#প্রণয়ে_খলনায়ক - [২য় খণ্ড]
#প্রণয়_সন্ধির_দিনে
লাবিবা ওয়াহিদ
৩১.
"ঝাটকা জারা-সা মেহসুস হুয়া এক
লাইফ কি গাড়ি নে কাসকে মারা ব্রেক
হো রাহা হ্যে কিউ, কানফিউজ মেরে দিল
মাশওয়ারা মেরা, তু আজমাকে দেখ
ইয়েহি উমার হ্যে গাল্লে, গালতি সে মিস্টেক
ইয়েহি উমার হ্যে গাল্লে, গালতি সে মিস্টেক বেটা..
চাল মাসাল ফুলানা
থরি বডি বানানা
তেরে চিকনে গালো প্যে
স্টাবল কি ফাসাল বানানা
আরে রে রে এ আবে এ"
রাত গভীর। ঘড়ির কাঁটায় রাত একটা ছুঁইছুঁই। এক চলন্ত মাইক্রোবাসে এই গানটি বেজে চলেছে। সেই গাড়িতে দুই গ্যাং। ফাইভ এলিমেন্টের পাশাপাশি মেয়েরাও। গানের তালে খুব গলা বাজিয়ে গাইছে সোবহান, কাশিফ এবং নিহিন। ইরতেজা ড্রাইভারের পাশের সিটে থম মে(১)রে বসা। তার মাঝে এত উত্তেজনা নেই ওদের মতো। কিন্তু বিপাকে পড়েছে স্বচ্ছ। সে বন্ধুদের পাশেই বসা। দুশ্চিন্তার পাশাপাশি চরম বিরক্ত। অথচ এদের উৎসব দেখে মনে হচ্ছে এরা বিয়ে খেতে যাচ্ছে। স্বচ্ছ এবার বিরক্তির চরম পর্যায়ে গিয়ে ড্রাইভারের সাথে চেঁচাল,
--"গান বন্ধ করেন।"
ড্রাইভারকে আগে থেকেই স্বচ্ছের কোনো কথা না শোনার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু বুরহান সাহেবের লোক, আদেশ-নির্দেশ চুপ করে পালন করা তার ধর্ম। কথার কোনো নড়চড় করবে না। সে হিসেবে স্বচ্ছের চেঁচামেঁচি ড্রাইভার শুনল কিনা বোঝা গেল না। স্বচ্ছ বলল,
--"আমার বিয়ে খেতে যাচ্ছিস না তোরা। থাম!"
দেখা গেল ইরতেজা ভলিউম কিছুটা কমিয়ে দেয়। গলায় গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,
--"চিল করাটা হেলদি, স্বচ্ছ।"
সোবহান ইরতেজাকে সাবাশি দিয়ে বলল,
--"আরেহ! আমাদের রোবট হেলদি বলেছে মানে হেলদিই।"
নিহিন বলল,
--"ওর মুখ থেকে 'হেলদি' বেরুলো কীভাবে সেটা চিন্তার বিষয়।"
কাশিফ নিজে হাত বাড়িয়ে ভলিউম আবার বাড়িয়ে দিয়ে অন্য গান ধরল,
--"সোয়াগ স্যে কারেঙ্গে সাবকা সোয়াগাত।"
হঠাৎ কাশিফের ফোন ছেড়ে ব্লুটুথ কানেকশন হলো সায়েবার ফোনে। মেয়েরা পেছনে বসা। সে গান ছাড়ল,
--"দিল কা জো হাল হ্যে ও তুঝে ক্যেসে বায়া কারে?"
কাশিফ রেগে পিছে ফিরে তাকাল।
--"এসব কি মেয়ে মানুষী গান! এগুলা কে শোনে?"
সায়েবা তখন মুখ বাঁকিয়ে গানের তালে তালে গাইল,
--"দিল জো তুমহারা হ্যে,
ক্যেসা বেচারা হ্যে..
মানে না বেশারাম
বিলকুল খাট্টারা হ্যেই।"
নিহিন হাসতে হাসতে পেছনে মৌরির দিকে ফিরে পরের লাইন ধরল,
--"তু কারে, দিল বেকারার।"
মৌরি মুখ ফিরিয়ে মিনমিন করে গাইল,
--"কিউ কারু, ম্যে তুঝছে পেয়ার?"
স্বচ্ছ সকলের জ্বালায় অতীষ্ঠ হয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
--"বিয়ে আমার না ভাইরা, আমার প্রেমিকার হতে যাচ্ছে! তোরা কতটা জালিম হলে আমার এই দুশ্চিন্তায় গান নিয়ে ঝগড়া করছিস। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম একেকটার নামে।"
স্বচ্ছের কথায় এবারও কেউ কান দিল না। সবাই যে যার মতো মস্তিতে ব্যস্ত। যেন তারা আহিনের বিয়ে ভাঙতে নয়, ট্যুরে যাচ্ছে। অবশ্য, এখানে সবার মনে সুখ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এরা প্রত্যেকেই প্রথমবারের মতো পছন্দের নারীদের নিয়ে ঢাকার বাইরে যাচ্ছে, আনন্দ তো হবেই। আর রইলো স্বচ্ছের ব্যাপার। সেটা তাদের জন্য খুব একটা ইস্যু না। তবে ইরতেজার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো, সে স্বচ্ছের পাশে দাঁড়াল। ইরতেজা ফট করে গান বন্ধ করে দিয়ে বলল,
--"দশ মিনিট ব্রেক হোক, হেডেক হচ্ছে।"
নিহিন হলো গিয়ে তার চেয়েও বড়ো ইতর। সে স্বচ্ছকে দেখিয়ে দশ মিনিটের টাইমার দিল। অর্থাৎ দশ মিনিট হতে না হতেই তারা আবারও গান বাজানো শুরু হবে। এতে স্বচ্ছকে আরও অসহায় দেখাল।
পেছন থেকে মোহ বলল,
--"কারো দুঃখে এভাবে হাসতে নেই।"
এ কথা শুনে সোবহান পেছন ফিরে তাকাল। হতাশার ভান ধরে বলল,
--"কেন বোন, ইরতেজা অনেক কষ্টে রেখেছে বুঝি? অবশ্য, ইরতেজার থেকে এসবই আশা করা যায়। যা রোবট!"
সোবহানের কথায় অধরা চোখ রাঙাল তাকে। অধরার চোখে চোখ পড়লেই সোবহান দমে গেল। একে বলে 'খাটি বউয়ের ভয়'। অধরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
--"নিজে বুঝি সংসারে অনেক সুখী আছ? সুখী থাকলে বলো, দুঃখের ব্যবস্থা করছি।"
স্বচ্ছ তখন পিছে মেয়েদের দিকে চেয়ে বলল,
--"তোমরাই আমার আপন বোন। আর এরা সব আমার আজন্মের শত্রু।"
মোহ লুকিং গ্লাসে তাকাল, ইরতেজার চোখ জোড়া দেখা যাচ্ছে। যদিও ইরতেজা বাইরে তাকানো। একবার না জানি দু'বার তাদের চোখাচোখি হয়েছিল। মোহ মুখ ফিরিয়ে নেয়। সেদিন বুরহান সাহেব তাকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যেতে চাইলেও মোহ স্পষ্ট না করে দিয়েছে। সে ভেবছিল ইরতেজা কিছু বলবে, কিন্তু তার আগেই হঠাৎ স্বচ্ছের এই দুঃসংবাদ। সায়েবা আর মৌরিও দুই বন্ধুর থেকে দূরে দূরে থাকছে। দুজনেই মহা বিরক্ত কাশিফ এবং নিহিনের প্রতি। যদিও কাশিফের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে এখনো জানে না তার সায়েবার সাথে বিয়ের কথা। কাশিফের মা-ই সায়েবাকে বলেছে কাশিফকে এখনো জানায়নি। সুযোগ বুঝে জানাবে। কিন্তু সায়েবার তো ইচ্ছে করছে কাশিফের গলা টিপে দিতে। তার এখনো ক্যারিয়ার গড়া হয়নি সেখানে বিয়ে নিয়ে বাড়ি জুড়ে হুলুস্থুল লেগেছে। দিন রাত কপাল চাপড়ায় সে কেন কাশিফের মায়ের চেনাজানা হতে গেল?
মৌরির দিকে তো নিহিন ভুলেও তাকাচ্ছে না। যেন মৌরির দিকে তাকালেই সে খপ করে ধরবে বিয়ে ভাঙার জন্য। মৌরি ত্যাড়া হলেও, নিহিন তার চেয়েও বড়ো ত্যাড়া। বন্ধুদের মধ্যে নিহিনেরই ঘাড়ের রগ সবচেয়ে ত্যাড়া। তার সাথে সে চরম অধৈর্যও। যেখানে সিদ্ধান্তের ১৯/২০ হলেই সে ঘটাঘট গায়ে হাত তুলে বসে, সেখানে যে কেমন করে মৌরির বিষয়ে সে এত ধৈর্য দেখাচ্ছে এটাই ভেবে পাচ্ছে না। প্রিয় মানুষদের জন্য বুঝি পুরুষরাই এভাবেই ধৈর্যশীল হয়ে যায়? কিন্তু যত যাই হোক, মৌরিকে পেতে সে কোনোপ্রকার কম্প্রোমাইজ করবে না।
তাদের এই ট্যুরে তৈমুর এবং তার বিবাহিতা স্ত্রী ছোঁয়াও যাচ্ছে। তবে তারা তৈমুরের গাড়িতে করে আসছে। তৈমুরের মন তার বেজায় খারাপ। ছোঁয়াও তার পাশে বেশ গাল ফুলিয়ে বসা। কিছুক্ষণ আগেই তাদের ঝগড়া হয়েছে। তৈমুর আজীবনের প্লেবয় ছিল। কত মেয়ের সাথে প্রেম করেছে তা সে নিজেও কখনো হিসাব করে দেখেনি। সেই কতশত মেয়ের মাঝে একজন ছিল ছোঁয়া নিজেও। অর্থাৎ দূর্ভাগ্যবশত তার এক্সের সাথে বিয়ে হয়েছে। ছোঁয়া সবসময়ই অসম্ভব মেধাবী, বড়োলোক ঘরের মেয়ে। সে নিজেই তৈমুরের জীবন জাহান্নাম করতে বিয়ের সমস্ত পরিকল্পনা করেছে। যেদিন তৈমুরের সাথে তার ব্রেকাপ হয়েছিল, সেদিনই সে নিয়ত করেছিল, তৈমুরকে সে বিয়ে করবেই। তার এই নিয়্যতে অবশ্য সহযোগিতা করেছে তৈমুরের নিজের আপন দাদা, বুরহান মিয়াজী। এই বৃদ্ধ যে কি চান সেটা কেউ বুঝে না। এই মনে হয় বৃদ্ধ চরম শত্রু, আবার মাঝেমধ্যে অনুভব হয় তার চাইতে আপন কেউ নয়। তবে এটুকু বোঝা যায়, সবার জীবনের আপস এন্ড ডাউন বুরহান সাহেব বেশ আনন্দের সাথে উপভোগ করে। যেখানে তিনি নিজ স্ত্রীকেই ছাড় দেননি, সেখানে কিসব নাতি-পুতি?
তৈমুর যখন প্রথম ছোঁয়াকে দেখেছিল তখন তার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছিল। এই ছোঁয়ার থেকে পিছু ছাড়াতে কি করেনি সে। সেখানে তার সাথেই বিয়ে? তৈমুর চেয়েছিল বিয়ে ভেঙে দিবে। কিন্তু ছোঁয়াও কম যায় না। তৈমুরের কুকীর্তির অসংখ্য প্রমাণ তো রেখেছেই, সাথে হুমকি ছিল তৈমুর মুখ খুললেই সে মানহানির মামলা দিয়ে দিবে। এখন মামলা কার্যকর হোক বা না হোক, মিয়াজী বংশের ছেলে মামলা খেয়েছে এটাই চরম অসম্মানের। শাফক্বাত সাহেব অর্থাৎ তার নিজের বাবা তাকে বাড়ি ছাড়া তো করতই, দাদা একদম মিয়াজী বংশ থেকে তাকে ত্যাজ্য করে দিত। সে যে ঘাড়ের ওপর দুজন মুসিবত নিয়ে এত অকাজ-কুকাজ করে ছাড় পেয়েছে— এই অনেক। সে এটাও জানে বুরহান সাহেব আগে থেকেই তার সবকিছুর খবর রেখেছে। নয়তো ছোঁয়ার মতো মেয়েকে তিনি কোথায় পাবেন তৈমুরকে শায়েস্তা করতে? তৈমুরের এখনো স্পষ্ট মনে আছে, বুরহান সাহেব বিয়ের দিন বলেছিল,
--"আমি ছাড় দিলেও ছেড়ে দেই না। নাতি-পুতিদের বড়ো তুক। সেখানে এসব করে বেরিয়েছিস। এখন সারা জীবন এমন মরিচ মেয়েকে ঘাড়ে তুলে বেড়াতে থাক। তোর মতো লম্পটের কপালে আমার বউয়ের মতো নিরীহ মেয়ে জুটবে, সে কথা ভুলে যা। তুই লাত্থি-উষ্টা খাওয়া মানুষ।"
তৈমুরের ভাবনার মাঝেই ছোঁয়া তাড়া দিল,
--"গাড়ি থামাতে বলো।"
তৈমুর বিরক্ত হলো।
--"মাঝরাস্তায় থামাতে পারব না।"
--"বলেছি থামাতে।"
--"এই অচেনা জায়গায় কে থামে রে ভাই? বিপদ আসলে কি হবে?"
--"তুমি আমাকে বিপদ শেখাতে আসবে না। আমি জানি ড্রাইভার তোমার দাদারই লোক। পি(১)স্তলটাও দেখা যাচ্ছে। তুমি গাড়ি থামাতে বলবা নাকি আমি পি(১)স্তলটা নিয়ে তোমার মাথা ফুটো করব?"
তৈমুর রাগ দেখিয়ে বলল,
--"তোমার এত জলদি বিধবা হওয়ার শখ হয়েছে?"
--"তোমাকে বিয়ে করাই তো সবচেয়ে বড়ো লোকসান। বিধবা হওয়া, না হওয়াতে কী আসে যায়? তোমার মতো মানুষের বাঁচাই উচিত না।"
চলবে~~~
[যারা পড়বেন, অবশ্যই রেসপন্স করবেন। জানি ছোটো হয়েছে তবে আজ চেয়েও বেশি লিখতে পারলাম না।]
বিঃদ্রঃ এতদিন পর লিখতে পেরে কেমন মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। আপনারা যদি সুন্দর সুন্দর মন্তব্য না করেছেন, আপনাদের সাথে আড়ি!😾 আপনাদের জন্যই আমার আরেকটা রানিং ধরা লেগেছে। আমি ভালো রেসপন্স না পেলে আপনাদের থেকে দূরে চলে যাব। তখন বুঝবেন লাবিবার শূন্যতা😴 আপনারা ভাবতেও পারবেন না এই গল্প শুরু করে আরও কতটা প্রেশার মাথায় তুলে নিয়েছি।😭