ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ে খলনায়ক

১ম পর্ব

লেখক: লাবিবা ওয়াহিদ

--"আমার যখন ১৬ বছর বয়স, তখন ইরতেজা ভাইয়ের সাথে আমার আকদ হয়ে যায়। আকদ সারতেই ইরতেজা ভাই আমার দৃষ্টি সীমানার বাইরে সুদূর কানাডা চলে গেলেন। ইরতেজা ভাই আমার জেঠার ছেলে হলেও আমার জেঠা এবং বাবার মধ্যে অনেক বছর যাবৎ-ই সম্পর্ক ভালো নেই।"

--"তোর বাবা-চাচাদের মধ্যে যদি সম্পর্ক খারাপই হয়ে থাকে তাহলে বিয়েটা কী করে হলো? তোরা কী একে অপরকে পছন্দ করতি?"

--"নাহ। আমরা দুজন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ। সহজ ভাষায় বলতে গেলে— আমরা একে অপরের চোখের বিষ, ছোটোবেলায় আমাকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়িতে ফেলে দেওয়ার রেকর্ড আছে ইরতেজা ভাইয়ের।"

মৌরি অবাক হয়ে যায়, অদ্ভুত কাণ্ড তো। সে নিজের বিস্ময় চেপে আবার জিজ্ঞেস করল,

--"তাহলে বিয়েটা কী ভেবে হলো? তোর বাবা-চাচারাই বা কী করে মেনে নিলেন?"

--"এসবের মধ্যে আমার দাদার হাত আছে, তিনি আমাদের দুই পরিবারের প্রধান নিয়ন্ত্রক। তবে গণ্ডগোলের শুরু ইরতেজা ভাইয়ের থেকেই। সে ছোটোবেলাতেই দাদার কাছে কানাডা চলে গিয়েছিল। যখন ফিরল, দূর্ভাগ্যবশত আমার সাথেই তার প্রথম দেখা হয় শপিংমলে। যেহেতু বহুদিন যাবৎ তাকে দেখিনি, তাই প্রথম দেখায় চিনতে পারিনি। তার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। দাদার হাত থেকে রেহাই পেতে সে আমাকে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে একটা লোকের থেকে লুকিয়ে বেড়াল।"

--"ও মাই গড! লিটারেলি তোর কথাগুলো পুরো সিনেমাটিক কাণ্ড লাগছে।"

আড়াচি হতাশ হয়ে বলল,

--"আমাদের মিয়াজী পরিবারে সিনেমাটিক কাণ্ড হবে না তো কোথায় হবে?"

--"আচ্ছা, সব বাদ। পরের কাহিনী বল।"

--"ইরতেজা ভাই আমার সামনেই বলল যে সে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ডেটে এসেছে, এদিকে কিশোরী আমি হতভম্ভ হই, ইরতেজা ভাইয়ের এসব নাটক আমার একদমই ভালো লাগছিল না। তবুও কিছু না করেও উপায় ছিল না। এরপর কী হলো? ইরতেজা ভাইয়ের সেই না হওয়া গার্লফ্রেন্ডের খোঁজ করতে করতে আমার দ্বারপ্রান্তে চলে আসল, এরপর আর কী— দিল ধরে আমাদের বিয়ে। আমার বয়স ছিল ষোলো আর ইরতেজা ভাইয়ের বয়স ছিল কুড়ি।"

--"যতদূর জানি তোর ইরতেজা ভাইয়ের বড়ো একজন ভাই আছে, কী যেন নাম বলেছিলি.. ও হ্যাঁ তৈমুর। তার সাথে তোর কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? তোর তো তৈমুর ভাইয়ের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক।"

আড়াচির কণ্ঠ জুড়ে আজ যেন হতাশা ঘর বেঁধেছে। সে একই ভাবে গলায় হতাশা মিশিয়ে বলল,

--"যখন আমার বয়স আঠারো বছর, তখন জানতে পেরেছি দাদা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন আমাকে তৈমুর ভাইয়ের বউ করবেন, কিন্তু ইরতেজা ভাইয়ের ওই ঘটনার জন্য ছোটোটার ঘাড়েই আমাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।"

মৌরি কোথাও একটা খুশি হলো। কারণ, সে তৈমুরকে পছন্দ করে, সেই পছন্দের রেশ ধরেই আজ আড়াচির সাথে এত ভালো বন্ধুত্ব। আড়াচি থেমে আবার বলল,

--"আমি তৈমুর ভাইয়াকেও মানতে পারতাম না কখনো। যার প্রেমপত্র আমি বিভিন্ন মেয়েদের হাতে হস্তান্তর করতাম তার সাথে বিয়ের মতো সম্পর্ক কী করে হয় বল তো?"

মৌরির খুশি হওয়া প্রদীপ যেন ধপ করে নিভে গেল। সে কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বলল,

--"এখন তো তৈমুর ভাই সিঙ্গেল থাকতে পারে তাই না?"

--"হ্যাঁ, থাকতে পারে। আগের মতো সময় কই তার, এখন ডাক্তার হয়ে গেছে। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ সে।"

মৌরি মুখ চেপে হাসল, আড়াচিকে মুচকি হেসে বলল,

--"ইরতেজা ভাইয়ের মতো হ্যান্ডসাম ছেলে তোর হাসবেন্ড, এটা ভেবে তো তোর খুশি হওয়া উচিত, তা না করে দুঃখ বিলাস করছিস।"

আড়াচির মুখ থমথমে হয়ে যায়, সে তো জানে এই বিয়ে নামক সম্পর্ক তার ঘাড়ে কতটা বোঝা হয়ে আছে। মানুষ ইরতেজার হ্যান্ডসাম, সুদর্শন রূপটাই দেখে এসেছে আজীবন, ভেতরের গল্প কেউ জানে না। মৌরি এবার ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হতে উদ্যত হলো। আড়াচির থেকে বিদায় নিয়ে বলল,

--"আজ তাহলে আসি আড়াচি, আমাদের এই শেষ বিকালের অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎ ভালো ছিল। পরশু নতুন ভার্সিটিতে আমাদের দেখা হচ্ছে।"

আড়াচি ম্লান হেসে বিদায় দেয়। মৌরিও ততক্ষণে চলে গেল। আড়াচি কাচের জানালা ভেদ করে অদূরে তাকাল। আকাশ কেমন মেঘলাটে হয়ে আছে, এই সময়টাতে সূর্য তার হলুদ রোদ দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে। চারপাশে তখন হলদে রোদের ছায়া পড়ে। কিন্তু আজ যেন ব্যতিক্রম। অস্বাভাবিক অন্ধকার হয়ে আছে আকাশ, যেন তার বিষাদ পালন শেষ হলেই যখন তখন মেঘ ভেঙে অশ্রু ঝড়াবে। আপাতত তাদের সেই প্রস্তুতিই চলছে। আড়াচি এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে ক্যাফেটেরিয়ার ক্যাশিয়ারে গিয়ে বসল, এই সময়টাতে কাস্টমার আসা শুরু করেছে। এই ক্যাফেটেরিয়াটি তাদের নিজস্ব। এটা নতুন ব্রাঞ্চ, এজন্য আড়াচি সুযোগ পেলে চলে আসে এখানে সময় দিতে। সে কাজ করতে গিয়ে জানতে পারল আজ ইরতেজা তাদের এই ক্যাফেতে আসবে গান গাইতে। এ কথা শুনে আড়াচির মুখে বিরক্তি খেলে গেল। সে ইরতেজাকে একদমই সহ্য করতে পারে না, তাই তার মুখোমুখি হবারও প্রশ্নই ওঠে না। আড়াচি কল করল তার বাবা আরিভ মিয়াজীকে। আরিভ সাহেব ব্যস্ততার মধ্যেও মেয়ের কল ধরলেন। কল রিসিভ হতেই আড়াচি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

--"নতুন ব্রাঞ্চে গান গাইতে কেন ইরতেজা ভাইকেই ডাকা লাগবে? শহরে আর কেউ নেই?"

আরিভ সাহেব অবাক হলেন মেয়ের এহেম কথায়। তিনি বললেন, "এসব তো আমার হাতে নেই মা। এগুলা দেখার দায়িত্ব অন্যদের। কেন কী হয়েছে?"

আড়াচি সরাসরি বলতে পারল না ইরতেজাই তার জীবনের মূল সমস্যা। তাই সে কথা চেপে বলল,

--"কিছু হয়নি।"

আরিভ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েকে বোঝাতে গলা যথেষ্ট নরম করে বললেন,

--"এই ব্যাপারে ইরতেজা আর আমাদের বিজনেসের সম্পর্ক। এখানে ইরতেজা নিজের জব করবে আর আমরা তাকে পেমেন্ট দিব, সিম্পল। এটা নিয়ে এতটা রাগ করিয়ো না মা। আচ্ছা শুনো, আমার এখনই একটা ইম্পোর্টেন্ট মিটিং পড়েছে, তোমার সাথে এ বিষয়ে বাড়ি ফিরে কথা বলছি।"

-------------------------

আচমকা ঝড়ের জন্য মৌরি পথে আটকে গেল। রিকশা, গাড়ি কিছুই পায়নি এখন অবধি। তীব্র বাতাসের চোটে ধুলোবালিতে চোখ অন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম। আজ সে চশমা পরেনি, পাওয়ার লেন্স পরে বেরিয়েছে। আজকাল সে চশমা ছেড়ে পাওয়ার লেন্সে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টায় আছে। কিন্তু তারপরেও বিপদ যেন পিছু ছাড়ে না। এই পথটা এমনিতেই একটু নীরব থাকে, ঝড়ের তোপে মানুষজন তো একদমই নেই বললেই চলে। তবে কোত্থেকে যেন ছিনতাইকারী এসে দাঁড়াল মৌরির সামনে। ছিনতাইকারীরা মৌরির দিকে দুটো ছুঁরি ধরে বলল,

--"যা সাথে আছে সব বের কর। নয়তো এটা একদম পেটে চালান করে দিব।"

মৌরি এমনিতেই একটু ভীতু প্রকৃতির, তার উপর তাকে ধরেছে ছিনতাইকারী! একদম মরিমরি অবস্থা তার। গলা দিয়ে একটা অক্ষরও বের হচ্ছে না। এদের প্রস্তুতি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল অনেকক্ষণ যাবৎ তাকে ফলো করেছে। ছিনতাইকারীর দলের আরেকজন মৌরির দিকে লালসার চোখে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বলল,

--"পেটে চালানের আগে এত সুন্দর ফিগার কাজে লাগাইতে হইব বস। এরকম মা/ল সচরাচর দেখা যায় না।"

আতঙ্কে মৌরি হুঁ হুঁ করে কেঁদে দিল, পালানোর সুযোগও পেল না। এবার বুঝি তার সব শেষ। আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে আচমকা এক গাড়ি এসে থামল তাদের কাছ ঘেঁষে। বিরাট গাড়ি, দামীও লাগছে বেশ। গাড়ির ড্রাইভিং সিটের উইন্ডো গ্লাস নেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে এক সুদর্শন মুখের দেখা পাওয়া গেল, যার চোখে সানগ্লাস। ড্রাইভিং সিটে বসেও সানগ্লাস পরা, কী অদ্ভুত। মৌরি কান্নার চোটে খেয়ালই করেনি এই মুখ। যুবকটি বেশ বিরক্ত গলায় বলল,

--"কী হচ্ছে কী এখানে?"

নিহিনের থেকেও যেন বেশি বিরক্ত হয় ছিনতাইকারীরা। এরা নিহিনকে একই ভাবে ছু/%রি দেখিয়ে বলল,

--"এই নবাবের ব্যাটা, এখান থেকে বিদায় হ। তোরে কেউ জিগায় নাই।"

নিহিনের এদের এটিটিউট বিশেষ ভালো লাগল না। সানগ্লাস খুলে সেটা ঠিক করতে করতে বলল,

--"এবার এটা পার্সোনাল হয়ে গেছে। মেয়েটাকে ছাড়, তোরা বিদায় হ।"

--"তোর কথা শুনমু ক্যান আমরা?"

নিহিন এবার বের হলো, হাতে একটা হকিস্টিক। নিহিনের কপালের রগ আগে থেকেই দপদপ করছিল, এখন যেন সেটা বেরিয়ে আসার উপক্রম। নিহিন হেসে বলল,

--"সুন্দর একটা ওয়েদার, এই ওয়েদারে কাকে মা*ব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ফাইনালি তোদের পেলাম!"

ছিনতাইকারীরা নিহিনকে আক্রমণ করবে তো দূর, নিহিন ওদের মনের ঝাল মেটানো অবধি পে%টালো। দুই একজন তো ছাড় পেয়ে কোনো মতে পালাল, বাকিরা নিহিনের পা ধরে বসে রইলো ছাড় পাওয়ার জন্য। নিহিন এতেও গলে না। উলটো পা ঝাড়া দিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

--"পা ছাড় বাস্টা%র্ডস!"

মৌরি কান্না ভুলে সব অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেল। নিহিন তার এই দুঃসময়ে তাকে বাঁচাল, তার উপর তার এমন ভয়ঙ্কর রূপ। মৌরির এই মুহূর্তে ঠিক কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করা উচিত সে জানে না।

এর মাঝে বৃষ্টি নামল ঝপঝপিয়ে। নিহিন বৃষ্টিতে ভেজা মৌরিকে দেখল, মেয়েটাকে দেখতেই তার সমস্ত রাগ ধুঁয়ে মুছে গেল কেন যেন। কখনো মেয়েদের দিকে হাত বাড়িয়ে না দেওয়া নিহিন মৌরিকে বলল,

--"আমার গাড়িতে উঠো, বাড়ি পৌঁছে দিই।"

নিহিন মৌরির এত উপকার করল, তাতে তো তাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। মৌরি তাই সব ভুলে বলল,

--"ধন্যবাদ ভাইয়া।"

মৌরির মুখে "ভাইয়া" ডাক শুনে নিহিনের মুখ তেতো হয়ে গেল। কেন যেন মৌরির মুখে ভাইয়া ডাকটা বিষ লাগছে তার কাছে। নিহিন নিজেকে বহু কষ্টে সামলে বলল,

--"ডোন্ট কল মি ভাইয়া।"

--"তো কী বলব?"

--"ফরগেট ইট, গাড়িতে ওঠো। নিজেকে যদি সামলাতেই না পারো একা বের হও কেন? কলেজে পড়ো?"

মৌরি থমথমে মুখে বলল, "না।"

--"দেখে তো তাই লাগছে, কাঁদুনে বাচ্চা।"

মৌরির একদমই ভালো লাগল না অচেনা কেউ তাকে এভাবে জ্ঞান দিচ্ছে। তবুও সে নিরূপায় হয়ে শেষ উপকারটা গ্রহণ করল। দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজেছে। নিহিনের গাড়ি চলছে মৌরির বাড়ির পথে। নিহিন আচমকাই বলল,

--"নাম কী?"

--"সরি?"

--"কানে শোনো না নাকি?"

অপমানে মৌরির মুখ থমথমে হয়ে যায়। এই ছেলে মিষ্টিভাষী নয়, তার কথাবার্তায় কেমন একটা অহংকারের রেশ থাকে, যা মৌরির মোটেও পছন্দ নয়। এ নিশ্চয়ই কোনো বড়োলোক বাপের বিগড়ানো ছেলে। মৌরি অন্য দিকে ফিরে বলল,

--"মৌরি।"

--"আমি নিহিন, নিহিন পাটোয়ারী।"

মৌরি নিশ্চুপ। তবে নিহিন ভাবল অন্যকিছু। গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে সে কয়েকবার দেখে নেয় মৌরির ভিজে থাকা শুভ্র মুখটা।

-------------------------

ক্যাফেটেরিয়াতে রাত অবধি আড়াচি থাকে। বাইরে বৃষ্টি হলেও ক্যাফেতে কাস্টমারের অভাব নেই। এতক্ষণে ইরতেজার আশার কথা, ইরতেজার জন্যই এই লোক সমাগম। আড়াচি তো ভেবেই নিয়েছে আজ ইরতেজা আসবে না। তবে তাকে চমকে দিয়ে ইরতেজাসহ তার বন্ধুরাও আসল। ইরতেজার এই গ্যাং পুরো চোখে লাগার মতো। বেশ ভাব নিয়ে এরা একেকজন ক্যাফেতে এসেছে। এরা কেউ কারো চাইতে কম নয়। সবাই সুদর্শন, সম্পদ-টাকার দিক থেকেও এরা সবাই উঁচুতে। আড়াচি ওদের নাম-পরিচয় ওত একটা জানে না। এদের প্রতি তার কখনো ইন্টারেস্টও জাগেনি। ইরতেজা আড়াচিতে লক্ষ্য করেনি, করার কথাও না। তবে ইরতেজা আড়াচির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার এক বন্ধু বলল,

--"কিরে ইরতেজা, শ্বশুরের ক্যাফেতে গান করতে এসেছিস, পেমেন্ট নিবি না নাকি?"

ইরতেজাও একই ঠাট্টার সুরে বলল,

--"আমি এতটাও শ্বশুর দরদী নই সোবহান! ইরতেজা নিজের পাওনা বুঝে নিতে জানে। হোক সে শ্বশুর কিংবা নিজের বাপ।"

আড়াচি স্পষ্টতই সব শুনে মুখ থমথমে করে ফেলল। সে আর এক মুহূর্তও থাকল না সেখানে, দ্রুত বেরিয়ে যায়। এই লোকের মুখের সামনে থাকার ধৈর্য কিংবা রুচি, কোনোটাই তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই।

ইরতেজা বন্ধুদের মাঝে নিহিনকে খুঁজল। নিহিন আসল কিছুটা ভেজা অবস্থায়। তা দেখে কাশিফ বলল,

--"গাড়ির ছাদ কী ফুটো ছিল? ভিজলি কেমনে?"

নিহিন বাঁকা হেসে বলল,

--"মাঝেমধ্যে সিনেমার নায়ক হতে হলে বৃষ্টিতে টুকটাক শুট থাকেই।"

ইরতেজা এ কথা শুনে হেসে উঠে বলল,

--"আমরা কেউই হিরো নই নিহিন, আমরা একেকজন লোকের চোখে ভিলেইন। ভুলে যাস?"

সোবহান বলল,

--"আমরা ভিলেইন বলেই আমাদের সবাই পছন্দ করে। কারণ কী রে?"

পুরো গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে ভদ্র কিংবা মিচকে টাইপ কাশিফ চোখের চশমা ঠিক করে বলল,

--"কারণ দুনিয়া বদলিয়েছে। মানুষ এখন দূর্নীতিতেই মত্ত।"

নিহিন বলে উঠল, "হ্যাঁ যেমন তোর মন্ত্রী বাপ।"

-----------------

আজ আড়াচির ভার্সিটি জীবনের প্রথম দিন। অনাকাঙ্খিত ভাবে আড়াচি যেই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে সেই ভার্সিটিতেই ইরতেজাসহ তার বন্ধুরা পড়াশোনা করছে। আড়াচির এখানে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু দাদাই তাকে এখানে ভর্তি করিয়ে দিলেন। এটা যে তাকে এবং ইরতেজাকে কাছাকাছি রাখার ফন্দি এটা সে ভালোই বুঝতে পারছে। তবে সেও পণ করেছে, ইরতেজা একটু এদিক ওদিক করলে সেও দেখে নিবে। ইরতেজা তার উপর স্বামীগিরি দেখাতে আসলে বুঝি সেও চুপচাপ মেনে নিবে? এতই সোজা সব? কক্ষনো না। আড়াচি লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গেট দিয়ে প্রবেশ করল।

এটা শহরের এক নামীদামি প্রাইভেট ভার্সিটি। এখানে বেশিরভাগ বড়োলোকের ছেলে-মেয়েরাই পড়াশোনা করে। যারা মধ্যবিত্ত আছে, তাদের এখানে বোধ হয় খুব হেলায় দেখা হয়। পড়াশোনার নমুনা আড়াচি আশেপাশে বেশ ভালোই দেখল। মেয়েরা যেন মডেলিং করতে এসেছে এখানে, বিরক্ত লাগল আড়াচির। সে তার বন্ধুদের অপেক্ষায়, ওরা কেউ আসেনি এখনো। অধরা, সায়েবা, মৌরি। সায়েবা, অধরা আড়াচির স্কুল ফ্রেন্ড। তবে মৌরির সাথে পরিচয় বহির্গত। কলেজ জীবনে কেন যেন তার বন্ধুই হয়নি। আড়াচি স্বার্থপর, নাকউঁচু মানুষদের এড়িয়ে চলে সবসময়। তাই জীবনে এই তিনজনই তার বন্ধু হয়ে থেকেছে। আড়াচির অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সায়েবা এলো।

সায়েবার থেকে জানতে পারে আজ নাকি অধরা আসবে না। কেন কে জানে? সায়েবা আসার কিছুক্ষণ পর মৌরিও এলো। মৌরি সর্দিতে কাবু, নাক-মুখ লাল হয়ে আছে তার। আড়াচি সে অবস্থাতেই মৌরিকে সায়েবার সাথে পরিচিত করিয়ে দিল। মৌরি ভাঙা গলায় বলল,

--"তোদের না আরেকজন ফ্রেন্ড আছে?"

সায়েবা জানাল, "ওর জরুরি কাজ পড়ে গেছে, আজ আসবে না।"

আচমকা দূর থেকে হুড়োহুড়ি শোনা গেল। সেই শব্দ অনুধাবন করে তিন বান্ধবীও গেল শব্দের উৎস খুঁজতে। যতই হোক তাদের প্রথম দিন ভার্সিটিতে, কতই না অপেক্ষা করেছে কলেজ জীবন পার করে ভার্সিটিতে উঠবে। অবশেষে কাঙ্খিত দিন এলো। তাই ভরপুর কৌতুহল থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। ওরা ভেতর থেকে বেরিয়ে বাইরে আসতেই দেখল চারটে গাড়ি পরপর পার্ক করা। গাড়ি থেকে নেমে পাঁচজন যাচ্ছে তাদের নির্দিষ্ট করা জারুল ফুলের গাছের নিচে। ওটা সম্ভবত ওদের আড্ডাখানা। সাধারণ মানুষজন যেমন আচমকা সেলেব্রিটি কাউকে দেখলে অতি উৎসাহী হয়ে পড়ে, গুঞ্জনটা ঠিক সেরকমই। সেই দল চিনতে পেরে আড়াচির মুখ কুঁচকে গেল, সে বান্ধবীদের টানল,

--"চল এখান থেকে।"

সায়েবা তার কথা গুরুত্ব না দিয়ে বলল,

--"আহ, দেখতে দে। মেলোড্রামা ভালোই চলছে।"

ছেলে-মেয়েরা ওদের একপ্রকার ঘিরে থাকলেও কেউ কাছ ঘেঁষার চেষ্টা করেনি। যে কয়েকজন ছেলেরা তাও গেল, তবে ওরা জুনিয়র— আড়াচিদের ব্যাচমেট। ওরা সরল মনে নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে উলটো র‍্যাগিং এর স্বীকার হলো। এতে করে মেয়েদের মধ্যকার গুঞ্জন কিছুটা নেতিয়ে গেল। মৌরি অবাক হয়ে দেখছে সবকিছু, ওইযে সেদিনের নিহিন পাটোয়ারীকেও দেখা যাচ্ছে। এর মানে ইরতেজার বন্ধুদের একজন ছিল সে?

আড়াচি তাচ্ছিল্য করে বলল,

--"এদের মতো অসভ্যদের থেকে আর কীই বা আশা করা যায়? বাপের টাকায় ফুটানি করবে আর আরেকজনকে হেয় করবে।"

সায়েবাও সহমত জানাল, তবে দেখল— চশমা পরা একজন নীরব। এসব র‍্যাগিং এর মধ্যে সে নেই, সায়েবার ভালো লাগল ছেলেটাকে। কাছে থেকে দেখলে হয়তো আরও ভালো করে দেখতে পারত?

হুড়োহুড়ি, দাপাদাপির মাঝে আচমকাই আরেকটা গাড়ি এসে থামল মাঠের মাঝখানে। ড্রাইভিং সিট থেকে নামল একজন দারুণ সুন্দরী মেয়ে। টপস, প্যান্টের সাথে পিঠসম চুল গুলো খোলা তার। ফরসা গায়ে নীল টপসটা দারুণ মানিয়ে গেছে যেন। মুখে সাজ-সজ্জা নেই তবে এই সুন্দরীর মুখজুড়ে ক্রোধের রেশ। সে কাউকে পরোয়া না করে লম্বা লম্বা পা ফেলে ইরতেজার গ্যাং এর দিকে এগিয়ে যায়। সবাই চেয়ে চেয়ে দেখছে এই সুন্দরী মেয়ের কর্মকাণ্ড। সায়েবা তো অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, "আরে, ও তো আমাদের অধরা।"

সোবহান জুনিয়র ছেলে দুজনকে র‍্যাগ দিচ্ছিল হেসে হেসে। অধরা সবাইকে ছেড়ে সোবহানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সোবহান হঠাৎ অধরাকে দেখে চমকে উঠে। অধরা চোখে রাগ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,

--"হাই, নাইস টু মিট ইউ।"

বলেই আর সময় নিল না। নিজের গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সোবহানের গালে এক চড় বসিয়ে দিল সে। আকস্মিক ঘটনায় পুরো ক্যাম্পাস থমথমে, নীরব হয়ে গেল। সকলের চোখ-মুখের বিস্ময় পাহাড় চূড়া ছুঁইছুঁই। সবার মতো আড়াচিরাও ভাবেনি, অধরা প্রথম দিনে এভাবে ভার্সিটিতে এসে, এই ধরণের একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে।

©লাবিবা ওয়াহিদ

চলবে—

#প্রণয়ে_খলনায়ক

|সূচনা পর্ব|

লাবিবা ওয়াহিদ

[যাদের কাছে এই পোস্ট পৌঁছাবে তারা সাড়া দিবেন, এতে করে অন্যদের ফিডেও গল্পটি পৌঁছাবে।]

বিঃদ্রঃ অবশেষে চলে আসলাম নতুন গল্প নিয়ে। শুরু হয়ে গেল আমার মোস্ট চ্যালেঞ্জিং একটা লেখা। যেহেতু প্রথম পর্ব, আমি সব চরিত্রকে একসাথে আনতে পারিনি। এমনকি সাজাতেও পারিনি কোনো চরিত্রকে। ইনশাআল্লাহ আগামী পর্বে আরও চরিত্র পাবেন, সাথে ইরতেজার গ্যাং-এরও পরিচয় পাবেন।

এই গল্পটি ভার্সিটি রিলেটেড, প্রতিশোধপরায়ণ এবং বেশ রোমান্টিক ধরণার হতে চলেছে। ধীরে ধীরে সব পাবেন আশা রাখছি। এই গল্পটি কেমন লেগেছে আপনাদের অবশ্যই অবশ্যই জানাবেন, এই সম্পূর্ণ গল্পটি নির্ভর করছে আপনাদের রেসপন্সের উপর। তাই বেশি বেশি রেসপন্স করুন, নয়তো আমি ঝিমিয়ে পড়ব।

পরের পর্ব আসবে "শুক্রবার"।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন