তোমার নিরবতায় আমি
🖊️Samira
৬ — “যে সত্যিটা বলা হয়নি”
মেহরিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
ভেতর থেকে মায়ের কাঁপা কণ্ঠটা যেন বারবার কানে বাজছে—
“সাহরিয়ার যেন ভেতরে না আসে…”
মেহরিন ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
সাহরিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখল।
এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
সে জানত, এই দিনটা একদিন আসবেই।
কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে—ভাবেনি।
কেবিনের ভেতরে মেহরিন মায়ের পাশে গিয়ে বসল।
— “মা…”
তার মা দুর্বল হাতে মেহরিনের হাতটা চেপে ধরলেন।
— “তুই ওর সঙ্গে এখানে এলি কেন?”
— “আমাকে ও-ই নিয়ে এসেছে।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
— “ওকে বিশ্বাস করিস না।”
মেহরিনের বুকটা ভার হয়ে গেল।
— “কিন্তু কেন?”
মা চোখ বন্ধ করলেন।
— “কারণ ওর পরিবার আমাদের জীবনটা শেষ করে দিয়েছিল।”
মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
— “বাবার জন্য?”
মা এবার চোখ খুললেন।
চোখের কোণে পানি।
— “তোর বাবা মারা যাওয়ার আগে একটা কথা আমাকে বলেছিল…”
— “কী কথা?”
মা মেহরিনের হাত আরও শক্ত করে ধরলেন।
— “রায়হান পরিবারকে কখনো বিশ্বাস করো না।”
মেহরিন নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।
— “কিন্তু মা… সাহরিয়ার তো—”
— “সাহরিয়ার তখন ছোট ছিল।”
মেহরিন থেমে গেল।
মা ধীরে বললেন,
— “ও হয়তো সব জানে না। কিন্তু ওর বাবা যা করেছিল… তার ছায়া আজও আমাদের পিছু ছাড়েনি।”
মেহরিনের মাথায় Episode 4-এর সেই পুরোনো ফাইলটার কথা ভেসে উঠল।
A. Ahmed.
বাবার নাম।
তারপর সাহরিয়ারের বাবার নাম।
দুজনের সম্পর্ক।
একটা অজানা ঘটনা।
আর এখন মায়ের এই কথা।
সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা।
হঠাৎ কেবিনের দরজায় টোকা পড়ল।
মেহরিন তাকাল।
সাহরিয়ার।
মা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
— “ওকে বল, চলে যেতে।”
মেহরিন দরজার কাছে গিয়ে থামল।
দরজা খুলল না।
— “সাহরিয়ার…”
বাইরে থেকে তার শান্ত কণ্ঠ—
— “আমি জানি আপনার মা আমাকে দেখতে চান না।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
— “কিন্তু একটা কথা আপনাকে বলতেই হবে।”
মেহরিন চুপ করে রইল।
— “আপনার বাবার মৃত্যুর জন্য আমার বাবা দায়ী ছিলেন না।”
মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।
সে দরজা খুলে দিল।
সাহরিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে।
চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত।
— “তাহলে কে দায়ী ছিল?”
সাহরিয়ার উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল।
তারপর বলল,
— “আমি জানি না।”
মেহরিন অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
— “আপনি জানেন না, নাকি আমাকে বলতে চান না?”
সাহরিয়ার কিছু বলল না।
মেহরিন এবার নিচু গলায় বলল,
— “আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম।”
সাহরিয়ারের চোখে কষ্টের ছায়া নেমে এল।
— “জানি।”
— “কিন্তু আপনি আমাকে বারবার অর্ধেক সত্যি বলেছেন।”
— “কারণ পুরো সত্যিটা আপনার জন্য নিরাপদ নয়।”
— “আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
সাহরিয়ার চুপ।
মেহরিন চোখ মুছে বলল,
— “আজ থেকে আমার ব্যাপারে আপনি আর কিছু করবেন না।”
সাহরিয়ার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর খুব ধীরে বলল—
— “ঠিক আছে।”
সে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
দু’পা যাওয়ার পর থেমে গেল।
পেছনে না তাকিয়েই বলল—
— “তবে একটা কথা মনে রাখবেন…”
মেহরিন তাকিয়ে রইল।
— “আপনি আমাকে বিশ্বাস না করলেও, আমি আপনাকে বিপদে একা ছেড়ে যাব না।”
সাহরিয়ার চলে গেল।
মেহরিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।
কেন যেন বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে গেল।
হাসপাতালের বাইরে এসে সাহরিয়ার গাড়িতে উঠল।
ড্রাইভারকে বলল,
— “অফিসে যাও।”
কিছুক্ষণ পর ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।
Unknown Number:
“প্রথম ধাপ শেষ। এবার মেহরিনকে তার বাবার পুরোনো জায়গায় নিয়ে যাও।”
সাহরিয়ারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
তারপর আরেকটা মেসেজ এল—
“ওখানেই সে প্রথমবার সত্যিটা দেখবে।”
সাহরিয়ার ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরল।
কারণ জায়গাটার নাম সে খুব ভালো করেই জানে।
পুরোনো নীলপুর রেলস্টেশন।
আর সেই জায়গাতেই—
১৭ বছর আগে মেহরিনের বাবাকে শেষবার দেখা গিয়েছিল।