ফন্ট সাইজ:
থিম:
অপ্রকাশিত অধ্যায়

১ম পর্ব

লেখক: Sabiha sultana sova
অপ্রকাশিত অধ্যায়

লেখিকা: সাবিহা সুলতানা শোভা

 পার্ট ওয়ান
_________________________________________________________তপ্ত রোদে পুড়ছে চারপাশ। মাথার ওপর সূর্যটা যেন আজ একটু বেশিই রাগ নিয়ে নেমেছে। সেই তীব্র রোদের মধ্যেই আপনমনে হেঁটে যাচ্ছে এক ষোড়শী কন্যা। রোদের তাপে ঘেমে একাকার হয়ে গেছে আফসানা। কপালের চুলগুলো ঘামে ভিজে মুখের সঙ্গে লেপ্টে আছে, গাল দুটোও লাল হয়ে উঠেছে—মুখটা যেন আস্ত একটা পাকা টমেটো। শরীরটা ক্লান্তিতে নুয়ে পড়লেও থামার কোনো ইচ্ছে নেই তার। শুধু মনে হচ্ছে, কোনোভাবে বাড়িটায় পৌঁছাতে পারলেই যেন শান্তি।
আজ শহরটাকেও কেমন যেন অন্যরকম লাগছে আফসানার কাছে। অন্যদিনের সেই একই রাস্তা, একই মানুষের ভিড়, একই গাড়ির হর্ন—সবই আছে, অথচ আজ সবকিছু যেন একসঙ্গে বিরক্ত করে তুলছে। রোদের তাপে চোখ মেলে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে। বারবার চোখ-মুখ কুঁচকে কোনোমতে হেঁটে চলেছে সে।
দীর্ঘ পঞ্চাশ মিনিটের হাঁটা শেষে অবশেষে বাড়িতে এসে পৌঁছাল আফসানা। এতক্ষণে যেন শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকেই ব্যাগটা একপাশে রেখে বিছানায় চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়ল সে।
কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে পড়ে রইল আফসানা। শরীরের ক্লান্তির চেয়েও যেন মনের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতাটাই তাকে বেশি ব্যস্ত করে রেখেছে। মনের ভেতর অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কয়েকদিন ধরে বন্ধুদের মুখে Instagram নিয়ে এত কথা শুনতে শুনতে অজান্তেই অ্যাপটা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে তার। আফসানা এমনিতে প্রায় সব অ্যাপই ব্যবহার করে, শুধু Instagram-টাই এতদিন তার ফোনে ছিল না। অথচ হালিমা, আর্থি, মিরা, মিম আর ইন্না যখনই একসঙ্গে হয়, কোনো না কোনোভাবে Instagram-এর কথা উঠেই যায়।
কেউ নতুন কোনো পোস্টের কথা বলে, কেউ কোনো ভিডিও নিয়ে হাসাহাসি করে, আবার কেউ আফসানাকে উদ্দেশ্য করে বলে—‘তুই Instagram চালাস না কেন?’
প্রথম দিকে কথাগুলো সে হেসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু একই কথা বারবার শুনতে শুনতে কেমন যেন একটা কৌতূহল তৈরি হয়েছে তার মধ্যে। সত্যিই তো, এমন কী আছে ওই অ্যাপটায় যে সবাই এত আগ্রহ নিয়ে ব্যবহার করে?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই আবার নিজেকেই একটু বোকা মনে হলো আফসানার। একটা অ্যাপ নিয়েও এত ভাবতে হচ্ছে তাকে!
পাশ থেকে স্মার্টফোনটা তুলে নিল সে। আপনমনে WhatsApp-এ ঢুকতেই চোখে পড়ল তাদের ছয় বান্ধবীর গ্রুপ—‘টক্সিক গার্ল’। গ্রুপটার নাম দেখেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। এই পাঁচটা মেয়ের সঙ্গে তার যত ঝগড়া, যত খোঁচাখুঁচি আর যত পাগলামিই থাকুক, শেষ পর্যন্ত এদের কাছেই যেন নিজের সব কথা অনায়াসে বলা যায়।
গ্রুপে ঢুকেই আফসানা লিখল—
—ভাঙ্গারীরা, তোরা কেউ আছিস?
মেসেজটা পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আর্থির রিপ্লাই চলে এলো।
—কিরে? কী মনে করে SMS দিলি?
মিরা সঙ্গে সঙ্গে লিখল—
—কী হইছে আবার? হঠাৎ আমাদের কথা মনে পড়ল কেন?
মিম মেসেজ করল—
—বল, কী খবর?
হালিমা লিখল—
—কী রে, আবার কোনো কাণ্ড করলি নাকি?
ইন্নাও সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
—আগে বল কী হইছে, তারপর উত্তর দিমু!
আফসানা মেসেজগুলো পড়ে মুচকি হাসল। ওদের স্বভাবই এমন। কেউ কখনো সরাসরি ভালোভাবে কথা বলবে না, আগে দুটো খোঁচা দেবে, তারপর আসল কথা শুনবে। তবুও এই জ্বালাতনগুলোই তার কাছে অদ্ভুতভাবে আপন।
কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে নিজের কৌতূহলের কথাটা লিখল আফসানা—
—আচ্ছা, তোরা একটা কথা বল তো। Instagram-এ এমন কী আছে? তোরা সবাই এত চালাস কেন?
মেসেজটা যেতেই আর্থি যেন সুযোগ পেয়ে গেল।
—ওইই! অবশেষে তোর Instagram নিয়ে আগ্রহ হইছে?
আফসানা বিরক্ত হয়ে লিখল—
—হ, হইছে। এখন বলবি নাকি শুধু প্যাঁচাল পারবি?
মিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল—
—তাহলে এতদিন নামাস নাই ক্যান? আমরা কতবার বললাম!
আফসানা ছোট্ট করে উত্তর দিল—
—ইচ্ছা হয় নাই, তাই নামাই নাই।
মিম সঙ্গে সঙ্গে খোঁচা দিয়ে লিখল—
—এখন আবার ইচ্ছা হইছে? বাহ্! এতদিন আমাদের কথা কানে ঢোকে নাই, আজ হঠাৎ Instagram-এর প্রতি প্রেম জাগল?
আফসানা মেসেজটা পড়ে চোখ উল্টানোর ভঙ্গিতে লিখল—
—ধুর! প্রেম-ট্রেম কিছু না। জানতে চাচ্ছি, এত কী পাও তোরা ওইখানে?
হালিমা এবার সরাসরি বলল—
—পাবি কী, আগে নামা। না চালাইয়া কীভাবে বুঝবি?
ইন্না যোগ করল—
—এই জন্যই তো বলতেছি, নামিয়ে ফেল। আমরা সবাই চালাই। তুই একা এমন ভাব করিস কেন যেন Instagram চালানো মহাপাপ।
আর্থি আবার লিখল—
—সত্যি বলছি, তোরে আর বুঝাইতে পারব না। আজকে নামা। তারপর যা বুঝার নিজেই বুঝবি।
আফসানা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। পাঁচজনই যেন একসঙ্গে তার পেছনে লেগেছে। ওরা খুব জোর করে কিছু বলছে না, কিন্তু একটার পর একটা মেসেজে একই কথা—‘নামা, নামা’—শুনতে শুনতে নিজের অজান্তেই একটা চাপ অনুভব করছে সে। তার ওপর এতদিন ধরে বন্ধুদের মুখে Instagram-এর কথা শুনতে শুনতে যে কৌতূহলটা তৈরি হয়েছে, সেটাও এখন আর চেপে রাখতে ইচ্ছে করছে না।
মিরা আবার লিখল—
—দেখ, পরে আবার বলিস না যে আমরা তোকে বলি নাই। আজকে নামা, ব্যস।
মিম সঙ্গে সঙ্গে বলল—
—হ, আর বেশি ভাবিস না। তোর এই বেশি ভাবার স্বভাবটাই সমস্যা।
হালিমা লিখল—
—নামিয়ে দেখ। ভালো না লাগলে মুছে ফেলবি। কিন্তু আগে থেকেই এত নাক সিটকানোর কী আছে?
ইন্না আবার খোঁচা দিল—
—আমরা পাঁচজন যদি চালাইতে পারি, তুই পারবি না কেন?
আফসানা এবার কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিল না। ফোনটা হাতে নিয়েই শুয়ে আছে, কিন্তু চোখ আটকে আছে স্ক্রিনে। কথাগুলো খুব বড় কিছু নয়, তবুও একটার পর একটা মেসেজ আসতে থাকায় তার নিজের জেদটাও ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল। আর সত্যি বলতে, কৌতূহলটাও কম নয়।
শেষমেশ আফসানা লিখল—
—আচ্ছা ঠিক আছে, নামাব। এখন তোরা শান্ত হ।
সঙ্গে সঙ্গেই আর্থির উত্তর এলো—
—এই তো! এতক্ষণে মানুষের মতো কথা বলছিস।
মিম লিখল
—হ, এইবার ঠিক হইছিস।
হালিমা বলল—
—নামা আগে, তারপর দেখবি আসল মজা।
ইন্না লিখল—
—আর নামাইয়া আমাদের জানাবি। চুপচাপ চালাইলে কিন্তু খবর আছে।
মিরা শেষবারের মতো খোঁচা দিয়ে লিখল—
—বলছিলাম না, শেষ পর্যন্ত আমাদের কথাই শুনবি!
আফসানা মেসেজগুলো দেখে হেসে ফেলল। বিরক্তিও লাগছে, আবার কোথাও একটা ভালোও লাগছে। এই মেয়েগুলোর জ্বালাতন না থাকলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি Instagram নামানোর কথাই ভাবত না সে।
ফোনটা হাতে নিয়ে সার্চ বারে ধীরে ধীরে লিখল—Instagram।
স্ক্রিনে অ্যাপটার নাম ভেসে উঠতেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল আফসানা। এতদিন যে অ্যাপটা তার কাছে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ছিল, আজ সেটাকেই ঘিরে মনের মধ্যে কেমন একটা নতুন কৌতূহল জন্ম নিয়েছে।
আঙুলটা ধীরে ধীরে স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে গেল।ষোড়শী রমণী আফসানা আজ প্রথমবারের মতো নিজের ফোনে Instagram নামিয়েছে। এতদিন অ্যাপটার নাম তার কাছে শুধুই একটা শব্দ ছিল—বন্ধুদের মুখে শোনা, তাদের গল্পের মাঝে বারবার ফিরে আসা একটা শব্দ। কিন্তু আজ সেই শব্দটাই তার ফোনের স্ক্রিনে সত্যি সত্যি জায়গা করে নিয়েছে।
Instagram খুলতেই কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার। নতুন কোনো জায়গায় প্রথমবার ঢুকলে যেমন চারপাশটা ভালো করে দেখে নিতে ইচ্ছে করে, আফসানারও ঠিক তেমন লাগছিল। কোথায় কী আছে, কে কী করছে, মানুষজন এখানে কীভাবে সময় কাটায়—সবকিছুই যেন একসঙ্গে জানতে ইচ্ছে করছে।
প্রথমে সে খুব স্বাভাবিকভাবেই অ্যাপটা দেখছিল। তারপর ধীরে ধীরে সেই দেখাটাই কৌতূহলে বদলে গেল।
একটা প্রোফাইল সামনে এলো। প্রোফাইলে ঢুকল। ছবি দেখল। আবার বেরিয়ে অন্য একটা প্রোফাইলে গেল। সেখানে কয়েকটা পোস্ট দেখে আবার নিচে নামতে লাগল। একটা ভিডিও সামনে আসতেই থেমে গেল। ভিডিওটা শেষ হওয়ার পর আরেকটা চলে এলো। সেটাও দেখল। তারপর আরেকটা।
কখন যে সময় কেটে যাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই।
মাঝে মাঝে আফসানা নিজেই বুঝতে পারছিল না, সে আসলে কী খুঁজছে। নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে নয়, নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ও নয়। শুধু মনে হচ্ছিল—আরেকটু দেখি। এত মানুষ এখানে কী করছে, সেটা একটু বুঝি। বন্ধুরা এতদিন ধরে যে জিনিসটার কথা বলে আসছে, সেটার মধ্যে আসলে এমন কী আছে?
এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতেই যেন সে একটার পর একটা জায়গায় ঢুকে পড়ছিল।
কোনো প্রোফাইল ভালো লাগলে ফলো দিচ্ছে। পরিচিত কাউকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ফলো করছে। আবার পরিচিতের পরিচিত কাউকে দেখেও ভাবছে—একে তো চিনি, দেখি কী পোস্ট করে। এভাবেই নিজের অজান্তে একের পর এক মানুষকে ফলো করে ফেলল সে।
ফলো দেওয়ার পর আবার নিজের প্রোফাইলে ফিরে এসে সংখ্যাটা দেখছে।
তারপর আবার অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে।
অধম্য কৌতূহলটা যেন কিছুতেই তাকে স্থির হতে দিচ্ছে না।
এতদিন Instagram ব্যবহার না করায় যেসব বিষয় তার কাছে অজানা ছিল, আজ সেগুলোই একে একে নতুন মনে হচ্ছে। কোনো একটা জিনিস বুঝতে না পারলে সেটাও ছেড়ে দিচ্ছে না। একটু ঘাঁটছে, আবার দেখছে, তারপর বুঝতে পারলে নিজের মনেই সন্তুষ্ট হচ্ছে। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে কয়েক সেকেন্ড পর আবার সেটাতেই ফিরে যাচ্ছে।
মনে হচ্ছিল, অ্যাপটার ভেতরে একটা বিশাল দুনিয়া লুকিয়ে আছে, আর আফসানা আজ প্রথমবার সেই দুনিয়ার দরজাটা খুলেছে। তাই দরজা খুলে আবার বেরিয়ে আসার ইচ্ছেটাই হচ্ছে না।
বন্ধুরা যে এতদিন ধরে Instagram নিয়ে বকর-বকর করত, তাদের কথাগুলো হঠাৎ করে এখন একটু একটু করে বুঝতে পারছে সে। কেন তারা কোনো পোস্ট নিয়ে কথা বলে, কেন কারও ছবি দেখে হাসাহাসি করে, কেন নতুন কোনো ভিডিও নিয়ে এত আলোচনা হয়—এসবের কিছুটা এখন নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে।
আর এই দেখাটাই তার কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একসময় ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আফসানা নিজেই অবাক হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে সে কী করছে, তার কোনো হিসাব নেই। শুধু একটা অ্যাপ নামিয়েছিল। অথচ সেই একটা অ্যাপই তাকে এমনভাবে টেনে রেখেছে যে উঠে যাওয়ার কথাও মনে হচ্ছে না।
নিজের ফলো করা মানুষগুলোর তালিকায় ঢুকে আবার একবার দেখল সে।
সংখ্যাটা দেখে চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা।
—আমি এতজনকে ফলো দিলাম কখন?
নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল আফসানা।
তারপরও ফোনটা নামিয়ে রাখল না।
বরং আবার Instagram-এ ফিরে গেল।
কারণ তার কৌতূহল তখনও শেষ হয়নি। বরং প্রথমবারের মতো এই নতুন জগতটার একটু স্বাদ পাওয়ার পর, আফসানার মনে হচ্ছিল—এখন তো আসলেই জানতে হবে, Instagram-এ এত কিছু নিয়ে সবাই এত মাতামাতি করে কেন।
এতক্ষণ এদিক-ওদিক ঘাঁটাঘাঁটি করার পর আফসানা একসময় নিজের ফলো করা মানুষগুলোর তালিকাটা আবার দেখতে বসল। তালিকাটা খুলতেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল সে। এতজন মানুষ! অথচ এদের বেশিরভাগকেই সে ঠিকমতো চেনেই না। নিছক কৌতূহলের বশে, সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই ফলো দিতে দিতে কখন যে এত বড় একটা তালিকা বানিয়ে ফেলেছে, নিজেরই খেয়াল নেই।
আফসানা নিজের কপালে হালকা চাপড় দিয়ে বিড়বিড় করল—
—আমি কি Instagram চালাইতে আসছি, নাকি ফ্রি-তে পুরো দুনিয়ার আত্মীয় বানাইতে আসছি! 
তারপর ধীরে ধীরে কয়েকজনকে আনফলো করতে শুরু করল। যাদের চেনে না, একে একে তাদের সরিয়ে দিল। কাউকে আনফলো করার সময় আবার প্রোফাইলের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, ‘একে ফলো দিছিলাম কেন?’—কিন্তু উত্তর নিজের কাছেও নেই।
কিছুক্ষণ পর তালিকাটা একটু গুছিয়ে এলে আফসানা এবার পরিচিত মানুষদের খুঁজতে বসল। নতুন একটা জায়গায় ঢুকেছে সে; সেখানে অন্তত নিজের মানুষগুলোর মুখ তো থাকা চাই।
সবার আগে মাথায় এলো তার পাঁচ বান্ধবীর কথা।
Instagram-এর সার্চ অপশনে গিয়ে একে একে হালিমা, আর্থি, মিরা, মিম আর ইন্নার নাম লিখে তাদের আইডি খুঁজে বের করল আফসানা। কারও প্রোফাইল পেয়ে একবার ছবি মিলিয়ে দেখল, কারও নাম দেখে আবার নিশ্চিত হলো—হ্যাঁ, এইটাই তার আম্মু!
একজনকে ফলো দিল, তারপর আরেকজনকে। পাঁচজনকে ফলো দেওয়া শেষ হতেই মনে হলো, এবার অন্তত Instagram-টা একটু নিজের নিজের লাগছে। এতক্ষণ যে অ্যাপের ভেতর শুধু অচেনা মানুষ আর অচেনা পোস্ট দেখছিল, সেখানে পরিচিত পাঁচটা মুখ হঠাৎ করেই অদ্ভুত এক স্বস্তি এনে দিল।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকল না।
‘টক্সিক গার্ল’ গ্রুপে একের পর এক মেসেজ আসতে শুরু করল।
মিরা—
—ওইইই মামা! আমারে ফলো দিছিস? 
আফসানা—
—হ আম্মু, দিছি। খুশি হ এখন।
মিম—
—এক মিনিট! মামা, আমারে দিছিস তো?
আফসানা—
—না আম্মু, তোরে বাদ দিছি।
মিম—
—মামা!!! 
আফসানা—
—মজা করলাম গাধী। তোরেও দিছি।
আর্থি—
—এই যে মামা, এতদিন Instagram নামাবি না নামাবি না করে এখন দেখি আমাদের খুঁজে খুঁজে ফলো দিচ্ছিস! আমাদের কথা মনে পড়ল কেমনে?
আফসানা—
—তোদের ফলো না দিলে কারে দিব? রাস্তায় যারে পাই তারে? 😑
হালিমা—
—হ, সেটাই তো করছিলি এতক্ষণ! আগে বল কতজনরে ফলো দিছিস?
আফসানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল—
—ওইটা গুরুত্বপূর্ণ না আম্মু।
ইন্না—
—ওহ! ‘গুরুত্বপূর্ণ না’ মানে কাহিনি আছে। 
মিরা—
—মামা, সত্যি কই। Instagram-এ ঢুইকা কি তোর মাথা ঠিক ছিল?
আফসানা—
—ছিল।
মিম—
—মিথ্যা।
আফসানা—
—কীভাবে বুঝলি?
মিম—
—কারণ সুস্থ মানুষ প্রথম দিনেই অর্ধেক দুনিয়ারে ফলো দেয় না। 
আর্থি—
—মামা, তুই Instagram চালাইতে গিয়ে এমন অবস্থা করছিস, মনে হইতেছে অ্যাপটা তোরে চালাইছে।
আফসানা—
—চুপ কর আম্মু। প্রথম দিন, একটু ভুল হতেই পারে।
হালিমা—
—একটু? 
ইন্না—
—মামা, তুই যদি আর দশ মিনিট আগে Instagram চালাইতি, মনে হয় জাতীয় পর্যায়ে ফলোয়ার বানায়া ফেলতি।
আফসানা হেসে লিখল—
—তোরা বেশি কথা বলিস।
মিরা—
—বেশি কথা বলব না তো কী করব? আমরা তো তোর আম্মু।
আফসানা—
—পাঁচজন আম্মু আমার জীবন শেষ কইরা দিছে।
মিম—
—কিন্তু মামা, একটা কথা বলি?
আফসানা—
—বল আম্মু।
মিম—
—আমার পোস্টে লাইক না দিলে কিন্তু এই সম্পর্ক শেষ।
আফসানা—
— বাপ আগে পোস্ট দে। পোস্টই নাই, লাইক দিব কই? 😑
আর্থি—
—ওরে! Instagram নামাইয়া দুই মিনিটেই ভাব দেখানো শুরু করছে!
হালিমা—
—মামা, আগে আমার পোস্টে লাইক দিবি। আমি সিনিয়র আম্মু।
ইন্না—
—কোন সিনিয়র? আমরা সবাই সমান আম্মু। 
মিরা—
—না, আমি সবচেয়ে পুরোনো আম্মু।
আফসানা—
—তোরা চাইলে নিজেদের মধ্যে নির্বাচন করে নে। আমার কোনো সমস্যা নাই।
মিম—
—দেখছিস? মামা আমাদের সংসারেও রাজনীতি ঢুকায়া দিছে।
আর্থি—
—এই জন্যই বলছিলাম, ওরে Instagram-এ আনা উচিত হয় নাই। 
আফসানা ফোনের দিকে তাকিয়ে হেসেই ফেলল। এতক্ষণ নতুন অ্যাপটা নিয়ে তার মধ্যে যে অচেনা কৌতূহল আর সামান্য দ্বিধা ছিল, এই পাঁচটা মেয়ের বকবকানিতে সেগুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। তাদের কথার ধরনটাই এমন—এক মুহূর্তে খোঁচা, পরের মুহূর্তে হাসি, আবার তার পরের মুহূর্তেই এমন একটা কথা, যেটা শুনে রাগ করার বদলে হাসিই পায়।
আবার Instagram-এর হোমপেজে ফিরে গেল আফসানা। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক স্ক্রল করার পর হঠাৎ নিজের প্রোফাইলে ঢুকে ফলোয়ার আর ফলোয়িংয়ের তালিকাটা দেখতে লাগল। নতুন অ্যাপ, তাই নিজের অজান্তেই বারবার সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছিল সে।
হঠাৎ একটা নামের ওপর চোখ আটকে গেল—
busy_xayan
আফসানা কয়েক সেকেন্ড নামটার দিকে তাকিয়ে রইল। নামটা একেবারেই অপরিচিত। কৌতূহলবশত প্রোফাইলটায় ঢুকে পড়ল সে।
প্রোফাইলটা বেশ গোছানো। উপরে কয়েকটা হাইলাইট—কোথাও ভ্রমণের ছবি, কোথাও আকাশ-বিকেলের দৃশ্য, আবার কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে তোলা কিছু ছবি। একটা হাইলাইটে পরপর বেশ কিছু সুন্দর ছবি ছিল। ছবিগুলো দেখতে দেখতে আফসানা অজান্তেই কয়েক মুহূর্ত থেমে গেল।
—বাহ! লোকটা তো দেখি অনেক ঘুরে বেড়ায়!
নিজের কথাতেই আবার একটু হেসে ফেলল সে। পরক্ষণেই যেন নিজের কৌতূহলটা সামলে নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে টোকা দিল।
—আচ্ছা, এসব দেখার দরকার কী? চিনি নাকি আমি!
আবার প্রোফাইলটা একটু দেখল। তারপর মনে হলো, আজকে তো কৌতূহলের বশে এমনিতেই অনেক অপরিচিত মানুষকে ফলো দিয়ে ফেলেছে। এই আইডিটাও হয়তো তাদেরই একজন।
আফসানা আনফলো করার অপশনে যেতে যাবে, ঠিক তখনই—
—আফসানা, মা?
ঘর থেকে মায়ের ডাক ভেসে এলো।
আফসানা ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল—
—হুম, আম্মু?
নাসরিন বেগম আবার ডাকলেন—
—এদিকে একবার আয় তো মা। একটা কাজ আছে।
—কী কাজ?
—আগে এদিকে আয়, তারপর বলছি।
আফসানা একটু বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়াল।
—আচ্ছা, আসতেছি।
দরজার কাছে গিয়ে আবার পেছনে তাকাল সে। ফোনের স্ক্রিনে তখনও খোলা সেই প্রোফাইলটা।
busy_xayan
আফসানা এক মুহূর্ত ভেবে ফোনটা সেখানেই রেখে দিল।
—পরে আনফলো করব।
তারপর মায়ের ডাকে সাড়া দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সে জানত না, নিছক কৌতূহল থেকে দেখা সেই অপরিচিত প্রোফাইলটাই একদিন তার জীবনের গল্পে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন অ্যাপের ভেতর এত অচেনা মুখের ভিড়ের মাঝে নিজের পাঁচ বান্ধবীকে খুঁজে পাওয়াটা আফসানার কাছে অদ্ভুতভাবে ভালো লাগল। মনে হলো, নতুন একটা জগতে ঢুকলেও সে একেবারে একা নয়। তার নিজের মানুষগুলোও আছে সেখানে—যদিও সেই মানুষগুলো শান্তিতে থাকতে দেবে না, সেটা আফসানা বেশ ভালোভাবেই জানে।
আবার Instagram-এর হোমপেজে ফিরে গেল সে। এবার আর স্ক্রিনটা আগের মতো অচেনা লাগল না।
কারণ এই নতুন জগতের এক কোণে তার পাঁচজন আম্মু ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে।
আর আফসানা বুঝতে পারল—Instagram-এ তার আসল ঝামেলা অপরিচিত মানুষ না, এই পাঁচটা পাগলই হতে চলেছে
           
                        To be continue everyone 😭💗

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন