#প্রণয়ে_খলনায়ক - [২১]
লাবিবা ওয়াহিদ
[কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
লুইস শাড়িটা আনতেই মৌরি আর সায়েবার সাহায্যে মোহ তৈরি হচ্ছে অন্য এক ক্লাসরুমে। মৌরি মোহর শাড়ির কুচি ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
--"ইরতেজা ভাই আসলেই অদ্ভুত কিসিমের মানুষ। এভাবে কেউ জোর করে?"
সায়েবা এমনিতেই চেতে ছিল। মৌরির কথা শুনে সে নাক কুঁচকে মুখ খুলল,
--"ঠিক হয়েছে, ওকে কে বলেছিল পাকামো করতে? ওকে আমরা বলিনি শাড়ি পরতে? এখন ডাবল খাটনিটা ওর পাওনা।"
মোহ রেগে গিয়ে বলল,
--"তুই আমার বান্ধবী হয়ে ইরতেজা ভাইয়ের সাইড নিচ্ছিস?"
--"সো হোয়াট? তুই কী এক্সপেক্ট করছিস? তুই কুমির ভরা খালে ঝাপ দিবি আর আমি বলব, ওয়াও মোহ ওয়েল ডান? স্টুপিড!"
মৌরি বুঝল সায়েবা কোনো কারণবশত রেগে আছে। নিশ্চয়ই কাশিফের কারণে। কাশিফ কী আর কম পিছে পড়ে সায়েবার? কাশিফের কথা ভাবতেই মৌরির নিহিনের কথা ভেবে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। তবে সে প্রকাশ করল না। আজ কেন যেন নিহিনের ভিন্ন রূপ দেখেছে। আগের চাইতেও জ্বালাচ্ছে বেশি। কে জানে কেন?
মোহ যতক্ষণে তৈরি হলো তার মনে পড়ল অধরার কথা। অধরাকে তারা প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মতো দেখছে না। ব্যাপারটা মাথায় আসতেই যেই সকলে মিলে তাকে খুঁজতে বের হবে তখনই অধরা এসে হাজির হলো। তার চোখ-মুখের রং ভিন্ন হবার পাশাপাশি শাড়িটাও ভিন্ন। খুব সুন্দর জর্জেট বাদামি রঙের শাড়ি। মোহ হতভম্ভ হয়ে বলল,
--"অধরা, আর ইউ ওকে? তোর শাড়ি চেঞ্জ কেন?"
অধরা অন্যদিকে ফিরে অস্বাভাবিক শক্ত গলায় বলল,
--"আগেরটা শাড়ি ছিঁড়ে গেছে।"
সায়েবা সেভাবে ধ্যান দিল না অধরাকে। সে জানে অধরার মন-মর্জির ঠিক নেই। আর যেহেতু অধরা মুখ খুলে কিছু বলছে না তাকে হাজার জিজ্ঞেস করলেও বলবে না। তাই মোহর পারফরম্যান্সের সময় হয়ে যাওয়ায় সকলেই বেরিয়ে পড়ল। মোহ ওদের থামিয়ে বলল,
--"তোরা যা, আমি আমার গিটার নিয়ে আসছি।"
কথাটা মোহ রেগেই বলল। বাকিরা বুঝতে পেরে চলে গেল। মোহ গেল ক্যাম্পাসের অন্যদিকে। যেখানে অলরেডি ইরতেজা বসে মোহর নতুন গিটারে টুংটাং শব্দ তুলছে। মোহ ইরতেজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভীষণ ব্যস্ত গলায় বলল,
--"আপনার শর্ত পূরণ করেছি, এবার আমার গিটার দিন।"
ইরতেজা চোখ তুলে তাকাল। শাড়িতে মোহকে প্রথম দেখল সে, তবুও তার মুখাবয়বের কোনো পরিবর্তন হলো না। সে তার দাম্ভিক ভাব ধরে রেখেই উঠে দাঁড়াল। কোনোরূপ ভণিতা ছাড়াই ইরতেজা তার গিটার ফিরিয়ে দিল। মোহ হাতে নিজের গিটার নিতেই ইরতেজা ভরাট গলায় আওড়াল,
--"গুড গার্ল।"
মোহ একপলক মাথা উঠে লম্বাটে মানুষটার চোখে চোখ রাখল, সেই চোখ নদীর মতো শীতল। যার চোখ আপাতত মোহর ঘাসে লুটিপুটি খাওয়া আঁচলে নিবদ্ধ। ইরতেজার কী হলো কে জানে, সে নিজে আঁচলটা তুলে মোহর হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল।
মোহ শাড়ি পরেই স্টেজে উঠল। চারপাশে করতালি হলো। বুরহান সাহেব তার নাতনিকে দেখে খুশিই হলেন। তিনি অদূরে দাঁড়ানো ইরতেজার দিকে তাকালেন। ইরতেজা মোহর দিকেই তাকিয়ে। মোহ ধীরে ধীরে গিটারে সুর তুললো। সময় নিয়ে গাইল,
"সুখেরই চাদরে রোদেরই আদর
পাঠিয়েছি তোর নামে
হো..
চাঁদেরই আলোকে রূপোলি পালক
রাখা আছে নীল খামে।
তোর উত্তরেরই আশায়
প্রশ্নেরা চিহ্ন ভুলে যায়
আবেগের ব্যস্ত পারাপার
আর কোনো রাস্তা নেই আমার
বল না তোর দোহাই, প্রেম ভাসাই কোন জলে..
Oh my love~ আদুরে আলাপ
ছুঁয়ে তোর আঁচলে এলাম বলে।
Be my love~ একটা গোলাপ
চুপিসারে রেখে দিলাম, তোর কোলে।"
মুহূর্তেই দারুণ হৈ-হুল্লোড়, করতালিতে চারপাশ মুখোরিত হলো। মোহর নার্ভাসনেস মুহূর্তেই কেটে যায় এত মানুষের চিয়ারআপ শুনে। বুরহান সাহেবও হাসি-মুখে তালি দিচ্ছেন। মোহর হঠাৎ চোখ পড়ল ইরতেজার দিকে। সে তালিও দেয়নি, তার কোনো ভাবান্তরও প্রকাশ পায়নি মুখে। মোহ মুখ বাঁকিয়ে স্টেজ থেকে নেমে গেল। মোহের গান শুনে এলিমেন্ট ফাইভ হতভম্ভ। নিহিন অবাক সুরে ইরতেজাকে জিজ্ঞেস করল,
--"কিরে, তোর কাজিনের দেখি এত সুন্দর গলা। সুরও একদম ঠিকঠাক।"
কাশিফ বলল,
--"ইরতেজার রক্ত বলে কথা, হবেই ত।"
নিহিন বলল,
--"এতটা ইম্প্রেসিভ আশা করিনি। কিরে ইরতেজা, আগে ত বলিসনি।"
ইরতেজা ঠান্ডা গলায় বলল,
--"আই ডোন্ট নো।"
সোবহান কপাল কুঁচকে বলল,
--"তোর কাজিন তুই জানিস না?"
আরও দুজন গান শেষ করতেই অবশেষে এলো সবচেয়ে কাঙ্খিত মুহূর্ত। স্টেজে এখন এলিমেন্ট ফাইভ উঠতে চলেছে। সোবহান স্টেজে ওঠার আগে অধরাকে টেক্সট করল,
--"অধরা, ঠিক আছ? কিছু লাগবে না ত?"
অধরা শুধু সিন করল। পরমুহূর্তেই সে বিষ চোখে দূরে বসা নাতাশাকে দেখে নিল। নাতাশা ব্যস্ত তার গ্রুপের সাথে। সে তখনো অধরাকে খেয়াল করেনি। অধরা ওর দিকে চোখ লাল করে দেখার সময়ে ডেইরি মিল্কে কামড় বসালো। এমন ভাবে চিবুচ্ছে যেন সেটা নাতাশা।
অবশেষে এলিমেন্ট ফাইভ স্টেজে উঠল। ইরতেজা, স্বচ্ছ গানে রেগুলার হলেও অন্যরা খুব একটা না। তবুও নবীনবরণে তারা সবাই মিলেমিশেই গায়। ওরা একসাথে উঠতেই চারিপাশে চেঁচামেচি, উত্তেজনার ঢল নামল। ওরা ওদের আসন বুঝে বসল। অতঃপর মিউজিক শুরু হলো, হট্টগোলের মাঝে। খুদগার্জ ব্যান্ডের কয়েকটা বলিউড গান মেলানো মিক্স শুরু করল,
"তুম কিউ চালে আতে হো,
হার রোজ ইন খাওয়াবো মেইন
চুপকে সে আ-আ ভি যাও
এক দিন মেরে বাহু মেইন।
তু মেরে খাওয়াবো মে, জাওয়াবো মে,
সাওয়ালো মেইন
হার দিন চুরা তুমহে মেইন
লাটা হুন খায়ালো মেইন
ক্যায়া মুঝে পেয়ার হেইন য়া~
ক্যায়সা খুমার হ্যায় য়া~
পরমুহূর্তেই ইরতেজা অন্য গানে চলে গেল। বাকিরা চুপ এবার।
"লাবোন কো, লাবোন পে.. সাজাও
ক্যায়া হো তুম, মুঝে আব বাতাও (2x)
তোর দো খুদকো তুম
বাহোমেইন মেরি, বাহোমেইন মেরি
বাহোমেইন মেরি (5x)
তেরি এহসাসোন মে ভিগি লামহাতো মেইন
মুঝকো ডুবাতি তিশ্নাগি হেইন
তেরি আদাও সে দিলকাশ খাতাও সে
ইন লামহো মেইন জিন্দেগি সি হেইন
হায়া কো জারা ভুল যাও
মেরে হি তারাহ পেশ আও
খো ভি দো, খুদ কো তুম..
রাতোন মেইন মেরি (4x)
গান শেষ হতেই সবাই এমন ভাবে হট্টগোল করল যেন তারা আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। ইরতেজার গান সেভাবে শুনতে পাওয়া যায় না, বিশেষ দিনগুলো বাদে।
সবার মতো মোহও শুনেছে ইরতেজার গান। ইরতেজার গলায় রোমান্টিক গান, অদ্ভুত। তার চাইতেও অদ্ভুত ব্যাপার, ইরতেজা তার পছন্দের গানটা গেয়েছে। মুগ্ধ হয়ে না শুনলে উপায় আছে? মৌরি ত ইরতেজার গান শুনে মোহকে খোঁচা দিল,
--"মেয়েগুলো খামাখা লাফাচ্ছে, এখানে তুই যে ইরতেজা ভাইয়ের বউ ওরা জানেই না। বউয়ের অধিকারে তুই এক বেলা কী, দশবেলা ইরতেজা ভাইয়ের গান শুনতে পারবি।"
এ কথা শুনে সায়েবা হেসে দিল। ওরা যখন নিজেরা ব্যস্ত, অধরার হাতে তখন ফোন। অধরার ফোনে একটা ছবি এসেছে। সেই ছবিতে নাতাশা ভীড়ের মধ্যে একটা ছেলেকে কিস করছে। এই ছবি অধরা চুপ করে সেভ করে নিল এবং বান্ধবীদের দিকে মনোযোগ দিল।
স্বচ্ছও একটা গান গেয়ে তবেই স্টেজ থেকে নামল। এরপর খুঁজে খুঁজে আহিনকে বের করল। স্বচ্ছ আহিনের মুখোমুখি হতেই সে চমকে গেল। থতমত খেয়ে বলল,
--"তুমি এখানে।"
--"আমার গান শুনেননি?"
আহিন সময় নিয়ে বলল,
--"শুনেছি।"
--"গানটা আপনাকে ডেডিকেট করা ছিল আহিন। এক রূপবতী শাড়িতে মুড়ানো স্বচ্ছ নারীর জন্য, যাকে আমি স্বচ্ছ ভালোবাসি কোমল মনে।"
ঠিক রাত দুটো নাগাদ, ক্যাম্পাসের সবার ফোনে ফোনে নাতাশার ছবিটি ছড়িয়ে গেল। আর নাতাশা তা টেরও পেল না।
চলবে—
[রিচেক একটু পর দিচ্ছি, আরেক পর্ব লিখতে শুরু করে দিই। তবে সুন্দর সুন্দর মন্তব্য চাই।]