"আপনি তো শিক্ষিত আপনি কেন বিয়েতে রাজি হলেন এতোই যখন অপছন্দ মেয়েটাকে তাহলে আগে কেন বলেন নি।তখন কি মুখে কথা ছিলো না আপনার।বাবা মায়ের বাধ্য সাজতে গেছিলেন তখন আপনি..?
সারা আর কিছু বলার আগেই ঠাশ করে পর পর দুটো চড় পড়ে সারার গালে।সারা একটু দূরে সরে যায়।বেশ জোরেই লেগেছে চড় দুটো।পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।সারা চড় খাওয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।আকশ্মিক চড়ে বেশ লেগেছে তার।
সারা সোজা হয়ে শুভ্রর দিকে তাকাতেই শুভ্র রাগী কন্ঠে গর্জে বলে উঠে..
-" হু আর ইউ।আমি কি করবো সেটা আমার ব্যাক্তিগত ব্যাপার তোর সমস্যা কি..?
-"বুজতে পারছেন না আমার সমস্যা কি..?
-"এই জা বলবি খুলে বল রাগাস না ফলাফল ভালো হবে না।
-"কিসের ফলাফল ভালো হবে না।আমার জীবনটা তো নষ্ট করেই ফেলেছেন আপনি..?
-"হোয়াট..?
-"বুজতে পারছেন না। কেন বিয়ে করলেন আমায়?যাকে বিয়ে করতে গেছিলেন তাকে কেন করলেন না।আমার জীবন টা নষ্ট করে কিসের আনন্দ পেলেন আপনি..?
-"আর একটা কথা বললে ঠাঠিয়ে তোর মুখের ভাস্কর্য পালটে দিবো।স্টপ।
-"কিসের চুপ করতে বলছেন আমাকে।কেন করলেন আমাকে বিয়ে।
শুভ্র মাথায় এবার রাগ উঠে গেলো।কোনো জীবনেই তার এমন বাচাল মেয়ে পছন্দ না।তার উপর একেবারে মুখের উপর কথা বলতেই থাকে।নন স্টপ হুইসেল এর মতো।শুভ্র আর রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে সারার গাল চেপে ধরে ঠেলতে বারান্দায় বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।
প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার। শুভ্রর নিজের ও এই বিয়েতে কোনো মত ছিলো না।একে তো মেয়ে তার থেকে গুনে গুনে দশ বছরের ছোট তার উপর মেয়েটা তার উপর মেয়েটা তার স্টুডেন্ট। শুধু নিজের মায়ের কথা রাখতেই বিয়ে করেচজে শুভ্র নয়তো কোনোদিন ই করতো না।শুভ্র একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বারান্দার দরজার পর্দা টেনে দেয়।যাতে মেয়েটার দিকে তার নজর না যায়।
বেশি পটর পটর করছিলো। এখন ভিজুক বৃষ্টিতে।শুভ্র রুমের লাইট অফ করে দিয়ে বিছানায় গিয়ে সুয়ে পড়ে।এদিকে সারাকে বারামদায় ধাক্কা দিয়েই শুভ্র দরজা লাগিয়ে দেওয়ার সারা দ্বিতীয় বারের হতভম্ব। সে মনে করেছিলো সে শক্ত থাকলে সামনে থাকা মানুষটি তার প্রতি নরম থাকবে কিন্তু না তার উলটো হলো।বরং তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বারান্দায় পাঠিয়ে দিয়েছে।
বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে।বারান্দার গ্রিল ভেদ করে বৃষ্টির পানিতে বারান্দা ভিজে যাচ্ছে।বারান্দার এক কোনায় গুটিশুটি মেরে হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে সারা। চোখ দিয়ে টপটপিয়ে পানি পড়ছে। খুব শীত লাগছে তার। ক্ষনে ক্ষনে বিদ্যুত চমকাচ্ছে ধরনীতে। মেঘ গর্জে উঠছে তবে সারার ভয় করছে না।
সারার চোখ বেয়ে পড়ছে ধারাহীন নোনা অশ্রু।এ কেমন নিয়তী তার বোনের সাথে বিয়ে করতে এসে তাকে বিয়ে করে নিলো।সারা যেনো এখোনো মানতে পারছে না।সারা ভেবে পায় না কেন তার আপু পালিয়ে গেলো আর কেনই বা তার বাবা মা তাকে জোর করে বিয়ে করালো।সারা এসব প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতেই ডুবে যায় কল্পনায়।
ফ্লাসব্যাক.....
আজ সারার বড় বোনের বিয়ে। সারার খুশি যেনো অন্য রকম। হবেই বা না কেনো। একটা বিয়ে বাড়ির সকলের মাঝে কত আনন্দ লুকিয়ে রাখে।পুরো কাজিন মহল মিলে আনন্দে মেতে আছে।সারার পুরো নাম সিদরাতুল সারা।বাবা মায়ের ছোট মেয়ে।সারার বড় বোনের নাম নাইমা জাহান নিদ্রা।
বিকালেই পার্লার থেকে সেজে এসেছে তারা।নিদ্রার মুখেও হাসি।হাসি থাকবেই বা না কেন। ভার্সিটির ক্রাস লেকচারার।ভার্সিটির প্রায় প্রতিটি মেয়ের ক্রাশ এর তার সাথে বিয়ে ভাবতেই আনন্দে মন নেচে উঠে নিদ্রার।
সন্ধ্যা হতে হতে না হতেই পর পর তিনটা গাড়ি বেরিয়ে গেলো কমিউনিটি হলের দিকে।সারার বাবা নাজমুল হুদা ও মা মারজিয়া ও আছে।এতো বড় ঘরের থেকে নিজের দুই মেয়ের জন্য সম্বন্ধ পেয়ে খুশি হয়েছিলেন তিনি।তবে শর্ত ছিলো বড় ছেলের বিয়ের এক বছরের মাথায় ছোট ছেলের বউ হিসেবে সারাকে নিয়ে যাবেন বলে কথা দিয়েছিলেন ফারুক তালুকদার।
যথাসময়ে সারাদের গাড়ি এসে থামে কমিউনিটি হলের সামনে। এটা তালুকদার বাড়ি থেকে আয়োজন করেছে। যদিও নাজমুল হুদা বিয়েতে এক পয়শা ও খরচ করছেন সব খরচ ই ফারুক তালুকদার করছেন।
ছেলে পক্ষ অনেক আগেই এসেছে পৌচেছে।কনে পক্ষ আশা মাত্রই সকল কে খাওয়া দাওওয়ায় বসিয়ে। ফারুক তালুকদার নাজমুল হুদাকে নিয়ে কাজি সাহেব এর কাছে আসে।সেখানে বর বেশে বসে আছে শুভ্র তালুকদার।এ বিয়েতে মোটেই তার মত নেই।শুধুমাত্র নিজের মায়ের কসম কাটায় বিয়ে তে বসতে হয়েছে।ফারুক তালুকদার এর অনুমতি তে কাজি বিয়ের কাজ শুরু করেন। নারজিয়া চলে যান মেয়েকে নিয়ে আসতে।একটু আগেই বান্ধুবীদের সাথে পাশের একটা রুমে বসিয়ে এসেছেন মেয়েকে।সারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে নাজমুল হুদার পাশে।পরনে রানী গোলাপী রঙের ভারী কাজের লেহেঙ্গা। হাটু সমান চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া।কাজল কালো চোখ গুলো টানা টানা।চিকন ঠোঁট। প্রথম দেখায় মনে ধরে যাবে যে কারো।
রুমে যেতেই মাথা আকাশ ভেঙে পড়ে মারজিয়ার।রুমে কেও নেই।নিদ্রার সকল বন্ধুরা খেতে বসেছে।নিদ্রা রুমে নেই এমনকি কোথাও নেই।মারজিয়া দৌড়ে আসে নাজমুল হুদার কাছে।মারজিয়া কে হাপাতে আর ভীত হতে দেখে নাজমুল হুদা বলে উঠে...
-"কি হলো হাপাচ্ছো কেন আর নিদ্রা কই তাড়াতাড়ি নিয়ে আসো..?
-"নিদ্রা কোথাও নেই।রুম ফাকা।
মারজির কথায় চমকে উঠে ফারুক তালুকদার,, নাজমুল হুদা সহ সকলে।নাজমুল হুদা কিছু বলার আগেই ফারুক তালুকদার বলে উঠে,,,
-"মানেহ..?কি বলছেন মেয়ে কোথাই...?
বিয়ের আসর থেকে মেয়ে পালিয়েছে কথাটা বাতাসের মতো উপস্থিত সকলের কানে পৌছে গেলো।
নাজমুল হুদা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন।মাথায় চিন্তা বাসা বেধেছে।পাশে বসেই রাগে ফুশছে ফারুক তালুকদার। এতদিন আগে বিয়ে ঠিক করে ছেলে মেয়ের সম্মতি নিয়েই আজ এত বড় আয়োজন। শহরের বেশ নামিদামি মানুষ এসেছে এখানে।
ইতিমধ্যে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে।শুভ্র ও রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।বন্ধুদের সামনে মান ইজ্জত শেষ হয়ে যাচ্ছে তার।যে ছেলে বিয়ে করতে চাইতো না তার বিয়ের দিন বউ পালিয়েছে।কথাটি কেমন যেন শুভ্রর রাগ বাড়িয়ে দিয়েছে।তবুও সামনে নিজের বাবাকে বসে থাকতে দেখে চুপ চাপ আছে সে। সমস্ত রাগ হজম করে নিচ্ছে।
বাইরে মুষল ধারে বৃষ্টি হচ্ছে।নাজমুল হুদা ঘেমে একাকার।মারজিয়া বেগমের চোখে পানি।কি বলবেন বুজে উঠে পারছে না সে।সে কল্পনায় ও ভাবতে পারি নি তাদের মেয়ে এমন একটা কাজ করবে।সারার এতক্ষন বন্ধুদের নিয়ে খুজেছে।নিদ্রা মোবাইল টাও রেখে গেছে। শুধু একটা থ্রিপিচ আর কালো বোরকা পরে গিয়েছে।বিয়ের সকল ড্রেস গয়না ঘরেই রেখে গেছে।
এখন কথা হচ্ছে নিদ্রা সবার সামনে দিয়ে চলে গেলো কেও জানতে পারলো না এটা কিভাবে সম্ভব।একজন মানুষ রুমের দরজা লাগিয়ে সমস্ত কিছু চেঞ্জ করলো তাও কেও সন্দেহ করলো না। কোনো কিছু হিসাব মিলাতে পারছে না সারা।নিশ্চয় কোনো ঘাবলা আছে।সারা পুরো রুম টা ভালো করে পরখ করতে চোখে পড়ে সোফার পাশে একটা কলম দিয়ে কাগজ চাপা দেওয়া।
সারা কপাল কুচকে সেখানে যায়।কাগজ টা হাতে নিতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায়।নিদ্রার রেখে যাওয়া চিঠি।চিঠি টা পডার পর সারার ভিতরের কোন অনুভতি সে প্রকাশ করবে বুজতে পারে না।সারা চিঠি টা নিয়ে বের হতে নিতেই কানে ভেসে আসে দুজন পুরুষের কন্ঠ।তারা এক কর্নারে দাঁড়িয়ে বলাবলি করছে...
-"আবিদ জানিস তো বেপার টা বেস্ট ইন্টারস্টেটিং। আমাদের শুভ্রর তো মেয়ে পছন্দই ছিলো না শুধু আন্টির কথায় রাজি হয়েছে।আর আজ বিয়ের আসর থেকে মেয়ে পালিয়েছে।
কথাটি বলেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে।বর্তমানে সবাই বিয়ের স্টেজের কাছে থাকায় সারা বাদে অন্য কেও তাদের হাসি দেখতে পায়না মুহুর্তে সারার রাগ উঠে যায়।দপাদপ পা ফেলে হেটে যায় স্টেজের দিকে।নাজমুল হুদার সামনে গিয়ে সারা দাড়াতেই নাজমুল হুদা মুখ তুলে তাকায় ছোট মেয়ের দিকে।
সারার বেশ খারাপ লাগে নিজের বাবার এমন অবস্থা দেখে।যে রাগ নিয়ে এখানে এসেছিলো আসার পর বাবার কষ্ট দেখে সে রাগের কথা ভুলে গেছে।সারা হাতে থাকা চিঠিটা নাজমুল হুদার দিকে বাড়ি দিয়ে বলে...
-"এটা ওই রুমে ছিলো...?
সকলে এবার সারার দিকে তাকায়।কিন্তু সারার মধ্যে কোনো ভাবাবেগ নেয়।মারজিয়া জিজ্ঞাসা করে..
-"কি এটা..?
-"আপুর চিঠি..!
আপুর চিঠি কথাটা শোনা মাত্রই সবাই আরেক দফায় অবাক হয়।নাজমুল হুদা মাথা নিচু করে করে এক অন্য রকম কষ্টের কন্ঠে সারাকে চিঠি টা পড়তে বলে।উপস্থিত সকলে এখন স্টেজের চারিপাশে দাঁড়িয়ে আছে।ফারুক তালুকদার এর মাথা নিচু।নিজের একমাত্র ছেলের জন্য নিজের কোম্পানির ম্যানেজার এর মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন।
মেয়েটা তার বেশ পছন্দ ও ছিলো।নাজমুল হুদার দুই মেয়েকেই প্রথম দেখায় তার চোখে ধরে ছিলো তাই বড় মেয়ে নিজের ছেলের বউ আর ছোট মেয়েটাকে শুভ্রর বন্ধুর জন্য ঠিক করেছিলেন।সারা শুকনো একটা ঢোক গিলে চিঠির ভাজ খুলে পড়তে শুরু করে।
প্রিয় বাবা,,,
প্রথমে আমার সালাম নিও। আমি জানি এই পরিস্থিতি তে আমার উপর কত বেশি রেগে আছো তুমি।রেগে থাকাটাই সাভাবিক।বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা আয়োজন করেছিলে অনেক।আর আমি কিভাবে চুনকালি মাখিয়ে চলে এলাম।বিশ্বাস করো বাবা আর কোনো উপাই ছিলো না।তুমি বা মা আমাকে বুজ লতে চাওনি।সব সময় তোমাদের সিদ্ধান্ত আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছো।এখন প্রশ্ন হলো আমি কেন তাহলে বিয়ে তে রাজি হলাম।সেটা আমি নিজেও জানিনা।তুমি কখোনো আমার মতামত জানতে চাওনি শুধু এসে বলেছিলে আমার বিয়ে। নিরব কে আমি অনেক বেশি ভালোবাসি বাবা।আমাকে খুজে লাভ নেই।এতক্ষনে আমাদের ফ্লাইট বাংলাদেশের সিমান্ত পার হয়ে গেছে হয়তো।আমরা দেশ ছাড়ছি আমি কখোনো ফিরে আসবো না বাবা।যদি আজ তোমার কথা শুনে বিয়ে করে নিতাম তাহলে আমি একজন বেইমান নারী হয়ে যেতাম।নিজের ভালোবাসা কে ঠকাতাম।তাই আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।আমাকে মাফ করে দিও বাবা।আমার বোনটার জীবনে অন্তন আমার মতো কোনো কিছু চাপিয়ে দিও না।মাকেও দেখে রেখো।
ইতি নিদ্রা।
০১-০৬-২০২৪
চিঠি পড়ে সারা থামতেই নাজমুল হুদা সারা হাত থেকে চিঠি টা কেড়ে নিয়ে খন্ড খন্ড করে দিলো।রাগে ফুশছে সে।ফারুক তালুকদার গম্ভীর ভাবে বসে আছেন।তার চোখ গুলোও লাল আভায় ভরে উঠেছে।শুভ্র পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে মনে মনে বেশ আনন্দ লাগছে তার।বর্তমানে তার বিয়ের কোনো ইচ্ছাই ছিলো তাও তার মা মিসেস আনিতা জোর করে কসম কাটিয়েছেন।
অসুস্থ মায়ের জন্য বিয়েতে রাজি হয়েছেন।তবে এখন বেশ ভালোয় লাগছে বিয়ে না করেই বাড়ি যাবে সে।ফাও ফাও একটা উটকো ঝামেলা বয়ে বয়ে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া লাগতো না আর।
সবার পিনপতন নিরবতার মাঝে ফারুক তালুকদার উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে নাজমুল হুদার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,,,
-"ভিতরে এসো তোমার সাথে আমার বোঝাপড়া আছে।
চলবে...
#শুভ্র_ভাই
#সুচনা_পর্ব
#লেখিকা_সারা_চৌধুরী