ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা শিউলির দিনে

৩৪তম পর্ব

লেখক: তামান্না ইসলাম শিমলা

#ঝরা_শিউলির_দিনে

#পর্ব ৩৪

#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

ছুটির আমেজে উৎসুক অফিসের সকলেই। তবে ছুটির আমেজটা সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে অপরূপাকে। কারণ আগামীকাল সে ফিরবে নিজের বাড়ি। নিজের মানুষদের কাছে। মায়ের কাছে। পরিবারের কাছে।

এই কয়েকটা ভাবনাই তার বুকটাকে অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরিয়ে তুলছে। হাতে কিছু ফাইল নিয়ে করিডোর ধরে এগোচ্ছে সে। পিছন পিছন ছোট ছোট পায়ে হাঁটছে পিহু। পিহুর পরনে হালকা হলুদ রঙের ফ্রক। মাথার দুপাশে ছোট্ট ঝুঁটি। হাতে একটা চকলেট। এমন সময় একজন স্টাফ এসে জানাল,

“ম্যাম, স্যার ডাকছেন।”

অপরূপার পা থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর নিজেকে সামলে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা।”

সে এগিয়ে গেল আভিয়ানের কেবিনের দিকে। দরজার সামনে এসে হালকা নক করতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো গভীর, গম্ভীর কণ্ঠ,

"কাম ইন।"

অপরূপা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঢুকতেই তার চোখ গিয়ে থামল আভিয়ানের উপর। লোকটা ডেস্কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কালো শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখের নিচে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে আগের মতোই। তবে আজ তাকে কেমন বেশি রুক্ষ লাগছে। অপরূপা ভেতরে ঢুকতেই আভিয়ানের চোখ উঠল। কিন্তু তার আগেই ডেকে উঠল পিহু,

“ইইইইয়ান!”

পিহু দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আভিয়ানের পা। মুহূর্তের মধ্যেই আভিয়ানের মুখের কঠোরতা খানিকটা নরম হয়ে এলো। সে ঝুঁকে পিহুকে তুলে নিল কোলে।

“লিটেল কিটেন।”

পিহু গলা জড়িয়ে ধরল তাকে। এ কয়েকটা দিন খুব বেশি একটা সময় তারা একসাথে থাকতে পারেনি। এ নিয়ে পিহুর মনটাও খারাপ থাকে। অপরূপা ফাইলগুলো এগিয়ে দিল।

“এই ডকুমেন্টগুলো সাইন করতে হবে।”

আভিয়ান ফাইলগুলোর দিকে তাকালই না। বরং স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অপরূপার দিকে। কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর ধীরে বলল,

“আপনার সমস্যাটা কী, অপরূপা?”

প্রশ্নটা শুনে জমে গেল পরিবেশটা। অপরূপা ভ্রু কুঁচকাল।শুধালো,

“মানে?”

“গত কয়েকদিন ধরে আমাকে এমনভাবে এড়িয়ে চলছেন যেন আমি কোনো অপরাধ করেছি।”

অপরূপা ঠান্ডা স্বরে বলল,

“আপনি আমার বস। কাজ ছাড়া অতিরিক্ত কোনো যোগাযোগের প্রয়োজন দেখি না।”

আভিয়ান হালকা হেসে ফেলল। তবে সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র আনন্দ নেই। বরং উপহাস।

“ওহ, তাই?”

“জি।”

“তো বউ হয়ে যান আমার।"

থমকে গেল অপরূপা। এ কেমন যন্ত্রণা? হুট করেই বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে গেল তার। চোখ সরিয়ে নিল মুহূর্তেই। কথা এড়িয়ে বলল,

"ফাইল গুলো দেখে নিন, সব ঠিকঠাক আছে কি-না।"

শোনা গেল আভিয়ানের বিষন্ন অসহায় কণ্ঠস্বর,

"কিচ্ছু ঠিক নেই, ঠিক থাকতে দিচ্ছেন না আপনি।"

"মিস্টার আভিয়ান প্লিজ স্টপ।"

কে জানে কী হলো অপরূপার, সে প্রায় ধমকে উঠল আভিয়ানকে। ছোট্ট পিহু ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে তার মা ও তার ইয়ানকে। সে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে এখানে। আভিয়ান ধীরে পিহুকে নামিয়ে দিল মেঝেতে।

তারপর খুব আস্তে ডেস্কের দিকে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।

চোখদুটো স্থির। তীক্ষ্ণ।

“আমাকে থামিয়ে দিয়ে পালাতে চাচ্ছেন আপনি? আমার আপনাকে চাই মানে আপনাকেই চাই। বুঝেছেন?"

থমকে যাওয়া মুখাবয়বটা কেমন অসহায় দেখাল অপরূপার। লোকটা তাকে পাগল করে ছাড়বে। কেন বুজতে পারছে না সে বাস্তবতা? এ পর্যায়ে সে কড়া স্বরে উচ্চারণ করল,

"মিস্টার আভিয়ান, আপনি যদি আমাকে বারবার এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতির সম্মুখীন করান তবে আমার এই কোম্পানিতে আর কাজ করা সম্ভব হবে না। আমি রিজাই....."

অপরূপা পুরো বাক্য শেষ করার আগেই আভিয়ান থামিয়ে দিল অপরূপাকে। বাঁকা হেসে বলল,

"আপনি বলবেন আর আমি মেনে নেব? চুক্তি অনুযায়ী এক বছরের আগে আপনি চাকরি ছাড়তে পারবেন না।"

থেমে গেল অপরূপা। এই লোকটা কী চাচ্ছে ঠিক? বুঝে নাকি না বুঝে? সে চোখ বুজে মাথা নিচু করে নিল। কিছু সময় চুপ থেকে নিচু স্বরে আওড়াল,

“আপনি যেই অনুভূতিটাকে গুরুত্ব দিয়ে এতদূর ভাবছেন, সেটা আসলে সাময়িক আকর্ষণ ছাড়া কিছু না।”

আভিয়ানের চোয়াল শক্ত হলো। রাগ হচ্ছে তার, কিন্তু কেন রাগ হচ্ছে সে জানে না। হয়তো অবহেলাটা নিতে পারছে না। নাকি সঠিক সময় আসার আগেই নিজেকে প্রকাশ করে বসল? জানা নেই ঠিক ভুল কিচ্ছুটি। বরং উচ্চারণ করল,

"রিয়্যেলি?"

অপরূপা এবার গম্ভীর হয়ে বলল,

“আপনার জীবন আলাদা। আমার জীবন আলাদা। আমাদের মন মানসিকতা আলাদা। সবচেয়ে বড় কথা আমি একজন সিঙ্গেল মাদার। যে কি-না নিজের মেয়ের জন্যই দাঁড়িয়ে আছে আপনার সামনে। সেখানে আপনি অভিজাত পরিবারের অবিবাহিত পুরুষ। আপনি যেমনটা ভাবছেন কিছুই তেমন হওয়ার নয়। সম্ভবই নয়। সমাজ, পরিবার, বাস্তবতা এসব গল্পের মতো চলে না।”

নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে আভিয়ানের। নিজের দুর্বলতা বেরিয়ে আসছে তার।

"আপনি সমাজের কথা ভেবে পিছিয়ে যাচ্ছেন? এই সো কোল্ড সমাজ আর সমাজের মানুষের ধ্যান ধারণা আমি আভিয়ার কোনো কালেই পরোয়া করিনি, আর না করব।"

"আমি করি, করতে বাধ্য হয়েছি। কী জানেন আমার বিষয়ে? কতটুকু জানেন? এই ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে আমার পথচলা সহজ ছিল না আভিয়ান। পাড়া প্রতিবেশি, এই সমাজ আমাকে কম শোনায়নি। সেসবকে আমিও পরোয়া না করে এতদূর এগিয়েছি। তার কারণটা হলো আমার মেয়ে, আমার পিহু। একজন মা তার সন্তানের জন্য নিজের সবটুকু বিসর্জন দিতে পারে,নিজের আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব সবকিছু। তবে একজন নারী পারে না। আপনার সাথে আমার কখনোই যায় না। আপনি আমার বস আভিয়ান। আজ আপনার সাথে ভালো মন্দ কোনো ভাবে আমি জড়ালে দায় এসে পড়বে আমার উপর। মানুষ আঙুল তুলবে আমার চরিত্রে। জেনে বুঝে আমি চাইব না নিশ্চয় নিজের শেষ সম্বল টুকু খোয়াতে? আর জীবনটা কোনো উপন্যাসের পাতা নয় যে যা খুশি করা যায়। প্লিজ আভিয়ান, এসব নিয়ে আর একটা কথাও বলবেন না। আমি চাই না। এখানেই শেষ দিন সবটা। এসব আবেগে গা ভাসাবেন না, অন্তত আপনার মত একটা মানুষের সাথে বিষয়টা মানানসই না।"

মনোযোগী শ্রোতা হয়ে অপরূপার প্রত্যেকটি কথা শুনে গেল আভিয়ান। মেয়েটা বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারে। যেখানে আভিয়ান নিজেই একটা অগোছালো মানুষ। আসলেই তাদের মাঝে বিস্তুর ফারাক। তবে তার অনুভূতি গুলোকে কখনোই আবেগ বলা চলে না। একদমই না।

“ঠিক বলেছেন, আপনি আপনার খারাপ পরিস্থিতি দেখিনি। আমি দেখিনি লিটেল কিটেনকে নিয়ে আপনার বিষাক্ত পথ চলা। আমি দেখিনি আপনাকে করা অপমান। এন্ড ইয়েস, এর জন্য আমার নিজের প্রতি রাগ হয়। মনে হয় আমি কেন আরো আগে আপনাকে খুঁজে পেলাম না। কেন আমি অপারগ? কেন আমি একটা লুজার? কেন আমার প্রিয় মানুষ গুলো কখনোই আমার থাকে না। কেন?"

বলতে বলতেই অস্থির হয়ে উঠল আভিয়ান। উত্তেজিত হয়ে বাম হাতে সজোরে আঘাত করল দেওয়ালে। মুহূর্তেই হাতের উপরিপিঠের চামড়া ফেটে বেরিয়ে এলো রক্তিম তরল। চমকে উঠল অপরূপা। সবকিছু এতটা দ্রুত হলো যে মস্তিষ্ক সময় মতো ঠাহর করতে পারল না। ছোট্ট পিহু এতটা সময় কেবল দেখেই যাচ্ছিল। এ পর্যায়ে মেয়েটা ভয় পেয়ে কেঁদে উঠল। পিহু দৌড় লাগাল মেয়ের দিকে। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।

"সোনা, আমার সোনা মা, কাঁদে না। কিচ্ছু হয়নি। এইতো সোনা, এইতো আমি আছি না? কাঁদে না মা।"

পিহু কান্নারত অবস্থায় তাকাল আভিয়ানের দিকে। আভিয়ানের চোখ মুখ অসম্ভব রকমের লাল হয়ে উঠেছে। চোখের পাতা, ঠোঁট কাপছে তিরতির করে। রক্ত মাখা হাতটা উঠিয়ে বারবার কান ঘষছে। তা দেখে পিহু আরো বেশি কেঁদে উঠল। অপরূপাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"মাম্মা, ইয়ান ব্যতা পেয়েচে। রক্ত, কত রক্ত।"

মুহূর্তেই পিহুর চোখে হাত দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল অপরূপা। আভিয়ানের পুরো ঘাড়টা রক্তে মেখে গিয়েছে। থমকে গেল রমণী। অজানা ব্যথায় জর্জরিত হলো হৃদয়খানা। দ্রুত মেয়েকে চেয়ারে বসিয়ে এগিয়ে গেল আভিয়ানের কাছে। হাতটা টেনে ধরল। দেখতে পেল হাতের মুঠোই চকচকে পেপার কাটার। অপরূপার চমকে উঠল। বিস্ময় নিয়ে তাকাল আভিয়ানের চোখে।

"এই, এই হাত খুলুন। খুলুন বলছি, পাগল আপনি? হ্যাঁ? আভি আভিয়ান প্লিজ হাত খুলুন।"

কোনো কথা আদেও তার কর্ণগহ্বরে পৌঁছাচ্ছে কি-না তা নিয়ে বেশ সন্দেহ আছে। কারণ আভিয়ানের পূরণ দৃষ্টি অপরূপার দিকে। অপরূপার দুইহাত দিয়ে টেনেই একটা আঙুলও ছাড়াতে পারছে না। মানুষের শরীরে এত শক্তি কী করে হতে পারে ভেবে পাচ্ছে না অপরূপা। তবে তার নিজেরও অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত যন্ত্রণা হচ্ছে। খুব বেশি যন্ত্রণা। অথচ এর কারণ তার জানা নেই। সে তাকাল আভিয়ানের চোখে। পুরো শরীর কাপছে। হালকা রঙের শাড়ির আঁচলটা রক্তে মেখে গিয়েছে। অপরূপা ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছেড়ে আগে নিজেকে শান্ত করল। অতঃপর অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,

"পিহু ভয় পাচ্ছে আভিয়ান, হ হাতটা খুলুন। কেন নিজেকে আঘাত করছেন? কষ্ট দিচ্ছেন? পাগল আপনি?"

এপর্যায়ে কিছু না ভেবেই হাত খুলে ফেলল আভিয়ান। কারণটা একটাই, তার লিটেল কিটেন। তার লিটেল কিটেন ভয় পাচ্ছে, ব্যাস এটুকুই। তবে একচুলও নড়ল না সে। আর না দৃষ্টি সরালো। অপরূপা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। চোখ নামিয়ে হাতটা দেখল। বেশ অনেক খানি আঘাত, ক্ষতটাও গভীর। রক্ত এখনো ছুটছে। অস্থির ব্যকুল হৃদয়টা এক ভয়ংকর অনুভূতির মুখোমুখি করাল অপরূপাকে। কী অদ্ভুত ভাবে তার কান্না পেল। ঠোঁট কামড়ে কান্না আঁটকে দ্রুত শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে বেঁধে দিল আভিয়ানের হাতটা। অথচ দৃষ্টির নড়চড় হলো না আভিয়ানের। অস্থিরতা বেড়ে দিগুণ হচ্ছে। অপরূপা শত চেষ্টা করেও নিজের চোখের পানি আটকাতে পারল না। যদিও বা কাঁদতে চায়নি সে। তবে চোখের পানি কপোল গড়িয়ে টুপ করে পড়ল আভিয়ানের কাঁটা হাতের উপর। নিজের কাজে মনোযোগ রেখেই উচ্চারণ করল,

"আপনি যে একটা পাগল, সেটা কি আপনি জানেন?"

"জানি।"

আভিয়ানের তৎক্ষনাৎ নিচু কণ্ঠস্বরের জবাব। রাগটা দপ করে মাথায় চড়ে বসল অপরূপার। ইচ্ছাকৃত গিট বাঁধল শক্ত করে। সুক্ষ্ম ব্যথার টান অনুভব করলেও আভিয়ানের মাঝে দেখা গেল না কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া। তা দেখে রাগের মাত্রা বৃদ্ধি পেল অপরূপার। দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল,

"এত জেদ কীসের আপনার? মাথায় সমস্যা? কেয়ারলেস একটা।"

আভিয়ান নিশ্চুপ, নির্লিপ্ত। অপরূপার রাগ, শাসন বড্ড বিনোদন দিচ্ছে তাকে। ভালো লাগা কাজ করছে তার মাঝে। অপরূপা দু'হাতে ধাক্কা দিল আভিয়ানের বুকে, যদি-ও বা এক চুলও নাড়াতে পারল না। রাগের বশিভূত রমণী হাত দুটো শক্ত করে নিল।

"করব না আমি চাকরি, আসব না আর। অসহ্য একটা লোক, হাত না গলা কাটুন নিজের।"

"ভেবে বলছেন?"

আভিয়ানের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলা কথাটা এবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারা করে ফেলল অপরূপাকে। আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। পিহুর কান্না থেমেছে অনেকক্ষণ। সে পিটপিট চোখে চেয়ে কেবল দেখছিল ঘটমান দৃশ্য। এ পর্যায়ে অপরূপা পিহুকে কোলে তুলে নিল। পা বাড়াল দরজার দিকে। আভিয়ান স্থির নিজের জায়গায়। দৃষ্টি তার পদচারণায়। দরজার হাতলে হাত ঠেকিয়ে থামল অপরূপা। এক পলক তাকাল পেছনে। বলে গেল,

"আপনি আসলেই একটা পাগল।"

আর দাঁড়াল না। বেরিয়ে গেল অপরূপা। ফেলে রেখে গেল আভিয়ানকে। যে কি-না নিজের মাঝেই নেই। প্রবল ভাবে ঘেমে নেয়ে ভিজে এসেছে তার শরীর। কঠোর হয়ে এসেছে চোয়াল। দাঁতে দাঁত চেপে রাখায় জ্বিভটাও রক্ষা পেল না, মুখের ভেতর নোনতা স্বাদ অনুভব করলেও তার কোনো হেলদোল হলো না। বরং অদ্ভুত ভাবে চোখের পলক ঝাপটাল। কপাল থেকে শুরু করে ঘার, হাতের শিরা উপশিরা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। আচমকা মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটো খুলে গেল। ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল আভিয়ানের গোটা শরীর। দুলে উঠল সমস্ত কায়া। তাল সামলাতে একহাত ঠেকাল দেওয়াল। অপর হাত আপনা আপনি চলে গেল চুলে। নিজের চুলগুলোই খামচে ধরল আভিয়ান।

“ফাক!”

গভীর, দমবন্ধ এক গর্জন বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে।

সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। মাথার ভেতর যেন অসহ্য চাপ জমছে। কানে বাজতে লাগল অপরূপার বলা প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ। ছেলেটা একদমই ঠিক নেই, দম আঁটকে এসেছে পুরোপুরি। ঘামের বিন্দু গড়াল কপাল বেয়ে গাল, গাল বেয়ে গলা। ঝাপসা চোখে ভাসছে অপরূপার মুখটা। অজানা ভয়ে রোধ হয়ে আসছে রক্ত চলাচল। সে কি তার স্নো হোয়াইটকে আবারো হারিয়ে ফেলবে? আবারো? আবারো? না! এটা হতে পারে না।

“শিট!”

প্রচণ্ড রাগে সামনে থাকা দেওয়ালে আবারো ঘুষি মারল আভিয়ান। কাপড়ে পেঁচানো হাতটা আবারো রক্তে মাখামাখি হলো। এই মুহূর্তে আভিয়ানকে কোনো অশরীরী ব্যতিত কিছুই মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো অশীরী ভর করেছে। চোখদুটো লাল হয়ে গেছে। চোখ ফেটে রক্ত বের হবে যেন। অস্থিরতা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। না, এভাবে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। সে কিছুতেই শ্বাস নিতে পারছে না। হাত বাড়িয়ে ডেস্কে ভর দিয়ে দাঁড়াল। ডেস্কের ড্রয়ার খুলল তড়িঘড়ি করে। ভেতর থেকে ওষুধের স্ট্রিপ বের করে কাঁপা হাতে একটা ট্যাবলেট মুখে দিয়ে পানি খেল।

তারপর ধপ করে বসে পড়ল সিটে। মাথাটা সিটে এলিয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল কিছুক্ষণ। সময় পেরোলো। ওভাবেই কাটল মিনিট বিশেক। স্থির সে। অতঃপর ঠোঁট কামড়ে চোখ খুলল, চোখের সামনে দেখা মিলল সিলিং। সে পানেই অপলক তাকিয়ে রইল অনেকটা সময়। বুকের ব্যথায় শব্দ বের হচ্ছে না কোনো। তবুও বিড়বিড় করে আওড়াল,

"আমি ঠিক নেই, স্নো হোয়াইট। একদম ঠিক নেই। আপনাকে হারাতে পারব না আমি, আপনাকে আমার চাই। খুব করে চাই। হয়ে যান না আমার, একটাবার সুযোগ দিয়েই দেখুন। এই গোটা দুনিয়ার যত সুখ আছে সব আমি লিখে দেব আপনার নামে, বিনিময়ে কেবল ওই বুকে একটু জায়গা দিন। জায়গা দিন আমার অপ্সরা।"

আবারো চোখ বুঁজে নিল আভিয়ান। সে সহ্য করতে পারছে না। মেয়েটাকে সে কিছুতেই হারাতে পারবে না। কেন প্রিয় মানুষগুলো বারবার তার থেকে হারিয়ে যায়? কেনই বা সকল যন্ত্রণা ঘিরে ধরে কেবল তাকেই? সে যে ভালো নেই, একদমই ভালো নেই। একদমই না! হাতের ক্ষততে জমাট বেঁধেছে রক্ত। অনুভব করল নাক গলিয়ে ঠোঁট বেয়ে গড়াচ্ছে কিছু একটা। সে জানে এটা কী, তবুও প্রয়োজন বোধ করল না রক্তটা মুছে ফেলার। বরং গড়াতেই লাগল। অধর ঘেঁষে গেল বিষাদময় এক হাসির রেখা। বুক পিঞ্জিরায় বাজল কেবল মনের বলা বাক্য,

"আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন তো? নিন, এই আভিয়ান পৃথিবীর সবচেয়ে ধৈর্যবান ব্যক্তি হয়ে দেখাবে। তবুও দিনশেষে আপনাকে আমার হতে হবে, স্নো হোয়াইট। আপনি আমারই হবেন, এই আভিয়ানেরই।"

_________

#চলবে

মন্তব্য করে যাবেন।🤍

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন