ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছায়ার নজরে

কবরস্থানের পাশে থেমে থাকা রাত

লেখক: তাহমিনা

সকালের নরম রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছে।অনেকদিন পর আজ সাইফার ঘুম ভাঙল একটা শান্ত অনুভূতি নিয়ে।গত কয়েক মাসে তার জীবনে এত কিছু বদলে গেছে যকিছু স্বপ্ন মনে হয়।নিজের আসল পরিচয়।মায়ের স্মৃতি,Shadow Order-এর রহস্য আর...সাইফ।বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়াতেই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।বাগানে সাইফ দাঁড়িয়ে আছে।হাতে কফির মগ।কারও সাথে ফোনে কথা বলছে।---সাইফা দ্রুত পর্দা সরিয়ে দিল।তারপর নিজের মনকেই বকা দিল।

— "উফ! আমি ওর দিকে এত তাকাই কেন?"কিন্তু প্রশ্নটার উত্তর সে নিজেও জানে।নাস্তার টেবিলে আজও যথারীতি হৈচৈ।সাফোয়ান বসেই বলল,

— "সুপ্রভাত ভাবি।"সাইফা জুস প্রায় ফেলে দিল।

— "সাফোয়ান!"

— "কি? আমি তো সম্মান দেখাইলাম।"রিয়ান হেসে উঠল।

— "তোর সম্মান না দেখালেও চলবে।"পুরো টেবিল হাসিতে ভরে গেল।অন্যদিকে সাইফ খুব শান্তভাবে নাস্তা করছে।কিন্তু মাঝে মাঝেই তার দৃষ্টি সাইফার দিকে চলে যাচ্ছে।আর সেটা সাফোয়ানের চোখ এড়াল না।

— "ভাই, নাস্তা খাও। মানুষ না।"এইবার সাইফও মাহাদির দিকে এমনভাবে তাকাল যে সে সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।নাস্তার পর রাশেদ চৌধুরী সবাইকে ড্রইংরুমে ডাকলেন।

— "কয়েকদিন সবাই অনেক চাপের মধ্যে ছিল।"

— "তাই কিছুদিন স্বাভাবিকভাবে কাটানোর চেষ্টা করো।"ইমতিয়াজও মাথা নাড়লেন।

— "ঝড় আসার আগে মানুষকে একটু শান্তি দরকার হয়।"কথাটা শুনে সাইফের চোখ এক মুহূর্তের জন্য গম্ভীর হয়ে গেল।কারণ সে জানে...Shadow Order এত সহজে থেমে থাকবে না।দুপুরে সাইফা বাগানে বসে আঁকছিল।হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছে।সে খেয়ালই করেনি কখন সাইফ এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।

— "কি আঁকছো?"সাইফা চমকে উঠল।

— "কিছু না।"

— "দেখতে দাও।"

— "না।"

— "কেন?"

— "কারণ না।"সাইফ ভ্রু তুলল।তারপর হঠাৎ স্কেচবুকটা নিয়ে নিল।

— "সাইফ!"কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।পাতায় সুন্দর একটা দৃশ্য আঁকা,লেক,গাছ, আকাশ আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ।সাইফ।কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।তারপর সাইফ ধীরে ধীরে হাসল।

— "মন্দ না।"সাইফার মনে হলো মাটির নিচে ঢুকে যায়।

বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই সাফোয়ান ড্রইংরুমে ঢুকে পড়ল।

লম্বা ছয় ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা, এলোমেলো কালো চুল, চোখে সবসময় দুষ্টুমির ঝিলিক। ম্যানশনের সবচেয়ে বড় ট্রাবলমেকার বললেও ভুল হবে না।অন্যদিকে সোফায় বসে ছিল রিয়ান। ফর্সা গায়ের রঙ, ধারালো চোয়াল, পরিপাটি কালো চুল আর মুখে সবসময় বিরক্ত একটা ভাব—যেন পৃথিবীর সব ঝামেলা তার কাঁধেই এসে পড়েছে।সাফোয়ানের মুখে আজ অস্বাভাবিক রকমের রহস্যময় হাসি।সে সোজা গিয়ে সাইফের সামনে দাঁড়াল।

— "ভাই, গাড়ির চাবিটা দেন তো।"

সাইফ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

— "কেন?"

— "দেশ উদ্ধার করতে যাব।"

— "চাবি পাবি না।"

— "আচ্ছা, তাহলে জাতি উদ্ধার করতে যাব।"

— "বের হয়ে যা।"

শেষমেশ অনেক নাটক করার পর মাহাদি কোনোভাবে চাবিটা হাতিয়ে নিল।

দূর থেকে সব দেখছিল রিয়ান।

— "তুই আবার কী করলি?"

— "চল।"

— "কোথায়?"

— "বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।"

— "আমি যাচ্ছি না।"

— "তাহলে আজ রাতের ঘটনা মিস করবি।"

রিয়ান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

— "কোন ঘটনা?"

— "গাড়িতে উঠ।"

কয়েক মিনিট পর কালো গাড়িটা ম্যানশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।গাড়ি চালাচ্ছে সাফোয়ান।

আর পাশে বসে বিরক্ত মুখে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে রিয়ান।

পাঁচ মিনিট...

দশ মিনিট...

পনেরো মিনিট...

অবশেষে রিয়ান আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠল—

— "এবার বলবি?"

সাফোয়ান নাটকীয় ভঙ্গিতে চারপাশে তাকাল।

— "আজ রাতে কিছু একটা হতে পারে।"

— "কি হতে পারে?"

— "গোপন তথ্য।"

— "কোথা থেকে পেলি?"

— "সূত্র বলতে নিষেধ করেছে।"

— "তোর কোনো সূত্র নেই।"

— "আছে।"

— "কে?"

— "আমি।"

রিয়ান মাথায় হাত দিল।

— "আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দাও।"

সাফোয়ান এবার হেসে ফেলল।

— "আচ্ছা শোন, আজ রাতে মনে হয় বাড়ির ভাবি আর ভাই এই গাড়িটা নিয়ে কোথাও যেতে পারে।"

— "এই জন্য আমাকে টেনে আনছিস?"

— "অবশ্যই।"

— তাহলে আমাদের কাজ কি?

— "তার এইসব জাতে ঠিক মতো না হয় এইটা।"

— "তো আমরা কি করতে পারি?"

সাফোয়ান প্ল্যানটা বুঝিয়ে দেয়। দুজনেই কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর একসাথে হেসে ফেলল।

তাদের প্ল্যানটা খুবই সহজ।

তারা সাইফের গাড়িটা নষ্ট করে দিবে তার সাথে বিশেষ চকলেটও রাখবে।

আজকে হঠাৎ করেই কেন যেন সাইফার চোখে ঘুম আসছিল না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে সে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। চোখ বন্ধ করলেই একটাই মুখ ভেসে উঠছিল—সাইফ।মাথার ভেতর যেন সাইফ নামের এক জেদি পোকা বাসা বেঁধেছে। যতই তাকে সরিয়ে দিতে চায়, ততই সে আরও বেশি করে জায়গা দখল করে নিচ্ছে।শেষমেশ বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সাইফা। ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়াল বারান্দায়। রাত তখন গভীর হওয়ার পথে। চারপাশ নিস্তব্ধ। দূরের রাস্তার লাইটগুলো মিটমিট করে জ্বলছে, আর ঠান্ডা বাতাস এসে বারবার তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে।রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক কণ্ঠস্বর।

— "রেডি হও।"চমকে পিছনে তাকাল সাইফা।

— "কেন?"দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সাইফ। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখেমুখে সেই চিরচেনা স্থির ভাব।

— "লং ড্রাইভে যাচ্ছি।"সাইফা ভ্রু কুঁচকাল।

— "এখন? এই রাতে?"সাইফ একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— "রাত বলেই। কিছু রাস্তা দিনের আলোয় সুন্দর লাগে, আর কিছু রাস্তা রাতের নীরবতায়।"কথাগুলো শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল সাইফা।

— "আমি যদি না যাই?"সাইফের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

— "তাহলে একা যাব। তবে পুরো রাস্তা তোমার কথা ভেবে বিরক্ত হব।"

— "এটা কি আমাকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা?"

— "না। এটা তোমাকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে নামার নির্দেশ।"কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। ঘুরে চলে গেল।সাইফা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছে। বিরক্ত হওয়ার কথা থাকলেও কেন যেন তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।পাঁচ মিনিট পর সে সত্যিই তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো।বাড়ির সামনে কালো গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়ির গায়ে রাস্তার লাইটের হলুদ আভা পড়ে এক রহস্যময় সৌন্দর্য তৈরি করেছে।গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সাইফ।সাইফার পা যেন হঠাৎ থেমে গেল।আজ মানুষটাকে অস্বাভাবিক রকমের সুন্দর লাগছে।কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে দামি ঘড়ি। রাতের মৃদু বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। গাড়ির আলো এসে তার তীক্ষ্ণ চোয়াল আর গভীর চোখ দুটোকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরই সাইফা বুঝতে পারল সে একদৃষ্টিতে মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে।তার বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে উঠল।সাইফ ভ্রু তুলে তাকাল।

— "এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?"সাইফা তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল।

— "কে তাকিয়ে আছে? আমি তো গাড়ি দেখছিলাম।"সাইফ মুচকি হেসে গাড়ির দরজা খুলে দিল।

— "অবশ্যই। আমি জানি গাড়িটা দেখতে আমার চেয়ে বেশি সুন্দর।"সাইফার গাল দুটো অজান্তেই হালকা লাল হয়ে উঠল। সাইফ গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সাইফাকে বসতে বলার আগেই মেয়েটা নিজেই গিয়ে সামনের সিটে বসে পড়ল।দৃশ্যটা দেখে সাইফের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। কিছু না বলেই সে গাড়ির অন্য পাশ দিয়ে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল।

মুহূর্তের মধ্যেই ইঞ্জিনের মৃদু শব্দে রাতের নীরবতা খানিকটা ভেঙে গেল।গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির গেট পেরিয়ে ফাঁকা রাস্তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। জানালার বাইরে একের পর এক রাস্তার লাইট পিছিয়ে যাচ্ছে, আর শীতল বাতাস মাঝে মাঝে খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দুজনের মাঝের নীরবতাটাকে আরও অদ্ভুত করে তুলছে।প্রথমে কেউই কিছু বলল না।তবে এই নীরবতা বেশিক্ষণ টিকল না।সাইফা একবার সাইফের দিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকাল।

— "আচ্ছা, তোমার গাড়ির কী হয়েছে?"

— "কোন গাড়ি?"

— "তোমার কালো স্পোর্টস কারটা। আজ হঠাৎ পরিবারের গাড়ি নিয়ে বের হয়েছো কেন?"

সাইফ স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে মৃদু স্বরে বলল,

— "একটু সমস্যা হয়েছে।"

— "সমস্যা মানে?"

— "গ্যারেজে পাঠাতে হবে।"

সাইফা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— "তোমার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে না খুব চিন্তায় আছো।"

সাইফ হালকা হেসে বলল,

— "গাড়ি নষ্ট হয়েছে, পৃথিবী তো না।"

— "তাও ঠিক।"

— "আর এই গাড়িটাও খারাপ না।"

সাইফা চারপাশে একবার তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

— "হুম, খারাপ না। তবে তোমার গাড়ির মতো স্টাইলিশও না।"

— "তুমি গাড়ির স্টাইল দেখো?"

— "অবশ্যই।"

— "আমি ভেবেছিলাম তুমি শুধু মানুষকে জাজ করো।"

সাইফা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।

— "এইটা কি খোঁচা ছিল?"

— "তুমি চাইলে খোঁচা ভাবতে পারো।"

— "অসভ্য।"

— "ধন্যবাদ।"

সাইফার মুখ থেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসি বেরিয়ে এলো।গাড়িটা তখন শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে অনেকটা নির্জন রাস্তায় উঠে এসেছে। সামনে লম্বা রাস্তা, দুপাশে অন্ধকার আর দূরে দূরে জ্বলতে থাকা আলো।গল্প করতে করতেই হঠাৎ সাইফার চোখ পড়ল গাড়ির ড্যাশবোর্ডের পাশে রাখা একটি চকলেটের প্যাকেটের দিকে।

— "ওহ! চকলেট!"

সাইফ কিছু বলার আগেই সে প্যাকেটটা খুলে ফেলল।কিন্তু ততক্ষণে সাইফা একটা টুকরো মুখে দিয়ে দিয়েছে।এরপর দুষ্টুমি করে আরেক টুকরো সাইফের দিকেও বাড়িয়ে দিল।

— "নাও।"

কথাটা এত দ্রুত ঘটল যে সাইফও না ভেবেই খেয়ে ফেলল।কয়েক সেকেন্ড পরই সাইফের কপাল কুঁচকে গেল।তার মনে পড়ল, বিকেলে সাফওয়ান গাড়িটা ব্যবহার করেছিল।

— "এক মিনিট..."

— "কী হলো?"

সাইফ কোনো উত্তর দিল না।

মাথার ভেতর দ্রুত কিছু হিসাব মিলাতে লাগল সে। প্যাকেটটার দিকে আবার তাকিয়ে তার বুকের ভেতর অস্বস্তি জমে উঠল।সাফওয়ানের দুষ্টুমির ইতিহাস তার অজানা নয়।এদিকে সাইফা জানালার দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। কিছুক্ষণ পর সে অস্বস্তি নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— "আচ্ছা... এটা কী চকলেট ছিল?"

— "কেন?"

— "জানি না... কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে।"

সাইফ শক্ত করে স্টিয়ারিং চেপে ধরল।

রাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছুটে চলেছে, কিন্তু গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা হঠাৎ করেই বদলে গেছে।সে চোখ সরাসরি সাইফার দিকে ফেরাল না।

কারণ সে জানত, এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন শান্ত থাকা এবং পরিস্থিতিটা আগে বোঝা।

— "তুমি ঠিক আছো?"

— "হ্যাঁ... শুধু একটু অদ্ভুত লাগছে।"

সাইফ গভীর শ্বাস নিল।সামনে রাস্তার দিকে চোখ রেখেই সে বলল,

— "ঠিক আছে। যদি বেশি খারাপ লাগে, আমরা কোথাও থামব।"

তার কণ্ঠস্বর শান্ত ছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভাবছিল—সাফওয়ান আবার কী কাণ্ড করে রেখে গেছে!

হঠাৎ করেই সাইফ গাড়ির গতি কমিয়ে আনল।

সাইফা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িটা রাস্তার পাশের একটি নির্জন জায়গায় এসে থামল।

জায়গাটা দেখে তার বুক ধক করে উঠল।

রাস্তার একপাশে পুরনো একটি কবরস্থান। রাত তখন অনেক গভীর। চারপাশে ঘন অন্ধকার, শুধু দূরে দূরে কয়েকটি রাস্তার লাইটের ম্লান আলো।

আশেপাশে কোনো মানুষের চিহ্ন নেই।গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারদিক আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল।সাইফা অস্বস্তি নিয়ে সিটে সোজা হয়ে বসল।

— "সাইফ ভাইয়া... এখানে গাড়ি থামালে কেন?"

কোনো উত্তর এল না।সাইফ দু'হাত শক্ত করে স্টিয়ারিংয়ে চেপে ধরে সামনে তাকিয়ে বসে আছে।তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, যেন ভেতরে ভেতরে কোনো কিছু নিয়ে লড়াই করছে।

— "সাইফ ভাইয়া?"

এবারও সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।

মাথার ভেতর তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

"সাফওয়ান... তুই আবার কী কাণ্ড করে গেলি?"

ড্যাশবোর্ডের ওপর পড়ে থাকা খালি চকলেটের মোড়কের দিকে একবার তাকাল সে।এখন অনেক কিছুই তার কাছে পরিষ্কার হয়ে আসছে।কিন্তু পরিস্থিতিটা আগে সামলানো দরকার।

সাইফা ক্রমশ আরও চিন্তিত হয়ে উঠল।

— "কী হয়েছে? তুমি এমন চুপ করে আছো কেন?"

সাইফ চোখ খুলে ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

তারপর শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল,

— "ভয় পেয়ো না। কিছু হয়নি।"

কথাটা বললেও তার গলায় অস্বাভাবিক চাপা গাম্ভীর্য ছিল।আর সেটাই সাইফার মনে আরও বেশি প্রশ্ন জাগিয়ে তুলল।কবরস্থানের পাশ দিয়ে হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল।দূরে কোথাও কোনো নিশাচর পাখির ডাক শোনা গেল।আর গাড়ির ভেতর নেমে এল এক অদ্ভুত, ভারী নীরবতা।

কবরস্থানের পাশ দিয়ে হঠাৎ এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল।গাড়ির ভেতরের ভারী নীরবতা ভাঙল সাইফার কাঁপা কণ্ঠে।

— "ভাইয়া... এটা তো কবরস্থান। এখানে কেন গাড়ি থামালে?"

সাইফ যেন নিজের চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে এলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে গভীর স্বরে বলল,

— "ইচ্ছে করেছে, তাই থামিয়েছি।"

উত্তরটা শুনে সাইফার ভয় আরও বেড়ে গেল।সে জানালার বাইরে অন্ধকার কবরগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে আবার দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল।

— "তার জন্য এইখানে?"

সাইফ এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।গাড়ির ভেতর আবার নেমে এলো নীরবতা।এক মিনিট।দুই মিনিট।মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে গেছে।

অবশেষে সাইফ নিচু স্বরে বলল,

— "কেউ একজনের অনুভূতির মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে।"

সাইফা বিভ্রান্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাল।

— "কার অনুভূতি?"

তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— "আর এখানে তো তুমি আর আমি ছাড়া কেউ নেই।"

সাইফের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় এক হাসি ফুটে উঠল।

— "সেটাই তো।"

— "মানে?"

— "বলদ, ওইটা তুই।"

— "আমি?"

সাইফা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল।

— "আমি তোমাকে কখন এসব বললাম?"

সাইফ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মাথা হেলিয়ে বলল,

— "মুখে বলিসনি।"

— "তাহলে?"

— "তোর চোখ অনেক কথা বলে।"

সাইফা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।

বুকের ভেতরটা হঠাৎ অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।

— "আজেবাজে কথা বলো না।"

— "আমি?"

সাইফ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— "আজেবাজে কথা সাধারণত আমি কমই বলি।"

বাইরে রাত আরও গভীর হয়ে উঠছিল।

আর গাড়ির ভেতরে দুজন মানুষ নিজেদের না বলা কথাগুলোর মাঝখানে আটকে বসে ছিল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে কবরস্থানের পাশে থেমে থাকা রাত শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন