সন্ধ্যার পর পর, শুদ্ধ ফারাহ'র সাথে দেখা করার জন্য ফারাহ্'দের বাড়ি এসেছে। ফারাহ'র বাবা মায়ের সাথে টুকটাক কথা বলে ফারাহ'র ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখে শুদ্ধ, তখন-ই ফারাহ্ ওয়াশরুম থেকে বেরোয়। শুদ্ধ'র দৃষ্টি ফারাহ'র উপর পড়লে, তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
ফারাহ্ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে শুদ্ধকে দেখে অবাক হলো। আজ ভার্সিটি থেকে আসার পর ঘুমিয়ে গিয়েছিল, ফলে গোসল করতে করতে লেট হয়ে গিয়েছে।
শুদ্ধ ঘরের ভেতরে এসে উল্টো ঘুরে ঘরের দরজা আটকে দেয়। এরপর ফারাহ্'র দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। এই সন্ধ্যায় গোসল করার মানে কি? শুদ্ধ বোধয় বিরক্ত হলো। একটু কড়া কিছু শোনাতে চাইছে ফারাহ্'কে, কিন্তু পারছে না। কি সুন্দর লাগছে তার বউটাকে। ভেজা চুলে, সারামুখে ছোট ছোট পানির কণা ছড়ানো। শুদ্ধ'র মনে হলো সদ্য ফোটা গোলাপের পাপড়িতে শিশির বিন্দু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এতো সুন্দর বউকে কড়া কথা শোনানো যায় না-কি!
শুদ্ধ'র দৃষ্টিতে ফারাহ্ অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সে শুদ্ধ'র সাথে এখন-ও ফ্রি নয়। শুদ্ধ'কে তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফারাহ্ ল'জ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।
শুদ্ধ একটু হাসলো ফারাহ'র লজ্জামাখা মুখ দেখে। এগিয়ে এসে ফারাহ্'কে ছুঁইছুঁই করে দাঁড়ায়। ফারাহ্ শুদ্ধ'র উপস্থিতি তার এতো নিকটে বুঝতে পেরে ঢোক গিলল। সে শুদ্ধ'র পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে শুদ্ধ ফারাহকে দু'হাতে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। ফারাহ্ কেঁপে ওঠে। শুদ্ধ ফারাহ'র কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, 'আমি তো ফরজ কাজ সারিনি। তবে এই অবেলায় গোসল করলে কেন ফারাহ্?'
কথাটি শুনে ফারাহ্ জমে যায়। শুদ্ধ ডান হাত ফারাহ'র থুতনিতে রেখে ফারাহ'র মুখ সামান্য উঁচু করে। ফারাহ'র চোখ বন্ধ। চোখের পাতাসহ, ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে। শুদ্ধ শুকনো ঢোক গিলল। নিজেকে দমিয়ে নিতে পারলো না। চোখের পলকে এগিয়ে এসে তার আর ফারাহ'র অধরের মাঝে দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়। ফারাহ্ বিদুৎ এর শক খাওয়ার ন্যায় ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। হাত থেকে ভেজা তাওয়াল পড়ে পড়ে যায়, যার স্থান হয় মেঝে। শুদ্ধ'র থেকে হঠাৎ এরকম আচরণ আশা করেনি সে। ধীরে ধীরে ফারাহ'র শরীর নেতিয়ে পড়ে। শুদ্ধ শ'ক্ত করে
ধরে রাখে ফারাহ্'কে। ফারাহ'র শরার থেকে ওড়না ফেলে দেয়। ধীরে ধীরে হাতের বিচরণ অবাধ্য হয়, ফারাহ্ হাসফাস করে। তবে শুদ্ধ থামে না। সে নিজের খেই হারিয়েছে।
হঠাৎ শুদ্ধ'র মস্তিস্কে কিছু নাড়া দেয়। শুদ্ধ সাথে সাথে ফারাহ'কে ছেড়ে একটা ধাক্কা দেয়।
ফারাহ্ কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। ল'জ্জা পাওয়ার বদলে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় শুদ্ধ'র দিকে। শুদ্ধ আর এক সেকেন্ড-ও এখানে দাঁড়ালো না। না তো ফারাহ'র দিকে তাকালো। বড় বড় পা ফেলে হনহন করে বেড়িয়ে যায় ফারাহ'র ঘর থেকে। যাওয়ার আগে শ'ক্ত করে বলেছে, 'এভাবে আমার সামনে আর আসবে না ফারাহ্।'
ফারাহ্ ছলছল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুদ্ধ'র দিকে। শুদ্ধ'র এরকম ব্যবহার করার কারণ কি? প্রথমবারের মতো শুদ্ধ একটুখানি কাছে আসায় ফারাহ'র মন আনন্দের জোয়ার এসেছিল। কিন্তু শুদ্ধ'র এরকম ব্যবহারে তা নিমিষেই মিলিয়ে যায়। সে চায়, শুদ্ধ তাকে অনেক ভালোবাসুক। শুদ্ধ কবে তাকে ভালোবাসবে? এটুকু ভাবতে গিয়ে ফারাহ'র দু'চোখের পাতা বেয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাপানি গড়িয়ে পড়ল। ডান হাত তুলে ঠোঁটে রাখলে কেঁপে ওঠে। যেখানে তার স্বামীর প্রথম ছোঁয়া লেগে আছে।
পরদিন,
সকাল সকাল নাছিম অফিস যাবে বলে রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে বসেছে। নাছিমের মা কোমরে হাত দিয়ে কণ্ঠে তেজ নিয়ে বলে, 'তুই কি বিয়ে করবি না? শুদ্ধটা-ও তো বিয়ে করে নিল। এখন অন্তত তুই বিয়েটা করে নে।'
মায়ের কথা শুনে নাছিম মৃদুস্বরে বলে, 'খুব দ্রুত করব মা। ছেলেকে বিয়ে দেয়ার প্রিপারেশন নাও।'
ভদ্রমহিলা খুশি হয়ে বলে, 'আলহামদুলিল্লাহ! মেয়ে দেখা শুরু করলাম তবে।'
নাছিম একটু হেসে বলে, 'তোমাকে ক'ষ্ট করে দেখতে হবে না মা। আমি মেয়ে পছন্দ করেছি। তুমি শুধু গিয়ে সব ঠিক করে আসবে।'
নাছিমের মা নাছিমের সামনে নাস্তা রেখে বলে, 'কবে যাবো? বউমা ছাড়া বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তাড়াতাড়ি কর তো।'
নাছিম মায়ের কথায় মৃদু হেসে খেতে শুরু করল।
খাবার শেষ করে নাছিম তার মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে তাদের ফ্লাট থেকে বেরিয়ে আসে। পকেট থেকে ফোন বের করে ফোনের আলো অন করে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামে। দৃষ্টি ফোনের ওয়ালপেপারে মাইরার হাস্যজ্জ্বল একখানা ছবিতে। সাথে নাছিমের ঠোঁটের কোণে হাসি। মাইরার এই ছবিটি সে শুদ্ধ'র বিয়ের দিন লুকিয়ে উঠিয়েছিল। সে জানে কারো অনুমতি ব্যতীত এভাবে লুকিয়ে ছবি তোলা উচিৎ নয়, কিন্তু মন মানেনি। কখনো কখনো দু'একটা ভুলকে প্রশ্রয় দিতে ইচ্ছে করে, ভুলটা যদি প্রিয় মানুষ রিলেটেড হয় তবে তো কথাই নেই। ভাগ্য ভালো হওয়ায় মাইরার সাথে কয়েকবার কথা-ও হয়েছে তার, যদি-ও মেয়েটির কথা ধানিলঙ্কা টাইপ লেগেছে, সাথে মাইরার চঞ্চলতা ভীষণ টানে নাছিমকে। কি যে ভালো লাগে! সারাদিন মাইরার কথা ভাবতে তার দিন যায়। অফিসের কাজ করতে গিয়ে বাচ্চাদের মতো বেখায়ালি হয়ে যায়। আরও কত কী!
মেয়েটা দেখতে একদম পুতুলের মতো। নাছিম মাইরার ছবিটির দিকে চেয়ে হাসিমুখে বিড়বিড় করে, 'বার্বিডল।'
নাছিম গতকাল শুদ্ধকে জিজ্ঞেস করেছিল মাইরার বাড়ি, তার বাবা-মাকে চেনে কি-না! শুদ্ধ জানিয়েছে, সে চেনেনা। সে শুধু মাইরাকেই ভালোভাবে চেনে।
নাছিমের হঠাৎ সামিয়ার কথা মনে পড়লো। শুদ্ধ'র বিয়ের দিন মেয়েটি তাকে ফেলে দিয়েছিল, এর বিহিত করা হয়নি। আজ করবে। মেয়েটি মাইরাকে যেহেতু চেনে তাহলে মাইরার বাড়ির ঠিকানা-ও নিশ্চয়ই জানবে। আর তাই ভাবলো, সে সামিয়ার থেকে মাইরার বাড়ির ঠিকানা নিবে, আর না দিতে চাইলে তাকে ফেলে দেয়ার অপরাধে বাড়ি ছাড়তে বলবে। অতঃপর নাছিম দোতলার ফ্লোরে নেমে সামিয়াদের ফ্লাটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এই ফ্লাট থেকে সামিয়াকে বহুবার বেরতে দেখেছে, এজন্য চিনতে অসুবিধা হলো না। নাছিম সামিয়াদের ফ্লাটে কলিংবেল চাপে।
কয়েক সেকেন্ড পর সামিয়া এসে দরজা খুলে দেয়। সামনে নাছিমকে দেখে অবাক হয়। সাথে একটু ভ'য়-ও পায়। ফারাহ'র বিয়েতে গিয়ে ভুলবশত নাছিমকে ফেলে দেয়ায় নাছিম তাকে এই বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছিল। এখন সেটা বলতেই আসেনি তো!
নাছিম ভ্রু কুঁচকে বলে, 'তোমার নাম কি?'
সামিয়া ঢোক গিলল। ছোট করে বলে, 'সামিয়া।'
নাছিম ফোন পকেটে রেখে দু'হাত আড়াআড়িভাবে গুঁজে বলে, 'শোনো মিস সামিয়া! তোমার শা'স্তির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? তো বাসা দেখেছ?'
সামিয়ার চোখেমুখে অসহায়ত্ব। এই ঢাকা শহরে সে কোথায় গিয়ে একা একা থাকবে? নাছিমের দিকে চেয়ে অনুতপ্ত স্বরে বলে, 'ভাইয়া আমি স্যরি! প্লিজ আমাকে এই বাসা থেকে বের করে দিবেন না।'
নাছিম মনে মনে হাসল। এটাই শুনতে চাইছিল সে। তবেই না তার কাজ হাসিল হবে! উপর থেকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, 'এক শর্তে এই বাসায় থাকতে পারবে।'
সামিয়া আগ্রহী চোখে তাকায় নাছিমের দিকে। নাছিম সোজাসাপ্টা বলে, 'মাইরার বাড়ির ঠিকানা বলো। নয়তো বাসা ছাড়তে হবে। কনফার্ম।'
সামিয়া বিস্ময় চোখে তাকায় নাছিমের দিকে। খুব ভালোই বুঝল, এই লোকটার মাইরার প্রতি কিছু আছে। সামিয়া তো বাচ্চা নয়, সে বোঝে। কিন্তু নিজের ভালোর জন্য মাইরার ক্ষ'তি করে দিবে? যদিও বাড়িওয়ালীর ছেলে হিসেবে নাছিমকে খারাপ লাগেনা। তবুও মানুষ আসলে কেমন, এটা তো উপর থেকে বোঝা যায় না। নাছিম যদি মাইরার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করে, তখন সামিয়া নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।
সামিয়া মাইরার হোস্টেল, বাড়ি দু'টোই চেনে। মাইরা সে দু'জনেই টিউশন করায়। এই চক্করেই একবার মাইরার বাড়ি, হোস্টেল চিনেছে। সে ভাবলো, নাছিমকে মাইরার বাড়ির ঠিকানা বলবে। হোস্টেলের কথা বলবে না, মাইরা হোস্টেলে থাকে। আর বাড়িতে নিশ্চয়ই মাইরার বাবা-মা থাকে। নাছিম মাইরার বাবা-মায়ের কাছেই যাক। তাহলে আর কোনো ভ'য় থাকবেনা।
সামিয়া একবার নাছিমের দিকে তাকালো। বিরক্ত লাগলো তার। এই লোকটা কেমন যেন। মনে হয় ভালো করে কথা বলতে পারেনা। আবার তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিল। লোকটির মা কত ভালো, তার সাথে দেখা হলেই কি সুন্দর করে কথা বলে, অথচ এই লোক একটা যাচ্ছেতাই।
নাছিম চোখ ছোট ছোট করে বলে, 'কি ডিসিশন নিলে? বাসা ছাড়ছ তবে?'
সামিয়া ভাবনা থেকে বেরিয়ে মাইরার বাড়ির ঠিকানা বলে দেয়। নাছিম মাইরার বাড়ির ঠিকানা পেয়ে প্রফুল্ল মনে চলে যায়।
মাইরা মিলার সাথে ভার্সিটির মাঠে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। মাইরা হাসতে হাসতে মিলার উপর ঢলে পড়ছে। যা সবসময় মাইরা করে থাকে।
মাইরাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে দু'জন ছেলে। দু'জনেই সেকেন্ড ইয়ারের। ফিসফিস করতে করতে একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়। ছেলেটি বন্ধুর ধাক্কা খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। হাতে বেশ বড়সড় একটি বক্স, যা র্যাপিং দিয়ে মোড়ানো। ছেলেটি সাহস করে মাইরা, মিলার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর গলা ঝেড়ে বলে, 'হ্যালো মাইরা!'
কারো কণ্ঠে নিজের নাম শুনে মাইরা উল্টো ঘুরে তাকালো। সাথে মিলা-ও তাকালো। সেকেন্ড ইয়ারের এক ছেলেকে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় দুই বান্ধবীর। মাইরাকে চুপ দেখে ছেলেটি তার হাতের বক্স মাইরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, 'এটা তোমার জন্য মাইরা।'
মাইরা, মিলা দু'জনে দু'জনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। ছেলেটি আবার-ও বলে, 'প্লিজ ফিরিয়ে দিও না।'
মাইরা মুখের উপর না করার সুযোগ পায় না। কারণ এই ছেলে তার ভার্সিটির সিনিয়র। তার উপর আবার তাকে এভাবে বলছে। উপায় না পেয়ে মাইরা হাত বাড়িয়ে বক্সটি নিয়ে নেয়। ছেলেটি মৃদু হেসে বলে, 'অপছন্দ হলে জানিও। আরও নিউ কালেকশন দিব।'
মাইরা, মিলা দু'জনেই অবুঝ নয়নে তাকিয়ে রইল। কিসের কালেকশন? তারা বুঝতে পারল না।
এদিকে ছেলেটি কথাটা বলে সাথে সাথে মাইরাকে পাস করে দ্রুতপায়ে জায়গাটি প্রস্থান করে।
ইরফান ভার্সিটির গেইটে দিয়ে প্রবেশ করেছে মিনিট পাঁচ আগে। মাইরার দিকে একটি ছেলেকে এগিয়ে যেতে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে তখন-ই। ছেলেটির দেয়া গিফট বক্স মাইরার হাতে, এটা দেখেই রা'গে শরীর রি রি করছে ইরফানের। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখমুখ শ'ক্ত করে মাইরার দিকে চেয়ে আছে।
মাইরা বক্সটি নিয়ে মাঠে বসে পড়ে। এরপর ছেলেটির দেয়া বক্সে মোড়ানো রেপিং পেপার ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে। মিলা-ও হেল্প করে মাইরাকে। দুই বান্ধবী মিলে পুরো বক্সের রেপিং পেপার খুলে ফেলল। এরপর বক্সের মুখ খুলে ভেতরে দৃষ্টি দিলে দু'জনের চোখেমুখে বিস্ময় ভর করে।
ভেতরে অনেক রঙবেরঙের চুড়ি। মিলা মুখে হাত দিয়ে বলে, 'হায় হায়! এতো চুড়ি! এখানে কত ডজন চুড়ি আছে? দাঁড়া গুনি।'
কথাটা বলে মিলা সাথে সাথে গুণতে শুরু করে চুড়ির ডজন। বেশ কিছুক্ষণ পর মিলা শব্দ করে বলে ওঠে, 'এখানে পুরো ৩০ ডজন চুড়ি আছে রে মাইরা। কি কিউট!'
মাইরা-ও অবাক হয়ে বলে, 'আসলেই কিউট!'
এরপর মিলার দিকে চেয়ে হেসে বলে, 'কি যে ভালো লাগে চুড়ি! ছেলেটাকে....'
বাকি কথাটুকু শেষ করতে পারে না মাইরা।
তখন-ই ইরফান মাইরার সামনে এসে দাঁড়িয়ে চুড়ির বক্স বরাবর ডান পা দ্বারা ফুটবলের মতো করে গায়ের জোরে বামদিকে একটা সট দেয়।
মাইরা কথা থামিয়ে দিয়ে দ্রুত সামনে তাকিয়ে মাথা উঁচু করে ইরফানকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকায়। মিলা-ও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইরফানের কান্ডে।
বক্সটি কয়েক হাত দূরে সরে গিয়েছে। মাইরা, মিলা দু'জনে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে, 'চুড়ি পরার সাধ মেটাবো তোমায়, ওয়েট।' কথাটা বলে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায় ইরফান। বক্সটির সামনে দাঁড়িয়ে আরেক সট দিলে বক্সটি মাঠের মাঝখানের দিকে ছিটকে যায়। ইরফান রাগান্বিত দৃষ্টি আশেপাশে ফেলে কিছু খুঁজল। এরপর কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে এক ছেলের হাত থেকে ব্যাট নিয়ে গটগট পায়ে এগিয়ে আসে চুড়ির বক্সটির নিকট।
এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ডান পা দ্বারা এক লাথি দিয়ে বক্সটি পুরো উল্টে ফেলে দেয়। ফলস্বরূপ ভেতরের সব চুড়ির স্থান হয় মাঠ, যেগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছে।
ইরফান দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যায় ছিটিয়ে পড়ে থাকা চুড়িগুলোর দিকে। এরপর চোখের পলকে দু'হাতে ব্যাট উঁচু করে একের পর এক আঘাত করতে থাকে চুড়িগুলোয়। গায়ে যত শক্তি ছিল, সব ঢেলে দিয়েছে, রাগে দু'চোখে যেন আগুন জ্বলছে ইরফানের।
যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রতিটি চুড়ি গুড়ো গুড়ো হয়, ততক্ষণ ইরফান থামলো না। প্রতিটি চুড়ি একদম গুড়ো গুড়ো হয়ে গেলে ইরফান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের ব্যাট ছুঁড়ে ফেলে, যার স্থান হয় মাঠের আরেক কোণায়, যেন টেনিস বল ছুঁড়ে ফেলল।
পুরো ভার্সিটির প্রত্যেকে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে। সকলে জানে এই ভার্সিটির ইরফান স্যার কতটা রগচটা স্বভাবের। কিন্তু আজকের করা ইরফানের কান্ডে সকলের অবাকের মাত্রা পেরিয়েছে। যে যেখানে ছিল, সে সেখানেই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। সকলের দৃষ্টি ইরফানের পানে।
ভার্সিটির মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে ইরফান, দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। রাগ কমেনি তার। অতিরিক্ত রাগে কাঁপছে সে। যে ছেলেটা মাইরাকে চুড়ি দিয়েছে, সেই ছেলের কথা ভাবতেই চোখমুখ চগের চেয়েও শক্ত হয়ে যায়। ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাওয়া চুড়িগুলোর দিকে চেয়ে শক্ত গলায় বিড়বিড়য়ে বলে,
আই'ল কিল ইউ, বাস্টার্ড।'
সকলের সাথে সাথে মাইরা, মিলার চোখেমুখে-ও আগের চেয়ে বেশি বিস্ময়। তবে মাইরা যেন একটু বেশি-ই অবাক হলো। এতক্ষণ করা ইরফানের কান্ডে তার কথা বলার ভাষা হারায়। কি হলো, কেন হচ্ছে সব যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। ইরফানকে দেখে ভীষণ ভয়-ও লাগছে। এত রেগে যাওয়ার কারণ সে ঠিক করে বুঝতে পারছে না।
হঠাৎ ইরফান দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এসে মাইরার সামনে দাঁড়ায়। মাইরা ইরফানের দিকে তাকালে ইরফানের লালিত চোখজোড়া দেখে ঢোক গিলল। ইরফান তার দিকে এভাবে তাকিয়ে কেন? মনে হচ্ছে তাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। ভাবনার মাঝেই ইরফান মাইরার হাত ধরে টেনে তার পাশে দাঁড় করায়। মাইরার ডান হাতের কব্জি ইরফান তার হাতে শক্ত করে ধরে। মাইরার মনে হলো তার হাতের রক্তের চলাচল থেমে যাচ্ছে। ভয় পেয়ে বারবার ঢোক গিলছে মেয়েটা। একবার হাত ছাড়াতে চাইলেও, তার হাত বিন্দুমাত্র নাড়াতে পারলো না।
ইরফান হঠাৎ সিংহের ন্যায় গর্জন তুলে সকলের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে,
'সি ইজ মিসেস মাইরা নেওয়াজ মাই ওয়াইফ। আমার মিসেসের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকিয়ে সীমা লঙ্ঘন করলে, জাস্ট এক ন্যানো সেকেন্ডে তাকে এই ভার্সিটির মাটিতে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিব। গট ইট?'
ইরফানের কথাগুলো যেন পুরো ভার্সিটিতে বোমাব্লাস্ট করল। সকলে স্তব্ধ চোখে ইরফান, আর ইরফানের পাশে দাঁড়ানো মাইরার দিকে চেয়ে আছে। মাইরা ঘাড় ঘুরিয়ে স্তব্ধ চোখে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফান এসব কি বলছে? ইরফান নিজে তাকে সবার সামনে নিজের ওয়াইফ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিল? তাও এভাবে? মাইরার বিস্ময়ের মাত্রা প্রায় আকাশ ছুঁয়েছে।
এদিকে ইরফানের কথায় মিলার মাথা ঘুরে ওঠে। তার বান্ধবী ইরফান স্যারের ওয়াইফ? কখন? কিভাবে? ইরফান স্যার তো মিথ্যা বলবে না। তাছাড়া মাইরা-ও তো কোনো রিয়েক্ট করছে না। মিলার শুধু বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইরফান-মাইরার দিকে।
ইরফান মাইরার দিকে ভষ্ম করে দেয়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাইরা ইরফানের দৃষ্টি দেখে ঢোক গিলল। ইরফান ডান হাত শক্ত করে মাইরার গাল চেপে ধরে। মাইরার দিকে চোখমুখ শক্ত করে চেয়ে সাপের ন্যায় ফোঁসফোঁস করতে করতে হিসহিসিয়ে বলে,
'নেক্সট টাইম কারো দেয়া জিনিস টাচ করলে তোমার এই দু'হাত কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আসব। আন্ডারস্ট্যান্ড?'
মাইরা গালে ব্যথা পেলে-ও সেদিকে পাত্তা দিল না। তার দৃষ্টি ইরফানের দিকে। সে বাকরুদ্ধ। ইরফানকে সে চিনতে পারছে না। মাথা ঘুরছে তার।
ইরফান মাইরাকে কথাগুলো বলে মাইরার হাত, আর গাল ছেড়ে দেয়। কারো দিকে না তাকিয়ে ইরফান দৃঢ় পায়ে তার অফিসরুমে চলে যায়।
পিছনে ফেলে যায় ভার্সিটির সকলের বিস্ময় দৃষ্টি। যাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ শুধুমাত্র ইরফানের পানে।
মাহরা স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে। ইরফানের আচরণে সে মারাত্মক শকড।
মাঠের মাঝে ভেঙে চুচূর্ণবিচূর্ণ চুড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মাইরা সেদিকে একবার তাকালো। তার মাঝে আপাতত এসব নিয়ে কোনো ভাবান্তর হলো না। মাইরা দৃষ্টি তুলে আশেপাশে তাকালে দেখল আপাতত সে ভার্সিটির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে সকলের দৃষ্টি তার পানে। মাইরা অস্বস্তিতে পড়ে যায়।
ইরফান তাকে পুরো ভার্সিটির সামনে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কথা ভাবতেই মাইরা ঢোক গিলল। কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হয়। এমনিতেই গত কয়েকদিন যাবৎ ইরফানের করা কাজে তার মাথায় শুধু ইরফান ঘুরছিল। আর আজকের কান্ডে মেয়েটা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে।
মিলা ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মাইরার সামনে দাঁড়ায়। অবাক হয়ে বলে,
'ইরফান স্যার যা বলল, সব সত্যি তাইনা?'
মাইরা ঢোক গিলল। সীতাকুণ্ড থেকে ফেরার পর ইরফান তাকে বলেছিল এই বিয়ের কথা ভুলে যেতে। লোকটা তাকে সহ্য করতে পারতো না। মাইরার এখনো মনে হয়, ইরফান তাকে এখনো সহ্য করতে পারেনা। কিন্তু ইরফানের এসব অদ্ভুত বিহেভ মাইরার মাথা ঘুরিয়ে দেয়।
এখন সে মিলাকে কি বলবে? সে তো চায়নি তার আর ইরফানের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে কেউ জানুক। তারা নিজেরাই ভুলে যেতে চেয়েছিল। এজন্য এই কথা সে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করত না। কিন্তু মিলার থেকে এত বড় কথা লুকানোয় মিলা যে কষ্ট পেয়েছে তা মাইরা জানে। মিলার চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মাইরা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। এরপর বোঝানোর স্বরে বলতে নেয়,
'হুম। কিন্তু আমার কথাটা.........'
মিলা মাঝ থেকে বিদ্রুপ স্বরে বলে ওঠে,
'বাহ! বিয়ে করে নিয়েছিস, অথচ আমাকে একটিবার জানাতে পারলি না? ভালো-ই। আমি কে? কেন বলবি আমাকে? ভালো থাক।'
মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। মিলা কথাগুলো বলে চলে যাচ্ছিল, মাইরা দ্রুত মিলার হাত ধরে অসহায় কণ্ঠে বলে,
'মিলা আমার কথাটা শোন। আমি তোকে বলতাম। আসলে....'
মিলা মাইরার হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলে,
'একদম আমার সাথে কথা বলতে এসেছিস তো, তোর খবর আছে। আমার কোনো বন্ধু নেই। আমার আশেপাশে যেন তোকে না দেখি।'
মাইরা শুনলো না। মিলাকে জোর করে জড়িয়ে ধরলে মিলা গায়ের জোরে মাইরাকে ধাক্কা দেয়। মাইরা কয়েক পা দূরে সরে যায়। পড়তে পড়তে বেঁচে যায়।
মিলা একবার-ও তাকালো না মাইরার দিকে। ধুপধাপ পা ফেলে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যায়। কিভাবে, কখন বিয়ে হয়েছে, সেসব শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখালো না সে।
মিলার রাগ লাগছে। সাথে ভীষণ কষ্ট লাগছে। মাইরাকে তার নিজের বোনের চেয়ে-ও বেশি কিছু ভাবে সে। অথচ এত বড় একটা কথা তাকে মাইরা জানালো না। সে মানুষকে বেশি আপন ভাবে। সবাই তো আর ভাবে না। কথাগুলো ভেবে মিলার চোখজোড়া ভিজে ওঠে।
এদিকে প্রিয় বান্ধবীর থেকে এত রুড ব্যবহার পেয়ে মাইরার চোখের কোণে-ও পানি জমেছে। সে এখন মিলাকে কিভাবে বোঝাবে তার পরিস্থিতি?
নুসরাত আর সামিয়া মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এতক্ষণ ঘটে যাওয়া কান্ডে বেচারি দু'জন দু'জনকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ ফারাহ্ ভার্সিটি আসেনি। ভার্সিটি আসার আগে সামিয়া, নুসরাত ফারাহ'র বাসায় গিয়েছিল। ফারাহ্ তাদের দু'জনকে বলেছে, গতকাল নাকি শুদ্ধ তার সাথে একটু অন্যরকম ব্যবহার করেছে, যেটাতে ফারাহ্ ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। কেঁদেছেও মেয়েটা। ভার্সিটি আসার জন্য অনেক জোর করেছে তারা। কিন্তু ফারাহ্ আসেনি। তারা ফারাহ্'কে সান্ত্বনা দিয়ে ভার্সিটি চলে এসেছে। নুসরাত হতাশ কণ্ঠে বলে,
'ফারাহ্'কে কতবার বললাম, ভার্সিটি আয়। আসলো না। আজ আসলে এত বড় লাইভ সিনেমা মিস হয়ে যেত না!'
নুসরাতের কথা শুনে সামিয়া অবাক হয়। এখানে মনে হচ্ছে একটা ঝামেলা বেঁধেছে আর এ ফারাহ্'কে সিনেমা না দেখাতে পেরে আফসোস করছে। সামিয়া বিরক্ত হয়ে বলে,
'তোর কাছে এটা সিনেমা মনে হচ্ছে?”
নুসরাত ভ্রু কুঁচকে বলে,
'হ্যাঁ। সিনেমায় নায়করা এভাবেই রেগেমেগে ভাঙচুর করে। নাটকে এসব হয় না। তাই এটা নাটক নয়। সিনেমা-ই হবে।'
সামিয়া হতাশ চোখে চেয়ে রইল। এর সাথে কথা বলা বেকার। সে নুসরাতের হাত ধরে এগিয়ে এসে মাইরার সামনে এসে দাঁড়ায়। এরপর মাইরার দিকে চেয়ে সামিয়া জিজ্ঞেস করে,
'তুমি কি সত্যিই ইরফানের স্যারের বউ মাইরা?'
মাইরা সামিয়া আর নুসরাতের দিকে তাকালো। দু'জন উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। সামিয়ার সাথে মাইরার মোটামুটি ভালো সম্পর্ক। এ কারণে মাইরা নিজেকে সামলে মৃদুস্বরে বলে,
'সীতাকুণ্ডে গিয়ে আমরা ঝড়ের রাতে এক জায়গায় আটকে গিয়ে এক বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওই বাড়ির লেকগুলো আমাদের জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।'
মাইরার কথা শুনে সামিয়া, নুসরাত আসল কাহিনী বুঝল। সামিয়া সীতাকুণ্ড না গেলে ফারাহ্ আর নুসরাতের থেকে গল্প শুনেছিল ইরফান আর মাইরা নাকি ঝড়ের রাতে হারিয়ে গিয়েছিল। সামিয়া মাইরার গালে হাত রেখে মৃদু হেসে বলে,
'তাহলে তো তুমি ইরফান স্যারের বউ হিসেবে আমাদের ম্যাডাম হয়ে গেলে!'
নুসরাত হেসে বলে,
'হয়ে গেলে না! অলরেডি হয়ে গেছ।'
এদের কথায় মাইরা ভীষণ লজ্জা পায়। এখন-ও সবাই তার দিকে কেমন যেন বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে। মাইরার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। সে আর এখানে থাকলো না। সামিয়া আর নুসরাতকে বলে মাইরা দ্রুত ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যায়।
ইরফানের রাগের প্রতিফলনে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো ভার্সিটিকে প্রথমে যেমন স্তব্ধ করে রেখেছিল, কিছু সময় পেরিয়ে গেলে, এখন ভার্সিটির প্রতিটি জায়গায় ইরফান, মাইরাকে নিয়ে গুঞ্জন চলছে।
ভার্সিটির ভিসি শাহাবুদ্দীন আহমেদ, যিনি তারেক নেওয়াজের খুব ভালো বন্ধু। ভদ্রলোক শক্ত হয়ে বসে আছেন। তিনি ভাবতেই পারছেন না তার বন্ধুর ছেলে ইরফান বিয়ে করেছে তাদের ভার্সিটির এক মেয়েকে। সবচেয়ে বড় কথা তারেক তাকে একটা কথা জানালো না পর্যন্ত। এটা তো তার বিশ্বাস-ই হচ্ছে না। ভাবনার ইতি ঘটিয়ে ভদ্রলোক তারেক নেওয়াজকে কল করে। ওপাশে তারেক নেওয়াজ কল রিসিভ করলে শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলে,
'ছেলেকে একা একা-ই বিয়ে দিলি? আমাকে একটা কথা জানালি না? এই তোর বন্ধুত্ব?'
বন্ধুর মুখে এরকম উদ্ভট কথা শুনে তারেক নেওয়াজ অবাক হয়ে বলেন,
'কি আবোল-তাবোল বকছিস! ইরফানকে কবে বিয়ে করালাম আমি? ওকে বিয়ের কথা বলি, ও এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়। আমি-ও অপেক্ষায় আছি, ও কবে বিয়েতে মত দেয়। কিন্তু তুই এসব কি শোনাচ্ছিস?'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ অবাক হয়ে বলে,
'কিন্তু তোর ছেলে যে পুরো ভার্সিটির সামনে স্বীকারোক্তি দিলো, আমাদের ভার্সিটির এক মেয়ে না-কি ইরফানের ওয়াইফ!'
তারেক নেওয়াজ বিস্ময় কণ্ঠে বলেন,
'কি বলছিস! আমি তো কিছুই জানি না।'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ তারেক নেওয়াজের কথায় আগের চেয়েও অবাক হয়। তিনি আরও ভাবছিলেন, তারেক তাকে না জানিয়ে ছেলের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এদিকে তারেক নিজেই জানেনা। তারেক নেওয়াজের কথার ধরনে তিনি অবিশ্বাস-ও করতে পারলেন না। অতঃপর বলেন,
'তুই আসলেই কিছু জানিস না?'
তারেক নেওয়াজ উত্তর দেয়,
'আমি তোকে মিথ্যা কেন বলব? তাছাড়া ইরফানের বিয়ে তোকে ছাড়া দিব, এটা তুই কিভাবে ভাবলি?'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ মৃদুস্বরে বলেন,
'আমিও সেটাই ভাবছিলাম। তাহলে কি ইরফান একা একাই কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে নিল?'
তারেক নেওয়াজ ভাবুক হয়ে বলেন,
'ইরফান বিয়ে করার মতো ছেলে না। অথচ সে একা একা বিয়ে করে নিয়েছে। আমার তো বিশ্বাস-ই হচ্ছে না।'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন,
'আচ্ছা আমি ইরফানের সাথে কথা বলছি।'
তারেক নেওয়াজ সম্মতি দিয়ে কল কেটে দেয়। তার মাথায় ঘুরছে, ইরফান কবে, কোথায়, কাকে বিয়ে করল!
তারেক নেওয়াজ ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে আছেন। ১৫ দিনের আগে ফিরতে পারবেন না। ভদ্রলোক ইরফানের নাম্বারে কল দিল বেশ কয়েকবার। কিন্তু কল রিসিভ হলো না। তারেক নেওয়াজ হতাশ হলেন। শুদ্ধকে কল করলে তাকেও না পেয়ে দ্বিগুণ হতাশ হলেন। ভাবলেন যত দ্রুত পারেন কাজ শেষ করে দেশে ফিরে ইরফানের সাথে সামনাসামনি বসে কথা বলবেন।
শাহাবুদ্দীন আহমেদ অফিসরুম থেকে বেরিয়ে ইরফানের রুমের দিকে যায়। তাদের সম্পর্কটা-ই এমন। সে ভিসি বলে ইরফানকে তার রুমে আসার অর্ডার করবে এরকম কখনো করেনি। আবার ইরফান, শুদ্ধ-ও যেকোনো প্রয়োজনে হুটহাট তার কাছে চলে যায়। তারেক নেওয়াজের বন্ধুত্বের খাতিরে ইরফান-শুদ্ধ'র সাথে সম্পর্কটা বেশ ফ্রি।
শুদ্ধ দু'টো ক্লাস নিয়ে বাইরে গিয়েছিল, দুপুরের শেষভাগে আবার-ও একটি ক্লাস নিতে ভার্সিটির মাঠে পা রাখলে ইরফান মাইরাকে নিয়ে গুঞ্জন তার কানে আসে। একজন স্টুডেন্টকে দাঁড় করিয়ে শুদ্ধ সব শুনল। সব শুনে শুদ্ধ অবাক না হয়ে পারলো না। ইরফান মাইরার জন্য এমন করেছে? পুরো ভার্সিটির সামনে মাইরাকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে? তার তো বিশ্বাস-ই হয় না। এর মানে ইরফানের মনে মাইরার জন্য ফুল ফুটেছে। বাহ! বেশ ভালো তো।
মিটিমিটি হাসতে হাসতে শুদ্ধ ইরফার অফিসরুমের দিকে যায়।
শুদ্ধ ইরফানের রুমে গিয়ে উঁকি দিলে রুমে ভার্সিটির ভিসি শাহাবুদ্দীন আহমেদকে দেখে বুঝল, তার মামার বন্ধুর খবর পেয়ে ইরফানের কাছে এসেছে। শুদ্ধ দরজা ঠেলে ভেতরে যেতে যেতে বলে,
'আঙ্কেল আসসালামু-আলাইকুম!'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ শুদ্ধর সালামের উত্তর দিয়ে বলে,
'এসো শুদ্ধ। তোমার ভাই একা একা বিয়ে করে নিয়েছে শুনছি। তুমি কি জানতে না-কি?'
শুদ্ধ এগিয়ে এসে শাহাবুদ্দীন আহমেদ এর পাশের চেয়ারে বসে বলে,
'জানতাম আঙ্কেল। কিন্তু পরে জেনেছি।'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ অবাক হয়। সামনে বসা ইরফানের দিকে চেয়ে বলেন,
'বাহ! তো ইরফান মেয়েটিকে কি আগে থেকেই পছন্দ করতে? কাউকে জানালে না যে?'
ইরফান কিছু বলার আগেই শুদ্ধ বলে ওঠে,
'ইরফান তো মেয়েটিকে মারাত্মক পছন্দ করে আঙ্কেল। মেয়েটির কথা ভাবলেই না-কি ইরফানের হার্টবিট শুধু ব্যাঙের মতো লাফায়। এজন্য-ই ঠাস করে বিয়ে করে নিয়েছে। আমাকেও জানায়নি। একবার ভাবুন আঙ্কেল হার্টবিট বের হয়ে গেলে তখন আমাদের ইরফানের কি হতো! এজন্য আমি আর রাগ করিনি। আহারে! পছন্দের মেয়ে বাচ্চা তো! পছন্দ করে লজ্জায় কাউকে বলতে পারেনি আমাদের ইরফান সোনা, তাই পালিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে।'
ইরফান শুদ্ধ'র দিকে চেয়ে রেগে বলে,
'শাটআপ।'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ মুখে হাত দিয়ে হাসছে। শুদ্ধ'র কথাগুলো যে সঠিক নয়, এটা শুদ্ধ'র বলার ধরনেই বুঝেছে সে। এই ছেলেটা এত ফানি, সাথে ইরফানকে রাগানোর ওস্তাদ। শুদ্ধ গলা নামিয়ে বলে,
'সত্য কথার স্বাধীনতা নেই, বুঝলেন আঙ্কেল?'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ হাসলেন। ইরফান ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে গম্ভীর স্বরে তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের ব্যাপারটি জানায়। শাহাবুদ্দীন আহমেদ পুরো ব্যাপারটি বুঝে বলেন,
'তাহলে মেয়েটিকে কবে নিজের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছো ইরফান?'
ইরফান ছোট করে বলে,
'জ্বি, এই টপিকে এখনো কিছু ভাবিনি।'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ ইরফানকে মাইরাকে দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়িতে তোলার কথা বলে। এরপর ইরফানের অফিসরুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে পকেট থেকে ফোন বের করে তারেক নেওয়াজকে কল করেন। বন্ধুকে সব বুঝিয়ে বলবেন বলে।
এদিকে শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে ইরফানের দিকে চেয়ে বলে,
'এখনো ভাবিস নি মানে? মাইরাকে কবে নিজের বাড়ি আনবি? এখন তো সবই জানাজানি হয়ে গেল!'
ইরফান শুদ্ধ'র দিকে চেয়ে শক্ত গলায় বলে,
'ওই স্টুপিড গার্ল কে আমার কাছে আনবো না। আন্ডারস্ট্যান্ড?'
শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে তাকায়। ব্যাপারটা কি হলো? এতোকিছু করার পর বলছে, মাইরাকে না-কি এর কাছে আনবে না। বিড়বিড় করল,
'শালা ত্যাড়ার ঘরের ত্যাড়া।'
শুদ্ধ ভাবলো, এই ত্যাড়ার সাথে কথা বলাই বেকার। একে অন্যভাবে সিধে করতে হবে। শুদ্ধ ইরফানকে আর কিছু বলল না। চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। উদ্দেশ্য ভার্সিটিতে রাখা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবে। শাহাবুদ্দীন আহমেদ নিজেদের মানুষের মতো হওয়ায় ঝামেলা হয় না কোনো ব্যাপারে। এজন্য-ই শুদ্ধ নির্দ্বিধায় নিরাপত্তা কন্ট্রোল রুমে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে।
শুদ্ধ এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও ভিডিওতে ইরফানের রিয়েকশন সাথে ইরফানের বলা কথাগুলো শুনে শব্দ করে হেসে ফেলে। খুব বুঝল, সময়টা অল্প হলেও ইরফান মাইরার ব্যাপারে ভীষণ পজেসিভ হয়ে গিয়েছে।
এরপর শুদ্ধ কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিটিমিটি হাসে, সাথে বিড়বিড় করে,
'এইবার আমি তোমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবো ইরফান সোনা। আমায় তুমি চেনো না!'