ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেজর শিকদার

১৩তম পর্ব

লেখক: ঈশিতা ইশা

#মেজর_শিকদার

#পর্ব_১৩

#ঈশিতা_ইশা 
....
পুরোটা রাস্তা তৃণা সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চেয়েছে যাতে মাহি সুস্থ থাকে আর খবরটা মিথ্যে হয়। মাহির সাথে কিছু হলে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।
জ্যাম ঠেলে পৌছাতে বেশ সময় লাগে।
পপুলার হাসপাতালের সামনে গাড়িটা থামতেই প্রায় দৌড়ে নেমে পড়ে তৃণা। বুকের ভেতরটা এত জোরে ধুকপুক করছে যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছে না সে।
রিসেপশনের দিকে ছুটে গিয়ে কাঁপা গলায় বলে,
"এক্সকিউজ মি। একটু আগে এক্সিডেন্টের এক পেসেন্ট এসেছে।"
"নাম?"
"মাহি শিকদার।"
রিসেপশনের মেয়েটা কম্পিউটারে কিছুক্ষণ দেখে বলে,
"ইমারজেন্সিতে আছে। দ্বিতীয় তলায়।"
আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না তৃণা। লিফটের অপেক্ষা না করে দ্রুত সিঁড়ি বাইতে শুরু করে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
ইমারজেন্সির সামনে পৌঁছেই দেখতে পায় একজন নার্স বের হচ্ছে।
"এক্সকিউজ মি সিস্টার, মাহি শিকদার নামে কেউ ইমারজেন্সীতে আছে?"
নার্স মাথা নাড়ে।
"আপনি কে? রোগীর আত্মীয়?"
"জি। আমি ওর ভাবি।"
"চিন্তার কিছু নেই। মাথায় হালকা আঘাত পেয়েছে আর হাতে ফ্র্যাকচার সন্দেহ করা হচ্ছে। এক্স-রে করা হবে। এখন ডাক্তারের অবজারভেশনে আছে।"
কথাটা শুনেই বুকের ওপর জমে থাকা বিশাল পাথরটা সরে যায়। তৃণা দেয়ালে হাত রেখে ধীরে নিঃশ্বাস নেয়। যাক অবশেষে গুরুতর কিছু হয়নি। আল্লাহর কাছে অজান্তেই শুকরিয়া আদায় করে সে।
নার্স যেতেই তৃণা ইমারজেন্সীর সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। অনুমনি ছাড়া প্রবেশ করাটাও ঠিক হবে না।
ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের সামনে পায়চারি করছে তৃণা।
দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার কাঁটা যেন আজ ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে। প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে অসহ্য লাগছে। ইমারজেন্সীতে ডাক্তার আর নার্সদের যাওয়া-আসা চলছে। হাত দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে তৃণা। কিছুতেই স্থির হতে পারছে না সে।
হঠাৎ ফোনটা কেঁপে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে রওনকের নাম। তৃণা তড়িঘড়ি কলটা রিসিভ করে।
"হ্যালো.."
ওপাশ থেকে রওনকের গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে আসে,
"পৌছেছো?"
"হ্যাঁ।"
"মাহি কোথায়?"
"ইমারজেন্সীতে আছে। নার্স বললো মাথায় সামান্য আঘাত লেগেছে আর হাতে ফ্র্যাকচার এর সন্দেহ করা হচ্ছে। হাতে এক্স-রে করা হবে। মাহি এখন ডাক্তার এর অবজারভেশনে আছে।"
রওনক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে।
তারপর প্রশ্ন করে,
"তুমি ঠিক আছো?"
তৃণা এক মুহূর্ত থেমে যায়।
এই পরিস্থিতিতে নিজের কথা ভাবার সুযোগই পায়নি সে।
কিছুটা থেমে উত্তর দেয়,
"হ্যাঁ..আমি ঠিক আছি।"
"কাঁদছো?"
তৃণা দ্রুত চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে ফেলে।
"না।"
"মিথ্যা বলো না।"
গম্ভীর স্বরটা শুনেই তৃণার বুকটা হঠাৎ কেমন করে ওঠে।
রওনক আবার বলে,
"শোনো, ভয় পেও না। মাহির কিছু হবে না।"
তৃণা ঠোঁট কামড়ে ধরে।
"আমি জানি না কেনো, কিন্তু খুব ভয় লাগছে।"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা ভেসে আসে।
তারপর রওনক নিচু স্বরে বলে,
"আমি রাহিকে পাঠিয়েছি। ও খুব শিগগিরই পৌছে যাবে। তুমি একা থাকবে না।"
তৃণা ধীরে মাথা নাড়ে। যদিও রওনক সেটা দেখতে পায় না।
"হুম।"
"আর একটা কথা।"
"জি?"
রওনকের গলা হঠাৎ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
"হাসপাতালে অপরিচিত কেউ তোমার সাথে কথা বলতে এলে বা কোনো অদ্ভুত কিছু মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে।"
তৃণার বুক ধক করে ওঠে।
"আপনি এমন বলছেন কেনো?"
রওনক কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে।
তারপর বলে,
"এখন কিছু জিজ্ঞেস কোরো না। শুধু আমি যা বললাম সেটা মনে রেখো।"
তৃণা কিছু বলার আগেই ইমারজেন্সীর দরজাটা খুলে যায়। একজন নার্স বেরিয়ে আসে।
"মাহি শিকদারের সাথে কে আছেন?"
তৃণা রওনককে বলে,
"পরে কল দিচ্ছি।"
কলটা কেটে তৃণা তড়িঘড়ি করে সামনে এগিয়ে যায়।
তৃণার বুকের ধুকপুকানি আবার বেড়ে যায়।
সে জবাব দেয়,
"আমি আছি।"
"আপনার রোগীকে কেবিনে শিফট করা হবে।"
নার্স কথাটা বলার কয়েক মিনিট পর স্ট্রেচারে করে মাহিকে বাইরে আনা হয়। মাথায় ব্যান্ডেজ। ডান হাতটাও ব্যান্ডেজ করা। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবে জ্ঞান আছে।
তৃণাকে দেখেই মাহি দুর্বল হাসে।
"কিরে মুখটা এমন করে রাখছিস কেনো?"
তৃণার চোখ ভিজে ওঠে।
তৃণা কিছু বলে না। শুধু স্ট্রেচারের পাশে পাশে হাঁটতে থাকে। মাহিকে কেবিনে শিফট করা হয়।
ডাক্তার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে চলে গেলে কেবিনে কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে আসে।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে মাহি। পাশের চেয়ারে বসে তৃণা।
মাহি আবার বলে,
"কিরে, আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না যে?"
তৃণা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে।
"তোর এই অবস্থা দেখে আমি কীভাবে স্বাভাবিক থাকি বল?"
মাহি ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টানে।
"এই যে দেখ, আমি তোর সাথে কথা বলছি। এত চিন্তা করার কিছু হয়নি।"
তৃণা রাগী চোখে তাকায়।
"আর একবার এমন কথা বললে কিন্তু সত্যি রাগ করবো।"
মাহি দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে।
"আচ্ছা বাবা, আর বললাম না।"
কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলে,
"ডাক্তারও তো বললো, মাথায় সামান্য চোট। হাতটার এক্স-রে করলেই বোঝা যাবে। আমি ঠিক আছি।"
তৃণা ধীরে বলে,
"তুই ঠিক আছিস বলেই তো আল্লাহর কাছে হাজারবার শুকরিয়া আদায় করছি।"
মাহি তৃণার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
তারপর হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে বলে,
"আচ্ছা, তোকে কে খবর দিলো?"
তৃণা একটু থেমে জবাব দেয়,
"একজন অপরিচিত লোক। বললো তোর ফোনের ইমারজেন্সি কন্টাক্টে আমার নাম্বার ছিল।"
মাহি অবাক হয়ে তাকায়।
"অপরিচিত লোক?"
"হুম।"
"আশ্চর্য! আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না।"
তৃণা আস্তে জিজ্ঞেস করে,
"আসলে কী হয়েছিল বল তো?"
মাহি চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড মনে করার চেষ্টা করে।
"আমরা রাস্তায় আসছিলাম। হঠাৎ একটা বাইক খুব স্পিডে উল্টো দিক থেকে সামনে চলে আসে। ড্রাইভার ওকে বাঁচাতে গাড়ি ঘুরায়। তারপরই একটা বিকট শব্দ.."
সে থেমে যায়।
"তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখি হাসপাতালে।"
তৃণার ভ্রু কুঁচকে যায়।
"ড্রাইভার?"
"ওরও নাকি একটু চোট লেগেছে। তবে আমার চেয়ে কম।"
তৃণার বুকের ভেতরটা আবার অস্বস্তিতে মোচড় দিয়ে ওঠে।
মাথার ভেতর ভেসে ওঠে
সেই মেসেজ—
'দ্যা গেম ইজ অন।'
এটা কি সত্যিই একটা দুর্ঘটনা? নাকি কেউ ইচ্ছা করেই...
তমণার মস্তিষ্কে যখন একরাশ প্রশ্ন এসে হানা দেয় ঠিক তখনই তার ফোনটা কেঁপে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে— আননোন নাম্বার।
নাম্বারটা দেখেই তৃণার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
মাহি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, "কার ফোন?"
তৃণা তড়িঘড়ি স্ক্রিনটা নিভিয়ে ফেলে।
"ভুল নাম্বার।"
বলে কলটা কেটে দেয়। মাহি আর কিছু বলে না।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে ওঠে। একই নাম্বার।
এবার তৃণার মুখের রঙই বদলে যায়। মাহি সেটা খেয়াল করে ফেলে।
"তৃণা, সব ঠিক আছে তো?"
তৃণা জোর করে হাসার চেষ্টা করে।
"হ্যাঁ। আচ্ছা, তুই বোস। আমি নার্সের সঙ্গে কথা বলে আসি। এক্স-রের ব্যবস্থা হয়েছে কি না দেখে আসি।"
মাহি মাথা নাড়ে।
"যা।"
তৃণা ফোনটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে।
করিডোরে এসে চারপাশে একবার তাকায়। লোকজনের আনাগোনা চলছে। একটু নির্জন দিকে সরে গিয়ে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে কলটা রিসিভ করে।
"হ্যালো.."
ওপাশ থেকে ভেসে আসে সেই অপরিচিত, ঠান্ডা পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠ।
"দেখলেন? আমি মিথ্যে বলিনি।"
তৃণার চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে ওঠে।
"মাহির অ্যাক্সিডেন্টের সাথে আপনার সম্পর্ক আছে? এসব আপনি করিয়েছেন?"
লোকটা হালকা হেসে ওঠে।
"আমি শুধু প্রথম চালটা দিয়েছি, মিসেস শিকদার।"
তৃণার হাত কেঁপে ওঠে।
"আপনি কে?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে লোকটা বলে,
"যে মানুষটা অনেক বছর ধরে মেজর রওনক শিকদারের পতনের অপেক্ষায় আছে।"
তৃণার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়।
"আপনি কী চান?"
লোকটা এবার ধীরে, স্পষ্ট স্বরে বলে,
"আপনাকে।"
তৃণার নিঃশ্বাস যেন আটকে যায়। কিছু একটা বলার পূর্বেই লোকটা বলে ওঠে,
"কারণ এই খেলায় আপনি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি।"
তৃণা কিছু বলতে যেয়েও পারে না। সঙ্গে সঙ্গে কলটা কেটে যায়। 
তৃণা তড়িঘড়ি করে নাম্বারটিতে কলব্যাক করে।
সঙ্গে সঙ্গেই রেকর্ড করা একটি নারীকণ্ঠ ভেসে আসে—
"আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন।"
একই বার্তা ইংরেজিতেও শোনা যায়।
ফোনটা ধীরে ধীরে নামিয়ে আনে তৃণা। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে।
ঠিক তখনই তার মনে হয় কেউ যেন তাকে দেখছে। ধীরে ধীরে মুখ তুলে করিডোরের শেষ মাথার দিকে তাকায়। কিন্তু সেখানে তখন শুধু কয়েকজন রোগীর স্বজন হাঁটাহাঁটি করছে।
তৃণা আর কিছু না ভেবে গভীর নিঃশ্বাস নেয়। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।
সে জানে না—
করিডোরের বাঁক ঘুরে, দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা কালো ক্যাপ আর কালো মাস্ক পরা লোকটা ঠিক এই মুহূর্তেও তার প্রতিটি নড়াচড়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ফোনটা সাইলেন্ট করে তৃণা ফিরে যায় কেবিনে।
...
সাত দিন কেটে গেছে।
মাহিকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। মাথার ব্যান্ডেজটা এখনও খোলা হয়নি। ডান হাতে প্লাস্টার। ডাক্তার অন্তত তিন সপ্তাহ পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে বলেছেন। আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ সে। তবে বেশি নড়াচড়া করতে এখনও নিষেধ।
এই দুই দিনে অচেনা নাম্বার থেকে আর কোনো ফোন আসেনি।
তবুও তৃণার অস্বস্তিটা একটুও কমেনি। হাসপাতালের সেই ফোনকল আর রওনকের সতর্কবাণী বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ঝড়টা থেমে যায়নি—শুধু সাময়িকভাবে স্তব্ধ হয়ে আছে।
সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে যথারীতি।
রিশান খেতে বসে একের পর এক বাহানা করছে। কখনও বলছে ডিম খাবে না, কখনও আবার দুধের গ্লাস সরিয়ে রাখছে।
তৃণা ধৈর্য ধরে ওকে খাইয়ে দেয়। তারপর স্কুল ইউনিফর্ম পরিয়ে, ব্যাগটা কাঁধে তুলে দেয়।
"দুষ্টুমি করবে না কিন্তু। ম্যামের কথা শুনবে।"
রিশান দাঁত বের করে হেসে মাথা নাড়ে। রিশানকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে আসে তৃণা।
আজ তারও ক্লাস আছে। দ্রুত নিজের জন্য একটা শাড়ি বের করে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুলটা গুছিয়ে বাঁধতে বাঁধতেই বিছানায় রাখা ফোনটা বেজে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে— মা।
তৃণা সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ করে।
"আসসালামু আলাইকুম, মা।"
ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে আসে।
"ওয়ালাইকুম সালাম। তৃণা, তুই কি আজ একটু আসতে পারবি?"
তৃণার হাত থেমে যায়।
"কেন? কী হয়েছে?"
"তোর নানুর শরীরটা খুব খারাপ। সকাল থেকে প্রেসার অনেকটা নেমে গেছে। বারবার তোর কথা জিজ্ঞেস করছে। যদি সময় করতে পারিস, একবার এসে দেখে যা।"
তৃণার মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে যায়।
"ডাক্তার দেখানো হয়েছে?"
"হ্যাঁ, ডাক্তার এসেছে। আপাতত ওষুধ দিয়েছে। কিন্তু মানুষটা তোকে দেখতে চাইছে।"
তৃণা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে।
"আচ্ছা মা, আমি আসছি।"
কলটা কেটে দিয়ে তৃণা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
নানুর শরীর খারাপের খবর শুনে মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে যায়।
সে ঘড়ির দিকে তাকায়। আজ ক্লাসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে নানুর কাছে যাওয়াটাই বেশি জরুরি।
সিদ্ধান্ত নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
ড্রয়িংরুমে এসে দেখে মাহি সোফায় বসে টিভি দেখছে। ডান হাতের প্লাস্টারটা এখনও গলায় ঝোলানো স্লিংয়ের ভেতর রাখা। আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ দেখাচ্ছে তাকে।
তৃণাকে দেখে মাহি জিজ্ঞেস করে,
"কোথাও যাচ্ছিস?"
"হ্যাঁ। মা ফোন দিয়েছিল। নানুর শরীরটা নাকি হঠাৎ খারাপ হয়েছে। একবার দেখে আসছি।"
মাহির মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়।
"ওহ... তাহলে তাড়াতাড়ি যা। গিয়ে আমাকে খবর দিবি।"
"হুম। তুই ওষুধগুলো সময়মতো খেয়ে নিস।"
"ওকে, ভাবি।"
মাহির কথায় তৃণার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
..
গাড়িটা ধীরে ধীরে ধানমন্ডির পরিচিত বাড়িটার সামনে এসে থামে।
গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই বহুদিনের চেনা বাড়িটার দিকে চোখ পড়ে তৃণার। এই বাড়িতেই তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে। অথচ আজ চারপাশের এত পরিচিত পরিবেশও তার মনে একটুও স্বস্তি এনে দিতে পারে না।
কলিংবেল বাজানোর আগেই ভেতর থেকে দরজা খুলে দেন শবনম বেগম।
"এসেছিস মা?"
তৃণা এগিয়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।
"নানু কেমন আছে?"
শবনম বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
"একটু আগেই ঘুমিয়ে ছিল। প্রেসারটা অনেক নেমে গিয়েছিল। এখন একটু ভালো আছে।"
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে আসেন তৈয়ব উদ্দিন।
"আয় মা।"
তৃণা বাবার দিকে তাকিয়ে সালাম দেয়।
"আসসালামু আলাইকুম, আব্বু।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছিস?"
"আলহামদুলিল্লাহ।"
তৈয়ব উদ্দিন স্নেহভরা চোখে মেয়ের দিকে তাকান।
"মাহির খবর কী?"
"অনেকটাই ভালো আছে। ডাক্তার বিশ্রামে থাকতে বলেছেন।"
"আলহামদুলিল্লাহ।"
এমন সময় নিজের কক্ষ হতে বেরিয়ে আসে তমাল।
"আরে আপু! তুই এসেছিস?"
তৃণার মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
"হ্যাঁ রে।"
তমাল এগিয়ে এসে বোনের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয়।
"চল, আগে নানুর কাছে চল। সকাল থেকেই তোর কথাই বলছে।"
তৃণা আর এক মুহূর্ত দেরি করে না।
ধীরে ধীরে করিডোর পেরিয়ে নানুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে উঁকি দিতেই দেখে, সাদা চাদর ঢাকা বিছানায় শুয়ে আছেন তার নানু। বয়সের ভারে শরীরটা অনেকটাই ভেঙে গেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
তৃণার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে বসে, কুঁচকে যাওয়া হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে আস্তে করে ডাকে,
"নানু, আমি এসেছি।"
নানু ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকান।
কয়েক সেকেন্ড যেন বুঝতেই পারেন না সামনে কে বসে আছে। তারপর ঝাপসা দৃষ্টিটা পরিষ্কার হতেই ঠোঁটের কোণে ম্লান একটা হাসি ফুটে ওঠে।
"আমার..তৃণা.."
তৃণার চোখ ভিজে ওঠে।
"হ্যাঁ নানু। আমি এসেছি।"
নানু কাঁপা হাতে তৃণার গালে আলতো করে হাত রাখেন।
"তোকে না দেখে..মনটা কেমন অস্থির লাগছিল রে।"
তৃণা হাতটা আরও শক্ত করে ধরে।
"আমি তো এসে গেছি। এখন আর কোনো চিন্তা নেই।"
শবনম বেগম পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলেন,
"সকাল থেকে কিছুই খেতে চাইছিল না। শুধু বলছিল, তৃণাকে একবার দেখতে চাই।"
তৃণা নানুর কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়।
"এবার কিন্তু ভালো মেয়ের মতো ওষুধ খাবে। আমি নিজে দেখে যাব।"
নানু মৃদু হেসে বলেন,
"তোকে দেখে আমার অর্ধেক অসুখ সেরে যায়।"
তৃণাও মুচকি হাসে।
নানুর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ গল্প করে তৃণা। নিজের হাতে তাকে ওষুধ খাইয়ে দেয়।
শবনম বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
"তুই আসার পর থেকেই মানুষটা যেন একটু চাঙা হয়ে উঠেছে।"
তৃণা মৃদু হেসে নানুর কপালে চুমু খায়।
"এখন তুমি বিশ্রাম করো আমি আছি। কেমন?"
নানু মৃদু হেসে মাথা নাড়েন। তৃণা এবং শবনম বেগম কক্ষ ত্যাগ করে।
শবনম বেগম চলে যায় রান্নাঘরে। দুপুরের রান্নাবান্নার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন ইতিমধ্যে। তৃণাও আসে মা'কে সাহায্য করতে।
রান্না শেষ করতে বেশ বেলা হয়ে যায়। গোসল সেরে চুলে তোয়ালে পেঁচিয়ে বসার ঘরে উপস্থিত হয় তৃণা।
কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবারের জন্য ডাইনিং টেবিলে বসে সকলে। তৃণাও এসে বাবার পাশের চেয়ারটায় বসে। ঠিক তখনই তার মনে পড়ে রিশানের কথা। সে ফোন বের করে মাহিকে কল দেয়।
দ্বিতীয়বার রিং হতেই কলটা রিসিভ হয়।
"হ্যালো?"
"রিশান স্কুল থেকে ফিরেছে?"
"হ্যাঁ। একটু আগেই এসেছে। ইউনিফর্ম পাল্টে খেতে বসেছে।"
তৃণার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে।
"ভালো। খাওয়া শেষ হলে একটু ঘুম পাড়িয়ে দিস।"
"আচ্ছা। তুই চিন্তা করিস না।"
"আর তোর ওষুধ খাওয়া হয়েছে?"
মাহি হেসে বলে,
"হ্যাঁ রে, সব খেয়ে নিয়েছি। এত টেনশন করিস না।"
"ভালো। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন দিবি।"
"ঠিক আছে।"
কলটা কেটে দিয়ে তৃণা আবার খেতে বসে।
ঠিক তখনই—টিং টং শব্দ করে কলিংবেলটা বেজে ওঠে। 
হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে সবাই দরজার দিকে তাকায়।
শবনম বেগম রান্নাঘর থেকে বলেন,
"তৃণা, মা, দরজাটা তো একটু খুলে দেখ।"
তৃণা তখনও খাচ্ছিল। ডান হাত এঁটো।
"আচ্ছা, আমি দেখছি।"
এঁটো হাতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে।
দরজার লক খুলতেই তৃণা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রওনক!
সাদা শার্টটা ঘামে ভিজে পিঠের সঙ্গে লেগে গেছে। কপালেও ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে। দুই হাতে এতগুলো ব্যাগ যে দরজার বেল বাজাতেও কনুই ব্যবহার করতে হয়েছে। এক হাতে দই-মিষ্টির প্যাকেট, অন্য হাতে নানা ধরনের ফলের ব্যাগ।
তৃণা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে।
"আপনি!"
রওনক হালকা হাসল।
"ভেতরে ঢুকতে দেবে? নাকি নিজের আপন বরকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখবে, তৃণলতা?"
.....
(চলবে..)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন