ফন্ট সাইজ:
থিম:
মনের রঙে তুমি

১ম পর্ব

লেখক: সুমনা সাথী

' ড. আহির ইবনান মীরকে বিয়ে করতে অনীহার কারণটা জানালে ভালো হতো, ম্যাডাম।? আমি কোনদিক দিয়ে খারাপ? '

সামনে বসা মেয়েটার উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল আহির। অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এলো,

' আসলে আপনি বড় ভালো মানুষ ডাক্তার। ভদ্র, শিক্ষিত, গুডলুকিং তার উপর একজন নামকরা ডাক্তার। কিন্তু আপনি একদমই আমার ধাঁচের নন। বরং আপনি যদি আমার পুরোটা জানতেন তাহলে নিজেই এই বিয়েটা ভেঙে দিতেন। তাই ভাবলাম আগেভাগেই জানিয়ে দিই।'

আহির চোখ সরাল না। শান্ত স্বরে বলল,

' তা জানি না। কিন্তু কেন ভাঙতাম, বিষয়টা একটু খোলসা করবেন কি?'

' আপনি বয়সে পরিপক্ব, অভিজ্ঞ। আমি? আমি তো কেবল শুরু করেছি জীবনটাকে উপভোগ করতে। আপনি কি আমার মতো এক তরুণ, সরল, বেপরোয়া মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে মানিয়ে নিতে পারবেন? বরং আপনার মতো একজন সমাজসম্মানিত মানুষ, আমার মতো মেয়ের সঙ্গে ঘর করা কি আদৌ শোভনীয়?'

আহির কফিতে চুমুক দিল। চোখেমুখে নির্লিপ্ততা। সে আবারও বলল,

' আমি প্রেমে বিশ্বাস করি, কিন্তু একজনে নয়। এখন আমার পাঁচজন বয়ফ্রেন্ড আছে। এক্সের সংখ্যা অসজ্ঞায়িত। ভালোবাসা এখনকার সময় আর একক নয়, তা এখন গতি, তা এখন বিকল্প। এই বয়সে বিয়ে? তা তো স্বাধীনতার শবযাত্রা ছাড়া আর কিছু নয়! বিয়ের পরেও আপনি আমার সঙ্গে সুখে থাকবেন না। আমি হয়তো পালিয়ে যাব, হয়তো প্রাক্তনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে যাব। আপনি কি তা মেনে নিতে পারবেন? বলুন আপনার মতো সজ্জন মানুষের জন্য কি এমন এক উচ্ছৃঙ্খল, অনুশাসনহীন মেয়ের সঙ্গে জীবন কাটানো সাজে?'

আহির চুপ। মুখে উত্তাপের একরত্তি চিহ্নও নেই। কফির কাপে ঠোঁট ডুবিয়ে শুধু মথা নাড়ালো। বোঝালো আসলেই বোধহয় শোভা পায় না। মেয়েটা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। মুখে বিজয়িনীর হাসি। চোখে চাপা তৃপ্তি। বলল,

' ঠিক আছে, তাহলে আপনি ভাবুন আপনার কী করা উচিত। আমি যাই তাহলে। আশা করি আমাদের আর দেখা হবে না।'

সে চলে গেল। আহির কিছু বলল না। চুপ করে বসে রইল। শুধু তার ঠোঁটের এক প্রান্তে, এক আশ্চর্য হাসি জ্বলজ্বল করে উঠল।

---------------

রেস্তোরাঁর ঝুলন্ত বেলজিয়াম ল্যাম্পের নিচে এসে দাঁড়াতেই নুহা দেখতে পেলো, রাস্তার পাশে সাদা গাড়িটা অপেক্ষা করছে। চালকের আসনে বসে আছে আরোযা। সে দ্রুত পা ফেলে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। দরজাটা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তার আগেই আরোযার প্রশ্ন,

' কি রে নুহা? দেখা হলো? ফলাফল কী? বিয়েটা ভাঙছে তো নিশ্চয়?'

নুহা একটু হেসে তার চশমাটা আরোযার হাত থেকে নিয়ে চোখে পরলো। তারপর গ্লাভ বক্সের আয়নায় নিজেকে একবার দেখে চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে বেঁধে বলল,

' ভাঙবে নিশ্চয়ই। আমি যে খুব কিছু বলেছি, তা না। তবু যা বলেছি তাতেই কেমন যেন থমকে গিয়েছিল লোকটা। মুখে কথা আটকে গিয়েছিলো। বুঝলি তো, ভদ্রলোকদের একরকম নীরবতা থাকে, যা ওদের সম্মতিরই আলামত। অত ভাবিস না। তোর বিয়েটা আর হচ্ছে না। এখন আমাকে তাড়াতাড়ি আংকেলের বাড়ি নামিয়ে দে।'

আরোযা যেন বহু দিনের ভার নামিয়ে রেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। একটু হতাশ গলায় বলল,

' ধন্যবাদ রে সোনা। তুই না থাকলে যে আমার ভালোবাসাটা অপূর্ণ থেকে যেত। আব্বু তো এবারে জোর করেই বিয়ে দিতো।তবে একটা কথা, তুই কি সত্যিই আজ থেকে আর হোস্টেলে থাকবি না?'

নুহা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বাইরের আলো-ছায়ার খেলা। গাছের পাতার নড়ে ওঠা। সব কিছু তার কাছে অদ্ভুত রকম ভালো লাগে। নিচু গলায় বলল,

' আব্বুর সঙ্গে জেদ করেই হোস্টেলে উঠেছিলাম। সেই জেদে আমি হয়তো আমার জীবনের অর্ধেক শান্তিটুকু বিসর্জন দিয়েছি। চাচ্চু বললেন, তাঁর এক বন্ধু আছেন এই শহরেই তাঁর বাড়িতে আমার থাকার ব্যবস্থা করেছেন। আমি এখন থেকে ওখানেই থাকবো। তুই চল, আর দেরি করিস না।'

আরোযা কিছু বলল না। গাড়িটা ছুটে চলল...

-----------

সন্ধ্যার কুয়াশার ছায়া তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে চারপাশে। আহির বাড়ির দরজাটা খুলে সোজা ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসল। চোখেমুখে ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট। চোখে এক রকম অন্যমনস্কতা। বসতে বসতে বলল,

' আম্মু, এক কাপ কফি দাও তো।'

আরিফা বেগম কিছুক্ষণ পর তাড়াহুড়ো করে, কফির মগ হাতে করে এগিয়ে এলেন। মগটি ছেলের হাতে দিয়ে তার পাশেই বসে পড়লেন। মুখে একটু কৌতূহল জিজ্ঞেস করলেন,

' আহির, আরোযা'কে কেমন লাগলো তোর? পছন্দ হয়েছে তো?'

মায়ের কথার জবাব না দিয়ে, আহির মগে চুমুক দিতে গিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা হালকা ধাক্কা। কফির মগ হাত ফস্কে মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। চমকে উঠে নিচে তাকিয়ে দেখলো কফির ছিটে ছড়িয়ে গেছে। এই কান্ড কে ঘটলো তা বুঝার জন্য সামনে তাকাতেই দেখলো, সামনে দাঁড়িয়ে এক চেনা মুখ অথচ এই মুহূর্তে একেবারেই অপ্রত্যাশিত সেই মেয়েটি।

আহিরের চোখে চোখ পড়তেই নুহার চোখ নিচু হয়ে গেল। কেমন এক বিব্রত, কুণ্ঠিত মুখ। যেন নিজেই নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে চাইছে। আসলে, আহিরের ছোট ভাই আরোশের সঙ্গে খুনসুটি করতে গিয়ে নুহা অসাবধানে এসে ধাক্কা খেয়ে বসেছে। আর এখন সেই ছোট ভাইকে চোখেই দেখা যাচ্ছে না। নুহাকে ফেলে পালিয়েছে ছেলেটা। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে নুহা পেছনে ঘুরে যেতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই সময় গম্ভীর কণ্ঠে আহির বলল,

' স্টপ , এদিকে এসো।'

আরিফা বেগম একরকম শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। ছেলের মেজাজ তিনি চেনেন সামান্য উসকানিতেই আগুন হয়ে ওঠে সে। তাই তড়িঘড়ি বললেন,

' আহির, রাগ করিস না প্লিজ। মেয়েটা আমাদের অতিথি। ঢাকা এসেছে পড়াশোনার জন্য। হোস্টেলে কষ্ট হচ্ছিল তোর আব্বু বলেছেন ও আমাদের এখানেই থাকবে কিছুদিন। নুহা মা, এদিকে এসো।'

আহির যেন আবার একটু চমকে উঠল। এবার স্পষ্ট ধাক্কাটা শুধু মগে নয়, বুকেও বাজল। সে নিরব হয়ে গেল। নুহা পা ফেলে এগিয়ে এলো সামনে। মাথা নিচু। ঠোঁট কাঁপছে। চোখে লজ্জার ছায়া। একপ্রকার মাঠির নিচে ডুকে যেতে ইচ্ছে করছে তার। আরিফা বেগম পরিচয় করিয়ে দিলেন,

' নুহা, এ আমার বড় ছেলে আহির। আর আহির, ও নুহা।'

নুহা কাঁপা কণ্ঠে বলল,

' আসসালামু আলাইকুম। '

আহির মেয়েটার এই শোচনীয় অবস্থা দেখে বেশ মজা পেলো। যদিও পুরোটা সে বুঝতে পারেনি তবে কিছুটা বুঝেছে। শান্ত স্বরে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,

' দেখতে তো খুব ছোট মনে হচ্ছে না! তা মানুষকে কষ্ট দিলে বা কোনো ভুল করলে যে সরি বলতে হয় সেটা কি জানোনা?'

আরিফা বেগম নুহাকে কিছু বলতে না দিয়ে বললেন,

' আহির, কী বলছিস এসব! মেয়েটা তো ভয় পাচ্ছে।

নুহা, তুমি যাও। আহির, এখন বল তোর পছন্দ হলো তো আরোযাকে?'

নুহা পেছন ফিরে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু কথাটা কানে আসতেই পা হঠাৎ থমকে গেল। আহির খেয়াল করলো সেটা। মনে মনে কিছু একটা ভেবে ধীর কণ্ঠে বলল,

' আরোযাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে, আম্মু। আমি আরোয়াকেই বিয়ে করতে চাই। তুমি প্রস্তুতি নিতে শুরু করো। আমি উপরে যাচ্ছি। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। '

কথাটা যেন নুহার কানে নয় সোজা বুকের মধ্যে গিয়ে আঘাত করলো। এই লোকটা এমন অবলীলায় বলল কথাটা! এতকিছুর পরও? লোকটা কি কিছুই বোঝে না?

সে কি এতটাই নির্বোধ? নাকি... ইচ্ছাকৃত করছে?আরোযা'র জায়গায় তো আমি... আমাকেই তো সে দেখেছিল...তবুও! নুহা আর ভাবতে পারলো না। তার নিজের ওপরেই সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে । এমন একটা কাজ সে কেন করতে গেল? প্রিয় বান্ধবীর চোখের জল মুছাতে গিয়ে এত বড় একটা খেলা খেলল। মানুষের জীবনে উপকারই তো করতে চেয়েছিল। আর আজ... সেই নিজের জীবনই যেন তার সঙ্গে পরিহাস করছে।

আহির নুহাকে পাশ কাটিয়ে নির্লিপ্তভাবে চলে গেল। নুহার প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হলো। লোকটা কি বুঝেনি। এত নাটকের কি আছে। আর কাকে বিয়ে করবে এবার সরাসরি কথা বলতে হবে।

#নির্বাণের_পথে সিজন - ২

#লেখনীতে :সুমনা সাথী(শাঁকচুঁন্নি)

#সূচনা_পর্ব

পরের পর্ব থেকে এটার নাম হবে #মনের_রঙে_তুমি

-----------নোট: ভালো রেসপন্স না পেলে এই গল্পের পরের পর্ব আর আসবে না। আর যারা চৈত্রের গোধূলির অপেক্ষায় আছেন একটু ধর্য্য ধরুন এটা নিয়ে বিস্তারিত একটা পোস্ট দেব।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন