ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা শিউলির দিনে

১৮তম পর্ব

লেখক: তামান্না ইসলাম শিমলা

#ঝরা_শিউলির_দিনে

#পর্ব ১৮

#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

সন্ধ্যার শেষ আলোটা মলিন হয়ে নেমে গেছে অনেক আগেই। আকাশজুড়ে মেঘের গাঢ় আস্তরণ। তার ফাঁক গলে নেমে আসা হালকা বৃষ্টির রেখাগুলো শহরের ক্লান্ত শরীরে নরম পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। টং দোকানের টিনের চালের ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ একটানা তাল তুলে বাজছে। দোকানের হলুদ আলোয় চারপাশে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা। চায়ের ধোঁয়া, ভেজা বাতাস, আর আড্ডার উষ্ণতা মিলে আলাদা একটা জগৎ।

থামের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান। হাতে রঙ চায়ের কাপ, ধোঁয়া ধীরে ধীরে উড়ছে আকাশের দিকে। তাকিয়ে আছে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিরর দিকে। অন্ধকার মেঘাচ্ছন্ন শীতল পরিবেশ।

জাওভান বেঞ্চে আধশোয়া হয়ে পা দুলাচ্ছে। দোকানে আর কোনো মানুষ নেই তারা ছাড়া। ফুয়াদ সামনে ঝুঁকে বসে আছে। পাশেই নিদ্রা। এ নিয়ে চার কাপ চা শেষ করেছে আভিয়ান। বর্তমানে বিরাজ করছে পিনপতন নীরবতা। নিজ শহর ছেড়ে অনেকটা দূরে চলে এসেছে তারা। জাওভান উঠে বসল। আভিয়ান চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আবারো এগিয়ে এসে বসল জাওভানের পাশে। জাওভান হঠাৎই বলে উঠল,

"কী সুন্দর একটা ওয়েদার। বউ থাকলে একটু খেতে পারতাম।"

অসহায় ভাব নিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতেই কথাটা বলে উঠল জাওভান। চোখ মুখ কুঁচকে নিল নিদ্রা ও ফুয়াদ। প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকাতেই নড়ে চড়ে সোজা হয়ে বসল জাওভান। নাক টেনে বলল,

"খিচুড়ি, খিচুড়ির কথা বলছিলাম।"

"শালা।"

মুহূর্তেই গালি ছুড়ে দিল ফুয়াদ। "হাহ" শব্দ করে মুখ ভেঙাল জাওভান। পরপর কিছু একটা ভেবে স্বাভাবিক হলো সে।

“আচ্ছা, রিলেশনশিপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী?”

জাওভানের মুখে হঠাৎ করেই এমন প্রশ্ন শুনে সবাই চোখ মুখ কুঁচকে তার দিকে তাকাল। হঠাৎ এসব প্রশ্ন তা-ও কি-না জাওভানের মুখে। আশ্চর্য না হয়ে পারা গেল না। ফুয়াদ গম্ভীর মুখ করে ছোট্ট জবাব দিল,

“বিশ্বাস।”

নিদ্রাও সময় নষ্ট না করে বলল,

“সম্মান।”

জাওভান নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

“আর আমার মতে, ধৈর্য। কারণ আমাকে সহ্য করতে হলে ধৈর্য লাগবেই!”

হেসে উঠল ফুয়াদ আর নিদ্রা। আভিয়ানের দৃষ্টি, মনোযোগ দুটোই খোলা রাস্তায় টুপটুপ করে পড়তে থাকা বৃষ্টির ফোঁটায়। নিদ্রা তাকাল আভিয়ানের দিকে । তৎক্ষণাৎ ডাকল,

"আভি, কী হয়েছে তোর? মনোযোগ কোথায়?

আভিয়ান শুনল। চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াল ধীরে। দৃষ্টি ফিরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠেই বলল,

"শুনছি।"

ফুয়াদ বলে উঠল,

"এবার বল, বিয়ে করার প্ল্যান নেই তোদের?"

জাওভান লাফিয়ে উঠল। বিরক্তি নিয়ে চ শব্দ উচ্চারণ করে উঠল সে। জবাব দিল,

"মেয়েটা পটছেই না ভাই। একশো বিরাশি নম্বর ক্রাশ, এই মেয়ে না পটলে আমি আর এ জীবনে বিয়েই করব না।"

"ডিজগাস্টিং।"

নিদ্রার বিড়বিড় করা শব্দ কানে গেল জাওভানের। মুখ কুঁচকে নিজেও বলে উঠল,

"তুই ডিজগাস্টিং।"

"তুই।"

"তোর টাকলা বাপ।"

রেগে গেল নিদ্রা দাঁতে দাঁত চেপে তেড়ে আসতে নিল,

"কী বললি তুই?"

আটকাল ফুয়াদ।

"উফ, তোরা আর ভালো হলি না। বস তো। এই নিদ্রা, তুই বল। বিয়ে করবি না?"

হঠাৎ করেই মুখটা মলিন হয়ে এলো নিদ্রার। কোনো এক ভাবনায় আটকা পড়ল সে। অতঃপর অজান্তেই হাসল। জবাব দিল,

"ইচ্ছে নেই।"

পরিবেশটা থমথমে হলো মুহূর্তেই। জাওভানও এখন আর মজা করার মতো মুডে নেই। ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল,

"লাইফে নতুন করে কাউকে জায়গা দে। যে চলে গিয়েছে তার জন্য কেন এত...."

"ভালোবাসতাম তো, ইভেন এখনো বাসি। সারাজীবন বাসব।"

কপালের ভাজ মসৃণ হলো ফুয়াদের। উচ্চারণ করল,

"কিন্তু....."

বাক্য শেষ হওয়ার আগেই হাসি মুখে নিদ্রা জবাব দিল,

"কিন্তু সে বেঁচে নেই। এই দুনিয়ার বুকে নেই। অথচ সে আছে, আমার স্মৃতিতে, আমার মস্তিষ্কে, আমার হৃদয়ে। নতুন করে কাউকে আর সেই জায়গাটা দেওয়া সম্ভব নয়। এসব নিয়ে কিছু না বললেই ভালো হয়।"

থেমে গেল জাওভান ও ফুয়াদ দুজনেই। মেডিকেল লাইফে নিদ্রার সাফিন নামক একটু ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল। প্রথম প্রেম বলা চলে। তারপর তিনবছরের সম্পর্ক। হুট করেই একদিন খবর এলো সাফিন আর নেই। একটি এক্সিডেন্টে সে মারা যায়। তারপর এইতো পাঁচটি বছর কাটলো। নতুন করে কাউকে নিয়ে ভাবার ইচ্ছেটাও হয়নি নিদ্রার। আর হয়তো হবেও না। বাবা আর এদের মতো বন্ধু, এই তো তার জীবন। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। পরিস্থিতি থমথমে দেখে নিজেকে স্বাভাবিক করে চঞ্চল চিত্তে ফিরে এলো সে। পরিস্থিতি সামলে নিয়ে আভিয়ানের দিকে দৃষ্টি ফেরাল।

"আভি, এবার তুই বল। বিয়ে কি করবি না?"

"খুব শীঘ্রই।"

আভিয়ানের তৎক্ষনাৎ স্পষ্ট জবাব। কেশে উঠল জাওভান। আঁড়চোখে তার দিকে তাকাল আভিয়ান। জাওভান বিস্ময়কর দৃষ্টি মেলে শুধালো,

"কী বললি?"

"কী বললাম?"

"বিয়ে করবি? রিয়েলি? আর ইয়্যু সিরিয়াস?"

তেমন কোনো প্রতিক্রিয়ার দেখা মিলল না তার মাঝে। বৃষ্টি কমে এসেছে। চায়ের কাপটাও খালি। কোনো জবাব এলো না তার তরফ থেকে। ফুয়াদ হাসলো। শুধালো,

"প্রেমে ট্রেমে পড়েছিস?"

"উঁহু।"

আভিয়ানের স্পষ্ট জবাব। ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো সকলের। ফুয়াদ ফের জিজ্ঞেস করল,

"তবে?"

"তবে কী?"

"তুই না বলেছিলি বিয়ে করবি না। ইন্টারেস্ট নেই।"

মাঝখানে নাকটা জাওভানই ঢুকাল। আভিয়ান নিজের ভোজা চুল গুলোতে আঙুল চালিয়ে বলে উঠল,

"এখন এসেছে।"

"আভিইইইই!"

তিনজনই একই সাথে উচ্চারণ করল আভিয়ানের নাম। বিস্ময় বিরাজ করছে সকলের চোখে মুখেই। হুট করেই নিদ্রার মস্তিষ্কে এসে ধাক্কা দিল সেদিনের বিষয়টা। সোজা হয়ে বসে আভিয়ানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

"এই আভি, ওই মহিলা...."

নিজের ভুলটা সংশোধন করে নিল নিদ্রা। থেমে আবার বলল,

"স্যরি, ওই মেয়েটা কে? আজ বলতেই হবে।"

ফুয়াদ থমকালো,

“কোন মেয়ে?”

জাওভানও ভ্রু কুঁচকালো। কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কোন মেয়ে?”

আভিয়ান তাকাল নিদ্রার দিকে। অত্যন্ত স্বাভাবিক সে। নিদ্রা একটু ভেবে ফুয়াদ ও জাওভানের উদ্দেশ্যে বলল,

“যেদিন আভিয়ান আমাকে একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখার জন্য ডেকেছিল। ওই বাচ্চাটার সাথে যে মহিলা আই মিন যে মেয়েটা ছিল, ওটা কে?”

শেষ কথাটা আভিয়ানের দিকে তাকিয়েই বলল। এক মুহূর্তে পরিবেশ বদলে গেল। আভিয়ান কোনো জবাব দেওয়ার আগেই জাওভানের চোখ চকচক করে উঠল। সে নিজেই বলে উঠল,

“ওহহ, ওয়েট। অপরূপা নাকি?"

শব্দটা উচ্চারণ হতেই আভিয়ানের মুখশ্রী৷ কঠিন হলো। চোয়াল শক্ত হলো তার।৷ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সে জাওভানের দিকে। চোখের ভেতরটা আর আগের মতো নেই, নির্লিপ্ততার বদলে জমাট বেধেছে কঠোরতা। দাঁতে দাঁত চেপে জাওভানকে বলে উঠল,

“সে তোর বড়। নাম ধরে ডাকছিস কেন?”

জাওভান থমকে গেল আভিয়ানের এহেন আচরণে। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আরে, এক বছরেরই তো মাত্র বড়। আর সে তো এখানে নেই, নাম ধরে বললেই কী?"

মুহূর্তেই আভিয়ানের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,

"বড় হোক বা ছোট, নাম ধরে ডাকবি না।"

"তো কী বলব? আন্টি?"

জাওভানের বলতে সময় লাগলেও আভিয়ানের জবাব আসতে সময় লাগল না। সে উঠে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দিল,

"আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট ইন বিইং ইওর আঙ্কেল।"

থতমত খেয়ে গেল জাওভান সহ নিদ্রা ও ফুয়াদ। জাওভান কখন তাকে আঙ্কেল বলল? আশ্চর্য। জাওভানে না বুঝে জিজ্ঞেস করল,

"কী বললি তুই?"

"নাথিং। আমি আসছি।"

"কোথায় যাচ্ছিস? জবাবটা তো দিয়ে যা, মেয়েটা কে?"

ডেকে উঠল নিদ্রা। আভিয়ান আর দাঁড়াল না। হেলমেটটা পরতে পরতে হাঁটা ধরল বাইকের দিকে। যেতে যেতে জবাব দিয়ে গেল,

"শি ইজ মাই ইউনিভার্স।"

মুহূর্তেই আশ্চর্যের চরম পর্যায়েম পৌঁছাল পেছনে থাকা ব্যক্তিগুলো। নিজেদের কানকেও বিশ্বাস করতে পারল না। আভিয়ান সত্যি এমন কিছু বলেছে? হিসাব মিলছে না জাওভান আর নিদ্রার। আর ফুয়াদ তো কিছু জানেই না। আপাতত তাকে জানানোর দায়িত্বটা পালন করল জাওভান আর নিদ্রা। কারণ বুঝে উঠতে তো তারাও পারেনি। আভিয়ান ততক্ষণে হাইস্পিডে বাইক স্টার্ট দিয়ে ছুটেছে নিজের গন্তব্যে। কমে আসা বৃষ্টি আবারো বাঁধ ভেঙে আছড়ে পড়ল ধরণীর বুকে। তবুও থামল না আভিয়ান। বরং গতি বাড়ল। মন গহীনে বেজে উঠল,

"এ অগোছালো হাওয়া, ব্যস্ত আসা যাওয়া

আমাদের চেনালো কী?

আবছা হয়ে এসো আমাকে ভালবাসো

এর বেশি চেয়েছি কী?

তোমাকে দিয়েছিলাম চেনা চেনা কথাগুলো

এসো না জুড়ে নিতে ছেঁড়া ছেঁড়া ব্যথাগুলো"

______

মাঝে কেটে গেছে আরও দুটো দিন। আজ মঙ্গলবার। অফিসের পরিবেশ আজ অন্যরকম ব্যস্ততায় ভরপুর ছিল সকাল থেকেই। বহুল প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্তটা অবশেষে এসেছে, ক্লাইন্টরা রাজি। হ্যাঁ বলেছে তারা। দ্রুত কাজ শুরু করতে চায়, আইনি জটিলতা মিটিয়েই প্রজেক্টে হাত দিতে চায়। পুরো টিমে যেন একটা স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেছে। তবুও কোথাও একটা অসম্পূর্ণতা। যার সাথে এই বিশাল চুক্তি সে নিজেই অনুপস্থিত। দু’দিন ধরে আভিয়ান অফিসে আসছে না।গতকাল ইরফান এহসান নিজেই এসে ঘুরে গিয়েছিলেন। গম্ভীর অথচ মার্জিত উপস্থিতি অফিসের সবাইকে চাপা সম্মানে আবদ্ধ করে ফেলেছিল।

সবার সাথে কথা বলেছেন, খোঁজ নিয়েছেন। অপরূপার কাজেরও বেশ প্রশংসা করেছেন খোলামেলাভাবে। তবে ফেসাদে পরেছিল পিহুকে নিয়ে। ইরফান এহসানের সাথে তার কী ভাব। যেন কতদিনের চেনা জানা। তবে ইরফান এহসান মোটেও বিরক্ত হননি। উল্টো অপরূপাকে বলে রেখে গিয়েছেন মেয়ের যত্ন নিতে। কোনো সমস্যা হলে আভিয়ানকে জানাতে না পারলে সরাসরি যেন তাকে জানায়। অপরূপা মুগ্ধ হয়েছে তার আচরণে।

আজ অপরূপা ছুটি নিয়েছে। গত দু'দিন অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বৃষ্টিতে ভেজার কারণে জ্বর এসেছে তার। এখন দুপুর। গত তিনদিন টানা বৃষ্টির প্রকোপ চলেছে। অথচ আজ পুরোপুরি ভিন্ন। রোদের তীব্রতা এত বেশি যে শরীরে কাটার মতো বিঁধছে। বর্তমানে দুপুরের জন্য রান্না করছে সে। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অপরূপা ধীরে ধীরে নেড়েচেড়ে রান্না করছে। ঘামে ভিজে গেছে কপাল, গাল। আঁচল দিয়ে বারবার মুছে নিচ্ছে। ঠিক তখনই টুপটাপ পায়ের শব্দ ভেসে এলো তার কানে। সাথে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠে ডাক,

“মাম্মা!”

দৌড়ে এলো পিহু। হাঁপাচ্ছে হালকা। অপরূপা তাকাল একপলক। শুধালো,

“কী হয়েছে সোনা?”

পিহুর চোখ দুটো উজ্জ্বল, উত্তেজনায় চকচক করছে।

“নিচে… নিচে হাওয়াই ক্যান্দি এসেচে! গোলাপি গোলাপি! মাম্মা, পিহু কাবে!”

অপরূপা ক্লান্ত শ্বাস ছাড়ল। মেয়ে এই দুপুর বেলা নতুন বায়না জুড়েছে। সে রান্নায় মনোযোগ দিয়ে বলল,

“এখন আমি রান্না করছি, সোনা। বিকেলে এনে দেব, ঠিক আছে?”

পিহু ঠোঁট ফুলিয়ে এগিয়ে এলো মুহূর্তেই। দুই হাতে জড়িয়ে ধরল মায়ের হাঁটু।

“প্লিজ মাম্মা, একনই কাই। পিহুর কুব ইচ্চে করচে।”

মিষ্টি, নরম গলায় অনুরোধ। যেখানে না বলার শক্তি খুব কমই থাকে মানুষের। অপরূপাও পারল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।

“এই মেয়ে আমাকে একদমই ছাড়বে না, তাই না?”

পিহু খিলখিল করে হেসে মাথা দোলাল। জবাব দিল,

“না-আ!”

শেষমেশ হেরে গেল অপরূপা। মেয়ের বায়না এখন মেটাতেই হবে। চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে আঁচলটা গুছিয়ে পিহুর হাত ধরল অপরূপা।

“চলো।"

পিহু হেলে দুলে পা বাড়াল। নিচে নেমে হাওয়াই মিঠাইওয়ালার কাছে গেল তারা। গোলাপি তুলোর মতো মিঠাইটা হাতে পেয়েই পিহুর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

“মাম্মা, দ্যাকো! মেঘের মতো!”

অপরূপা হেসে জিজ্ঞেস করল,

“এবার খুশি?”

পিহু জোরে জোরে মাথা নাড়ল। তারপর এগিয়ে এসে অপরূপার হাতে একটা চুমু দিল। জবাব দিল,

“কুব কুব কুশি!”

"এবার চলো। খুব রোদ, দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না।"

পিহু হাত ধরল অপরূপার। এই টুকু সময়ের মাঝেই দুজনের ফর্সা গালই লাল বর্ন হয়ে উঠেছে। অপরূপা আর সময় নষ্ট করল না। পিহুকে নিয়ে পা বাড়াল গেটের দিকে। গেট পার হতেই ডাক পড়ল অপরূপার।

“আম্মাজান, শোনো।”

পেছন ঘুরে তাকাল অপরূপা। দারোয়ান মকবুল এগিয়ে আসছে তারই দিকে, হাতে বিশাল একটা বিশাল সাইজের বক্স।

“এইটা তোমার নামে এসেছে। ডেলিভারি ম্যান দিয়ে গেছে। অনেকক্ষণ নাকি তোমারে ফোন দিছে, পায় নাই। তাই আমার কাছে দিয়ে গেল।”

অপরূপা থমকে গেল। এই বিশাল আকৃতির পার্সেল এসেছে তার নামে? অবাক হলো অপরূপা। শুধালো,

“আমার নামে?”

বক্সটা হাতে নিতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। উঠাতেই পারছে না সে।

“এত ভারী জিনিস! আমি তো কিছু অর্ডার করিনি।"

মকবুল চাচা হেসে বললেন,

"হ্যা, মা। অনেক ওজন।"

উপায় না দেখে অপরূপা বলল,

“আচ্ছা চাচা, একটু কষ্ট করবেন? পার্সেলটা একটু দিয়ে আসবেন?"

“কষ্ট কিসের? চলো।”

মকবুল চাচা হেসেই পা বাড়ালেন। অপরূপার মাথায় চলছে নানা রকম প্রশ্ন। দু’জনে মিলে বক্সটা নিয়ে উঠল উপরে।

পাশের ফ্ল্যাটের সেই বৃদ্ধা মহিলা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখে কৌতূহলী, সন্দেহমিশ্রিত দৃষ্টিকে বক্সটার দিকে তাকিয়ে আছেন অদ্ভুতভাবে। অপরূপা সেদিকে খেয়াল করল না। ঘরের সামনে এসে পিহুকে বলল,

“সোনা, তুমি ভেতরে যাও।”

পিহু খুশিমনে দৌড়ে ঢুকে গেল। অপরূপা মকবুল চাচাকে বলল,

“আপনি একটু দাঁড়ান, চাচা।”

অপরূপা দ্রুত পা চালাল ভেতরে। মিনিট দুয়েকের মাঝেই অপরূপা ফিরে এলো। তার হাতে একশো টাকার একটা নোট। সেটা এগিয়ে দিল মকবুল চাচার দিকে। বলল,

“চাচা, চা খেয়ে নেবেন।”

মকবুল চাচা হাসিমুখে নিলেন,

“আল্লাহ তোমারে ভালো রাখুক মা।”

বিনিময়ে কেবল হাসলো অপরূপা। মকবুল চাচা সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতেই করিডোরে নেমে এলো নিস্তব্ধতা । দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধা মহিলার চোখ তখনো অপরূপার দরজার দিকেই স্থির। ভারী বক্সটা তার মাথার ভেতর প্রশ্নের পর প্রশ্ন জাগিয়ে তুলছে। ঠোঁট কুঁচকে বিড়বিড় করলেন,

“এইসব ভালো লক্ষণ না, একদমই ভালো লক্ষণ না।"

ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বের হলেন আরেকজন মহিলা. মাঝবয়সী, গলায় ওড়না আলগাভাবে জড়ানো। তিনি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“কী হয়েছে খালা? কার দিকে তাকিয়ে আছেন?”

বৃদ্ধা সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ পেলেন। গলা একটু নামিয়ে আগ্রহ বাড়িয়ে বললেন,

“তুমি কিছু দেখো নাই নাকি? এইমাত্র একখান বিশাল বক্স আইলো ওই মেয়েটার ঘরে!”

“কোন মেয়ে?”

“এই যে নতুন আইছে না, মা আর বাচ্চা যে? তালাক হওয়া একখান মাইয়া, জানো না?"

মহিলা ভ্রু কুঁচকালেন,

“ও হ্যাঁ, দেখি তো। চুপচাপই তো থাকে মনে হয়।”

বৃদ্ধা হুঁ করে উঠলেন,

“চুপচাপ থাকলেই মানুষ ভালো হয় না রে মা। ভিতরের খবর কে জানে!”

আরও একটু এগিয়ে এসে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে বললেন,

“স্বামীর লগে নাকি তালাক হইছে। আবার এইসব বড় বড় পার্সেল আসে, তুমিই বলো ব্যাপারটা কি ঠিক লাগে?”

মহিলা একটু ইতস্তত করলেন। কৌতুহল নিয়ে শুধালেন,

"ভালো চাকরি করে শুনলাম। হতে পারে অফিস থেকে আসছে। এত ভাবার কী আছে, খালা?”

বৃদ্ধা তৎক্ষণাৎ বাধা দিলেন। চোখ মুখ বিকৃত করে আওয়াজ তুললেন,

“আরে রাখো তোমার ওই অফিসের কথা! আমি কি এই বয়সে কিছু বুঝি না? একদিন এক বেডা ছাওয়াল বাড়ি পর্যন্ত দিয়া যায়। আরেকদিন আরেক বেডা ঘরে ঢুকে। এসব ভালা মাইয়াদের কাম? হুহ। চুল তো এমনিই পাকে নাই।"

মহিলা কৌতূহলী হয়ে উঠলেন এবার,

“সত্যি নাকি, খালা? কিন্তু মেয়েটাকে তো কখনো বের হতেও দেখি না। যদিও অফিসেই থাকে।”

“এই নিজের চোখে দেখছি! সুন্দর খালি বাইরেই, ভিতর ভিতর চরিত্রের ঠিক নাই! সমাজটা শেষ হইয়া গেল রে মা।”

মহিলা একটু গলা নামিয়ে বললেন,

"হতে পারে। আজকার কাল যুগে কত কী হয়।"

বৃদ্ধা সন্তুষ্টির হাসি দিলেন। আরো মুখ বাঁকিয়ে বললেন,

“আমি তো সেই কথাই কইতেছি। বাইরে থেকে যতই ভদ্র ভাব দেখাক, ভেতরের কাহিনি আলাদা! এইসব মেয়ে মানুষরে সাবধানে থাকতে হয়। সমাজের মানসম্মানও তো একটা জিনিস আছে!”

মহিলা মাথা নাড়লেন ধীরে। আর কথা বাড়ালেন না। বৃদ্ধা মহিলা কোমর ধরে পা টেনে হাঁটা ধরলেন।

"যাই গা। মাইনশের লীলা খেলা দেখার আর সময় নাই।"

বৃদ্ধা চলে গেলেন। মহিলাটি এক পলক তাকালেন অপরূপার ঘরের দরজার দিকে। অপরূপা শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে বক্সটা টেনে ভেতরে নিতে ব্যস্ত। এত বড় এবং ভারি একটা পার্সেলে কী আছে এই প্রশ্নটাই তার মাথায় ঘুরছে। কারো দিকে তার মনোযোগ নেই। পরপর বক্সটা ঘরে নিয়ে আঁটকে দিল দরজা। মহিলাটিও আর সময় নষ্ট করলেন না। তিনিও প্রস্থান করলেন নিজের কাজে।

________

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন