শুদ্ধ ফাইজদের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামিয়েছে। বউটাকে সেই গতকাল রাতে দেখেছিল। এরপর আর দেখা হয়নি। তাই চলে এলো বউয়ের বাপের বাড়ি। যদি ফারাহ্ তাদের বাড়ি থাকতো তবে কি তাকে এভাবে বউয়ের টানে ছুটে আসতে হত? উল্টে বউ কাছে থাকলে ঘুম আরও ভালো হত। কিন্তু নাহ্, বউ তো বাপের বাড়ি। তার কি আর বউকে জড়িয়ে ঘুমানোর উপায় আছে? শুদ্ধ ভাবতে ভাবতে বাড়ির সামনে এসে কলিংবেল চাপে। সাথে সাথেই দরজা খুলে যায়, যেন কেউ তার-ই অপেক্ষা করছিল। শুদ্ধ সামনে তাকালে দেখল ফারাহ্ ভেজা চুলে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার-ই দিকে। মনে হচ্ছে মেয়েটি হাঁপাচ্ছে। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। বউটা কি তাকে দেখে এভাবে ছুটে এসেছে? শুদ্ধ বুঝল বোধয়। তখনই ফারাহ্ প্রশ্ন করে বসে,
'আজ তো ভার্সিটি ছিল না। তাহলে দিনে আসেননি কেন?'
ফারাহ'র কথা শুনে শুদ্ধ মিটিমিটি হাসে। ধীরে ধীরে হাসির পরিধি দীর্ঘ হয়। ফারাহ'র দিকে একটু ঝুঁকে চাপা কণ্ঠে বলে,
'খুব বেশি মনে পড়ছিল বউ?'
কথাটা বলে শুদ্ধ ডান ভ্রু নাচায়। শুদ্ধ'র রিয়েকশনে ফারাহ'র অস্বস্তি হয়। শুদ্ধ তার মনের ভাব ধরে ফেলেছে ভেবে মেয়েটার দৃষ্টি এলোমেলো হয়। মাথা নিচু করে নেয়। সে শাওয়ার নিয়ে বেলকনিতে তাওয়াল মেলতে গিয়েছিল। তখনই দেখেছে শুদ্ধকে তাদের বাড়ির দিকে আসতে। ওমনি দরজা খুলতে দৌড়ে চলে এসেছে। গতকাল অন্তরার বাড়ি গেল। সকাল সকাল তার ভাইয়া গিয়ে তাকে নিয়ে এসেছে। আজ সারাদিন শুদ্ধ'র অপেক্ষা করেছে ফারাহ্। আজ তো ভার্সিটি ছিল না, তাই ভেবেছিল শুদ্ধ সকাল সকাল-ই আসবে। কিন্তু সকাল তো দূর, শুদ্ধ সারাদিনে একবারো আসেনি। এজন্য মেয়েটার মন খারাপ ছিল ভীষণ। শুদ্ধ ফারাহকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। ফারাহ্'র পাশে দাঁড়িয়ে নিজেই দরজা আটকে দেয়। ফারাহ্ এটা দেখে দ্রুত বলে,
'আপনি আটকাচ্ছি।'
শুদ্ধ হাসল। কিছু বলল না। ডান ত ফারাহ'র বা হাত ধরে ফারাহ'র ঘরের দিকে যায়। ফারাহ্ অবাক হলেও কিছু বলল না। শুদ্ধ আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে না দেখে স্বস্তি-ই পেল। এখন কেউ আসলে মুড খারাপ হয়ে যেত। শুদ্ধ ফারাহ' র ঘরে এসে ফারাহ্'র হাত ছেড়ে এবারেও কিছু না বলে চুপচাপ দরজা আটকে দিল। ফারাহ্ শুদ্ধ'র পিছনে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। শুদ্ধ দরজা আটকে দিয়ে সাথে সাথে উল্টোদিকে ফিরে দাঁড়ায়। ফারাহ'র দিকে এগোতে নিলে ফারাহ্ দ্রুত দু'পা পেছায়।
শুদ্ধ'র এগোনোটা কেমন যেন বলে মনে হলো ফারাহ'র। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'পিছিয়ে যাচ্ছ কেন?'
ফারাহ্ আমতা আমতা করে বলে,
'আপনি এগোচ্ছেন তাই?'
শুদ্ধ হেসে ফেলল। অতঃপর বলে,
'হাসবেন্ড এগোলে ওয়াইফকে পিছিয়ে যেতে হয়, এসব কোথা থেকে শিখেছ ফারাহ্? মনে হচ্ছে.....
মাঝ থেকে ফারাহ্ বলে,
'আপনার যা-ই মনে হোক, আমি কিছু দেখিনা।'
এবার শুদ্ধ শব্দ করে হেসে ফেলে। নিজেকে সামলায় সে। তাকায় ফারাহ'র দিকে। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। এমনিই তার বউটা কি সুন্দর! এর মধ্যে একবার সেজে তার সামনে আসে, আরেকবার গোসল করে! উফ! বউটা তো দিব্যি ভালো থাকে! আর তার ভেতরে শুরু হয় জ্ব'ল'ন। অথচ বউ অবুঝের মতো পেছায়।
ফারাহ্ কিছু বোঝার আগেই শুদ্ধ হঠাৎ-ই এগিয়ে এসে ফারাহকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ফারাহ্ কেঁপে ওঠে। শুদ্ধ ফারাহ'র কাঁধে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলে,
'তুমি যে উল্টাপাল্টা সিন দেখ, এটা তো আমি বুঝে গিয়েছি ফারাহ। বাট তুমি অসময়ে শাওয়ার নাও কেন? নাও ভালো কথা, আমার জন্য একটুখানি ওয়েট করতে পারো না, হু?'
শুদ্ধ'র কথার অর্থ বুঝতে পেরে ফারাহ্ ঢোক গিলল। শুদ্ধকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। শুদ্ধ বুঝতে পেরে ফারাহকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসানি কণ্ঠে বলে, ঘরে ফারাহকে আরও শক্ত করে
'আমার তোমাকে লাগবে ফারাহ্।'
ফারাহ্ চোখ বুজে রেখেছে। শুদ্ধ'র এহেন কথায় মেয়েটির ভেতরে কম্পন শুরু হয়ে গিয়েছে। সে দু'হাত শুদ্ধ'র পিঠে রেখে শার্ট আঁকড়ে ধরতে নেয় তার আগেই শুদ্ধ ফারাহকে ছেড়ে দাঁড়ায়। সাথে সাথে ফারাহ্ চোখ মেলে তাকায়। শুদ্ধ দু'হাতের আজলায় ফারাহ'র মুখটা নিয়ে অধৈর্য কণ্ঠে বলে,
'তোমার আসল বাড়ি যাবে না বউ?'
ফারাহ্ প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। শুদ্ধ জিজ্ঞেস করে,
'তুমি চাও আমি ঘরজামাই থাকি?'
ফারাহ্ ছোট করে বলে, 'জ্বি।'
কথাটা শুনতেই শুদ্ধ'র রাগ হয়। মুহূর্তেই ফুরফুরে মনটা পাল্টে গেল। ইচ্ছে করল, মেয়েটাকে ঠাটিয়ে চার-পাঁচটা থাপ্পড় মেরে বরকে ঘরজামাই রাখার সাধ মিটিয়ে দিতে। শুদ্ধ নিজেকে সামলায়। ফারাহ'র গাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসে। এরপর ফারাহ'র দিকে চেয়ে শান্ত স্বরে বলে,
'আমি ঘরজামাই থাকতে চাইনা। তাই আমাদের আর হবেনা। তোমাকে তো বলেছিলাম, তোমাকে আমার পছন্দ নয়। নিহাতই তোমার জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই তোমাকে বিয়ে করলাম। অপছন্দের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তোমাকে সাথে সারাজীবন থাকার কথা ভেবে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর কোনো ভাবাভাবি নেই। তোমার আমার মত মিলছে না তাই তোমাকে টাটা বাই বাই বলে, এবার পছন্দের এক মেয়েকে বিয়ে করে ফেলব। আহ! আবারো বিয়ে হবে আমার! ভাবতেই নাচতে ইচ্ছে করছে।'
এটুকু বলে শুদ্ধ থামে। আড়চোখে তাকায় ফারাহ'র দিকে। বোঝার চেষ্টা করে ফারাহকে।
এদিকে শুদ্ধ'র কথাগুলো শুনে ফারাহ'র বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। শুদ্ধকে দেখে মোটেও মনে হচ্ছে না সে মজা করছে। শুদ্ধ বিয়ের দিনই এই কথাগুলো বলেছিল। কিন্তু শুদ্ধ'র হঠাৎ হঠাৎ অন্যরকম আচরণে শুদ্ধ'র বলা এসব কথা সে ফেলনা হিসেবে নিয়েছিল।
মজা করেছে। কিন্তু এখন তো তা মনে হচ্ছেনা। তাহলে শুদ্ধ যে হুটহাট কাছে আসত, ওসব কিছুই ছিল না? কথাগুলো ভেবে ফারাহ'র চোখজোড়া ভরে ওঠে। চোখের পলকে দু'চোখ বেয়ে টুপ করে কয়েকফোঁটা পানি গড়িয়ে গালে এসে পড়ল।
শুদ্ধ ফারাহ'র চোখের পানি দেখে মনে মনে হাসল। চিড়ে ভিজেছে তার মানে। এইবার কাজ হবে। সবচেশে বড় ব্যাপার ফারাহ্ যে তার প্রতি কিছুটা উইক হয়েছে এটাও বুঝল। এখন সে ঠিকভাবে এগোতে পারবে। শুদ্ধ গলা ঝেড়ে বলে,
'তুমি যদি আমাকে ঘরজামাই না রেখে আমার বাড়ি একবারে যেতে চাও, তবে তোমাকে নিয়ে আবারো ভেবে দেখব।'
কথাটা শুনে ফারাহ্ শুদ্ধ'র দিকে তাকায়। নাক টেনে বলে,
'আপনি সবসময় আমাকে অপশন হিসেবে রাখেন কেন? আমি কি দেখতে এতোটাই খারাপ?'
ফারাহ'র কথা শুনে শুদ্ধ'র হাসি পেল। কিন্তু সে হাসল না। উপর উপর ভীষণ গম্ভীর হয়ে থাকল। মেয়েটা যদি তার ভেতরটা দেখতে পেত, তবে বুঝত, সে তার ফারাহ্ পাখির সৌন্দর্য দেখে কত কষ্টে নিজেকে সামলায়।
শুদ্ধ একটু দাঁড়ানোর ভঙ্গি করে ফারাহ'র হাত ধরে টেনে ফারাহ'কে তার উরুর উপর বসিয়ে দেয়। ফারাহ্ আর তার মাথা বরাবর। শুদ্ধ দু'হাতে ফারাহ'র কোমর জড়িয়ে ধরে হেসে বলে,
'তুমি আসলেই সুন্দর না জানো ফারাহ্? আচ্ছা তুমি কি আয়নায় নিজেকে দেখনাহ?'
কথাটা শুনে ফারাহ্ ছলছল দৃষ্টিতে তাকায় শুদ্ধ'র দিকে। ভাঙা গলায় বলে, 'হ্যাঁ দেখি। আমি জানি আমি সুন্দর নাহ। আপনি যান একটা সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে করে সুখে সংসার করুন। ছাড়ুন আমাকে।'
কথাটা বলে ফারাহ্ শুদ্ধ'র কোল থেকে উঠতে চাইলে শুদ্ধ আরও শক্ত করে ধরে ফারাহকে। বলে,
'ছেড়ে দিবে তবুও শ্বশুরবাড়ি একেবারে যাবে না? ঘরজামাই রাখার এতো শখ?'
ফারাহ্ উত্তর করে,
'ঘরজামাই রাখব না। কিন্তু আপনার সাথে থাকব না। আমি সুন্দর নয় বলে আপনি শুধু আমাকে খোঁটা দেন। আপনি একটা সুন্দর মেয়ে.......
কথার মাঝেই শুদ্ধ ফারাহ্'কে টেনে ঠোঁটজোড়া আঁকড়ে ধরে। ফারাহ্ কেঁপে ওঠে। প্রতিবারের মতো এবার শুদ্ধ'র সঙ্গ দিতে চায়না সে। বরং শুদ্ধ'র থেকে ছাড়া পেতে ছটফটায়। শুদ্ধ ফারাহ'র আশকারা না পেয়ে মেয়েটাকে ছেড়ে দেয়, তবে হাতের বাঁধন ছাড়ল না। ফারাহ্ দু'হাতে শুদ্ধ'র হাত ঠেলে মোচড়ামুচড়ি করে আর বলে,
'ছাড়ুন আমাকে।'
শুদ্ধ ভীষণ আবেগী সুরে ডাকে,
'পাখি?'
এই ডাকে কি ছিল কে জানে! ফারাহ'র দেহ জুড়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়। মাথাটা সামান্য উঁচু করে তাকায় শুদ্ধ'র দিকে। শুদ্ধ ফারাহ'কে নিজের দিকে টেনে নিয়ে ডান হাত ফারাহ'র গালে রেখে আবেগঘন কন্ঠে বলে,
'যদি একবার আমার চোখ দিয়ে নিজেকে দেখতে পেতে, তবে বুঝতে, আমার ফারাহ্ পাখি ঠিক কতটা অসুন্দর!'
ফারাহ্ ভীষণ অনুভূতি নিয়ে শুনছিল শুদ্ধ'র কথা। কিন্তু শেষের অসুন্দর শব্দটা সব নষ্ট করে দিল। সে মলিন গলায় বলে, 'আমি অসুন্দর?'
শুদ্ধ ফারাহ'র চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। এবার সে কিছুটা শব্দ করেই হেসে ফেলল। ফারাহ্ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুদ্ধ ফারাহ্'কে বিছানায় ঠাস করে চিত করে শুইয়ে দেয়। ফারাহ্ বিস্মিত হয়। উঠতে চায় তার আগেই শুদ্ধ ফারাহ'র উপর আধশোয়া হয়ে ফারাহ'কে চেপে ধরে মেয়েটার গালে সর্বশক্তি দিয়ে কামড়ে ধরে। ব্যথা পেয়ে ফারাহ্ মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে। শুদ্ধ ছেড়ে দেয়। কামড় দেয়া স্থানে একটি চুমু খেয়ে ফারাহ'র চোখের দিকে তাকালে দেখল মেয়েটির দু'চোখ পানিতে টইটুম্বুর। শুদ্ধ ফারাহ'র কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে বলে,
'ওরে, আমার বোকা-পাখি রে! আমার চোখে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী আমার ফারাহ্ পাখি। আমার চোখের ভাষা বুঝিস না কেন বউ?'
ফারাহ'র শরীর শিরশির করে ওঠে। শুদ্ধ'র এই একটি কথা অনেকগুলো সঠিক-ভুল কথার উত্তর, ফারাহ্ তা খুব ভালোই বুঝেছে।
এদিকে শুদ্ধ ফারাহ'র শরীর থেকে ওড়না সরিয়ে ফেলে। ভীষণ এলোমেলো লাগে শুদ্ধকে। ফারাহকে টেনে নেয় নিজের মাঝে।
মেয়েটা হাসফাস করে, শুদ্ধ সেসবদিকে পাত্তা দেয়না, সে তার মতো ফারাহ'তে মত্ত হতে চায়। বা হাতে শার্টের বোতাম অর্ধেকটা খুলে ফেলেছে। তখনই দরজায় করাঘাত করে কেউ। শুদ্ধ'র মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে। বিরক্ত হয়ে মাথা উঁচু করে তাকায়। দরজার ওপাশ থেকে ফাইজের কণ্ঠ ভেসে আসছে। শুদ্ধ'র বিরক্ত বাড়ল। এই বেয়াদব ফাইজটা তো তাকে জ্বালিয়ে মারল। শালা আসলেই বৃটিশ।
শুদ্ধ' র দৃষ্টি ফারাহ'র দিকে। ফারাহ্ চোখ বুজে রেখে ভারী নিঃশ্বাস ফেলছে। শুদ্ধ কিছু একটা ভেবে মনে মনে হাসল। অতঃপর গম্ভীর গলায় বলে,
'এখন তোমার ভাইকে নিজ মুখে বলবে, তুমি আমার বাসায় একেবারে গিয়ে থাকতে চাও। নয়তো তোমার সাথে আমার হবে না ফারাহ্। কনফার্ম।'
কথাটা বলে শুদ্ধ ফারাহ'র উপর থেকে উঠে দাঁড়ায়। এদিকে শুদ্ধ'র কথা শুনে ফারাহ্ চোখ মেলে তাকায়। শুদ্ধ উঠে যাওয়ায় সে-ও উঠে বসে। ওড়না টেনে নিজেকে ঢেকে নেয়। তাকায় শুদ্ধ'র দিকে।
শুদ্ধ ফারাহ'র দিকে চেয়ে শার্টের বোতাম লাগাতে ব্যস্ত। মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে। শুদ্ধ'র গম্ভীর মুখ দেখে ফারাহ্ ঢোক গিলল। মেয়েটা বুঝতে পারেনা শুদ্ধ কেন এমন করে। একেকবার একেক কথা বলে। সে ভীষণ দ্বিধায় পড়ে যায়।
শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'ফাইজকে বলবে না-কি আমি চলে যাবো?'
ফারাহ্ ঢোক গিলে বলে, 'বলব।'
শুদ্ধ এগিয়ে এসে ফারাহ'র ঠোঁটজোড়ায় টুপ করে একটা চুমু খেছে খেয়ে মুসু মৃদু হেসে বলে, 'দ্যাটস মাই গুড গার্ল।'
মুহূর্তেই শুদ্ধকে গম্ভীর থেকে হাসতে দেখে ফারাহ্ অবাক হলো। শুদ্ধ হুটহাট মুড চেঞ্জ করে ফেলে। শুদ্ধ' র এই ব্যাপারটি ফারাহ'র কাছে ভীষণ অদ্ভুদ লাগে।
ওদিকে শুদ্ধ এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। ফাইজ শুদ্ধকে দেখে বলে,
'তুই?'
শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'আমার বউয়ের কাছে আমি থাকবো না তো কে থাকবে? তাছাড়া তোর বউ নেই বলে কি কষ্ট হচ্ছে সোনা? কোথায় কোথায় কষ্ট হচ্ছে?
কথাটা বলতে বলতে শুদ্ধ একে একে ডান হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেয় ফাইজের গলা, বুক, পেট এরপর আরও নিচের দিকে নামতে গেলে ফাইজ শুদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে রেগে বলে,
'বেয়াদব ভালো হবি না তুই?'
শুদ্ধ মিটিমিটি হাসে। এগিয়ে এসে ডিভানের উপর বসে গা এলিয়ে দিয়ে ফারাহ'র দিকে চেয়ে হেসে বলে,
'জন্মের সময় আমার মা আমার নাম শুদ্ধ রেখেই প্রমাণ করে দিয়েছে আমি কত ভালো। আর ভালো হতে পারব না। ফারাহ্ তোকে ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলবে, বোস।'
এতক্ষণ ফারাহ্ ফাইজ আর শুদ্ধ'র কাহিনী বোঝার চেষ্টা করছিল। শুদ্ধ উল্টো হয়ে দাঁড়ানোয় ঠিক বুঝতে পারেনি। তবে শুদ্ধ নিশ্চয়ই কিছু করেছে, তাই তার ভাই এমন রিয়েকশন দিল। কিন্তু শুদ্ধ'র শেষ কথায় ফারাহ্ ঢোক গিলল।
ফাইজ ভেতরে এসে ফারাহ'র পাশে ডান পা তুলে বসে বলে, 'কি বলবি?'
ফারাহ্ ভাইয়ের দিকে তাকায়। এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে শুদ্ধ'র দিকে তাকায়। শুদ্ধ বাদিকে হেলে ডান পা বা পায়ের উপর রেখে তার দিকে গম্ভীর মুখে চেয়ে আছে। দু'হাত আড়াআড়িভাবে বুকে গুঁজে রাখা। ফারাহ্ দৃষ্টি সরিয়ে ভাইয়ের দিকে আনে। ফাইজ ভ্রু কুঁচকে বলে,
'কি রে কি বলবি? চুপ করে আছিস কেন?'
ফারাহ্ দোনামোনা করে। এতোদিন বলেছে সে ঘরজামাই নিয়ে থাকবে। আর আজ বলবে সে শ্বশুরবাড়ি যেতে চায়। সবচেয়ে বড় কথা, সে শ্বশুর বাড়ি যেতে চায়, এই কথাটা তার নিজের মুখে ভাইকে বলতে কেমন যেন লজ্জা লাগছে। ফাইজ আবারো বলে,
'কিছু কি বলবি?'
ফারাহ্ মিনমিন করে বলে, 'হু।'
'তো বল?'
ফারাহ্ আবারো শুদ্ধ'র দিকে তাকায়। ইতোমধ্যে শুদ্ধ'র চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। ফারাহ'র অসহায় লাগলো। মাথা নিচু করে চোখ বুজে নেয় সে। ঢোক গিলে বলে, 'পরে বলব।'
কথাটা শুনতেই শুদ্ধ দাঁড়িয়ে যায়। ইচ্ছে করল, ফারাহকে ঠাটিয়ে দু'টো থাপ্পড় লাগাতে। চোখমুখ শক্ত করে দেখল ফারাহকে। দাঁড়ালো না আর। বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায় আর বলে, 'যাচ্ছি আমি।'
ফাইজ শুদ্ধ'র পিছু পিছু আসে আর বলে, 'থাকবি না আজ?'
'না। কাজ আছে।'
'কিছু খেয়ে যা।'
শুদ্ধ'র কাটকাট জবাব,
'পেট ভরে গেছে।'
বলতে বলতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় শুদ্ধ। ফাইজ কিছু বলল না। বলেও লাভ নেই। থাকবেনা এ।
শুদ্ধ গাড়িতে উঠে বসে পকেট থেকে ফোন বের করে ফারাহ'র নাম্বারে একটি মেসেজ পাঠায়,
'কসম, আর জীবনে তোর মুখ দেখতে আসব না এই বাড়ি।'
মেসেজটি পাঠিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়। রাগে শরীরটা কাঁপছে। অ'সহ্য লাগছে সব। বিড়বিড় করল,
'বালের বেয়াদব বউ।'
এদিকে ফারাহ্ শুদ্ধ'র মেসেজটি দেখে থমথমে মুখে বসে আছে। সে শুদ্ধ'র সামনে ঠিক করে বলতে পারতো না। সে চাইছিল শুদ্ধ চলে গেলেই সে তার ভাইকে ভালোভাবে বলবে। কিন্তু শুদ্ধ'র মেসেজ দেখে মনটা ভীষণ ভার হয়। শুদ্ধের বলা তুই টুকু বেশি খারাপ লাগছে। তবে ফারাহ্ নিজেকে সামলায়। শুদ্ধ হুটহাট মুড চেঞ্জ করে ফেলে। এই রাগ তো এই হাসি। সে ভাইকে রাজি করিয়ে শুদ্ধকে জানালে শুদ্ধের সব রাগ নিমিষেই পড়ে যাবে ভেবে ফারাহ'র মন হালকা হয়।
বাড়ির সামনে এসে ইরফান গাড়ি থামায়। মাইরা তার কোলে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। মাথাটা ইরফানের একদম বুকে। ইরফান ডান হাত বাড়িয়ে মাইরার মুখ সামান্য উপরদিকে তোলে। গাড়ির ভেতরের লাইট অফ। চারিদিক থেকে আবছা আলোর ছিটেফোঁটা ঘুমন্ত মাইরার মুখে এসে পড়েছে। ইরফানের দৃষ্টি মাইরাতে ঘুরছে।
মাইরা ঘুমের মাঝে মিটমিট করে হাসে, বোধয় স্বপ্ন দেখছে। ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হঠাৎ-ই মাইরা ঠোঁট নাড়িয়ে ডাকে, 'প্রফেসর সাহেব?'
ইরফানকে ডেকে মাইরা ঘুমের মাঝেই জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। ইরফান শীতল দৃষ্টিতে তাকায়। ডান হাতের বুড়ো আঙুল মাইরার ভেজা ঠোঁটের চারপাশে ঘোরায়। মৃদুস্বরে জবাব দেয়, 'বলো।'
মাইরা ঘুমের মাঝেই ঠোঁট উল্টে আবারো বলে, 'আমার বয়ফ্রেন্ড আছে।'
কথাটা বলতেই মাইরার ঠোঁট প্রসারিত হয়। মাইরা ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মাঝে বোধয় ইরফানকে জ্বালাতে আবারো মজা করছে। তাই সে ঘুমের মাঝে হেসেও ফেলছে।
কিন্তু ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়। কটমট চোখে মাইরার দিকে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে, 'স্টুপিড গার্ল, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বাঁদরামি করছ? থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার।'
কথাটা বলে ইরফান তার ডান হাতে মাইরার গাল চেপে ধরে মাইরার মুখ উঁচু করে, ফলস্বরূপ মাইরার ঠোঁটজোড়া কিছুটা চৌখা হয়। চোখের পলকে ইরফান মুখ এগিয়ে নিয়ে মাইরার ঠোঁটজোড়ায় শক্ত করে দাঁত বসায়। আকস্মিক তীব্র ব্যথায় গুঙিয়ে ওঠে মাইরা। ঘুম ছুটে যায়। দ্রুত চোখ মেলে তাকায়। ব্যাপারটি বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। দু'হাতে ইরফানকে ঠেলে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইরফানের সাথে পারলে তো! মাইরা ছটফট করে। প্রায় মিনিট দুই পর ইরফান কোমল হয়। ছেড়ে দেয় মাইরাকে। মাইরা দ'হাতে ঠোঁট চেপে ধরে।
সাথে পারলে তো! মাইরা ছটফট করে। প্রায় মিনিট দুই পর ইরফান কোমল হয়। ছেড়ে দেয় মাইরাকে। মাইরা দু'হাতে ঠোঁট চেপে ধরে। ব্যথায় চোখজোড়ায় পানি জমেছে। ইরফানের দিকে চেয়ে রেগে বলে, 'আপনি কি রাক্ষস?'
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে, 'নো।'
মাইরা আবারো রেগে বলে, 'নো বললেই হলো? একটা রাক্ষস-ও আপনার চেয়ে ভালো আছে।'
কথাটা বলে মাইরা ব্যথাসূচক শব্দ করতে লাগলো। ইশ! তার ঘুমের সুযোগ নিয়ে লোকটা কিভাবে রাক্ষসগিরি করছিল। অসভ্য লোক একটা।
ইরফান মাইরার কথায় বিরক্তি কণ্ঠে বলে, 'ঠিক যেমন একটা বাঁদর-ও তোমার চেয়ে বাঁদরামিতে পিছিয়ে আছে, রাইট?'
মাইরা কটমট চোখে তাকায়। সবসময় তার মতো এত সুন্দর একটা মেয়েকে বাঁদর বলে লোকটা। সে কিছু বলার আগেই ইরফান গাড়ির দরজা খুলে মাইরাকে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে এগোয়। মাইরা বিচলিত কণ্ঠে বলে, 'কি করছেন? আমাকে নামিয়ে দিন।'
ইরফান ভাবলেশহীনভাবে বলে, 'নো।'
মাইরার বিরক্ত লাগলো। এমনিতেই ইরফানের মা তাকে পছন্দ করেনা বলেছে, তাকে এই বাসায় আসতেও নিষেধ করেছে। সেখানে নিজের ছেলের কোলে তাকে দেখলে শ্বাশুড়িটা বোধয় খেয়েই ফেলবে। তাছাড়া লজ্জার-ও একটা ব্যাপার আছে। মাইরা ইরফানের দিকে চেয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, 'আমাকে নামিয়ে দিন বলছি। বাড়িতে আপনার মা বাবা আছে তো। দয়া করে আমাকে নামান। বিশ্বাস করুন, আমি হাঁটতে পারি। আপনি চাইলে আপনাকে র্যাম শো করে দেখাতে পারবো। তবুও আমাকে নামান।'
ইরফান ধমকে ওঠে, 'সাটআপ। অন্যের বউকে কোলে নিয়েছি আমি? স্টুপিড বাঁচাল!'
ধমক খেয়ে মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। স্টুপিড বাঁচাল বলায় ইচ্ছে করল ইরফানের গলা চেপে ধরতে। যতরকম অসহ্য নাম আছে সব নামে তাকে ডাকছে এই লোকটা। ভাবার মাঝেই ইরফান বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। মাইরা ইরফানের দিকে সিটিয়ে যায়। যদি পারত তবে ইরফানের কোর্টের ভেতর লুকিয়ে পড়ত। ইশ! কে কোনদিক থেকে তাকে দেখছে কে জানে!
ডাইনিং-এ ইরফানের বাবা, মা, ইনায়া তিনজনেই ছিল। তারা মূলত রাতের খাবার খাওয়ার জন্য এখানে এসেছে। ইনায়া, তারেক নেওয়াজ ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসা। রুমা নেওয়াজ টেবিলের পাশে দাঁড়ানো। সকলে ইরফানের কোলে মাইরাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে নেয়। ইনায়া উঠে এসে বলে, 'ভাবি কি অসুস্থ নাকি ভাইয়া?'
ইরফান ছোট করে বলে, 'নো।'
মাইরার ইচ্ছে করল মাটি ফাঁক হয়ে যাক, সে ভেতরে ঢুকে যাক। তারেক নেওয়াজ গালে হাত দিয়ে ছেলেকে দেখছে। সে ছেলেটাকে চিনতে কত বড় ভুল করেছিল ভাবা যায়! এ তো তার চেয়েও কয়েকশো গুণ উপরে বউ পাগল। খারাপ না। বংশের নাম রাখছে। খারাপ কি! শুধু আগের ইরফানের সাথে মেলাতে পারেনা, এই যা!
ইরফান মাইরাকে নিয়ে সরাসরি তার মায়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে মাইরাকে কোলে থেকে নামিয়ে দেয়। রুমা নেওয়াজ প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায় ছেলের দিকে। ইরফানের সাথে মাইরাকে দেখে অবাক হয়নি। ইরফান যখন বেরিয়ে গেল তখনই সে বুঝেছে ইরফান মাইরাকে না নিয়ে ফিরবেনা। নিজ ছেলেকে খুব ভালোভাবেই চেনা আছে তার। মাইরা ইরফানের পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দুই মা ছেলের মাঝে তার যে কি হবে, এটা ভেবেই মেয়েটার ঘাম ছুটছে।
ইরফান তার মায়ের দিকে চেয়ে গম্ভীর স্বরে বলে, 'আমার ওয়াইফ আমার সাথে এই বাসায় থাকবে। তুমি ওকে লাইক না করলেও থাকবে।'
ইরফানের কথায় রুমা নেওয়াজসহ, তারেক নেওয়াজ, ইনায়া অবাক হয়। ইরফানের মা যে মাইরাকে পছন্দ করছেনা এটা তারেক নেওয়াজ, ইনায়া আগেই জানত। তবে ইরফানের মুখে এহেন কথায় তারা অবাক হয়েছে।
রুমা নেওয়াজ কিছু বলতে চাইলে ইরফান আবারো বলে, 'তোমার ডিসিশন চাইনি। আমার ডিসিশন জানিয়েছি। বিয়ে যেহেতু আমার তাই আমার ডিসিশন-ই হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফাইনাল। আমার ওয়াইফকে তুমি লাইক না করলেও এডজাস্ট করে নিবে। ঠিক যেভাবে আমি তোমার হাসবেন্ডকে লাইক না করলেও এডজাস্ট করে নিচ্ছি।'
ছেলের কথায় রুমা নেওয়াজ আগের চেয়েও বিস্মিত হয়। বলার মতো কিছু খুঁজে পায়না। আর পাঁচজন শ্বাশুড়ির মতো সে মাইরার উপর দোষ চাপালেন না। কারণ তিনি জানেন, তার ছেলে কখনো অন্যের কথায় চলে না। যা করে সব নিজের মর্জিতে। কিন্তু মাইরাকে তার অজ্ঞাত এক কারণে অপছন্দ যার পরিমাণ বিন্দুমাত্র কমল না।
ইরফানের পাশে দাঁড়ানো মাইরা একবার রুমা নেওয়াজের দিকে তাকায় তো একবার ইরফানের দিকে। ইরফান কি অদ্ভুতভাবে কথা বলে! কাউকেই ছাড় দেয়না।
ওদিকে ছেলের বলা সব কথা এতক্ষণ সুন্দরভাবে বুঝলেও শেষের কথায় তারেক নেওয়াজ কেশে ওঠে। অবাক হয়ে বলে, 'কি বলছ? আমাকে তোমার পছন্দ নয়?'
ইরফান বাবার দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে, 'নো বাবা। ফাঁকিবাজদের আমি ডিসলাইক করি।'
কথাটা বলে ইরফান মাইরার হাত তার ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে দোতলায় যেতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে।
তারেক নেওয়াজ থমথমে মুখে চেয়ে থাকে ইরফানের দিকে। সে কাজের জন্য বিদেশ গিয়েছিল। কিন্তু অর্ধেক কাজ ফেলেই বাংলাদেশ ফিরে এসেছে। এখন সেসব কাজের জন্য আবার ইরফানকে পাড়ি জমাতে হবে বিদেশে। কিন্তু সে তো ইচ্ছে করে কাজ ফেলে আসেনি। ছেলের বিয়ে করা বউকে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে না পেরে চলে এসেছে। কিন্তু এখন তো সেই ছেলের কাছেই খোঁটা শুনতে হচ্ছে। হাহ! এই ছিল কপালে? অবশ্য এমন ছেলে কপালে থাকলে সেই কপাল খোঁটাময় হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। কথাগুলো ভেবে তারেক নেওয়াজ হতাশার শ্বাস ফেললেন।
মাইরা সিঁড়ি বেয়ে উঠছে আর অবাক হয়ে দেখছে ইরফানকে। এতদিন শুনেছে বাবারা ছেলেদের ফাঁকিবাজ বলে। আজ দেখছে ইরফান ছেলে হয়ে তার বাবাকে ফাঁকিবাজ বলছে। মানে ইরফানের ক্ষেত্রে সব উল্টো। ভাবতে ভাবতে ইরফানের ঘরের কাছে চলে এসেছে মাইরা।
ইরফান হঠাৎ-ই মাইরাকে একটানে ঘরের ভেতর এনে দরজা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। এরপর মাইরাকে দরজা সাথে চেপে ধরে।
হঠাৎ করে কি হয়ে গেল বেচারি মাইরা বুঝতেই পারেনি। হতভম্ভ চোখে তাকায় ইরফানের দিকে। ইরফান মাইরার সাথে চেপে দাঁড়িয়ে থমথমে কণ্ঠে বলে, 'তাকিয়ে তাকিয়ে সিডিউস করছিলে?'
মাইরা বোকাচোখে চেয়ে বলে, 'হ্যাঁ?'
ইরফান তার দৃষ্টি নামায় মাইরার লালিত ঠোঁটজোড়ায়। ব্যাপারটি মাইরা খেয়াল করতেই দু'হাতে তার ঠোঁট চেপে ধরে। অসভ্য লোকটা শুধু উল্টাপাল্টা মতলবে থাকে, আর রাক্ষসগিরি করে। মাইরার কান্ডে ইরফান বিরক্ত হলো। বিড়বিড় করে, 'স্টুপিড গার্ল।'
কথাটা বলে মাইরাকে ছেড়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। মাইরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
সামিয়া আর তার সাথে যে দু'জন মেয়ে থাকে তারা নাছিমদের এখানে এসেছে। মূলত নাছিমের মা তাদের আসতে বলেছিল, এজন্যই এসেছে তারা। ভদ্রমহিলা সবকিছু এগিয়ে দিয়ে খাওয়ালেন সামিয়াদের। হাতের রান্না বেশ ভালো, এজন্য সামিয়া তৃপ্ত করে খেয়েছে। খাওয়াদাওয়া শেষে সামিয়া মৃদুস্বরে বলে, 'আন্টি আপনি আমাদের হাতের রান্না অবশ্যই একদিন টেস্ট করবেন। যদিও খুব ভালো রাঁধতে পারিনা তবে চেষ্টা করব।'
নাছিমের মা সামিয়ার থুতনিতে হাত রেখে বলে, 'আর কয়েকদিন পর থেকে নিয়মিত তোমার হাতের রান্নাই খাবো মা, চিন্তা কর না।'
ভদ্রমহিলার কথায় সামিয়াসহ, সামিয়ার দুই রুমমেট অবাক হলো। সামিয়া ভ্রু কুঁচকে বলে, 'জ্বি?'
নাছিমের মা মৃদু হেসে বলেন, 'এসো তোমার সাথে একটু গল্প করি। একা একা ভালো লাগেনা মা।'
সামিয়ার দুই রুমমেট কাজ আছে বলে চলে যায়। সামিয়াকে নিয়ে নাছিমের মা সোফায় এসে বসে। জিজ্ঞেস করে, 'তোমার বাসায় কে কে আছে মা? বাবা, মা ছাড়া আর কে কে?'
সামিয়া মলিন মুখে উত্তর দেয়, 'আমার বাবা মা ছোট বেলায় মারা গিয়েছে আন্টি। আমি আমার চাচা-চাচির কাছে বড় হয়েছি।'
কথাটা শুনে নাছিমের মায়ের মনটা খারাপ হলো। আহারে! কি শান্তশিষ্ট মিষ্টি এক মেয়ে! বাবা মা ছাড়াই বড় হয়েছে মেয়েটি। ভদ্রমহিলা বলে, 'এখন থেকে আমাকে তোমার মা ভাববে, বুঝেছ?'
সামিয়া মলিন মুখে তাকায়। নাছিমের মাকে তার ভীষণ ভালো লাগলো। কি সুন্দর করে কথা বলে, মায়েরা বোধয় এমনি হয়? মায়ের আদর কখনো পায়নি সে। তবে চাচি তাকে সন্তানের মতো না দেখলেও অত্যাচার করেনি কখনো। সেদিকে থেকে সে শুধু মায়ের আদর থেকেই বঞ্চিত
নাছিমের মা সোফার উপর থেকে তার ফোন নিয়ে বলে, 'মা তোমার চাচার নাম্বারটা একটু বল তো?'
কথাটা শুনে সামিয়া ভীষণ অবাক হয়। তার চাচার নাম্বার নিয়ে ইনি কি করবে? বোকা সামিয়া কিছু আন্দাজও করতে পারেনা। মুখের উপর না-ও করতে পারেনা। আবার ভাবে, সে কি কোনো ভুল করেছে? যার বিচার ইনি তার চাচাকে দিতে চাইছে? সামিয়া ঢোক গিলে মিনমিন করে বলে, 'আন্টি আমি কি কোনো ভুল করেছি? এমন হলে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার চাচাকে কিছু বলবেন না। উনি আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন।'
নাছিমের মা সামিয়ার কথা শুনে হেসে ফেলল। নিজেকে সামলে বলে, 'পাগলি মেয়ে। তোমার মতো শান্তশিষ্ট, ভদ্র মেয়ে কিভাবে ভুল করবে বল তো? তুমি কোনো ভুল করনি মা। আমি তোমার চাচার সাথে কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলব। বুঝলে?'
সামিয়া স্বস্তি পায়। চাচা তাকে খুব আদর করে শহরে পড়তে পাঠিয়েছে। সে ভুল করে তার চাচাকে একটুও কষ্ট দিতে চায়না। মেয়েটি সরল মনে তার চাচার নাম্বার নাছিমের মাকে দিল। ভদ্রমহিলা ভীষণ খুশি হয়েছে বোঝা গেল। তবে সামিয়া বুঝল না, নাছিমের মায়ের সাথে তার চাচার কি এমন ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। এসব নিয়ে এতো ভাবলো না। নাছিমের মা সামিয়াকে আবারও তাদের বাড়ি আসতে বলে সে তার ঘরে চলে যায়। আর বলে যাওয়ার সময় দরজাটা ভিড়িয়ে দিতে।
ভদ্রমহিলা তার ঘরে চলে গেলে সামিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দরজা খুলে বাইরে বেরতে নিলে শক্তপোক্ত প্রশস্ত বুকে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে নিলে নাছিম সামিয়ার ডান হাত টেনে ধরে। ফলস্বরূপ সামিয়া পড়ে যায়না। সামনে নাছিমকে দেখে মেয়েটি অবাক হয়। দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়ালে নাছিম সামিয়ার হাত ছেড়ে দেয়। সামিয়া মিনমিন করে বলে, 'স্যরি ভাইয়া!'
নাছিম উত্তরে বলে, 'এগেইন থ্যাংক্স!'
কথাটা শুনে সামিয়া অবাক চোখে তাকায়। বুঝল না, নাছিম তাকে থ্যাংক্স কেন বলল! থ্যাংক্স তো তার বলা উচিৎ, সে পড়ে যাচ্ছিল কিন্তু নাছিম তাকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে।
এদিকে নাছিম আগে হলে হয়ত দু'টো ঠ্যাস মেরে কথা বলে দিত। কিন্তু এখন সেসব বলতে ইচ্ছে করল না। বরং ছাদে বলা সামিয়ার কথাগুলো তার উপর ভীষণ পজিটিভ প্রভাব ফেলেছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, ইরফানের সাথে কথা বলে সব ঠিক করবে। বার্বিডলকে তো হারিয়েছিই, সাথে বন্ধুকেও কেন হারাবে? একবছর আগেও বার্বিডলের কোনো অস্বস্তি-ই তাদের মাঝে ছিল না, তার বহু বছর আগে থেকে তাদের বন্ধুত্ব। তবে সেই পুরনো বন্ধু কেন কোনো অজুহাতে ভাঙবে?
সামিয়া অনেকক্ষণ থেকে নাছিমকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গলা ঝেড়ে বলে, 'ভাইয়া একটু সাইড দিবেন?'
সামিয়ার কথায় নাছিমের ধ্যান ভাঙে। তাকায় সামিয়ার দিকে। কিছু একটা ভেবে বলে, 'দেখতে ছোট হলেও, মাথায় বুদ্ধি আছে।'
সামিয়া বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে বলে, 'জ্বি?'
নাছিম কিছু বলল না। সামিয়াকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে যায়। সামিয়া অবুজ নয়নে চেয়ে থাকলো নাছিমের এলোমেলো পায়ে হেঁটে যাওয়ার দিকে। লেকটার জন্য তার খারাপ লাগে। ইশ! কি দুঃখ পাচ্ছে! দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামিয়া বাইরে বেরিয়ে আসে। এরপর দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে দ্রুত পা চালায় তার ফ্ল্যাটের দিকে।
পরদিন,
ঘড়ির কাটা তখন ৯ টার ঘরে। মাইরা বিছানার এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে। ভার্সিটি আছে আজ। ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে, মিস দেয়া যাবেনা। গতকাল রাতে ইরফান তার জন্য সব প্রয়োজনীয় বই, ব্যাগ, কাপড় এনে দিয়েছে। অর্থাৎ তাকে আর হোস্টেলে যেতে হবে না। মাইরা সেটা নিয়ে ভাবছেও না। সে ভাবছে, ইরফানের সাথে ভার্সিটি গেলে সবাই তার দিকে আগের চেয়েও অদ্ভুতভাবে তাকাবে। ইরফান তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর সে ভার্সিটি গেলে সবাই কিভাবে যেন তাকাতো। আজ প্রায় এক সপ্তাহ পর ভার্সিটি গিয়ে আবারো সেই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তাকে, এর উপর আবার যেতে হবে ইরফানের সাথে। সবাই তো তার থেকে চোখ-ই সরাবে না। ভাবতেই ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। মাইরা একবার ভাবছে সে ভার্সিটি যাবে না, আবার ভাবছে ভার্সিটি মিস দেয়া যাবে না। আবার ভাবছে ইরফানের সাথে যাবে না। সবমিলিয়ে মাইরার মাথা ব্যথা ধরে যাচ্ছে।
ভাবনার মাঝেই ইরফান তার জামার উপর থেকে ওড়না টান মেরে সরিয়ে একটানে জামার চেইন খুলে দেয়। মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দ্রুত পিছিয়ে যায়। বিস্ময় চোখে চেয়ে বলে, 'কি করছেন?'
ইরফান হাত বাড়িয়ে বলে, 'কাম। চেঞ্জ করিয়ে দিচ্ছি। লেইট হচ্ছে আমার।'
মাইরা দু'হাঁটু ভাঁজ করে রেখে ডান হাত পিছন দিয়ে নিয়ে খোলা জামা চেপে রেখে মিনমিন করে বলে, 'মানে? আমি চেঞ্জ করতে পারি তো!'
ইরফান বিরক্ত চোখে তাকায়। মাইরা আমতা আমতা করে বলে, 'আপনি যান। আমি একা যেতে পারবো।'
ইরফান রেগে বলে, 'হোয়াট? থাপ্পড় খেতে চাইছ?'
সাথে সাথে মাইরা দু'হাতে তার দু'গাল ঢেকে নেয়। তার জীবনটা কি সত্যি সত্যিই থাপ্পড়ময় হয়ে গেল? উঠতে বসতে শুধু থাপ্পড় আর থাপ্পড়! ইরফানকে আবারো তার দিকে এগোতে দেখে মাইরা দ্রুত বিছানার অপর পাশে নেমে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দেয় আর বলে, 'যাচ্ছি তো। একটু রেস্ট-ও নিতে দেয় না!'
তার বোঝা হয়ে গেল, তাকে ইরফানের সাথেই যেতে হবে, নয়তো নিশ্চিত কপালে থাপ্পড় জুটবে।
ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে আওড়ায়, 'স্টুপিড!'
মাইরা আর মিলা ক্লাসের এক কোণায় বসে আছে। মাইরা গালে হাত দিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে, 'বাঙালি মেয়েরা মনে হয় স্বামীকে নিয়ে বেশি ভাবে, তাইনা?'
মিলা হেসে বলে, 'ঠিক ঠিক। তুই তো ইরফান স্যারকে মাথা থেকে সরাতেই পারছিস না। এই তোদের কি কি হলো রে? হয়েছে তো?'
মাইরা কটমট চোখে চেয়ে বলে, 'হ্যাঁ সব শেষ, আমি তো পাঁচ মাসের প্রেগনেন্ট, জানিস না?'
মিলা চোখ ছোট ছোট করে বলে, 'কিছু? বিয়ে হলো পাঁচদিন আগে, প্রেগনেন্ট হয়ে গেলি পাঁচ মাসের? ওয়াও! হাউ ইন্টারেসটিং!'
মাইরা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় ক্লাসের এতো শান্তভাব দেখে। সে সামনে তাকালে দেখল টিচার নেই, তাহলে সবাই এভাবে চুপ করে আছে কেন? অতঃপর সে আশেপাশে তাকায়, বাদিকে চোখ পড়তেই মাইরা ভূত দেখার মতোন চমকে ওঠে, ইরফানকে গম্ভীর মুখে তার দিকে চেয়ে থাকতে দেখে। ঢোক গিলল মেয়েটা। তার কথা শুনে ফেলল না-কি! কি অদ্ভুত! ইনি কখন ক্লাসে আসল? দুই বান্ধবী কথার তালে খেয়াল-ই করেনি ইরফানকে। মিলা ইরফানকে দেখে স্ট্যাচু হয়ে বসে আছে। একবার তাকিয়ে দেখেছে, ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে আছে। এরপর আর তকায়নি।
ইরফান কিছুই বলল না। চুপচাপ সামনে চলে যায়। মাইরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তার মানে তার বলা বেফাঁস কথা ইরফান শোনেনি। ইরফান সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে লেকচার দিতে ব্যস্ত হয়।
মাইরা খেয়াল করল, ক্লাসের সবার দৃষ্টি ইরফানের দিকে। অস্বাভাবিক কিছু নয়, স্যার লেকচার দিলে সবাই স্যারের দিকেই মনোযোগ দিবে, তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু সকলের দৃষ্টি একটু অন্যরকম লাগছে। কেউ কেউ তো মিটমিট করে হাসছে। মনে হচ্ছে সামনে পাত্র দাঁড়ানো। সে এদের দেখতে আসায় নতুন বউ লজ্জা পেয়ে হাসছে। ওদিকে মিলাও ইরফানকে অবাক হয়ে দেখছে। তখন পাশ থেকে সেভাবে খেয়াল করেনি। ইরফানের চুল বড় ছিল, এখন চুল একদম সাইজ করে সুন্দর এক কাটিং দেয়া। যেটাতে আগের চেয়ে ইরফানকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। যা সবার ভীষণ চোখে লাগছে। মিলা মাইরার দিকে এগিয়ে ফিসফিস কণ্ঠে বলে, 'কি রে ময়না, তোর স্বামীকে আগে তামিল মুভির নায়ক লাগতো, এখন তো হিন্দি মুভির নায়ক লাগছে। মারাত্মক! তুই তো জিতছিস ময়না!'
মাইরা ইরফানের দিকে তাকিয়ে গালে হাত দিয়ে ভাবনায় ব্যস্ত ছিল সবার এরকম রিয়েকশনের মানে বুঝতে। মিলার কথায় মাইরার ভাবনায় ছেদ ঘটে। এবার বুঝল কাহিনী। সে ইরফানকে আরও ভালোভাবে দেখায় মন দিল। গায়ের রঙ ভীষণ উজ্জ্বল! চোখদুটোর মণি বাদামি, গাল ভর্তি চাপদাড়ি, চুলগুলো কি সুন্দর সেট করা! আসলেই ইরফান সুন্দর। চোখে পড়ার মতো সুন্দর। এজন্যই ক্লাসের সব মেয়েরা হা করে ইরফানকে দেখছে? কথাটা ভাবতেই মাইরার রাগ হলো। ইরফানকে এরা দেখবে কেন আজব! মাইরার চোখেমুখে রাগের আভা। মাইরা ডান হাত নামিয়ে
মিলার বা পায়ের কাছে খামচে মিলা ব্যথা পেয়ে মাইরার হাত চেপে ধরে। ব্যথাতুর কণ্ঠে বলে, 'এই বেদ্দপ খামচাখামচি করিস ক্যান? ইশ! মাংস তুলে নিল রে!'
মাইরা মিলার দিকে চেয়ে কটমট চোখে চেয়ে বলে, 'আমার জামাইয়ের দিকে নজর দিস ক্যান বেদ্দপ?'
মাইরার কথা শুনে মিলা মুখ চেপে হাসল। ফিসফিসিয়ে বলে, 'ওয়াহ ময়না ওয়াহ! মারাত্মক জেলাস তুই, তোর ইরফাইন্না স্যার তো স্বার্থক রে!'
মাইরা তাকায় ইরফানের দিকে। মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে, 'এই লোক আস্ত এক বজ্জাত! শুধু থাপড়াতে আসে আমাকে। আমি কোনো জেলাস ফেলাস না। আমি তো তোদের উনার থাপ্পড়ের হাত থেকে বাঁচাতে চাইছি এই আর কি!'
মাইরার কথা শুনে মিলা চোখ ছোট ছোট করে তাকায় মাইরার দিকে। কি হলো ব্যাপারটা? এ মনে হচ্ছে, নিজের অনুভূতি থেকে নিজেই পালাচ্ছে! ফাজিল মাইরা। মুখে স্বীকার করছেনা। নাটকবাজি কোথাকার!
এদিকে ইরফান লেকচার দিতে দিতে বেশ কয়েকবার মাইরার দিকে তাকিয়েছে। তখন থেকে মাইরাকে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লেকচার দিতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আটকে গিয়েছে ইরফান। মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটছে বারবার। চোখেমুখে বিরক্তি তার। আবারও লেকচার থামিয়ে বিড়বিড় করে, 'স্টুপিড গার্ল!'
মাইরার চোখেমুখে রাগটুকু ইরফানের চোখে পড়ে। কপালে ভাঁজ পড়ে ইরফানের। এই স্টুপিড টার কি প্রবলেম? তাকে ঠিক করে ক্লাস নিতেই দিচ্ছে না। ইরফান দু'হাত প্যান্টের পকেটে রেখে মাইরার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে, 'মিসেস ইরফান নেওয়াজ, স্ট্যান্ড আপ।'
ইরফানের মুখে নিজের নামে এমন নির্দেশ শুনে মাইরা কেঁপে ওঠে। ক্লাসের সকলের দৃষ্টি মাইরার উপর পড়ে। তারা কেউ আজ নতুন করে আর অবাক হলো না। যা অবাক হওয়ার সেদিনই হয়েছে, যেদিন ইরফান ভার্সিটির মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে মাইরাকে তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ক্লাসের সকলের দৃষ্টি নিজের উপর বুঝতে পেরে মাইরার অস্বস্তি হয়। তবে ইরফানের কথা মেনে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ইরফানের দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে আছে। ইরফান আবারো বলে,
'কাম হেয়ার।'
মাইরা ঢোক গিলল। এতক্ষণ রাগ লাগছিল ইরফানকে সবাই দেখছিল বলে, আর এখন ভয় লাগছে ইরফানকে দেখে। আল্লাহ আর এই ইরফান স্যার জানে, সে সামনে গেলে তার কপালে কি আছে! ইরফান তাড়া দেয়, 'ফাস্ট।'
মিলা মাইরাকে ঠেললে মাইরা ধীরপায়ে এগিয়ে ইরফানের সামনে এসে দাঁড়ায়। তাকায় ইরফানের দিকে। ইরফান বলে,
'স্টার্ট কর।'
মাইরার চোখেমুখে প্রশ্ন। ইরফানের গম্ভীর স্বর, 'এই টপিক পড়ানো স্টার্ট কর।'
মাইরা বিস্মিত হয়। সে পড়াবে? কেন? এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার পারল না। দ্রুত বলে, 'আমি কিভাবে পড়াব? আমি তো ম্যাডাম নই।
তাছাড়া আজ তো প্রেজেন্টেশন নেই। আমি....'
ইরফান পাত্তা দিল না। সকলের উদ্দেশ্যে বলে,
'ওল্ড প্রেজেন্টেশন রিভাইজ করানো হবে। ফোকাস অন মাই ওয়াইফ।'
এরপর ছেলেদের দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বলে,
Just focus on her voice. Otherwise, keep your eyes down.'
ইরফানের কথায় ক্লাসের প্রতিটি ছেলে মাথা নিচু করে নেয়। ইরফানের কথা অমান্য করার সাহস কারো নেই। ভীষণ মেজাজী স্যার ইনি। সকলেই ভীষণ ভয় পায়। তাই ইরফানের কথা মেনে নিতে একবারো ভ্রুক্ষেপ করল না কেউ।
বেশিরভাগ মেয়েরা গালে হাত দিয়ে ইরফানকে দেখছে। ইরফানের মতো সুদর্শন লোকের মুখে মাইরাকে নিয়ে ওয়াইফ সম্মোধন কি ভালো লাগলো! কেউ কেউ মাইরাকে ভাগ্যবতীর তালিকায় রাখতে ভুলল না! আবার অনেকে আফসোস করে, এমন কাঠখোট্টা মানুষের সাথে থেকে মাইরার মতো চঞ্চল মেয়ের জীবন প্যারাময় হয়ে যাবে ভেবে। মিলা মিটমিট করে হাসছে। যদিও মাইরাকে সামনে নিয়ে পড়ানোটা প্যারাময় মনে হলো, কিন্তু বান্ধবীকে নিয়ে ইরফানের সম্মোধন সাথে ছেলেদের মাথা নিচু রাখার ব্যাপারটা ভীষণ ভালো লাগলো।
মাইরা কাঁদোকাঁদো মুখে ইরফানের দিকে চেয়ে আছে। এই পড়াটা সেই কবে না কবেকার। সে কি ঠিকঠাক কিছু বলতে পারবে? ইরফান ইচ্ছে করে এমন করছে তার সাথে। অশিক্ষিত লোক একটা। অন্যসময় শুধু থাপড়ায় আর ক্লাসে আসলে তাকে প্যারা দেয়। তার জীবনটা অশান্তিতে ভরে যাচ্ছে। ইশ! তবে ইরফানের সম্মোধন আর ছেলেদের দৃষ্টি নিচু রাখার ব্যাপারটির কথা ভেবে মাইরার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা ঘিরে ধরে। কিছু কিছু ব্যাপারে ইরফান ভালো, এটুকু মাইরা বুঝেছে। তাকে নিয়ে অনেক ভাবে ইরফান, এটাও বোঝে। কিন্তু ঘাড়ত্যাড়া লোকটা তার জীবন থেকে অনেক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে এটাও সত্য।
ইরফান মাইরাকে এখনো নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে রেগে তাকায়। ঘেমে যাচ্ছে সে। স্টুপিডের দৃষ্টি তাকে অশান্ত করে তুলছে, অথচ এর দৃষ্টির নড়চড় নেই। ইরফান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে মাইরার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনে তাকিয়ে খুব সুক্ষ্মভাবে ঠোঁট নাড়িয়ে লো ভয়েজে বলে,
'তাকিয়ে তাকিয়ে সিডিউস করছ? ফাইন! বাট মাইন্ড ইট, ক্লাস শেষে পানিশমেন্ট পাবে। দ্যাট'স কনফার্ম।'
ইরফানের বলা কথা তো দূর, কেউ বুঝলও না সে কিছু বলেছে মাইরাকে। কিন্তু মাইরা শুনতে পেয়েছে ঠিকই।
ইরফানের এমন ভয়েজে কথাগুলো শুনে মেয়েটা ঢোক গিলল। সে তাকিয়ে তাকিয়ে কিভাবে সিডিউস করে, আজব! কি অদ্ভুত কথাবার্তা বলে এই লোক। এখনই যা প্যারা দিচ্ছে, ক্লাস শেষে আবার কি-না কি করবে, আল্লাহ জানে।
এদিকে ইরফান মাইরার পিছন থেকে সরে ক্লাসের মাঝ বরাবর শেষের দিকে গিয়ে দু'হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে দাঁড়ায়। দৃষ্টি মাইরাতে। মাইরা ইরফানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এর আগে প্রেজেন্টেশন দেয়নি ব্যাপারটি এমন নয়। গত একবছর বহুবার দিয়েছে প্রেজেন্টেশন। কিন্তু এখন ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। কারণটা অবশ্যই ইরফান। সবার দিকে একবার তাকায় মাইরা। ছেলেগুলোকে মাথা নিচু করে রাখতে দেখে মাইরা মনে মনে ইরফানকে মুখ ভেঙায়। সবাইকে চোখ নামিয়ে রাখতে বলে নিজে হা করে তাকিয়ে আছে। উফ! আজ তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। মাইরা নিজেকে সামলে কথা বলতে শুরু করে। সবাইকে বোঝানোর কাজে লেগে পড়ে। টপিকটা সহজ হওয়ায় মাইরা স্বস্তি পায়। মাঝে মাঝে ইরফানের সাথে চোখাচোখি হয়, মাইরা নিজেকে সামলে আবারও কথা খরচ করে। মনে মনে ইরফানের গুষ্টি উদ্ধার করে। অকারণে তার থেকে খাঁটিয়ে নিচ্ছে। অশিক্ষিত লোক একটা।
ইরফান মাইরাকে সুক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করে। সামান্য ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে, 'মাই বার্ডফ্লাওয়ার!'
ইরফান ভার্সিটি থেকে তার বিজনেসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে অফিসে এসেছিল। কাজ শেষে আবারো ভার্সিটি ব্যাক করবে বলে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে। ঘড়ি দেখল একবার। খুব বেশি টাইম নেই। মাইরার ক্লাস শেষ হয়ে যাবে। এজন্য ইরফান তাড়াহুড়ো করে হাঁটছিল। রাস্তার পাশে নাছিমকে দেখে ইরফানের পা থেমে যায়। চোখমুখ শক্ত হয়। নাছিম তার বার্ডফ্লাওয়াকে বিয়ে করতে গিয়েছিল ভাবলেই ইচ্ছে করে একে যাস্ট খুন করে ফেলতে।
নাছিম ইরফানকে দেখে ঢোক গিলল। ইরফানের অ্যাসিস্ট্যান্টকে কল করে জেনেছে ইরফান এখন অফিসে, এজন্যই এখানে আসা। কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে, তার বার্বিডলের হাসবেন্ড তার বন্ধু ইরফান। নিজেকে সামলায় নাছিম।
ইরফানকে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে নেয়, কিন্তু ইরফান নাছিমকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নাছিমকে পাশ কাটিয়ে গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠার জন্য পা বাড়ালে নাছিম দ্রুত ইরফানের হাত ধরে বলে,
'ইরফান প্লিজ আমার কথাটা শোন।'
বহুকষ্টে ইরফান নিজেকে সামলে এই স্থান প্রস্থান করতে চেয়েছিল, কিন্তু এখন আর পারল না। বা হাতে নাছিমকে ধাক্কা দেয়। তেড়ে যায় নাছিমের দিকে। দু'হাতে নাছিমের শার্টের কলার ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,
'তোর সাহস কি করে হয়, আমার বার্ডফ্লাওয়াকে বিয়ে করতে যাওয়ার?'
নাছিম ঢোক গিলে বলে,
'ও তোর বার্ডফ্লাওয়ারের আগে আমার বার্বিডল ছিল ইরফা.....'
বাকিটুকু বলার আগেই ইরফান নাছিমের গাল বরাবর একটা শক্তপোক্ত ঘুষি মারে। নাছিমের মুখ বাদিকে সামান্য হেলে যায়। ইরফান নাছিমের শার্টের কলার ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
'ওয়ার্নিং করছি, আমার বার্ডফ্লাওয়াকে কোনো ফালতু নামে ডাকবি না।'
নাছিম মলিন মুখে তাকায় ইরফানের দিকে। বুকটা ব্যথা করছে। আল্লাহ বার্বিডলকে তার থেকে কেড়ে নিয়ে বেছে বেছে তার বন্ধুর জীবনের সাথেই কেন জড়ালো? এতে যে তার দুঃখগুলো আরও অনেকটা বাড়ল।
শুদ্ধ ভার্সিটিতে একটা ক্লাস নিয়ে বাড়ি গিয়েছে। এখন মূলত ভার্সিটি ব্যাক করছিল ফারাহকে নিতে। কিন্তু ইরফানের অফিসের সামনে ইরফান আর নাছিমকে দেখে সে গাড়ি সাইড করে দাঁড়ায়। ইরফান নাছিমের কলার ধরে রেখেছে, নিশ্চয়ই ঝামেলা হচ্ছে এদের। শুদ্ধ দ্রুত পা চালিয়ে এসে ইরফানকে টেনে নাছিমের থেকে সরিয়ে আনে। বিচলিত কণ্ঠে বলে,
'ইরফান কি করছিস?'
ইরফান এবার শুদ্ধ'র শার্টের কলার ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
'তোদের সাহস কি করে হয়, আমার বার্ডফ্লাওয়াকে আমার থেকে কেড়ে নিতে চাওয়ার? তোকে আমি হাজারবার আস্ক করেছি, আমার বার্ডফ্লাওয়ার কোথায়! তুই চুপ থেকে তোর ফ্রেন্ডের সাথে আমার ওয়াইফকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলি? হোয়াট দ্য হেল?'
কথাটা বলে শুদ্ধকে একটা ধাক্কা দেয়। শুদ্ধ বিরক্ত হয়ে নিজেও ইরফানকে একটা ধাক্কা দেয়। ইরফান রেগে তাকায়। শুদ্ধ-ও রেগে তাকায়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
'বালের একা মাথা, ২৪ ঘণ্টা গরম থাকে। দু'টো মিনিট শান্ত হয়ে আমাদের কথা শোনা যায় না?'
ইরফান রেগে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। গাড়িতে উঠতে নিলে শুদ্ধ দু'হাতে সাপ্টে ধরে ইরফানকে। অসহায় কণ্ঠে বলে, 'এ ভাই থাম। দুই মিনিটে সব গরগর করে বলব। ভুলভাল ধারণা নিয়ে আমাদের উপর রাগ ঝাড়িস না। কথাটা শোন।'
ইরফান শান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পেরে শুদ্ধ ইরফানকে ছেড়ে ইরফানের সামনে এসে দাঁড়ায়। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
'যার সাথে নাছিমের বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে যে মাহরা, এটা তো আমরা কেউ জানতামই না। শুধু নাছিম জানতো। আমি মাইরাকে আগে থেকেই চিনি বলে ও আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল।'
এটুকু বলে শুদ্ধ থামে। ইরফান দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। নাছিম জেনেশুনে তার বার্ডফ্লাওয়াকে বিয়ে করতে গিয়েছিল। কথাটা নিতে পারছে না সে। এদিকে শুদ্ধ ইরফানকে রাগাতে দেখে বিচলিত কণ্ঠে বলে,
'আর পুরোটা শুনে তারপর রাগ করিস। শোন, নাছিম মাইরাকে বিয়ে করতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত জানতো না, মাইরা তোর বিয়ে করা বউ। আচ্ছা ও জানবে কি করে বল তো? তোর আর মাইরার যে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিয়ে হয়েছে, এটা কি তুই কাউকে বলেছিলি? ফার্স্টে তো আমাকেও বলিস নি। আমি মাইরার থেকে শুনে জেনেছি। তুই মাইরাকে নিতে যাওয়ার পর নাছিম এসব জেনেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, তুই কাউকে না বললে সবাই কিভাবে জানবে, মাইরা তোর বউ? তুই-ই বল?'
শুদ্ধ'র কথা শুনে ইরফানের দৃষ্টি শীতল হয়। ডানদিকে ঘাড় বাঁকালে নাছিম গলায় হাত দিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,
'কসম, আমি এসবের কিচ্ছু জানতাম না। আমাকে কেউ কিছু বলেনি।'
ইরফানের মুখ থমথমে হয়ে যায়। বলে,
'আমি ভেবেছিলাম, সবাই জানে।'
শুদ্ধ কৌতুকস্বরে বলে,
'হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই কাউকে কিছু বলবি না আর সবাই হাওয়া খেয়ে তোর সব চেপে রাখা কথা জেনে যাবে!'
ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
'আমি কিভাবে জানব, তোর মতো বাঁদর এতোদিন এসব কথা পেটে চেপে রেখেছিস?'
শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'কিছু? তুই আমাকে অপমান করছিস? আমাকে? এই শুদ্ধ ইয়াসারকে?'
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,
'নো। শুদ্ধ বাঁদরকে অপমান করেছি।'
ইরফানের কথায় নাছিম হাসল। শুদ্ধ ভোতা মুখে তাকায়। সবাই তাকে অপমান করে! তার বহুত কষ্ট।
নাছিম এগিয়ে এসে ইরফানের উদ্দেশ্যে বলে,
'ইরফান একসাথে বসবি কিছুকক্ষণ?'
ইরফান তাকায় নাছিমের দিকে। এরপর হাতঘড়িতে সময় দেখে নাছিমকে নিষেধ করতে গিয়েও থেমে গেল। নাছিম মলিন হেসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শুদ্ধ বোধয় বুঝল ইরফানের মনের কথা। বউকে নিতে যেতে হবে, আবার বন্ধুর আবদারও ফেলতে পারছেনা। শুদ্ধ ইরফানের উদ্দেশ্যে বলে,
'আমি যাচ্ছি। তুই নাছিমের সাথে বোস।'
ইরফান চুপ থাকল। অর্থাৎ নিরবতা সম্মতির লক্ষণ। শুদ্ধ ইরফানের কাঁধে হাত রেখে বলে,
'আবার ঝামেলা করিস না যেন। নাছিম কিন্তু জানতো না, মাইরা তোর বউ। আর এদিকে আমি তো এটাও জানতাম না, নাছিম কাউকে পছন্দ করত!'
ইরফান নাছিমের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে, 'But I knew that.'
ইরফানের কথা শুনে নাছিম আর শুদ্ধ দু'জনেই বিস্ময় চোখে তাকায় ইরফানের দিকে। ইরফান আবারো বলে, 'সেই মেয়ে যে মাইরা এটা জানতাম না।'
নাছিম, শুদ্ধ এবার একটু স্বস্তি পেলেও পুরোপুরি অবাকতা কাটল না। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'তুই কিভাবে জানতি নাছিম একজন মেয়েকে পছন্দ করত?'
ইরফান এবারেও নাছিমের দিকে চেয়ে উত্তর করে, 'ওর কথার টোনেই বোঝা যেত।'
ইরফানের কথায় নাছিম কেশে ওঠে। কি সাংঘাতিক! তার কথার টোনেই সব বুঝে ফেলেছে!
শুদ্ধ মাথায় হাত দিয়ে বলে,
'ওরে গোপন সিসিটিভি! তুই তো মারাত্মক লেভেলের সিসিটিভি রে! শুধু দেখতে একটু মানুষের মতো, এই যা! সেই সেই!'
এরপর শুদ্ধ বাচ্চাদের থুতনি ধরার মতো করে ইরফানের থুতনি ধরে বাচ্চাদের মতো করে বলে,
'হাউ কিউট সিসিটিভি!'
ইরফান রেগে শুদ্ধ'র হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়। শুদ্ধ'র কান্ড দেখে নাছিম হাসল। ইরফান নাছিমের দিকে রেগে তাকালে নাছিম মেকি হেসে বলে,
'শুদ্ধ হাসায়। আমি ইচ্ছে করে হাসছি না।'
শুদ্ধ-ও একবার হাসল। ইরফান যে অল্পতেই মেনেছে এই অনেক। সে তার গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে,
'বাই বাই সোনা, জান, পরাণ। আবার দেখা হবে।'
ইরফান শুদ্ধ'র উদ্দেশ্যে বলে,
'ওকে সেভলি বাসায় পৌঁছে দিবি।'
শুদ্ধ পিছু ফিরে হাসতে হাসতে বলে,
'ওখেই ওখেই, তোর ওকে সেভলি কয়েকটা বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে দিব। নো চিন্তা সোনা!'
ইরফান রেগে বলে,
'খুন করে ফেলব তোকে।'
শুদ্ধ পাত্তা দিল না। সে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
নাছিম ইরফানকে অবাক হয়ে দেখে। ভার্সিটি লাইফ থেকে ইরফান কখনো কোনো মেয়েকে নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। অন্তরা তার অনুভূতি প্রকাশ করায় ইরফান মেয়েটার সাথে যোজন যোজন দূরত্ব বাড়িয়েছে। সেই ছেলে তার এক বিপরীতধর্মী মেয়ের প্রতি কত পজেসিভ! নাছিম মৃদুস্বরে বলে,