লিজা মনি
সূচনা পর্ব
.স.সা. সামনে এগোচ্ছেন কেনো? দে.. দে.. দেখুন আমি কিন্তু চিৎকার করবো।
মেয়েটির কম্পমান কন্ঠে বিষেদের শীতল বাতাস বয়ে যায়।ভয় আর প্রতিবাদের মিশ্রন এক পলকে তার সমস্ত রক্ত গলিয়ে গলিয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়।
মেয়েটির কথা শুনে সামনে থাকা ব্যক্তিটি উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। কি সেই ভয়ংকর হাসি। তার হাসিতে কোনো হাস্যরস ছিলো না। ছিলো এক নিষ্ঠুর উপহাস।
হাসিয়ে থামিয়ে ব্যক্তিটি মুখের কাঠিন্যতা বজায় রেখে বলে,,,,
" তাই নাকি বেবি, চিৎকার করবে?অগ্নি চৌধুরির জায়গা এইটা যেখানে তার অনুমতি ছাড়া একটা পাতা ও নড়ে না। সেখানে তুই যদি চিৎকার করতে করতে মরে ও যাস কেউ আসবে না"
এই বলে আহান এক পা এক পা করে সামনে এগোতে থাকে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মাটির ভেতর থেকে বিষাক্ত বিষ বের করে ফেলে। বাতাস ঘন হয়ে ওঠে।রক্ত গা ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
ইয়ানা কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। মেয়েরা সব কিছুর সাথে লড়তে পারে কিন্তু যখন কেউ তার ইজ্জতের দিকে হাত বাড়ায় তখন পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে কেউ সাহসী হয়ে গর্জে উঠে আবার কেউ সবচেয়ে দুর্বলভাবে নিরবে কাঁদে।
কিন্তু ইয়ানা?
ইয়ানা যথাসম্ভব নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করছে।
কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেসেই অগ্নি চৌধুরীর চোখ।
জীবনের এক মায়া-বেদনা, প্রেম আর শত্রুতার জটিল মিলনে গড়া এক অচেনা পাহাড়। যার সাথে লড়াই করা মানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো।
আহানের চোখ এখন রক্তিম হয়ে উঠেছেকপালের শিরা ফোলানো নীলাভ হয়ে আসা রগ যেন তার মনের উত্তেজনা বহন করছে।
তার ফর্সা গাল মনে হচ্ছে আগুনে পুড়ে লাল হয়ে উঠেছে।
তাকে দেখলেই মনে হয় সে শুধু রাগে নয়, ঘৃণায়, অবিশ্বাসে, আর এক অজানা অন্ধকারের মাঝে ডুবে আছে।
আহান অস্থির হয়ে উঠে।এক ঝাঁকে ইয়ানার সামনে এসে দাঁড়ায়।তার শক্তিশালী হাত ইয়ানার গলা আঁকড়ে ধরে। হাতে থাকা আঙুলগুলো রক্ত ঝরানোর জন্য তৈরি। গলার শব্দের মধ্যে লুকানো হুমকি আর ঝাঁঝালো স্বর.......
"" এখন এত পিছাচ্চিস কেনো। তোর ইচ্ছাতো পূরন করছিলাম। পরপুরুষের সঙ্গ পেতে খুব ভালো লাগে তোর তাই না? একজন দিয়ে মন টিকে না তাই আরেকজন নিয়ে নিয়েছিস। বল কি আছে ওই ছেলেটার মধ্য যা আমার মধ্যে নেই? আমার চেয়ে কি বেশি কেয়ার করে । নাকি এতক্ষনে ও বেডে নিয়ে চলে গেছে কিন্তু আমি নিতে পারে নি""
ইয়ানা আহানের কথা সহ্য করতে না পেরে কানে দুই হাত চেপে বলে,,,,
"" প্লিজ চুপ করুন। আর নিতে পারছি না। ছিহ..কি জঘন্য চিন্তাভাবনা আপনার। লজ্জা করে না একটা মেয়ে সম্পর্কে এইসব বলতে""
আহান গর্জে কেঁপে উঠে। রেগে চিৎকার দিয়ে বলে,,,
"না করে না লজ্জা। কারন তোরা সব মেয়েরা ছলনাময়ী একজনকে দিয়ে হয় না পরে আরেকজনের বেডে চলে যাস। আর আজ আমি তোর সেই আশা ওই পূরন করবো। যাতে কারোর কাছে না যেতে পারিস"
""""""""""""""""""""""""""""""" ফ্লাসব্যাক """""""""""
প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ে ভার্সিটিতে পা রাখে জীবন যুদ্ধের একরাশ আশা আর সপ্ন নিয়ে আসে। আলো- আধাঁরের জীবনের ঝাঁক।কিন্তুু কে জানত এই আশা আর সপ্ন প্রথম দিন ওই দুঃস্বপ্নে পরিনত হবে।
মাত্র ঊনিশে পা রাখা কিশোরী ইয়ানা আজ স্বপ্ন নিয়ে ভার্সিটিতে এসেছে।
নতুন জীবন,নতুন বন্ধু, নতুন ভবিষ্যতের এক সূর্যস্নাত সকাল। ক্লাসরুমে ঢুকেই হাসি, আড্ডা, উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে সে ও তার বন্ধুরা। ইমথিহা জাহান আয়াত, হুজাইফা ইসলাম আরোরা, সাজিয়া হোসেন সুমাইয়া, রুহান শেখ আর আকাশ খান। এই ছয় বন্ধু যেন একটি পরিবার, হৃদয়ের আত্মীয়।
স্যার ক্লাসে না থাকায় সবাই একসাথে বসে ক্লাসরুমে আড্ডা দিচ্ছিলো এমন সময় একটা মেয়ে আসে ইয়ানার কাছে। মুখে চিন্তার ছায়া......
---- ইয়ানা আমার একটা কাজ করে দিবে?
ইয়ানা--- কি কাজ করতে পারি তোমার জন্য?
মেয়েটি-- খুব দরকারি, একটু বাহিরে চলো। কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
ইয়ানা দ্বিধায় পড়ে যায়।
আয়াত পাশ থেকে বলে,,,
"ঠিক আছে চলো আমি ও যাচ্ছি।
মেয়েটি মুচকি হাসি দিয়ে বলে,,,,
"না আয়াত শুধু ইয়ানা গেলেই হবে।
ইয়ানা ---ঠিক আছে চলো।
সন্দেহ জন্মালেও, ইয়ানা সৌজন্যে না বলতে পারে না।
চুপচাপ মেয়েটিকে অনুসরণ করে চলে যায় একটি
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি ইয়ানাকে নিয়ে একটি ক্লাসরুমে প্রবেশ করে।ইয়ানা চারদিকে তাকিয়ে দেখে পুরো রুম ফাঁকা। সে মেয়েটিকে কিছু বলতে গেলে দেখে মেয়েটি নেই। আজবতো বললো কি কাজ আছে এখন মেয়েটি গেলো কই?সে এইসব ভাবতে ভাবতে যখন ক্লাসরুম থেকে বের হতে যাবে তখনি একটা ছেলের পরিচিত কন্ঠ শুনতে পায়।
ছেলেটি---হেই সুইটহার্ট এত কষ্ট করে ডেকে আনলাম কথা না বলেই চলে যাচ্ছো।
চমকে উঠে ইয়ানা। এই কন্ঠ তার কাছে ভয়ানক ভাবে পরিচিত। সে ঘুরে দাঁড়ায়.....
"" রায়হান! তুমি? তুমিই ডেকেছো আমাকে?
রায়াহানের বিকৃত হাসি,,,,,,,
"হ্যা জান ওই মেয়েটাকে আমিই পাঠিয়েছি তোমাকে আনার জন্য।আমি বললে তো তুমি আসতে না।
ইয়ানা রায়হানের কথা শুনে চমকে যায়। রায়হানের চোখে এক বিকৃত আনন্দ। মুখে এক জঘন্য বাঁকা হাসি।
এই ছেলেটা?সেই ভয়ঙ্কর নাম যার সাথে অসংখ্য মেয়ের কান্না জড়িত। যার সম্পর্কে ইয়ানা বহু কিছু শুনেছে।নারীর অনুভূতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, গুজব, ব্যবহারের কাহিনি।
রায়হান এগিয়ে আসে।
—কি হলো জান? কি ভাবছো?
ইয়ানা সামান্য পিছিয়ে যায়। কন্ঠে ঘৃনা তিব্রতা আর তীক্ষ্ম গর্জন,
"এই ছেলে তোমার সাহস কি করে হয় আমাকে এইখানে ডেকে আনার?
রায়হান একটা জঘন্য হাসি দিয়ে বলে,,,
"শুধুইতো ডেকে এনেছি আরতো কিছু করিনি। কতবার ভালোবাসার কথা বললাম অথচ রিজেক্ট করে দিলে। কতো মেয়ে আমকে এক রাতের জন্য পেতে চায়।কত মেয়ের সাথে রুম ডেট করেছি তার হিসাব নেই কিন্তু তোমাকে ছুইনি পর্যন্ত। কারন তুমি স্পেশাল।কতক্ষণ নিজের ভদ্রতা ধরে রাখতে পারব জানিনা বেইবি। তাই বলছি আমার ভালোবাসা স্বীকার করো জান। হালাল ভাবে তোমায় পেতে চাই। "
তার কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে বেঁধে বসে ইয়ানার আত্মায়।
মনের ভিতর এক বিস্ফোরণ ঘটে। সে পলকে রায়হানের কলারে হাত রাখে।চোখের দৃষ্টিতে দাবানলের মতো আগুন,
দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
"ইউ বাস্টার্ড! আর কত মেয়ের জীবন শেষ করবি তুই?
তোর মতো মানুষকে দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে।
ভালোবাসা? সেটা তো বিলাসিতা, যেটা তোর মতো মানুষের কদর্য হাতে মরে যায়। আর একবার আমার সামনে আসিস, আর এই নোংরা মুখে আমার নাম উচ্চারণ করিস—
এর মাঝেই রায়হান নীচু কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,,
"তুই কী করবি জান? তুই জানিস না রাগলে কী ভয়ঙ্কর সুন্দরী দেখায়!তোর গর্জন আমাকে আরও পাগল করে দেয়।
হঠাৎ করেই সে অশালীনভাবে এগিয়ে এসে ইয়ানাকে জড়িয়ে ধরে। সমস্ত ঘৃণা, অপমান, ক্রোধ একসাথে ফুটে ওঠে ইয়ানার মুখে। সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সজোরে এক চড় বসিয়ে দেয় রায়হানের গালে।
তারপর অপমান আর অভিমানে চোখে জল নিয়ে
মুখ নিচু না করে মাথা উঁচু করে হনহন করে বেরিয়ে যায় সেই রুম থেকে।
রায়হান ধীরে ধীরে গালে হাত বুলিয়ে হেসে ওঠে,
সেই হাসি ছিল ঠাণ্ডা কিন্তু ভয়ানক।চোখে এক ধরণের অন্ধ প্রতিশোধের আগুন।
"এই রায়হান শেখের গায়ে মাছিও বসে না,আর তুই? তুই আমায় থাপ্পড়?তুই তো জানিস না এর দাম কী।তোর সেই চোখে প্রথম দিন যেদিন তোর দিকে তাকিয়েছিলাম সেদিনই ভেবে নিয়েছিলামতোকেই চাই।জোরে হোক বা সেচ্ছা তুই আমার হবিই।
এই বলে সে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।আর তার পেছনে রয়ে যায় শীতল বাতাসের বিষাক্ত প্রতিধ্বনি।
ইয়ানা রাগে দুঃখে ক্লাসরুমে প্রবেশ করে। তার এই দিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আরোরা চমকে উঠে ,,,
- কিরে তোর চোখ মুখ এমন দেখাচ্ছে কেনো? কিছু হয়েছে নাকি? এই মেয়েটা কি বলল?
ইয়ানা কাঁপা কণ্ঠে মুখে হাসির পর্দা টেনে বলে,
"না রে, কিচ্ছু না। সব ঠিক আছে।
আকাশ ভ্রুঁ কুঁচকে বলে,
"তুই কি আমাদের বাচ্চা ভাবিস নাকি? তোর চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দান থেকে হেরে ফিরেছিস।আর বলছিস কিছু হয়নি?
এই কথায় ইয়ানার ঠোঁট কেঁপে ওঠে চোখের জল আর আটকাতে পারে না।সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।একটা মেয়ে যাকে সবাই চেনে হাসির জন্য আজ তার কান্নাই যেন গোটা ক্লাসরুমটা স্তব্ধ করে দেয়। বন্ধুরা কেউ কিছু বলে না। তারা চুপচাপ তাকে ঘিরে রাখে।এই বন্ধুরাই তো তার দ্বিতীয় পরিবার। যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু আত্মার বন্ধন সবচেয়ে দৃঢ়।
রোহান মজার ভঙ্গিতে বলে উঠতে যায়,
" কিরে বাসর রাতে জামাই পালিয়েছে নাকি?
কিন্তু আয়াত তাকে থামিয়ে দেয়,
"রোহান! চুপ কর। দেখছিস না মেয়েটা কেমন ভয় পেয়ে আছে!
সুমাইয়া ধমকের সুরে বলে,
—“চুপ কর তোরা। ইয়ানা বল তো বেবি আসলে কী হয়েছে?
এইবার ইয়ানা আর চেপে রাখতে পারে না।
সে সব খুলে বলে রায়হান, তার অপমান, সেই ক্লাসরুমের ঘটনা।
পুরো ঘটনা শুনে রোহান এক নিঃশ্বাসে বলে,
"বাপরে! বইন, কাদের পাল্লায় পরেছিস!
এই রায়হান তো অন্ধকার জগতের লোক। খুন, ধর্ষণ, হুমকি এমন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে তার নাম জড়ায় না।
সুমাইয়া নিচু স্বরে বলে,
"ঠিকই বলছ। কয়েকদিন আগেই একটা রেপ কেস হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে রায়হান করেছে কিন্তু ভয়েই কেউ কিছু বলতে পারে না।
আকাশ দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায়।চোখে আগুন জ্বলে ওঠে,,,,,
"এই শালার এত বড় সাহস!তোকে স্পর্শ করার মতো অপমান!এইবার ওর মুখটাই থেঁতলে দিব!
সবাই চুপচাপ। কারণ আকাশের রাগ তারা ভালোই জানে।
আকাশ যদি এখন কিছু করে বসে, তাহলে বিপদে পড়বে ও-ই। কারণ রায়হানের পাশে সবসময় থাকে বডিগার্ড থাকে।
আরুরার গভীর আওয়াজ,,,,,
"শান্ত হ ভাই এখন রাগ করার সময় নয়। ঠান্ডা মাথায় সবকিছু ভাবতে হবে।
তার যুক্তিসঙ্গত কথায় সবাই ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
আকাশ একটু শান্ত হলেও, মুখে তার ক্ষোভ এখনো ফুটে আছে।চোখে লাল রেখা।থুতনিতে থেমে থাকা গর্জন।
ইয়ানা নিচু গলায় বলল,
"রায়হান বলেছে সে দুই মাসের জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছে। নাকি খুব জরুরি কোনো কাজে।
রুহান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"কি আর কাজ? নতুন কারো রক্তে হাত রাঙাতে যাচ্ছে নিশ্চয়। এ ওর স্টাইল।
সুমাইয়া একটু চিন্তিত গলায় বলে,,,,,
"যাক, অন্তত এই দুই মাসের জন্য তোকে নিয়ে আমাদের দম বন্ধ হওয়ার মতো ভয় থাকবে না। তবে ইয়ানা মনে রাখিস রায়হানের নজর একবার যার ওপর পড়ে সে সহজে রেহাই পায় না।এখন আমাদের খুব সাবধানে এগোতে হবে। তবে আদৌ কি আমরা ওর হাত থেকে বাঁচতে পারব?
বন্ধুরা যখন একের পর এক পরিকল্পনায় মগ্ন তখনই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিওন কণ্ঠ তুলে বলে,
"ইয়ানা বিনতে আসাদ? প্রিন্সিপাল স্যার আপনাকে এখনই তার অফিসে যেতে বলেছেন।
হঠাৎ এ ধরনের ডাকে সবাই থমকে যায়। সবার চোখে ছায়া নামে।
আয়াত ফিসফিস করে বলে,
"এই সময় প্রিন্সিপাল কেন ডাকবে?
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুমাইয়া ইয়ানার কাঁধে হাত রেখে বলে,
"ভয় পাস না।
ইয়ানা মন শক্ত করে উঠে দাঁড়ায়। বুকের ভেতর অনির্বচনীয় এক উৎকণ্ঠা। ধীরে ধীরে পায়ে পায়ে রওনা দেয় প্রশাসনিক ভবনের দিকে।
প্রিন্সিপালের কক্ষে পৌঁছে।কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে,
"স্যার। আসতে পারি?
ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ শোনা যায়,
"হ্যাঁ ইয়ানা, ভিতরে এসো। আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
দরজার খোলামেলা পরিবেশেও ঘরটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে।প্রিন্সিপাল তাকে চেয়ারে বসতে ইশারা করেন।
তাঁর টেবিলের উপর রাখা ফোনে কয়েকটি ছবি খোলা।
"তুমি কি জানো, এই ছবিগুলো এখন আমার কাছে কীভাবে এসেছে?
ইয়ানা তাকিয়ে দেখে সেদিকে। ছবি একটার পর একটা।
রায়হান তার দিকে এগিয়ে আসছে।রায়হান তাকে জড়িয়ে ধরছে।আরেকটা সে রায়হানকে চড় মারছে।
তবে কোনোটাতেই পুরো ঘটনা নেই। থাকছে না মেয়েটির চোখে তীব্র ভয় বা প্রতিরোধের দৃশ্য।
ছবিগুলো যেন ইচ্ছেমতো ছেঁটে ছেঁটে বানানো এক ভ্রান্ত গল্প।
ইয়ানার মুখ সাদা হয়ে যায়। ঠোঁট কাঁপে গলা শুকিয়ে যায়।
মনে মনে ভাবে—
"এই ছবি ! কে তুলেছে? কিভাবে? আর কার কাছে গেছে আগে?
প্রিন্সিপাল তখন গলা পরিষ্কার করে গম্ভীরভাবে বলে
ওঠেন,
---- ইয়ানা তোমার থেকে এটা আশা করিনি। তুমি আমাদের ভার্সিটির মেধাবী ও ভালো একজন শিক্ষার্থী। আর তুমি কিনা" আর হ্যাঁ এইসব করার যদি ইচ্ছে হয় তাহলে ভার্সিটির বাইরে গিয়ে করতে পারো। দয়া করে ভার্সিটির পরিবেশ নষ্ট করো না।
প্রিন্সিপাল স্যারের রূঢ় কথাগুলো ইয়ানার বুকের ভেতর পাথরের মতো ভারি হয়ে ঝুলে থাকে। তিনি কিছু বলেননি তবুও তার চোখ দুটো যেন বলে দিয়েছে,
"তুমি দোষী।
চোখ নামিয়ে ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে ইয়ানা।
চারদিক ঝাপসা হয়ে আসে।কেউ কিছু বলছে।, কেউ ডাকছে হয়তো, কিন্তু তার কানে কিছু ঢোকে না।মোবাইলটা বন্ধ করে দেয়।এই মুহূর্তে সে কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না। কারো সহানুভূতি নিতে চায় না।সে শুধু একা থাকতে চায় নিঃশব্দে, নিঃস্বভাবে। পা টেনে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে সে শহরের প্রান্তে চলে এসেছে বোঝেনি।
একসময় এক পুরনো, ধূলিধূসরিত, জনমানবহী গোডাউনের সামনে এসে দাঁড়ায়। পচা ইট, ধ্বংসপ্রায় দেয়াল, আর ভাঙা গেটের ভেতর সে প্রবেশ করে।
চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন তার মনের গর্জন ঢেকে রাখে।
সেখানে বসে পড়ে। হিমসিক্ত মেঝেতে বসে হাহাকার করে কাঁদতে থাকে। তার কান্নায় যেন সমস্ত অভিমান, অপমান, কষ্ট সব মিশে আছে।
নিজেকে প্রশ্ন করে,,
"আমি কী করেছি? কেন আমাকে এইভাবে বিচার করা হলো?
আজ অবধি কেউ তার চরিত্র নিয়ে একটাও কথা বলেনি
আর আজ সে জেনেই অপরাধী হয়ে গেছি।
এই সময়েই ঠিক সেই রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল একটি কালো Range Rover। স্মোক গ্লাসে ঢাকা ভারী গর্জন করা সেই গাড়ি আসলে চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক।
অহংকারে পেটানো শান্ত আগুনের মতো পুরুষ আহান চৌধুরী। গাড়ির ভিতর পাশের সিটে বসে থাকা রায়ান গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে,
"এই সন্ধ্যার আধো আলোয় এমন একটা ভয়ংকর জায়গায় একটা মেয়ে একা বসে আছে!
আহান নিজের চিন্তায় এতটাই ডুবে ছিল যে আশেপাশে কিছুই দেখেনি। সে জানালার দিকে তাকায়। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যায়।
একটা মেয়ে একা ধূলিতে বসে আছে। বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নেয়।
আহান রায়ানের মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে বলে,,
"কে কোথায় আছে না দেখে গাড়ি স্টার্ট কর।
রায়ান জানালার দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলে,
"ব্রো, তুই তো জানিস এই এলাকা রায়হানের এলাকা সন্ধ্যার পর এখানে ওর ছায়ারাও ঘোরে। এই মেয়েটা যদি ওর লোকেদের চোখে পড়ে তাহলে কী অবস্থা করবে তোর জানা আছে। এক কাজ কর, তুই একটু বস। আমি গিয়ে দেখে আসি।
এই বলে রায়ান দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল, তখনই পাশে বসা আহান তার হাত চেপে ধরে রাগত কণ্ঠে বলে,
'তোর পায়ের ব্যথাটা ভুলে গেছিস নাকি? এই অবস্থায় কোথাও যাচ্ছিস কেমন করে?
রায়ান একটু ইনোসেন্ট ফেইস করে বলে ,
"কি করব বল? মেয়ে মানুষটাকে তো যমের দরজায় ফেলে যেতে পারি না। আর তুই তো যাবি না তোর তো মেয়েদের এলার্জি’ আছে!
আহান চোখ উল্টে বিরক্তির ছায়া ফেলে বলল,
"ঠিক আছে তুই বস। আমি গিয়ে দেখি।
রায়ান আনন্দে হালকা গদগদ হয়ে হেসে বলল,
"এই তো ঠিক কথা। যা।
আহান ধীরে গাড়ি থেকে নামে। চোখে - মুখে রাগ আর বিরক্তি। তার পায়ের ভারী জুতো গোডাউনের ভাঙা জমিনে ধাপ ফেলে। চারপাশের স্তব্ধতায় যেন তার পদচারণায় শব্দের জন্ম নেয়। সামনে এগিয়ে আসে।
এক মেয়ে ধুলোয় বসে আছে।মাথা নিচু করে রাখা। চোখে লোনা অশ্রু।
আহান কিছুটা রাগত স্বরে বলে উঠে।
"এই মেয়ে! জানের মায়া নেই? এমন জায়গায় সন্ধ্যার বেলায় একা বসে আছো কেন? জানো না এটা কাদের এলাকা?
ধমকের শব্দে ইয়ানার চিন্তার স্রোত থেমে যায়। সে এতক্ষণ অতীতের ঘূর্ণিতে হারিয়ে ছিল প্রিন্সিপাল স্যারের কণ্ঠ, ছবির অপবাদ, চোখের অপমান সবকিছু যেন ভেঙে গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ল সেই কণ্ঠের হুংকারে।
সে ধীরে মুখ তোলে চোখ তুলে তাকায় সেই অপরিচিত পুরুষের দিকে। আহান চমকে উঠে। অশ্রু ভেজা নয়নে বাচ্চামো চেহারার মেয়েটার দিকে নজর আটকে যায়। মনে হচ্ছে পৃথিবী থমকে গিয়েছে।
চলবে.....................