ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 11

লেখক: F. Tabassum

ঢাকা শহরের রাতের চেনা যানজট পেরিয়ে কালো  গাড়িটা যখন ধীরে ধীরে ফেং ভিলার সদর দরজার সামনে এসে থামল, তখন চারদিকের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো পুরোপুরি জ্বলে উঠেছে।
গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভার বিনীতভাবে দাঁড়াতেই ইনায়া ক্লান্ত শরীরে গাড়ি থেকে নেমে এল। তার পরনে এখনও অফিসের সেই ব্ল্যাক ফরমাল স্যুট, একহাতে ভারী ল্যাপটপ ব্যাগ আর অন্যহাতে বেশ কয়েকটি নতুন কেস ফাইলের স্তূপ। সারাদিনের ম্যারাথন ইন্টারভিউ আর ওরিয়েন্টেশনের ধকল তার শান্ত চোখে স্পষ্ট।
কিন্তু সদর দরজা ঠেলে বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই ভেতরের নরম আলো আর একটা অতি চেনা, আদুরে কণ্ঠের চিৎকার ইনায়ার সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিল—
— "মাম্মা এসেছে!"
আইরা!
ড্রয়িংরুমের কার্পেটে বসে এতক্ষণ নিজের পুতুলগুলো নিয়ে খেলছিল সে। মায়ের চেনা গলার আওয়াজ আর জুতোর শব্দ শুনতেই সে হাতের খেলনা ফেলে এক দৌড় দিল। তার ছোট্ট দুই পা ফ্লোরের ওপর 'টুপটাপ' মিষ্টি শব্দ তুলে ডানা কাটা পাখির মতো ছুটে এল।
— "মাম্মাআআ!"
ইনায়া হাতের ফাইল আর ল্যাপটপ ব্যাগটা পাশের একটা সোফায় আলতো করে ছুঁড়ে ফেলে দুই হাত বাড়িয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। ঠিক পরের মুহূর্তেই আইরা একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে পাখির ছানার মতো মায়ের গলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
— "উফ! আমার কলিজার টুকরো! আমার রাজকুমারী!"
ইনায়া মেয়েকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আইরার তুলতুলে দুই গালে, কপালে একের পর এক অজস্র স্নেহের চুমু খেতে লাগল সে।
আইরা মায়ের গলাটা ছোট ছোট দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট ফুলিয়ে, ভারী অভিমানী মুখে বলল—
— "তুমি আজ অনেক অনেক দেরি করেছো মাম্মা। ঘড়ির কাঁটা কত ঘোরে, তাও তুমি আসো না।"
ইনায়া মেয়ের সেই আদুরে রাগ দেখে অপরাধীর মতো মুখ করে বলল— "সরি আমার মা। আজ অফিসে অনেক অনেক কাজ ছিল তো, তাই।"
— "না... আমি কিচ্ছু শুনব না। আমি আর তোমার সাথে একদম কথা বলব না।" আইরা মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
ইনায়া বড় বড় চোখ করে অবাক হওয়ার ভান করল— "তাই নাকি? আমার মা আমার সাথে কথা বলবে না?"
— "হুম!" আইরা নিজের দাবিতে অনড়।
— "তাহলে এই যে আমি আমার বুড়ির জন্য একটা বিশাল সারপ্রাইজ লুকিয়ে এনেছি, সেটার কী হবে?"
'সারপ্রাইজ' শব্দটা কান ছুঁতেই আইরার বড় বড় ডাগর চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে কৌতূহলে চকচক করে উঠল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল— "সত্যি? কী এনেছ?"
ইনায়া হেসে তার ব্যাগ থেকে একটা বড় সাইজের প্রিমিয়াম ডার্ক চকোলেট বের করে সামনে ধরল— "আমার মিষ্টি রাজকুমারীর রাগ ভাঙানোর জন্য।"
আইরা খুশিতে একগাল হেসে চকোলেটটা একহাতে  নিল এবং পরক্ষণেই মায়ের গালে টুপ করে একটা পাল্টা চুমু বসিয়ে দিল— "Thank you, Mamma! ইউ আর দ্য বেস্ট!"
ঠিক তখনই রান্নাঘরের সুগন্ধি পর্দাটা সরিয়ে শামীমা বেগম হাতা হাতে মুখে হাসি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা গলায় বললেন—
— "আসছো মা? হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো যাও। চা একদম তৈরি করে রেখেছি। সারাদিন খুব ধকল গিয়েছে তোমার ওপর দিয়ে, তাই না?"
ইনায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল— "একটু মা... আজ নতুন স্টাফদের ওরিয়েন্টেশনও ছিল তো, তাই একটু বাড়তি চাপ ছিল।"
শামীমা বেগম এগিয়ে এসে আইরাকে ইনায়ার কোল থেকে নিজের কোলে নিলেন। বললেন— "আগে তুমি ওপরে গিয়ে কাপড়টা বদলে ফ্রেশ হও। তারপর সবাই মিলে একসাথে নাস্তা করব।"
ইনায়া সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে ইভানের গলা পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে শোনা গেল—
— "ভাবি! বাঁচাও! জাস্ট বাঁচাও আমাকে!"

ইনায়া সিঁড়ির গোড়ায় থমকে দাঁড়িয়ে একদিকের ভ্রু কুঁচকে ওপরে তাকাল— "কী হলো আবার? কী হয়েছে?"
ইভান সিঁড়ির মাথায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নাটকীয় মুখভঙ্গি করে, কাঁদোকাঁদো গলায় বলল— "ভাবি, তোমার এই নিষ্পাপ দেবরকে অফিসে রীতিমতো অমানুষিক অত্যাচার করা হচ্ছে! জাস্ট লিগ্যাল টর্চার!"

তার ঠিক পেছনেই চুল বাঁধতে বাঁধতে সায়মা এসে দাঁড়াল। বরের এই ওভার-অ্যাক্টিং দেখে সে নিজের হাসি কোনোমতেই চেপে রাখতে পারল না। সে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল— "ভাবি, ওর একটা কথাও বিশ্বাস করবেন না। আজকে ভাইয়া ওকে পর পর তিনটা ব্যাক-টু-ব্যাক ইম্পর্ট্যান্ট বোর্ডার মিটিংয়ে বসিয়েছিল। আর তাতেই ওনার এই দশা!"

ইভান সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা নেড়ে তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল— "তিনটা না সায়মা, চারটা! চার চারটা ফাইনাল প্রেজেন্টেশন! মানুষ নিজের আপন ছোট ভাইকে এভাবে খাটিয়ে মারতে পারে? ভাবি, তুমিই বলো!"
ইনায়া ইভানের বাচ্চাদের মতো মুখভঙ্গি দেখে খিলখিল করে হেসে ফেলল।
— "কাজ করতে গেলে একটু আধটু কষ্ট তো হবেই, ইভান। তুমি তো এখন আর ছোট নও।"
— "ধুর ভাবি! আমি ভেবেছিলাম তুমি অন্তত আমার পক্ষে কথা বলবে! এই বাড়িতে আমার দুঃখ বোঝার কেউ নেই!" ইভান আকাশ ফাড়ার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই সদর দরজার ওপাশ থেকে একটা গম্ভীর, ভারী আর পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠস্বর পুরো ড্রয়িংরুমের আবহ বদলে দিল—
— "কিসের পক্ষ নেওয়া হচ্ছে এখানে?"
সবাই একযোগে ঘুরে তাকাল।
কোম্পানির অফিশিয়াল স্যুট-টাই পরা অ্যারিস অফিস থেকে ফিরে জুতোর ফিতে খুলছে। হাতের আঙুল দিয়ে সে নিজের টাই-এর নটটা সামান্য আলগা করতে করতে সিঁড়ির দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো সরাসরি ইভানের শুকিয়ে যাওয়া মুখের ওপর নিবদ্ধ হলো।
অ্যারিস কোটের বোতাম খুলতে খুলতেই ইভানের দিকে তাকিয়ে একদম শান্ত অথচ ঠান্ডা গলায় বলল—
— "আগামীকাল ঠিক সকাল নয়টায় তুমি আমার পার্সোনাল কেবিনে থাকবে। নেক্সট প্রজেক্টের ফাইল রেডি চাই।"
ইভানের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে যেন তুবড়ে যাওয়া কাগজের মতো শুকিয়ে ছোট হয়ে গেল। সে তোতো করে বলল— "ভাইয়া... কাল তো ক্যালেন্ডারে সরকারি বন্ধ!"
অ্যারিস ইভানের দিকে আর না তাকিয়ে সোজা ইনায়ার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই কঠোর ভাবটা ইনায়ার দিকে তাকাতেই মুহূর্তের মধ্যে নরম ও ভালোবাসাময় হয়ে এল। সে ইভানের প্রশ্নের উত্তরে শান্ত গলায় বলল—
— "ক্যালেন্ডারে সরকারি বন্ধ থাকতে পারে ইভান, তাই বলে আমার কোম্পানির কাজ বন্ধ না। শার্প নাইন এএম।"

অ্যারিস সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ইনায়ার দিকে এগিয়ে যেতেই, পেছন থেকে ইভান অত্যন্ত করুনভাবে মুখ বাঁকিয়ে সায়মার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল—
"দেখলে সায়মা? দেখলে? আমি আগেই বলেছিলাম, এই ফেং পরিবারে আমার একটা ছ্যাদলা পয়সারও মূল্য নেই... জাস্ট কোনো ভ্যালুই নেই আমার!"

ইভানের এমন করুণ মুখভঙ্গি আর বাচ্চাদের মতো সংলাপ শুনে সায়মা আর পিচ্চি আইরা একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠল।
আইরা তার দুটো হাত কোমরে রেখে একদম পাকা বুড়িদের মতো মাথা নেড়ে বলল—
— "চাচ্চু, মাম্মা ঠিকই বলেছে। তুমি তো সবসময় কাজ থেকে পালাও! শুধু ফাঁকি দাও!"
ইভান এবার নিজের বুকের বাঁ-পাশে হাত চেপে ধরে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল— "উফ! কলিজাটা একদম ঝাঁঝরা হয়ে গেল! এইটুকু একটা দুধের বাচ্চাও আমাকে এভাবে সবার সামনে অপমান করছে! দুনিয়াতে কি জাস্টিস বলে কিচ্ছু নেই?"
সায়মা বরের পাশে বসে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে বলল— "আহা, ও তো অপমান করছে না , একদম খাঁটি সত্যি কথা বলছে।"
ইভান এবার স্ত্রীর দিকে করুণ চোখে তাকাল— "তুমিও সায়মা? নিজের ঘরের লোক হয়ে শত্রুপক্ষের সাথে হাত মেলালে?"
— "হুম, চিরকাল!" সায়মা চোখ টিপল।

...

এদিকে ইনায়া ওপরে নিজের রুমে গিয়ে সারাদিনের সেই ভারী কর্পোরেট ব্লেজার আর ফরমাল পোশাকগুলো বদলে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এল।
তার পরনে এখন অফিসের সেই ডার্ক থিমের বদলে একটা প্যাস্টেল শেডের নরম রঙের কটন শাড়ি, যা সে খুব সাধারণ বাঙালি কায়দায় জড়িয়েছে। অফিসের কড়া করে বাঁধা খোঁপাটা এখন মুক্ত, পিঠ জুড়ে খোলা চুলগুলো আলগা হয়ে ছড়িয়ে আছে। অফিসের সেই ধারাল, আপসহীন আইনজীবীকে এখন আর দূর দূরান্তেও চেনার উপায় নেই। সে এখন পুরোপুরি ঘরোয়া, শান্ত আর মায়াময় এক গৃহবধূ।

ডাইনিং টেবিলে রাতের নাস্তার জন্য ততক্ষণে সবাই এসে আসন গ্রহণ করেছে। শামীমা বেগম নিজ হাতে সবার প্লেটে গরম গরম সিঙ্গারা আর নাস্তা তুলে দিচ্ছেন। জিয়ান ফেং ইনায়াকে চেয়ার টেনে বসতে দেখে তিনি হাসিমুখে স্নেহভরা গলায় বললেন—
— "আজ তোমাকে বড্ড ক্লান্ত লাগছে মা। কাজের চাপ খুব বেশি ছিল?"
ইনায়া শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে মৃদু ও বিনীত হেসে উত্তর দিল— "একটু বাবা। আসলে আজ ল-ফার্মের নতুন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্টদের ফাইনাল ভাইভা আর ওরিয়েন্টেশন সেশন ছিল একসঙ্গে।"
জিয়ান ফেং অভিজ্ঞ মানুষের মতো একটু মাথা নাড়লেন— "হুম, সেটাই স্বাভাবিক। হাজারটা মুখোশের ভিড় থেকে একটা ভালো আর সৎ মানুষ বাছাই করা বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা।"
— "জি বাবা, একদম ঠিক বলেছেন।"

ঠিক তখনই অ্যারিস ওপর থেকে জামা বদলে এসে ইনায়ার ঠিক পাশের চেয়ারটা টেনে বসল। সে বসামাত্রই ইনায়ার মুখের দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। ভালোবাসার তীক্ষ্ণ চোখ তো, এক নজরেই সে বুঝে গেল তার মিসেস আজ আসলেই ভেতরে ভেতরে ভীষণ ক্লান্ত।
সবার অলক্ষ্যে, ডাইনিং টেবিলের নিচে অ্যারিস আলতো করে ইনায়ার কোলের ওপর রাখা হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল। তারপর আলতো করে একটা ভরসার চাপ দিল, যা ইনায়ার সমস্ত ক্লান্তি যেন এক সেকেন্ডে শুষে নিল। খুব ছোট্ট, নিঃশব্দ একটা স্পর্শ। টেবিলের ওপরে থাকা বাকি চারজন মানুষের কেউ সেটা খেয়ালও করল না। শুধু ইনায়া অ্যারিসের দিকে ফিরে তাকাল, তার ক্লান্ত চোখে এক চিলতে মিষ্টি হাসির রেখা ফুটে উঠল। তাদের এই নীরব কথোপকথন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভাষা।
...
ইভান নিজের প্লেটে একটা গরম সিঙ্গারা তুলে নিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল— "তা ভাবি, নতুন কেউ জয়েন করল নাকি এবার?"
— "হ্যাঁ, কয়েকজন করেছে।" ইনায়া চায়ের কাপ হাতে নিল।
— "কেমন বুঝলে এবারের লট?"
ইনায়া এক মুহূর্ত ভাবল, সিভির সেই নামটা—আদি শেখ আর তার ভাইভা বোর্ডের স্পষ্ট কথাগুলো মনে পড়ল। সে শান্ত গলায় বলল— "একজন ছেলেকে আমার ক্রিমিনাল বিভাগে নিয়েছি। একদম ফ্রেশার, নতুন। তবে ছেলেটার লিগ্যাল কনসেপ্ট ভালো আর সবচেয়ে বড় কথা—শেখার আগ্রহ আছে।"

প্রতিদিনই ইনায়ার বিভাগে কত নতুন মানুষ আসে, কেউ কাজের চাপে টিকে থাকে, কেউ আবার দুদিন পর ভয়ে চলে যায়। তাই প্রফেশনাল লাইফের এই অংশটা নিয়ে আলাদা করে গভীরভাবে ভাবার কিছু নেই ইনায়ার কাছে। আদি তার কাছে আর পাঁচটা সাধারণ জুনিয়রের মতোই একজন।
কিন্তু ইভান ইনায়ার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলল—
"যাক বাবা, বাঁচা গেল। তবে ভাবি, প্রথম দিনেই যেন ছেলেটাকে তোমার ওই ডেডলি চাউনি দিয়ে বেশি ভয় দেখিয়ো না। বেচারা ফ্রেশার, এমনিতেই কাঁপবে!"

ইনায়া একদিকের ভ্রু উঁচু করে তাকাল— "আমি মানুষকে ভয় দেখাই? কবে দেখালাম?"
সায়মা আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে বরের কথায় ফোড়ন কেটে বলল— "না না ভাবি, ইভান ভুল বলছে। আপনি একদম ভয় দেখান না... আসলে মানুষ আপনাকে ওই কালো কোট পরে গম্ভীর মুখে হেঁটে আসতে দেখেই এমনি এমনি ভয় পেয়ে যায়!"
সায়মার এই সপাটে মন্তব্যে অ্যারিস শব্দ করে হাসল, আর ইনায়া নিজেও হেসে মাথা নাড়ল।

...
এমন সময় আইরা টেবিলের পাশ থেকে গুটি গুটি পায়ে এসে চুপচাপ মায়ের কাঁধে নিজের ছোট্ট মাথাটা এলিয়ে দিল। তার চোখে তখন ঘুমের আমেজ নামতে শুরু করেছে।
— "মাম্মা..." সে আদুরে সুরে ডাকল।
— "হুম, আমার মা?" ইনায়া মেয়েকে একহাতে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল।
— "আজকে রাতে তুমি কিন্তু সব ফাইল বন্ধ রাখবে। আমাকে একটা পরীর গল্প শুনিয়ে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়াবে, কেমন?"
ইনায়া মেয়ের ছোট্ট নাকে নিজের তর্জনী দিয়ে আলতো একটা টোকা দিয়ে পরম মমতায় বলল— "অবশ্যই মা। আজ মাম্মা শুধু তোমার।"
আইরা খুশিতে মায়ের গালে হাত দিয়ে হাততালি দিয়ে উঠল— "ইয়েহ! লাভ ইউ মাম্মা!"

___
রাত তখন সাড়ে দশটা।
আইরাকে একটা রূপকথার পরীর গল্প শুনিয়ে, কপালে আদুরে চুমু দিয়ে ঘুম পাড়াল ইনায়া। বিছানার চাদরটা মেয়ের গায়ের ওপর ভালো করে টেনে দিয়ে সে ধীর পায়ে, নিঃশব্দে তার ঘরের কাঠের দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল।
ক্লান্ত শরীরে করিডোরে বের হতেই ইনায়ার চোখ গেল ডানদিকের খোলা ব্যালকনিটার দিকে। রাতের ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগছে ঘরের পর্দায়। সে দেখল, ব্যালকনির রেলিং ধরে একলা দাঁড়িয়ে আছে অ্যারিস। তার একহাতে চিনা মাটির কফির মগ, যেখান থেকে হালকা ধোঁয়া উড়ছে। অন্য হাতটা ট্রাউজারের পকেটে গোঁজা। রাতের আকাশের হালকা চাঁদের আলো আর দূরের ঢাকা শহরের নিয়ন বাতির আলো এসে পড়েছে তার সুপুরুষ অবয়বের ওপর।
ইনায়া কোনো শব্দ না করে বিড়ালের মতো পায়ে হেঁটে গিয়ে ঠিক তার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। রাতের মৃদু হাওয়া তার খোলা চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছিল। সে শহরের আলোর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—
— "এত রাতে একা একা কফির মগ হাতে কী ভাবছ?"
অ্যারিস কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু পাশ ফিরে ইনায়ার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই গভীর, কালো মণি দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে রইল ইনায়ার মায়াবী মুখের ওপর।
পরের মুহূর্তেই, অ্যারিস নিজের মুক্ত হাত বাড়িয়ে ইনায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের একদম কাছে টেনে নিল। কফির হালকা সুবাস আর অ্যারিসের শরীরের চেনা ওম ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল।
— "তোমাকে ভাবছি।" অ্যারিসের গলার স্বর রাতের বাতাসের মতোই নিচু আর নিবিড়।
ইনায়া অ্যারিসের বুকের ওপর নিজের দুহাত রেখে মৃদু হেসে বলল— "সারাদিন আমাকে নিয়ে ভাবতে হয়?"
— "অফিসে তো কাজের ফাইল আর বোর্ডের মানুষজন থাকে। আমি আমার মিসেস-কে সারাদিন চোখের সামনে দেখিনি।"
— "কেন? আজ দুপুরে ওই যে কড়া পাহারা দিয়ে ভিডিও কলে দেখলে?"
— "ওটা তো স্ক্রিনে দেখা, ওভাবে মন ভরে না। ওটা হিসেবে গুনে লাভ নেই।" অ্যারিস মুখ বাঁকাল।

ইনায়া তার এই বাচ্চাদের মতো যুক্তির ধরন দেখে মাথা নেড়ে হেসে ফেলল— "তুমি না বিয়ের এতগুলো বছর পরও একদমই বদলাওনি।"
অ্যারিস তার একহাতের আঙুল দিয়ে ইনায়ার কপালে আর চোখের ওপর নেমে আসা অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার চোখ দুটো নমনীয় হয়ে এল।
— "আমি বদলাতে চাইও না ইনায়া। কারণ আমার এই চোখ দুটো এখনও তোমাকে ঠিক প্রথম দিনের মতোই দেখে। সেই একই মুগ্ধতা নিয়ে।"
ইনায়া পলকহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অ্যারিসের চোখের সেই চেনা গভীরতা, সেই তীব্র অধিকারবোধ আর নিঃশর্ত ভালোবাসার জোয়ারে সে যেন নিমেষেই তলিয়ে যাচ্ছিল।
অ্যারিস হঠাৎ কফির মগটা পাশের টেবিলে রেখে ইনায়ার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল— "তবে একটা ব্যাপারে আমার খুব আপত্তি আছে।"
— "কী ব্যাপারে?"
— "তুমি যখন কাজ করো..." অ্যারিস একটু থামল।
— "হুম? কী হয় তখন?"
— "তখন আমার বড্ড হিংসে হয়।"
ইনায়া অবাক হয়ে অ্যারিসের চোখের দিকে তাকাল— "কাজের ওপরও কেউ হিংসে করে নাকি?"
অ্যারিস একদম গম্ভীর, পাথুরে মুখ করে বলল— "করে। তীব্র হিংসে হয়।"
— "কার হয় শুনি?" ইনায়া হাসল।
— "আমার হয়।"

অ্যারিস ইনায়ার দুটো হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে পুরে নিল। তার গলায় এবার মেঘলা অভিমান ঝরে পড়ল— "সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দুনিয়ার সব মানুষ তোমার সময় পায়। ক্লায়েন্টরা পায়, কোর্টের জাজ পায়, নতুন জুনিয়ররা পায়..." সে একটু থেমে ইনায়ার চোখের দিকে চাইল, "আর আমি? আমি পাই কেবল দিনের শেষে, যখন তুমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।"
অ্যারিসের এই ভালোবাসামাখা অভিমান দেখে ইনায়ার বুকের ভেতরের সমস্ত কাঠিন্য মুহূর্তের মধ্যে গলে জল হয়ে গেল। তার চোখ দুটো মায়ায় আর্দ্র হয়ে এল। সে নিজের একটা হাত মুক্ত করে অ্যারিসের দাড়ি কামানো মসৃণ গালে রাখল। তার বুড়ো আঙুল দিয়ে অ্যারিসের গালটা ছুঁয়ে নিশ্চিত স্বরে বলল—
— "তুমি তো খুব ভালো করেই জানো অ্যারিস... সারাদিন আমি যে প্রান্তেই থাকি না কেন, দিনের শেষে আমার ফেরার আসল ঠিকানাটা কোথায়?"
অ্যারিস চুপ করে রইল, তার চোখ ইনায়ার ঠোঁটের দিকে।
— "তোমার কাছেই। আমার সব রাস্তা তো তোমার বুকেই এসে শেষ হয়।"
খুব সাধারণ কয়েকটা শব্দ। কিন্তু এর ভেতরের গভীরতা অ্যারিসের মুখের সমস্ত মেঘলা অভিমানকে এক পলকে রোদের মতো উড়িয়ে দিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে ইনায়াকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে তার কপালে একটি দীর্ঘ, উষ্ণ আর স্নেহভরা চুমু আঁকল।
— "এই একটা কারণেই তো আমি তোমাকে আমার জীবন থেকে কোথাও হারাতে দিতে চাই না।"
ইনায়া অ্যারিসের চওড়া, শক্ত বুকে নিজের মাথাটা রাখল। তার চেনা পারফিউমের গন্ধটা বুক ভরে টেনে নিয়ে বলল— "আমি তো কোথাও যাচ্ছি না। চিরকাল এখানেই আছি।"
অ্যারিস বাহুডোর আরও একটু শক্ত করে তাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল— "যেও না কখনো। এভাবেই থেকো।"
ইনায়া চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে মৃদু স্বরে বলল— "ইনশাআল্লাহ... আমাদের এই পৃথিবীটা এভাবেই সুন্দর থাকবে।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন