#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_১৪
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
ডিসেম্বর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়। এই সময় জার্মানিতে হার কাপানো শীত অবস্থান করে। সূর্যের দেখা মেলা ভার। মৃদুমন্দ তুষারপাত ঘটে চারপাশে। বাচ্চারা সেই তুষারপাতের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করে। স্নো বল বানিয়ে ছোড়াছুড়ি করে নিজেদের মধ্যে। এমনকি মাঝে মাঝে বয়স্ক লোকেদেরও দেখা যায় করা কিনা শেষ বয়সে এসে মন খুলে বাঁচার লোভে বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা শুরু করে দেন।
সেই বিভীষিকাময় রাতের দুই মাস পেরিয়েছে। এই দুই মাসে এক বারের জন্যও কোমল কিয়ানের কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। কিয়ান সেদিন মারা গেছে নাকি বেঁচে গেছে সেই ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যথা নেই ওর। তবে ওর সাথে ইদানিং যেটা ঘটছে সেটা হলো হ্যালুসিনেশন। আগে এই সমস্যা কম থাকলেও এবার দেশ থেকে ফিরে আসার পর যেনো তা হুর হুর করে বেড়ে চলেছে । মাঝে মাঝে ও কিয়ানকে দেখতে পায়। যে কিনা ছুরি নিয়ে ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তবে ওকে ধরার আগেই আবার উধাও হয়ে যাচ্ছে। আবার দেখতে পায় সেই পনেরো বছর আগের দৃশ্য। যা দেখলেই সেকেন্ডের মাথায় মাথা খারাপ হয়ে যায় ওর। আবার এমন অনেক কিছুই দেখে যেটা ওর স্মৃতি থেকে ও মুছে ফেলতে চায়। ইচ্ছে করে সেই স্মৃতি মুছে ফেলতে নিজের মস্তিষ্ক থেকে।
জার্মানীর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির প্রথম ইয়ারের স্টুডেন্ট কোমল।এতোদিন বাংলাদেশে যেই কোমল ছিলো সেই কোমলের সাথে এই কোমলের যেনো আকাশ পাতাল পার্থক্য। সেই কোমল ছিল মিষ্টভাষী, কোমল, চঞ্চল, হাসিখুশি। আর এই কোমল যেনো সম্পূর্ণ তার বিপরীত। এতো বড় একটা ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট হয়েও কোনো বন্ধুবান্ধব নেই কোমলের। প্রতিদিন সকালে ড্রাইভার ওকে ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছে দিয়ে যায়। আবার বিকালে ইউনিভার্সিটি ছুটির সময় এসে নিয়ে যায়। এই সারাদিন সময়ের মাঝে কারো সাথে কোনো প্রকার কথা বলে না ও। কেউ যদি বলতেও আসে তার সাথে ও বলতে চায় না। সকলকে এক প্রকার এভয়েড করে চলে।
বেশির ভাগ স্টুডেন্টই ওর থেকে দূরত্ব রেখে চলে। কোনো এক কারণে বেশির ভাগ স্টুডেন্টই ওর মিশে না। সেই কারণটা অবশ্য ওর তাকানো ভঙ্গিমা। ওর কাছে যেটা নরমাল সেটা অন্যদের কাছে এবনরমাল। ও যদি কারো দিকে তাকায় সেই লোক ওর তাকানোর ভঙ্গিতেই ভয় পেয়ে যায় । অথচ ওর দিক থেকে ও ঠিক ভাবেই তাকায়।
ইউনিভার্সিটি ঘেঁষে বেয়ে চলেছে নেকার নদী। সেই নদীর ধারেই এক কাঠের বেঞ্চে বসে আছে কোমল। দৃষ্টি নিবদ্ধ নদীর জলে। অনুভূতি শূন্য সেই বেগুনী মনির দৃষ্টি দেখলে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে।
হঠাৎ করে নিজের বা পাশ থেকে একটা বাচ্চার হাসির শব্দ ভেসে আসলো। ঘাড়টা সামান্য কাত করে তাকালো সেদিকে কোমল। দেখলো বছর দুই কি তিনেকের একটা বাচ্চা মেয়ে হাসছে আর দৌড়াচ্ছে। আর সেই বাচ্চাটিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে ওর থেকে বারো/তেরো বছরের একটা কিশোর ছেলে। আস্তে আস্তে অবয়ব দুটি বড় হতে লাগলো। এবং সেই অবয়ব দুটি পরিণত হলো কোমল আর কিয়ানের অবয়বে। কোমল হেসে দৌড়াচ্ছে আর কিয়ান ওকে ধরার জন্য তাড়া করে বেড়াচ্ছে। হুট করে হওয়ায় মিলিয়ে গেলো অবয়ব দুটি। তখনই ওর চোখ পড়লো গাছের পিছনে লুকিয়ে থাকা একটা লোকের দিকে। যে কিনা আগাগোড়া কালোতে মুড়ে রয়েছে। শুধু চোখ দুটো দেখা যায়।
ওকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে লোকটি আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। ভাবলো একটুর জন্য বেঁচে গেছে। তবে লোকটি বুঝতে পারলো না কোমল তাকে দেখে ফেলেছে।
কোমলের ভার্সিটির এক সিনিয়র ওকে গত সপ্তাহে প্রপোজ করেছিলো। তবে ও তা রিজেক্ট করেছে। সেই সিনিয়রই লোক দিয়ে ওকে স্টক করছে। প্রথম দিনেই টের পেয়ে গেছে কোমল। তবে সেটা প্রকাশ করেনি।
কোমল বাকা হাসলো। মনে মনে ভাবলো দেশ থেকে এসেছে দুই মাস হয়েছে এখনোও হাত পুজো করা হয়নি। এবার নাহয় সেটা করেই নিক।
_
পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো কিয়ান। প্রথমে নজরে আসলো সাদা সিলিং। নাকে ভুরভুর করে প্রবেশ করলো ফিনাইলের করা ঘ্রাণ। মৃদু ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে এসি। চোখের সামনে ভেসে উঠলো কোমলের স্নিগ্ধ মুখশ্রী।
“স্বর্ণ?”
অস্ফুট স্বরে আওয়াজ করে বলে উঠলো কিয়ান।
“বাবা আমি। তোর মা।”
জাহরা চৌধুরী ছেলের হাত ধরে বসে আছেন মাথার কাছে।
মায়ের গলার আওয়াজে চোখ বুজে পুনরায় তাকালো চারপাশে। কেবিনে আপাদত তেমন কেউ নেই। ওর এক পাশে ওর মা। অন্য পাশে রাতুল। আর সোফায় রাইসা ঘুমিয়ে আছে বুকে বই গুঁজে। আস্তে আস্তে মাথায় একটু চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ে গেলো সেই রাতের কথা। চোখ দুটো পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠলো ওর। যা দেখে জাহরা চৌধুরী বিচলিত হয়ে পড়লেন মুহূর্তেই।
“কি হয়েছে বাবা তোর? চোখে পানি কেনো? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বাবা? বল মাকে।”
কিয়ান এক হাত তুলে বুকে আঙুল ঠেকিয়ে বললো,
“ এখানে ব্যথা হচ্ছে মা। সে আমাকে ভালোবাসলো না। আমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়ে চলে গেলো সে । চলে গেলো আমাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে।”
ঠোঁট কেঁপে উঠলো কিয়ানের। চোখ দিয়ে পানি বেরোতে লাগলো অনবরত। ছেলের এহেন কাণ্ডে কেঁদে উঠলেন মাও।
চোখের পানি মুছে নিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো কিয়ান,
“যেখানেই যাক না কেনো আমি ঠিক ওকে খুঁজে বের করবো। আমাকে শতবার ভাঙলেও ওকে আমার সাথেই থাকতে হবে। নাহলে যে আমি বাঁচবো না।”
“ ওকে ছাড়া মরে যাবি বুঝি?”
“অক্সিজেন ছাড়া বেঁচে থাকতে দেখেছো কাউকে? ও আমার সেই অক্সিজেন যেটা ছাড়া আমি বাঁচবো না এক মুহূর্তও।”
“শরীর এখন কেমন লাগছে বাবা?”
মা কথা ঘুরতে চাইছে সেটা খুব ভালোই বুঝতে পারলো কিয়ান। তবে মেয়ের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না। চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে রাখলো জানালা দিয়ে আদুরে। কারো সাথেই এখন কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
_
আঁধারের চাদরে ঢেকে গেছে পুরো ধরণী। জার্মানির স্ট্রেইট লাইট গুলোর জলে উঠেছে সারি বদ্ধ ভাবে।
রাস্তার এক পাশ দিয়ে হেটে চলেছি কোমল। পুরো রাস্তা ফাঁকা। হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই একটা গলিতে প্রবেশ করলো ও। স্টকার বুঝতে পারেনি যে হুট করে এভাবে গলিতে ঢুকে পড়বে কোমল। একটু হালকা ছুটে গলির ভিতর প্রবেশ করলো স্টকারটি। তবে গলিতে কাউকেই দেখতে পেলো না সে। পুরো গলি অন্ধকারে ছেয়ে আছে। দূর হতে আবছা আলো তীর্যক হয়ে প্রবেশ করছে গলিতে। তবে তা এতোই ক্ষীণ যে অন্ধকার সেই আলোকে গিলে ফেলছে।
লোকটা আস্তে ধীরে পা ফেলে সামনে এগোতে লাগলো। কিছুদূর গিয়েই নিজের পিছনে খুব কাছে কারো অস্তিত্ব টের পেলো লোকটি। ভয়ে হাড় হীম হয়ে গেলো লোকটার। অতপর খুব তাড়াতাড়িই ঘটে গেলো কাজটি। মাথার তালু দিয়ে সূচালো কিছু ঢুকে একদম অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে গেলো। মুখ থেকে গলগলিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো। হাত থেকে ক্যামেরা পরে গেলো ফসকে। লোকটি ঠাস করে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।
কোমল নিচ থেকে ক্যামেরা তুলে নিলো।ক্যামেরা চেক করে দেখলো তাতে নিম্নে সাড়ে পাঁচশোর বেশি হবে ওর ছবি। ছবিগুলো ডিলিট করে দিলো। অতপর ক্যামেরা টাকে সেখানেই ফেলে রেখে লোকটাকে ডেঙ্গিয়ে গলির ওপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে গেলো। এমন ভঙ্গিমা যেনো কিছুই হয়নি। অথচ মাত্রই একটা খুন করে আসলো। মুখের অভিব্যক্তি যেন ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। নাদান বাচ্চা।
#চলবে
[ সকলের ভালো রেসপন্স আশা করছি। ]
হ্যাপি রিডিং 🫰