--ছিঃ ছিঃ কি দিনকাল এলো রে বাবা। আঠারো বছরের মেয়ের কোলেই কিনা আড়াই বছরের একটা বাচ্চা। আবার শুনলাম মেয়ে নাকি অবিবাহিত।
--হ্যা গো দিদি আমিও শুনেছি। ওই যে পাশের বাসার সোহেলের মা উনিই বললো এই কথা। এতোটুকু বয়সেই যৌ*ব*নে এতো জ্বালা বেড়েছিলো যার জন্য বিয়ে করার ও তর সইল না। বিয়ের আগেই কার না কার সঙ্গে শু*য়ে এই জা*র*জ সন্তান জন্ম দিয়েছে।
--আবার দেখো ওই অ'বৈধ সন্তান নিয়ে কত রং তামাশা। বাচ্চা নিয়ে গর্বে যেন মাটিতে পা পড়ে না। সেই তো বে*শ্যাগিরি করে জন্ম দিয়েছে। তা নিয়ে এতো আদিক্ষেতার কি আছে বাপু? চাল নেই তার ফুটুনি ভালোই আছে, হুহ!
রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় রোজকার মতো আজও প্রতিবেশী মহিলাদের বি'ষবাক্যে গুলো কানে এলো অষ্টাদশী রমণীর। তাকে দেখেই একটু আগের আলোচনায় কিছুটা ভাটি পড়লো হয়তো। মেয়েটা একটু দূরে যেতেই পুনরায় শুরু হলো ফিসফিসানি। এগুলো রোজকার ব্যাপার। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগলেও এখন এসব সয়ে গেছে তার। যাদের ঘটে ব্রেইনের জায়গায় গু দিয়ে ঠাসা তাদেরকে হাজার বার সত্য ধরিয়ে দিলেও শুধরবে না। তাদের দায়িত্ব তারা পালন করেই যাবে। ওই যে বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না “ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো”- এই মহিলা গুলো সেই শ্রেণীর প্রাণীর কাতারেই পড়ে। স্বামীর খেয়ে স্বামীর পড়ে অন্যর ঘর নিয়ে সমালোচনা এদের রোজকার রুটিন। সে ঘটনা সত্য হোক কিংবা বানোয়াট নিজেদের মতো একটা তৈরি করে সেটা কে তিল থেকে তাল বানিয়ে পাড়ায় পাড়ায় প্রচার করে বেড়ানো তাদের নৈতিক দায়িত্ব গুলোর মধ্যে অন্যতম। না খেয়ে থাকলেও এই দায়িত্ব থেকে তাদের কেউ সরাতে পারবে না।
অষ্টাদশী বালিকা নিজের এই সমালোচনার কথা ভেবে মুচকি হাসলো। নিজেকে আজকাল তার সেলিব্রেটি মনে হয়। যেখানে ইট পাথরের এই ব্যস্ত শহরে মানুষের কাজ রেখে দম ফেলার ফুসরত টুকু মেলে না সেখানে তাকে নিয়ে কতো মানুষ গবেষণা করে। দিনের মধ্যে নিজেদের নিয়ে যতোটুকু না ভাবে তার চেয়েও হাজার গুন ভাবে তাকে নিয়ে। হাজার অভাব অনটনের মধ্যেও এই একটা বিষয় আজকাল তাকে বেশ আনন্দ দেয়। আচ্ছা মানুষের সামনে সমালোচিত হতে পেরেও বুঝি এমন সুখ সুখ লাগে? এর সঠিক ব্যাখ্যা জানা নেই রমণীর তবে সে শান্তি খুঁজে পায়। একপ্রকার পৈশাচিক শান্তি।
তপ্ত দুপুরের কড়া রোদে পুড়ে মেয়েটার সুশ্রী চেহারা কিছুটা তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে। হিজাবের আড়ালে আটকানো মুখটা ঘেমে একাকার। পড়নের কালো রঙা মলিল বোরকা টাও গরমের ধুলোময় রাস্তার বালুতে ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে। ছিপছিপে গড়নের মেয়েটা সকাল থেকে খালি পেটে থাকায় কিছুটা দূর্বল ও। দীর্ঘ পথ হাঁটতে গিয়ে পা যেন আর চলছে না। থেকে থেকে চলন্ত পা জোড়া থেমে যাচ্ছে। ওরাও যেন বলতে চাইছে এবার একটু ফুসরত মিলুক আমাদের। শক্তিতে যে আর কুলোয় না। তবুও সংসারের চারজন মানুষের ভরণপোষণের দায়িত্ব সামলানোর জন্য রিক্সা ভাড়ার পঞ্চাশ টাকাও যেন তার কাছে অমূল্য রত্ন। যে রত্ন একবার হাত ফোসকে গেলে শ্বাসরোধ হবে তার।
নিজের দেহের ক্লান্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে মেয়েটা পিলপিল পায়ে এগিয়ে গেলো মোড়ের দোকানটায়। এটাই একমাত্র দোকান যেখানে বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু পাওয়া যায়। দাম টা একটু বেশিই রাখে তবে পন্য ভালো দেয়।
নিজের ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে নিজের কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো মুছে নেয় সে। ব্যাগ থেকে টাকা গুলো বের করে গুনে দেখে চারশত বিয়াল্লিশ টাকা আছে। দুটো পুরনো পঞ্চাশ টাকা, একটা একশো টাকা,বারো টা বিশ টাকার নোট আর দুটো এক টাকার কয়েন। মাসের প্রায় শেষ, টিউশনির টাকা হাতে পেতে এখনও সাতদিন বাকি। হাতে জমানো কিছু টাকা ছাড়া বাড়তি আর কোনো টাকা নেই। এই কটাদিন কিভাবে চলবে ভেবেই চিন্তারা মাথায় কিলবিল করলো মেয়েটার। আজ খুব করে অনুভব করলো বাবা নামক বটবৃক্ষ আর ভাই নামক ভরসার ছায়া টাকে। এই দুটো মানুষ বেঁচে থাকলে তাদের এতো কষ্ট করতে হতো না। অন্য সচ্ছল পরিবারের মতোই হেসেখেলে দিব্যি দিন পার হতো তাদের। অথচ ভাগ্যের নি'ষ্ঠুর লিখনে দুটো মানুষকে হারিয়ে আজ তারা নিঃস্ব। দমকা হাওয়ার ঝড় যেমন মূহুর্তেই প্রকৃতি এলেমেলো করে দেয় তেমন করেই এলোমেলো তাদের চারটে প্রাণের জীবন নি'ষ্ঠুর এই পৃথিবীতে সংগ্রামের জন্য বেঁচে রইলো শুধু।
টাকা গুলো হাতে নিয়ে শুষ্ক ঢোক গিললো মেয়েটা। এই কটা টাকা দিয়ে তো পানির দাম ও হবে না সেখানে বাবুর জন্য দুধ,মেজো আপার ঔষধ,ঘরের বাজার এসব কিভাবে করবে সে? বাসা থেকে বের হওয়ার সময় দেখেছিলো মায়ের শরীর কিছুটা খারাপ,কাশিটা আবারও বেড়েছে। মায়ের জন্য ও ঔষধ নিতে হবে। এসব কিছু নিতে হলেও তার এখন হাজার খানেক টাকা প্রয়োজন অথচ হাতে আছে মলিন কিছু অর্ধ ছেড়া কাগজ। হ্যা কাগজই তো। তবে সাধারণ কাগজের চেয়ে এই কাগজের ভাড় অনেক। সাধারণ কাগজ পুড়িয়ে জ্বালানির প্রয়োজন মেটায় আর এই কাগজ পেটের জোগান দেয়। ইশশ কতো তফাৎ।
মেয়েটার ভাবনার মাঝেই পেটে আবারও গুরগুর শুরু হলো। টাকা গুলো ডান হাতে মুঠ করে বাম হাতটা পেটের উপর রেখে খাবারের প্রয়োজন অনুভব করলো। সকালে খেতে গিয়েও খায় নি। পাতিলে অল্প কিছু পানি দেওয়া ভাত ছিলো। সেগুলো মা আর মেজো আপারই তো ঠিক মতো হতো না। সেখানে সে ভাগ বসালে চলতো? মা বোনের জন্য খাবারের ব্যবস্তা করতে গিয়ে নিজেই অভুক্ত রইলো। গ্লাস ভরে ঢকঢক করে পানি খেয়ে বেড়িয়েছিলো সেই সকালে। এরপর আর পেটে দানাপানি কিছু পড়ে নি। বাসায় যে চাল আছে সেটা দুপুর পর্যন্ত হবে তাহলে রাতে কি খাবে তারা? আজও কি শুধু মুড়ি আর চিড়ে ভিজিয়ে খেতে হবে?
নিজের জীবনের কথা ভেবে বুক চিড়ে বেড়িয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। আর কতো সংগ্রাম আর ত্যাগ স্বীকার করলে তিনবেলা দুমুঠো খাবার পেট ভরে খাওয়া যাবে জানা নেই অষ্টাদশীর। হতাশার শ্বাস ফেলে মেয়েটা ব্যস্ত সড়কের দিকে নজর বুলালো। দুপুর বেলাও মানুষের ব্যস্ততার শেষ নেই। পেটের তাগিদে কেমন যন্ত্রের মতো ছুটছে তো ছুটছেই রূহ টাকে বিন্দুমাত্র দম ফেলবার ফুসরত পর্যন্ত দিচ্ছে না। মেয়েটা যান্ত্রিক মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যে হাসলো। বিরবির করে বললো
--ওহে যান্ত্রিক মানব,মাটির খাঁচা থেকে রূহ টা বের হলেই মিলবে কিছুটা ফুসরত। রূহ খাঁচা না ছাড়া অবদি তোমাদের মুক্তি নেই হে বোকা মানব।
মেয়েটার ভাবনার মাঝেই পেছন থেকে ভেসে আসা পুরুষালি কন্ঠের ভারী স্বরে কিছুটা কেঁপে উঠলো। তড়িৎ পেছনে ঘুড়ে দেখলো বেবী ষ্টেশনারী দোকানটার মালিক তাকে ডেকে বলছে
--এই মেয়ে রোদের মধ্যে এমন দাঁড়িয়ে আছো কেনো? নিজেকে শুঁটকি বানাতে চাওয়ার শখ জেগেছে বুঝি?
লোকটার গম্ভীর স্বরে বলা কথাটার সঠিক অর্থ বুঝতে সক্ষম হলো না বালিকা। লোকটা কটাক্ষ করেছে নাকি রসিকতা কিছুই বোধগম্য হলো না। হাতের টাকা গুলোর দিকে নজর দিয়েই ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো দোকানের দিকে।
দোকানির মালিক তেমন বয়ষ্ক না হলেও মধ্যবয়সী পুরুষ নন। বয়স কতো হবে পয়তাল্লিশের মাঝামাঝি কিংবা তার বেশি। অথচ এই বয়সেই কি তেজ। কথায় কথায় কেমন ছ্যাত করে ওঠে। ভালো কথা বলতে গেলেও কেমন গুরুগম্ভীর শোনায়। লোকটাকে সে ঠিকমতো চেনে না। এই শহরে তারা নতুন। এসেছে মাস দুয়েক হবে। এই সময়ে নিজেদের ছোট সংসারটা গুছানো,ভরণপোষণের দায়িত্ব আর পড়াশোনা নিয়ে ছোটাছুটি করতে গিয়ে দম ফেলবার ফুরসত পায় নি। তেমন কোনো মানুষের সঙ্গে পরিচয় ও হয়নি। যান্ত্রিক এই শহরে সবাই নিজেদের মতোই ব্যস্ত সেখানে তাদের খোঁজ নেওয়ার সময় কোথায়?
মেয়েটা দোকানের ভেতরে গিয়ে আশেপাশে নজর বুলালো। কয়েকটা মানুষ ছাড়া তেমন কেউ নেই। অবশ্য এই দুপুরে থাকার কথা ও নয়। সবাই কি আর তার মতো পেটে গামছা বেঁধে ছুটছে। মেয়েটাকে আবারও ভাবনায় ডুবে যেতে বিরক্ত হলো দোকানি। বিরক্তির স্বরে বললো
--এই মেয়ে হুট হাট তুমি এমন কোথায় হারিয়ে যাও বলো তো? এসে থেকে দেখছি মিনিটে মিনিটে ভাবনায় হারিয়ে যাচ্ছো। ব্যাপার কি, মহা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ফিমেল ভার্সন হতে চাও?
মেয়েটা কিছুটা ভরকে গেলো। আমতা আমতা করে বললো
--আ..আসলে আঙ্কেল আমি..
--হোয়াট? আঙ্কেল? কিসের আঙ্কেল? কোথাকার আঙ্কেল? কোন জন্মের আঙ্কেল? আমাকে দেখে কি তোমার আঙ্কেল মনে হয়?
হুট করে গম্ভীর লোকটার প্রশ্নে ভরকে গেলো অষ্টাদশী। ফাঁকা ঢোক গিলে বললো
--মানে আমি..
--থাক হয়েছে আর মানে মানে করতে হবে না। আমাকে আঙ্কেল টাঙ্কেল বলবে না। দাদু বলে ডাকবে মনে থাকবে।
--জ্বী..জ্বী মনে থাকবে।
--হুম এখন বলো কি দরকারে এসেছো। এই সময়ে বিনা কারণে ঘুরতে নিশ্চয়ই আসো নি। অবশ্য এই শহরের মানুষের সেই সময় কই?
শেষ কথায় লোকটা বোধহয় একটু তাচ্ছিল্য হাসলো। এদিকে চিন্তায় পড়লো মেয়েটা। পুনরায় হাতের মুঠ করে রাখা টাকা গুলো দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বললো
--ছোট বাচ্চার জন্য দুধ দেন।
লোকটা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। দুধ আনতে গিয়ে বললো
--বাচ্চার বয়স কত?
--আ..আড়াই বছর।
লোকটা সেকেন্ডের মাথায় মাঝারি সাইজের একটা দুধের ডিব্বা নিয়ে এলো। মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো
--চারশ উনপঞ্চাশ টাকা দাও।
এই ভয় টাই মেয়েটা এতোক্ষণ পাচ্ছিলো। সে তো জানতোই বাচ্চাদের খাওয়ার দুধের এমন দাম। এখন বাকি টাকা কোথায় পাবে সে।
--কি হলো দাও।
মেয়েটা ইতস্তত করে বললো
--দাদু একটু ছাড় হবে না।
--পাশেই লেখা আছে এটা ফিক্সড রেটের দোকান। ওই যে দেখো ওখানে রাখা সাইনবোর্ড।
লোকটার ইশারা করা দিকে তাকালো মেয়েটা। সে তো আগেই জানে এটা ফিক্সড রেটের দোকান। এখন কি করবে? অনেক ভেবে চিন্তে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
--দুধ টা রেখে দেন। পরে এসে না হয় নিয়ে যাবো।
মেয়েটা চলে যেতে নিলে সহসা পিছু ডাকলো সে। আগের চেয়েও গম্ভীর স্বরে বললো
--নিবে না যখন আমাকে খাটালে কেনো? এখন তার মূল্য দিয়ে যাও।
--মূল্য! কিসের মূল্য?
--ওমা জানো না। এই শহরে বিনে পয়সায় যেখানে শ্বাস নেওয়া নিষেধ সেখানে তুমি আমার সাত মিনিট পয়ত্রিশ সেকেন্ড নষ্ট করেছো। অনেক বড় অন্যায় করেছো। এখন তার মূল্য তোমাকে চোকাতে হবে নয়তো দুধের ডিব্বা নিতে হবে।
মেয়েটা চিন্তিত স্বরে এগিয়ে গিয়ে নিজের হাতের টাকা গুলো বাড়িয়ে দিয়ে বললো
--আমার কাছে এগুলোই আছে দাদু। এছাড়া আর একটা টাকাও নেই।
লোকটা হাতের মলিন টাকা গুলো দেখে নিচ থেকে একটা পানির বোতল আর একটা রুটির প্যাকেট বের করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো
--আমার দোকানে কোনো অভুক্ত মানুষ এসে ফিরে যেতে পারে না। এগুলো খাও আর নিজের মলিন, দূর্বল চেহারা টা সচল করো। মনে রাখবে এই শহরে টিকতে হলে খেয়ে দেয়ে শক্তি অর্জন করে তারপর লড়াই করতে হবে। দূর্বল হয়ে পড়লে নি'ষ্ঠুর শহরে দুদিনও টিকতে পারবে না তুমি।
বয়স্ক লোকটা বাকির খাতাটা খুলতে খুলতে বললো
--আমাদের দোকানে বাকিতে পন্য নেওয়ার সুবিধা ও আছে। ফিক্সড রেটে পন্য বিক্রি করে মানে এই না যে আমরা ক্রেতার সঙ্গে জু*লুম করি।
লোকটা কথা শেষ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললো
--নাম কি তোমার?
অষ্টাদশী মেয়েটা বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো। লোকটার প্রশ্নে চমকে উঠে বললো
--জ্বি
--নাম কি তোমার?
মেয়েটা নিজের শুষ্ক ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে বললো
--মে..মেহেরিমা। #মেহরিমা_নেওয়াজ_পুষ্প।
নামটা শুনে লোকটার ব্যস্ত হাতটা হালকা কেঁপে উঠলো হয়তো। অতঃপর কিছু না হওয়ার ভঙ্গিতে মেয়েটার নাম লিখতে লিখতে বললো
--আপাতত পঞ্চাশ টাকা দিয়ে যাও। বাকির খাতায় তিন’শ নিরানব্বই টাকা দেনা থাকলো। সঠিক সময়ে ফেরত দেবে।
লোকটার এমন সাহায্যেপূর্ন মনোভাব দেখে মেয়েটা বিগলিত হাসলো। পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললো
--আপনাকে অনেক ধন্যবাদ দাদু। আপনার এই ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না।
--ঋণ শোধের কিছু নেই। তুমি আমার কাস্টমার। তোমার সঙ্গে আমার দেনা পাওনার সম্পর্ক। টাকা দাও জিনিস নাও।
মেহরিমা মুচকি হাসলো। দুধের ডিব্বাটা নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে লোকটাকে সালাম দিয়ে চলে যেতে নিলে লোকটার কথা থমকে দাঁড়ালো
--বয়ষ্ক মানুষেরা কিছু দিলে সেগুলো নিতে হয়। না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়াকে কিন্তু অভদ্রতা বলে।
মেহরিমা পিছু ফিরে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকালে
লোকটা পানির বোতল আর রুটির প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বললো
--এগুলো ফেলে যাচ্ছিলে কেনো? না নিয়ে আমায় অপমান করতে চাও?
মেহরিমা দ্বিধায় পড়লো।
--এগুলো না নিলে এক্ষুনি বাকির সব টাকা ফেরত দেবে সঙ্গে আমার সময় নষ্ট প্লাস অপমান করার জন্য এক্সট্রা ফাইন।
মেহরিমা তরিঘরি করে লোকটার হাত থেকে রুটি আর পানির বোতল নিয়ে বললো
--ধন্যবাদ
আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না মেহরিনা। ব্যস্ত রাস্তার গাড়ির বহর পাড় করে বাম পাশের গলিতে মিলিয়ে গেলো। মেহরিমার যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো বয়স্ক মানব। বিরবির করে বললো
--যাদুর শহরের আজব মানুষজন।
******************
মেহরিমার বাসায় ফিরতে আরো আধাঘন্টা মতো লাগলো। গলির শ্যাতশ্যাতে শেওলা পড়া এক দোতলা বাড়ির পাশে ছোট্ট একটা দু রুমের ঘরে তারা থাকে। বাসায় এসে নিজের পায়ের জুতার বেল্ট খুলতে খুলতে মাকে ডেকে বললো
--আম্মু কোথায় তুমি? এগুলো নিয়ে যাও তো।
ঘরের ভেতর থেকে শাহিদা নেওয়াজ বেড়িয়ে এলো। নিজের পরনের পুরাতন জোড়াতালি দেওয়া শাড়ির আঁচলে হাত মুছে বললো
--এসেছিস তুই। এতো দেরি হলো কেনো রে?
মেহরিমা নিজের ব্যাগ,বাজারের ছোট থলি এগিয়ে দিয়ে বললো
--রাস্তায় যে জ্যাম তার উপর কাঠ ফাটা রোদ্দুর একটু তো দেরি হবেই।
শাহিদা নেওয়াজ ব্যাগ গুলো হাতে নিয়ে বললো
--সারাদিনে কিছু খেয়েছিস?
মেহরিমা একটু চুপ থেকে বললো
--হুম
বাইরে টানানো দড়ি থেকে নিজের জামা আর গামছা নিয়ে কলপাড়ে যাওয়ার আগে বললো
--পুতুল কোথায়? ঘুমিয়েছে?
--হ্যা একটু আগে খিদের জন্য অনেক কান্নাকাটি করছিলো। উপায় না পেয়ে পাশের ঘর থেকে একটু ভাতের মাড় এনে কিছুটা খাওয়ানোর পর ঘুমিয়েছে।
মেহরিমা কিছু না বলে গোসলে চলে গেলো। আপাতত গোসল করে একটু শান্তির প্রয়োজন। গরমে অশান্তি অশান্তি লাগছে।
বেশ সময় নিয়ে গোসল করলো মেহরিমা। বোরকা,হিজাব ধুয়ে দিয়ে দড়িয়ে মেলে দিয়ে ঘরে ঢোকার সময় ঘুম ঘুম কন্ঠের আদো বুলি শুনে ফ্যাকাশে মুখে হাসি ফুটলো। রুমের দিকে তাকিয়ে দেখলো বিছানার উপর বসে ঘুমে ঢুলু ঢুলু হয়ে পুতুল চোখ পিটপিট করে বলছে
--আম..মাম মাম।
মেহরিমা হাতের গামছা টা চেয়ারে মেলে দিয়ে হাসি মুখে এগিয়ে গেলো। পুতুলকে কোলে নিয়ে বললো
--এইতো মাম এখানে।
--মাম এতেতো।
--হ্যা মা এসেছি তো। তুমি ঘুমিয়ে ছিলে?
পুতুলের ঘুমে চোখ বুজে আসছে। ঘুম ঘুম চেহারা একদম ফুলকো ফুলকো। ফর্সা মুখটা বালিশের ভাজে চাপা লেগে কিছুটা দাগ বসে লাল হয়ে গেছে। মেহরিমার বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে মাথা ঝাকালো। মেহরিমা পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে মাথার তালুতে চুমু আকলো। আদুরে স্বরে বললো
--ঘুম থেকে উঠে গেলে কেনো আম্মু? গরম লাগছিলো?
পুতুল নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা গালে নিয়ে খাচ্ছিলো। মেহরিমার কথায় মাথা উঠিয়ে চোখ তুলে মায়াময় ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে থেকে নিজের ছোট্ট হাত পেটের উপর রেখে ঠোঁট উল্টে আধো বুলিতে বললো
--মাম কুদা।
ছোট্ট বাচ্চার কথা বুঝতে অসুবিধে হলো না মেহরিমার। হুট করে বুকটা মুষড়ে উঠলো। সহসা পুতুলকে বুকে আগলে নিয়ে ভেজা কন্ঠে বললো
--মাম তোমার জন্য দুধ নিয়ে এসেছি আম্মু। আর ক্ষুধা লাগবে না।
ছোট্ট মেয়েটার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। হাত তালি দিয়ে বললো
--তু তু তাবো।
--হ্যা মা খাবে তো। আমার আম্মু খাবে না তো কে খাবে? সব তুতু আমার আম্মুর পেটুতে যাবে।
মেহরিমা পুতুলের পেটে সুরসুরি দিলে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ছোট্ট প্রাণ। নিজের ছোট্ট হাতে মেহরিমার গাল ধরে আদুরে স্বরে বলে
--পুতু তুতু তাবেএএএ। মাম ও তুতু তাবে। তি মজা।
মেহরিমা চোখে পানি নিয়ে হাসলো। পুতুলের গালে ঠোঁট দাবিয়ে বললো
--আমার প্রাণ,আমার সুখ।
পুতুল তার মামের বুকে মাথা রেখেই হাসলো। পিছন থেকে শাহিদা বেগম বললো
--আর কতকাল অন্যের দায়িত্বকে নিজের ঘাড়ের বোঝা বানিয়ে রাখবি?
চলবে..?
#আয়_তবে_সহচরী
#সূচনা_পর্ব
#উম্মে_হাবিবা