ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ স্মৃতি

৩য় পর্ব

লেখক: আরশি জাহান

 নিষিদ্ধ স্মৃতি

 লেখিকা :আরশি জাহান 
 পর্ব ৩
নীরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ডান হাত তখনও দরজার হাতলের ওপর, কিন্তু হাতটা যেন নিজের অজান্তেই কাঁপছিল। দরজার ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড আগেও যে কণ্ঠটা ভেসে এসেছিল, সেটি এখন আর শোনা যাচ্ছে না। শুধু নিস্তব্ধতা। এমন নিস্তব্ধতা, যার মধ্যে নিজের হৃদস্পন্দন পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যায়। নীরা ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল। তার মা করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে আতঙ্ক। কয়েক মুহূর্ত আগেও তিনি নীরাকে দরজা খুলতে নিষেধ করছিলেন, কিন্তু এখন যেন কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছেন না।
নীরা নিচু গলায় বলল, "মা, তুমি নীলার গলা শুনেছ?"
মা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
"আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি শুনেছ?"
মা এবার ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। তাঁর চোখে পানি জমে উঠেছে।
"হ্যাঁ।"
একটা শব্দই যেন নীরার বুকের ভেতর সবকিছু ওলটপালট করে দিল। এতক্ষণ সে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে হয়তো তার স্মৃতির কোনো ভুল, হয়তো তার মস্তিষ্ক তাকে পুরোনো কোনো শব্দ মনে করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তার মা-ও সেই কণ্ঠ শুনেছেন। তাহলে দরজার ওপাশে কে?
নীরা আবার দরজার দিকে তাকাল। "নীলা যদি সত্যিই এখানে থাকে?"
মা দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত ধরে ফেললেন। "চল। এখনই নিচে চল।"
"কিন্তু—"
"কোনো কিন্তু না।"
"তুমি এত বছর ধরে আমাকে মিথ্যা বলেছ কেন?"
মা থেমে গেলেন। তাঁর মুখে এমন একটা অসহায় ভাব ফুটে উঠল, যা নীরা আগে কখনো দেখেনি।
"সবকিছু তোকে বলার মতো ছিল না।"
"কেন?"
"কারণ কিছু সত্য জানার পর মানুষ আগের মতো থাকতে পারে না।"
নীরা মায়ের হাত ছাড়িয়ে নিল। "আমি আগের মতো থাকতেই চাই না। আমি জানতে চাই সেদিন কী হয়েছিল।"
মা কিছু বললেন না। নীরা আবার দরজার দিকে তাকাল। এবার তার মনে হলো দরজার নিচ দিয়ে যে আলোটা বের হচ্ছিল, সেটা একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। যেন ভেতরের কেউ আলো নিভিয়ে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে খুব হালকা একটা শব্দ হলো।
"নীরা..."
সে জমে গেল।
কণ্ঠটা এবার আরও পরিষ্কার।
"তুই কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছিস?"
নীরার চোখে পানি চলে এল। সে জানে না কেন, কিন্তু সেই কণ্ঠ শুনলেই তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ জেগে উঠছে। যেন সে সত্যিই কাউকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল।
"নীলা?"
কোনো উত্তর এল না।
নীরা আবার বলল, "নীলা, তুমি ভেতরে আছ?"
দরজার ওপাশ থেকে এবার একটা মৃদু হাসি শোনা গেল।
"দরজাটা খুল। তারপর সব মনে পড়বে।"
নীরা হাতলটা ধরল।
মা পেছন থেকে বললেন, "না!"
নীরা থামল।
"মা, চাবিটা কোথায়?"
মা কিছু বললেন না।
"চাবিটা কোথায়?"
"তোর কাছে ছিল।"
নীরা অবাক হয়ে তাকাল। "আমার কাছে?"
"সেদিনও তোর কাছেই ছিল।"
নীরার মাথার ভেতর আবার একটা ঝলক এল। অন্ধকার ঘর। তার ছোট হাত। একটা পুরোনো পিতলের চাবি। পাশে দাঁড়িয়ে নীলা কাঁদছে। তারপর বাবা বলছেন, "নীরা, চাবিটা আমাকে দে।"
কিন্তু সে চাবি দেয়নি।
কেন দেয়নি?
এই প্রশ্নটা মাথায় আসতেই নীরার শরীর কেঁপে উঠল।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল দরজার পাশের দেয়ালে। সেখানে একটা ছোট কাঠের তাক। ধুলোর নিচে কিছু একটা চকচক করছে। নীরা এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে জিনিসটা তুলে নিল।
একটা চাবি।
পুরোনো পিতলের চাবি।
চাবিটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথার ভেতর যেন প্রচণ্ড শব্দ হলো। সে চোখ বন্ধ করতেই একটা দৃশ্য দেখতে পেল। দশ বছরের নীরা দৌড়ে করিডোর দিয়ে আসছে। তার হাতে এই একই চাবি। পেছনে নীলা চিৎকার করছে, "দিদি, আমাকে রেখে যাস না!"
নীরা চোখ খুলে ফেলল।
"দিদি?"
মা তাকিয়ে রইলেন।
"নীলা আমাকে দিদি বলত?"
মা উত্তর দিলেন না।
নীরা চাবিটা শক্ত করে ধরে বলল, "আমি ওর বড় বোন ছিলাম?"
"তোমরা যমজ ছিলে।"
"তাহলে ও আমাকে দিদি বলত কেন?"
মা এবার চুপ হয়ে গেলেন।
নীরা বুঝতে পারল, আরও একটা রহস্য লুকিয়ে আছে।
সে চাবিটা তালায় ঢোকাল।
মা এবার আর তাকে থামালেন না। শুধু কয়েক পা পেছনে সরে গেলেন।
চাবি ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে একটা ভারী শব্দ হলো।
ক্লিক।
দরজা খুলে গেল।
ঘরের ভেতর অন্ধকার।
নীরা প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না। তারপর জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলোয় ঘরের জিনিসগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। একটা পুরোনো কাঠের খাট। দেয়ালের পাশে বইয়ের তাক। একটা ভাঙা টেবিল। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা পুরোনো খেলনা। ঘরের মাঝখানে একটা ছোট গোল টেবিল, তার ওপর ধুলোয় ঢাকা একটা লণ্ঠন।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিল ঘরটা বহু বছর ধরে বন্ধ।
কিন্তু তারপর নীরার চোখ আটকে গেল খাটের ওপর।
সেখানে একটা সাদা চাদর বিছানো।
চাদরের ওপর রাখা একটা ছোট পুতুল।
নীরা পুতুলটা দেখেই থমকে গেল।
"এটা..."
সে ধীরে ধীরে খাটের কাছে গেল। পুতুলটা হাতে তুলে নিল। পুতুলটার একটা চোখ নেই। লাল পোশাক পরানো। মাথার চুল এলোমেলো।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—এই পুতুলটা সে নীলাকে দিয়েছিল।
দৃশ্যটা এত পরিষ্কার ছিল যে নীরার শরীর কেঁপে উঠল। ছোট্ট নীলা পুতুলটা হাতে নিয়ে হাসছে। নীরা বলছে, "এটার নাম রাখবি কী?"
নীলা বলছে, "রুবি।"
তারপর দুজনেই হাসছে।
নীরা পুতুলটা বুকে চেপে ধরল।
"মা..."
মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
"এটা নীলার পুতুল।"
মা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
"তাহলে এটা এখানে কীভাবে?"
মা উত্তর দিলেন না।
নীরা ঘরটা ভালো করে দেখতে শুরু করল। দেয়ালের একপাশে একটা পুরোনো আলমারি। সে দরজা খুলতেই ভেতর থেকে কিছু কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল। নীরা নিচু হয়ে কাগজগুলো তুলল।
বেশিরভাগই পুরোনো আঁকিবুঁকি।
দুই বোনের ছবি।
একটা বাড়ি।
একটা বড় গাছ।
আর একটা কালো দরজা।
কিন্তু শেষ ছবিটা দেখে নীরা থেমে গেল।
ছবিতে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। মুখ আঁকা হয়নি। শুধু কালো একটা অবয়ব।
ছবির নিচে শিশুসুলভ হাতের লেখায় লেখা—
**"ও আবার এসেছে।"**
নীরা ছবিটা মায়ের সামনে ধরল।
"ও কে?"
মা ছবিটা দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
"আমি জানি না।"
"মিথ্যা।"
"নীরা..."
"তুমি জানো।"
মা চুপ।
নীরা এবার আলমারির নিচের ড্রয়ার খুলল। সেখানে একটা পুরোনো ডায়েরি পাওয়া গেল। নীল রঙের মলাট। ধুলোয় ঢাকা। প্রথম পাতায় লেখা—
**নীলা রহমান।**
নীরার বুক ধক করে উঠল।
সে ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা সাধারণ। স্কুলের কথা, খেলাধুলার কথা, নীরার সঙ্গে ঝগড়া, মায়ের রান্না—সবকিছু। কিন্তু ২০১৬ সালের অক্টোবরের পাতায় এসে লেখাগুলো বদলে গেছে।
একটা পাতায় লেখা—
**"আজ আবার সেই লোকটাকে দেখলাম।"**
পরের পাতায়—
**"নীরা বলে কেউ নেই। কিন্তু আমি জানি সে আছে।"**
তারপর—
**"বাবা আমাকে বিশ্বাস করে না।"**
আর শেষের আগের পাতায়—
**"যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, তাহলে নীরা যেন উত্তর দিকের ঘরটা খুলে। সত্যিটা ওখানে আছে।"**
নীরা ডায়েরিটা শক্ত করে ধরে রইল।
"মা, বাবা কেন ওকে বিশ্বাস করত না?"
মা চুপ করে রইলেন।
নীরা শেষ পাতাটা খুলল।
পাতাটা প্রায় ফাঁকা।
শুধু মাঝখানে একটা বাক্য—
**"নীরা, তুই যদি এটা পড়িস, তাহলে বুঝবি—আমি তোর কাছেই আছি।"**
তার নিচে একটা তারিখ।
**১৭ অক্টোবর, ২০১৬।**
নীরা কিছুক্ষণ শব্দহীন দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ তার চোখ পড়ল ডায়েরির পেছনের মলাটে। সেখানে ছোট একটা পকেটের মতো অংশ। নীরা আঙুল ঢুকিয়ে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল।
কাগজ খুলতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল।
সেখানে একটা নাম লেখা।
**ডা. আরমান হোসেন।**
তার নিচে একটা ফোন নম্বর।
আর তার নিচে—
**"ওনার সঙ্গে কথা বলার আগে কাউকে বিশ্বাস করবি না। এমনকি..."**
বাকিটা কেটে দেওয়া।
নীরা মায়ের দিকে তাকাল।
"এই ডাক্তার কে?"
মা এবার সত্যিই ভেঙে পড়লেন।
তিনি ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লেন।
"ওই ডাক্তারই তোকে ২০১৬ সালের পর চিকিৎসা করেছিলেন।"
নীরা হতবাক।
"আমার memory loss?"
মা মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
"কেন হয়েছিল?"
মা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "কারণ তুই সেদিন রাতে এমন কিছু দেখেছিলি, যেটা তোর মনে থাকা উচিত ছিল না।"
নীরার বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলো।
"আমি কী দেখেছিলাম?"
মা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে হঠাৎ একটা শব্দ হলো।
কেউ যেন প্রধান দরজায় আঘাত করল।
একবার।
দুবার।
তারপর তিনবার।
মা উঠে দাঁড়ালেন।
নীরা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে কেউ এসেছে।
কিন্তু এই বাড়ির ঠিকানা জানে এমন মানুষ খুব কম।
মা ফিসফিস করে বললেন, "আমরা একা আসিনি।"
নীরা কিছু বলল না।
দরজার বাইরে থেকে এবার একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
"নীরা রহমান?"
নীরা মায়ের দিকে তাকাল।
লোকটা আবার বলল,
"আমি ডা. আরমান হোসেন।"
নীরার হাতে ধরা নীলার ডায়েরি হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার পেছনের বন্ধ ঘরের দরজাটা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
**চলবে...**

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন