★★★
আজ মির্জা বাড়ি আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। সদর দরজা থেকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত টাটকা কাঁচা ফুলের সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। সময়ের স্বল্পতায় নৌশির বিয়ের আয়োজনটা বাড়িতেই করা হয়েছে, কিন্তু আভিজাত্যের কোনো কমতি নেই। মেহমানদের আনাগোনা আর হইহুল্লোড়ে মুখরিত পুরো বাড়ি। অথচ এই উৎসবের মধ্যমণি নৌশি নিজের ঘরে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। তাকে সাজানো হচ্ছে কনের সাজে, কিন্তু তার চোখের কোণে কোনো আভা নেই যেন এক প্রাণহীন পুতুল।
আজ সকালেই ঘটে গিয়েছিল এক অদ্ভুত কাণ্ড।
বাড়ির সবাই যখন ব্যস্ত, তখন আদনান ঝড়ের বেগে নৌশির ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তার উসকোখুসকো চুল আর রক্তাভ চোখ দেখে নৌশি শিউরে উঠেছিল। সে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ধমকের সুরে বলেছিল,
“কী হয়েছে তোর? এভাবে অনুমতি ছাড়া পাগলের মতো রুমে ঢুকলি কেন?”
আদনান কোনো কথা না বাড়িয়ে ঝাপটে ধরল নৌশির দুহাত। তার স্পর্শে যেন আগুনের তাপ ছিল। সে মরিয়া হয়ে বলল,
“এখনো সময় আছে নৌশি, প্লিজ এই বিয়েটা করিস না! এখনো সব ঠিক করা সম্ভব।”
নৌশি নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা না করেই শীতল গলায় প্রশ্ন করল,
“কেন করব না?”
আদনান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“কথায় কথায় কেন এমন করিস? কেন বুঝিস না যে আমি তোকে ভালোবাসি? তোকে ছাড়া আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়!”
নৌশি থমকে গেল। তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। যান্ত্রিক গলায় অস্ফুট স্বরে আবারও বলল,
“কী বললি? আর একবার বল!”
আদনান এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। নৌশির চোখের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল,
“ভালোবাসি তোকে! নিজের চেয়েও বেশি, এই মহাবিশ্বের চেয়েও বেশি। তুই কেন বুঝতে চাসনি এতদিন?”
নৌশির দুই চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল তার সাজানো গালে। আদনান এবার হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে নৌশির পায়ের কাছে বসে পড়ল। তার হাতদুটো শক্ত করে ধরে পাগলের মতো বলতে লাগল,
“এই নাদানের বাচ্চা, চল না আমরা এখান থেকে অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যাই! আমি তোকে ছাড়া বাঁচতে পারব না রে। আমার সত্যি পাগল পাগল লাগছে। তুই অন্য কারও হয়ে যাবি এটা ভাবলেই আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে!”
আদনানের কথায় নৌশি হেঁসে দিল।নৌশির সেই হাসি আদনানের বুকটা যেন ধারালো ছুরি দিয়ে চিরে দিল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল একরাশ অবজ্ঞা আর হাহাকার। নৌশি রক্তাভ চোখে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,
“একই ছাদের নিচে ১৯টা বছর কাটিয়ে দিলি আদনান, অথচ নিজের মনের কথাটুকু বলতে পারিসনি? আজ যখন আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর আমি অন্য কারোর হয়ে যাব, তখন তুই এসে বলছিস পালিয়ে যেতে? তুই আমাকে নাদান ডাকিস, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নাদান তো তুই! ভালো থাকিস আদনান। এই মুহূর্তে বাড়ির মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এক জীবনে না হয় অপূর্ণতা নিয়েই বাঁচলাম। চিন্তা করিস না, সেই অচেনা মানুষটার সাথে আমি মানিয়ে নিতে পারব। আর যদি কোনোদিন দেখি আর পারছি না, তখন না হয় এই পৃথিবী থেকেই বিদায় নেব।”
নৌশির মুখে মৃত্যুর কথা শুনে আদনান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার সমস্ত পৃথিবী যেন দুলে উঠল। সে শেষবারের মতো অসহায় কণ্ঠে বলল,
“আমি বাঁচব না তোকে ছাড়া নৌশি, সত্যিই বাঁচব না।”
নৌশি ওপাশে মুখ ফিরিয়ে নিল। নিজের চোখের অবাধ্য জলটুকু কোনোমতে গিলে নিয়ে পাথরচাপা কণ্ঠে বলল,
“কাউকে ছাড়া কেউ মরে না। সময় সব শিখিয়ে দেয়।”
আদনান এবার অদ্ভুত এক শান্ত স্বরে বলল,
“মরে, মানুষ মরে। তুই জানিস না, শুধু নিঃশ্বাস নেওয়া মানেই বেঁচে থাকা না। কিছু মানুষ দিনের পর দিন বেঁচে থাকে মরার মতো। সেই তিল তিল করে মরে যাওয়াটা যন্ত্রণাময়ী মৃত্যুর চেয়েও হাজার গুণ বেশি ভয়ঙ্কর।”
নৌশি আর কোনো উত্তর দিল না। ঘরের নিস্তব্ধতায় কেবল বাইরে সানাইয়ের সুর ভেসে আসছিল, যা আদনানের কানে বিসর্জনের বাজনার মতো বাজছিল। সে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার চোখে তখন কোনো পানি নেই, আছে কেবল এক স্থির অন্ধকার সঙ্কল্প।
আদনান ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় শেষবারের মতো নৌশির দিকে ফিরে তাকাল। তার দুচোখে তখন আর মিনতি নেই, আছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে ফিসফিস করে বলল,
“চল না নৌশি, এখনো বলছি পালিয়ে যাই। এছাড়া আমাদের এক হওয়ার আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমি তোকে ছাড়া নরকযন্ত্রণায় ছটফট করছি।”
নৌশি নিজের কাঁপাকাঁপা হাতদুটো শক্ত করে মুঠো করল। পাথরের মতো কঠিন হয়ে জবাব দিল,
“আদনান, দোহাই তোর, রুম থেকে বের হ! আর আমাকে এভাবে জ্বালাস না। আমি আর পারছি না।”
আদনান হঠাৎ করেই শব্দ করে হেসে উঠল অট্টহাসি, কিন্তু সেই হাসিতে এক তীব্র যন্ত্রণা মেশানো। সে বিড়বিড় করে বলল,
“আর জ্বালাব না তোকে? আচ্ছা, আর জ্বালাব না। এবার তোকে আমি পুড়াবো নৌশি!”
নৌশি আদনানের কথার গূঢ় অর্থ বুঝতে পারল না। সে ম্লান হেসে উত্তর দিল,
“আমি তো অনেক আগেই পুড়ে ছারখার হয়ে গেছি আদনান। পোড়া জিনিসকে আর নতুন করে কী পুড়াবি?”
আদনান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
বর্তমানে ফিরে এল নৌশি। আয়নার সামনে মিতু তখন কাজলের তুলি হাতে দাঁড়িয়ে। মিতু বলে উঠল,
“এভাবে চোখের জল ফেললে কাজলটা দেব কীভাবে? সব তো লেপ্টে যাচ্ছে!”
মিতুর কথায় নৌশির ঘোর কাটল। সে খেয়াল করল, দীর্ঘক্ষণ ধরে সে নুসরাত আর তৃণাকে দেখছে না। তার মনের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু করল। সে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
“নুসরাত আপু আর বউমনি কোথায় ? ওদের তো অনেকক্ষণ ধরে দেখছি না।”
মিতু সাজগোজের জিনিসে হাত চালাতে চালাতে হালকা স্বরে বলল,
“বাড়িতে কত কত মানুষ এসেছে দেখছিস না! হয়তো মেহমান সামলাতে কোথাও ব্যস্ত আছে।”
নৌশির বুকটা কেন জানি কু গাইছে। সকালেই সে আদনানকে শেষ দেখেছিল, তারপর আর কোনো হদিস নেই। সে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“আদনান কোথায়? ও কি ড্রয়িংরুমে?”
মিতু এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আদনান তো সেই সকালেই বাড়ি থেকে বের হয়েছে, এখনো ফেরেনি। বড় বাবা আর ছোট কাকা বারবার কল করেছেন, কিন্তু ওর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। মেজাজটাই খারাপ করে দিল ছেলেটা, আজকের দিনেও এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা!”
নৌশির বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ‘ফোন বন্ধ’ এই শব্দ দুটো তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাজছে। আদনানের সেই শেষ কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার, ‘তোকে আমি পুড়াবো’। নৌশির ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে কনের সাজ ছিঁড়ে ফেলে সব কিছু থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু সামাজিক শৃঙ্খল আর পরিবারের সম্মানের এই জাঁতাকল থেকে মুক্তি পাওয়া কি এতই সহজ?
★★★
উৎসবে মাতোয়ারা মির্জা বাড়ির হইচই থেকে নিজেকে আড়াল করে তৃণা করিডর দিয়ে প্রায় ছুটছিল। তার কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ। ঠিক নিজের রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা একটা শক্ত হাতের টানে তার গতি থমকে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ তাকে ঝটকা দিয়ে রুমের ভেতর টেনে নিল।
ভয়ে চিৎকার দিতে গিয়েও পারল না তৃণা, তার আগেই একটা উষ্ণ হাতের তালু শক্ত করে চেপে ধরল তার মুখ। ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিল সে, কিন্তু অতি পরিচিত সেই গায়ের ঘ্রাণ নাকে আসতেই ধক করে উঠল বুকটা। চোখ মেলতেই দেখল সামনে দাঁড়িয়ে তার আরিয়ান। তবে এখন তার চোখে রাগ নেই, আছে এক ভুবন ভোলানো দুষ্টুমিমাখা হাসি।
তৃণা নিজের মুখ ছাড়িয়ে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির ভান করে বলল,
“ধ্যাৎ! আপনি সবসময় এমন কেন করেন?”
আরিয়ান এক পা এগিয়ে এসে তৃণার কোমরে হাত রাখল। গাঢ় স্বরে শুধাল,
“কেমন করি, হুম?”
“এই যে... এরকম হুটহাট!” তৃণা আমতা আমতা করে বলল।
“এরকম ‘কী’?” আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।
“কিছু না!”
“কিছু না ‘কী’?” আরিয়ান এবার আরও কাছে ঝুঁকে এল।
তৃণা চোখ সরিয়ে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“জানি না।”
আরিয়ান এবার তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আজ বড্ড মায়াবী লাগছে তোমায়, আমার শ্যামলিনী।”
তৃণা লজ্জা পেয়ে একটু আড়ালে যেতে চেয়ে বলল, “শ্যামলা মানুষকে আবার সুন্দর লাগে নাকি?”
আরিয়ান তৃণার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখের গভীরতা মেপে নিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“সত্যি বলছি, আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী তুমি। এই কালচে বরণেই তো আমি বারবার হারি!”
তৃণা আলতো করে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“সরুন তো! আমি খুব টেনশনে আছি।”
আরিয়ান এবার একটু গম্ভীর হলো।
“কী বিষয় নিয়ে এত টেনশন? বিয়ে নিয়ে?”
“হুম।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, আদনানের কী হয়েছে বল তো? ছেলেটাকে কদিন ধরে কেমন জানি মনমরা দেখছি। কোনো ঝামেলা হয়েছে ওর?”
তৃণা মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। নিজের চোখের পলক লুকিয়ে নিয়ে শুকনো গলায় বলল,
“কিছু না তো, এমনি হয়তো।”
আরিয়ান তৃণার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর পায়ে ওর আরও কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কিছু একটা লুকাচ্ছ তুমি, শ্যামলিনী। তোমার ওই চঞ্চল চোখ দুটোতে মিথ্যে কথা একদম ধরা পড়ে যায়। বলো তো, আদনান আর নৌশিকে নিয়ে কোনো গোপন কথা জানো তুমি?”
তৃণা আর লুকাতে পারল না। আরিয়ানের বুকের ওপর হাত রেখে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নৌশি আর আদনানের সেই অব্যক্ত প্রেম আর তিলে তিলে পুড়ে যাওয়ার গল্পটা বলতে শুরু করল।
★★★
নৌশির সাজগোজ তখন শেষ পর্যায়ে। আয়নার প্রতিবিম্বে নিজেকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে তার টকটকে লাল বেনারসি আর গয়নার ভারে তাকে রাজকন্যার মতো দেখালেও, ভেতরটা শ্মশানের মতো খাঁ খাঁ করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে এসে ঢুকল নুসরাত। নৌশি অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, নুসরাতের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে এক চিলতে হাসি।
নৌশি ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় ছিলে এতক্ষণ আপু? কতক্ষণ ধরে তোমায় খুঁজছি।”
নুসরাত সহজভাবে জবাব দিল,
“এই তো , নিচেই ছিলাম একটু কাজে।”
ঘরের বাকি সবার চেয়ে নুসরাতকে আজ বেশি প্রফুল্ল দেখাচ্ছে। নৌশি বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল। ছোটবেলা থেকে নৌশির সামান্য মন খারাপেও যে মানুষটা হাজারবার কারণ জানতে চাইত, আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার দিনেও নুসরাত এত নির্লিপ্ত কী করে হতে পারে? নুসরাত কি তবে কিছুই বুঝতে পারছে না?
হঠাৎ নিচ থেকে শোরগোল ভেসে এল। কচিকাঁচারা চিৎকার করে বলতে লাগল,
“বর এসেছে! বর এসেছে!”
সেই শব্দটা নৌশির কানে যেন মরণঘণ্টার মতো বাজল। সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করল, ‘
বেঁচে থেকেও মরার স্বাদ পাওয়ার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম।’
নৌশি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। নুসরাত ওর কাঁধে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
“আরে, মুখটা অমন করে আছিস কেন? আজ তো তোর খুশির দিন, তাই না?”
নৌশি এবার আর চুপ থাকতে পারল না। তার ভেতরে জমানো সবটুকু অভিমান যেন বিস্ফোরিত হলো। সে নুসরাতের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল, “আপু, তুমি তো একসময় দাদাভাইকেআরিয়ান) ভালোবাসতে, তাই না? কিন্তু ভাগ্যের ফেরে তাকে পাওনি। সেই কষ্টটা কি আজ ভুলে গেছ?”
নৌশির মুখে এমন সরাসরি প্রশ্নে নুসরাত এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। তার মানে নৌশি জানত! নুসরাত নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে কিছুটা শক্ত গলায় বলল,
“অতীত নিয়ে কেন কথা তুলছিস নৌশি? ওটা আমার বোকামি ছিল। আজ দেখ আমি কত সুখে আছি। উপরওয়ালা যখন কোনো নারীর কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেন, তার বদলে আরও উত্তম কিছু দান করেন। আমার ক্ষেত্রে নির্জন ইমতিয়াজ হলো সেই শ্রেষ্ঠ উপহার।”
নৌশি এবার তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল,
“তাহলে আজ আমার এই অবস্থায় তুমি এত খুশি কেন আপু? কেন তোমার চোখেমুখে জয়ের হাসি?”
নুসরাত কোনো উত্তর দিল না। তার সেই হাসিটা আরও চওড়া হলো মাত্র। সে পরম মমতায় নৌশির কপালে একটা চুমু খেয়ে মনে মনে বলল,
’আমি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি।’
★★★
বিয়ের আসর তখন কানায় কানায় পূর্ণ। ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় ঝলমল করছে মির্জা বাড়ির আঙিনা। লাল বেনারসিতে মোড়ানো নৌশি স্টেজের ওপর পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। পাশে বসা তার হবু স্বামী, যার দিকে একবারও ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেনি সে। লোকটা আমেরিকা থাকে না কি মঙ্গল গ্রহে তা নিয়ে নৌশির বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার দুচোখ বারবার ভিড়ের মাঝে খুঁজে ফিরছে সেই চঞ্চল, জেদি ছেলেটাকে। কোথায় আদনান? সে কি সত্যিই আজ আসবে না?
কাজি সাহেব খাতা খুলে বসলেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নৌশির মনে হচ্ছিল, প্রতিটি সেকেন্ড তার বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসছে। কাজি সাহেব বরকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করতেই ওপাশ থেকে পুরুষটির জবাব এল,
“কবুল, কবুল, কবুল।”
নৌশির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আর মাত্র কয়েকটা শব্দ, তারপরই সে অন্য কারো অন্দরমহলের বন্দি হয়ে যাবে। কাজি সাহেব এবার নৌশির দিকে ফিরলেন। বিয়ের বয়ান পড়তে শুরু করলেন তিনি। নৌশি ঝাপসা চোখে সামনের দিকে তাকাতেই দেখল, তার থেকে কিছুটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আদনান।
নৌশি চমকে উঠল। আদনানের পরনে টকটকে লাল রঙের এক রাজকীয় শেরওয়ানি! এই অবেলায় আদনান কেন বরের সাজে সজ্জিত? নৌশির মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ভিড় করল। ওদিকে কাজি সাহেব তাড়া দিচ্ছেন,
“মা বলুন, কবুল বলুন।”
নৌশি সেদিকে খেয়ালই করল না। সে অপলক দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকিয়ে রইল। আদনান কোনো বিশৃঙ্খলা করল না, বরং ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসিতে আজ কোনো হাহাকার নেই, আছে এক অদ্ভুত জয়ের আনন্দ।
নৌশি অসহায় বোধ করল। বুক ফেটে কান্না আসলেও সে চোখ বন্ধ করল। নিজের নিয়তি মেনে নিয়ে ‘কবুল’ বলার জন্য ঠোঁট জোড়া কাঁপিয়ে প্রস্তুতি নিল সে।
আর ওদিকে করিডরের থামে হেলান দিয়ে আদনান ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে সময় গুনতে শুরু করল,
“এক... দুই... তিন!”
#রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র
#পর্ব_৫৪(বর্ধিতাংশ)
★★★
মির্জা বাড়ির সেই আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তেই হিমাঙ্কিত হয়ে গেল। চারদিকে রেশমি আলোর ঝিলিক ছাপিয়ে এখন কেবল পুলিশের সাইরেনের প্রতিধ্বনি আর মানুষের অস্ফুট ফিসফিসানি। নৌশি কবুল বলার ঠিক আগমুহূর্তে ইউনিফর্ম পরা চার-পাঁচজন পুলিশ অফিসার ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ায় গোটা বিয়েবাড়ি যেন থমকে গেছে।
ইকবাল মির্জা হতবিহ্বল হয়ে এগিয়ে গেলেন। তাঁর কণ্ঠে বিস্ময় আর আতঙ্ক মিশে আছে,
“কী ব্যাপার অফিসার? এভাবে আমাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আপনারা! কোনো ঝামেলা হয়েছে কি?”
পুলিশ অফিসার ইকবাল মির্জার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি নৌশির পাশে বসা সেই সুবেশ বরের দিকে এগিয়ে গেলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
“আপনারা যখন নিজেদের আদরের মেয়েকে বিয়ে দেন, তখন কি পাত্রের হাড়ির খবরটাও ভালো করে নেন না?”
ইকবাল মির্জা অবাক হলেন,
“মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি?”
অফিসার বরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল
, “এই যে আপনাদের আমেরিকা প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার, ইনি আসলে বিদেশের বড় এক দালাল চক্রের পান্ডা। বাংলাদেশের সহজ-সরল মেয়েদের উচ্চশিক্ষার আর সুন্দর জীবনের লোভ দেখিয়ে এরা বিদেশে পাচার করে দেয়। এই ছেলেটার নামে আমাদের কাছে শক্ত এভিডেন্স আছে।”
খবরটা শোনামাত্রই উপস্থিত সবার যেন বাকশক্তি হারিয়ে গেল। নৌশি আক্ষরিক অর্থেই মুখ হাঁ করে পাথরের মতো বসে রইল। বরবেশে থাকা ছেলেটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“কী যা তা বলছেন আপনি? আমি আমেরিকা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছি, আর আপনি বলছেন আমি নারী পা*চারকারী? ডু ইউ নো হু আই অ্যাম?”
অফিসার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে লোকটির কাঁধে হাত রাখলেন,
“হুম, খুব ভালো করেই জানি। প্রমাণ ছাড়া আমরা মির্জা বাড়ির মতো জায়গায় হানা দিইনি। চলো মামার বাড়ি, সেখানে গেলেই তোমার সব ডিগ্রি বেরিয়ে আসবে।”
বরের পরিবারের লোকজন তেড়ে আসলেও পুলিশের কড়া নির্দেশের সামনে সবাই দমে গেল। হট্টগোলের মাঝে নৌশি হঠাৎ খেয়াল করল করিডরের থামে হেলান দিয়ে থাকা আদনানকে। ছেলেটা বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়, বরং তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা আরও গাঢ় হয়েছে।
বরের বাবা মরিয়া হয়ে এগিয়ে এলেন,
“আমার ছেলে নির্দোষ! সব মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে আমাদের মান-সম্মান ডুবানো হচ্ছে। কারোর ইশারায় আপনারা এসব নাটক করছেন!”
পুলিশ অফিসার আর কারো কোনো অজুহাত শুনলেন না। পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করে রুক্ষ স্বরে বললেন,
“আমাদের কাছে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে, আইন নিজের গতিতে চলবে।”
এই অকাট্য প্রমাণের সামনে বরের বাড়ির লোকজনের দম্ভ মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আহাদ মির্জা এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সব দেখছিলেন, এবার তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। বললেন,
“অসংখ্য ধন্যবাদ অফিসার। আপনারা সময়মতো না এলে আজ আমার ভাইঝির জীবনটা জ্যান্ত নরক হয়ে যেত। আমাদের অন্ধ বিশ্বাস আজ আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছিল।”
অফিসার মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
“কর্তব্য পালন করেছি মাত্র। ভালো থাকবেন।”
পুলিশের গাড়ি যখন সেই প্রতারক বরকে নিয়ে মির্জা বাড়ির গেট পার হলো, তখন পুরো বাড়িতে এক শ্মশানসম নিস্তব্ধতা নেমে এল। আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে কানাকানি আর ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে বিয়ের আসর থেকে বর গ্রেফতার হওয়া মানেই মেয়ের কলঙ্ক। এই সমাজ আজও ভাঙা বিয়েকে বড্ড নিচু চোখে দেখে। নৌশি এখনো সেই স্টেজে বেনারসি জড়িয়ে পাথরের মতো বসে আছে, তার চোখে জল নেই, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে শুধু দূর থেকে আদনানের সেই রহস্যময় শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাহি বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন,
“আমার মেয়েটার সাথেই এমনটা হতে হলো? এখন লোকে কী বলবে? কে নেবে আমার মেয়েকে?”
মায়মুনা বেগম আর ফারহানা বেগম তাঁকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু কারোর কাছেই কোনো উত্তর নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে সবাইকে চমকে দিয়ে নুসরাত ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল। সে নৌশির বাবা ইকবাল মির্জার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“বড় বাবা, তোমরা অনুমতি দিলে আমি একটা কথা বলতে চাই।”
ইকবাল মির্জা দিশেহারা হয়ে বললেন,
“কী বলবি বল মা?”
“বড় বাবা, আমার মনে হয় নৌশির বিয়েটা যদি আজ না হয়, তবে আমাদের বংশের মান-সম্মান যাবে। নৌশিও ভেতর থেকে ভেঙে যাবে।”
ইকবাল মির্জা অসহায়ভাবে মাথা নিচু করে বললেন,
“কী করব বল? কার সাথে এখন ওর বিয়ে দেব? ভাগ্য এত খারাপ হবে কে জানত!”
নুসরাতকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল আরিয়ান। সে বড় বাবার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক কিন্তু জোরালো কণ্ঠে বলল,
“বড় বাবা, পরিস্থিতি বদলাতে হলে আমাদেরও বদলাতে হবে। বংশের পুরোনো নিয়মের চেয়ে নৌশির জীবন অনেক বড়। আমি চাই, এখনই এই আসরেই আদনানের সাথে নৌশির বিয়েটা সম্পন্ন হোক।”
আরিয়ানের এই প্রস্তাব যেন মির্জা বাড়িতে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটাল। সবার নজর গিয়ে পড়ল লাল শেরওয়ানি পরা আদনানের দিকে, যে এতক্ষণ একটা জাদুকরী মুহূর্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল।
মির্জা বাড়ির অন্দরমহলে তখন এক থমথমে উত্তেজনা। আরিয়ানের সোজাসাপ্টা প্রস্তাব দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক বিশাল বরফখণ্ডে আঘাত করল। এনামুল মির্জা ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এসে বললেন,
“আরিয়ান, তুই কী বলছিস ভেবে দেখছিস? নুসরাত আর তুই মিলে এই বাড়ির শত বছরের নিয়ম ভাঙার কথা বলছিস?”
আরিয়ান শান্ত কিন্তু ধীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“হ্যাঁ ছোট চাচ্চু, আমি খুব ভেবেই বলছি। তোমাদের নিয়ম কি একটা মেয়ের জীবনের চেয়েও বড়? আজ যদি এই বিয়েটা না হয়, তবে নৌশির সারাজীবনের অসম্মানের দায়ভার কি তোমাদের এই নিয়ম নিতে পারবে?”
ইকবাল মির্জা অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বললেন,
“কিন্তু ওরা তো দুজনেই অবুঝ। ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে।”
এতক্ষণ এক কোণে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা আহাদ মির্জা এবার ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। তিনি বড় ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর দুচোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি ইকবাল মির্জার হাত ধরে বললেন,
“ভাইজান, আজ এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই হয়তো আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য ঘটেছিল। আমি চাই আদনান আর নৌশি মা-মণির বিয়েটা আজ এই আসরেই হোক।”
ইকবাল মির্জা চমকে উঠে বললেন,
“তুইও এসব কী বলছিস আহাদ?”
“আমি ঠিকই বলছি ভাইজান। আদনান আজ যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তাতে আমি নিশ্চিত ও নৌশিকে পৃথিবীর সব বিপদ থেকে আগলে রাখবে। নিয়মের চেয়ে মানুষের সুখ অনেক বড়।”
বাড়ির বড়দের এমন নমনীয়তা দেখে উপস্থিত সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। দীর্ঘ বিতর্কের পর অবশেষে মির্জা বাড়ির সেই কঠোর নিয়ম হার মানল ভালোবাসার কাছে। সবাই রাজি হলো আদনান আর নৌশির বিয়েতে।
নৌশি তখনো স্টেজে বসে আছে, তার মনে হচ্ছে সে কোনো ঘোরের মধ্যে আছে। পাশে এসে বসল আদনান পরনে সেই লাল শেরওয়ানি, যা সে হয়তো আজকের এই মুহূর্তটার জন্যই লুকিয়ে রেখেছিল। কাজি সাহেব আবারও খাতা খুলে বসলেন। নৌশি আর আদনান কেউ কারোর দিকে তাকাতে পারছে না, এক অদ্ভুত লজ্জা আর প্রাপ্তির আনন্দ তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে।
কাজি সাহেব গম্ভীর স্বরে আদনানকে বললেন,
“বাবা, তুমি কি এই বিয়েতে রাজি আছ? থাকলে তিনবার বলো কবুল।”
আদনানের বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম বাজছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর লড়াইয়ের পর আজ সে তার নাদান কে নিজের করে পাওয়ার শেষ ধাপে। সে রুদ্ধশ্বাসে অস্ফুট স্বরে বলল,
“কবুল,কবুল, কবুল। আলহামদুলিল্লাহ!”
কাজি সাহেব এবার নৌশির দিকে ফিরলেন। নৌশির মনে হচ্ছিল সবটাই বুঝি স্বপ্ন, এখনই হয়তো ঘুম ভেঙে যাবে আর সে দেখবে সেই অপরিচিত লোকটার সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। নুসরাত এসে নৌশির কাঁধে হাত রাখল,যেন অভয় দিচ্ছে। নৌশি সেই স্পর্শে সাহস পেয়ে বুজে থাকা চোখে জল টলটল করা অবস্থায় বলে উঠল,
“কবুল,কবুল, কবুল।”
আলহামদুলিল্লাহর ধ্বনিতে মির্জা বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন আজ পবিত্র হয়ে উঠল। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও বিসর্জনের সুর বাজছিল, সেখানে এখন কেবলই প্রাপ্তির আনন্দ। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আদনান আর নৌশি যখন একে অপরের চোখের দিকে তাকাল, নৌশি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঠোঁট উল্টে নিঃশব্দে একরাশ আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিল সে।
নুসরাত পরম মমতায় নৌশিকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পাগলি মেয়ে! তুই ভেবেছিলি কী করে যে আমি তোকে আর আদনানকে এত কষ্ট পেতে দেব? তোদের এই হাহাকার কি আমি সইতে পারতাম?”
নৌশি বিস্ময়ভরা চোখে নুসরাতের দিকে তাকাল। অস্ফুট স্বরে শুধাল,
“তার মানে? সব কি তবে তোমারই পরিকল্পনা ছিল আপু?”
নুসরাত রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বলল,
“সে সব পরে জানবি। এখন শুধু এই মুহূর্তটাকে উপভোগ কর।” নৌশি আর প্রশ্ন করল না, শুধু নুসরাতের কাঁধে মাথা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল আরিয়ান আর তৃণা। উৎসবের এই আবহে আরিয়ান হঠাৎ তৃণার একদম কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে বলল,
“শ্যামলিনী, এদের এই মিষ্টি বিয়ে দেখে তোমাকে আবারও নতুন করে বিয়ে করতে ইচ্ছে হচ্ছে!”
তৃণা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“মানে? হঠাৎ এই পাগলামি কেন?”
আরিয়ান তৃণার চোখের গভীরতায় হারিয়ে গিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“আমাদের বিয়েটাও তো সহজ ছিল না শ্যামলিনী। ওটা তো ছিল একটা র*ক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আমি চাই সব নিয়ম মেনে আবারও তোমাকে নিজের করে পেতে।”
আরিয়ানের এই রোমান্টিক কথায় তৃণা লাজুক এক হাসি দিল. নুসরাত কিছুটা দূর থেকে ওদের দুজনকে দেখছিল। আরিয়ান আর তৃণার এই অনাবিল সুখ দেখে ওর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে পাশে থাকা নির্জনের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ভালোবাসার এই উষ্ণতায় নিজেকে সঁপে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“স্রষ্টা যা করেন, নিশ্চয়ই আমাদের ভালোর জন্যই করেন, তাই না?”
নির্জন নুসরাতকে নিজের একহাতের আশ্রয়ে কাছে টেনে নিল। গভীর স্বরে বলল,
“একদম ঠিক। মেঘ না জমলে কি আর এমন বৃষ্টির পর স্নিগ্ধ রোদের দেখা পাওয়া যেত?”
★★★
রাত তখন বেশ অনেকটা। মির্জা বাড়িতে এখনো আত্মীয়-স্বজনের ভিড় কমেনি, চারদিকে হাসাহাসি আর খোশগল্পের শব্দ। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে আদনানের ছটফটানি যেন কমছেই না। বিয়ে তো হলো, কিন্তু সেই কখন থেকে নৌশির সাথে দুটো কথা বলার সুযোগই পাচ্ছে না সে।
হঠাৎ পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠতেই আদনান একটু আড়ালে সরে গেল। স্ক্রিনে বন্ধুদের নম্বর দেখে দ্রুত কলটা রিসিভ করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কীরে, লোকটাকে শেষ পর্যন্ত কী করলি?”
ওপাশ থেকে বন্ধুটি খিলখিল করে হেসে উঠল,
“আরে দোস্ত, একদম মাঝরাস্তায় নামিয়ে দিয়েছি! ব্যাটা তো ভয়ে কাঁপছিল। আমাদের পুলিশের অভিনয়টা কেমন হয়েছে বল?”
আদনান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসল।
“দুর্দান্ত! তোদের এই নাটকের জন্যই আজ আমি নৌশিকে ফিরে পেলাম। তোদের ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না রে।”
“আরে রাখ তোর ধন্যবাদ! এখন আমাদের সাথে সময় নষ্ট না করে ভাবির কাছে যা। শুভ রাত্রি!”
আদনান হাসিমুখে কলটা কেটে দিয়ে যেই না ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অমনি তার বুকটা ধক করে উঠল। সামনে হাতদুটো পকেটে ঢুকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরিয়ান। ভাইয়ের সেই জহুরির চোখ ফাঁকি দেওয়া যে অসম্ভব, সেটা আদনান ভালো করেই জানে। আরিয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
“তার মানে, বাড়িতে যে পুলিশগুলো এসেছিল, তারা তোরই সাজানো লোক ছিল? তাই তো?”
আদনান মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“আসলে ভাইয়া, আমি...”
আরিয়ান এবার কিছুটা চড়া স্বরে ধমক দিয়ে উঠল,
“স্পষ্ট করে জবাব দে আদনান!”
“হ্যাঁ ভাইয়া... ওরা আমার বন্ধুই ছিল,” আদনান মাথা নিচু করে স্বীকার করল।
আরিয়ানের চোখে তখনো রাগের রেশ।
“একটা মানুষের ওপর এভাবে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে সবার সামনে চোর-দালাল সাজালি? তুই জানিস ওই ছেলেটার ক্যারিয়ার আর সম্মানের কতটা ক্ষতি হতে পারত?”
আদনান এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জেদি গলায় বলল,
“এছাড়া আমার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না ভাইয়া। নৌশিকে পাওয়ার জন্য আমাকে এই ঝুঁকিটা নিতেই হতো। আর শুনো, ওই ছেলেটা যতটা ধোয়া তুলসী পাতা সাজছিল, ততটা সে নয়। আমি কালই খোঁজ নিয়েছি, ওর চরিত্র মোটেও ভালো না। ডিস্কো ক্লাবে রাত কাটানো আর আজেবাজে নেশায় আসক্ত থাকার অনেক প্রমাণ আছে ওর বিরুদ্ধে।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“এই কথাগুলো আগে বড় আব্বুকে বললেই তো বিয়েটা ভেঙে দেওয়া যেত। এই নাটক করার কী দরকার ছিল?”
“আমি যদি সত্যি কথাগুলো বলতাম, তবে কেউ বিশ্বাস করত না ভাইয়া,” আদনান ধরা গলায় বলল। “সবাই ভাবত আমি নৌশিকে পাওয়ার জন্য এসব মিথ্যে গল্প সাজাচ্ছি। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, শুধু কলঙ্ক দিয়েই এই বিয়েটা আটকানো সম্ভব ছিল।”
আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর ভয় কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। ছোট ভাইয়ের এই মরিয়া অবস্থাটা সে মনে মনে অনুভব করতে পারল। আরিয়ানের কঠিন মুখটা এবার কিছুটা শিথিল হলো। সে আদনানের কাঁধে হাত রেখে আলতো করে চাপ দিয়ে বলল,
“যা, অনেক রাত হয়েছে। এবার গিয়ে নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু কর। আর শোন, নৌশিকে যেন কোনোদিন কোনো অভাব বা কষ্টের ছোঁয়া পেতে না হয়।”
★★★
নৌশি তখনো আদনানের রুমের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের মায়াবী জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে ছিল। বিকেলের সেই বিষাদ আর রাতের এই পূর্ণতা সবই যেন কোনো রূপকথার গল্প। ভাবতে অবাক লাগছে, যে চঞ্চল ছেলেটাকে সারাজীবন আদু ভাই বলে খেপিয়েছে, আজ সে-ই কিনা তার স্বামী! তার জীবনের পরম আশ্রয়।
হঠাৎ নিস্তব্ধ ঘরটায় সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর ফিসফিসিয়ে ভেসে এল,
“বউ!”
ডাকটা শুনে নৌশির শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। এই নামে আগে কখনো কেউ ডাকেনি তাকে। সে ধীরপায়ে ঘুরে তাকাল। সামনে লাল শেরওয়ানি পরা আদনান দাঁড়িয়ে, তার চোখেমুখে আজ এক প্রশান্তি আর ঠোঁটের কোণে সেই অমায়িক হাসি।
নৌশিও বেশ খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে পাল্টা ডাক দিল,
“জামাই!”
আদনান এবার ড্রামাটিক কায়দায় নিজের বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। যেন এই ডাকটা সরাসরি তার হৃদপিণ্ডে গিয়ে আঘাত করেছে। সে আবারও গাঢ় স্বরে ডাকল,
“বউ!”
নৌশি মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“জামাই!”
“ও বউ!” আদনান এবার এক পা এগিয়ে এল।
নৌশি এবার লজ্জায় আর তাকাতে পারল না। দুহাতে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করে বলে উঠল,
“ধ্যাত! কী শুরু করলি এসব?”
আদনান অপলক দৃষ্টিতে তার এই অপরূপা সুন্দরী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। আজ নুসরাত আপু পাশে না দাঁড়ালে কি নৌশি এই ঘরে থাকত? গতকাল রাতে যখন বাবার পায়ে ধরেও কোনো ফল হয়নি, তখন আদনানের মাথায় প্রথম আ*ত্মহ*ত্যার চিন্তাটা এসেছিল। সে ভেবেছিল, নৌশিকে ছাড়া বেঁচে থাকার চেয়ে ম*রে যাওয়াই শ্রেয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় কড়া নেড়েছিল নুসরাত।
নুসরাত সেদিন কেবল দরজা খোলেনি, আদনানের বন্ধ হয়ে যাওয়া ভাগ্যের দরজাটাও খুলে দিয়েছিল। নুসরাত আর আরিয়ান মিলেই এই পুলিশি অভিযানের ছক কষেছিল। আজ নৌশির এই লাজুক হাসির পেছনের কারিগর যে ওই দুজন, সেটা ভেবেই আদনানের বুকটা কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল।
আদনান এগিয়ে গিয়ে নৌশির হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। জানলা দিয়ে আসা হালকা বাতাস তখন নৌশির চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল।
আদনান নেশালো মাখা স্বরে বলল,
“নাদানের বাচ্চাকে আজ কিন্তু আসমানি হুরদের মতো সুন্দর লাগছে!”
নৌশি অবাক হয়ে এক জোড়া ভুরু বাঁকিয়ে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট উল্টে বলল,
“বাপরে! সূর্য আজ কোন দিকে উঠল? জীবনে প্রথম তোর মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনলাম।”
আদনান শব্দ করে হাসল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না, পরম আবেশে নৌশিকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। নৌশিও সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আদনানের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকাল। দুজনের চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল এতদিনের না পাওয়া, সমাজের ভয় আর বিচ্ছেদের সুর যেন এই এক আলিঙ্গনে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ এই নিস্তব্ধ আবেগমাখা মুহূর্ত কাটার পর নৌশি হঠাৎ আদনানকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। নাকে হাত দিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
“উফ! দূরে যা তো। তোর শরীর থেকে ছাগলের গন্ধ আসছে!”
আদনান থমকে গেল। তারপর নিজের শেরওয়ানির হাতা শুঁকে একগাল হেসে দিল। নৌশির এই চিরচেনা দুষ্টুমিই তো তাকে বাঁচিয়ে রাখে। সে নিজের অবাধ্য চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ড্যাশিং ভঙ্গিতে নৌশির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার চোখে তখন নেশাতুর চাহনি। সে এবার নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে গান ধরল,
“কোনো কিচ্ছু শুনবো না,
কোনো বারণ মানবো না।
আয় সজনী গান করি গলা মিলাইয়া,
গানের তালে নাইচা যাবি কোমর দুলাইয়া!”
আদনানের গানের তালের সাথে পা মিলিয়ে এগিয়ে আসা দেখে নৌশি লাজুক হাসলো। রুমের ভেতর তখন তাজা ফুলের সুবাস আর ভালোবাসার খুনসুটি মিলেমিশে একাকার। আদনান গান গাইতে গাইতে নৌশির হাতটা ধরে নিজের দিকে এক ঝটকায় টেনে নিল।