★★★
বাইরে তখন রোদের কড়া তেজ। জানালার পর্দার ভাঁজ দিয়ে সেই সোনালি আলো উঁকি দিলেও রুমের ভেতরের মায়াবী নিস্তব্ধতা ভাঙতে পারছিল না। আরিয়ান আর তৃণা যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ কোনো এক সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। আরিয়ানের প্রশস্ত বুকের একপাশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তার শ্যামলিনী। আরিয়ানের দুই হাতের শক্ত বাঁধন যেন তৃণার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
হঠাৎ দরজায় সজোর করাঘাতে তৃণার তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। ঘুমের ঘোরেই আরিয়ান একটু নড়েচড়ে উঠে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। তৃণা আধোবোজা চোখে তাকাতেই দেখল তার ঠিক সামনেই আরিয়ানের সেই পুরুষালি বুক। মুহূর্তের জন্য তৃণা ভুলে গেল যে দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। পরম আবেশে সে আবারও আরিয়ানের বুকের মাঝে মুখ লুকালো।
কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে নৌশির চপল কণ্ঠস্বর এবার স্পষ্ট শোনা গেল,
“বউ মণি! আজ কি তোমরা ঘুম থেকে উঠবে না নাকি?”
নৌশির ডাকে তৃণার পুরো ঘুমটাই এক নিমেষে টুটে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে তো রীতিমতো আঁতকে উঠল সকাল দশটা বেজে বিশ! সে তড়িঘড়ি করে আরিয়ানের লোহার মতো শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা শুরু করল। কিন্তু আরিয়ান যেন ঘুমের ঘোরেও তাকে ছাড়তে নারাজ। অনেক মুচড়ামুচড়ি আর কসরত করে শেষমেশ নিজেকে মুক্ত করে বিছানা থেকে নামল তৃণা।
দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজা খুলতেই নৌশির সেই হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠল। ফর্সা চেহারায় লাল টকটকে ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে নৌশি মিটিমিটি হাসছে। তৃণা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“আসলে... কাল রাতে খুব দেরি করে ঘুমিয়েছি তো, তাই উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল।”
তৃণার কথা শুনে নৌশি প্রথমে বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ কী যেন ভেবে মুখ চেপে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি দিল।
তৃণা ভ্রু কুঁচকে নৌশির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে? হাসছো কেন?”
নৌশি হাসি সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে কোনোমতে বলল,
“কিছু না... যাও, তাড়াতাড়ি শাওয়ার নিয়ে নিচে এসো বউমণি।”
তৃণা বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। নৌশি চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েও পেছন ফিরে টিপ্পনী কাটল,
“বাড়িতে কিন্তু ছোট একটা অবিবাহিত ননদ আছে! একটু বুঝে-শুনে দরজা খুললে ভালো হতো।”
বলেই সে ফিক করে হেসে দ্রুত পায়ে করিডোর দিয়ে চলে গেল।
তৃণা বিভ্রান্ত হয়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। নৌশি কী নিয়ে এত হাসল? ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াতেই তৃণার যেন বজ্রপাত হলো! নিজের গলার দিকে তাকিয়ে তার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। গলার ঠিক নিচে গভীর ভালোবাসার স্পষ্ট দাগ এক গাঢ় রক্তিম চিহ্ন! তৃণা হাত দিয়ে দাগটা ঢাকার চেষ্টা করল, আর মনে মনে ভাবল, ‘এই কারণেই তবে নৌশি ওভাবে হাসছিল!’
সে লাজুক হেসে ঘুমে আচ্ছন্ন আরিয়ানের দিকে তাকালো। অগোছালো চুলে আর গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা লোকটাকে আজ যেন অন্যদিনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সুন্দর লাগছে। তৃণা মোহাবিষ্ট হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।
এদিকে ড্রয়িংরুমে মির্জা বাড়ির কর্ত্রীরা সবাই তখন সকালের আড্ডায় ব্যস্ত। নৌশি নিচে নামতেই মায়মুনা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“তৃণারা কি উঠেছে রে?”
নৌশি সোফায় বসে বলল,
“হুম, ডেকে দিয়ে এলাম।”
মায়মুনা বেগম একটু বিরক্তির সুরে বললেন,
“আহা, ডাকতে গেলি কেন? একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে, হয়তো শরীরটা ভালো নেই। আরেকটু ঘুমালে কী এমন ক্ষতি হতো?”
নৌশি উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গের মোড় ঘুরিয়ে বলল,
“আমি একটু বন্ধুদের সাথে বাইরে যাচ্ছি আম্মু।”
রাহি বেগম (নৌশির মা) শাসন মেশানো গলায় বললেন, “বেশি দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি ফিরবি।”
নৌশি উঠে গিয়ে নিজের মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদরমাখা স্বরে বলল,
“ওসব বলতে হবে না ! তোমার মেয়ে অনেক লক্ষ্মী, আমি ঠিক সময়েই ফিরে আসব।”
বলেই সে বাড়ির তিন কর্ত্রীর গালে টপ টপ করে চুমু খেয়ে নিল। বাড়ির এই এক নিয়ম, নৌশি সবসময় ছোট বাচ্চার মতো বাড়ির বড়দের এভাবেই ভালোবেসে মাতিয়ে রাখে।
★★★
মিতু একদৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে যান্ত্রিকভাবে চুল আঁচড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার মন সেখানে নেই, পড়ে আছে কালকের সেই বিষণ্ণ ঘরটিতে। আয়নার নিজের প্রতিবিম্বটাকেও আজ তার কাছে বড় অচেনা মনে হচ্ছে।
রোহান রুমে ঢুকে মিতুর এই শূন্যতা দেখে বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ধীর পায়ে মিতুর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। মিতুর কাঁধে হাত রাখতেই মেয়েটা চমকে উঠল। রোহান মিতুর ঘাড়ে নিজের মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী হয়েছে আমার নীলাঞ্জনার? মনটা কি কোথাও হারিয়ে গেছে?”
মিতু নিজেকে স্বাভাবিক করার বৃথা চেষ্টা করে অস্ফুট স্বরে বলল,
“না... কিছু না তো।”
রোহান আয়নার ভেতর দিয়েই মিতুর চোখের গভীর বিষাদটুকু মেপে নিচ্ছিল। মিতু হঠাত্ ঘুরে দাঁড়িয়ে রোহানের মুখোমুখি হলো। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“একটা কথা বলি? রাখবে আমার কথাটা?”
রোহানের ভ্রু কুঁচকে গেল। মিতুর চোখের ওই উদাসীনতা দেখে সে আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল মিতু কী বলতে যাচ্ছে। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“এমন কোনো আবদার করো না নীলাঞ্জনা, যা রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব।”
মিতু রোহানের কথা পাত্তা না দিয়ে এবার বলেই ফেলল,
“প্লিজ তুমি আরেকটা বিয়ে করো রোহান। আমি চাই তুমিও একদিন ‘বাবা’ ডাক শোনো। আমি তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি, আমি একটুও রাগ করব না।”
রোহান এবার কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না, চুপ করে রইল। রোহানের এই নিস্তব্ধতা মিতুকে দ্বিধায় ফেলে দিল। সে আবারও বলল,
“রাখবে না আমার এই কথাটা?”
রোহান এবার মিতুকে অবাক করে দিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠল,
“তোমার কথা কি আমি কখনো ফেলেছি? তাহলে এই বড় কথাটা না রেখে কীভাবে পারি? তুমি যখন বলছ, তবে তাই হোক।”
মিতুর বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই বরফ হয়ে গেল। সে নিজের মন থেকেই রোহানকে বিয়ের কথা বলেছিল, কিন্তু রোহান এত সহজে রাজি হয়ে যাবে তা সে কল্পনাও করেনি। তার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করল। মিতু অবিশ্বাসে শুধু বলতে পারল, “হুঁ?”
রোহান এবার একটু বাঁকা হেসে বলল,
“বললাম তাহলে মেয়ে দেখা শুরু করো। দ্বিতীয় বিয়ে করতে রাজি হয়নি এমন পুরুষ কি পৃথিবীতে আছে? চারটা বিয়ে করতে পারলে তো আরও ভালো, আলহামদুলিল্লাহ!”
মিতু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিজের অজান্তেই তার দুচোখ বেয়ে গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে নিজের অধিকার অন্য কাউকে বিলিয়ে দেওয়ার কথা মুখ ফুটে বললেও, তার অন্তর যেন এই নিষ্ঠুর সত্যটা নিতে পারছে না।
মিতুকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রোহান আর অভিনয় ধরে রাখতে পারল না। সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। পরক্ষণেই মিতুকে এক ঝটকায় নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রোহান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ভারী কণ্ঠে বলল,
“আমার এই অস্তিত্বে নীলাঞ্জনা ছাড়া অন্য কোনো নারীর ছায়া পড়ার আগে যেন আমার মরণ হয়। আমার ভালোবাসা এত সস্তা নয় যে কোনো একটা অপূর্ণতার কারণে আমি তোমাকে দূরে সরাবো । আমার পূর্ণতা শুধু তোমাতেই।”
মিতু রোহানের বুকে মুখ লুকিয়ে শব্দ করে কেঁদে দিল। এই কান্নায় যেমন যন্ত্রণা ছিল, তেমনি ছিল হারানোর ভয় থেকে মুক্তির এক পরম তৃপ্তি।
★★★
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসতেই ভোরের সেই অদ্ভুত শীতলতা তৃণার শরীর ছুঁয়ে গেল। আরিয়ান তখনও শয্যায় অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাকে জাগানোর কোনো চেষ্টা না করেই তৃণা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে তার নজর স্থির হলো আয়নায় নিজের গলার ওপর। শাওয়ারের উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় দাগগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, ঠিক যেন কোনো এক গভীর অনুরাগের রক্তিম স্বাক্ষর।
তৃণা নিজের আঙুল দিয়ে সন্তর্পণে সেই দাগগুলো একবার ছুঁয়ে দেখল। মুহূর্তেই গত রাতের সেই মায়াবী স্মৃতিগুলো তার মনে ভিড় করে এলো। এক অনির্বচনীয় আবেশে সে নিজের দুই হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে ফেলল। সে নিজেই নিজের কাছে আজ বড্ড অচেনা, তার এই লাজুক সত্তা, এই অদ্ভুত শিহরণ সবকিছুই যেন আরিয়ানের পরশে নতুন রূপ পেয়েছে। নিজেকে কোনোমতে স্বাভাবিক করে সে আবারও চুলে তোয়ালে দিয়ে ঝাড়া দিতে শুরু করল।
ঠিক তখনই অবাধ্য চুলের কয়েক ফোঁটা জল ছিটকে গিয়ে পড়ল আরিয়ানের ঘুমন্ত চেহারায়। ঘুমের ঘোরে ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত মুখে চোখ মেলল আরিয়ান। কিন্তু চোখ মেলতেই আয়নার সামনে ভেজা চুলের সেই মায়াবিনীকে দেখে সে যেন এক পলকেই স্তব্ধ হয়ে গেল। অন্য সময় হলে হয়তো এমন কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় একটা কড়া বকুনি দিয়ে বসত লোকটা, কিন্তু আজ তার মুখে কোনো অভিযোগ নেই। বরং সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল এক শ্যামকন্যার স্নিগ্ধ রূপের দিকে।
আরিয়ান বিছানা ছেড়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো। তৃণা আরিয়ানকে আসতে দেখলেও কোনো কথা বলল না, নিজের মতো চুল মোছায় ব্যস্ত রইল। কিন্তু পরক্ষণেই এক বলিষ্ঠ হাতের বাঁধনে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল আরিয়ান। আচমকা এই স্পর্শে তৃণা একটু শিউরে উঠলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করল না।
আরিয়ান তৃণার সেই সুবাসিত ভেজা চুলে নিজের মুখ লুকালো। এক দীর্ঘ গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সে যেন তৃণার চুলের প্রতিটি কণা থেকে সবটুকু ঘ্রাণ শুষে নিতে চাইল।
আরিয়ানের কণ্ঠস্বর তখন ভোরের কুয়াশার মতো ঘন আর নেশাতুর। তৃণার ভেজা চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“সকাল সকাল আমাকে ধ্বংস করার পায়চারি করছেন বুঝি, মিসেস আরিয়ান মির্জা? এত সুন্দর মায়াকাড়া মুখ নিয়ে জন্মাতে কে বলেছিল আপনাকে? উপরওয়ালার অশেষ রহমত যে আপনি আমার জন্য চিরতরে হালাল, তা না হলে এই রূপ দেখে আমার চোখের জিনার পরিমাণ বোধহয় আকাশ ছুঁত।”
তৃণা আরিয়ানের এই গভীর আর অকপট স্বীকারোক্তিতে নিজের চোখ দুটো বুজে নিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অভিমানী হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর স্বরে বলে উঠল,
“অথচ এই শ্যামলা চেহারার জন্য আপনিই আমাকে কতবার খোঁটা দিয়েছেন, মনে আছে আপনার?”
আরিয়ান এবার তৃণার দুই কাঁধ ধরে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তৃণার কাজল ধোয়া চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে সে নরম গলায় বলল,
“আমার কাছে রূপ বা গায়ের রঙ কখনোই বড় ছিল না শ্যামলিনী। তোমাকে কড়া কথা শোনানোর কারণ চেহারা ছিল না, বরং আমার জেদ ছিল। আমি চেয়েছিলাম তুমি যেন আমাকে ঘৃণা করে আমার জীবন থেকে চলে যাও।”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,
“ওহ, তাই নাকি? তাহলে এক কাজ করি, সুযোগ যখন আছে আমি এখনই চলে যাই?”
“এক পা বাড়িয়ে দেখো শুধু, একদম ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব!”
আরিয়ান মুহূর্তেই তৃণার কোমরের বাঁধন আরও শক্ত করে নিল। মুখে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করল।
আরিয়ানের শাসানি শুনে তৃণা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। তৃণার সেই মুক্তোর মতো হাসির শব্দে আরিয়ানের কঠোরতাও মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। সেও তৃণার হাসিতে যোগ দিল।
★★★
পার্কের চারধারে বিকেলের মায়াবী রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। নৌশি, মৌ আর আঁখি তিন বন্ধু মিলে বাদাম চিবোতে চিবোতে হাঁটছে। এইচএসসি পরীক্ষার পর জীবনটা যেন অনেকটা বদলে গেছে। কিছুদিন আগেই নৌশির রেজাল্ট বেরিয়েছে, জিপিএ ফাইভ পেয়ে সে এখন উড়ন্ত পাখির মতো আনন্দিত। কিন্তু বন্ধুদের আড্ডায় তো আর শুধু পড়াশোনার কথা থাকে না!
আঁখি বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে হঠাৎ কনুই দিয়ে নৌশিকে গুঁতো দিয়ে বলল,
“কিরে নৌশি, রেজাল্ট তো ফাটাফাটি করলি। এবার কি প্রেম-ট্রেম করার কোনো ইচ্ছা আছে? আর কতদিন এই সিঙ্গেল তকমা নিয়ে ঘুরবি?”
মৌ আঁখির কথায় তাল মিলিয়ে যোগ করল,
“একদম ঠিক! আমরা তো কয়েকদিন পর হয়তো বিয়েই করে ফেলব। তুই কি আসলেই সিঙ্গেল নাকি আমাদের কাছে কিছু লুকাচ্ছিস?”
নৌশি হালকা হেসে দূরে দিগন্তের দিকে তাকালো। তার চোখে এক পলকের জন্য অন্যরকম একটা আবেশ ফুটে উঠল। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“আরে না, লুকানোর কিছু নেই। তবে আমি একটা বিশেষ দিনের অপেক্ষায় আছি।”
“কোন দিন?” দুজন একসাথে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল।
নৌশি একটু লাজুক হেসে বলল,
“যেদিন আমার মনে বসবাস করা মানুষটা নিজে থেকে এসে আমাকে বলবে ‘ভালোবাসি নাদানের বাচ্চা’।”
আঁখি আর মৌ অবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। আঁখি বলল,
“বাহ! তা কে সেই মহাপুরুষ? কবে থেকে উনি তোর মনে ঘর বেঁধেছেন শুনি?”
নৌশি আনমনে বলল,
“কবে থেকে জানি না, তবে এটুকু বুঝি তাকে ছাড়া আমি বড্ড অসহায়।”
কথাটা বলতে বলতেই নৌশির কণ্ঠ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো কিছুটা দূরে পার্কের একটি বেঞ্চের দিকে। সেখানে পাশাপাশি বসে আছে দুজন একজন আদনান, আর অন্যটি একটি অপরিচিত মেয়ে। তারা বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে হাসাহাসি করছে আর বাদাম খাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখা মাত্রই নৌশির বুকের ভেতরটা কেমন যেন জ্বলে উঠল।
বন্ধুরা নৌশিকে ওভাবে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৌ জিজ্ঞেস করল,
“কিরে, কী হলো? থেমে গেলি কেন?”
নৌশি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কিছু না। তোরা চলে যা, আমি আসছি।”
বলেই নৌশি হনহন করে আদনানের দিকে এগোতে শুরু করল। কিছুদূর যেতেই তার পা জোড়া যেন মাটির সাথে গেঁথে গেল। দেখল, মেয়েটি হাসতে হাসতে বারবার আদনানের গায়ে ঢলে পড়ছে, অবলীলায় তার হাত স্পর্শ করছে। নৌশির সারা শরীরে এক অসহ্য রাগের ঢেউ খেলে গেল।
সে আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গিয়ে তাদের ঠিক সামনে দাঁড়ালো। নৌশিকে আচমকা এভাবে সামনে দেখে আদনান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল এবং মুখে এক চিলতে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলল,
“নৌশি! তুই এখানে?”
“তার আগে বল তুই এইখানে কেন?” নৌশির গলার স্বর কঠিন।
আদনান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এভাবে জিজ্ঞেস করছিস কেন?”
নৌশির গলার স্বর সপ্তমে চড়ে গেল। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে রীতিমতো চিৎকার করে উঠল,
“এভাবে জিজ্ঞেস করব না তো কীভাবে করব? তুই এই মেয়েটার সাথে এখানে কী করিস? কে হয় ও তোর?”
আদনান অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। পার্কের দু-চারজন মানুষ তখন তাদের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। নৌশি এবার সেই মেয়েটির সামনে গিয়ে রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়িয়ে বলল,
“এই মেয়ে! তুমি আদনানের সাথে কী করছ এখানে, শুনি?”
মেয়েটি হকচকিয়ে গিয়ে আদনানের দিকে তাকালো। বিরক্তির সুরে বলল,
“আদনান, এই মেয়েটা কে? এভাবে কথা বলছে কেন আমার সাথে?”
নৌশির রাগ এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। সে ফেটে পড়ে বলল,
“আমি কে মানে? আমি নৌশি! তুই আদনানের সাথে কেন এত ঘনিষ্ঠ হচ্ছিস?”
নৌশি আরও কিছু কড়া কথা বলতে উদ্যত হতেই আদনান এক ঝটকায় তার হাত টেনে ধরে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে আদনান বলল,
“নৌশি, ওয়াট ইজ রং উইথ ইউ? এসব কীরকম বিহেভিয়ার তোর?”
“তোকে আমি না করছি না কোনো মেয়ের সাথে মিশবি না? তাহলে তুই এখানে বসে কী করিস? লজ্জা লাগে না তোর?”
আদনান এবার চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“লজ্জা লাগবে কেন? আর তুই এরকম ব্যবহার করার মানে আমি বুঝতে পারছি না। আমি যা-ই করি না কেন, তাতে তোর কোনো সমস্যা হওয়ার তো কথা না!”
“তুই একজনের সাথে বসে বসে প্রেম করবি আর সেটা আমি মেনে নেব?” নৌশির গলায় এবার হাহাকার।
আদনান এবার তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল,
“তুই মেনে নেওয়া বা না নেওয়ার কে? আমার পার্সোনাল লাইফ সম্পর্কে নাক গলানোর তুই কে? তুই শুধুই আমার কাজিন, এছাড়া আর কোনো অধিকার তোর নেই আমার ওপর। পরের বার থেকে নিজের ব্যবহার ঠিক করে কথা বলবি।”
বলেই আদনান মেয়েটার দিকে ফিরে গিয়ে বলল,
“চলো মিলি, এখান থেকে যাই।”
আদনান চলে গেল, কিন্তু নৌশি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই পাথরের মতো জমে রইল। তার কানে শুধু একটা কথাই বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল “কে তুই? আমার পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলানোর কে তুই?”
নৌশির মনের ভেতর তখন প্রলয়ংকরী ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতির আকাশটাও যেন নৌশির মনের সাথে তাল মিলিয়ে অন্ধকার হয়ে এল। চারদিক মেঘে ঢেকে গেল, বইতে লাগল তপ্ত বাতাস। নৌশির চোখের কোণে টলটল করতে থাকা জল এবার বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ল।
এতদিন যে মৌন ভালোবাসাকে সে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে, আদনানের শাসনের আড়ালে যে ভালোবাসার স্বপ্ন বুনেছে সবটাই কি তবে ভুল ছিল? আদনান কি তবে কখনোই তাকে সেই বিশেষ জায়গাটা দেয়নি
#রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র
#বোনাস_পর্ব (আদনান-নৌশি)
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
আকাশ চিরে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অঝোর ধারায় নামা সেই বৃষ্টিতে মুহূর্তেই চারপাশ ঝাপসা হয়ে এল। মির্জা বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভিজে একাকার হয়ে ঢুকল আদনান। বাইকটা কোনোমতে গ্যারেজে রেখেই দৌড়ে ড্রয়িংরুমে এসে হাঁফ ছাড়ল সে। শার্টের হাতা দিয়ে কপাল আর ঘাড়ের জল মুছতে মুছতে আঙুলে বাইকের চাবিটা বনবন করে ঘুরাচ্ছিল সে।
ঠিক যখনই সিড়ির দিকে পা বাড়াবে, তখনই রাহি বেগমের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর তার কানে এল,
“আদনান! নৌশি কোথায় রে? ও কি তোর সাথে ছিল?”
আদনানের পা সেখানেই থেমে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন কেঁপে উঠল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“নৌশি কোথায় মানে? ও কি বাড়িতে নেই?”
রাহি বেগম কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বললেন,
“না তো! ও তো সকালে বলল বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবে, দুপুরের আগেই ফেরার কথা। এখন দুটো বেজে পার হয়ে গেল, অথচ মেয়েটার পাত্তা নেই। বাইরে দেখছিস কীরকম বৃষ্টি শুরু হয়েছে!”
আদনান আর মুখ ফুটে বলতে পারল না যে, ঘণ্টাখানেক আগেই পার্কের মাঝখানে নৌশির সাথে তার এক পশলা লড়াই হয়ে গেছে। সে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কল দিতে নিতেই রাহি বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কল দিয়ে লাভ নেই, আমি অনেকবার ট্রাই করেছি। ওর ফোন বন্ধ বলছে।”
“কী? ফোন বন্ধ!” আদনান নিজের কপালে আঙুল দিয়ে ঘষতে লাগল।
রাহি বেগমের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। তিনি বললেন,
“খুব টেনশন হচ্ছে আমার। মেয়েটা কখনো এমন করে না।”
আদনান নিজেকে সামলে নিয়ে বড় মা-কে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না বড় মা। বন্ধুদের সাথেই আছে হয়তো, বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছে। আমি যাচ্ছি, ওকে এখনই নিয়ে আসছি।”
আদনান আর দেরি করল না। ভিজে শার্টেই আবার বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। দৌড়ে বাইকে ওঠার সময় সে দ্রুত তার মোবাইল থেকে নৌশির বান্ধবী মৌ-এর নাম্বারটা বের করল। আদনান সবসময়ই একটু সাবধানি, নৌশির সব বন্ধুদের নাম্বার সে নিজের কাছে সেভ করে রেখেছিল কোনো এক বিপদের কথা ভেবে। আজ যেন সেই দিনটাই সামনে এসে দাঁড়াল।
মৌ-এর ফোনে রিং হতে হতেই আদনানের মনে বারবার নৌশির সেই জলভরা চোখের করুণ মুখটা ভেসে উঠল। পার্কের সেই কড়া কথাগুলোর জন্য এখন নিজের ভেতরেই এক অপরাধবোধ কাজ করছে। বৃষ্টির ঝাপটায় চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে নৌশির ফোন বন্ধ থাকার কথা শুনে।
আদনানের দূরদর্শিতা আজ সত্যিই কাজে লেগে গেল। মৌ ফোন ধরতেই আদনান কোনো ভনিতা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“আমি নৌশির কাজিন আদনান বলছি। নৌশি কি তোমার সাথে?”
ওপাশ থেকে মৌ অবাক হয়ে উত্তর দিল,
“না তো! ও তো অনেকক্ষণ আগেই পার্কে কাকে যেন দেখে বলল আমাদের চলে যেতে, ও পরে আসবে। আমরা তো তখন থেকেই বাসায়। কেন, কোনো সমস্যা হয়েছে?”
“না, কিছু না,” বলেই আদনান কলটা কেটে দিল।
আদনানের ভেতরের অস্থিরতা এবার ঝড়ের বেগে বাড়তে লাগল। তার মানে নৌশি সেই পার্ক থেকে আর কোথাও যায়নি! বাইরের বৃষ্টির দাপট আরও বেড়েছে, সাথে বইছে ঠান্ডা হাওয়া। এই দুর্যোগে একটা মেয়ে একা কোথায় থাকতে পারে? নিজের ওপর প্রচণ্ড আফসোস হতে লাগল আদনানের। রাগের মাথায় কেন যে ওভাবে কথা বলতে গেল!
সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাইক স্টার্ট দিল। তার একমাত্র লক্ষ্য এখন সেই পার্ক। চারদিকের ঝাপসা অন্ধকার আর বৃষ্টির তোড় ঠেলে সে পাগলের মতো বাইক চালাচ্ছে। ফাঁকা রাস্তায় দু-একটা গাড়ি ছাড়া আর কেউ নেই। আদনানের বুকের ভেতরটা তখন মোচড় দিয়ে উঠছে এক অজানা আশঙ্কায়।
হঠাৎ রাস্তার মোড় ঘুরতেই আদনানের চোখ আটকে গেল। রাস্তার একপাশে ডিভাইডারের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে এক মানবী। আদনান এক ঝটকায় বাইক থামিয়ে দিল। মনে হলো মৃতদেহে যেন প্রাণ ফিরে এল তার।
বাইকটা স্ট্যান্ড করিয়েই সে দৌড়ে এগিয়ে গেল। বৃষ্টির ঝাপটায় তার টি-শার্ট শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে, গায়ের সাদা শার্টের বোতামগুলো খোলা।
নৌশি রাস্তার ধারে মাথা নিচু করে বসে আছে। পরনের কাপড় আর চুল ভিজে একাকার হয়ে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। আদনান নৌশির সামনে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে থামল। বৃষ্টির জল উপচে না পড়লে হয়তো দেখা যেত আদনানের কপালের ঘাম বৃষ্টির জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। নৌশি একবার মাথা তুলে আদনানকে দেখল, কিন্তু তার চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই, কোনো অভিযোগও নেই। সে যেন এক পাথরের প্রতিমা।
রাগী অথচ কান্নার মতো শোনানো এক অদ্ভুত স্বরে চিৎকার করে উঠল,
“এই নাদানের বাচ্চা! কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই তোর? এই বৃষ্টির মধ্যে এভাবে রাস্তায় বসে আছিস কেন? কিছু হয়ে গেলে কী হতো?”
নৌশি কোনো জবাব দিল না। সে আগের মতোই নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তখন শুধু শোনা যাচ্ছিল আদনানের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।
আদনান ভেজা রাস্তায় হাঁটু গেঁড়ে নৌশির ঠিক সামনে বসল সে। নিচু হয়ে নৌশির নুয়ে থাকা মুখটা দেখার চেষ্টা করে খুব নরম স্বরে শুধাল,
“কী হয়েছে? খুব রাগ হয়েছে আমার ওপর?”
আদনানের প্রশ্নটা শেষ হতে না হতেই নৌশি হঠাত্ হো হো শব্দে হেসে উঠল। বৃষ্টির তীব্র ঝাপটা আর চারদিকের ধূসর আবহাওয়ার মাঝে নৌশির এই অট্টহাসি কেমন বিদঘুটে আর যন্ত্রণাময় শোনাল। আদনান ভ্রু কুঁচকে পাথরের মতো তাকিয়ে রইল। নৌশি হাসি থামিয়ে একদৃষ্টে আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“রাগ? রাগ তো তাদের সাথেই করা যায় যারা আপন হয়, যাদের ওপর অধিকার থাকে। কিন্তু আমি তোর ওপর রাগ করার কে? কেনই বা রাগ করব?”
আদনান এবার সত্যিই আহত হলো। সে কপাল কুঁচকে বলল,
“আমি তোর আপন না? আমি তোর কেউ না?”
নৌশি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মনে করিয়ে দিল,
“কেন, কিছুক্ষণ আগেই না পার্কে সবার সামনে চিৎকার করে বললি ‘কে তুই? আমার পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলানোর তুই কে?’ মনে পড়ছে না ?”
আদনান এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। নিজের বলা বিষাক্ত শব্দগুলো যে এভাবে ফিরে আসবে, সে ভাবেনি। সে কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল এবং নৌশির হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে বলল,
“জেদ করিস না। চল বাড়ি চল।”
নৌশি এক ঝটকায় আদনানের হাতটা সরিয়ে দিল। তার চোখেমুখে এখন কেবল ঘৃণা আর অভিমান। সে চিৎকার করে উঠল,
“ডোন্ট টাচ মি! একদম ছোঁবে না আমায়!”
আদনান হতভম্ব হয়ে বলল,
“কী সমস্যা তোর? কেন এমন করছিস?”
“আমার কী সমস্যা সেটা তোকে বুঝতে হবে না। এখানে মিথ্যে আদিখ্যেতা দেখিয়ে আমাকে খুঁজতে আসলি কেন? যা, ওই মেয়ের কাছে যা। ওখানেই তো তোর সব অধিকার!”
আদনান এবার মেজাজ হারাল। রাগী স্বরে বলল,
“নৌশি, বাড়াবাড়ি হচ্ছে। পার্কেও অযথা সিন ক্রিয়েট করেছিস, এখানেও করছিস। আর তর্কা-তর্কি না করে চুপচাপ চল আমার সাথে।”
নৌশি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “অযথা সিন ক্রিয়েট করেছিলাম? তুই কেন ওই মেয়ের সাথে বসো ওমন আদিখ্যেতা করবি?”
আদনান নৌশির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমি যদি কোনো মেয়ের সাথে প্রেমও করি এতে তোর তো কোনো যায় আসার কথা না? হিংসা হয় নাকি তুই সিঙ্গেল আর আমি প্রেম করছি বলে?”
নৌশি অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে রইল।তারপর হঠাৎ রাগিস স্বরে বলল,
“তোর কি মনে হয় আমি প্রেম করতে পারিনা?”
“না পারিস না।”
“আজ এই বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে আমি কথা দিচ্ছি সাতদিনের মাঝে আমি বিয়ে করবো।দেখে নিস।”
নৌশির কথায় আদনান কিছুটা স্তব্ধ হয়ে গেল পরক্ষণেই বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ, অনেকদিন ধরে কোনো বিয়ে খাওয়া হচ্ছে না। এবার খেতে পারবো।”
নৌশি অসহায় নয়নে তাকিয়ে রইল। আদনান কি তার কথাটা সিরিয়াস ভাবে নেয়নি?
নৌশি বৃষ্টির জল আর চোখের জল একসাথে মুছে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর শান্ত কিন্তু পাথুরে গলায় বলল, “তুই যা এখান থেকে। আমি একাই যেতে পারব।”
“আমি আবারও বলছি, চল আমার সাথে।”
“বললাম তো আমি একাই যেতে পারব! কথা কানে যায় না তোর?” নৌশির জেদি কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে গেল।
আদনান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। রাগে গড়গড় করতে করতে নিজের বাইকের দিকে হাঁটা দিল। নৌশি অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে রইল আদনানের চলে যাওয়ার দিকে। তার মনে হলো, সত্যিই কি তবে আদনান তাকে একা ফেলে চলে গেল? বুকটা এক অসহ্য ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল তার। সে যখন উল্টো দিকে ফেরার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকানোর মতো একটা হেঁচকা টানে সে থমকে গেল।
দেখল, আদনান ফিরে এসেছে। সে কোনো কথা না বলে নৌশির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। আদনান তাকে প্রায় টানতে টানতে নিজের বাইকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
নৌশি রাগে হাত-পা ছুড়ে বলল,
“ছাড় বলছি! এভাবে আমার ওপর জোর খাটাবি না একদম।”
আদনান হঠাৎ নৌশির ঠোঁটে নিজের তর্জনী আঙুল চেপে ধরল। এক নিমিষেই নৌশি স্তব্ধ হয়ে গেল। আদনান খুব নিচু স্বরে, অনেকটা হুকুম করার মতো করে বলল,
“হুশশ! একদম বেশি কথা বলবি না। আমি জোর করতে পারি, সেই হক আমার আছে। ভালো মেয়ের মতো না মানলে সত্যি বলছি, ঠেং ভেঙে কাঁধে করে নিয়ে যাব। আমাকে তো চিনিস!”
নৌশি ভেজা গলায় পালটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল,
“কিসের জোর দেখাস তুই? কোন অধিকারে?”
আদনান উত্তর দিল না। বৃষ্টির ঝাপটায় দুজনের মুখ বেয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে। আদনান পলকহীন চোখে নৌশির ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির এই বুনো আবহেও নৌশিকে কী যে মায়াবী লাগছে! নৌশির সব কথা গলায় আটকে গেল আদনানের ওই তপ্ত চাহনি দেখে।
আদনান পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিয়ে গলার স্বর কিছুটা পালটে বলল,
“তুই আমাদের বাড়ির মেয়ে, বাড়ির ছোটদের ওপর বড়দের দায়িত্ব থাকে। সেই হিসেবেই জোর করছি।”
নৌশি মনে মনে একটা বাঁকা হাসল। নিজের ওপর ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে তার। অথচ মনে মনে সে কী সব রঙিন স্বপ্নই না বুনে এসেছিল, আদনান তাকে ভালোবাসে! অথচ আজ তার সব স্বপ্ন এক নিমিষেই কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আদনান আবারও ফিসফিস করে বলল, “তুই বড্ড অবুঝ নৌশি। এমনি এমনি তোকে নাদান ডাকি না।”
নৌশি আর কোনো তর্কে গেল না। আদনান বাইকে উঠে বসলে সে নিঃশব্দে পেছনে গিয়ে বসল। কিন্তু আদনানের শরীর স্পর্শ না করার এক আপ্রাণ চেষ্টা তার মাঝে স্পষ্ট। সে খুব দূরত্ব বজায় রেখে কোনোমতে বাইকের একদম শেষ প্রান্তে বসল।
আদনান পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
“পড়ে যাবি তো, শক্ত করে ধরে বস।”
নৌশি কোনো নড়চড় করল না, ধরলও না আদনানকে। আদনান একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাইক স্টার্ট দিল। বৃষ্টির তীব্র ঝাপটায় বাইক চালানো বেশ কঠিন, তবুও সে বার বার লুকিং গ্লাসে নৌশির মুখের দিকে তাকাচ্ছে। বৃষ্টির জলে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল চেনা না গেলেও, নৌশির অস্বাভাবিক লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো আদনানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। আজ দুজনের মাঝের এই সামান্য কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব যেন কয়েক যোজন মাইলের দূরত্বে পরিণত হয়েছে।