অদ্বিতীয়ার_ঘর
পর্ব_|০২|
লেখনীতে:ঈশিতা_ইশা
________________
রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হালকা আলো এসে পড়ছে। আমি কড়াইয়ে তেল গরম করছি। পিয়াজ কেটে গরম তেল এ দিতেই ছ্যাৎ করে শব্দ হয়। বিরক্ত হয়ে ধুয়ে রাখা আলু কুচি সদ্য গরম হওয়া তেল এ ঢেলে দেই। এরপর একে একে কাঁচামরিচ, লবণ সব ঢেলে দিচ্ছি একসাথে, কোনো নিয়ম মানছি না আজ।
নাশতা বানাতে বানাতে আমার হাত থেমে যায় এক মুহূর্ত। রুটি বেলা থামিয়ে তাকাই জানালার বাইরে। একটা কাক বসে আছে ঠিক সামনেই। কাকটার ডানায় হয়তো কাঁটা লেগেছে, তাই ওড়তে পারছে না। আমিও তো পারছি না..ওড়তে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে মনোযোগ দেই।
শিউলি তখনো ঘুমিয়ে, ওর ছেলেটার শব্দ আসে ভেতরের ঘর থেকে। বোধহয় ঘুম থেকে উঠে রুমের মধ্যেই খেলছে।
তানভীর কখন উঠে বেরিয়েছে জানি না। এখন অবধি ফেরেনি। সদর দরজা লক করা না দেখে টের পেয়েছি সে বেরিয়েছে।
হাতের কাজ সেরে বসে পড়ি টেবিলের একপাশে। চায়ের কাপ সামনে রেখে চুপ করে বসে থাকি কিছুক্ষণ। একবার মনে হলো, সব ছেড়ে এখনই বেরিয়ে যাই। এই বাড়ি, এই দেয়াল, এই সংসার সব পেছনে ফেলে।
কিন্তু তখনি রান্নাঘরের দরজায় একটা ছায়া পড়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি শাশুড়ি দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। তবুও ঠোঁটে মৃদু গম্ভীরতা।
'আজ মাংস আনবি বাজার থেকে? কাল তো শুক্রবার।'
জিজ্ঞেস করেন এমন ভঙ্গিতে যেন কিছুই হয়নি।
আমি মাথা নাড়ি,'জি আনবো।'
উনি আর কিছু বলেন না। চুপচাপ চলে যান।
এইভাবে যেন নতুন এক নাটকের শুরু হয়েছে, আমি জানি না স্ক্রিপ্টটা কে লিখেছে। বুঝতে পারছি আমিও এ নাটকের অংশ। তবে মূল চরিত্রে নাকি পার্শ্ব চরিত্রে তা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। হয়তো ডানা ভাঙা কাকের মতো আমার শেষ আশ্রয় স্থল এটা।
আমার শুধু মনে হয় আমি এখন ঠিক মা’র জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যাকে একদিন আমি স্বার্থপর ভেবে ঘৃণা করতাম। অথচ আজ বুঝতে পারি, সেই মা কতোটা একা ছিলেন। মা স্বার্থপরের মতো চলে গিয়েছিলেন নিজের হাতে সাজানো সংসার ফেলে কিন্তু আমি তা করবো না।
আজ নাস্তা টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে হঠাৎ শিউলি এসে বলে,
'তুমি রান্না করো ভালো। তানভীর আগে বলতো, লাবন্যর হাতের আলু ভাজি পরোটা খেতে খুব ভালো লাগে।'
আমি কিছু বলি না। শুধু একবার তার চোখে চোখ রাখি। এরপর মিষ্টি হাসি দেই। তার চোখে এখন জয়ের তৃপ্তি। আর ঠোঁটে অহংকারীর ঝলক। আর আমার চোখে হার না মানার গ্লানি।
.
বারান্দায় থাকা আমার আদর যত্নে টবে লাগানো গাছ গুলোতে পানি দিচ্ছিলাম সেই সময় শাশুড়ির উপস্থিতি টের পাই। দু'জনেই অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলাম। মৌনতায় কি খুঁজছিলাম জানি না তবে আমার কিছুই ছিলো না বলেই হয়তো কিছু হারানোর ভয় পাই না আমি। তবুও আজ শাশুড়ি যখন জিজ্ঞেস করলো,
'তুই থাকতে চাস, না চলে যেতে চাস লাবন্য?'
আমি চুপ করেছিলাম প্রথমে। কিছু কথা থাকে, মুখে বললেই হালকা লাগে না বরং বুকটা ভারি হয়ে ওঠে। তারপরও মুখ তুলে বললাম,
'আমার মায়ের ছিলো বাপের বাড়ি, সংসার ফেলে গেলে দু'বেলা খাবার আর মাথার উপর আশ্রয়ের একটা জায়গা ছিলো। আমার তো তাও নেই। এই ঘরেই আমি প্রথম কারো বউ হয়েছিলাম। প্রথম চা বানিয়েছিলাম, এই রান্নাঘরের ধোঁয়ার মধ্যে আমার প্রথম পরিচয় মিশে আছে। পুরো বাড়িতে আমার অস্তিত্ব মিশে আছে। আপনারা আমার আদর,ভালোবাসা দিয়েছে। চলে গেলে এসব কোথায় পাবো। তাছাড়া আমি যাবো কোথায়?'
কথাগুলো বলে থামি৷ ততক্ষণে শাশুড়ির চোখমুখ নরম হয়ে এসেছে।
'থাকবো, যদি থাকতে দেন। কিন্তু বলে দিচ্ছি নিজের অধিকার আমি আর ছাড়বো না। এ সংসার আমার। তানভীরের বড় বউ এর যেমন অধিকার আছে তেমনি আমারও অধিকার আছে। নিজ হাতে সাজানো গোছানো সংসার ছেড়ে কোথাও যাবো না।'
শাশুড়ির মুখে কোনো উত্তর ছিলো না। নীরবতা দিয়েই জানিয়ে দিলো আমি থাকলে, সে মেনে নেবে।
.
তানভীর বাজার করে ফিরলো। আমি এগিয়ে গেলাম তার দিকে 'ফিরছো?' বলার জন্য। তার আগেই সে মুখে কিছু না বলে শুধু বাজারের ব্যাগ এগিয়ে দিলো তারপর চলে গেলো পাশ কাটিয়ে। খেয়াল করলাম তার হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ। হয়তো বড় বউয়ের জন্য কিছু কিনে এনেছে। রুমে ঢুকতেই বাচ্চার উচ্ছ্বাসের শব্দ পেলাম। বাবা হয়তো তার জন্য এমন কিছু এনেছে যা পেয়ে সে বেশ খুশি৷ এর খানিকক্ষণ বাদেই শিউলির চাপা উত্তেজনার চিৎকার কানে আসে। সেই সাথে দু'টো শব্দ। 'মেরুন শাড়ি? আমার জন্য?'
আর কান না পেতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যাই। দুপুরের রান্নাটা তাড়াতাড়ি সারতে হবে। শত হলেও বাড়িতে অতিরিক্ত মানুষ যুক্ত হয়েছে।
নতুন বউ রান্নাঘরে যেতে চাইলো। তানভীর বললো,
'তুমি এখন বিশ্রাম নাও। রান্না করতে হবে না। লাবন্য সবটা সামলে নিবে।'
আমি কিছু বললাম না। ওদের কথাবার্তায় না আমার আগ্রহ আছে, না আছে অধিকার। নিজের মতো কাজ করতে লাগলাম।
ডালের মাঝে ফোড়ন দিচ্ছিলাম, ঝোলের কড়াইয়ে মাছ ছাড়ছিলাম। বাইরে থেকে বাচ্চা ছেলের হাসির শব্দ ভেসে এলো। উঁকি দিয়ে দেখি তানভীর খেলছে তার সাথে।
কেমন যেন একটা ব্যথা বুকের বাঁ পাশে চিনচিন করে উঠলো। আমি জানি, আমার কাঁদা উচিত না। কাঁদতে নেই এখন। নিজেকে বোঝাই আমি যে ছিলাম, সেই আমি এখনও আছি। আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম সে না থাকলেও আমি তো মরে যাইনি। ভালোবাসার মানুষ না থাকলে কেউ মরে না। একটা সময় তাকা ছাড়া বাঁচা শিখে যায়। সেখানে তানভীর আমার সামনেই আছে। ছুঁতে না পারি,জড়িয়ে ধরতে না পারি অন্তত দু-চোখ ভরে দেখতে তো পাবো!
.
ঘরের চাবিটা এখন শিউলির কাছে। বিগত তিনমাসে এ সংসারটা এখন হয়ে গেছে তার। তিনমাসে তিনি হয়ে উঠেছেন এ ঘরের কর্ত্রী। যেটা বিগত তিন বছরে আমি হয়ে উঠতে পারিনি।
রান্নাঘরের ধারে কাছে যেতে গেলেই গলা ওঠে, 'লাবন্য, পেঁয়াজগুলো পাতলা করে কেটে দাও তো..আরে এতো মোটা মোটা কেনো কাটছো? এমন না, আরেকটু চিকন করে..'
আগে আমার কাজ নিয়ে কারো কোনো রকম অভিযোগ ছিলো না। এখন পেঁয়াজ কীভাবে কাটতে হয়,ডাল কীভাবে রান্না করতে হয় সেটাও শিউলি আপা আমায় শিখিয়ে দেয়। আপা বললাম কারণ শিউলি আমার চেয়ে বয়সে গুনে গুনে পাঁচ বছরের বড়। এ বাড়িতে যেদিন সে পাকাপোক্ত ভাবে এসে উঠে তার পরের দিনই বলেছে তাকে যেনো আমি আপা ডাকি। একে বয়সে বড় তার উপরে এ বাড়ির বড় বউ সে।
আমার ননদ তানহার কাছ থেকে একদিন জেনেছিলাম, কলেজে পড়ার সময় তানভীর আর শিউলির প্রেম ছিলো। সেই রকম প্রেম যা গুটি কয়েক নয়, পুরো কলেজ জানতো। তারা একসাথে ক্লাস করত, একসাথে ক্যান্টিনে বসত, একে অপরের খাতা ভরে যেত ভালোবাসার শব্দে। তানভীর নাকি একবার কলেজ ম্যাগাজিনে শিউলিকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলো।শিরোনাম ছিলো 'আমার তুমি'।
তাদের সেই সম্পর্ক ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষকের মুখেও। কেউ কেউ মজার ছলে আবার কেউ কেউ ঈর্ষায় বলতো, 'এই দুইজন তো একসাথে জীবন পার করে দেবে।'
তানভীর সত্যিই চেয়েছিলো তাই। কলেজ শেষে বাড়িতে গিয়ে মা'কে জানায় শিউলির কথা। বলে, 'মা, আমি একজনকে ভালোবাসি। ওর নাম শিউলি। আমি ওকেই বিয়ে করতে চাই।'
কিন্তু শাশুড়ি তখন যেন আকাশ থেকে পড়েছিলেন। তার নিজের একটা স্বপ্ন ছিলো ছেলের বিয়েতে নিজের পছন্দের বউ আনবেন। এমন একজনকে আনবেন, যে হবে রূপে-গুণে ঠিক তার মনের মতো। শিউলির মতো সুন্দরীর রূপ দেখে তার মন ভরেনি। হয়তো শিউলির পরিবার, পোশাক, কথাবার্তা সব কিছুতেই আপত্তি ছিলো তার। শিউলির পরিবারও গ্রামে থাকতো আর শিউলি থাকতো মেয়েদের মেসে। পরিবার বিহীন একা একটা মেয়ে শহরে থাকে এতে শাশুড়ির আপত্তি ছিলো। সরাসরিই বলে দেন, 'ও মেয়েটাকে কখনোই আমার ঘরে বউ হিসেবে দেখতে চাই না।'
তানভীর প্রথমে অনেক চেষ্টা করেছিলো, বোঝাতে চেয়েছিলো। কিন্তু শাশুড়ি তখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি অনড় তার 'না' তে।
এই না-টা যে এতটা বিষাক্ত হতে পারে, আমি তখন জানতাম না।
তানহার মুখে শুনেছিলাম, এই 'না' শুনে একদিন শিউলি বাড়ি ফিরে গলায় ফাঁস দেয়ার চেষ্টা করে। সময়মতো ওর এক বান্ধবী গিয়ে বাঁচিয়ে ফেলে। হাসপাতালে নেওয়া হয়। সে সময় তানভীর ছুটে যায় শিউলির কাছে। ওর চোখে তখন শুধু ভয় আর অস্থিরতা প্রিয় মানুষটাকে হারানোর আশঙ্কায়।
সেই এক মুহূর্তেই তানভীর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কাউকে না জানিয়ে, মায়ের অনিচ্ছাকে অমান্য করে শিউলিকে নিয়ে সোজা চলে যায় কাজী অফিসে। সেদিন তাদের চুপিসারে বিয়ে হয়।
চার বছর আগে, যখন আমি ছিলাম এক অপরিচিত গ্রামে নিজের জগতে তখন তানভীর আর শিউলি একটা 'গোপন সংসার' শুরু করে ফেলেছিলো।
তানভীর বিয়ে করেছিলো, কিন্তু তার মা জানতেন না। না বললে ভুল হবে জানলেও মেনে নেননি।
আর তারপর?
তারপর তানভীর আমাকে বিয়ে করে। মায়ের পছন্দে, ঘর আলো করে 'বউ' হিসেবে ঢুকি আমি। অথচ তখনও শিউলি ছিলো। কাগজে কলমে তার আগেই তানভীরের জীবনভাগিনী।
আমি যখন প্রথম চা বানিয়ে এগিয়ে দিই তখন শিউলি হয়তো অনেক দূরে কোথাও বসে নিজের একাকিত্বে পুড়ছিলো। আমি যখন ঘর সাজাতাম, সংসার গোছাতাম, তখন ওর বুকেও হয়তো উঠতো ঘন কষ্টের ঢেউ।
তানভীরের জীবনে আমি কখনই প্রথম ছিলাম না এই কথাটা পরে জেনেছি। তবু ভালোবেসেছিলাম। কারণ মানুষ কখনও জেনেও নিজেকে ঠকাতে ভালবাসে।
.
একসময় এই রান্নাঘরের গন্ধে আমার অস্তিত্ব মিশে থাকত। এখন আমি শুধু শিউলির ফরমাশ খাটা একজন। তার মনমতো না হলে মুখ ভার করে রাখে। তানভীর কোনোদিন দেখেও কিছু বলে না।
তানহা যার সাথে সারাক্ষণ গল্পে মেতে থাকতাম সে এখন কলেজ থেকে ফিরেই সোজা শিউলির ঘরে ঢোকে। আমি থাকি রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট স্টোররুমে। কারণ তানহার নাকি পড়ায় ডিস্টার্ব হয়। একটা সময় ছিল, আমি আর তানহা রাতে একসাথে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম। এখন সে আমায় দেখে যেন চেনে না।
শাশুড়ি একসময় আমার পক্ষে ছিলেন। তানভীর কিছু বললে প্রতিবাদ করতেন। এখন শিউলির ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। হাঁসেন, খিলখিল করে হাসেন, ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,'আমার চোখের মণি।' আমার দিকে তাকান না, আমি যেন এ ঘরের বাতিল কোনো পুরোনো আসবাব।
তানভীর এখন আর আমার চোখের দিকে তাকায় না। আমি খেয়াল করি, সে এখন তার মোবাইলের স্ক্রিনে ডুবে থাকে বা ছেলেকে সময় দেয়। আমি পাশে দাঁড়ালেও যেন আমি নেই।
আরও একটা বিষয় প্রায় প্রতিদিন ঘটে শিউলি আমার সামনে তানভীরকে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখি সোফায় শিউলির কাঁধে মাথা রেখে তানভীর বসে আছে। মাঝে মাঝে ঠোঁটে ঠোঁটও রাখে। জানে আমি পাশের ঘরেই থাকি, দেখছি। হয়তো জেনেই করে। যেন বোঝাতে চায়, এই ঘর এখন তার। তানভীর এখন শুধুই তার।
একদিন সকালে তানভীর অফিসে যাবার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে শিউলি তাকে আঁকড়ে ধরেছিলো। সে বলল, 'আরেকটু থাকো না। যেতে দিতে ইচ্ছা করছে না।'
তানভীর হেসে বলল, 'বাচ্চার দিকে খেয়াল রেখো। দুপুরে ফিরেই আসবো।'
ওরা দু'জনের এমন খুনসুটি দেখেও আমি কোনোদিন কিছু বলিনি। কারণ এখন আমি কেউ না। এই ঘরের অলিখিত নিয়মে আমি অতীত। বাতিল এক মানুষ।
তানভীর কোনোদিন আমাকে 'তুমি খেয়েছো?' জিজ্ঞেসও করে না। মাঝে মাঝে রান্না করতে করতে আমি চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকি। শিউলি তখন রান্নাঘরে এসে বকা দেয়, 'কি হলো? থেমে গেলে কেন? হাত চালাও। আমি একটু পরে আসছি।'
একদিন দুপুরে আমি ডাল বসিয়ে তরকারি কাটছিলাম পেছনে পায়ের আওয়াজ শুনে ঘুরে দেখি, তানভীর দাঁড়িয়ে। চোখাচোখি হতেই সে যেন কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। তার পেছনেই শিউলি। বলল, 'তানভীর চলো, নাশতা রেডি। খেয়ে নিই। তুমি তো অফিস যাবা।'
আমি একবারও চোখ নামালাম না। কিন্তু বুকের ভেতর ঝড় উঠলো। যে মানুষটার জন্য এতো কিছু করেছিলাম, যাকে নিজের সবটা উজার করে দিয়েছিলাম সেই মানুষটা আজ আমার সামনে অন্য নারীকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে।
আমি তাদের জন্য এতটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছি যে একদিন শিউলি সোজা তানভীরকে বলেই ফেলল, 'ছেলে বড় হচ্ছে, সতীন নিয়ে সংসার করতে পারবো না আমি।'
তানভীর এক মুহূর্তও দেরি করলো না।
রাতে খাবার পর বাসন গুছাচ্ছি। পেছন থেকে তানভীর এসে বলল, 'তোমার থাকা উচিত না এখানে। তোমার থাকা আমাদের সংসারে সমস্যা করছে।'
আমি থমকে যাই।
'তুমি এমন বলছো কেন? আমি কোথায় যাবো?' আমার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো।
সে নির্লিপ্ত স্বরে বলল, 'যেখানে খুশি যাও। কিন্তু কালকের মধ্যে যেন ঘর ছেড়ে দাও। না গেলে নিজেই বের করে দিবো।'
আমি জানি না তখন কী বলবো। শুধু বললাম, 'তানভীর, আমি কই যাবো? আমার তো কেউ নেই। আমার বাবা-মা নেই, ভাই নেই, বোন নেই। আমি কোথায় যাবো?'
আমার গলা বুঁজে আসছিল। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সে সরে গেল। কোনো কথা না বলে। মনে হলো, আমার কান্না, কষ্ট, বুকের ভার এসব তার কাছে কিছু না।
রাতে আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারলাম না। স্টোররুমের এক কোণে পাটাতনের ওপর শুয়ে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে ছিলাম, চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে নামছিল। মনে হচ্ছিল, শরীরটা যেন হাওয়াহীন শূন্যতাতে ভাসছে।
পরদিন সকালে আমি চুপচাপ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। শাশুড়ি একবার আমার দিকে তাকালেন, কিছু বললেন না। শিউলি তানহাকে নতুন চায়ের কাপ সেট দেখাচ্ছিল। তানহা খুশিতে উচ্ছ্বাসিত।
আমার দিকে তাকালো না কেউ। যেন আমি নেই।
একটা সময় মনে হলো, আমি আর পারবো না। এই ঘরে আর এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব না।
আমি ঘরের ভেতরে গিয়ে আমার একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে ফেললাম। একটু পুরোনো সালোয়ার কামিজ, কিছু কাপড়, একটা পুরোনো চাদর, আর বিয়ের সময় তানভীরের দেওয়া নাকফুলটা নিলাম সাথে। খরচের জন্য আগে তানভীর আমায় টাকা দিতো সেগুলো কখনো প্রয়োজন হয়নি। যা লাগতো এনে দিতো। আজ সেই টাকাগুলো হাতে নিয়ে তাকিয়ে ভাবছি- একটা মানুষ এতোটা কি করে বদলে যেতে পারে? একটা আসবাবপত্র বছরের পর বছর থাকলে মানুষের তার উপর মায়া জন্ম আর এদিকে আমি এক জল জ্যান্ত মানুষ! আমার উপর তানভীরের এক বিন্দুও মায়া জন্মায়নি?
ব্যাগ গুছিয়ে বের হলাম দরজার খুলে। তানভীর সকালবেলা অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে গেছে। শাশুড়ি নিজের ঘরে শিউলির ছেলেকে নিয়ে খেলছে। তানহা আর শিউলি নিজেদের রুমে। টিভির শব্দে বুঝতে পারলাম তারা হয়তো সিনেমা দেখছে।
আমি জানি না কোথায় যাবো। শুধু জানি, এই ঘর আমার না। এই সংসার আমার না। এই মানুষগুলো কখনোই আমার ছিল না। এখানে আমি থাকা মানে তাদের সংসারের বোঝা।
সদর দরজা খুলে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ আমার হৃদয়ের উপর দিয়ে চলছিলো। প্রতিটা পা ফেলতেই মনে হচ্ছিলো, আমি ভেঙে যাচ্ছি। তবু থেমে থাকলাম না।
...
(চলবে..)