মাইরা ভয়ে কাঁপছে। সেদিন ইরফানের রাগ দেখেছিল। সামান্য কারণে নিজের হাতের বারোটা বাজিয়েছিল, আজ সত্যি-ই তাকে মেরে ফেলবে না-কি! মাইরা মিনমিন করে বলে,
'স্যরি! আমি বুঝতে পারিনি। 'ইরফান রে'গে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মাইরার পরনের জামা, হিজাব উড়ে ওঠে। ঝিরঝির বৃষ্টি পরতে শুরু করেছে। বাতাসের বেগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। ইরফান আশেপাশে তাকালো। মাইরার কান্না পাচ্ছে। এ কোথায় এসে পড়লো সে? তাও এমন একজন মানুষের সাথে, যার রা'গ নাকের ডগায়। কিছুক্ষণের মাঝেই বাতাসের বেগ তীব্র হয়। মাইরা ভ'য়ে ইরফানের দিকে এগিয়ে যায়। ইরফান বিরক্ত চোখে তাকালে মাইরা কাঁপা কন্ঠে বলে,
'প্লিজ কিছু বলবেন না। আমি ভ'য় পাই।'
ইরফান মাইরাকে রেখে বড় বড় পা ফেলে ডানদিকে এগিয়ে যায়। মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। এই লোকটা এমন কেন? তাকে রেখে কিভাবে চলে যেতে পারছে। মাইরা-ও ইরফানের পিছু পিছু যায়।
প্রায় ১ ঘণ্টার মতো ইরফান এদিক-ওদিক ছুটেছে। মূলত রিসোর্টে পৌঁছানোর রাস্তা খুঁজেছে। পিছু পিছু মাইরা। কিন্তু ইরফান ব্যর্থ। এতোক্ষণ ঝড়ের বেগ সহনীয় হলেও এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ইরফান, মাইরা কেউ ঠিক করে তাকাতে পারছে না। ভ'য়ে মাইরার চোখ ভিজে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই ইহজীবনে সে পড়েনি। মাইরা ভ'য়ে ভ'য়ে ইরফানের সাথে সিটিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়। ইরফান বিরক্ত চোখে তাকায়। কিন্তু কিছু বলল না।
হঠাৎ-ই কিছুটা দূরে মাইরার চোখে পড়ে একটি বাড়ির মতো। ঘুটঘুটে অন্ধকার, সাথে তীব্র ঝড়ের বেগ, এর মাঝে মাইরা যেন একটুখানি আগুনের মতো কিছু দেখতে পেল। মাইরা ধীরপায়ে এগিয়ে গেলে বুঝতে পারে একটা ছোটোখাটো বাড়ি। মাইরার জানে পানি আসে। একটুখানি উঁচু ঠেকল পায়ে। মাইরা কোনোরকমে উপরে ওঠে। পিছন থেকে ইরফান রে'গে বলে,
'স্টুপিড গার্ল, কি করছ?'
মাইরা কিছু বলল না। এগিয়ে গিয়ে জোরে জোরে দরজা ধাক্কায়। বেশ কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে একজন বয়স্ক লোক মাথা বের করে তাদের ভাষায় কিছু বলে।
মাইরা অস্থিরতার সহিত বলে,
'ন্দাদু, আমরা অনেক বিপদে পড়েছি। প্লিজ হেল্প করুন!'
ভদ্রলোক মাইরার বাংলা বুঝলো না, তবে 'প্লিজ' শব্দ শুনে বুঝলো মেয়েটি বিপদে পড়েছে। কিন্তু যাকে তাকে তো বিশ্বাস করা যায় না। মাইরা খুব আকুতি-মিনতি করলে ভদ্রলোকের মন একটু নরম হয়। কিন্তু সে মাইরার বাংলা বুঝতে না পেরে ভেতর থেকে মাইরার বয়সী একটি ছেলেকে ডাক দিলে সে আসে। ছেলেটি শহরে পড়াশুনা করে। যে কারণে সে বাংলা বুঝতে পারে। সে তার দাদুর বলা কথা বাংলায় মাইরাকে জিজ্ঞেস করল,
'আপনি কি একাই?'
মাইরা মাথা নেড়ে বলে,
'না, আমার সাথে আরেকজন আছে।'
'উনি আপনার কে?'
মাইরা কিছু বলার আগেই ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
'হাসবেন্ড।'
কথাটা শুনে মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। ভদ্রলোক কিছু বলায় তার নাতি মাইরাদের উদ্দেশ্য বলে,
'আপনারা ভেতরে আসুন।'
এরপর দু'জন উল্টো ঘুরলে মাইরা বলতে নেয়,
'আরেক, এই লোক আমার স্বামী....'
ইরফান ডান হাতে মাইরার মুখ চেপে শক্ত গলায় বলে,
'একটা বাজে কথা বললে তোমাকে ওই জঙ্গলের মাঝে ছুঁড়ে ফেলব, স্টুপিড।'
মাইরা ঢোক গিলল। নিজে বাজে কথা বলে তাকে ধমকাচ্ছে। খ'বি'শ লোক।
ইরফান মাইরার মুখ থেকে হাত সরিয়ে ভেতরে যেতে নিলে উপরে দরজার সাথে ধাক্কা খায়। এতো শক পেয়ে-ও মাইরা ইরফানের অবস্থা দেখে হেসে ফেলে। ইরফান রে'গে তাকালে মাইরা নিজেকে সামলে ভেতরে চলে যায়। ইরফান-ও মাথা নিচু করে ভেতরে প্রবেশ করে।
ইরফান আর মাইরাকে একটি রুম দেয়া হয়েছে। দু'জনেই ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে। একজন বয়স্ক মহিলা মাইরার হাতে দু'টো পোষাক ধরিয়ে দিয়েছে। একটি তার জন্য। আরেকটি ইরফানের জন্য। মাইরা আগামাথা খুঁজে পাচ্ছে না। কিভাবে পরবে বুঝতে পারছে না। এরা এসব কি পরে?
এভাবে থাকলে-ও তো জ্বর বাঁধবে নিশ্চিত। ইরফান ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। মাইরা ইরফানের পাশে গিয়ে পোষাক এগিয়ে দিয়ে বলে,
'এটা নিন।'
ইরফান ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। তখন-ই তার হাঁচি আসে। এদিকে মাইরার-ও একই অবস্থা, সেইম টাইমে হাঁচি দেয়। দু'জনেই মুখোমুখি হয়ে একসাথে হাঁচি দিয়ে দু'জনের মুখে বিস্ময় ভিড় করে। মাইরার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ইরফান তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বিড়বিড় করে,
'স্টুপিড।'
এরপর ইরফান সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মাইরা ডান হাতে নাক ডলে। গত এক ঘণ্টা যাবৎ ঝড়ের মধ্যে থেকে দু'জনের অবস্থা নাজেহাল। মাইরা আবার-ও বলে,
'এই কাপড় টা নিন।'
ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
'নো নিড।'
মাইরা মুখ বাঁকালো। তখন ইরফান নিজেকে তার হাসবেন্ড বলার কথাটা মাইরার মনে পড়তেই কিছুটা রে'গে বলে,
'আপনি তখন নিজেকে আমার হাসবেন্ড বললেন কেন, হ্যাঁ? স্যার বলে কি মাথা কিনে......'
বাকিটুকু শেষ করার আগেই ইরফান রে'গেমে'গে মাইরার গাল চেপে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
'আর একটা কথা বললে, যাস্ট ছুড়ে ফেলব।'
মাইরা ঢোক গিলল। ভীত চোখে তাকালো ইরফানের দিকে। ইরফান মাইরাকে ছেড়ে দাঁড়ায়।
মাইরার ইচ্ছে করল, ইরফানের মাথায় চারটে বাড়ি মা'র'তে। শুধু তার উপর রা'গ ঝাড়ছে। অ'স'হ্য লোক একটা।
মাইরা আশেপাশে জায়গা খুঁজল চেঞ্জ করার, কিন্তু একটা ছোট্ট রুমে কি এমন জায়গা থাকবে? বাইরে প্রচন্ড ঝড় হচ্ছে। ইরফানকে বাইরে যেতে বলবে আবার না জানি সত্যি সত্যি তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়।
ঝড় না হলেও এই লোককে কিছু বলার সাহস নেই তার। স্যার বলে কিছু বলতেও পারে না।
হঠাৎ-ই দরজায় কেউ টোকা দিলে মাইরা এগিয়ে গিয়ে ভিড়িয়ে রাখা দরজা খোলে। ওপাশে তখনকার ছেলেটি বলে,
'আপনারা কিছুক্ষণ সময় দিতে পারবেন?'
ইরফান এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
'হোয়াই?'
ছেলেটি গলা ঝেড়ে বলে,
'আপনাদের বিয়ে পড়ানো হবে।'
কথাটা ইরফান-মাইরার কাছে বোম ব্লাস্ট এর মতো শোনালো। ইরফান রাগান্বিত স্বরে বলে ওঠে,
'হোয়াট?'
একইসাথে মাইরা বলে,
'কিইইইইই?'
ছেলেটি থতমত খেয়ে তাকায়। এরপর নিজেকে সামলে বলে,
'আপনারা তো স্বামী-স্ত্রী। তাহলে এমন রিয়েকশন দিচ্ছেন কেন?'
ইরফান রে'গে কিছু বলতে গিয়েও জিভ গুটিয়ে নেয়। ছেলেটির পাশে বুড়ো দাদু এসে দাড়িয়ে কিছু বললে, ছেলেটি সেসব বাংলা বলে,
'এখানে অনেকেই এসে স্বামী-স্ত্রী না হয়েও মিথ্যা বলে। আর আমাদের এখানে বিবাহিত ব্যক্তি ছাড়া কাউকে আশ্রয় দিই-না। আপনাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পারায় এই ব্যবস্থা।'
ইরফান দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ছেলেটির দিকে চেয়ে আছে। ইচ্ছে করছে এক ঘুষি মে'রে এই ছেলের নাক ফাটিয়ে দিতে। ছেলেটি উল্টো ঘুরে চলে গেলে ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
'আমি এই স্টুপিড কে বিয়ে করব? ইম্পসিবল!'
মাইরা-ও রে'গে বলে,
'হ্যাঁ তো, আমি যেন আপনার মতো ঘাড়ত্যাড়া লোককে বিয়ে করার জন্য ম'রে যাচ্ছি!'
ইরফান চোখমুখ শক্ত করে বলে,
'সাটআপ। থা'প্প'ড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার, স্টুপিড।'
মাইরা মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকালে দেখল বুড়ো দাদু তাদের দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। মাইরা ঢোক গিলল। ভাগ্যিস এই লোকটা বাংলা বোঝেনা। নয়তো কি হতো? একটু পর আবার-ও আগের ছেলেটি এসে জিজ্ঞেস করে,
'আপনারা কোন ধর্মাবলম্বী?'
মাইরা মিনমিন করে বলে,
'ইসলাম।'
ছেলেটি একটু হাসলো। উত্তর মনমতো হয়েছে হয়তো। এই ঝড়ে একজন হুজুর তাদের একটি ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে দিয়েই কাজ সারিয়ে নেয়া যাবে। তারা আদিবাসী। তাদের ধর্ম আলাদা। এজন্য একটু চিন্তিত ছিল। এরপর ছেলেটি লোকটিকে ডেকে আনতে যায়।
চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে মাইরার। ইরফানের দিকে এগিয়ে গিয়ে মাইরা
তার দু'হাতে ইরফানের হাত ধরে বলে,
'আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাইনা, প্লিজ!'
ইরফান তার হাতে রাখা মাইরার হাতের দিকে তাকায়। এরপর মাইরার দিকে রে'গে তাকালে মাইরা ইরফানের দৃষ্টিতে থতমত খেয়ে দ্রুত হাত ছেড়ে মাথা নিচু করে বলে,
'স্যরি!'
একটু পর মাথা উঁচু করে মিনমিন করে বলে,
'আপনাকে বিয়ে করতে চাইনা।'
ইরফান দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলে,
'মিঠু।'
মাইরা বিচলিত কণ্ঠে বলে,
'তাহলে চলুন পালাই। নয়তো এই লোকগুলো আমাদের বিয়ে দিয়ে দিবে।'
ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
'স্টুপিড!'
মাইরা নিজের মাথায় নিজেই একটা চাটি মারে। সুস্থ পরিবেশ থাকলে পালানো যায়। এখন কিভাবে পালাবে! আল্লাহ এ কোথায় এনে ফেলল তাকে।
ইরফান মাইরা পাশাপাশি বসে আছে, তবে মাঝে খানিক ব্যবধান। এক আধবয়সী হুজুর মাত্র ইরফান আর মাইরার বিয়ে পড়িয়ে চলে গিয়েছে। ইরফানের দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ। চোখমুখ শক্ত।
মাইরা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। কি থেকে কি হয়ে গেল? হঠাৎ বিকট শব্দে বাজ পড়ায় মাইরা কেঁপে ওঠে। বিয়ে পড়ানোর আগে ইরফান রেগে-মেগে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন-ও এমন বিকট শব্দে বাজ পড়ছিল, ইরফান কোনোকিছুর তোয়াক্কা করেনি। কিন্তু ইরফানকে তিনজন আটকায়। এর মধ্যে বাইরে বেরোলে মৃত্যু নিশ্চিত!
ইরফানের রিয়েকশনে তারা বুঝেছিল, ইরফান তাদের বিয়ের ব্যাপারে মিথ্যা বলেছিল। এরপর তারা ইরফানকে বলে, 'অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের তাদের বাড়িতে কোনো আশ্রয় নেই।'
ইরফান মাইরার দিকে তাকালে মাইরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। ইরফান রা'গে ফোঁসফোঁস করতে করতে এসে জায়গায় বসলে তাদের বিয়ে পড়ানো হয়।
কথাগুলো ভেবে মাইরা ঢোক গিলল। ইরফান মাইরার পাশ থেকে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মাইরা আড়চোখে ইরফানের দিকে তাকালো। চুপচাপ বসে থাকলো অনেকটা সময়।
একটা ঘরে এরকম একজন ছেলের সাথে সারারাত মাইরা কিভাবে থাকবে? ভীষণ ইতঃস্তুত লাগছে তার। ভাবলো সারারাত ঘুমাবে না, বসে বসে কাটাবে।
এরপর চেয়ার থেকে উঠে একটা বিছানার মতো দেখে মাইরা বসলে ডেবে যায়, ভ'য়ে মৃদু চিৎকার দিয়ে ওঠে মেয়েটা। ইরফান ঝড়ের গতিতে মাইরার পাশে এসে ডান হাতে মাইরার গাল ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
'স্টুপিড গার্ল, তোমার চোখ কোথায় ছিল? স্পিক আপ। ওরা কোন সাহসে তোমার মতো স্টুপিড কে আমার বউ বানিয়েছে, টেল মি!'
মাইরা চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। এতো জোরে গাল চেপে ধরায়, মাইরার গাল দাঁতের সাথে বেঁধে খানিক কেটে যায়। মাইরা ইরফানের হাত ছাড়াতে চাইলো, কিন্তু ইরফানের শক্তির সাথে পেরে ওঠেনা। মাইরা ছটফট করলে ইরফান মাইরাকে ছুঁড়ে ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মাইরা চোখমুখ কুঁচকে নেয়। ইরফানের দিকে চেয়ে রে'গে বলে,
'নিজেই তো স্বামী স্বামী করছিলেন। একদম স্বামীর অধিকার ফলাতে আসবেন না বলে দিলাম।'
ইরফান জ্বলন্ত চোখে তাকায়। আবারও তেড়ে আসতে নিলে মাইরা দ্রুত নেমে ঘরের কোণায় দাঁড়ায়। মুখে নোনতা স্বাদ লাগে। কি খারাপ লোক, তার গাল পুরো কেটে দিয়েছে। যদিও ইরফানকে ভ'য় লাগছে, তবুও নিজেকে সামলে রে'গে বলে,
'একদম এগোবেন না আমার দিকে। বিয়ে করে স্বামীর অধিকার ফলাতে আমাকে মা'র'তে আসছেন, তাই না?'
ইরফানের শক্ত দৃষ্টিতে মাইরা চুপসে যায়। মাথা নিচু করে ঢোক গিলল।
আমাকে মার তে আসছেন, তাই না?
ইরফানের শক্ত দৃষ্টিতে মাইরা চুপসে যায়। মাথা । নিচু নিচু করে করে ঢোক ঢোক গিলল। গিলল। সাংঘাতিক লোক এটা! চুপ থাকাই ভালো হবে।
শুদ্ধ রুমে বসে অনেকক্ষণ যাবৎ ইরফানকে ফোনে ট্রাই করছে। কিন্তু নেটওয়ার্কের অবস্থা খুবই বাজে। তাই রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। তবে একদম রিসোর্টের ভেতরে থেকে বাইরে যায় না। বাইরে প্রচুর ঝড় হচ্ছে। ইরফান আর মাইরাকে খুঁজে পাচ্ছে না তারা। প্রথমে ভেবেছিল, শুধু ইরফান নেই। পরবর্তীতে মিলা এসে কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে,
'তার বান্ধবীকে খুঁজে পাচ্ছে না।'
শুদ্ধর চিন্তা দ্বিগুণ হয়। এতো ঝড়ের মাঝে ওরা দু'জন কোথায় আছে কে জানে! রাস্তায় দাঁড়ালে তারা কি বাঁচবে? ঝড়ের তীব্রতায় সকলে ঘরে বসে-ই ভ'য় পাচ্ছে। সেখানে ইরফান মাইরা দু'জনেই বাইরে। চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে শুদ্ধর।
হঠাৎ-ই মেয়ে কন্ঠে চিৎকারের আওয়াজ পেয়ে শুদ্ধ দ্রুতপায়ে সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু কিছু দেখতে পায় না। একটি বড় অংশ জুড়ে ফাঁকা। এখানে জানালার মতো একটি অংশ। এটা সাধারণত লাগানো থাকে, এখন খোলা দেখে শুদ্ধ লাগিয়ে দিতে গেলে অপর পাশ থেকে আবার-ও মেয়ের কন্ঠ পেয়ে শুদ্ধ ফোনের ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে বাইরে তাক করে। ফারাহ্ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে শুদ্ধ হতভম্ব হয়ে যায়। বাইরে তুমুল ঝড়, সেখানে এই মেয়েটি। শুদ্ধ দ্রুত নিচু করে ডান হাত বাড়িয়ে বলে,
'উরে এসো। ফাস্ট।'
ফারাহ্ শুদ্ধকে চিনতে পারলো। ভ'য়ে কাঁপছে। সব জড়তা রেখে শুদ্ধর হাতে ডান হাত রাখলে শুদ্ধ হাত ধরে টেনে তোলে ফারাহ্'কে। শুদ্ধর হাত ধরে হাঁটু সমান প্রাচী ক্রস করে ফারাহ্ শুদ্ধর পাশে দাঁড়ায়। শুদ্ধ বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
'ওখানে পড়লে কি করে?'
ফারাহ মিনমিন করে বলে,
'এটার উপর উঠে হাত ভিজাতে গিয়ে।'
শুদ্ধ কি বলবে বুঝল না। এই ঝড়ের মাঝে এ হাত ভেজাতে এসেছিল! মেয়ের সাহস কি! শুদ্ধ জানালা লাগাতে গেলে ফারাহ বলে,
'লাগাবেন না।'
শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ফারাহ'র পা থেকে মাথা পর্যন্ত দৃষ্টি বুলায়। পরনে সাদা জামা, মাথার অর্ধেকটা পর্যন্ত ওড়না টানা। জামায় কাঁদা লেগে গিয়েছে, আংশিক ভিজেছে। বাইরে পড়ে গিয়ে-ও আবার লাগাতে নিষেধ করছে। অতিরিক্ত সাহসী মেয়ে মনে হয়।
শুদ্ধ মৃদু হাসলো। এরপর একটু পিছিয়ে গিয়ে ফারাহ'র পিছনে দাঁড়িয়ে
বলে,
'সামনে যাও।'
ফারাহ্ শুদ্ধ'র দিকে তাকালে শুদ্ধ চোখের ইশারায় সামনে যেতে বলে। ফারাহ্ ঢোক গিলে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শুদ্ধ ফারাহ'কে স্পর্শ না করে ফারাহ'র পিছনে দাঁড়ায়। মৃদুস্বরে বলে,
'হাত ভেজাও, ভ'য় নেই। আমি আছি।'
ফারাহ'র চোখেমুখে বিস্ময়। সাথে নতুন এক অনুভূতির সাথে মাত্র পরিচিত হলো মনে হয়। তবে পিছু ফিরল না। শুদ্ধর কথায় অগাধ ভরসা রেখে দু'হাত বাড়িয়ে দেয়; বৃষ্টির ফোঁটা কোমল দু'হাত ভিজিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়। শুদ্ধ ফারাহ'র পিছন থেকে বা হাত বাড়িয়ে দিল, এবার-ও ফারাহ'কে স্পর্শ করে না। ফারাহ শুদ্ধ হাত খেয়াল করতেই বলে,
'আপনার ঘড়ি ভিজে....'
শুদ্ধ মৃদু হেসে বলে,
'ওয়াটার প্রুফ।'
ফারাহ্ ঢোক গিলল। যদি-ও শুদ্ধ'র সাথে তার একবার-ও স্পর্শ লাগেনি। কিন্তু তার বুক টিপটিপ করছে। গলা শুকিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে শুদ্ধ তাকে ঘিরে রেখেছে। ফারাহ্ সামনে হাত বাড়িয়ে, হাত ভেজালেও, তার মন পিছনে দাঁড়ানো শুদ্ধ'র দিকে।
হঠাৎ শুদ্ধ'র কিছু মনে পড়তেই দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়। ডান হাতে ফোন দিয়ে ইরফানের নাম্বারে কল করে। এখানে খুব সামান্য নেট পাচ্ছে। ফারাহ্ উল্টো ঘুরে তাকায়। শুদ্ধকে চিন্তিত দেখে ফারাহ ভ্রু কোঁচকায়। শুদ্ধ ইরফানের ফোন বন্ধ পায়, বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
'হায়রে, এই ইরফান মাইরার চিত মনে হচ্ছে আজ আমার কিডনি অ্যাটাক হবে।'
শুদ্ধ'র কথায় ফারাহ্ হেসে ফেলল। শুদ্ধ অসহায় কণ্ঠে বলে,
'হাসবে না মেয়ে। ওদের খুঁজে পাচ্ছি না। এই ঝড়ের মাঝে দু'জন কোথায় আছে কে জানে!'
ফারাহ্ ভাবুক হয়ে প্রশ্ন করে,
'মাইরা আপনার আপন বোন?'
শুদ্ধ মৃদু হেসে বলে,
'একই গ্রামের ছেলে মেয়ে আমরা। র'ক্তের সম্পর্ক নেই, বাট র'ক্তের সম্পর্কের চেয়ে কম বলে মনে হয় না। বরং বেশি মনে হয়।'
ফারাহ্ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ বারবার ফোনে ইরফানকে ট্রাই করছে। ফারাহকে খেয়াল করলে, ফারাহ'র উদ্দেশ্যে বলে,
'ঘরে যাও। নয়তো ঠাণ্ডা লাগবে।'
ফারাহ্ মাথা নিচু করে সম্মতি দেয়। দাঁড়ালো না এখানে। এগিয়ে গেল তার রুমের দিকে। তবে বারবার পিছু ফিরে শুদ্ধ'র দিকে তাকায়। ভীষণ ভালো লাগলো তার শুদ্ধকে।
তাকে একবার-ও ভুল করে-ও স্পর্শ করেনি। আবার মাইরা নিজের বোন না হলেও, শুদ্ধর এতো সুন্দর স্বীকারোক্তিতে ফারাহ্ আপ্লুত হলো। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।
ইরফান সারারাত দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরের এমাথা-ওমাথা পায়চারি করেছে শুধু। মাথা পুরো হ্যাং হয়ে আছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় বেচারা রা'গে কতবার যে শক্ত চেয়ারে পাঞ্চ মে'রে'ছে তার হিসাব নেই। রাত তিনটার পর পর ঘরের এক কোণায় গিয়ে বসেছে ইরফান। ডান পা মেলে রাখা, বাম পা উঁচু করে, হাঁটুর উপর বাম হাত রেখে বিরক্তির শ্বাস ফেলে। বিছানার মতো অনেকটা নিচু জায়গায় মাইরা ঘুমিয়ে আছে। ইরফান শক্ত চোখে মাইরার দিকে চেয়ে রইল। ইচ্ছে করছে একে থা'প'ড়ি'য়ে সোজা করতে।
বাঁশের তৈরী ঘর। জানালায় একটা পর্দা টানানো। তীব্র বাতাস ধেয়ে এসে মাইরার গা ছুঁয়ে দেয়। মেয়েটি শীতে কাঁপছে। ইরফান এতোক্ষণ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বলে মাইরা আড়াল হয়ে ছিল। কিন্তু
এসে মাইরার গা ছুঁয়ে দেয়। মেয়ে শীতে কাঁপছে। ইরফান এতোক্ষণ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বলে মাইরা আড়াল হয়ে ছিল। কিন্তু ইরফান সরে যাওয়ায়, ঠাণ্ডা বাতাস সরাসরি মাইরার গায়ে এসে লাগে। একসময় মাইরার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমাবেনা ভাবলেও, কখন ঘুমিয়েছে বুঝতেই পারেনি।
ঘরটি অন্ধকার ঠেকল। তবে একটু একটু আলো আছে বলে মনে হলো। বামদিকে তাকালে দেখল জানালার পর্দা তীব্রবেগে উড়ছে। মাইরা ঢোক গিলল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকায়, সাথে বিকট শব্দে বাজ পড়ে। মাইরা ভ'য়ে দু'হাতে কান চেপে ধরে। শোয়ার জায়গাটি থেকে নেমে যায়। ভীষণ ভ'য় লাগছে তার।
মেঝেতে ইরফানকে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে মাইরা দোনোমনা করে মাঝে একটুখানি দূরত্ব রেখে ইরফানের পাশে গিয়ে বসে। জামা গায়ে শুকিয়ে গিয়েছে। ইরফানের সামনে আর চেঞ্জ করা হয়নি। যার ফলে মাইরার শরীর টা খারাপ লাগছে। মাথা ব্যাথা করছে প্রচন্ড। ইরফানের পাশে বসে আবার যে কখন ঘুমিয়ে যায়, টের পায় না।
রাত তখন ৪:৩০ এর কাছাকাছি। ইরফান বুকে উষ্ণতা অনুভব করে। ঝড়ো হাওয়ায় পরিবেশ ঠাণ্ডা। ইরফানের আরাম-ই লাগলো এই উষ্ণতা। ঘুমের ঘোরে মাইরাকে দু'হাতে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। মাইরার গলায় মুখ গুঁজলে, অন্যরকম এক ঘ্রাণ নাকে এসে ধাক্কা খায়, যা ইরফানের কাছে ভীষণ মিষ্টি লাগলো। ইরফান এবারেও খেই হারিয়ে ঘুমের ঘোরে মাইরার গলায় মুখ ডুবিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে নিল।
ওদিকে মাইরা-ও উষ্ণতা পেয়ে ইরফানের বুকে গুটিশুটি মে'রে বেঘোরে ঘুমায়।
ইরফানের ঘুম হালকা হয়। নাকের কাছে মিষ্টি একটি ঘ্রাণ ভেসে আসে। ইরফান চোখ বুজে রাখা অবস্থায়-ই আরেকটু শ্বাস টেনে নেয়। বিড়বিড় করে,
'নাইস স্মেল!'
কোলের উপর ভারী কিছু মনে হয়, তাছাড়া এই স্মেলের উৎস-ও না বুঝতে পেরে ইরফানের ঘুম পুরোপুরি ছুটে যায়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে। মাথা উঁচু করে কোলের উপর দৃষ্টি পড়লে চোখের সামনে মাইরার ঘুমন্ত মুখ ভেসে ওঠে। যখন-ই মনে পড়ল এটা সেই স্টুপিড মেয়ে, রা'গে চোয়াল শ'ক্ত হয়ে যায় ইরফানের।
এক সেকেন্ড সময় ন'ষ্ট না করে তার কোল থেকে ঘুমন্ত মাইরাকে গায়ের জোরে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলে।
ঘুমের ঘোরেই মাইরা চেঁচিয়ে ওঠে। ঘুম ভেঙে যায়। কোমরে ব্য'থা পেয়ে চোখমুখ কুঁচকে নেয়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তার সামনে ইরফানের শক্ত মুখায়বয়ব সাথে লাল চোখজোড়া দেখে মাইরা ভ'য়ে ঢোক গিলল। ইরফান উঠে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
'তোমার সাহস কি করে হয়, আমার কোলে ওঠার? থা'প্প'ড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার।'
মাইরা বিস্ময় চোখে তাকায়। সে এই ব'জ্জা'ত লোকের কোলে উঠেছিল। জীবনেও না। সে তো একটুখানি পাশে বসেছিল, তবুও মাঝে দূরত্ব রেখে। অতঃপর রে'গে বলে,
'আমি কখনোই আপনার কোলে উঠিনি। আপনি-ই আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে স্বামীর অধিকার ফলাতে চাইছিলেন তাই না? অ'স'ভ্য লোক একটা।'
মাইরার কথাগুলো আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল। ইরফান রেগে-মেগে এগিয়ে গিয়ে মাইরার হাত ধরে ঝট করে মাইরাকে টেনে তোলে। এরপর মাইরাকে টানতে টানতে ঘরের বাইরের দিকে নিয়ে যায়।
মাইরা হাত মোচড়ায়। কি শুরু করেছে এই লোক? উফ! বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
'উফ! হাত খুলে গেল আমার! হাত ছাড়ুন বলছি।'
ইরফান মাইরার কথা কানে নিল না। ঘরের দরজা খুলে মাইরাকে বাইরে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে মাইরার মুখের উপর ঠাস করে দরজা আটকে দেয়। মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। বাইরে এখনো বৃষ্টি পড়ছে, তবে ঝড় কমেছে। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাইরা ভ'য় পায়। বৃষ্টির ফোঁটা কাঁটার মতো লাগছে। ভীষণ শীত করছে, গায়ে জ্বর বুঝল। মাইরা মৃদু শব্দে দরজা ধাক্কায় আর বলে,
'দরজা টা খুলুন প্লিজ! বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।'
কিন্তু ইরফানের কোনো সাড়া নেই। মাইরা বেশ কিছুক্ষণ ডাকলো। কোনো সাড়া পায়না। পাশেই একটি জানালা। মাইরা দৌড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ভেতরে ইরফানকে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। দু'জনের চোখাচোখি হয়। ইরফান গম্ভীর চোখে চেয়ে আছে। মাইরা ভীত কণ্ঠে বলে,
থাকতে দেখে। দু'জনের চোখাচোখি হয়। ইরফান গম্ভীর চোখে চেয়ে আছে। মাইরা ভীত কণ্ঠে বলে,
'দরজাটা খুলুন প্লিজ! বাইরে অনেক অন্ধকার।'
ইরফান জড়বস্তুর মতো মাইরার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। মাইরা অসহায় কণ্ঠে বলে,
'প্লিজ! দরজা খুলুন। আমি আর কথা বলব না। 'মাইরা বেশ কিছুক্ষণ এভাবে বলার পরও ইরফানকে ভাবলেশহীন দেখে মাইরা অসহায় চোখে তাকায়। লোকটা এত পা'ষা'ণ কেন?
মাইরা জানালার সাথে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজল। এই লোকটার মতো পা'ষা'ণ বোধয় আর কেউ নেই। ভাবলো, ভোরের আলো ফুটলে সে এখান থেকে একা একাই চলে যাবে। মনে মনে ইরফানকে ধুয়ে দিতে লাগলো।
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মাইরার মনে হয়, তার পিছনে কেউ। মাইরা ঢোক গিলল। চোখ মেলে তাকালে সামনে ইরফানকেও দেখল না। ভয় আরও বাড়লো। বাইরে ঠাণ্ডা আবহাওয়া, তবুও সে ঘামছে। বহু কষ্টে একটুখানি সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে উল্টো ঘুরে একটা লম্বা ছায়া দেখে চিৎকার দিতে নিলে ইরফান মাইরার মুখ চেপে ধরে শক্ত গলায় বলে, 'স্টুপিড, ভদ্রভাবে থাকতে পারো না?'
মাইরা ইরফানের গলা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ইরফান বিরক্ত হয়ে মাইরার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়।
মাইরার পায়ের কাছে সুড়সুড়ি লাগায় সে ঢোক গিলল। সেই গর্তে একটি সাপ ফণা তুলেছিল, দৃশ্যটি মনে পড়তেই মাইরা ইরফানের সাথে চেপে গিয়ে জোরেসোরে এক চিৎকার দেয়।
ইরফান চোখমুখ শক্ত করে মাইরার দিকে তাকায়। আর নিতে পারছে না। রাগে মাইরাকে তার থেকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে মাইরার ডান গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারে। মাইরা তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়, শক্ত ভেজা মাটির উপর। মাথা ভনভন করে উঠল। একে তো সারারাতে বৃষ্টির ঠাণ্ডা পানি শরীরে বসে গিয়ে জ্বর এসেছে।
তার উপর ইরফানের দাবাং মার্কা চড় খেয়ে মাইরার অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম। ফোঁপাতে ফোঁপাতে ইরফানের গুষ্টি উদ্ধার করে। পাশে কিছু খসখস শব্দ শুনতে পেয়ে মাইরার আত্মার পানি শুকিয়ে যায়। সাপ দেখে খুব ভয় পায় সে। উঠতে চাইলেও পারছে না। কোমরে অনেক ব্যথা পেয়েছে।
সামনে তাকিয়ে ইরফানকে যেতে দেখে কান্নামাখা গলায় বলে, 'প্লিজ।
ইরফান তাকায় না। মাইরা আবারও বলে, 'একটু শুনুন। আমার ভয় লাগছে।'
ইরফান হঠাৎ উল্টো ঘুরে ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে আসে মাইরার দিকে। মাইরা ঢোক গিলল। ভাবলো, আবার মারবে হয়তো। মাইরা নাক টানলো। সাপের ছোবল খাওয়ার চেয়ে ইরফানের মার খাওয়াই ভালো। ভাবনার মাঝেই ইরফান ঝট করে মাইরাকে কোলে তুলে নেয়। এরপর বড় বড় পা ফেলে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। মাইরা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আবছা আলোয় অস্পষ্ট দেখল ইরফানকে।
ইরফান ঘরে গিয়ে ঠাস করে মাইরাকে নামিয়ে দেয়। ডান হাতে মাইরার গাল চেপে হিসহিসিয়ে বলে, 'আর একটা বাজে কথা বললে, মেরে এই জঙ্গলের মাঝে গুম করে দিয়ে যাব। আন্ডারস্ট্যান্ড?'
মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। ইরফান মাইরার গাল ছেড়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে।
মাইরা তার ডান গালে হাত বুলালো। গাল, হাত, কোমর সব ব্যথা বানিয়ে দিয়েছে এই অশোভন লোকটা। বিড়বিড় করল, 'খবিশ লোক একটা।'