেগ অনেক সময় গৌণ; সামান্য দেরি হওয়া মানেই একজন রোগীর জীবনের ঝুঁকি।
​জিহান যখন তড়িঘড়ি করে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন আদ্র ধীরস্বরে প্রশ্ন করল, 
"জিহান, আমাকে কি সাথে যেতে হবে?"
​জিহান মুহূর্তকাল থমকে দাঁড়াল। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে নিয়ে মাথা নেড়ে বলল, 
"না রে, তোকে যেতে হবে না। আমি একাই সামলে নিতে পারব।"
​আসলে জিহান জানে, গত রাতে আদ্র একটি অত্যন্ত জটিল এবং ক্রিটিক্যাল অপারেশন করেছে। সেই ধকল এখনো কাটেনি। আদ্রের শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে, তাতে আজ তাকে আর নতুন কোনো ঝামেলার মধ্যে ফেলা ঠিক হবে না ভেবেই জিহান একা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বন্ধুর প্রতি এই নীরব যত্নটুকু আড়ালে রেখেই সে দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
 এই তাড়াহুড়ো আর কর্তব্যের চাপে তার হাঁটাচলায় এক ধরণের অস্থিরতা স্পষ্ট। গজগজ করতে করতে সে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করল—"শালা! আর সময় পেলি না? ফোনটা ঠিক এই সময়েই দিতে হলো!"
​জিহানের সেই বিরক্তিমাখা গজগজানি আদ্রের কানে স্পষ্ট পৌঁছালেও সে কোনো প্রতিবাদ করল না। বরং তার এই অস্থিরতা দেখে আদ্রের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল।
মাথা নেড়ে নিচু স্বরেবলল, "পাগল একটা!"
​জিহান চলে যাওয়ার পর সেই শূন্য ঘরে আদ্র একা দাঁড়িয়ে রইল। তার অসমাপ্ত গল্পের রেশটুকু তখনো ভারী হয়ে বাতাসে ভাসছে, আর আদ্র তাকিয়ে রইল জিহানের চলে যাওয়া পথের দিকে।
অন্যদিকে ————
-
ঢাকা শহরের ব্যস্ততা যেন হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢাকা পড়েছে। সারা দিনের ক্লান্তির অবসান ঘটাতে ধরনীতে অন্ধকার নেমেছে। দিনের সেই চিরচেনা কোলাহল এখন স্তিমিত, কেবল দূর থেকে ভেসে আসা গাড়ির হর্নের ক্ষীণ আওয়াজ জানান দিচ্ছে শহরটা এখনো জেগে আছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা।
​চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি সদস্যের চোখে আজ ঘুম নেই, আছে কেবল সীমাহীন উদ্বেগ আর আশঙ্কার কালো মেঘ। কিছুক্ষণ আগেই কর্তব্যরত চিকিৎসক এসে জানিয়ে গেছেন, চিকিৎসাবিদ্যার সাধ্যমতো সবটুকুই করা হয়েছে, এখন কেবল আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই একটি ঘোষণা যেন মুহূর্তেই হাসপাতালের করিডোরের বাতাসকে ভারী করে তুলল। বাড়ির সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।
​গত আট ঘন্টা ধরে কাব্য চৌধুরী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে এবারের পরিস্থিতি ডাক্তারদের কাছেও কিছুটা রহস্যময় ঠেকছে। সাধারণ হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণের বাইরেও কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দেওয়ায় তারা বেশ চিন্তিত। সেই রহস্যের জট খুলতেই কিছু জরুরি পরীক্ষা করানো হয়েছে।
পুরো চৌধুরী পরিবার এখন হাসপাতালের সেই করিডোরে পাথরের মতো বসে আছে। দশ মিনিট, ঠিক দশ মিনিট পরেই সেই রিপোর্ট আসার কথা। এই দশটি মিনিটই হয়তো ঠিক করে দেবে কাব্য চৌধুরীর ভাগ্য আর চৌধুরী পরিবারের ভবিষ্যৎ। হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলোর মাঝে এখন কেবল আতঙ্কের নিঃশব্দ হাহাকার।
কিছু ঘন্টা পূর্বে , 
______________ফ্লাশব্যাক_________________
আজকের সকালটা ছিল অন্যরকম। ড্রয়িংরুমের আরামদায়ক চেয়ারে বসে কাব্য চৌধুরী অভ্যাসবশত ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছিলেন। কফির কাপে ধোঁয়া উড়ছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা পাতায় এসে তাঁর হাত থমকে গেল। 
​চোখের সামনে ভেসে ওঠা ছবিটার দিকে তাকিয়ে তিনি যেন পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেলেন। মস্তিষ্ক মানতে চাইছিল না, কিন্তু চোখের ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাবার কাছে কি নিজের সন্তানের অবয়ব কখনো অচেনা থাকে? না, এ যে তাঁর একমাত্র ছেলে আদ্র! 
ছবির মানুষটির চোখের চাহনি আর হাসির ভঙ্গি বলে দিচ্ছে—এ আদ্র ছাড়া আর কেউ নয়। ​কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা কাটিয়ে কাব্য চৌধুরী অস্থির হয়ে উঠলেন। বুকটা যেন কোনো এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। তিনি আর দেরি না করে উচ্চস্বরে স্ত্রীকে ডাকলেন:
​"সায়রা! এই সায়রা, এদিকে এসো! জলদি দেখে যাও!"
​রান্নাঘরে তখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। আদ্রর মা সায়রা চৌধুরী আর ছোট জা সুমি চৌধুরী মিলে সবার জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করছিলেন। স্বামীর এমন আতঙ্কিত আর অস্থির কণ্ঠস্বর শুনে সায়রা হাতের কাজ ফেলে একরকম দৌড়েই ড্রয়িংরুমে চলে এলেন।
​কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে সায়রা জিজ্ঞেস করলেন,
"কী হয়েছে? এভাবে ডাকছ কেন? কোনো বিপদ হয়েছে কি?"
কাব্য চৌধুরী মুখে কিছু বলতে পারলেন না; তাঁর কণ্ঠস্বর যেন আবেগে রুদ্ধ হয়ে এসেছে। তিনি কেবল কাঁপাকাঁপা আঙুলে ম্যাগাজিনের সেই পাতাটির দিকে 
​সেখানে আদ্রর ছবির ঠিক নিচেই বড় বড় অক্ষরে শিরোনামটি জ্বলজ্বল করছিল:___
​❝ডক্টর শাহরিয়ার চৌধুরী আদ্র: বিশ্বের শ্রেষ্ঠ হার্ট সার্জন হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছেন তিনি।❞
​প্রতিবেদনে আরও লেখা ছিল—এটি এক অবিশ্বাস্য অর্জন! প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি নাগরিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশ্বমঞ্চে এমন বিরল সম্মাননা পেতে চলেছেন, যা পুরো দেশের জন্য গর্বের।
​খবরটা পড়া মাত্রই সায়রা চৌধুরীর দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভিজে উঠল। যে ছেলেকে নিজের গর্ভে ধারণ করেছেন, তিলে তিলে বড় করেছেন, সেই ছেলেকে চিনতে তাঁর এক মুহূর্তও দেরি হয়নি। বাবা-মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে? 
প্রতিটি মা-বাবার স্বপ্ন থাকে সন্তান এমন কিছু করুক যাতে সমাজে তাঁদের মাথা উঁচু হয়। আজ আদ্র শুধু তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করেনি, বরং সারা বিশ্বের কাছে দেশের মান বাড়িয়ে দিয়েছে।
​একটু আগেও যে ঘরটা সকালের সাধারণ ব্যস্ততায় মুখর ছিল, মুহূর্তেই সেখানে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। কাব্য চৌধুরী আর সায়রা চৌধুরী একে অপরের দিকে তাকিয়ে অপলক হাসছিলেন। তাঁদের সাধারণ ছেলেটি যে একদিন এমন অসাধারণ কিছু করে দেখাবে, সেটা কল্পনাতেও ছিল না। খুশিতে আত্মহারা এই দম্পতির মনে হলো, জীবনের সব পরিশ্রম আজ সার্থক। তাদের আদ্র আজ সাফল্যের সেই শিখরে পৌঁছেছে, যা কেবল স্বপ্নের মতোই সুন্দর।
আনন্দের আতিশয্যে সায়রা চৌধুরী আর এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারলেন না। এই বিশাল প্রাপ্তির খবরটা এখনই সবাইকে জানানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি ড্রয়িংরুম থেকেই চিৎকার করে সুমি চৌধুরীকে ডাকতে শুরু করলেন।
​"কই রে সুমি! তাড়াতাড়ি এদিকে আয়, দেখে যা! আজ আমাদের আদ্র আজ কত বড় হয়ে গেছে রে! ওর কত্ত বড় নাম হয়েছে!"
​বড় ভাবির এমন উত্তেজিত আর আনন্দিত ডাক শুনে সুমি চৌধুরী হাতের কাজ ফেলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। তাঁর পিছু পিছু পরিবারের অন্য সদস্যরাও কৌতূহলী হয়ে উপস্থিত হলেন ড্রয়িংরুমে। সবার চোখেমুখে তখন রাজ্যের বিস্ময় আর প্রশ্ন।
​সুমি চৌধুরী কাছে এসেই উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, 
"কী হয়েছে ভাবি? আদ্রের কিছু হয়েছে নাকি? ও ঠিক আছে তো?"
​সায়রা চৌধুরী তখনো হাসছেন, চোখে তাঁর আনন্দের পানি। তিনি ম্যাগাজিনটা সুমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 
"দেখ সুমি, চেয়ে দেখ! আমাদের আদ্র আজ শুধু আমাদের ছেলে নেই, সে আজ পুরো দেশের গর্ব।আমাদের ছেলে আজ কত বড় ডাক্তার হয়েছে!"
​ম্যাগাজিনের সেই পাতায় আদ্রর হাস্যোজ্জ্বল ছবি আর বড় বড় হরফে লেখা সাফল্যের খবরটার দিকে তাকিয়ে সুমি চৌধুরীসহ পরিবারের সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে রইলেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করা যেন কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই স্তব্ধতা রূপ নিল এক বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে। এক নিমেষেই দীর্ঘদিনের উৎকণ্ঠা আর বিষণ্নতা উধাও হয়ে চৌধুরী বাড়িতে বয়ে গেল অভাবনীয় খুশির জোয়ার। আদ্রর এই বিশ্বজয়ী সাফল্যে আনন্দের কলরবে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো ঘর।
কিন্তু এই ভিড়ের মাঝে সুখ-এর মনের অবস্থা ছিল একদম ভিন্ন। আদ্রর সাফল্য দেখে প্রথমে তার মন খুশিতে ভরে উঠলেও, পরক্ষণেই সেই হাসিমুখ অমাবস্যার অন্ধকারের মতো কালো হয়ে গেল। অতীতের কিছু ভুল তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
"পনেরো বছর পর আদ্র ভাইয়া কত সুন্দর হয়েছে দেখতে! সামনাসামনি দেখলে না জানি আরও কত হ্যান্ডসাম লাগবে।" 
কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মনে ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। সে ভাবল,"এত সুন্দর দেখতে হয়েছে, না জানি কত মেয়ের সাথে প্রেম করছে এখন!" রাগে ফেটে পড়ে সে মনে মনে সংকল্প করল—আদ্র ভাইয়া শুধু আমার, আর কারো না।
​এদিকে আশরাফ চৌধুরী মনে মনে বেশ গর্বিত। তিনি ভাবলেন, 
"এই তো চাই! এই না হলে আমার যোগ্য মেয়ের জামাই!" 
পাশেই দাঁড়িয়ে জিয়ান ভাবছিল, "সাবাস ভাইয়া! কী কামাল দেখালে! এই নাহ হলে আমার ভাইয়া, থুক্কু আমার বোন জামাই !"
​সবাই যখন আনন্দে আত্মহারা, কাব্য চৌধুরী তখন এক গভীর ভাবনায় ডুব দিলেন। তাঁর কানে বাজতে লাগল পনেরো বছর আগে আদ্রর বলে যাওয়া সেই শেষ কথাগুলো:
​"আজ আমি সবার ঘৃণা নিয়ে বাসা ছেড়ে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু কথা দিচ্ছি—একদিন আমি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবো যে সবাই আমাকে সম্মান করতে বাধ্য হবে। সেদিন আমার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য সবাই অপেক্ষায় থাকবে।"
​আদ্রর সেই তেজস্বী কথাগুলো মনে পড়তেই কাব্য চৌধুরীর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। হঠাৎ করেই তীব্র যন্ত্রণায় তিনি চেয়ারে ঢলে পড়লেন। এর আগেও দুবার তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, কিন্তু এবার পরিস্থিতি মুহূর্তেই হাতের বাইরে চলে গেল। আনন্দের ঘর বিষাদে ছেয়ে গেল। স্বামীর এই অবস্থা দেখে সায়রা চৌধুরী দিশেহারা হয়ে পড়লেন। পরিবারের কেউ আর দেরি না করে দ্রুত কাব্য চৌধুরীকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। শুরু হলো এক অনিশ্চিত লড়াই।
( চলুন এর মাঝে আদ্রের পরিবারের পরিচয় দিয়ে দেই)
কাব্য চৌধুরী আদ্রের বাবা, চৌধুরী পরিবারের বড় সন্তান। তাঁর ছোট ভাই আশরাফ চৌধুরী। আদ্রের মা সায়রা চৌধুরী, একজন সাধারণ গৃহিণী হলেও পরিবারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর যত্নে ভরপুর সংসার। অন্যদিকে, আশরাফ চৌধুরীর স্ত্রী সুমি চৌধুরী। তাদের দুই সন্তান—ছেলে জিয়ান চৌধুরী এবং মেয়ে মেহজাবিন চৌধুরী। সবার আদর এবং বাড়ির একমাত্র মেয়ে বলে মেহজাবিনকে সবাই ভালোবেসে “সুখ” বলে ডাকে।
আদ্রদের পারিবারিক ব্যবসা। ঢাকা শহরের মধ্যে তাদের অবস্থান দ্বিতীয়, প্রথম ছিল কিন্তু কিছু ব্যক্তিগত কারণে জন্য এখন দ্বিতীয়। সেই কারণ মাঝে আছে। 
পড়াশোনা শেষ করে জিয়ান এখন সেই ব্যবসার দায়িত্বে যুক্ত হয়েছে। আর সুখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স তৃতীয় বর্ষের একজন মেধাবী ছাত্রী, যার চোখে ভবিষ্যতের অনেক স্বপ্ন।
মেহজাবিন চৌধুরী সুখ নাম যেমন সুন্দর কেমন রূপটাও বর্ণনা করার মতো। তার গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, আর এক জোড়া হরিণের মতো টানা টানা মায়াবী চোখ যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। তার মুখাবয়বে এক অদ্ভুত মায়া লেগে থাকে। এমন স্বর্গীয় সৌন্দর্যের অধিকারী সে, যে কেউ প্রথম দেখাতেই তার প্রেমে পড়ে যেতে বাধ্য।
---------------------------------------------------------------------
দীর্ঘ এক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যাত্রা শেষ করে কাব্য চৌধুরীকে নিয়ে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজে পৌঁছাল। জরুরি বিভাগে ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হতে না হতেই পরিবারের বাকি সদস্যরাও সেখানে এসে উপস্থিত হন। মিনিট পনেরো পার হওয়ার পর ডাক্তার আরাফ, যিনি জিহানের বাবা—গম্ভীর মুখে রিপোর্ট ফাইল হাতে নিয়ে এগিয়ে এলেন।
জিয়ান হাত বাড়িয়ে রিপোর্টটি নিতে চাইলে ডাক্তার আরাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "রিপোর্ট খোলার আগে একটা কথা বলি, আপনাদের সবাইকে শক্ত থাকতে হবে। কাব্য চৌধুরীর অবস্থা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সংকটাপন্ন। আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম যে, এই বয়সে হার্ট অ্যাটাক বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ওনাকে সব সময় টেনশনমুক্ত রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি।"
পুরো করিডোরে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল।
​ডাক্তার আরাফের গম্ভীর কথার উত্তরে আশরাফ চৌধুরী কিছুটা হালকা করার ভঙ্গিতে বললেন, "আরে তেমন কিছু না রে আরাফ, তুই মিছেই দুশ্চিন্তা করছিস। আসলে আজ বড় ভাইজান একটু বেশিই খুশি হয়ে গিয়েছিলেন। এতগুলো বছর পর নিজের ছেলেকে এভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে দেখে মানুষটা আবেগ সামলাতে পারেননি, এই যা।" আর হ্যা আরাফ ও আশরাফ ছোট থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড। 
​আশরাফ চৌধুরীর হালকা মেজাজের কথাগুলো শুনে আরাফ চৌধুরী বেশ বিরক্ত হলেন। ভ্রু কুঁচকে তিনি বললেন, 
"আরে, পরিস্থিতি এখন কতটা ক্রিটিক্যাল সেটা তুই বুঝতে পারছিস না আশরাফ! হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার মতো অবস্থা আমাদের নেই।"
​আরাফের গলার স্বরে ভয়ের আভাস পেয়ে আশরাফ চৌধুরী উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠলেন, 
"তাহলে কি বড় ভাইজানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করব?"
​আরাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন, 
"বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থায় উনি এখন নেই রে আশরাফ। আর এখন আমাদের দেশেই অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। সমস্যাটা যন্ত্রের নয়, সমস্যা ওনার শারীরিক অবস্থার।"
​আশরাফ চৌধুরী আর কিছু বললেন না, কেবল অপলক দৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আরাফ চৌধুরী পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য যোগ করলেন, "রোগীকে আপাতত আইসিইউ-তে (ICU) অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। এখনই ভেঙে পড়ার কিছু নেই, কাল সকাল পর্যন্ত দেখি কী হয়। এই বলে সে সেই স্থান ত্যাগ করলো।
​একদিকে ছেলে আজ এত বড় এক জন ডাক্টার হয়েছে, আর অন্যদিকে তার স্বামীর এহেন অবস্থা দেখে সায়রা চৌধুরী নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। দীর্ঘদিনের চেপে রাখা কান্নাটা আজ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। স্বামীর স্মৃতি আর ছেলের শূন্যতার কথা ভেবে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বিলাপ করে বলতে লাগলেন, 
"আজ যদি ছেলেটা পাশে থাকতো, তবে আমাদের আর এই সব কিছুই করা লাগত না, সে সব কিছু করত !"
সবাই জানে যে আদ্র থাকলে তাদের আর কিছু করা লাগতো নাহ।
​বড় আব্বুর এহেন অবস্থা দেখে সুখের কান্নাও আরও বেড়ে গেল। তার সাথে যোগ দিলেন তার মা সুমি চৌধুরী। জিয়ানের বাবা আশরাফ চৌধুরী সবকিছু শুনে যেন পাথর হয়ে গেছেন; তার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না। কাউকে আর কিছু না বলে সে বেরিয়ে গেলো।
​জিয়ান নিজেকে শক্ত রাখল। কারণ সে জানত, সে ভেঙে পড়লে এই মানুষগুলোকে সামলানোর কেউ থাকবে না। সে মাকে শান্ত করে বলল, 
"মা, তুমি বড় আম্মুকে একটু সামলাও। আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি।" 
সুমি চৌধুরী ছেলের কথার গুরুত্ব বুঝতে পারলেন এবং সে ছেলে কে সায় দিয়ে সায়রা চৌধুরীকে সান্ত্বনা দিতে তাঁর পাশে গিয়ে বসলেন।
​সুখের কান্না থামছিলই না। বড় আব্বু তাকে অনেক আদর করতেন এবং কথা দিয়েছিলেন যে, আদ্র দেশে ফিরলে তার সাথেই সুখের বিয়ে দেবেন।পুরোনো সব কথা ভেবে মেয়েটা ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। 
নিজের একমাত্র বোনের এই অবস্থা দেখে জিয়ানের মনটাও হাহাকার করে উঠল। সে বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, 
"সুখ, দেখিস বড় আব্বুর কিছু হবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ।"
​সুখ ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে অস্ফুট স্বরে বলল, "আমি আর পারছি না ভাইয়া।"
জিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিল, 
"পারতে হবে সুখ। আমাদের হাতে সব কিছু থাকে নাহ।"
​সুখ কোনো ভনিতা না করেই সরাসরি জিজ্ঞেস করল, 
"ভাইয়া, উনি কি এসবের কিছু জানেন?"
জিয়ান বোনের ইশারা বুঝতে পারল। সে মৃদু স্বরে বলল, 
"এখনো ভাইয়াকে এসব জানানো হয়নি। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় দেখে তারপর জানাব। আর ভাইয়া তো আমাদের ওপর অভিমান করেই আছে রে..."।
​সুখ সব বুঝতে পারে। সে জানে, আজকের এই পরিস্থিতির জন্য সে-ই দায়ী। তখন ছোট ছিল বলে পরিণাম বুঝতে পারেনি। যদি জানত এমন কিছু হবে, তবে সে কখনো এমন ভুল করত না। সুখ ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে 'ওহ' বলল, তারপর ভাইয়ের বুকেই একসময় ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল।
​এরই মাঝে জিয়ানের বাবা ফিরে এলেন। সে মূলত বড় ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে তিনি হাসপাতালের মসজিদে গিয়েছিলেন তার নামে দোয়া করতে। আসার সময় সবার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এসেছেন। খাবারগুলো সুমি চৌধুরীর হাতে দিয়ে তিনি ডাক্তারের চেম্বারের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাকিরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
​হাসপাতালের সেই থমথমে উৎকণ্ঠা আর দীর্ঘশ্বাসে এভাবেই সবার একটি নির্ঘুম রাত কেটে গেল। জানালার ওপাশে অন্ধকারের পর্দা সরে গিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল ভোরের আলো।
------------------------------------------------------------------------
​এদিকে, সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের অনেক আগেই সূর্য উদয় হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে সকালের নরম আলোয় নতুন একটা দিন শুরু হচ্ছে কিন্তু সেই আলো কি এই পরিবারের বিষণ্ণতা ঘোচাতে পারবে?
চলবে......))

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন