ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 33

লেখক: মিশু

-----

তাসিফা সরাসরি আয়রা বেগমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমি এই বিয়ে করতে রাজী না, মা।”

মুহূর্তের মধ্যেই সবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। হাফসা চোখ বড় বড় করে তাসিফার দিকে তাকিয়ে রইলেন। পুরো ড্রইংরুমে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা।

আয়রা বেগম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,
-"কারণ কী, তাসিফা?”

তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
-"যার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে, তাকে তো আমার পছন্দ হতে হবে, তাই না? আমি তো তার সঙ্গেই সারাজীবন থাকব। তাই শুধু তোমরা ঠিক করলেই তো হবে না, আমারও তো পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার আছে। শেষ পর্যন্ত সংসারটা তো আমাকেই করতে হবে, তোমাদের না।”

আলমগীর আলম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“তোমার কি কোনো পছন্দ আছে, তাসিফা?”

তাসিফা একবার বাবার দিকে তাকাল। তারপর বলল,
-“বাবা, এখানে অন্য কাউকে পছন্দ করার কথা কোথা থেকে এলো? আমি তো এমন কিছু বলিইনি। আমি শুধু বলছি, আমি এখনো বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নই। এত তাড়াহুড়ো করে জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই না আমি। প্লিজ বাবা, কেউ আমাকে এই ব্যাপারে জোর করো না। তোমরা হয়তো আমার ভালোর জন্যই ভাবছো, আমি সেটা বুঝি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনটা তো আমারই। যার সঙ্গে সারাজীবন থাকতে হবে, তাকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত আমার নিজের মতামতটাও তো গুরুত্বপূর্ণ, তাই না? আমি তো এখানে বিয়ের কথা ভেবে আসিনি। শুধু বেড়াতে এসেছিলাম। তাই প্লিজ, আগামীকাল আমাকে কুমিল্লায় ব্যাক করতে দাও। আমার ক্লাস আছে।”

কথাগুলো বলে তাসিফা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

সে জানে, তার কথাগুলো হয়তো এখানে উপস্থিত অনেকের মনেই কষ্ট দিয়েছে। হয়তো তার এমন আচরণে কেউ কেউ অভিমানও করেছেন। কিন্তু তাসিফারও কিছু করার নেই। নিজের জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত সে শুধু অন্যদের ইচ্ছায়, কিংবা কাউকে খুশি করার জন্য নিতে পারবে না। বিয়েটা তার জীবনকে বদলে দেবে। তাই সিদ্ধান্তটাও তার নিজের হওয়া উচিত, অন্তত নিজের মতামতটুকু জানানোর অধিকার তার আছে।

তাসিফা আর কারও দিকে না তাকিয়ে নিজের রুমে চলে এলো।

বিছানার ওপর মোবাইলটা পড়ে আছে। এখন কাউকে কল দিতে একদমই ইচ্ছে করছে না। মাথার ভেতরটা কেমন এলোমেলো লাগছে।

এরই মধ্যে হিয়াও রুমে চলে এলো। রুমে ঢুকেই সে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল।

তাসিফা ভ্রু কুঁচকে হিয়ার দিকে তাকাল।

হিয়া ধীরে ধীরে এসে তার পাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তাসিফার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,
-"তাসিফা, তোকে একটা কথা বলি? প্লিজ, আমাকে খারাপ মনে করিস না।”

তাসিফা মাথা নেড়ে বলল,
-“আচ্ছা, বল।”

হিয়া কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
-"তুই বিয়েতে রাজি হয়ে যা না, প্লিজ।”

তাসিফা যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“হিয়া আপুই, এসব কী বলছিস!”

হিয়ার চোখে পানি জমে উঠল। সে তাসিফার হাতটা শক্ত করে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
-"আমার ভাই তোকে অনেক ভালোবাসে রে, তাসিফা। অনেক বেশি।”

তাসিফা কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু অবাক হয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

হিয়া চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে বলল,
-“তুই হয়তো ভাবছিস, আমি এসব কীভাবে জানি। আসলে তুই যখন পাঁচ বছরের ছিলি, তখন আমি মাত্র আট বছরের ছিলাম। তখন তো আমি এসব বোঝার বয়সে ছিলাম না। কিন্তু বড় হওয়ার পর মা নিজেই আমাকে সবকিছু বলেছে।”

তাসিফা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।

হিয়া বলতে শুরু করল,
-"মা বলেছিল, ভাইয়া ছোটবেলা থেকেই তোকে খুব বেশি আদর-যত্ন করত। তোর ব্যাপারে একটু বেশিই চিন্তা করত। তখন ভাইয়ার বয়স ছিল চৌদ্দ। তোর প্রতি ওর সেই টানটা ঠিক কী ছিল, সেটা হয়তো তখন ও নিজেও পরিষ্কারভাবে বুঝত না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতিটা গভীর হয়ে যায়।”

তাসিফার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।

হিয়া একটু থেমে আবার বলল,
-"মা বিষয়টা লক্ষ্য করেছিলেন। তাই একসময় ভাইয়ার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছিলেন। প্রথমে ভাইয়া কিছুই স্বীকার করতে চায়নি। কিন্তু পরে মায়ের কাছে স্বীকার করেছিল, সে তোকে ভালোবাসে।”

তাসিফা এবার ফিসফিস করে বলল,
-"উনি আমাকে ভালোবাসেন?”

হিয়া মাথা নেড়ে বলল,
-“হ্যাঁ।”

তারপর হিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-"পরে মা মামা-মামীর সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছিল। তখন বিয়ের ব্যাপারে কথা উঠলেও মামা বলেছিলেন, এখনই কিছু করা যাবে না। আগে হাসিব পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। আর তুইও বড় হোস, নিজের মতামত দেওয়ার মতো বয়সে পৌঁছাস। তারপর সময় হলে দুই পরিবার মিলে সিদ্ধান্ত নেবে।”

তাসিফা চুপ করে শুনছে।

হিয়া এবার একটু নিচু গলায় বলল,
-“এরপর ভাইয়াকে আমেরিকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। মা চেয়েছিলেন, ভাইয়া আগে পড়াশোনা করুক, নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করুক। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ভাইয়া আমেরিকায় চলে যায়।”

কথাগুলো বলতে বলতে হিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল আর বলল,
-"ভাইয়া সেখানে গিয়ে নিজের পড়াশোনা শেষ করেছে, নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করেছে। এত বছর পর যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে দেশে ফিরেছে, তখনও তোকে ভুলে যায়নি।”

তাসিফা স্থির হয়ে বসে আছে। কাঁপা গলায় তাসিফা বলল,
-“উনি, এত বছর ধরে আমাকে ভালোবাসেন?”

হিয়া তাসিফার দিকে তাকিয়ে ধীরে মাথা নাড়ল আর বলল,
-“হ্যাঁ, তাসিফা।”

তাসিফা আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার এখন কিছুই ভালো লাগছে না। সে অন্য কাউকে ভালোবাসে। তাই হাসিবকে সে কোনোভাবেই বিয়ে করতে পারবে না।

তাসিফা ধীরে ধীরে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, -“আমি হাসিব ভাইয়াকে বিয়ে করতে পারব না, হিয়া আপুই। তুই তো ভালো করেই জানিস, আমি জুয়িন ভাইয়াকে পছন্দ করি।”

হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে তাসিফার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা যে সত্যিই কথাগুলো বলছে, সেটা তার চোখেমুখেই স্পষ্ট। আর তাসিফারও এখানে কোনো দোষ নেই। নিজের জীবনের সিদ্ধান্তটা নিজের মতো করে নেওয়ার অধিকার তার আছে।

হিয়া চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে হালকা একটা হাসি দিয়ে বলল,
-"আচ্ছা। তোর মতামতকে আমি সম্মান করলাম। সবারই নিজের পছন্দ থাকতে পারে। সেটা কোনো দোষের বিষয় না।”

কথাটা বলে হিয়া আর কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল সে।

তাসিফা কিছুক্ষণ একইভাবে থম মেরে বসে রইল। মাথার ভেতর যেন একসঙ্গে অনেক কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো। মনটা একটু হালকা করার জন্য সে ‘ভন্ডপার্টি’ গ্রুপে কল দিল।

এক এক করে সবাই কল ধরতেই তাসিফা নিজের হাসিটা কোনোভাবে চেপে রেখে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
-“দোস্ত, আমার বিয়ে হয়ে গেছে।”

ইয়াশ তখন বিছানায় শুয়ে ছিল। কথাটা শুনেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল আর বলল,
-“কিহ!”

তাসনিম অবাক হয়ে বলল,
-“কি বলছিস?”

সাদও হতভম্ব গলায় বলে উঠল,
-“আল্লাহ! কীভাবে?”

তাসিফা নাক টেনে টেনে বলল,
-“একটু আগে জোর করে কাজি এনে বিয়ে করিয়ে দিয়েছে।”

ইয়াশ এবার প্রায় চিৎকার করে বলল,
-“বা*ল! এগুলো কী বলছিস? তুই কি প্র্যাঙ্ক করছিস?”

তাসিফার মুখে হাসি চলে এলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
-“এই ব্যাপারে আমি তোদের সঙ্গে প্র্যাঙ্ক করব? পাগল নাকি?”

সাদ অস্থির হয়ে বলল,
-“এখন কী করবি? ঢাকায় আসবি না আর?”

তাসিফা মুখ ছোট করে বলল,
-“জানি না রে, বলতে পারছি না।”

তাসনিমের চোখে পানি টলমল করছে। সে কাঁপা গলায় বলল,
-“তাসিফা, এভাবে বলিস না। তোর কি সত্যি সত্যিই বিয়ে হয়ে গেছে?”

তাসিফা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে বলল,
-“হুম। তোদের পরে কল দিব। এখন রাখছি।”
কথাটা বলেই সে কল কেটে দিল।

---

এদিকে ইয়াশ কিছুক্ষণ মোবাইল হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল। তাসিফার কথাগুলো এখনও তার মাথায় ঘুরছে। শেষ পর্যন্ত আর দেরি না করে সে জুয়িনের নম্বরে কল দিল।

প্রথমবার কল দিতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।
-“হ্যালো?”

ইয়াশ তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল,
-"জুয়িন ভাই, তাসিফার বিয়ে হয়ে গেছে!”

ওদিকে জুয়িন তখন রাতে ছাদের ফুল গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল। ইয়াশের কথা শুনে তার হাত থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড যেন কোনো কথাই তার মাথায় ঢুকল না।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,
-"কি বলছো?”

ইয়াশ বলল,
-“হ্যাঁ ভাই। তাসিফার বিয়ে হয়ে গেছে। ওর ফুফাতো ভাই হাসিবের সঙ্গে।”

কথাটা শুনে জুয়িন একদম চুপ হয়ে গেল।
হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে এলো। রাগ, কষ্ট আর অবিশ্বাস, সবকিছু একসঙ্গে এসে ভর করল তার ওপর।

সত্যিই কি তাসিফার বিয়ে হয়ে গেছে? তাসিফা কীভাবে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারল?
সে কি একবারও জুয়িনের কথা ভাবেনি? তাদের এত কথা, এত অনুভূতি, সবকিছু কি তাহলে তাসিফার কাছে এতটাই সহজ ছিল?

রাগে জুয়িনের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেল। মাথার ভেতরটা যেন ঝিমঝিম করছে।

ওপাশ থেকে ইয়াশ কয়েকবার,
-“জুয়িন ভাই?” বলে ডাকলেও কোনো উত্তর পেল না।

শেষ পর্যন্ত জুয়িনের নীরবতা দেখে ইয়াশ কলটা কেটে দিল।

----

জুয়িন ধীরে ধীরে নিজের ফ্ল্যাটে এসে বিছানার ধারে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল।

তার ভেতরে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। তার থেকেও বেশি হচ্ছে কষ্ট।

তাসিফা অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছে, এই কথাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে।
একসময় রাগের বশে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল জুয়িন। একে একে সব জায়গা থেকে তাসিফাকে ব্লক করে দিল।

মোবাইলটা পাশে ছুড়ে রেখে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে থাকল। তারপর হঠাৎ উঠে দেওয়ালে হাত দিয়ে আঘাত করল।

কিন্তু তাতেও বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা কমল না।
বরং আরও বেশি করে মনে হলো, সে তাসিফাকে হারিয়ে ফেলেছে।

----

এদিকে তাসিফা বন্ধুদের সঙ্গে একটু মজা করার পর বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে। নিচে নিশ্চয়ই সবাই তাকে নিয়ে আলোচনা করছে। এসব ভেবে নিজের অজান্তেই আবার একটু হাসল সে।

ঠিক তখনই হঠাৎ দরজা খুলে গেল। হন্তদন্ত হয়ে হাসিব রুমে ঢুকল।

হাসিবকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে তাসিফা চমকে উঠে বসে পড়ল আর বলল,
-“হাসিব ভাইয়া?"

কিন্তু হাসিব কোনো উত্তর দিল না। সে দ্রুত তাসিফার কাছে গিয়ে তার হাত ধরে তাকে বিছানা থেকে দাঁড় করাল।

তাসিফা কিছু বলার আগেই হাসিব তার হাতটা দেওয়ালের পাশে চেপে ধরল।

তাসিফা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

হাসিবের চোখেমুখে তখন প্রচণ্ড অস্থিরতা। সে হিসহিসে গলায় বলল,
-“কেন বিয়ে করবি না আমায়? কেন?”

তাসিফা ভয় পেলেও তার চেয়েও বেশি অস্বস্তি লাগল হাসিবের আচরণে।

হাসিব আবার বলল,
-“বল! কেন করবি না? আমি কোন দিক থেকে খারাপ বল?”

তাসিফার এবার রাগ উঠে গেল। সে জোর করে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে হাসিবের গালে একটা চড় বসিয়ে দিল।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
-"আপনার এসব আচরণকে আমি ঘৃণা করি। এসব কোন ধরনের অসভ্যতা?”

চড় খেয়ে হাসিব চুপ করে গেল।

তাসিফা ভেবেছিল, হাসিব হয়তো এবার তাকে আরও অনেক কথা শোনাবে। কিন্তু তার বদলে হাসিব ধীরে ধীরে তাসিফার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

মাথা নিচু করে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল সে। যেন নিজের ভেতরের কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তারপর কাঁপা গলায় বলল,
-“সরি, আমি অনেক সরি। অনেক অনেক সরি, তাসিফা। আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি আর কখনো এমন করব না। তুই যেভাবে চাইবি, আমি সেভাবেই চলব। শুধু, আমার হয়ে যা তুই।”

কথাগুলো বলতে বলতে হাসিবের গলা ক্রমেই ভারী হয়ে এলো। সে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করল। দ্রুত হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিল। কিন্তু কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়ল।

হাসিব এবার তাসিফার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
-“তোকে খুব ভালো রাখব। কোনো কিছুর অভাব হতে দেব না। শুধু একবার আমাকে সুযোগ দে।”

শেষ কথাটা বলতে গিয়েই তার গলা ভেঙে গেল।
হঠাৎ যেন এতদিন ধরে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সব কষ্ট একসঙ্গে বেরিয়ে এলো।

হাসিব মুখটা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। চোখের পানি থামানোর কোনো চেষ্টাই যেন আর করতে পারছে না সে। একসময় কাঁদতে কাঁদতে তার কাঁধও কেঁপে উঠল।

তাসিফা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এত বড় একজন মানুষকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে সে কী বলবে, বুঝতে পারছে না।

হাসিব চোখ মুছতে মুছতে আবার বলল,
-"আমি এত বছর ধরে শুধু একটা আশাই নিয়ে ছিলাম, দেশে ফিরে তোকে নিজের করে পাব। এতগুলো বছর তোকে মনে রেখেছি, তাসিফা। ভাবতাম, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে আবারও তার চোখ ভিজে উঠল।
-“কিন্তু আজকে যখন শুনলাম তুই আমাকে বিয়ে করবি না, তখন মনে হলো, আমার এত বছরের অপেক্ষার কোনো মূল্যই ছিল না।”

হাসিব এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। চোখের পানি মুছতে মুছতে বারবার মাথা নাড়ছে, অথচ কান্না কিছুতেই থামছে না। সে আবারও বলল,
-"আমি কী এমন চেয়েছি তোর কাছে? শুধু তোকে একটু নিজের করে চেয়েছিলাম।"

তার গলা কাঁপছে।
-"আমাকে একটু ভালোবাসলে, খুব বেশি কিছু কি চাওয়া হয়ে যেত?”

তাসিফার বুকটাও কেমন ভার হয়ে এলো। তার চোখেও পানি জমে উঠল। কিন্তু হাসিবের প্রতি মায়া লাগলেও নিজের সিদ্ধান্ত বদলানোর কোনো কারণ সে খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,
-“আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না হাসিব ভাইয়া। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।”

কথাটা শুনে হাসিব যেন এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার কান্নার শব্দও থেমে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। সে শুধু তাসিফার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো তখনও পানিতে ভেজা। তারপর খুব ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল। চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়তে লাগল।

কাঁপা গলায় বলল,
-"আমাকে একটু ভালোবাসলে কি, অপরাধ হয়ে যেত?”

তাসিফার বুকটাও কেমন ভার হয়ে এলো। তার চোখের কোণ বেয়ে এবার একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু তার হাতে সত্যিই কিছু করার নেই।

হাসিব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়ানোর পরও কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচু করে রইল। হাতের পিঠ দিয়ে বারবার চোখ মুছছে, কিন্তু চোখের পানি যেন কিছুতেই থামছে না।

তারপর তাসিফার দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
-"যেখানে তোকে পাব না, সেখানে আমি দেশে থেকে লাভ কী?”

তাসিফা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
-“মানে? আপনি কি আবার চলে যাবেন?”

হাসিব কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁট শক্ত করে কান্নাটা আটকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু চোখের পানি আবারও গড়িয়ে পড়ল। সে মুখ ফিরিয়ে নিল, যাতে তাসিফা তার কান্নাটা আর দেখতে না পায়। তারপর চোখ মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শুনে তাসিফা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার বুকের ভেতরটাও কেমন ভার হয়ে এসেছে। হাসিবের জন্য তার মনে ভালোবাসা না থাকলেও, তার এভাবে ভেঙে পড়াটা দেখে সত্যিই খারাপ লাগছে।

তাসিফা ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়ল। চোখের সামনে এখনও হাসিবের কান্নাভেজা মুখটা ভাসছে।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মুছে নিল। তার সিদ্ধান্ত বদলাবে না,কিন্তু একজন মানুষকে এতটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছে, এই ভাবনাটাও তাকে ভেতর থেকে অস্বস্তিতে ফেলছে।

#চলবে

{সত্যি বলছি, এই পর্বটা লিখতে গিয়ে জাস্ট হাত কাঁপছিল আমার!
একবার হাসিবের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখলাম, বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল। কাউকে নিজের সমস্তটা দিয়ে ভালোবেসেও, শেষ পর্যন্ত তাকে না পাওয়ার কষ্টটা বোধহয় এমনই হয়। কিছু অনুভূতি লিখতে গেলে শুধু শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, নিজেকেও সেই অনুভূতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। আর এই পর্বটা লিখতে গিয়ে ঠিক তেমনই একটা অনুভূতি হয়েছে আমার 🙃}

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 33 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন