#মনের_রঙে_তুমি
#লেখনীতে:সুমনা সাথী
[০৬]
আহিরের ঘরের সামনে এসে থেমে গেল নুহা। ভিতরে প্রবেশ করতে কেমন যেন কুন্ঠাবোধ হচ্ছে তার।বুকের ভেতর কেমন যেন ভার ভার লাগছে। সেদিনের অপমানের কথা মনে করে, একবার দম নিয়ে দরজায় নক করল। কোনো সাড়া নেই। আরেকবার নক করে ও ভিতর থেকে কোনো আওয়াজ পাওয়া গেল না ।ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল আহির। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নুহাকে দেখে সে খানিকটা চমকে উঠল। নুহার চোখে চশমা, মাথায় ওড়না। চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে কেঁদেছে। নুহা কোনো কথা না বলে হাতে ধরা ব্যাগটা এগিয়ে দিল। আহির কপাল কুঁচকে বলল,
' কী?'
নুহা কোনো কথা বলল না। ব্যাগটা একইভাবে বাড়িয়ে রইল। আহির বিরক্তভাবে ব্যাগটা নিয়ে খুলে দেখল ভেতরে সেই শাড়ি, জুয়েলারি। একটু বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
' এইগুলো আমাকে দিচ্ছো কেন? আমি এগুলো দিয়ে কী করবো?'
নুহা স্বাভাবিক ভাবে বলল,
' আপনার ইচ্ছে।'
আহির একটু চুপ করে থেকে বলল,
' তোমার ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে আমি তোমার সাথে বিশাল অন্যায় করেছি। আর এগুলো তুমি রেখে দিতে পারতে। আমি কি শাড়ি,চুড়ি পরে বসে থাকবো?'
এইবার নুহার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
' হ্যাঁ, পারেন। পরে বসে থাকুন। আপনি এটারই যোগ্য! একটা মেয়েকে অচেনা একটা জায়গায় নতুন পরিবেশে কীভাবে একা ফেলে রেখে চলে যেতে পারেন? আপনি একজন ডাক্তার, তাই না? মানুষের শরীর বোঝেন, কিন্তু মন বোঝেন না! একটাও সরি বলার প্রয়োজন মনে করেননি?যদি আমার কিছু হয়ে যেত। আপনার ভিতরে কোনো দায়িত্ববোধ আছে? আর আপনার এক্স.....'
আহির ঠান্ডা গলায় বলল,
' তোমার কি মনে হয় আমি এতটাই ইরেসপন্সিবল, ইডিয়ট? কথায় কথায় অপমান করার অভ্যাসটা একটু বন্ধ করো, প্লিজ। তুমি গাড়িতে করে বান্ধবির সাথে চলে যাওয়ার পরেই ফিরেছি আমি!আর তোমাকে আগেও বলেছি মেয়েটা না তো আমার প্রেমিকা আর না তো আমার প্রাক্তন।'
নুহা মুখ ফিরিয়ে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করলো। বলল,
' সে যাই হোক, যদি ওই মেয়ে আপনার এক্স না-ই হয়, তাহলে আমাকে তার সামনে নকল হবু বউ সাজিয়ে নাটক করার মানেটা কী? অসভ্য, বেকার ডাক্তার সাহেব, আপনি নাট্যশালায় যোগ দিলে হয়তো আরও সফল হতেন!'
আহির মুখ ঘুরিয়ে একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
' সেটা তোমাকে বলতে বাধ্য নই। আমার শর্ত পূরন হয়েছে এটাই ফ্যাক্ট। হিসাব বরাবর। এইবার এগুলো নিয়ে যাও।'
আহির ব্যাগটা সামনে এগিয়ে ধরল। নুহা ব্যাগের দিকে না তাকিয়েই ধীরে ধীরে হাঁটা ধরল। পিছু ফিরে দেখলো ও না। যেতে যেতে একটা ঠাণ্ডা মন্তব্য ছুড়ে দিল,
' আপনার 'বউ'কে দিয়েন। যাকে আপনার মতো ফালতু, বেকার লোককে সহ্য করতে হবে।'
আহির খানিকক্ষণ চুপ থেকে নুহার যাওয়া দেখলো। ঘরের ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে চমৎকার হাসলো।
-------------
চারপাশে সন্ধ্যার আবরণ নেমে এসেছে। নিচতলার বসার ঘরটি রঙিন লাইটে আলোকিত। টুকটাক অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। আরোশের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে একটা প্রাণবন্ত আমেজ। নুহা ও এখন বেশ খুশি। তার মন খারাপ বেশিক্ষণ থাকেনা। আসলে সে মন খারাপ রাখা পছন্দ করেনা। নুহার ধারনা এত বড় পৃথিবীতে সবার সবকিছু থাকবে এমনতো কোনো কথা নেই, কিছু কিছু অপূর্ণতা নিয়েও জীবনটাকে সুন্দর মতো উপভোগ করা যায়। নুহা আজকে একটা মেরুন রঙের গাউন পরেছে। মাথায় পরিপাটি করে মেরুন রং-এর ওড়না জড়ানো। আরোশের বন্ধুদের সঙ্গে মিশে গেছে এমনভাবে, যেন নুহা তাদেরই বয়সী। হাসছে, খেলছে, কথা বলছে। ছোটদের সাথেও কী সহজে মিশে যেতে পারে মেয়েটা দূর থেকে তাকিয়ে থাকা যে কেউ ভাবতে বাধ্য। আহির বসেছে তার বন্ধুদের সাথে। রোশান, আলিফ, আর নয়ন আহিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সবার মুখে গল্পের ফোয়ারা। নুহাকে দেখে হঠাৎ রোশান থমকে গেল। চমকে উঠে বলল,
' ভাই, ওই যে... ওই তো ওই মেয়েটা... মানে তুই কি ওকে সত্যিই বিয়ে করবি?'
আহির হালকা হেসে বলল,
' আরে না, আমাদের বাড়ির গেস্ট। একটা ছোট হেল্প করেছে এই আরকি।'
রোশান আহিরের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,
' মানে তোর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই?'
' নো ওয়ে।'
' কিন্তু সম্ভাবনা আছে, তাই না?'
' না রে ভাই, একেবারেই না।'
রোশানের চোখ চকচক করে উঠলো। আহিরের কাঁধে হাত রেখে মুখে সুন্দর একটা হাসি নিয়ে বলল,
' তাহলে ভাই, আমার একটা কাজ করে দে। একটু সেটিং করিয়ে দে। আমার হেব্বি পছন্দ হইছে মেয়েটারে!'
আহির বিরক্ত চোখে তাকালো। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
' তোর মাথা খারাপ হইছে রোশান! ও আমার থেকে অন্তত আট-নয় বছরের ছোট। ওইটুকু একটা মেয়েকে! তোর লজ্জা করে না। তাছাড়া, ওকে তুই পছন্দ করলি কখন?'
রোশান একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
' বয়স তো বড় ব্যাপার না। মনটা ভালো হলেই হয়। মেয়েটার একদম সাদামাটা সুন্দর আছে।কেমন যেন মায়াবী আর...'
আহির রোশনের কথা কেটে দিয়ে, রেশনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
' সাদামাটা বলছিস ঠিকই। তুই ওকে ভালো করে দেখেছিস। ভালো করে দেখ, ওর মতো মেয়ে তোর সাথে মানাবে না রে ভাই। দেখ, তুই ফর্সা, লম্বা, হ্যান্ডসাম। ও তেমন ফর্সা ও না । আর চোখে চশমা ও পরে। আমি দেখেছি চুলটাও তেমন লম্বা না। আর গ্রাম থেকে এসেছে ক্লাস, কালচার সবই আলাদা। আর বউ বরের কাঁধ অবধি না হলে মানায় বল! এই মেয়েটা তো তোর সমান লম্বা! তোর মতো ছেলের সাথে এমন মেয়ে? তুই মানলে ও আমি মানতে পারছি না। ওর সাথে তোকে একদমই মানাবে না। '
আহিরের কথায় রোশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর মৃদু মাথা নেড়ে বলল,
' তা তুই ভুল বলিসনি ভাই। আমি আগে ভাবিনি...আসলে আমিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। মেয়েটা আসলেই আহামরি সুন্দর না। কোথায় আমার মতো হ্যান্ডসাম ছেলে আর কোথায় ও... মানাবে না সত্যিই।'
পাশে বসে থাকা আলিফ আর নয়ন মুখ টিপে হাসছে। আলিফ বলল,
' ঠিকই বলছিস, একেবারে বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালার মতো লাগবে! তোর গলায় ওর ঝোলায় উচিত না।'
নয়ন বলল,
' আহির, তুই একটু ওকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দে না।
আহির উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
' ছাড় তো এখন। কেক কাটার টাইম হয়ে যাচ্ছে। চল।'
কেক কাটা শেষ হতেই ঘরজুড়ে হইচই পড়ে গেল। ছোটরা কেক মাখা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো যু'দ্ধ শুরু করে দিয়েছে। কেউ চোখে, কেউ গালে, কেউ কপালে কেক মেখে দিচ্ছে একে অপরকে। হাসির রোল উঠছে এখানে-ওখানে। নুহা একপাশে দাঁড়িয়ে, হাতে এক টুকরো কেক নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত মুখে তাকিয়ে আছে। তার মাথায় ঘুরছে একটা দুষ্টু চিন্তা। তায়েফ মীরের সাথে সে বাজি ধরেছে তার ওই রাগী,গম্ভীর বদমেজাজি বড় নাতিকে কেক মাখাতে হবে। কিন্তু এখন সমস্যা হলো সাহস। কেক মাখাতে গেলে যদি সবার সামনে অপমান করে? তার অহংকার তো আকাশচুম্বী। নুহার চোখ পড়ে আহিরের দিকে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আহির পরনে সাদা ইন করা শার্ট, কালো প্যান্ট, জেল দিয়ে চুল গুলো পরিপাটি করা। বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে, হালকা হাসি মুখে। মাঝে মাঝে কোল্ড ড্রিংকের গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে। পুরো ভঙ্গিতে একটা চৌম্বকিও আকর্ষণ। নুহা নিজের কপালে হাত ঠুকলো।সে কি এই লোকটাকে ভয় পাচ্ছে। একদমই না ভয় পাওয়ার কি আছে। নুহা এগিয়ে গেল। আহিরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হালকা গলায় বলল,
' এই যে আহির ভাই, একটু শুনুন তো!'
সবে কোল্ড ড্রিংসের গ্লাসে ঠোঁট ছুঁইয়েছে আহির, এমন সময় নুহার কণ্ঠ কানে যেতেই কোল্ড ড্রিংটা যেন ভুল পথে গলা দিয়ে চলে গেল। আহির হেঁচকি দিয়ে কাশতে লাগল। আলিফ তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে আহিরের পিঠে হাত দিতে দিতে বলল,
' সাবধানে ভাই, কি করছিস?'
আহির নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
' কি বললে তুমি?'
নুহা ঠোঁটে এক চিলতে হাসি টেনে বলল,
' বলছিলাম আপনার সাথে একটু দরকার ছিল। একটু আসবেন?'
আহির ভ্রু কুঁচকে বলল,
' এখানেই বলো। এরা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সমস্যা নেই। '
নুহা কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
' আপনি কিছু মনে করবেন না তো?'
আহির নুহার দিকে তাকালো। আহিরকে কিছু বলতে না দিয়ে নুহা পরবর্তী মুহূর্তেই এক ঝটকায় হাতে থাকা কেকটা দুহাত দিয়ে তুলে একেবারে আহিরের গালে চেপে মাখিয়ে দিলো। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। যেন কেউ হঠাৎ সবার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিয়েছে। আহির নিজের জায়গায় জমে গেলো। চোখ-মুখ স্থির। যেন কেউ তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে, অথচ চেয়ারটা ছিলই না। পরের মুহূর্তেই উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলো তায়েফ মীর। হাসতে হাসতে বললেন,
' দেখো দেখো! আমি বলেছিলাম না! আমার প্রেডিকশন কখনো ভুল হয় না! প্রাউড অফ ইউ নুহা!'
সবাই হেসে উঠলো। রোশান তো হাসতে হাসতে হেলে পড়েছে। আহির দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে রইলো হতবাক হয়ে। কিছু বলবে তার আগেই নুহা হেসে “সরি!” বলে সিঁড়ির দিকে ছুটে পালাতে লাগলো। পেছন থেকে আহিরের কণ্ঠ ভেসে এলো,
' ওই! দাঁড়াও! বলছি দাঁড়াও নুহা!'
তৎক্ষণাৎ আহিরও নুহার পেছনে দৌড়াতে লাগলো।
আরিফা বেগম, তায়েফ মীর সবাই আহিরকে ডাকছে, থামাতে বলছে। কিন্তু আহির শুনলো না। নুহা যেন প্রাণ হাতে করে দৌড়াচ্ছে। সে জানে, আহির তার ঠিক পেছনেই আছে। ধরা পড়লে এই লোকটা ঠিক কি করবে তা সে কল্পনাও করতে পারছে না! হৃদপিণ্ড যেন দৌড়ে তার আগেই সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে যেতে চাইছে করিডোরে এসে হঠাৎ থেমে গেল নুহা। পেছনে ফিরে তাকালো। না, আহির নেই। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে হাফ ছেড়ে বাঁচলো। আহির আসচ্ছে না দেখে নুহা খুশি খুশি আবারও নিচে নামার জন্য এগোতে গেল।সিঁড়ির দিকে এগোতেই আচমকা...আহির তার সামনে এসে দাঁড়ালো। নুহা ভূত দেখার মতো চমকে এক পা পিছিয়ে গেল। চোখে-মুখে আতঙ্কের ছায়া। আহিরের চোখে গম্ভীরতা। চোখ-মুখ শক্ত। মুখে কোনো কথা নেই। শুধু পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে নুহার চোখের দিকে। নুহা কাঁপা গলায় বলল,
' দেখুন… আমি সরি বলেছি... খবরদার! এক পা-ও এগুবেন না, বলে দিচ্ছি!'
আহির এক পা এগিয়ে এল। ঠান্ডাস্বরে বলল,
' এই সরিটা দিয়ে আমি কি করবো? আর এগোলেও কি করবে?'
নুহা তড়িঘড়ি করে আরো পেছালো,
' দেখুন, ভাল হচ্ছে না। আমি আপনাকে....'
নুহার কথার মাঝখানেই পা হড়কে গেল। শরীরটা পেছন দিকে ঝুঁকে গেল। নিচের দিকে ছিটকে যাচ্ছিল ঠিক তখনই আহির এসে তাকে ধরার চেষ্টা করলো। তবে ফল যা হবার তাই হলো। দুজনেই একসাথে পড়ে গেলো নিচে। আহির ঠিক সময়ে এক হাত নুহার মাথার পেছনে দিয়ে আঘাত আটকালো। নিজে পুরোটা গিয়ে পড়লো নুহার উপর। নুহা চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ নিয়েছে। চুল গুলো ছড়িয়ে আছে মুখজুড়ে। এক হাতে আহিরের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরেছে। আহির কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো নুহার মুখের দিকে। নুহা ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই আবিষ্কার করলো আহিরের মুখ একদম তার মুখের কাছে। চোখে চোখ রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নুহার দিকে। নুহা কিছু একটা বলার জন্য ঠোঁট খুলতে যাবে, তখনই আহির অদ্ভুত এক কাজ করলো। একহাত দিয়ে নিজের গাল থেকে একটু কেক তুলে নুহার ডান গালে লাগিয়ে দিলো। নুহা চোখ বন্ধ করে ফেললো হতচকিত হয়ে। আহির থামলো না। পূনরায় একই কাজ করলে এবার নুহার বাম গালেও কেক লাগিয়ে দিলো।একটুখানি কেক নুহার নাকের ডগায় ছোঁয়ালো। আহিরের ঠোঁটে চাপা হাসি। কাজটা শেষ করেই চুপচাপ উঠে গেল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
' আমার সাথে লাগতে এসো না, মেয়ে। এই বেকার ডাক্তারের সাথে লাগতে আসার ফলটা কেমন হয়, এখন নিশ্চয়ই বুঝেছো?'
[আমি কিন্তু নিয়মিত হচ্ছি, তাই আজকে সবার থেকে একটা করে টাইটানিক আকারের কমেন্ট আশা তো করতেই পারি]