ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 15

লেখক: F. Tabassum

সকাল ঠিক আটটা পঞ্চান্ন।
'Prime Legal Partners'-এর বিশাল কাঁচঘেরা কর্পোরেট অফিসের ভেতরের পরিবেশটা তখন কেবল চনমনে হতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ কর্মী তখনও পুরোপুরি নিজেদের ডেস্কে গিয়ে বসেনি। কেউ ল্যাপটপের পাওয়ার বাটন অন করছে, কেউ আবার সকালের ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে নিয়ে সহকর্মীদের সাথে আজকের কাজের তালিকা নিয়ে টুকটাক আলাপ করছে।
কিন্তু এই চেনা অলস সকালের মাঝেও একজন মানুষ ইতোমধ্যেই নিজের নির্দিষ্ট ডেস্কে একদম সোজা হয়ে বসে পড়েছে।
সে আদি শেখ।
আজ তার স্বপ্নের সেই চাকরির প্রথম দিন। আর তাই কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে, নির্ধারিত সময়েরও প্রায় আধা ঘণ্টা আগে সে অফিসে চলে এসেছে। তার ডেস্কটা খুব বেশি বড় নয়, তবে বেশ গোছানো। একটা নতুন ডেস্কটপ কম্পিউটার, কিছু প্রয়োজনীয় স্টেশনারি আর একপাশে রাখা নতুন কর্মীদের জন্য বরাদ্দকৃত চকচকে পরিচয়পত্র—যেখানে বড় অক্ষরে লেখা 'Adi Sheikh, Junior Associate'।
আদি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বুক ভরে এক লহমা শ্বাস নিল। মনে মনে কৃতজ্ঞতায় বলল—
— "আলহামদুলিল্লাহ..."
টানাটানির মধ্যবিত্ত সংসারের শত কষ্টের পর, এটাই তার জীবনের প্রথম নিজের অফিস, নিজের উপার্জনের প্রথম ধাপ।
ঠিক তখনই নীল শার্ট পরা একজন মাঝবয়সী সিনিয়র স্টাফ হাসিমুখে তার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন—
— "আপনিই কি আদি? নতুন জয়েন করেছেন?"
আদি বিনীতভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বলল— "জি, ভাই। আমিই আদি শেখ।"
— "আমি রুবেল, এই ফার্মের অ্যাডমিন সেকশনে আছি। আজ থেকে কিছুদিন আপনাকে অফিসের টুকটাক নিয়মকানুন আর ফাইল প্রসেসিংগুলো বুঝিয়ে দেব।"
— "অনেক ধন্যবাদ, রুবেল ভাই। আপনার সাহায্য আমার খুব কাজে আসবে।"
রুবেল ভাই চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে গলাটা সামান্য নিচু করে হেসে বললেন— "সব তো বুঝবেনই আদি সাহেব, তবে একটা গোল্ডেন রুল আগে থেকেই মাথায় ঢুকিয়ে রাখুন।"
— "জি বলুন?" আদি উৎসুক হলো।
— "আমাদের ম্যাম, মানে ব্যারিস্টার ইনায়া ফেং... সময়ের ব্যাপারে কিন্তু মারাত্মক সচেতন। উনার ডিকশনারিতে 'দেরি' বলে কোনো শব্দ নেই। উনার সাথে টিকে থাকতে হলে ঘড়ির কাটার সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে হবে।"
আদি মৃদু ও আত্মবিশ্বাসী হেসে উত্তর দিল— "ইনশাআল্লাহ ভাই, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।"
— "এখানে চেষ্টা শব্দটা খাটে না ভাই, এটাকে একদম নিজের রক্তে মিশিয়ে অভ্যাস করে ফেলুন।" রুবেল ভাই চোখ টিপলেন। দুজনেই হালকা করে হেসে ফেলল।
...
ঠিক নয়টা বাজতে চার মিনিট বাকি।
হুট করেই লিফটের দরজাটা খুলে গেল এবং করিডোরে পা রাখতেই পুরো ফ্লোরের কর্মচারীরা যে যার জায়গায় একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। চারপাশের ফিসফিসানি এক নিমেষে গায়েব।
— "Good Morning, Ma'am."
ইনায়া অত্যন্ত দ্রুত ও মাপা পায়ে ফ্লোরের ভেতর দিয়ে হেঁটে ঢুকছিল। আজ তার পরনে একটা ডার্ক ফরমাল স্যুট। ডানহাতে বেশ কয়েকটি ভারী কেস ফাইল। তার ঠিক এক কদম পেছনে ট্যাবলয়েড হাতে হাঁটছে তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট।
ইনায়া ডানে-বামে না তাকিয়ে শুধু হালকা মাথা নেড়ে সবার অভিবাদনের উত্তর দিল— "Good Morning."
হাঁটতে হাঁটতেই তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া গিয়ে পড়ল কর্নারের নতুন ডেস্কটার ওপর। আদি ইতোমধ্যে সাথে নিজের জায়গায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
— "Good Morning, Ma'am." আদির গলাটা নার্ভাসনেসের কারণে সামান্য কাঁপল।
ইনায়া মাঝপথে নিজের হাঁটার গতি এক সেকেন্ডের জন্য কমিয়ে আদির দিকে তাকাল। তার চোখের সেই গম্ভীর চাউনি আদির মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল। ইনায়া শান্ত গলায় বলল—
— "Good Morning, মিস্টার আদি. আজ আপনার প্রথম দিন, তাই তো?"
— "জি, ম্যাম।"
— "ভালো। ঠিক নয়টায় আমার কেবিনে আসবেন।"
— "জি ম্যাম, অবশ্যই।"
ইনায়া সোজা নিজের বিশাল এক্সিকিউটিভ কেবিনের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে চলে গেল।
...
ঘড়ির কাঁটা ঠিক নয়টা ছুঁতেই আদি নিজের ফাইল আর ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ইনায়ার কেবিনের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা তখন ধুকপুক করছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে দরজায় দু'বার হালকা নক করল।
ভেতর থেকে সেই অতি চেনা, গম্ভীর ও শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
— "কাম ইন."
আদি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ইনায়া তখন মনোযোগ দিয়ে একটি পুরনো কেস ফাইল পড়ছিল। সে আদির দিকে চোখ না তুলেই পেনসিলটা হাতে নিয়ে বলল—
— "আপনি একদম সময়মতো এসেছেন, মিস্টার আদি। আই অ্যাপ্রিশিয়েট দ্যাট।"
আদি বিনীতভাবে মৃদু হেসে উত্তর দিল— "আসলে ম্যাম, আমি সময়ের একটু আগেই এসে প্রিপারেশন নেওয়ার চেষ্টা করেছি।"
এবার ইনায়া নিজের ফাইল থেকে চোখ তুলে সরাসরি আদির চোখের দিকে তাকাল। তার সেই কঠোর ঠোঁটের কোণে খুব হালকা, প্রায় অদৃশ্য এক সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠল।
— "চমৎকার। যারা সময়কে এবং নিজের কাজকে গুরুত্ব দিতে জানে, তাদের সঙ্গে কাজ করতে আমার বড্ড সুবিধা হয়।"
সে টেবিলের ওপর রাখা একটা বেশ মোটা, হলদেটে ফাইল আদির দিকে বাড়িয়ে দিল— "দিস ইজ ইওর ফার্স্ট অ্যাসাইনমেন্ট।"
আদি দুই হাত বাড়িয়ে ভারী ফাইলটা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিল। ফাইলের কভারে কালো কালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
State vs. Rahman
ইনায়া চেয়ারে হেলান দিয়ে ডেস্কে হাত রেখে বলল— "আজ আপনার একমাত্র কাজ হলো এই পুরো ফাইলটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়া। তারপর লাঞ্চের পর আমার কাছে এসে এই কেস সম্পর্কে আপনার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ কী, সেটা আমাকে জানাবেন।"
আদি নিজের ভেতরের সমস্ত নার্ভাসনেস ঝেড়ে ফেলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা নাড়ল— "জি, ম্যাম। আমি খুব ভালো করে দেখে নেব।"
— "মনে রাখবেন মিস্টার আদি, আমি কিন্তু আপনার মুখে কোনো মুখস্থ বিদ্যা বা আইনের বইয়ের ধরাবাঁধা ভাষা শুনতে চাই না। এই কেসটার গভীরে গিয়ে আপনি একজন আইনজীবী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে কী বুঝেছেন, আমি ঠিক সেটাই শুনতে চাই। ইউ মে গো নাও।"
— "বুঝেছি ম্যাম।"
ফাইলটা নিজের বুকের সাথে শক্ত করে আগলে ধরে আদি কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ইনায়া আবারও কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের পেনসিল হাতে মূল কাজে ডুবে গেল।
...
কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে আদি নিজের ডেস্কে বসল। সামনে রাখা সেই মোটা ফাইলটার দিকে সে এক পলক তাকাল।
State vs. Rahman.
সে বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে ফাইলের প্রথম পাতাটা উলটাল। পুলিশের দেওয়া প্রথম চার্জশিট... প্রধান প্রধান সাক্ষীদের জবানবন্দি... ময়নাতদন্তের ফরেনসিক রিপোর্ট... এবং সবশেষে ক্রাইম সিনের কিছু রোমহর্ষক ও ঝাপসা ছবি।
আদির পুরো মনোযোগ যেন চারপাশের চেনা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তার পাশ দিয়ে অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মচারী হেঁটে গেল, রুবেল ভাই কফির মগ হাতে ইশারা করলেন, কিন্তু আদি একবারের জন্যও নিজের মাথা তুলল না। নতুন অফিস, সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশ—তবুও তার মস্তিস্ক এখন পুরোপুরি এই জটিল কেসের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে।
...
প্রায় এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। আদি একটা ছোট নোটপ্যাডে কলম দিয়ে নিজের তৈরি করা পর্যবেক্ষণগুলো পয়েন্ট আকারে লিখছিল। ঠিক তখনই পাশের ডেস্ক থেকে ফাইল হাতে একজন সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট অ্যাডভোকেট তার দিকে এগিয়ে এলেন।
— "তুমিই কি নতুন জুনিয়র অ্যাসোসিয়েট?" ভদ্রলোক হাসলেন।
আদি সৌজন্যতাবশত দ্রুত উঠে দাঁড়াল— "জি, ভাই। আজই প্রথম জয়েন করেছি।"
— "বসো বসো। আমি অ্যাডভোকেট মাহিন। এই ফার্মের সিনিয়র ক্রিমিনাল উইংয়ে আছি।"
— "আমি আদি শেখ, ভাই।" আদি নিজের পরিচয় দিল।
মাহিন আদির টেবিলের ওপর রাখা সেই মোটা ফাইলটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন— "আরেহ! প্রথম দিনেই তোমাকে সরাসরি কেস অ্যানালাইসিসের ফাইল ধরিয়ে দিয়েছেন?"
— "জি ভাই। ম্যাম বললেন এটা পড়ে ওনার কাছে অবজারভেশন জমা দিতে।"
মাহিন এবার চেয়ারে ভর দিয়ে একটু নিচু হয়ে বললেন— "তাহলে আদি, তুমি নিজেকে লাকি ভাবতে পারো। ইনায়া কিন্তু সাধারণত নতুন কাউকে প্রথম দিনেই কোনো রিয়েল কেস অ্যানালাইসিস করতে দেয় না। আগে কয়েকদিন ওরিয়েন্টেশন করায়।"
আদি কিছুটা অবাক হয়ে নিজের ফাইলটার দিকে তাকাল— "তাই নাকি ভাই? আমি তো জানতাম না।"
— "হুম। তবে এর একটা অন্য মানেও আছে। ইনায়া প্রথম দিনেই তোমার মেধা আর ধৈর্য পরীক্ষা করছে। কাজে সামান্য ভুল হলে কিন্তু ও কাউকে এক চুলও ছাড় দেয় না। ওর পারফেকশনিজমের কাছে কোনো ওজুহাত খাটে না।"
আদি দৃঢ়তার সাথে হেসে বলল— "আমি আমার সেরাটা দিয়ে ভুল না করারই চেষ্টা করব, মাহিন ভাই।"
...
ঘড়িতে তখন দুপুরের একটু আগে, প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে।
আদি তখনও ফাইলের প্রতিটি লাইনের ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে ডুবে আছে। হঠাৎ করেই তার চোখ একটা অদ্ভুত অসঙ্গতির ওপর গিয়ে আটকে গেল। তার ভ্রু দুটো মুহূর্তের মধ্যে কুঁচকে শক্ত হয়ে গেল।
সে পাতা উলটে আবার ফরেনসিক রিপোর্টটা খুলল। তারপর তার সাথে মেলালো এক নম্বর প্রধান সাক্ষীর জবানবন্দি। সবশেষে সে ক্রাইম সিনের সেই রক্তাক্ত ছবিটা আলোর নিচে এনে ধরল।
কয়েক মিনিট ধরে সে এই তিনটা ভিন্ন ডকুমেন্ট পাশাপাশি রেখে একটার সাথে অন্যটা মিলিয়ে দেখতে লাগল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে নিজের অজান্তেই নিচু স্বরে স্বগতোক্তি করে উঠল—
— "না... কিছু একটা বড় রকমের গড়মিল আছে এখানে। এই তিনটা কাগজের লজিক কোনোভাবেই একসাথে মিলছে না!"
ঠিক তখনই তার টেবিলের ওপর রাখা কালো ইন্টারকমের বেলটা বেজে উঠল। আদি চমকে উঠে রিসিভারটা কানে তুলল। ওপাশ থেকে রুবেল ভাইয়ের তাড়াহুড়ো মাখানো কণ্ঠ শোনা গেল—
— "মিস্টার আদি? আপনি কি ডেস্কে আছেন?"
— "জি, রুবেল ভাই। আছি।"
— "ম্যাম আপনাকে এখনই উনার কেবিনে ডাকছেন। ফাইলটা সাথে নিয়ে জলদি আসুন।"
আদি দ্রুত নোটপ্যাডটাও পকেটে পুরল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা নিয়ে, একটা দীর্ঘ ও গভীর শ্বাস ফেলে সে ব্যারিস্টার ইনায়া ফেং-এর সেই শান্ত কেবিনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

আদি কেবিনের কাঠের ভারী দরজাটার সামনে এসে এক মুহূর্ত স্থির হলো। বুকের ভেতর উথালপাথাল করা উত্তেজনাটাকে শান্ত করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে হালকা করে দু'বার নক করল।
— "কাম ইন."
ভেতর থেকে সেই চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই আদি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ইনায়া তখন ল্যাপটপের স্ক্রিনে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ লিগ্যাল ড্রাফট দেখছিল। টেবিলের একপাশে আরও কয়েকটি মোশন কেস ফাইল স্তূপ করে রাখা।
ইনায়া একবার চোখ তুলে তাকাল।
— "বসুন, মিস্টার আদি."
— "জি, ম্যাম। ধন্যবাদ।"
আদি সামনের চেয়ারটায় বসল। হাতের সেই মোটা ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখতেই ইনায়া ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল—
— "পুরো ফাইলটা লাইন বাই লাইন পড়া শেষ?"
— "জি ম্যাম, শেষ।"
— "তাহলে বলুন... এই কেসে আপনার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ কী?"
আদি কয়েক সেকেন্ড নিজের চিন্তাভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নিল। তারপর  ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল— "ম্যাম, প্রথম দেখায় চার্জশিটটা পড়লে মনে হবে এটা খুব সাধারণ একটা ওপেন-অ্যান্ড-শাট মার্ডার কেস। কিন্তু পুরো ফাইলটা মন দিয়ে খুঁটিয়ে পড়ার পর আমার মনে হয়েছে... পুলিশের মূল তদন্তে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় সম্পূর্ণ বাদ পড়ে গেছে।"
ইনায়া কোনো মন্তব্য করল না, তার শান্ত চোখ জোড়া স্থির হয়ে রইল আদির মুখের ওপর।
— "কোন বিষয়ের কথা বলছেন?"
আদি ফাইলটা খুলে ভেতরের কয়েকটি দাগানো কাগজ ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিল— "ম্যাম, এটা হলো ভিকটিমের ফরেনসিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। এখানে ডাক্তার পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুর সম্ভাব্য সময় ছিল ঘটনার দিন রাত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে।"
সে নোটপ্যাডের পাতা উলটে আরেকটি বয়ান বের করল— "কিন্তু এই কেসের এক নম্বর প্রধান সাক্ষী পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি নাকি রাত সাড়ে নয়টার দিকেই ভিকটিমের ঘর থেকে তীব্র চিৎকার শুনেছেন।"

আদির ক্রাইম সিনের একটা গ্লসি ছবি আলোর নিচে ধরল— "আর ম্যাম, এই ঘটনাস্থলের ছবিতে ভিকটিমের ঠিক পেছনে দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির সময়টাও ভালো করে খেয়াল করুন—সেখানেও কিন্তু কাঁটা প্রায় সাড়ে নয়টা দেখাচ্ছে। আঘাতের তীব্রতায় ঘড়িটা তখনই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।"
সে একটু থামল। ইনায়ার চোখে চোখ রেখে বলল— "এই তিনটা প্রধান তথ্য একে অপরের সঙ্গে কোনোভাবেই মিলছে না, ম্যাম। টাইমিংয়ে একটা বড় গ্যাপ আছে।"
ইনায়া এবার ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিল। তার আঙুলগুলো দিয়ে এক এক করে কাগজগুলো উলটে দেখল। ছবিটা চোখের আরও কাছে এনে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর খুব ধীরে ধীরে চোখ তুলে আদির দিকে তাকাল— "আর কিছু নোটিস করেছেন?"
আদি মাথা নাড়ল— "জি ম্যাম, আরও একটা ব্যাপার আছে।"
সে তার ব্যক্তিগত নোটপ্যাডটা খুলে বলল— "তদন্ত কর্মকর্তার প্রাথমিক ডায়েরি রিপোর্টে পাশের একটা কনফেকশনারি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজের কথা স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, মূল কেস ফাইলের ডকে তার কোনো ট্রান্সক্রিপ্ট সংযুক্ত নেই।"
— "তাতে আপনার চূড়ান্ত ধারণা কী?" ইনায়ার গলা এবার আরও গম্ভীর।
— "আমার মনে হয়, ওই সিসিটিভি ফুটেজটা যদি উদ্ধার করা যায়, তবে হয়তো জানা যাবে রাত সাড়ে নয়টা থেকে সাড়ে দশটার সেই রহস্যময় এক ঘণ্টায় ক্রাইম সিনের আশেপাশে আসলে কে বা কারা উপস্থিত ছিল।"

ইনায়া নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। তার পাথুরে মুখে কোনো ভালো বা মন্দের অভিব্যক্তি নেই। আদি নিজের চেয়ারে বসে ঘামতে লাগল—সে বুঝতে পারছে না তার এই প্রথম দিনের ওকালতি ম্যামের পছন্দ হয়েছে, নাকি সে ভুল কিছু বলে ফেলেছে।
হুট করেই ইনায়া ফাইলটা বন্ধ করল। ঠোঁটের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা টেনে বলল—
— "ভালো।"
মাত্র একটা শব্দ। কিন্তু সেই একটি শব্দেই আদির বুকের ওপর চেপে থাকা মস্ত বড় পাথরের বোঝাটা যেন হালকা হয়ে গেল।
ইনায়া শান্ত কণ্ঠে বলল— "আপনি শুধু কাগজের লেখাগুলো পড়েননি মিস্টার আদি, আপনি কাগজের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য সত্যটাকেও দেখার চেষ্টা করেছেন। একজন ভালো ক্রিমিনাল লইয়ারের প্রথম গুণই হলো এটা।"
আদি বিনীতভাবে মাথা নিচু করে বলল— "অনেক ধন্যবাদ, ম্যাম।"
— "তবে একটা কঠিন বাস্তব কথা সবসময় মনে রাখবেন।"
— "জি ম্যাম?"
— "কাগজের ওপর বসে কোনো বিষয়ে সন্দেহ করা খুব সহজ। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিপক্ষের আইনজীবীর সামনে সেই সন্দেহটাকে প্রমাণ দিয়ে এস্টাবলিশ করাটা ঠিক ততটাই কঠিন।"
— "জি ম্যাম, আমি মনে রাখব।"
ইনায়া ডেস্কের ওপর নিজের কলম দিয়ে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল— "আজ ঠিক দুপুর দুইটায় আমরা এই কেসের মূল তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে একটা ক্লোজ-ডোর মিটিং করব।"
আদি অবাক হয়ে তাকাল— "মিটিং?"
— "হ্যাঁ। এবং সেই মিটিংয়ে আপনিও আমার সাথে বসবেন।"
— "আমি?" আদির চোখ জোড়া বিশ্বাস করতে পারল না, "কিন্তু ম্যাম... আমি তো একদম নতুন, আজই আমার প্রথম দিন..."
ইনায়া হাত তুলে তার কথা শেষ করতে দিল না। — "নতুন হওয়াটা কোনো অপরাধ বা সমস্যা নয়। যদি শেখার আর লড়ার খাঁটি ইচ্ছা থাকে, তবে প্রথম দিন থেকেই ময়দানে নেমে কাজ শুরু করতে হবে। যান, প্রিপারেশন নিন।"

আদির চোখে ম্যামের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা আর সম্মানের ঝিলিক ফুটে উঠল। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল— "আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে কেসটা ডিফেন্ড করার চেষ্টা করব, ম্যাম।"
ইনায়া মাথা নাড়ল— "ঠিক আছে। এখন ডেস্কে যান। দুপুর দুইটার মধ্যে মিটিং রুমে ফাইলসহ রেডি থাকবেন। আর তার আগে এই কেসের সঙ্গে সম্পর্কিত দণ্ডবিধির আইনের ধারাগুলো আরেকবার রিভিশন দিয়ে নেবেন।"
— "জি, ম্যাম।"
আদি কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইনায়া কয়েক মুহূর্ত সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, ভাইভা বোর্ডে এই ছেলেটাকে চিনে নিতে সে আসলেই কোনো ভুল করেনি। সে আবার কেস ফাইলটা খুলে আদির দেখানো সেই তিনটি অসঙ্গতি নতুন করে নিজের ডায়েরিতে নোট করতে শুরু করল।

...
এভাবেই দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল।
'Prime Legal Partners'-এর চেনা কর্পোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে আদি শেখ মানিয়ে নিতে শুরু করল। প্রথম দিন যে ছেলেটা ম্যামের সামনে কথা বলতে গিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ভুগত, এখন সে ইনায়ার চোখের ইশারা আর কাজের নির্দেশ বুঝে চোখের পলকে আউটপুট দিতে শিখে গেছে।
কোর্টের পরবর্তী ডেটের ফাইলগুলো সাজানো... বিপক্ষের লয়ারদের পুরোনো জাজমেন্টের রেফারেন্স লাইব্রেরি থেকে খুঁজে বের করা... সাক্ষীদের আগের বিবৃতির সাথে বর্তমান জবানবন্দি মিলিয়ে দেখা...
প্রতিটা কাজই আদি নিজের সবটুকু মনোযোগ দিয়ে করতে লাগল। ইনায়াও আড়াল থেকে জুনিয়রের এই নিষ্ঠা লক্ষ্য করছিলেন। তিনি সহজে অকারণে কারও প্রশংসা করার মানুষ নন, তবে প্রফেশনাল লাইফে কাজের মাধ্যমেই তিনি তার ভরসা প্রকাশ করতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ ছোট ছোট দায়িত্বগুলো আদির কাঁধে সঁপে দিতে লাগলেন।
কোনোদিন সকালে কেবিনে ডেকে বলতেন— "মিস্টার. আদি, এই মার্ডার কেসের একটা নিখুঁত টাইমলাইন চার্ট তৈরি করুন।"
আরেকদিন বলতেন— "এই প্রধান সাক্ষীর আগের সবকটা স্টেটমেন্টের কপি বের করুন।"
আবার কখনো বলতেন— "আগামীকালের শুনানির জন্য মূল ড্রাফট ফাইলগুলো আমার ডেস্কে প্রস্তুত রাখবেন।"

প্রতিবারই আদি রাত জেগে হলেও একদম নির্ভুলভাবে কাজ শেষ করে ম্যামের টেবিলে জমা দিত। আর তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে ব্যারিস্টার ইনায়া ফেং-এর একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে উঠল।

অন্যদিকে—
Feng Group (হেড অফিস)
সায়মা ফেং ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেক্সটাইল ডিপার্টমেন্টে ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে ইভানের দৈনন্দিন আচরণ যেন পুরো একশো আশি ডিগ্রি বদলে গেছে!
যে মানুষটাকে আগে বিছানা থেকে টেনে তুলতে পুরো পরিবারের যুদ্ধ করতে হতো, যে প্রতিদিন সকাল নয়টার আগে অফিসে আসার কথা ভাবতেই পারত না—সে এখন নিজেই সবার আগে সম্পূর্ণ পরিপাটি হয়ে অফিসে এসে হাজির হয়।

আজ সকালে—
অ্যারিস নিজের কেবিনে ঢুকেই প্রথমে রিস্টওয়াচের দিকে তাকাল। ঘড়িতে তখন সকাল আটটা পঞ্চান্ন। তারপর সে যখন তার কেবিনের কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরের ওপেন ফ্লোরের দিকে চোখ রাখল, তার ঠোঁটের কোণে একটা গভীর ও মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
ইভান ইতোমধ্যেই নিজের ডেস্কে বসে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মারাত্মক এক কাজের ভান করে বসে আছে!
অ্যারিস নিজের টেবিলের ইন্টারকম তুলে সরাসরি এইচআর ম্যানেজারকে ডায়াল করল— "মিস্টার খান, ইভান আজ কখন অফিসে ইন করেছে?"
ওপাশ থেকে অবাক হওয়া উত্তর এল— "স্যার, মিস্টার ইভান আজ সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই পাঞ্চ করেছেন। আপনারও আগে এসেছেন উনি!"
অ্যারিস হাসতে হাসতে ইন্টারকমটা রেখে দিয়ে নিজের মনেই বলল— "বাহ... আমার লাইফ ম্যানেজমেন্টের প্ল্যানটা তো দেখছি ম্যাজিকের মতো কাজ করছে!"

ঠিক তখনই কাঁচের ওপাশে একটা দৃশ্য অ্যারিসের চোখে পড়ল। ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের কর্নারে সায়মা তার টিমের কয়েকজন সিনিয়র ডিজাইনারের সাথে একটা নতুন স্কেচ নিয়ে বেশ সিরিয়াস আলোচনা করছে। আর ইভান নিজের ডেস্কে ফাইলের আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখলেও... তার চোখ দুটো বারবার ফাইল ফাঁকি দিয়ে সায়মার সেই মুখের ওপরেই গিয়ে আছড়ে পড়ছে। সায়মা একটু হাসলেই ইভানের মুখেও বোকা বোকা হাসি ফুটে উঠছে।
অ্যারিস নিজের ফাইলটা খুলতে খুলতে মাথা নেড়ে মনে মনে বলল— "বিয়ে করলে মানুষ কত দ্রুত সুধরে যায়, ইভানকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 15 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন