অনুষ্ঠান শেষ হলো কিছুক্ষণ আগেই। একে একে সবাই ভার্সিটি থেকে বের হতে লাগল। তাসিফা এখনো থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সে জুয়িনের সাথে কাপল ডান্স করেছে! এই কথাটা ভাবতেই তাসিফার শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
ইয়াশ নিজের চুল আঙুল দিয়ে ঠিক করতে করতে বলল,
-“গাইস, চল কোথাও থেকে ঘুরে আসি।”
তাসিফা মোবাইলে সময় দেখে নিল। এখন বাজে দুপুর ২টা।
-“হুম, যাওয়া যায়।”
সাদ চোখ উল্টে বলল,
-“ভাই, কোথায় যাবি? জায়গা ঠিক করতে করতেই তো আর যাওয়াই হবে না।”
তাসনিম বলল,
-"চল আমরা সবাই ফ্যান্টাসি কিংডমে যাই?”
সাদ আঁতকে উঠল তাসনিমের কথা শুনে।
-“বইন, মাফও চাই, দোয়াও চাই! আমি যামু না। তোরা যা সেখানে।”
তাসিফা বলল,
-"আরে চল। আমি কখনো যাইনি।”
তাসনিম বলল,
-“আমিও না! তাই চল আজ সবাই মিলে যাই।”
ইয়াশ বলল,
-"আচ্ছা চল। মজা হবে।”
ভন্ডপার্টিরা বাসায় কল করে জানিয়ে দিল যে তারা একটু ঘুরতে যাচ্ছে। পরে কল না করলে বাসার মানুষ টেনশন করবে। এবার সবাই রওনা দিল ফ্যান্টাসি কিংডমের উদ্দেশে।
আর অন্যদিকে জুয়িন বাইক নিয়ে সোজা বাসায় চলে এসেছে। আজ ওর উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। খুব ক্লান্ত সে। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। তাই ঘুমিয়ে পড়ল। তবে তাসিফার কথাটা মাথা থেকে সরাতে পারল না।
---
ভন্ডপার্টিরা ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে এসে পড়েছে। ইয়াশ আর সাদ মিলে চারটে এন্ট্রি টিকেট কিনে নিল। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চারপাশটা একদম বদলে গেল। রঙিন ফুলের বাগান, কৃত্রিম ঝর্ণার পানি টুপটাপ পড়ছে, দূরে বড় বড় রাজপ্রাসাদের মতো স্ট্যাচু। চারপাশে বাচ্চাদের হাসি, মাইকে গান আর রাইডের চিৎকার মিলে একটা উৎসবের মতো পরিবেশ। আকাশে বড় ফেরিস হুইলটা আস্তে আস্তে ঘুরছে। বাতাসে তুলার মতো মিষ্টি কটন ক্যান্ডির গন্ধ।
তাসিফা আর তাসনিম ঠিক করল সবাই মিলে রোলার কোস্টারে চড়বে। রোলার কোস্টারটা সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল লোহার দানবের মতো। লাল-নীল রেললাইনটা আকাশের দিকে উঠে আবার নিচে নেমে পেঁচিয়ে গেছে। রাইডটা যখন উপর থেকে নিচে নামে, তখন মানুষের চিৎকার কানে আসে।
ইয়াশের মাথা ঘুরে উঠল ওটা দেখে। আর সাদ মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুদের কীভাবে বলবে যে ওর প্রচণ্ড ভয় করছে!
তাসিফা আর তাসনিম ইয়াশ আর সাদকে টেনে রোলার কোস্টারের সিটে বসাল। প্রতি সিটে ২ জন করে বসার ব্যবস্থা। সামনে সেফটি বেল্ট আর লোহার বার। ইয়াশ আর সাদ একসাথে বসল। তাসিফা আর তাসনিম বসল ওদের পেছনের সিটে।
তাসিফা ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নিল। ধীরে ধীরে রোলার কোস্টার চলতে লাগল। প্রথমে আস্তে আস্তে উপরে উঠছে। তাসিফা-তাসনিম হাসছিল। কিন্তু যত উপরে উঠছে, পেটের ভেতর কেমন মোচড় দিচ্ছে। একদম উপরে গিয়ে ২ সেকেন্ড থেমে থাকল। নিচে পুরো পার্কটা দেখা যাচ্ছে। তারপরই হঠাৎ রোলার কোস্টারটা ছেড়ে দিল। মনে হলো উপর থেকে সোজা নিচে পড়ে যাচ্ছে সবাই।
ইয়াশ চিল্লাতে চিল্লাতে শেষ,
-“বাঁচা কেউ আমারে! আল্লাহ গো! ও আল্লাহ!”
তাসিফা-তাসনিম নিজেদের ভয় ভুলে ইয়াশের কাণ্ড দেখে হাসছে। হঠাৎ সবাই খেয়াল করল সাদের কোনো আওয়াজ নেই। ইয়াশ পাশে ফিরে দেখল সাদ অজ্ঞান হয়ে আছে।
ইয়াশ বলল,
-“মাদারবোর্ডের বাচ্চা! চোখ খোল শালার পুত।”
তাসিফা হতভম্ব হয়ে চিল্লাতে লাগল,
-“ভাই আমি আর পারছি না। নামাই দেন কেউ!”
তাসনিম বলল,
-"ভাই নামান কেউ! ও আল্লাহ গো!”
অবশেষে রাইড শেষ হলো। সবাই সিট থেকে নেমে দৌড়ে সাদের কাছে গেল। সাদ তখনো অজ্ঞান। ইয়াশের বমি আসছিল। আগে একটু পানি খেয়ে মুখে ছিটা দিল। তারপর বোতলের বাকি পানি সাদের মুখের উপর ঢেলে দিল।
তাসিফা সাদের এই অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে বলল,
-"শালার হার্ট দুর্বল, আগে বলবে না? এখন ঢলে পড়ে আছে।”
তাসনিম বলল,
-"আরে শালার পুত চোখই মেলতেছে না। মরল-টরল নাকি!”
ইয়াশ সাদের গালে আলতো করে চাপড় মেরে হুঁশ ফেরাল। সাদ পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল।
-“আমি কই?”
সবাই একসাথে বলল,
-“জাহান্নামে শালা!”
সাদের ধীরে ধীরে সব মনে পড়ল। উঠে বসে বলল,
-"কুত্তারা, আর রাইড খুঁজে পাস না?”
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
তাসিফা বলল,
-"এখন কী করবি? আমি বাসায় যাব। আর কোনো রাইডে চড়ব না।”
সবাই মাথা নেড়ে বলল,
-“ঠিক আছে চল। সবাই বাসায় যাই।”
---
সবাই যার যার বাসায় ফিরে এল। তাসিফা বাসার দরজার সামনে এসে কলিং বেলে চাপ দিল। আয়রা বেগম এসে দরজা খুলে দিলেন।
-“তাড়াতাড়ি গোসল সেরে নে! বাড়িওয়ালা কল করে জানাল যে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো বিল্ডিংয়ে পানি থাকবে না।”
তাসিফা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
-“কেন?”
আয়রা বেগম বললেন,
-"মোটরের কাজ করাবেন, তাই।”
জবাবে তাসিফা শুধু “ওহ” বলল।
তাসিফা নিজের রুমে এসে কাবার্ড থেকে সাদা টি-শার্ট আর ব্ল্যাক কার্গো প্যান্ট বের করল। সেগুলো নিয়ে বাথরুমে চলে গেল গোসল করতে।
---
পরের দিন
আজ তাসিফা অনেক তাড়াতাড়ি ভার্সিটিতে চলে এসেছে। আবহাওয়াটা কিছুটা ঠান্ডা ঠান্ডা। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। তাসিফা ক্লাসে এসে বসল। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে ভন্ডপার্টি গ্রুপে কল দিল। সাদ শুধু কলে জয়েন হলো।
-“হ্যালো…”
তাসিফা বিরক্ত হয়ে বলল,
-"কই তুই? কখন আসবি?”
সাদ বলল,
-"এই তো রেডি হয়ে নিয়েছি। বের হব এখন।”
এর মাঝে তাসনিম জয়েন হলো,
-"দোস্ত, ১০ মিনিট পর বের হব। তুই কোথায়?”
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-"আর বলিস না! সময় না দেখে তাড়াতাড়ি ভার্সিটিতে চলে এসেছি।”
তাসনিম বলল,
-"মশার কামড় খা এখন।”
কল কেটে দিল সবাই।
তাসিফার বোরিং লাগছে। ভার্সিটিতে এখনো বেশি স্টুডেন্ট আসেনি। হাতে গোনা ১০-১২ জন এসেছে। তাসিফা ক্লাসে বসল না। মাঠে চলে এল। ঘাসের উপর বসে পড়ল। বাইরের ওয়েদারটা জোস। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে।
বাইকের হর্নের শব্দে তাসিফার হুঁশ ফিরল। তিনটা বাইক ঢুকছে ভার্সিটিতে। তিনজনই কালো হেলমেট পরে আছে। এদের চিনতে বেশি বেগ পেতে হলো না তাসিফার। এরা হলো জুয়িন আর ওর বন্ধুরা।
জুয়িন হেলমেট খুলে নিল। আচমকা তাসিফার দিকে চোখ পড়ল ওর। হঠাৎ চোখে চোখ পড়ায় তাসিফার একটু অস্বস্তি লাগল। ও তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল। আর অন্যদিকে জুয়িন এক দৃষ্টিতে তাসিফার দিকে তাকিয়ে আছে। তাসিফার দিকে তাকালে চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না জুয়িনের। তাসিফাকে দেখতে একদম স্নিগ্ধ লাগে, গাল দুটো সামান্য ফোলা ফোলা, চোখ দুটো টানা টানা, গোলাপি রঙের চিকন ঠোঁট।
হঠাৎ ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। তাসিফা যেন বৃষ্টির জন্যই অপেক্ষা করছিল। ও বসে থেকেই হাত মেলে দিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।
আর তাসিফার এই কাণ্ড দেখে অন্য এক পুরুষের বুকে অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হলো। জুয়িনের সাদা শার্ট বৃষ্টির পানিতে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেল।
বৃষ্টির মাঝেই ভন্ডপার্টিরা এলো।ইয়াশ, সাদ আর তাসনিম দৌড়ে এল তাসিফার কাছে। কিন্তু ইয়াশ দৌড়াতে গিয়ে পিছলে পড়ে গেল।আর সেই দৃশ্য দেখে ইয়াশ আর তাসনিম ইয়াশকে না উঠিয়েই হাসতে লাগল। অন্যদিকে তাসিফা ইয়াশের ওই অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে দিল।
সাদ হাত বাড়িয়ে দিল ইয়াশের দিকে। হাসতে হাসতে বলল,
-“শালা, তুই আর বুঝদার হলি না।”
ইয়াশ সাদের সাহায্যে নিচে থেকে উঠে দাঁড়াল। মুখ গোমড়া করে বলল,
-“বা*লের কথা কও মিয়া। আমি বুঝদারই।”
তাসনিম হেসে বলল,
-“হ, এইজন্যই তো তুই রাস্তায় যেখানে-সেখানে আছাড় খাস।”
সবাই হেঁটে তাসিফার পাশে এসে বসল। বৃষ্টিতে ভিজে সবাই একদম চুপচুপে। শরীর দিয়ে ঠান্ডা পানি গড়িয়ে পড়ছে, চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। তবুও মুখে সবার হাসি।
ইয়াশ চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর বলল,
-“ভাই, সেরা ফিলিং! এই বৃষ্টিতে বন্ধুদের সাথে ভেজার মজাই আলাদা। কোলাহল নাই, টেনশন নাই,শুধু আমরা আর বৃষ্টি।”
তাসিফা মোবাইলের ক্যামেরা অন করল। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আয়, আমরা ছবি তুলি। এই মোমেন্টটা মিস করা যাবে না।”
সবাই একসাথে পোজ দিল। কেউ ভি দেখাল, কেউ চুল ঝাড়ল। তাসিফা চট করে সবাইকে ক্যামেরাবন্দি করে নিল। ছবির ফ্রেমে ধরা পড়ল বৃষ্টিভেজা হাসি, কাদা মাখা পা, আর বন্ধুত্বের খুনসুটি।
---
অন্যদিকে জুয়িন আর ওর বন্ধুরা তাসিফাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
রিদ চুল ঝাঁকিয়ে বলল,
-"শুনলাম ভার্সিটিতে নাকি নিউ টিচার জয়েন হবে?”
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"হুম। কেন?”
রিদ বলল,
-“না, এমনেই।”
সিয়াম জিজ্ঞেস করল,
-“কবে জয়েন হবে?”
জুয়িন বলল,
-“আগামী মাসে।”
জবাবে রিদ আর সিয়াম শুধু “ওহ” বলল।
এর মাঝেই আচমকা একটা মেয়ে এসে জুয়িনকে জড়িয়ে ধরল।
মেয়েটার গায়ে ছিল হালকা গোলাপি ক্রপ টপ আর হাই-ওয়েস্ট ডেনিম শর্টস। পায়ে সাদা স্নিকার্স। হালকা ঢেউ খেলানো চুল ছেড়ে দেওয়া, ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। একদম ওয়েস্টার্ন লুকে একটা ফ্রেশ ভাইব। দেখেই বোঝা যায় অনেকদিন দেশের বাইরে ছিল।
জুয়িন হতভম্ব হয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়েটাকে ছাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই ওর চোখ পড়ল তাসিফার দিকে। তাসিফা ঘাসের উপর বসে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
জুয়িনের বুকটা ধুক করে উঠল। চট করে মেয়েটাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ধমকের সুরে বলল,
-“তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে কেন?”
মেয়েটা ন্যাকামি করে বলল,
-“ওহ কাম অন জুয়িন! এমন করছো কেন? এতদিন পর বিডিতে এলাম, আর তুমি কিনা ধমকাচ্ছ!”
জুয়িন চোখ গরম করে বলল,
-“রাইসা, এনাফ! আমাকে নাম ধরে ডাকো কেন? আমি বয়সে তোমার বড়। আর আমাকে জড়িয়ে ধরার পারমিশন কে দিল তোমাকে?”
রাইসা মুখ ফুলিয়ে রিদের কাছে গিয়ে বলল,
-“দেখেছো ভাইয়া! জুয়িন আমার সাথে কীভাবে কথা বলে!”
রিদ রাইসাকে ধমক দিয়ে বলল,
-"চুপ কর। তুই জুয়িনকে জড়িয়ে ধরবি কেন? অস্ট্রেলিয়া থেকে বিডিতে কখন ফিরলি?”
রাইসা প্রফুল্ল হয়ে বলল,
-“আজকেই ফিরেছি। তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে চলে এলাম।”
জুয়িন আশেপাশে তাকিয়ে দেখল তাসিফা আর নেই, শুধু ওর বন্ধুরা বসে আছে। মনে মনে বলল, “শিট, শিট!”
রাইসা এর মাঝে জুয়িনের এক হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
-“এই, তোমাকে অনেক মিস করেছি বেবি।”
জুয়িন রাইসার হাত নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে বলল,
-“বেয়াদব মেয়ে।”
বলে হনহন করে ক্লাসের ভেতর ঢুকে গেল। রিদ আর সিয়ামও ওর পিছু পিছু গেল।
(রাইসা হলো রিদের ছোট বোন।)
---
তাসিফা বন্ধুদের মাথাব্যথার মিথ্যে অজুহাত দিয়ে লাইব্রেরি রুমে এসে বসল। জুয়িনকে অন্য একটা মেয়ে জড়িয়ে ধরায় তাসিফার বুকের ভেতরটা মুচড়ে যাচ্ছিল। কেন এমন লাগছে, ও নিজেও বুঝতে পারছে না।
তাসিফা মনে মনে বলল,
-“হয়ত উনার প্রেমিকা হবেন।এতে আমার কেন এতো খারাপ লাগছে?”
হঠাৎ সামনে কারও উপস্থিতি টের পেল তাসিফা। ধীরে ধীরে সামনে তাকিয়ে ‘থ’ হয়ে গেল।