#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_২
#লেখিকা_Esrat_Ety
হাসপাতালের করিডোরে একটা লম্বা ধরনের বেঞ্চিতে পা উঠিয়ে বসে আছে আলো। কিছুক্ষণ পরে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে দেয় সে। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা তার। ইচ্ছে করছে বাচ্চাদের মতো গলা ছেড়ে,হাত পা ছুড়ে কাঁদতে, কিন্তু এটা করা যাবে না। মা, দাদী, আয়াত,আজান তাকে দেখেই কিছুটা ভরসা পাচ্ছে। এখন যদি সেও ভেঙে পরে তবে তো সব ভেসে যাবে! দু'টো ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনও নেই যে তাদের ভরসায় সবাইকে ছেড়ে দিয়ে সে শোকপালন করবে।
"এই আপু।"
আয়াতের গলার আওয়াজ পেয়ে আলো মাথা তুলে তাকায়। আয়াতের দিকে তাকাতেই বুকটা হুহু করে ওঠে তার। কত প্রাণোচ্ছল ছেলে দুটোর মুখ শুকিয়ে কি হয়েছে ! সহ্য করা যাচ্ছে না এসব।
"আপু একটু ডাল পুরি এনেছিলাম কিনে। মুখে দেবে একটু?"
আলোর চোখ দুটো ভিজে উঠেছে। সবসময় বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকা ছেলেটা আজ খেয়াল রেখেছে বোন কিছু খায়নি। বোনকে খাওয়াতে হবে।
আলো একবার মাথা নাড়িয়ে না বলতে চেয়েও পারে না। ডালপুরির ঘ্রানে তার পেটের খিদে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সে হাত বাড়িয়ে প্যাকেট টা নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে খাবার টা। আয়াত চোখের চশমা খুলে চশমাটা পরিষ্কার করতে করতে বলে,"সত্যি করে বলো তো, কোথায় গিয়েছিলে? থানায়?
_না। ওখানে যাবো কোন দুঃখে? সব তো ইয়াসারের পা চাটা চামচা।
_তাহলে?
_তোর জেনে কাজ নেই। শোন না,আমায় একটু ওয়াশ রুমের কাছে নিয়ে যা।
আয়াত উঠে দাঁড়ায়। আলো আয়াতের পিছু পিছু যাচ্ছে। হঠাৎ করে সে বুঝতে পারলো লোকজন তাকে দেখছে,তার দিকেই তাকিয়ে আছে আগন্তুকরা , অস্বাভাবিক লাগছে আলোর কাছে ব্যাপারটা। আলো আয়াতকে বলে,"শোন না,আমার মুখে কি কিছু লেগে আছে দেখতো!"
_না আপু। কেনো?
আলো কিছু বলে না। হাঁটতে হাঁটতে ওয়েটিং রুমের কাছে এসে সে থমকে যায়। আয়াত মাথা ঘুরিয়ে চোখ বড়বড় করে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। ওয়েটিং রুমের বড় স্ক্রিনের টিভিতে সামিন ইয়াসারকে থাপ্পর মারার ভিডিওটি চোখে পরতেই সে স্তব্ধ হয়ে যায়। লোকজন হা করে দেখছে। প্রত্যেকটা লোকাল খবরের চ্যানেলে একই জিনিস দেখানো হচ্ছে। আলো হতভম্ব হয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে। আয়াত আতংকিত হয়ে তার বোনকে দেখতে থাকে, বিড়বিড় করে বলে,"আপু,এটা তো তুমি!"
আলো কোনো কথা না বলে আশেপাশে তাকায়। সবার দৃষ্টি টিভির দিকে। তাকে এখনো সম্ভবত ওয়েটিং রুমে বসে থাকা মানুষ গুলো দেখতে পায়নি। কেউ দেখে ফেলার আগেই আলো তড়িঘড়ি করে হ্যান্ডব্যাগ থেকে মাস্ক বের করে পরে নেয়। আয়াতের হাত ধরে দ্রুত ওখান থেকে আড়াল হয়ে যায়।
"আপু। তুমি এটা কি করলে ! ওই লোকটাকে কেনো চড় মারলে!"
_ওটা ওই লোকটার প্রাপ্য ছিলো।
_তাহলে এখন? এখন কি হবে। দেখলে প্রত্যেকটা চ্যানেলে তোমাকে দেখাচ্ছে। এই উটকো ঝামেলার মোকাবেলা কিভাবে করবে।
_যা হয় হোক। আমার আব্বুর গাঁয়ে হাত দিয়েছে। ওই লোকটাকে এর দাম দিতে হতোই। যে এই ভিডিওটি করেছে তাকে ধন্যবাদ দিতে হবে,ওই লোকটার মান সম্মান সব ধুলোয় মিশে যাক। বেশ হয়েছে। পশু একটা।
_কিন্তু আপু ও যদি তোমার কোনো ক্ষতি করে দেয়!
_নির্বাচনের আগে কিছূ করতে পারবে না ও। ওর হাত পা বেঁধে রেখেছে ওর ক্ষমতার প্রতি লোভ। আমার কিছু হলে সবাই ভাববে ও করিয়েছে। আমার মনে হয় না ও এই রিস্ক নিতে চাইবে। তোরা চিন্তা করিস না। কিচ্ছু হবে না আমার।
***
"পুরো নাম অদ্রিতা আলো। অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী, ইংরেজি বিভাগ, স্থানীয় মহিলা কলেজে পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে বেড়ায়। খুবই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একটা মেয়ে। সবার মুখে যেরকমটা শুনেছি তাতে মেয়েটিকে বেশ ভালোই মনে হয়েছে।"
_ভালো? ভালো না খারাপ তা দিয়ে আমার লাভ? আমি শুধু ওই মেয়ে টাকে শিক্ষা দিতে চাই।
চেঁচিয়ে কথাটি বলে সামিন ইয়াসার। তার সামনে বসে আছে তার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফুয়াদ।
সামিন বলতে থাকে,"মেয়ে মানুষের এতো ঔদ্ধত্য আমি নিতেই পারি না। ওই মেয়ের সাহস কি করে হয় ওর অহেতুক সন্দেহের বসে সামিন ইয়াসারের মুখোমুখি হওয়ার? আমি ওর বাপকে মেরেছি?
_একেবারে বাবার ফটোকপি আলো। প্রচন্ড দুঃসাহসী। তবে ওর জমজ দুটো ভাই আবার তেমন নয়। খুবই ভীতু প্রকৃতির। সদ্য এস.এস.সি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। দু'জনেই সাইন্সের স্টুডেন্ট, সৃষ্টি কোচিং সেন্টারে যায় নিয়মিত। চশমা পরে, সবসময় কাঁচুমাচু মুখ করে থাকে, একেবারে মায়ের দুধের খোকা টাইপ। দু'জনেই আলোর কলিজা।
_ওর ভাই দুটোর উপরেও নজর রাখবি।
ফুহাদ বলে,"একটু মাথা ঠান্ডা কর। আংকেলের কথা মতো মান হানির মামলা দিয়ে দে। নিজে কেনো জড়াতে চাইছিস ব্যাপারটায়? একটা ব্লান্ডার হয়ে গেলে পার্টি তোকে নমিনেশন দেবে?
_ওসব পরে দেখবো, এখন আমি শুধু আর শুধু ওই মেয়েটার ভোগান্তি দেখতে চাই। এই বত্রিশ বছরের জীবনে আমার নিজের মা কখনো আমার গায়ে হাত তোলেনি আর ঐ মেয়েটা সবার সামনে দাঁড়িয়ে......!
আর কিছু বলে না ইয়াসার। রাগ,ক্ষোভ, প্রতিহিংসার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ফুঁসছে সে।
ফুয়াদের ফোনে একটা ফোন আসে, সে ফোনটা রিসিভ করে "হু হা" আওয়াজ করে উত্তর দিয়ে ফোন রেখে দেয়। ইয়াসারের দিকে তাকিয়ে বলে,"আতাউর আলমের জ্ঞান ফিরেছে গতকাল রাতে। স্ত্রী কন্যা এখন হসপিটালেই আছে। তার জমজ ছেলে দুটো কোথাও বেড়িয়েছে।"
_দুটোকে আমার কাছে ধরে নিয়ে আয়।
_এখন?
_হু।
_ওদের দিয়ে কি করবি? বাচ্চা ছেলে। খুবই শান্ত এবং মেধাবী দুটি ছেলে।
ইয়াসার চোখ গরম করে ফুয়াদের দিকে তাকায়। ফুয়াদ ঘাবড়ে গিয়ে বলে,"লোক পাঠাচ্ছি!"
ফুয়াদ উঠে চলে যায়। ফুয়াদ চলে যেতেই ইলহাম ঘরে ঢোকে। সামিন ইয়াসার মাথা না তুলে বলে,"ফুল এনেছিস?"
_হ্যা,আনিয়ে রেখেছি। কিন্তু কেনো? এখন ফুল দিয়ে কি করবে?
_সাংবাদিক আতাউর আলমের জ্ঞান ফিরেছে। কাউকে দিয়ে আমার নাম করে পাঠিয়ে দে। রাজনীতির মাঠে শত্রু হলেও আমরা তো উভয়ই দেশের সেবায় নিয়োজিত। একটু সহমর্মিতা প্রকাশ করা উচিৎ।
ইলহাম সামিনের কথা শুনে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন ইয়াসার মৃদু হেসে বলে,"ছোটো ফোন করেছিলো।"
_কি বললো?
_বারবার বলেছে কোনো ঝামেলা না করতে এটা নিয়ে।
_ও বরাবর ভীতু,ছেলেটার কিচ্ছু হবে না ভাইয়া। বাবা শুধু শুধু ওকে অপছন্দ করে না। বাবার তিন ছেলের মধ্যে বাবার কাছে ও সবচেয়ে বেশি অযোগ্য।
সামিন শুকনো হাসি হাসে। বাবা পছন্দ না করলেও সামিনের কাছে তার ছোট্ট ভাইটা তার কলিজা। ভাইয়ের জন্য জান দিতেও সর্বদা প্রস্তুত থাকে সে। অথচ এই ভাইটাই বুঝতে চায় না। অভিমানে তাদের থেকে কতটা দূরে সরে গিয়েছে।
লিভিং রুমে কান্নাকাটির আওয়াজ কানে যেতেই ইলহাম এবং সামিন ইয়াসার উঠে দাঁড়ায়। কাঁদছে ইলহামের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ইহান। তার পাশে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ইলহামের স্ত্রী রিতু। তাকে আটকানোর চেষ্টা করছে ইশিতা,সামিন ইয়াসারের একমাত্র ছোটো বোন। রিতুকে আটকানো যাচ্ছে না,সে ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছে ইহানের উপর।
"হচ্ছে টা কি এখানে!"
গর্জে ওঠে ইলহাম। রিতু স্বামীর গলার আওয়াজ পেয়ে কিছুটা কেঁপে ওঠে।
ইলহাম লিভিং রুমের দিকে এগিয়ে যায়। তার পেছনে পেছনে যায় সামিন ইয়াসার। বড়বাবাকে দেখে ইহান দৌড়ে এসে তার কোলে উঠে যায়। সামিন ইয়াসারকে সে বড় বাবা বলে ডাকে। সামিন ইহানের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে রিতুর দিকে চায়, কপাল কুঁচকে বলে,"ওকে মারছো কেনো রিতু?"
স্বামী আর ভাসুর দু'জনকে দেখে রিতুর আত্মারাম খাঁচাছাড়া অবস্থা। একটা ঢোক গিলে বলে,"ওর দাদার মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে সব টাকা ছিঁড়ে ফেলেছে, সবগুলো একহাজার টাকার নোট ছিলো ভাইয়া।"
ইলহাম রিতুর দিকে তেড়ে যায়,"তো? তোর বাপের টাকা ছিঁড়েছে ফকিন্নির বাচ্চা?"
রিতু ইশিতার পেছনে লুকায়। ইশিতা রিতুকে আগলে নিয়ে ইলহামকে বলে,"এখন তুমি সিনক্রিয়েট করো না ভাইয়া প্লিজ।"
সামিন ইয়াসার ঠান্ডা গলায় বলে,"টাকা ছিঁড়েছে বলে ওকে মারবে তুমি? কত টাকা ছিঁড়েছে? পাঁচ হাজার? দশ হাজার? ভবিষ্যতে আমার ভাইপোর গাঁয়ে হাত তুললে তোমাকে শাস্তি পেতে হবে রিতু। এখন যাও এখান থেকে, আমি ইহানকে নিয়ে বাগানে যাচ্ছি।"
তারপর ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,"চলো চাচ্চু। ফুটবল খেলবো আমরা।"
সামিন ইয়াসার ইহানকে নিয়ে চলে যায়। রিতু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দু'চোখ বেয়ে দুফোঁটা তরল গড়িয়ে পড়েছে তার। ইলহাম গলার আওয়াজ নিচু করে বলে,"অনেকদিন গাঁয়ে মার পরেনি তাইনা? তাই এতো বাড় বেড়েছিস। তোকে আজ বোঝাবো।"
গটগট করতে করতে চলে যায় ইলহাম। ইশিতা করুণ দৃষ্টি দিয়ে তার মেজো ভাবীকে দেখে। কি সুন্দর পুতুলের মতো দেখতে ২৩ বছরের মেয়েটা। সতেরো বছরে বিয়ে,আঠেরো বছরে বাচ্চা। স্বামীর ভালোবাসা তো দূরে থাক কখনো তুই তোকারি ছাড়া কথাই বলে না মেজো ভাইয়া। এতো সুন্দর,নরম মনের একটা মেয়ের সাথে কেউ কিভাবে এতো অমানবিক আচরণ করতে পারে! ইশিতা রিতুর গায়ে হাত রেখে বলে,"ভাবী।"
রিতু কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,"তুমি খুব ভাগ্যবতী আপু। তোমার বাপ ভাইদের কত টাকা দেখেছো? পাঁচ হাজার,দশ হাজার টাকা ছিঁড়ে ফেললেও তাদের যায় আসে না। তুমি অনেক ভাগ্যবতী। তাদের টাকার অভাব নেই, তাই টাকার কষ্টে, মোটা টাকার মোহরানার বিনিময়ে তোমাকে তোমার বাপ ভাইয়েরা কোনো জানোয়ারের কাছে অন্তত বিয়ে দেবে না,আমার মতো অবস্থা হবে না তোমার। তুমি খুব ভাগ্যবতী আপু।
***
রেহেনা আক্তার মেয়ের দুই বাহু ঝাঁকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,"বল কেনো করলি এমনটা! বল।"
আলো চুপ করে আছে। রেহেনা কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে,"তোর বাবার এই অবস্থা। মাথার উপর শক্ত কোনো হাত নেই। কেনো জড়াতে গেলি এই ঝামেলায়,বল আমায়। এর পরিণাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে তুই জানিস? তোকে ওরা কি কি করতে পারে জানিস?"
_এতো কিছু জানার দরকার নেই আমার। চড় মেরেছি বেশ করেছি। ওকে জুতা দিয়ে মারা উচিৎ ছিলো।
রেহেনা মেয়ের কথা শুনে বলে,"তোর বাবার মাত্র জ্ঞান ফিরেছে। সে সুস্থ হয়ে যদি জানতে পারে তার মেয়ে এতো বড় একটা কান্ড ঘটিয়েছে কি হবে বুঝতে পারছিস?"
_বাবা আমাকে বাহবা দেবে।
রেহেনা আহত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আলো গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পরে। আতাউর আলমের জ্ঞান ফিরেছে। যেটুকু স্বস্তি পাওয়ার কথা আলো তা পাচ্ছে না। সবাইকে না বুঝতে দিলেও ভেতরে ভেতরে সে খানিকটা ভয় পাচ্ছে। তবে তার নিজের জন্য না,আয়াত এবং আজানের জন্য। খুবই ভীত স্বভাবের ছেলে দুটো,ওরা বাইরের লোকজনকে ফেইস করবে কিভাবে! কিছুক্ষণ এসব কথা ভাবতে গিয়ে টের পায় তার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। এই দুদিনে মোটে এক-দু'ঘন্টার জন্য চোখের পাতা বন্ধ করেছিলো সে। ক্লান্তিতে তার পুরো শরীর ছেয়ে গিয়েছে। ফোনের রিংটোন বেজে উঠলে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার ক্লান্তি চলে যায়। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বলে ওঠে,"অদ্রিতা আলো।"
_শুনছি। বলো।
_কেনো করলে ওমন? একটু ঠান্ডা মাথায় থাকা যেতো না?
_বেশ করেছি । আরো করবো। জানোয়ারের বংশধর একটা।
ওপাশের ব্যক্তি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,"তুমি তো নিশ্চিত না কাজটা যে সামিন ইয়াসারের লোকই করেছে। কেনো সন্দেহের বশে অহেতুক ঝামেলায় জরালে? যতটুকু তাদের সম্পর্কে জানি তাতে মনে হয়না তারা কাজটা করবে।"
আলো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"কি বলো তো ইশমাম? তোমাকে সবসময় দেখেছি তুমি ওই মির্জা বাড়ির লোকজন আর ওদের পার্টিকে সাপোর্ট করে কথা বলো। একটা কথা বলো তো,তুমি কি ওই দলের ছেলে নাকি? ওদের পার্টির সমর্থক?"
ইশমাম ফোনের ওপাশে বসে একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলে,"কি যে বলো না অদ্রিতা, আমি বিদেশে থেকে দেশীয় পলিটিক্স করবো?"
আলো কিছু বলে না। ইশমাম বলে,"আচ্ছা ঠিকাছে। সামিন ইয়াসার এবং তার চৌদ্দ গুষ্টি খারাপ,খুউউব খারাপ। খুশি?
আমার তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছে অদ্রিতা। আর ওই সামিন ইয়াসারের সাথে লাগতে যেও না। আংকেলের এই অবস্থা! তুমি প্লিজ সেইফ থাকো। পরিবারের জন্য সেইফ থাকো,আমার জন্য সেইফ থাকো!"
শেষের কথাটা শুনে আলো পুলকিত হয়। শুকনো মুখে হাসির রেখা ফোটে। ইশমাম ওপাশ থেকে বলে,"লাভ ইউ!"
আলো অস্ফুট স্বরে জবাব দেয়,
_মি টু।
"আপু বাবা চোখ খুলে তাকিয়েছে। দেখবে না?"
আজানের কথায় আলো ফোন রেখে এক লাফে উঠে দাঁড়ায়। দৌড়ে গিয়ে দরজা ঠেলে আতাউর আলমের কেবিনে ঢুকে পরে। আতাউর আলমের মাথার কাছে রেহেনা বসে আছে। স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে তিনি। আলো ধীরপায়ে হেটে গিয়ে গিয়ে আতাউর আলমের পায়ের কাছে দাড়ায়। আতাউর আলম তার আদরের বড় মেয়ের মুখের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে। মুখে খানিকটা চেষ্টা করলো হাসি ফুটিয়ে তুলতে কিন্তু সে ব্যর্থ হলো। তীব্র যন্ত্রনায় শরীরটা বিষিয়ে উঠেছে। আলো মৃদু স্বরে বলে,"খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না আব্বু!"
_না আম্মু। একটুও ব্যথা করছে না।
_ওই লোকটাকে আমি উচিত শিক্ষা দিয়েছি আব্বু।
আতাউর আলম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"কাকে?"
_সামিন ইয়াসার মির্জাকে। ওর অকাদ বুঝিয়ে দিয়েছি। ও এখন হারে হারে টের পাচ্ছে।
আতাউর আলম কিছু বুঝতে পারছে না।
আলো ম্লান হেসে বেডে বসে বাবার হাতটা টেনে নিজের কোলের উপর রাখে। আতাউর মেয়েকে দেখতে থাকে,মুখ শুকিয়ে কি হাল হয়েছে মেয়েটার! আলো বলতে থাকে,"তুমি খুব শিগগিরই সেরে উঠবে আব্বু। তারপর ইলেকশনে লড়বে। দেখি কে তোমাকে আটকায়।"
রেহেনা আতংকিত হয়ে বলে,"পাগল হয়েছিস তুই? কিসব উল্টো পাল্টা বকছিস এই সময়ে।"
_আহা। ওকে বকছো কেনো? ঠিকই তো বলেছে। আমি এতো সহজে হার মেনে নিয়ে বসে থাকবো নাকি!
অত্যন্ত ক্ষীণ কন্ঠে বলে আতাউর আলম। রেহেনা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে অভিমানী সুরে বলে ওঠে,"ক্রাইম রিপোর্টারের স্ত্রী হয়ে পাপ করেছি পাপ। প্রতিনিয়ত সন্তানদের বিপদের কথা,স্বামীর বিপদের কথা ভেবে ভয়ে তটস্থ হয়ে থেকেছি। শেষ বয়সে এসে রিপোর্টারের পেশা ছেড়ে এখন রাজনীতির ভুত মাথায় চেপেছে তাইনা? দেখলে তো ফল কি হলো? একটুর জন্য তোমার স্ত্রী বিধবা, তোমার মা সন্তান হারা আর তোমার তিন ছেলেমেয়ে এতিম হয়নি। আর যদি কখনো এসবে জরিয়েছো তাহলে আমি কিন্তু এই সংসার ছেড়ে চলে......"
"ম্যাম পেশেন্টের সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে।"
নার্সের কথায় আলো মাথা ঘুরিয়ে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকায়। কে দেখা করতে আসবে এখন!
রেহেনা বলে,"কে এসেছে?"
"আমরা।"
অচেনা পুরুষালি গলার আওয়াজ পেয়ে রেহেনা মাথায় ঘোমটা তুলে দেয়। আলো উঠে দাঁড়িয়ে যায়। পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢোকে দুজন ছেলে। আলো হতভম্ব হয়ে চোখ কপালে তুলে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলতে থাকে। এই দুজনের একজনকে সে চেনে। জামিল নাম লোকটার,সামিন ইয়াসারের ডানহাত। লোকটার হাতে একটা ফুলের তোড়া। আলো রেগেমেগে বলে,"আপনারা!"
জামিল ফুলের তোড়াটা আতাউর আলমের বেডের উপর রেখে বলে,"ইয়াসার ভাই পাঠিয়েছে। আপনার বাবা জলদি জলদি সুস্থ হয়ে যাক,এই কামনা করে সে।"
আলো একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ফুলের তোড়াটা ঠেলে মেঝেতে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে কুচলে দেয়। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে,"বেড়িয়ে যান। আর আপনার ইয়াসার ভাইকে বলে দিবেন এসব নাটক আমাদের সাথে না করে জনগণের সামনে গিয়ে করতে, দুয়েকটা ভোট পেলেও পেতে পারে।"
জামিল শীতল চোখে একবার আলো আর একবার মেঝেতে পরে থাকা ফুলের তোড়া টার দিকে তাকায়। তারপর কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
আলো মাথা ঘুরিয়ে বাবাকে দেখে, তারপর নিচু গলায় বলে,"তেলাপোকা কতগুলো!"
আতাউর আলম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমার বাঘের বাচ্চা।"
আলো বাবার মাথার কাছে বসে পরে, বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলে,"হুম,আর তুমি বাঘ!"
_তা তোমার মেনি বিড়াল ভাই দু'টো কোথায় গিয়েছে?
_ওদের কোচিং-এ পাঠিয়ে দিয়েছি আব্বু। বেশ কয়েকদিন ধরে যায়নি।
_ভালো করেছিস।
বাপ-বেটিতে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আলোর ফোনের রিংটোন বেজে উঠতেই আলো সেদিকে তাকায়। আজানের ফোন, আলো রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে আজান বলে ওঠে,"আপু।"
চলমান.......