#এটা_কি_ভুল_নাকি_সুখ
#রওনোক_জাহান_হায়াত
#পর্ব_৩
সকাল পেরিয়ে দ্বিপ্রহরের সূচনা। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে স্থির হতেই কুমিল্লা থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছাল কালো রঙের দুটি বিলাসবহুল গাড়ি। দীর্ঘ যাত্রার অবসান ঘটিয়ে সেগুলো এসে থামল দোতলা বিশিষ্ট সুদৃশ্য অট্টালিকার প্রধান ফটকের সম্মুখে। মালিকের গাড়ি দেখে দারোয়ান আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করল না; তড়িঘড়ি করে লোহার ফটক খুলে দিল।
আকাশের মধ্যগগনে তখন তেজোদীপ্ত দিবাকর রাজত্ব করছে। প্রখর তাপদাহে বৃক্ষরাজির সবুজ পল্লবও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে; কোথাও কোথাও পাতাগুলো কুঁকড়ে গিয়ে নিস্তেজ দেখাচ্ছে। ভ্যাপসা উষ্ণ বায়ু শরীরে এমনভাবে আছড়ে পড়ছে, যেন অদৃশ্য অগ্নিশিখা ত্বক দগ্ধ করে দিচ্ছে। বাংলায় প্রচলিত একখান কথা আছে–"ভাদ্রের গরমে কুকুর-শেয়াল এক ঘাটে পানি খায়।” আজকের আবহাওয়া ঠিকই তেমনি।
দৃষ্টিসীমা জুড়ে কেবলই রৌদ্রের দহনলীলা। পিচঢালা পথ থেকে উত্তাপের তরঙ্গ কাঁপতে কাঁপতে উঠছে, চারপাশের বাতাসও অগ্নিকুণ্ডের নিঃশ্বাস বহন করছে। এই অসহনীয় দাবদাহ থেকে সামান্য স্বস্তি খুঁজতে পথচারীদের কারও হাতে ছাতা, কারও হাতে পাখা কিংবা ঠান্ডা পানির বোতল। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্র রোষের সামনে সেসব প্রয়াস নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী।
গাড়ি থেকে একে একে নেমে এলো অভিক, পারমিতা, সৌরভ আর সাহেদ মির্জা। গাড়িতে এসি অন ছিলো বটে; তবুও প্রত্যেকের ললাটে ঘামের বিন্দু চিকচিক করছে। সৌরভ একবার অভিক আর পারমিতার দিকে নির্বিকার চাহনিতে তাকালো। অতঃপর হনহন করে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। তারপর ধীরে ধীরে অভিক, সাহেদ মির্জা আর তাদের অনুসরণ করে পারমিতাও বাড়ির দরজার দিকে অগ্রসর হয়।
বাড়ির প্রধান দরজার সামনে এসে সবাই থেমে গেল। লিভিং রুমের সোফায় চিন্তায় জর্জরিত মুখাবয়ব নিয়ে বসে আছেন এক মধ্যবয়স্ক রমণী। বয়সে তিনি সাহেদ মির্জার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। সময়ের ছাপ দেহে সুস্পষ্ট হলেও মুখমণ্ডলের ঔজ্জ্বল্যে তার এতটুকু ভাটা পড়েনি। প্রবেশদ্বারে কারও উপস্থিতি টের পেতেই উদ্বিগ্ন নয়নজোড়া সেদিকে নিক্ষেপ করলেন তিনি। স্বামী আর ছোট ছেলেকে একসঙ্গে দেখে বুকের ওপর থেকে এক পশলা ভার নেমে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে উদগ্রীব কণ্ঠে শুধালেন,
–"কিগো! কালকে মেয়ে দেখতে যাবে বলে বের হলে আর এখন আসার সময় হলো! নাকি একেবারে ছেলেকে করিয়েই নিয়ে এলে?"
শেষাংশটুকু কৌতুকের ছলেই বললেন তিনি। অধরের কোণে ফুটে উঠল ক্ষীণ হাসির রেখা। সাহেদ মির্জা আর অভিক নীরবে একবার তার দিকে তাকাল। অতঃপর দু'জনে একে অপরের সঙ্গে চোখাচোখি করে ধীরে ধীরে দু'পাশে সরে দাঁড়াল। আর তাদের মাঝখান থেকে সামনে এসে দাঁড়াল ঘোমটার আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকা পারমিতা। লাল শাড়িতে আবৃত নববধূকে চোখের সামনে দেখে মুহূর্তেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন মধ্যবয়স্ক রমণী। বিস্ময়ে তার নয়নদ্বয় ক্রমশ প্রসারিত হয়ে উঠল। ধীর পায়ে পারমিতার দিকে অগ্রসর হতে হতে সাহেদ মির্জার দিকে তাকিয়ে হতবাক কণ্ঠে আওড়ালেন,
–"আমি তো মজা করেছিলাম? তোমরাও কি আমার সঙ্গে মজা করা শুরু করলে নাকি!"
ভদ্রমহিলার কথায় সাহেদ মির্জা ফোঁস করে একখান শ্বাস ছাড়লেন। একবার অভিকের দিকে তাকিয়ে অতঃপর জুতসই কণ্ঠে বললেন,
–"মজা করছি না। তোমার ছেলেকে বিয়ে করিয়ে এনেছি।"
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো লিভিং রুমজুড়ে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সৌরভ। সবে ফ্রেশ হয়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়েছে সে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও ঠোঁটের কোণে লেগে আছে চিরচেনা দুষ্টুমি। এসে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
–" ওরা মজা করছে না,আম্মু। বাই দ্যা ওয়ে,বিয়েটা কিন্তু আমি করি নি।”
মুহুর্তেই বির্বণ হয়ে উঠল রমণীর মুখমণ্ডল। অকপট বিমূঢ় দৃষ্টি মেলে তাকালেন স্বামীর মুখপানে। সাহেদ মির্জা বুঝতে পারলেন, স্ত্রী বেশ মন খারাপ করেছেন। ব্যাপারটাও অস্বাভাবিক নয়। ছেলের বিয়ের মতো এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, অথচ তাকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। তিনি নিজেকে শান্ত রেখে নরম স্বরে বললেন,
–"আসলে হামিদা, সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে তোমাকে জানানোর সুযোগই পাইনি। আর ভেবেছিলাম আগে সবকিছু ঠিকঠাক হোক, তারপর তোমাকে বলবো। আমরা তো পারমিতাকে দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বড় ছেলে মুখের উপর না করে দিলো। তখন অভিক বললো, ও পারমিতাকে বিয়ে করবে। আজ আবার ওর ফ্লাইট, তাই আর সময় নষ্ট না করে বিয়েটা করিয়েই ফেললাম।"
কথাগুলো শুনে হামিদা মির্জার অভিমান আরও খানিকটা বাড়লো। ছেলের বিয়েতে তার কোনো আপত্তি নেই। বরং ছেলেদের সংসারী হতে দেখার স্বপ্ন বহুদিনের। কিন্তু তাই বলে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কেউ একবার তাকে জানানোও প্রয়োজন মনে করলো না? অসন্তোষের ছাপ ফুটে উঠলো তার মুখমণ্ডলে। তিনি ধীরে ধীরে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ঠিক তখনই পেছন থেকে সৌরভ কৌতুকময় হেসে বলে উঠলো,
–”আরে আম্মু, তোমার ছোট ছেলের বউয়ের চাঁদবদন মুখখানা তো আগে দেখো।”
ছেলের কথায় হামিদা বেগমও নড়েচড়ে দাঁড়ালেন এবার। দু'কদম এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন নববধূ বেশে দাঁড়িয়ে থাকা পারমিতার সম্মুখে। ঘোমটায় আচ্ছাদিত মেয়েটাকে সরু'দৃষ্টে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন তিনি। এদিকে ঘোমটার আড়ালে থেকে হামিদা মির্জা ওমন ধারালো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পরখ করে শুষ্ক ঢোক গিললো পারু। ভাবছে, ঘোমটা উঠানোর পর ভদ্রমহিলার প্রতিক্রিয়া কি'রূপ হবে। এই ভাবনাতেই মেয়েটা নিজের হাত কচলাচ্ছে অনবরত।
তখনই হামিদা মির্জা কোনোরূপ বিলম্ব না করে অতর্কিতে পারমিতার মুখ থেকে ঘোমটা সরিয়ে দিলেন। মেয়েটার উজ্জ্বল শ্যামলা মুখখানা তার সামনে বেরিয়ে এলো। ভারী মিষ্টি ঠেকলো ওর কোমল মুখশ্রী। কিন্তু পরক্ষণেই ভদ্রমহিলা থমকে গেলেন। চোখ জোড়া বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হয়ে উঠে। ‘মাশাল্লাহ’ শব্দটি মুখ থেকে বের হতে গিয়েও কন্ঠনালীতে যেন আটকে গেল। নিজের স্থান থেকে দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে আচানক চেচিয়ে উঠলেন,
–"হায় হায়! শেষে কিনা একটা টাকলা মেয়েকে বিয়ে করলি, অভি? কিভাবে করতে পারলি তুই? আল্লাহ, আমার মাথা ঘুরছে। ওরে কেউ ধরে আমাকে।"
মায়ের তিক্ত বাক্যগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই অভিকের ভ্রূঁযুগলের মধ্যবর্তী স্থানটি কুঞ্চিত হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, দু'হাত অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। বহু কষ্টে নিজের ধৈর্য সংবরণ করে রেখেছে সে। কিন্তু এবার যেন সংযমের বাঁধ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার উপক্রম।
সবার সমস্যাটা ঠিক কোথায়, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না অভিক। পারু আজ নাহয় নেড়া;তাই বলে কি সারাজীবন এমনই থাকবে? চুল তো আবার গজাবে। আর মেয়েটা তো নিজের ইচ্ছায় মাথার চুল বিসর্জন দেয়নি; পরিস্থিতির শিকার হয়েই তাকে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। অথচ কেউ একবারও সেই দিকটা ভেবে দেখছে না। অবশ্য বুঝবেই বা কি করে কেউ তো জানার চেষ্টাই করছে না মূল ঘটনা। নিজেকে সংযত রেখে অভিক জুতসই শান্ত স্বরে বলল,
–"আম্মু, ও আমার বউ।"
–"তাই বলে একটা টাকলা মেয়েকে বউ করে আনবি?"
ধৈর্যের সব বাঁধ যেন এবার ভেঙে গেল অভিকে। দু’কদমে পারমিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর ঢাল হয়ে। পারমিতা নিশ্চুপ। কোন প্রকার কথা বলছে না। সকলের সামনে নিজেকে তামাশার পাত্রী হতে দেখে এক প্রকার আত্মসম্মানবোধ যেন ভেঙে গেল তার। কিন্তু যখনই অভিক’কে নিজের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে দেখল; তখনই অধর কোণে অলক্ষিত এক চিলতে হাসি রেখা ফুটে উঠলো। অভিক মায়ের দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখলো নির্দ্বিধায়,নির্ভয়ে। অতঃপর সংযত কন্ঠে বলল,
–” চুল আজ নয়তো কাল ঠিক উঠবে। এই নিয়ে তোমাদের সবার এত মাথা না ঘামালেও চলবে। না হলে পরে দেখা যাবে; তোমাদের মাথার চুলে গায়েব হয়ে গেছে ওর চিন্তায়।”
অভিকের কথায় থ হয়ে গেলেন হামিদা মির্জা। মুখে এনে রাখা কথাগুলো যেন গলায় বিঁধে গেল তার। তিনি নিষ্পলক চাহনিতে তাকিয়ে দেখছেন তার ছোট ছেলেকে। বিশ্বাস করতে পারছে না তার ছেলেটা এই কথাগুলো বলেছে। এদিকে পরিস্থিতি খারাপ হলেও অভিকের কথাগুলো শুনে সাহেদ মির্জা মুখ টিপে হাসলেন।
–” দেখলে আম্মু, বিয়ে হতে না হতেই তোমার ছেলে কেমন ওর টাকলা বউয়ের হয়ে কথা বলছে,ছিঃ ভাই ছিঃ!”
সৌরভের আগুনে ঘি ঢালার মতো কথা শুনে অভিক ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো বড় ভাইয়ের দিকে। তা দেখে কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো সৌরভ। অভিক খোশমেজাজি মানুষ হলেও, একবার তার মাথায় রাগ চড়ে বসলে তখন দিন দুনিয়ার খবর থাকে না। এই ভেবে সৌরভ নিজের মুখে লাগাম টানলো। ইতোমধ্যেই পারমিতা অভিকের পাশে এসে দাঁড়ালো। দোপাট্টা খান তার কাঁধেই ঝুলে আছে। তা উঠিয়ে আর নিজের কেশবিহীন মস্ত ঢাকা প্রয়োজন করলো না শান্ত রমণী। নিজের দৃষ্টি নত রেখে মৃদু স্বরে প্রথমবারের মতো বলে উঠল সে,
–”আন্টি, আপনার আর আপনার ওই ছেলে.. মানে আমার ভাসুরের যখন আমার চুল নিয়ে এতোই সমস্যা–তখন আমি কথা দিচ্ছি, আমার মাথায় চুল না উঠা পর্যন্ত আমি সর্বক্ষণ আমার মাথা ঢেকে রাখবো। আশা করছি, এতে আপনাদের আর কোনো অসুবিধা হবে না।”
মেয়েটা কথাগুলো বলে থামলো। বুক ফুলিয়ে একটা লম্বায় শ্বাস ছেড়ে পুনরায় নিজের মস্ত ঢেকে নিলো দোপাট্টা দ্বারা। এবার আর মুখখানি ঢাকলো না। মেয়েটার কথাগুলো শুনে হামিদা মির্জার
মুখাবয়ব কিঞ্চিৎ কোমল হতে গিয়েও থেমে গেলো সৌরভের বিড়বিড় করা কন্ঠস্বর শুনে।
–”আদৌও কি কোনোদিন চুল গজাবে এই টাক মাথায়?”
–”ভাইয়া, এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।”
অভিকের হুশিয়ারিতেও থামলো না সৌরভ। সে উল্টো পায়ে পা রেখে ঝগড়া করতে উদ্যত হলো। বলল,
–”কি বাড়াবাড়ি করেছি? আমাদের পুরো বংশে আজ পর্যন্ত এমন রেকর্ড কেউ করেনি।”
অভিক বক্র হাসলো। আর বলল,
–” তাহলে তো তোদের আমার জন্য গর্বিত হওয়া উচিত। আমি তোদের বংশের রেকর্ড এক তুরিতে ভেঙে দিয়েছি। সো ইউনিক, রাইট ব্রো?”
–”কচু! ও একটা টাকলা। ওর চুল উঠবে না। কেনো বুঝতে পারছিস না তুই? আল্লাহ জানে, এই মেয়ে তোর উপরে কি জাদু-টোনা করেছে!”
সৌরভের কথায় অভিক বিরক্তিতে নিজের চোখ পাকালো। ঠোঁট বাঁকিয়ে নিরস কণ্ঠে বলল,
–”তুই এমন স্টার জলসা আর জি বাংলা সিরিয়াল গুলোর ভাসুরদের মতো করছিস কেনো রে? বিয়ে হওয়ার আগ থেকেই মেয়েটার পিছনে শকুনের মতো পড়ে আছিস!”
–”তোর ভালো চাই তাই।”
–”আমার মাথা চাস। আমার বউকে টাকলি বলা বন্ধ কর, ভাইয়া।”
–”করবো না। তোর বউ একটা টাকলি।”
অভিক অত্যন্ত ক্ষোভে ঝংকার দিয়ে উঠে,
–”আমার বউকে নিয়ে ঠাট্টা করছিস তো! দেখবি একদিন তুইও টাকলা হয়ে যাবি।”
অভিকের কথায় অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লো সৌরভ। নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে করতে বলে উঠলো,
–” শকুনের দোয়ায় কখনো গরু ম'রে না,অভি।”
অভিক একদম শান্ত হয়ে গেলো। নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে ভাইয়ার পানে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,
–”কখনো কখনো ম'রে। জাস্ট ওয়েট ফর দ্য রাইট টাইম, মাই ডিয়ার ব্রো।”
ব্যস, ওদের এহেন কথোপকথন শ্রবণেন্দ্রিয় হতেই হামিদা মির্জার মুখাবয়ব পুনরায় কাঠিন্যতায় মুড়িয়ে উঠে। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পারমিতার পানে তাকান। কিছু বলার জন্য মুখ খুলবেন তার পূর্বেই সাহেদ মির্জা শক্ত কন্ঠে বললেন,
–”যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। পারমিতা এখন আমার ছেলের বউ। ওকে কেউ অসম্মান বা অপমান মূলক কথা বললে তা আমি আর অভি মোটেও বরদাস্ত করব না।”
কথাগুলো যে তিনি হামিদা মির্জা আর সৌরভের উদ্দেশ্যে বলেছেন তা মা-ছেলে মুহূর্তেই বুঝে গেলো। বিরক্তিতে দুজনের মুখ কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল। তবে এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না ভদ্রলোকের তিনি পারমিতা আর অভিকের দিকে তাকিয়ে কন্ঠস্বর নরম করে বললেন,
–”তোমরা রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। বিকালে অভির ফ্লাইট আছে।”
–”টাকলি ভাবী।”
শব্দ দুটি উচ্চারণ করে সৌরভ সেখান থেকে হনহন করে চলে গেল। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে পারমিতা মনে মনে বিড়বিড়িয়ে উঠল,
–”শা'লা, খাম্বা ভাসুর!”
.
.
.
দোতলার পূর্বপ্রান্তের রুমটি অভিকের। বেশ বড়সড় রুমখানা। রুমের ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে কিং সাইজের একখান খাট পাতানো। তার উপর সাদা রঙের বেডশিট অত্যন্ত মানানসই লাগছে। একপাশে বিশাল জানালা থেকে দূরের মাঠ সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। সূর্যের ফিকে আলো নীলচে দেয়ালে পড়তেই তার অদ্ভুতভাবে চিকচিক করে উঠে। সেই জানালার পাশে মাঝারি আকৃতির একটি বুকশেলফ আছে।
পারু কতক্ষণ ধরে পুরো রুমখানা নিরীক্ষণ করে চলেছে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করতে করতে তিনটা বেজে গেছে। রুমে এসেই অভিক চলে গেছে ওয়াশরুম তৈরি হতে। পারু যখন বিছানায় বসে রুমটা পর্যবেক্ষণ করছিল তখনই অভিক ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। পরনে একটা নেভি ব্লু কারালের শার্ট আর কালো জিন্স। অভিককে দেখে পারমিতা নড়েচড়ে বসে। ছেলেটা হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে পারমিতা পাশে এসে বসলো। হালকা কেশে বলে উঠল,
–”আপনার কিছু লাগলে আব্বুকে বলবেন। আর যদি আব্বুকে বলতে ইতস্তত বোধ করেন তবে আমাকে জানাবেন।”
পারমিতা মিহি স্বরে বলল, –”আচ্ছা।”
–”আম্মু হয়তো এখন রেগে আছে। কিন্তু দেখবেন আস্তে আস্তে আপনাকে আপন করে নেবে।”
এবারও একই উত্তর এলো পারমিতার তরফ থেকে, –”আচ্ছা।”
–”আর ভাইয়া যদি আপনাকে কিছু বলে তাহলে আমাকে জানাবেন।”
এবার পারমিতা চোখ পিটপিট করে তাকালো অভিকের পানে। তার দৃষ্টি দেখে অভিক নিজের ভ্রুঁ উঁচু করলো। আর শান্ত কন্ঠে আওড়ালো,
–”কি? কিছু ভুল বলেছি?”
পারু নিজের দৃষ্টি স্থির রেখে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
–”আপনার কি আমাকে বাচ্চা মনে হয়?”
প্রশ্ন শুনে বিমূঢ় চিত্তে রমণীকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলো অভিক। অতঃপর বুকের দু’পাশে হাত ভাঁজ করে বলল,
–”বাচ্চা মনে হলে নিশ্চয়ই বিয়ে করতাম না।”
–”তাহলে আপনার ভাইয়ের মামলা আমার হাতে ছেড়ে দিন। ওই ব্যাটা… না মানে ভাসুরকে যদি আমি শায়েস্তা না করেছি তবে আমার নামও পারমিতা সিদ্দিকী না।”
–”একচুয়ালি পারমিতা, ওটা সিদ্দিকা নয় মির্জা হবে। তোমার বিয়ে হয়ে গেছে; আমার সঙ্গে। রিমেম্বার?”
অভিকের কথা প্রস্তুত হয়ে পড়ল পারমিতা। নিজের গলা পরিষ্কার করার ভান করে মৃদুস্বরে বলল,
–”ওই একই হলো।”
অভিক কেবল ঠোঁট টিপে মৃদু হাসল। অতঃপর বেড ছেড়ে উঠে নিজের লাগেজে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখল। সবশেষে চেইন টেনে লাগেজটি বন্ধ করে হাতে তুলে নিল। দরজার দিকে কয়েক কদম এগোতেই আচমকা থমকে দাঁড়াল সে। ধীরে ধীরে সমগ্র দেহ ফিরিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল হালকা গোলাপি শাড়িতে মোড়া নববধূর দিকে। মেয়েটার মায়াময় মুখশ্রীর দিকে তাকালেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে মনে। যদি তার মস্তকজুড়ে ঘন কেশরাশির আবরণ থাকতো, তবে হয়তো সেই সৌন্দর্য আরও পরিপূর্ণ হয়ে ধরা দিতো। ভাবনা’খান মনে উদিত হতেই অজান্তেই দীর্ঘ এক নিশ্বাস বেরিয়ে এলো অভিকের বুক চিরে।
লাগেজটি পুনরায় মেঝেতে নামিয়ে রেখে ধীর এগিয়ে এলো সে পারমিতার সন্নিকটে। অভিককে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে পারমিতাও উঠে দাঁড়াল। মুহূর্তেই চার চোখ একসূত্রে আবদ্ধ হলো। অভিক কণ্ঠে কোমলতার পরশ মিশিয়ে শান্ত স্বরে আওড়ালো,
–"একা থাকতে পারবেন? মানে…আম্মু আপাতত রাগ আর অভিমানে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে না। আব্বু দিনের অধিকাংশ সময়ই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর ভাইয়ার সঙ্গে তো আপনার সম্পর্কটা সাপে-নেউলের মতো। তাই ভাবছিলাম, আপনি পারবেন তো?"
কথাটা শেষ হলেও অভিকের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সরে গেল না পারমিতার নয়নযুগল থেকে। প্রশ্নটি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই পারমিতার চোখজোড়া মুহূর্তেই বিষন্নতার ছায়ায় আবৃত হয়ে গেল। সত্যিই তো! এই বাড়িতে সে সম্পূর্ণ নতুন। তার ওপর এ পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্গেই তার সম্পর্ক এখনো সহজ-স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। এমন পরিস্থিতিতে অভিককে ছাড়া দীর্ঘ পাঁচটা মাস কীভাবে কাটাবে সে? হৃদয়ের গভীরে তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল পারমিতার। অন্তরজুড়ে নেমে এলো এক অচেনা শূন্যতার আবরণ। অজান্তেই টলমল করে উঠল তার নয়নকোণ, অশ্রু যেকোনো মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে। ভাবুক রমণী নত করল আপন মস্তক। ক্ষীণ, ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল,
–"পাঁচ মাসেরই তো ব্যাপার,আমি মানিয়ে নিতে পারব।"
কথাগুলোর আড়ালে চাপা পড়ে থাকা বিষণ্নতার সুরটা অভিকের বুঝতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে ধীরে ধীরে নিজের ডান হাত রাখল পারমিতার বাহুর ওপর। আকস্মিক স্পর্শে শিহরিত হয়ে উঠল পারমিতার সমগ্র সত্তা। মস্তিষ্ক তাকে এক পা পিছিয়ে যেতে তাগিদ দিলেও; হৃদয় নিঃশব্দে তাকে স্থির থাকতে বলল। অভিক আলতো করে তার চিবুক স্পর্শ করে মুখখানি তুলে ধরল। বাধ্য হয়ে অভিকের চোখে চোখ রাখল পারমিতা। টলমল দৃষ্টির গভীরে জমে থাকা না-বলা অনুভূতিগুলো স্পষ্ট পড়ে ফেলল অভিক।
অজানা এক ব্যথা কাঁটার মতো বিঁধে উঠল তার বক্ষে। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পারমিতার কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার আগেই অশ্রুকণা মুছে দিল অভিক। তারপর আবিষ্ট, ভারী কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলে উঠে,
–"এই মুহূর্তে এমন কোনো আবদার করা হয়তো আমার উচিত নয়। তবুও একটা ইচ্ছের কথা বলতে চাই। পারমিতা, মে আই কিস ইয়োর ফরহেড? জাস্ট ওয়ান্স... প্লিজ?”
প্রশ্নটা বাতাসে ভেসে রইল। ক্ষণিকের জন্য সময়ও আপন গতি থামিয়ে দিল যেনো। অভিকের চোখে কোনো জোরাজুরি নেই, নেই কোনো অধিকার ফলানোর ঔদ্ধত্য। সেখানে আছে কেবল একরাশ সংকোচ আর অনুমতির অপেক্ষায় থাকা গভীর আকুতি।
পারমিতা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার মুখপানে। বুকের ভেতর ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ছে, অথচ অধরদ্বয় নিথর। কী উত্তর দেবে, তা সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। লজ্জা, দ্বিধা, অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভূতির সংমিশ্রণে তার সমগ্র সত্তা এক অদ্ভুত আবরণে ঢেকে গেল। ধীরে ধীরে তার পল্লবদ্বয় নত হয়ে এলো। অতি সূক্ষ্ম ভঙ্গিতে সম্মতির ইঙ্গিত জানিয়ে সে মাথা সামান্য এগিয়ে দিলো অভিকের দিকে।
সেই নীরব সম্মতি পেয়ে অভিকের বক্ষদেশে জমে থাকা অদৃশ্য ভার খানিকটা লাঘব হলো। তবু সে তাড়াহুড়ো করল না। পরম যত্নে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো কিছুর কাছে এগিয়ে যাচ্ছে, তেমন সতর্কতায় আরও এক পা এগিয়ে আসলো। অতঃপর ধীরে ধীরে মুখ ঝুঁকিয়ে অত্যন্ত স্নিগ্ধ, শ্রদ্ধামিশ্রিত অপরের কোমল পরশ ছুঁয়ে দিলো রমণীর ললাটে। পারমিতা অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ বুজে ফেলল। অকারণে তার দেহে শিহরণ বইছে। কপালের সেই ক্ষুদ্র স্পর্শটুকু সারা শরীরে উষ্ণ এক প্রশান্তির ঢেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুকণাটি এবার আর বাধ মানল না; নীরবে গড়িয়ে পড়ল কপোল বেয়ে। অভিক ধীরে ধীরে সরে এলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মলিন, তৃপ্তির এক রেখা হাসি। নিচু স্বরে বলল,
–”নিজের যত্নে নেবেন।"
পারমিতা নিজের চোখ মেলে তাকালো। অধরে মৃদু হাসি টেনে বলল,
–”আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন। অতিরিক্ত কাজের চাপে নিজের নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাবেন না যেনো। আর…”
থেমে গেলো পারমিতা। শব্দটা উচ্চারণ করতে ঈষৎ সংকোচ বোধ করছে রমণী। যা দেখে কৌতুহলে ভ্রুঁযুগল কুঁচকে ফেললো অভিক। আর আওড়ালো,
–”আর কি, পারমিতা?”
পারমিতা একটা শুষ্ক ঢোক গিলে মিহি কন্ঠে বলল,
–”আমি.. আমি আপনার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবো।”
কথাটা শুনে অভিকের অধর কোণে হাসি রেখা কারো হয়ে উঠলো।
–” আমিও অপেক্ষায় থাকবো। খুব শীঘ্রই আমাদের আবার দেখা হবে। এখন তাহলে আসি। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
এই বলে নিজের লাগেজ পুনরায় হাতে নিলো।
পারমিতাও মাথায় কাপড় দিয়ে অভিকের সঙ্গে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
চলবে......