#নিশীথের_ছায়া
#পর্ব_১০
#রুহানী_ইসমাত
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। নায়রা অনেকক্ষণ আগেই বাসায় ফিরেছে। রুজিনা খান নিহানকে পড়তে বসিয়েছিল, তাই সে বেশি কথা না বলে নিজের রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিচ্ছে। ঘরের আলো নিভিয়ে শুধু জানালার পর্দাটা সরিয়ে রেখেছে নায়রা। বাইরে কুয়াশায় ভেজা বাতাসে টিউলিপ ফুলের গন্ধটা যেন আবার ভেসে বেড়াচ্ছে। কারণ ফুলগুলো সে সাথে করেই এনেছে। সায়ানের এই ফুল দেয়ার ব্যাপারটা খুব ভাবাচ্ছে নায়রা কে। কীভাবে টিউলিপ ফুল পেলো সে? আর কেনই বা এতো চেনা মনে হচ্ছে সায়ানকে তার। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় সায়ানের 'টিউলিপ' বলে ডাকাটা নায়রার কাছে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে! এই শব্দটা বারবার কানে বাজছে। কে এই লোক? এত আপন করে কেন বললো? নায়রার মন যেন এক অদ্ভুত ঘূর্ণিতে আটকে গেছে।
কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা। রুজিনা খান, নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
'ঘুমাসনি এখনো?
নায়রা মুখ তুলে তাকায়,
'না মা, ঘুম আসছে না।
মা হালকা হাসে, এসে বিছানার ধারে বসে পড়ে।
'বুঝতে পারছি, প্রথম ব্লাইন্ড ডেট বলে কথা। মেয়ের মুখে হালকা লজ্জা থাকবে ভেবেছিলাম, দেখি মুখটা বরফের মতো ঠান্ডা।
'মা, আমি লজ্জা পাই না, আমি observe করি।
'ওমা! observation-ও শুরু হয়ে গেছে!তাহলে observation report দে দেখি, কেমন ছিল ছেলে?
নায়রা একটু চুপ করে, তারপর বলে,
'ভালো ছিল। ভদ্র, স্মার্ট, একটু বেশি confident।
'তারপর?
'মানে... এমনভাবে কথা বলে, মনে হয় ওর সব জানা। এমনকি আমি কোন ফুল পছন্দ করি তাও! তুমিও জানো না, আমি টিউলিপ ফুল পছন্দ করি। কিন্তু সে কীভাবে জানলো?
রুজিনা খান হেসে ফেলে,
'ওহ, তাই নাকি? তাহলে তো ভাগ্য খুলে গেছে আমাদের মেয়ের!
নায়রা চোখ উল্টায়,
'মা, তুমি মজা করো না তো। আসলেই অদ্ভুত ছিল উনি। মনে হচ্ছিল আগে কোথাও দেখেছি।
'হয়তো মুখের ভঙ্গি কারো সাথে মিলে গেছে। মনটা শান্ত করো, সবসময় এমন ভাবনা ভালো না।
নায়রা মাথা নাড়ে, কিন্তু তার মন বলে,
'না, শুধু মুখ না, তার চোখ… সেই চোখ আমি কোথায় যেন দেখেছি…'
.
.
.
.
.
এদিকে সায়ান নায়রাকে নামিয়ে দিয়ে আবার অফিসে গিয়েছিল। তার মনটা ভালো হয়েও কেন জানি ভালো হচ্ছে না। সেই একটা কথা মাথায় ঘুরছে,
'টিউলিপের জীবনে কী কেউ রয়েছে?
কথাটা তার মনে আসছে শুধু, সে সব মেনে নিলেও নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে অন্য কোনো পুরুষকে মেনে নেয়া কি সহজ? সায়ান, চৌধুরী নিবাসে পৌছে প্রায় একটার দিকে। ভেতরে ঢুকেই দেখতে পারে একজন বসে আছে ডাইনিংএ, তার বুঝতে বাকি নেই এটা তার ফুপি সালমা চৌধুরী। বাড়িতে নিজের বাবার পরে এই একটা মাত্র মানুষ তার জন্য এতো ভাবে, এতো ভালোবাসে। নিজের সৎ বোন আলিয়াও সায়ানকে খুব ভালোবাসে কিন্তু মায়ের জন্য কিছু করতে পারে না। সালমা চৌধুরী এই বাড়তেই থাকে, কিন্তু অনেক কথাও শুনতে হয় নিজের ভাইয়ের বউয়ের কাছ থেকে। কিন্তু সায়ানের সামনে আর মি. চৌধুরীর সামনে কেউ কিছু বলতে পারে না।
সায়ান এগিয়ে যায় ফুপির কাছে, বুঝতে পারে তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গেছে। সে আলতো করে সালমা চৌধুরীর মাথায় হাত রাখে, উনার ঘুম ভেঙে যায়। স্থির গলায় বলে,
'রাত কয়টা বাজে সায়ান?
'একটা হবে।
'এতো রাত পর্যন্ত বাইরে ছিলে কেন?
'ফুপি আজকে তোমার বউমার সাথে দেখা করেছি, জানোই তো।
'হুম, কিন্তু সেটা তো সন্ধ্যার পরেই শেষ। এতোক্ষণ তুমি অফিসে ছিলে, কেন? কতবছর পর দেশে ফিরেছো এখনো বাইরেই থাকতে চাও?
সায়ান হাসে।
'তুমি তো গোয়েন্দা থেকে কম নও, ফুপি। আচ্ছা, আর লেট করে আসবো না।
'মনে যাতে থাকে। আর কেমন ছিলো, নায়রার সাথে কাটানো সময়?
মুখটা কিছুটা মলিন হয় সায়ানের।
'ফুপি, ও অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি আমার পুরোনো টিউলিপকে পেলাম না। আমাকে ওর মনেই নেই, আর আমার মনে হয় ওর জীবনে কেউ আছে।
সালমা বুঝতে পারে সায়ানের কথা। মাথায় হাত রেখে বলে,
'ও আমাদের কাউকেই মনে রাখেনি, সায়ান। পুরনো সব স্মৃতি মুছে গেছে। কিন্তু কি আর করার! আমরা সবাই নতুন করে ওকে আপন করে নিবো। কিন্তু চিন্তা তো ভাবীকে নিয়ে, কখন কি বলে দিবে।
'এটা নিয়ে ভেবো না, ফুপি। উনাকে আমার টিউলিপই শায়েস্তা করবে, দেখে নিও।
দুজনেই হেসে দেয়, গল্প করতে থাকে। সায়ান সব কথা একমাত্র সালমাকেই বলে। এমনকি যেসব কথা নিজের বাবাকে বলতে পারে না, তাও ফুপির সাথে বলতে পারে। সালমা চৌধুরীর বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছরের মতো, কিন্তু এখনো তিনি দেখতে খুব সুন্দর। নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিয়ের দুদিন আগে লোকটা হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। অনেকেই বলেছিল হয়তো মারা গেছে। আর সালমা.. সে তো মনে মনে ঠিক করে রেখেছে কখনো বিয়ে করবে না, তার ভালোবাসা এতো কম না যে সে এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে নিজের ভালোবাসাকে। সে থেকে সালমা আর বিয়ে করেনি, ভাই ভালো হওয়ায় তার বাড়িতেই থাকছেন।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
পরেরদিন সকালে। নায়রা এখনো ঘুমাচ্ছে, হঠাৎ ফোন বেজে উঠে। নায়রা স্কিনে তাকিয়ে দেখে 'Incoming Call: Meera'
নায়রা কল ধরে, কণ্ঠে ঘুমঘুম ভাব।
'কি রে, সকাল সকাল?
মীরা হাসে,
'ডেটের রিপোর্ট না দিলে ঘুম ভাঙবে কেমন করে বল?
নায়রা হেসে বলে,
'তুইও না, CID এর মতো প্রশ্ন করিস।
'তাহলে উত্তর দে, handsome ছিল?
'ছিল।
'মজার?
'কিছুটা।
'তাহলে কেন গলায় excitement নাই?
নায়রা একটু থেমে, জানালার দিকে তাকায়,
'কারণ বুঝতে পারছি না, তাকে দেখে আমার মন খারাপ হয়েছে।
'মন খারাপ মানে?
'জানি না মীরা… মনে হচ্ছিল তার চোখদুটো আমি কোথাও দেখেছি। একদম সেই রকম, যেমন…
মীরা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
'যেমন কার?
নায়রা থেমে যায়।
হয়তো বলতে চায় কেউ কাছের, খুব কাছের। কিন্তু গলায় শব্দ আটকে যায়।
'যেমন একটা পুরনো স্মৃতি, উনাকে অনেক পরিচিত মনে হলো।
ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মীরা বলে,
'নায়রা, তুই আবার ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিস। মানুষটা ভালো, সেটাই যথেষ্ট এখন। এতোকিছু ভাবিস না।
নায়রা শুধু হালকা হাসে,
'ভালো… হ্যাঁ, ভালোই তো।
তার দৃষ্টি চলে যায় জানালার পাশে টেবলের উপর। যার উপর রাখা টিউলিপ ফুলগুলো। এখনো তাজা, ঠিক আগের রাতের মতোই…। কিছু কথা বলার পর নায়রা কল কেটে দেয়।
নায়রার বুঝতে পারলো, লোকটাকে দেখার পর বীরের কথা মনে পরছে না তেমন। ব্যাপার টা ভালো লাগছে। কারণ সে চায় বা এমন দুশ্চরিত্র, লম্পট, কাপুরুষের কথা মনে করতে। কিন্তু তার মনে শুধু একটাই কথা, সেই লোকটার চোখগুলো... কেনো এতো চেনা! মনে মনে আওড়ালো,
'মি. সায়ান চৌধুরী।
চলবে....