পুরোনো লাইব্রেরির ভেতরটা অস্বাভাবিক নীরব।জানালার ভাঙা কাঁচ দিয়ে সকালের আলো ঢুকছে।ধুলোমাখা টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে আছে সাইফা।তার হাত কাঁপছে।কারণ ডায়েরির কভারে লেখা নামটা তার খুব পরিচিত।এলিনা চৌধুরী।তার মা।যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত।আর যাকে নিয়ে বাড়ির সবাই অদ্ভুতভাবে চুপ থাকে।ধীরে ধীরে সে পরের পাতাটা উল্টাল।পাতার কোণে একটা তারিখ।প্রায় তেইশ বছর আগের।নিচে তার মায়ের হাতের লেখা।
"আজ সাইফা জন্মেছে।আমি তাকে কোলে নিয়ে প্রথম যে প্রতিজ্ঞাটা করেছি, সেটা হলো—যে অন্ধকার আমাদের পরিবারকে গ্রাস করেছে, আমি সেটা কখনো আমার মেয়ের জীবনে আসতে দেব না।"সাইফার চোখ ভিজে উঠল।সে নিজের অজান্তেই লেখাগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দিল।মনে হলো...মা যেন এখনও তার সঙ্গে কথা বলছে।কিন্তু পরের লাইনটা পড়তেই তার বুক কেঁপে উঠল।
"যদি কোনোদিন এই ডায়েরি সাইফার হাতে পড়ে...তাহলে বুঝবে আমি ব্যর্থ হয়েছি।"
— "ব্যর্থ?"সাইফা ফিসফিস করে বলল।তারপর পরের পাতা খুলল।সেখানে একটা পুরোনো ছবি আটকানো।ছবিতে—একজন তরুণী।তার মা।তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন যুবক।অপরিচিত।কিন্তু তাদের দুজনের হাসি দেখে মনে হচ্ছে তারা খুব কাছের মানুষ ছিল।ছবির নিচে লেখা
—"আমি, আরিফ... আর আমাদের অসমাপ্ত গল্প।"সাইফার ভ্রু কুঁচকে গেল।আরিফ?সে তো এই নাম কখনও শোনেনি।হঠাৎ...পেছনে দরজা খোলার শব্দ।কড়াৎ...সাইফা ঘুরে দাঁড়াল।---আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে চমকে উঠল।সাইফ।সে হাঁপাচ্ছে।মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছিল।
— "তুই এখানে কেন?"
— "তুমি আমাকে অনুসরণ করেছো?"
— "হ্যাঁ।"
— "কেন?"সাইফ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর বলল
— "কারণ আমি জানতাম তুই এখানে আসবি।"সাইফা ডায়েরিটা শক্ত করে ধরল।
— "তুমি আগে থেকেই জানতা?"
— "হ্যাঁ।"
— "আর আমাকে বলোনি?"
— "না।"---সাইফার রাগ হলো।অনেক রাগ।
— "সবাই আমার কাছ থেকে সব লুকাও কেন?"তার গলাটা কেঁপে উঠল।
— "আমি কি এতটাই দুর্বল?"সাইফ থমকে গেল।প্রথমবার সে বুঝতে পারল—সাইফার কষ্টটা কতটা গভীর।ধীরে ধীরে সে সামনে এগিয়ে এল।
— "না।"
— "তুই দুর্বল না।"
— "আমি শুধু চাইনি তোর কষ্ট হোক।"সাইফার চোখ ভিজে উঠল।সে জানে না কেন...কিন্তু এই মানুষটার সামনে তার কান্না পায়।আর ঠিক তখনই লাইব্রেরির বাইরে বজ্রপাত হলো।ধাম!সাথে সাথে ডায়েরির ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা চিঠি মেঝেতে পড়ে গেল।দুজনেই চমকে তাকাল।সাইফা দ্রুত চিঠিটা তুলে নিল।খামটার ওপর লেখা— "শুধুমাত্র সাইফার জন্য।"আর নিচে— "যদি তুমি এটা পড়ো, তাহলে বুঝবে সত্য তোমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।"সাইফের মুখের রং বদলে গেল।কারণ...সে এই চিঠিটার কথা জানত না।আর সাইফা বুঝতে পারল—এবার এমন কিছু সামনে আসতে চলেছে...যেটা সাইফও লুকিয়ে রাখতে পারবে না।