#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_১৯ [ অতীতের রহস্য উদঘাটন ]
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
হাসপাতালের সাইকোলজি ডাক্তারের সামনে বসে আছে কিয়ান। ওর মাথায় ব্যান্ডেজ মোড়ানো। বেশ খানিকটা বেশিই কেটেছে। ওর সামনে বসা শুকনা পাটকাঠির মতো দেখতে হেংলা পাতলা একজন অল্পবয়সী মহিলা ডাক্তার বসা। বয়স কত হবে? ত্রিশ এর কোঠায় হয়তো। নাম মালিথা ক্যান। চোখে একটা ভারী মোটা ফ্রেমের যা নাকের ডগায় স্থান পেয়েছে। বাম হাতে ফাইল নিয়ে ডান হাত নাড়াচাড়া করে চলেছেন সেই তখন থেকে। তো একবার চশমা ঠিক করছেন একটু পর পর। কিয়ান ইংরেজিতে ডাক্তার মালিথাকে বললো,
“ডক্টর মালিথা! আমি তো আপনাকে আগেই সব ইনফর্ম করেছিলাম।ওর পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনাকে অবগত করেছিলাম। ওকে আরো দুদিন পরে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। তবে হুট করেই ওর কন্ডিশন খারাপ হয়ে গেলো। তাই এখন নিয়ে আসা।”
“হুম। বুঝলাম মিস্টার চৌধুরী। তবে আমি কিন্তু এটা এখনো জানি না যে, ওর সাথে ঠিক হয়েছিলো টা কি? যা হয়েছে তা একদিনে হয় নি। অনেকদিনের টর্চার সহ্য করতে হয়েছে ওকে। আর যা হয়েছে তা মোটেও ভালো কিছু হয়নি। সেটা ওর হেলথ কন্ডিশন দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”
“আমিও সেটা বলতে পারছি না যে এজেক্টলি ওর সাথে কি হয়েছে?”
“হুম। চলুন আমার সাথে।”
কিয়ান ডাক্তার মালিথার পিছনে চেম্বার থেকে বেরিয়ে পাশের একটা কেবিনে প্রবেশ করলো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি। সাদা ফকফকা রুমে সেইসব যন্ত্র আরো বেশি ফুটে উঠেছে। কেবিনের মাঝখানে একটা যান্ত্রিক চেয়ারে আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে আছে কোমল। ডক্টর মালিথা ওর মাথার দুই পাশে গোল টাইপের দুটো তারওয়ালা স্টিকার টাইপের কিছু একটা লাগিয়ে দিলো। ওর হাত দুটো চেয়ারের সাথে ম্যাগনেটিক সিস্টেমে বেঁধে রাখা। কিয়ান অন্যপাশে বসে ওর হাত চেপে ধরলো। চোখ দুটো ছল ছল করছে ছেলেটার। ঠোঁট কাপছে অনবরত।
ডক্টর মালিথা ওই একই তারের সাথে যুক্ত একটা মেশিন হাতে নিলেন। সেটাতে একটা গোল নব রয়েছে সেটা আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলো কোমলের সাথে।
“কোমল? কোমল? শুনতে পাচ্ছো তুমি আমার কথা? কোমল তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছো? উত্তর দাও। কোমল?”
“হুঁ?”
কোমলের সাড়া পেয়ে ডক্টর মালিথা আর কিয়ান একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলেন। ডক্টর মালিথা এবার কোমলকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোমল? তোমার সাথে কি এমন কিছু হয়েছিলো যার কারণে তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো। খুলে বলো আমাকে। অতীতে কি এমন হয়েছিলো যার কারণে তুমি অনেক ভয়ে থাকতে? এখন পর্যন্ত অতীতে তোমার সাথে কি কি অস্বাভাবিক ঘটেছে? বলো আমাকে।”
কোমলের কপাল সামান্য কুচকে গেলো। চোখের পাতা পিটপিট করতে লাগলো। যেনো কিছু মনে করার চেষ্টা করছে।
অতীত…
আমি কোমল। বর্তমানে হাইডেল বার্গ ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে স্টাডি করি। এর আগে আমি যেই স্কুলে ছিলাম সেখানে কোনো কিছুই স্বাভাবিক ছিলো না আমার জন্য। ছোটো থেকেই আমি খুব কম মানুষের সাথে মেলামেশা করেছি। মানুষের সঙ্গ আমার তেমন খুব একটা পছন্দ ছিলো না কখনোই। তাই আমার তেমন কোনো বন্ধুও ছিলো না। আমার বয়স তখন ষোলো। আর মাত্র কিছুদিন পর সতেরো তম জন্মদিন ছিলো আমার। তবে এই সতেরো বছরের জার্নিতে কোনো জন্মদিনেই মাকে তেমন কাছে পেতাম না। বিজনেসের কারণে মা চাইলেও আমাকে সময় দিতে পারতো না। খুব কম জন্মদিনই মাকে কাছে পেয়েছি আমি তাও অল্প সময়ের জন্য। আর বাবা নেই ছোটবেলায় বাবা একটা এক্সিডেন্টে মারা যায়। আমি তেমনটাই জেনে এসেছিলাম ছোটো থেকে।
আমার একটা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো সেই সময়ে। যখন আমার বয়স ষোলো ছিলো। ওর নাম ছিলো এলিসা। প্রায় আমার মায়ের নামের সাথে মিল ছিলো ওর। মূলত এই কারণেই সকলের মতো ওকে আমি এভয়েড করে চলতে পারি নি। আমার যে বাবা নেই এই কথাটা তখন ক্লাসের শুধু ওই জানতো। আমিই বলেছিলাম ওকে। যেহেতু খুব কাছের আর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলাম আমরা। ওর সাথে বন্ধুত্ব চলাকালীন ক্লাসের সকল স্টুডেন্ট আমার সাথে ভালো আচরণ করতো। ওর একটা ভাই ছিলো নাম ছিলো জ্যাক। যে ছিলো আমাদের থেকে অনেক সিনিয়র।ওর সাথেও আমার মাঝে মাঝে টুকটাক কথা বার্তা হতো এলিসার কারণে। বেস্ট ফ্রেন্ডের ভাই ভেবে এড়িয়ে যেতে চাইলেও বিবেকে বাঁধতো। তার উপর আবার সিনিয়র।
তো সেইবার আমার সতেরোতম জন্মদিনে আমার মা থাকতে পারেনি। নানা নানু বেশিরভাগ সময়েই বাহিরে থাকতেন। আমার দেখাশোনা করতো বাড়ীর কেয়ারটেকার আইলিন আন্টি। আর আমার ড্রাইভার মিসির আংকেল। এলিসার আবদারে আমাদের বাড়িতেই জন্মদিনের আয়োজন করা হলো। ছাদে খুব সুন্দর করে সাজালেন আইলিন আন্টি ।
জন্মদিনে আমার ক্লাসের অনেক ছেলে মেয়েকে ডাকা হলো অনুষ্ঠানে। অনেকেই এসেছিলো। আবার অনেকেই আসেনি। এলিসার ভাই জ্যাক কেও ডাকা হলো সেই সুবাদে।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে কেক কাটার ঠিক আগের মুহূর্তে। এলিসা কোথাও একটা গেলো। আমাকে বললো ও একটু বাদেই চলে আসবে। মিনিট পাঁচেক পর আমাদের ক্লাসের এক মেয়ে এসে বললো এলিসা তোমাকে তোমাদের স্টোর রুমের ওই কোনায় ডেকে পাঠিয়েছে। আমার জন্য নাকি সারপ্রাইজ রেডি করেছে ও।
আমাদের বাড়ির ছাদের এক কোনায় একটা স্টোর রুম রয়েছে। সেটা সবসময় বন্ধই থাকতো। আমিও ভাবলাম দেখি কি সারপ্রাইজ রেডি করেছে ও আমার জন্য।
ছাদের ওই কোনাটায় গিয়ে আমি এলিসাকে তো দূর একটা কাক পক্ষীও দেখলাম না। ওই কোনাটা কেমন ভূতুড়ে নীরব ছিলো। দেখেই ভয় লেগেছিলো আমার। তবুও ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে।
স্টোর রুমের বাহিরের দিকে গিয়ে পৌঁছাতেই সেই স্টোর রুম থেকে বড় ভাই জ্যাক বেরিয়ে এলো। হুট করে এমন হওয়ায় ভয়ে দু পা পিছিয়ে গেলাম আমি। তবে চিৎকার করার পূর্বেই জ্যাক আমার মুখ চেপে ধরে স্টোর রুমের ভিতরে ঢুকে পড়লো।
তার এমন অস্বাভাবিক আচরণ আমার ছোট মস্তিষ্কে ভয় ঢুকিয়ে দিলো। অজানা কোনো আশঙ্কায় বুক ধড়ফড় করে উঠলো আমার।
ধস্তাধস্তি করেও ওনার সাথে পেরে উঠলাম না আমি। আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো স্টোর রুমে। তখনই দেখলাম ভিতরে আমার ফ্রেন্ড এলিসা অর্ধনগ্ন অবস্থায় একটা পুরোনো খাতের উপর শুয়ে আছে। আমি সেখানেই স্তব্ধ হয়ে পড়লাম। ভাইয়ের সাথে এগুলো? ছিঃ!
ওরা দুজনে মিলে আমাকে খাটের সাথে বেধে ফেললো। আমিও চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলাম। তবে সাউন্ড বক্সের দ্রিম দ্রিম শব্দে আমার চিৎকারের আওয়াজ বাহিরের কেউ শুনলো না। আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম,
“ছিঃ এলিসা! ভাইয়ের সাথে এগুলো?”
“ তোকে কে বললো জ্যাক আমার ভাই? ও আমার একমাত্র বয়ফ্রেন্ড। ওর তোকে পছন্দ হয়েছে। তাই তোকে ওর হাতে আজকের জন্য তুলে দিলাম।”
“ছিঃ এলিসা। তোকে আমি সত্যি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের ভেবেছিলাম। আর তুই কিনা?”
এলিসা আমার আর কোনো কথা শুনলো না। হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো স্টোর রুম থেকে।
আর জ্যাক হিংস্র জন্তুর মতো ঝাপিয়ে পড়লো আমার উপর। আমার হাত পা বাধা থাকায় আমি ওকে কোনো বাধা দিতে পারলাম না। আমার ঘাড়, গলা, গাল সব জাগায় কামড়াতে শুরু করলো জ্যাক। টেনে ছিঁড়তে শুরু করলো আমার সুন্দর পিংক কালারের বার্বি ফ্রকটা। আমার চিৎকার বোধয় ওর পছন্দ হয়নি তাই আমারই জামার ছেড়া অংশ মুখে ঢুকিয়ে দিলো ঠেলে। এবার আর আমার গলা থেকে কোনো চিৎকার বের হলো না। শুধু গো গো আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বের হলো না আমার গলা দিয়ে।
#চলিত
[ আগামী পর্বেও অতীতের অংশ থাকবে। চেষ্টা করবো আগামী পর্বেই অতীতের কাহিনী শেষ করার।কেমন লাগলো? এখন থেকে গল্প পাবে ঠিক নয়টা ত্রিশে। ইনশাআল্লাহ্। রেসপন্স করতে ভুলো না কিন্তু। ]