ফন্ট সাইজ:
থিম:
ভালোবাসা যখন হেদায়েত

১ম পর্ব

লেখক: তারিক জামিল সিরাজী

📖 ভালোবাসা যখন হেদায়েত

পর্ব ১ — লাল ইটের ক্যাম্পাস
পৃষ্ঠা — ১
সকালটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনগুলোর গায়ে তখনও সকালের নরম রোদ এসে পুরোপুরি বসেনি। ক্যাম্পাসের রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়ার শুকনো পাতাগুলো বাতাসে মৃদু শব্দ তুলছিল। কোথাও একদল শিক্ষার্থী ক্লাসের দিকে ছুটছে, কোথাও চায়ের কাপে জমে উঠেছে তর্ক-বিতর্ক, আবার কোথাও দুজন বন্ধু দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করছে—যেন পৃথিবীর সব সিদ্ধান্ত তাদের হাতেই।
এই ব্যস্ততার মাঝেও একজনকে দেখে মনে হতো, সে যেন এই কোলাহলের অংশ হয়েও কোলাহল থেকে অনেক দূরে।
সাদা পাঞ্জাবি পরা ছেলেটি ধীর পায়ে হাঁটছিল।
এক হাতে কয়েকটি বই। অন্য হাতে কিছুই নেই। কাঁধে কোনো ব্যাগ নেই।
মাথাভর্তি ঘন কালো বাবরি চুল বাতাসে সামান্য নড়ছিল। শ্যামলা মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। চোখ দুটি নিচু, হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
সে মেহরাব আদনান হোসাইন।
বন্ধুদের কাছে শুধু আদনান।
পেছন থেকে আফিফের ডাক ভেসে এল—
— “আদনান! দাঁড়া ভাই!”
আদনান থেমে পেছনে তাকাল।
দৌড়ে আসতে আসতে আফিফ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— “তুই মানুষ নাকি বাতাস? এত দ্রুত হাঁটিস কীভাবে?”
আদনান মৃদু হাসল।
— “তুই দেরি করিস বলেই আমার দ্রুত মনে হয়।”
পাশ থেকে ইরফান হেসে উঠল।
— “ভাই, আজকে কিন্তু তোর শান্তির পরীক্ষা আছে। আরিয়ান বলছিল, বিকেলে দাওয়াতের কাজে যেতে হবে।”
আদনান মাথা নাড়ল।
— “ইনশাআল্লাহ। আগে ক্লাসটা শেষ করি।”
কথাটা বলেই সে আবার সামনে হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু সে জানত না—
কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জোড়া চোখ তার প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করছে।
চোখ দুটি ছিল নুসরাত নাবিলার।
আর সেদিন নুসরাত প্রথমবার ভাবল—
“ছেলেটা এমন কেন?”
সে জানত না, এই একটি প্রশ্নই একদিন তার পুরো জীবন বদলে দেবে।
📖
পৃষ্ঠা — ২
— “কী দেখছিস?”
জেরিনের কথায় নুসরাত যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল।
সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
— “কিছু না।”
জেরিন ভ্রু কুঁচকে সামনে তাকাল। তারপর আদনান‌ ও তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— “কিছু না? তাহলে ওই সাদা পাঞ্জাবি পরা ছেলেটার দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলি কেন?”
নুসরাত একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— “তুই বেশি কথা বলিস।”
পাশ থেকে রুহি  হেসে উঠল।
— “আরে, ছেলেটা দেখতে তো বেশ ভালো। কিন্তু ওকে নিয়ে এত আগ্রহের কী আছে?”
আইরা চুপচাপ নুসরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে বলল,
— “ছেলেটা অন্যরকম মনে হচ্ছে।”
নুসরাত এবার আর কিছু বলল না।
তার চোখ আবার অজান্তেই চলে গেল আদনানের দিকে।
আদনান তখন বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ রাস্তার পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধের দিকে তার চোখ পড়ল। লোকটির সামনে কয়েকটি পুরোনো বই ছড়িয়ে ছিল।
আদনান থেমে গেল।
বন্ধুরা কয়েক পা এগিয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পেরে তারাও থামল।
আদনান বৃদ্ধের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে সালাম দিল।
— “চাচা, কেমন আছেন?”
বৃদ্ধ লোকটি মুখ তুলে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— “আলহামদুলিল্লাহ বাবা।”
আদনান তার সঙ্গে দু-একটি কথা বলল। তারপর নিজের হাতে থাকা বইগুলোর একটি বৃদ্ধের সামনে রেখে বলল,
— “চাচা, এটা আপনি রাখেন। আমার কাছে আরেকটা আছে।”
বৃদ্ধ অবাক হয়ে বইটির দিকে তাকালেন।
— “বাবা, তোমার লাগবে না?”
আদনান হেসে বলল,
— “আল্লাহ চাইলে আবার জোগাড় হয়ে যাবে।”
দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল নুসরাত।
তার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কেন জানি বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
সে ফিসফিস করে বলল,
— “ছেলেটা সত্যিই অন্যরকম…”
জেরিন শুনে ফেলল।
সে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— “তাহলে শুরু হয়ে গেল?”
নুসরাত কোনো উত্তর দিল না।
শুধু আদনানের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর সেদিন প্রথমবার—
নুসরাতের কৌতূহলের সঙ্গে অজান্তেই মিশে গেল এক অচেনা ভালো লাগা।
📖
পৃষ্ঠা — ৩
জেরিনের কথার কোনো উত্তর দিল না নুসরাত।
সে শুধু ব্যাগের ফিতেটা কাঁধে ঠিক করে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু তার মনটা যেন হাঁটছিল অন্য কোথাও।
সামনে আদনানদের দলটাও এগিয়ে যাচ্ছিল।
ইরফান হঠাৎ আফিফকে বলল,
— “আজকে ক্লাস শেষে কোথায় যাবি?”
আফিফ উত্তর দেওয়ার আগেই আরিয়ান বলল,
— “তোমরা যা খুশি করো। আসরের পর কিন্তু আমাদের বের হতে হবে।”
ইরফান হেসে বলল,
— “জানি ভাই, জানি। তুই আর আদনান থাকলে দাওয়াতের কথা ভুলে থাকার উপায় আছে?”
আদনান মৃদু হেসে বলল,
— “দাওয়াত শুধু আমাদের কাজ না, ইরফান। ভালো কথা মনে করিয়ে দেওয়াটাও এক ধরনের দায়িত্ব।”
কথাটা খুব সাধারণভাবেই বলেছিল সে।
কিন্তু কিছু দূর থেকে নুসরাতের কানে কথাটা পৌঁছে গেল।
সে থেমে গেল।
দাওয়াত…
শব্দটা তার কাছে নতুন নয়। কিন্তু আদনানের মুখে শুনে কেন যেন অন্যরকম লাগল।
রুহি পাশে এসে বলল,
— “কী হলো? আবার থেমে গেলি কেন?”
নুসরাত ধীরে বলল,
— “ওরা দাওয়াত বলতে কী বোঝায়?”
জেরিন অবাক হয়ে তাকাল।
— “তুই এতক্ষণ ওর কথা শুনছিলি?”
নুসরাত বিরক্তির ভান করে বলল,
— “শুনেছি তো কী হয়েছে?”
আইরা মৃদু হেসে বলল,
— “মনে হয় তোর আজ অনেক কিছু জানার আছে।”
নুসরাত এবার কোনো জবাব দিল না।
কিছুক্ষণ পর সবাই ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
ক্লাস শুরু হওয়ার আগে নুসরাত নিজের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
লাল ইটের ভবনের পাশ দিয়ে আদনান তখন শেষবারের মতো হেঁটে যাচ্ছে।
হাতে বই।
সাদা পাঞ্জাবি।
চোখ নিচু।
তার চারপাশে অনেক মানুষ ছিল, অথচ ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছিল—সে নিজের ভেতরেই এক আলাদা পৃথিবী নিয়ে হাঁটছে।
নুসরাত নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,
— “তোমার পৃথিবীটা আসলে কেমন, আদনান?”
সেদিন প্রশ্নটার উত্তর সে পায়নি।
কিন্তু সে জানত না—
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই একদিন তাকে নিজের পুরো পৃথিবী নতুন করে চিনতে হবে।
📖
পৃষ্ঠা — ৪
ক্লাস শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেল।
শিক্ষার্থীরা একে একে বেরিয়ে আসতে লাগল। করিডোরে আবারও সেই চেনা কোলাহল। কেউ বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ ক্যান্টিনের দিকে ছুটছে, কেউবা পরের ক্লাসের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নুসরাতও জেরিন, রুহি আর আইরার সঙ্গে বেরিয়ে এল।
হঠাৎ জেরিন বলল,
— “চল, ক্যান্টিনে যাই।”
রুহি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু নুসরাতের চোখ তখন অন্যদিকে।
ক্যাম্পাসের এক কোণে আদনান দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে আগের সেই বই। পাশে আফিফ, ইরফান আর আরিয়ান।
নুসরাত না চাইলেও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
আদনান হঠাৎ মাথা তুলল।
দূর থেকে দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।
নুসরাতের বুকটা কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিন্তু আদনান?
সে মাত্র এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আবার বন্ধুর কথায় মন দিল।
কোনো বিস্ময় নেই।
কোনো অস্বস্তি নেই।
কোনো বিশেষ অনুভূতির প্রকাশও নেই।
নুসরাতের মনে হলো, “আমি এতটা অনুভব করলাম, আর ওর কিছুই হলো না?”
জেরিন তার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
— “চোখাচোখি হয়ে গেছে কিন্তু!”
— “চুপ কর।”
— “তোর গলা কেন কাঁপছে?”
— “কাঁপছে না।”
জেরিন আর কিছু বলল না। শুধু মুচকি হাসল।
অন্যদিকে আফিফ আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “ভাই, ওই মেয়েটা কয়েকবার ধরে তোর দিকে তাকাচ্ছে।”
আদনান শান্তভাবে বলল,
— “হয়তো কোনো কারণ আছে।”
ইরফান হেসে বলল,
— “তুই তো একবারও তাকাস না!”
আদনান বইটা বন্ধ করে বলল,
— “সব তাকানোকে গুরুত্ব দিতে নেই।”
আরিয়ান কিছু না বলে আদনানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তারপর চার বন্ধু ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
আর নুসরাত দাঁড়িয়ে রইল একই জায়গায়।
তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন—
“যে মানুষটা আমাকে একবারও দেখতে চায় না, তার কথাই কেন আমি বারবার ভাবছি?”
সে জানত না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পটা শুরু হয়ে গেছে।
       •  পর্ব ১ এখানে ই সমাপ্ত 💞📄
🖋️ লেখক - তারিক জামিল সিরাজী ✓
📢
বি:দ্র: প্রিয় সম্মানিত পাঠকগণ যদি আপনাদের কাছে আমার ইসলামিক উপন্যাস টা ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই পাশে থাকবেন এবং আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আরো ভালো কিছু উপহার দিতে পারি ইনশাআল্লাহ 💝 🥀
📢
বি:দ্র: এই উপন্যাসের পর্ব গুলো প্রতিদিন রাত ১০ টা থেকে ১১ টার মধ্যে আপলোড করা হবে ইনশাআল্লাহ 💝🥀 
সকলের দোয়া কামনা করছি আপনারা পাশে থাকবেন ইনশাআল্লাহ সকল সম্মানিত লেখকগণ সম্মানিত পাঠকদের ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে ইনশাআল্লাহ 💝🥀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন