#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#সূচনা_পর্ব
পনেরো বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছে চৌধুরী বাড়ির ছোটো মেয়ে কোমল চৌধুরী। মাত্র তিন বছর বয়সে কার এক্সিডেন্টে বাবা তাশরীফ চৌধুরী মারা যান।বাবা মারা যাওয়ায় মায়ের সাথে পারি জমিয়েছিল জার্মানী। সেখানেই মা ও নানা নানুর সাথে বেড়ে ওঠা।তবে এই ব্যাপারে ও আজও অনাগত কেনো ওকে নিয়ে ওর মা নিজের বাবার বাড়ি থেকে চলে এসেছিলো। বুঝতে শেখার পর থেকেই ও চাইতো ওর দাদাবাড়ি যেতে কিন্তু ওর মার এক কথা যেখানে ওর বাবা নেই সেখানে ওরা যাবে না। এখনও অবশ্য যেতো না কিন্তু ওর দাদা দাদী নাকি ওকে দেখতে চায়।তারা তার নাতনির থেকে বেশি দূরত্ব তৈরি করতে চায় না।ওর কোন চাচাতো ভাইয়ের নাকি বিয়ে সেই উপলক্ষেই এবার নিজ দেশে ফেরা।ওর মা কিছুতেই ওই বাড়িতে পা রাখতে চাইছিলেন না।কিন্তু নানা নানুর জোরাজুরিতে আর কমোলের জেদের কাছে হার মেনে না এসেও পারলেন না।তবে তার কথা একটাই বিয়ে শেষ হলে আর এক দিনও বেশি থাকতে পারবেন না তিনি।
~~~
° ঢাকা এয়ারপোর্ট °
ঢাকা আন্তর্জাতিক শাহজালাল বিমানবন্দর। এটি এমন এক জায়গা যেখানে কেউ কাঁদে কেউ বা হাসে। কেউ তাঁর আপনজনকে বিদায় দিয়ে দুঃখের সাগরে ভাসে।আবার কেউ বা কয়েক বছর পর আপন মানুষকে দেখে সুখের সাগরে ভাসে। পার্কিং এরিয়ায় গাড়ির বহর। ছোট বড় নানান ধরনের মানুষের চলাচল এখানে। বিভিন্ন গেট দিয়ে ট্রলি হাতে কেউ কেউ ভিতরে প্রবেশ করছে, কেউ কেউ বাহিরে বের হচ্ছে। হকার রা চা, পান ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছে। চার নম্বর গেট দিয়ে কোমল, এলিজা আরা ও তার পি এ ( ব্যক্তিগত সহকারী ) তূর্য বের হলো ।ওদের নিতে এসেছে কোমলের দাদাভাই শমসের চৌধুরী,চাচা সাদমান চৌধুরী,আর যার বিয়ে মানে ওর চাচাতো ভাই তিয়ান চৌধুরী। কোমল দৌঁড়ে ওর দাদাভাইকে জড়িয়ে ধরলো।চললো কিছুক্ষণ আবেগ ঘন মুহূর্ত। ভাইজিকে এতো দিন পর কাছে পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারেননি সাদমান চৌধুরীও। ভাইজীকে বুকে আগলে নিয়েছেন অতি সানন্দে। তিয়ানই বা কম কি।এত দিন শুনে এসেছে ছোটো বোন আছে অথচ কখনও দেখার সুযোগ হয়নি। এমন ব্যবহার করতে লাগলো দুজনে যেনো ওরা অনেক দিনের পরিচিত।দুই ভাই বোনকে দেখে কেই বা বলবে ওরা আগে থেকে কেউ কাউকে চিনে না।কোমলের আচরণ এমন যেনো ওরা সকলেই বিমুগ্ধ নয়নে চেয়েছিলেন কিয়ৎক্ষণ।তবে এলিজার মুখ থমথমে। বিরক্তি নিয়ে চেয়ে আছেন সকলের দিকে। অবশ্য নিজেও টুকটাক কথা বলছেন সকলের সাথে, সৌজন্যের খাতিরে।।সকলের সাথে কুশল বিনিময় সম্পন্ন করে ওরা রওনা দিলেন নিজস্ব গন্তব্যে। গন্তব্য চৌধুরী প্যালেস।
~~~
° চৌধুরী প্যালেস °
বিয়ে বাড়ি মানেই হইচই, আড্ডা, গণ্ডগোল। জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ। চৌধুরী বাড়ির বিয়ে বলে কথা।বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান।ইতিমধ্যেই আত্মীয় স্বজনরা উপস্থিত হয়েছেন বিয়ে বাড়িতে।কিন্তু বিয়ে বাদেও এখন সকলে মুখিয়ে রয়েছেন অন্য বিষয়ে। বাড়ির ছোট বউ দেশে ফিরছেন প্রায় পনেরো বছর পর।সাথে বাড়ির মেয়েও ফিরছে।সবাই অপেক্ষায় কখন বাড়ি ফিরবেন তারা।বাড়ির গিন্নীরা সকলে মিলে রান্না ঘরে খাটছেন।একেতো বিয়ে বাড়ির ঝামেলা তার উপর এতদিন পর মেয়ে টা বাড়ি ফিরছেন।যত্ন আত্তিতে কোনো কমতি যেনো না থাকে সেটাই তোড়জোড় করছেন।বাড়ির মেয়ে বাড়ি ফিরছে সকলেই অনেক খুশি। কেউ কেউ ফিস ফিস করছে তাদের নিয়ে। যাকে বলে পিছনে বসে সমালোচনা। আসলে কিছু কিছুমানুষই থাকে এমন যে তাদের খেয়ে দেয়ে আর কোনো কাজ থাকে না।
~~~
কোমল তিন বছর বয়সে দেশ ছাড়ায় কাউকেই তেমন চিনেনি সেই বয়সে।মার কাছ থেকেই জেনেছে সকলের পরিচয়।
কেউ না জানলেও তিয়ানের সাথে কোমলের যোগাযোগ বছর দেড়ের। অনলাইন এই পরিচয় হয় ওদের। আসলে কোমল নিজেই খুঁজে বের করে তিয়ানের ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট। আসলে ওদের অনেক বড় ব্যবসা হওয়ায় খুঁজে পেতে সমস্যা হয়নি বেশি। শুধু একটু খাটনি করতে হয়েছে এই আর কি।
এলিজা একদিন বাসায় না থাকায় তার রুমে চুপি চুপি গিয়েছিলো কোমল। সেখান থেকে সকলের ছবি দেখেছে। পুরো ডায়েরি জুড়ে ছিলো পরিবারের প্রত্যেকের ছবি। তবে সেখানে ও কিংবা ওর সব কাজিনরা তখন ছোট ছিলো। তাই দেখেছে শুধু বড়দের।
কোমলের দাদাভাই শমসের চৌধুরী,দাদী রেহানা চৌধুরী। তার তিন ছেলেমেয়ে ।বড় মেয়ে রাফা চৌধুরী, বড় ছেলে সাদমান চৌধুরী আর ছোটো ছেলে মরহুম তাশরীফ চৌধুরী। রাফা বেগম মানে কোমলের ফুপি চৌধুরী থেকে হয়েছেন বেগম। শমসের চৌধুরী অনেক বড় পরিবারের সাথে বিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে। সাদমান চৌধুরীর স্ত্রী জাহরা বেগম,তার দুই ছেলে। বড় ছেলে জায়রিন কিয়ান চৌধুরী, ছোট ছেলে আহনাফ তিয়ান চৌধুরী।রাফা বেগমের স্বামী অনিল তালুকদার ।তার জমজ ছেলে মেয়ে।ছেলে রাতুল তালুকদার, মেয়ে রাইসা তালুকদার।আর সবশেষে মরহুম তাশরীফ চৌধুরীর স্ত্রী এলিজা আরা,তার একমাত্র মেয়ে কোমল চৌধুরী।
~~~
ঘড়ির কাঁটা এখনোও আট পেরোয় নি।ড্রয়িংরুমে হইচই পরে গেছে। কোমলরা মাত্রই বাড়িতে ঢুকেছে।তাদের ঘিরেই এখন চলছে এতো হইচই।রেহানা চৌধুরী নাতিকে পেয়ে বোধহয় দিন দুনিয়া ভুলেই গেছেন। কোমল ও সকলের সাথে মার্জিত ব্যবহার করছে।রেহানা চৌধুরী যারপরনাই অবাক।এত বছর বিদেশে থেকেও এই মেয়ের ব্যবহার যেমন মিষ্টি তেমন অমায়িক।
পরণে জিন্সের প্যান্ট সাথে হালকা গোলাপি রঙের লেডিস শার্ট ।যা হাঁটুর একটু উপরে পর্যন্ত উঠেছে। উপরে আবার একটা ডেনিম জেকেট পরা। কারো আর বুঝতে বাকি নেই এলিজা রেমান বিদেশের মাটিতে থেকেও নিজের মেয়েকে যথেষ্ঠ মার্জিত শিক্ষা দীক্ষায় বড় করেছেনের, শিক্ষা দিয়েছেন অমায়িক ব্যবহারের । যার মধ্যে নেই কোনো উগ্রতা।
আর সবচেয়ে আকর্ষণের বিষয় হলো কোমলের চোখের মণি, পার্পেল ( violet ) মণিতে অদ্ভুত এক সৌন্দর্যে ঘেরা মুখশ্রী সাথে সোনালী চুল যা একদম হাটুর দুই তিন ইঞ্চি নিচ পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। বাঁকানো কোমর। চোখ ধাঁধানো সুন্দর তার নাতনি।এ যেনো রূপকথার রূপাঞ্জেল। বিদেশের মাটিতে থেকে এত সুন্দর চুল গড়ার পিছনে যে এলিজার হাত রয়েছে তাও তিনি বুঝে গেছেন।
চুলগুলো একদম রেহানা চৌধুরীর মতোই সুন্দর।শুধু কোমলের চুল গুলো হাটুর দুই তিন ইঞ্চি নিচ পর্যন্ত নেমেছে, সোনালী রঙের আর রেহানা চৌধুরীর চুলগুলো হাটুর কিছুটা উপরে পর্যন্ত আর কালো।অবশ্য এমন অদ্ভুত চোখের মনি ওদের বংশের করো নেই। মা বিদেশী সেই সূত্রেই এমন অদ্ভুত বিদেশীদের মতো চোখ ওর। অদ্ভুত তবে সুন্দর। ভয়ংকর সুন্দর।মা বিদেশী সেই সূত্র ধরে মেয়েও হয়েছে পুরো বিদেশীদের মোতো গোলাপ ফর্সা সুন্দর । মায়ের গায়ের রং পেলেও চেহারার আদল পেয়েছে একদম বাবার মতন।রেহানা চৌধুরী বড্ড আফসোস করেন নিজেদের ভুলের জন্য এত গুলো বছর নাতনির থেকে দূরে থেকেছেন। নিজের ভুল খুব ভালো মতোই বুঝতে পেরেছেন। তিনি হালকা হেঁসে বলেন ~
~বাহ আমার নাতনি টাতো বেশ মিষ্টি দেখতে।দেখতে একদম বাবার মতো হয়েছো তুমি মিষ্টি মা ।
কোমল মিষ্টি হেঁসে রেহানা চৌধুরীর গাল টেনে আদুরে কন্ঠে বললো ~
~তুমি ও কিন্তু সেই সুন্দরী গ্র্যান্ডমা।একদম ঝাক্কাস।এই রূপ দেখেই বুঝি আমার দাদাভাইকে পাগল করেছিলে ?
কোমলের কথায় উপস্থিত সকলেই হাসলেন। শুধুমাত্র এলিজা ব্যতিত।তিনি গম্ভীর মুখে বসে আছেন ভদ্রতার খাতিরে নাহলে কখন রুমে চলে যেতেন। রেহানা চৌধুরীর কথায় কোমলের ফুপি রাফা বেগম হেঁসে বলেন ~
~সে তুমি যাই বলো না কেনো মা ভাইয়ের মতো দেখতে হলেও গায়ের রং কিন্তু পেয়েছে পুরো মায়ের মতো, খাটি বিদেশীনী।
~হ্যাঁ,সেটাই।আচ্ছা এখন সব কথা বাদ।পরে সকলে মিলে আড্ডা দেয়া যাবে।ওরা তো আর চলে যাচ্ছেনা। অনেক দূরের জার্নি করে এসেছে, পরে নাহয় কথা বলা যাবে। এখন ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিক বরং।
রেহানা চৌধুরীর যাওয়ার কথায় এবার মুখ খুললেন এলিজা রেমান।একটু গম্ভীর স্বরে বললেন ~
~ বিয়ে শেষ হলে আর একদিনও আমরা থাকতে পারবো না মা। ভাববেন না আপনাদের কথায় আমি এখানে এসেছি।মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে আসতে হয়েছে আমাকে। আপনারা পুরোনো কথা ভুলে গেলেও আমি কিন্তু কিছুই ভুলিনি।আর তাছাড়া যেখানে ওই ছেলে আছে সেখানে আমার মেয়েকে নিয়ে বেশিদিন থাকাই রিস্ক। মনে রাখবেন, কুকুরের লেজ আপনি যতই ঘি দিয়ে মাজেন না কেনো লেজ কিন্তু কখনও সোজা হয়না।আর তাছাড়া এই এক সপ্তাহেই আমার অনেক লস।বাবার এখন বয়স হয়েছে। অফিস আমাকেই সামলাতে হয়।বিয়ের পরের দিনই চলে যাবো আমরা ।
চলবে,,,,