ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বপ্নবিহারিণী

১ম পর্ব

লেখক: মুনতাসির ফাহিম
ঘুটঘুটে অন্ধকার অমাবস্যার রাত্রি! নিস্তব্ধতায় ঘিরে আছে চারদিক! আকাশে নেই বিন্দুমাত্র আলোর ছোঁয়া! সামান্য দূরের জিনিসও ভালো করে দৃষ্টিগোচর হয় না কৃত্রিম আলো ব্যতীত। মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতি-ও ডুবে আছে অথৈ নিদ্রার সাগরে। 
মধ্যরাত! গ্রামের রাস্তা যেন শুনশান কোন শ্মশান ঘাট।এমনি এক নিস্তব্ধ পথ ধরে আধারের দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ছুটছে একলা এক যুবক। চারদিকে নেই কোন জনমানবের চিহ্ন। কিছুক্ষণ পরপর দূর অজানা থেকে ভেসে আসছে অচেনা পাখিদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। 
বুকপকেটে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে রেখে দৌড়াচ্ছে সে। চারদিকের অন্ধকার এবং নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করে নিচ্ছে তার সর্বাঙ্গ। 
হঠাৎ তার চোখে পড়লো দূর থেকে ভেসে আসা রোড লাইটের ক্ষীন আলোর আভা। যা দেখে তার মনে উদয় হল ক্ষুদ্র আশার আলো। "সেখানে গেলে হয়তো দেখা মিলবে কোন মানুষের।" 
এ কথা ভাবতেই যেন তার চলার গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। যতই সেই দিকে এগোচ্ছে, ধীরে ধীরে যেন বেড়ে চলছে তার সাহস ও মনোবল। আস্তে আস্তে তার কানে আসতে লাগলো যানবাহন চলাচলের শব্দ। 
রাস্তার কাছে যেতেই একটি মোটরসাইকেল শু শু শব্দ করে চলে গেল তার সামনে দিয়ে। কিছু বলার আগে-ই মোটরসাইকেলটি তার দৃষ্টি সীমার বাহিরে চলে গেল। 
কোন দিকে যাবে সে, পথ না চেনায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল পরবর্তী গাড়ির অপেক্ষায়। দুই দিকে পথ পানে তাকাতে লাগল সে বারবার। কিন্তু আঁধারের কালো চাদর ব্যতীত আর কিছুই চোখে পড়ছে না তার। 
কিছুটা হতাশা চেপে বসলো তার মনে। পরক্ষণেই সে খেয়াল করল দূর থেকে ধীরগতিতে কিছু একটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। অন্ধকারের জন্য ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না কি সেটা। যুবকটি ও পা বাড়ালো সেদিকে। মোটামুটি কাছে আসার পর দেখলো সেটি একটি পায়ে চালিত ভ্যান গাড়ি। যুবকটি উচু আওয়াজে ডাক দিল ভ্যান চালককে-
 :- ভাই! দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি এদিকে আসুন।
ডাক শুনে মাথা তুলে সামনে তাকালো ভ্যান চালক। যুবকটির দিকে চোখ পড়তে-ই থমকে দাঁড়ালো ভ্যান চালক 'লাল মিয়া'। শীতল হয়ে এলো তার গায়ের রক্ত। সে নিজের চোখে যা দেখছে তা তার মনকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছে না। 
রোড লাইট এর আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে রক্তাক্ত শার্ট গায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক টগবগে যুবক। মনে হচ্ছে যেন এইমাত্র রক্তের নদী থেকে স্নান করে এলো সে। 
তার কোলে অর্ধমৃত বা পূর্ণমৃত এক নারী দেহ যার মাথায় তাজা আঘাতের চিহ্ন, এখনো ফোটা ফোটা রক্ত ঝরছে সেখান থেকে। তার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে। পা যেন তার আটকে গেছে এক জায়গায়। সামনে এগুতে বা পিছনে যেতে কোনটারই সাহস পাচ্ছে না সে। 
তাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে যুবকটি বলতে লাগলো-
:- ভাই! দয়া করে একটু জলদি এদিকে আসুন। তাকে একটা হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। অন্যথায় হয়তো তাকে আর বাঁচানো যাবে না। এখানেই সমাপ্তি ঘটবে একটি জীবনের।
লাল মিয়া তার একহাত ভ্যানের উপর রেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। মনে হচ্ছে যেন কোন ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে আছে। কিছুই যেন শুনতে পায়নি সে।
লাল মিয়ার এমন অবস্থা দেখে যুবকটি পুনরাবৃত্তি করলো তার কথার। বার কয়েক ডাকার পর যেন শুনতে পেল ভ্যানচালক। 
লাল মিয়ার ঠিক কি করা উচিত এখন, সেটা ভেবে পাচ্ছে না সে। তবুও একজনের জীবন-মৃত্যুর কথা শুনে এগিয়ে এলো। কাছে গিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাস করল-
 :- উনার মাথা ফাটলো কেমনে? আর আপনে কেডা? আগে কহনো তো এলাকায় দেহি নাই আপনারে?
যুবকটি লাল মিয়ার কথা শুনে অনেকটা অনুনয়ের স্বরে বলল-
 :- ভাই! আপনাকে সব বলতেছি, দয়া করে আগে আমাকে একটি হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন।
গ্রামের অতি সাধারণ একজন ভ্যান চালক লাল মিয়া। একেবারেই সরল সোজা প্রকৃতির মানুষ। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে যা পায় তা দিয়েই কোনমতে খেয়ে পড়ে চলে যায় তার দিন। এই পৃথিবীতে সে একদম একা। খবর নেয়ার মতো কেউ নেই তার।
সে যুবকের কথার কোন উত্তর না দিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলো , কোন সমস্যায় পড়বো না তো আবার। কে জানে, শুনছি এগুলোতে নাকি থানা পুলিশের ঝামেলাও থাকে। সাহায্য চাওয়ার ভান কইরা মাঝখান থেকে ফাসাইয়্যা দিয়া চইলা যায়।
যুবকটি হয়তো বুঝতে পারল লাল মিয়া কি ভাবছে। তাই সে দুই হাতে লাল মিয়ার হাত চেপে ধরে বলল-
 :-ভাই! আমি জানি আপনি কি ভাবতেছেন। আপনি যা ভাবতেছেন তা নয়। উনার এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমিও চিনি না উনাকে। কিন্তু একজনকে তো আর চোখের সামনে মরতে দিতে পারি না। তাই কোন যানবাহন না পেয়ে দৌড়াতে শুরু করি তাকে নিয়ে। 
আমি এই এলাকায় থাকি না। নতুন এসেছি তাই রাস্তাঘাটও কিছু চিনি না। আপনি যদি না যেতে চান, তাহলে অন্তত কাছে কোন একটি হাসপাতালের রাস্তা বলে দিন। আমিই চলে যাচ্ছি তাকে নিয়ে।
লাল মিয়া আর কিছু না ভেবে যুবকটিকে বলল-
 :-ভাই আপনি উনারে নিয়া আমার ভ্যানে উঠ্যা বহেন, আমি আপনাগোরে হাসপাতালে নিয়ে যাইতেছি।
 
লাল মিয়ার কথা মত যুবকটি মেয়েটিকে নিয়ে উঠে বসল তার ভ্যান গাড়িতে। লাল মিয়াও দ্রুত ঘুরাতে লাগলো ভ্যানের প্যাডেল। ভ্যান চালাতে চালাতে যুবকটির কাছে পরিচয় জানতে চাইলো লাল মিয়া- 
 :-ভাইজান আপনের নাম কি? আর কোথায় থাহেন?
 :-আমার নাম আবিদ। আমি ঢাকায় থাকি। এখানে আমার নানুবাড়ি। আজই প্রথমবার আসলাম। যাওয়ার আগে-ই রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়। 
মেয়েটি আর আমি একই অটোতে ছিলাম। হঠাৎ সামনে থেকে একটি বড় ট্রাক আমাদের অটোর সামনে এসে পড়ে। তাই ড্রাইভার সামলাতে না পেরে রাস্তা থেকে নিচে পড়ে যান অটো সহ। সামনে থাকায় আমি লাফ দিয়ে নেমে যাই অটো থেকে। তাই বেশি একটা ব্যথা পাইনি। কিন্তু মেয়েটি মাথায় অনেক চোট পেয়েছে।
লাল মিয়া যথাসম্ভব দ্রুত ভ্যান গাড়ির প্যাডেল ঘুরাচ্ছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই ভ্যানটি নরসিংদী সদর হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়ালো। আবিদ ভ্যান থেকে নেমে মানিব্যাগ বের করলো লাল মিয়াকে কিছু টাকা দেওয়ার জন্য। লাল মিয়া আবিদকে থামিয়ে দিয়ে বলল-
 :-ভাই! টাকা লাগবো না, জীবনে অনেক টাকা কামাইতে পারমু। আপনি আগে আফার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আমি এইখানে আছি। কোন দরকার লাগলে বলবেন।
আবিদের সারা গায়ে রক্ত লেগে আছে, তার সাদা শার্ট রক্তে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। আবিদকে এ অবস্থায় দেখে একটি ট্রলি বয় দ্রুত ট্রলি নিয়ে হাজির হলো আবিদের সামনে। 
আবিদ ট্রলিতে শুইয়ে দিল মেয়েটির নিথর দেহটা। ট্রলি বয় আবিদকে একটি কাউন্টার দেখিয়ে বলল, সেখান থেকে মেয়েটির প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে একটি ফরম পূরণ করে আসতে। 
আবিদ ফরম পূরণ করে এলে ট্রলি বয় ইমারজেন্সি ওয়ার্ড এর দিকে হাঁটতে লাগলো। ওয়ার্ডের সামনে অপেক্ষা করতে লাগলো আবিদ। 
কিছুক্ষণ পর একজন নার্স বাইরে এসে আবিদ কে বলল-
 :-রোগীর সাথে কি আপনিই এসেছেন?
আবিদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
নার্স পুনরায় বলল-
 :-রোগীর রক্ত লাগবে O-
আবিদ খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেল, এখন সে O- রক্ত কোথায় পাবে। তার রক্ত তো B+
তখন আবিদের মনে পড়ল তার মায়ের কথা। কারণ তার সকল বিপদে একটাই আস্থা, সেটা হলো তার মা। অবশ্য তার মায়েরও রক্তের গ্রুপ O- না। কিন্তু সে জানে তার মা নিশ্চয়ই কোন একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। 
তাই আবিদ পকেট থেকে মোবাইল বের করল তার আম্মুর কাছে ফোন করার জন্য। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাড়ির সবাই চিন্তা করছে তার জন্য। শেষ ১১ টার দিকে ফোন করা হয়েছিল বাড়িতে। এখন রাত প্রায় ১ টা বাজে। এর মাঝখানে আর একবারও ফোন করা হয়নি বাড়িতে।
বাড়ির কেউ এতক্ষণে একটা ফোনও করল না। ব্যাপারটি কেমন যেন লাগলো তার। আর কেউ না হলেও অন্তত তার মা তো ফোন করার কথা। 
তাহলে কি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে? নাকি ফোন দিয়েছিল আমি টের পাইনি? আবিদ তা জানার জন্য মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে চার্জ শেষ হয়ে একেবারে বন্ধ হয়ে আছে তার মোবাইল।
 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন