অ্যারিস এবার নিজের বউয়ের এই অদ্ভুত ফ্যাশন আর ইমেজ সচেতনতা দেখে জোরে হেসে ফেলে বলল— "তোমার থিংকিং প্রসেস আর ফোকাসটা সত্যিই এই দুনিয়ার বাকি সব আইনজীবীদের চেয়ে একেবারে আলাদা, ইনায়া!"
ইনায়া বালিশে পুরোপুরি হেলান দিয়ে সিরিয়াস মুখে বলল— "খবর করবে করুক, ওটা ওনাদের রাইট। কিন্তু ওনাদের মনে রাখা উচিত বিচারপতি আফরিন সুলতানা এই দেশের একটা ব্র্যান্ড। ওনার ছবিটা তো অন্তত স্ট্যান্ডার্ড দেওয়া উচিত ছিল!"
তবে এই হালকা খুনসুটির পরই ইনায়া ফোনটা আবার নিজের হাতে শক্ত করে ধরে সোজা হয়ে বসল। সে ধীরে ধীরে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পুরো সংবাদের ভেতরের প্রতিটি লাইন, আশরাফ শাহের কোটেশন আর সোর্সগুলোর নাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করল।
কয়েক মুহূর্ত পর পুরো খবরটা পড়া শেষ করে সে ফোনটা বিছানায় নামিয়ে রেখে অ্যারিসের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো তখন এক অজানা আইনি ঝড়ের আশঙ্কায় চকমক করছে। সে গম্ভীর ও থমথমে গলায় বলল—
— "এই আশরাফ শাহ লোকটা... বিগত এতগুলো বছর ধরে সম্পূর্ণ আড়ালে, চুপচাপ বসে ছিল। কোনো রা কাড়েনি। কিন্তু হঠাৎ আজ এই সকালেই ও সুপরিকল্পিতভাবে মিডিয়া ডেকে আম্মুর বিরুদ্ধে এত বড় খুনের অভিযোগ কেন আনতে গেল? এর পেছনে আসল মাস্টারমাইন্ডটা কে, অ্যারিস?"
অ্যারিসের চোখের মড়কেও তখন ঠিক একই গভীর ও রহস্যময় প্রশ্ন চিহ্নের কালো ছায়া।
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর কম্বলটা গা থেকে সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল— "চলো।"
অ্যারিস একদিকের ভ্রু তুলল— "কোথায়?"
— "আম্মুর বাসা থেকে ঘুরে আসি। এমন একটা বিস্ফোরক নিউজ পোর্টালগুলোতে বের হয়েছে, ওনারা এখন কী অবস্থায় আছেন, আম্মুর মাইন্ডসেট কেমন—একবার নিজের চোখে গিয়ে দেখে আসা দরকার।"
অ্যারিস ইনায়ার সিদ্ধান্তের যুক্তি বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল— "ঠিক আছে, চলো।"
ইনায়া দ্রুত বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে এলো। যেহেতু দুই বাড়ি একদম পাশাপাশি তাই বিশেষ কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হলো না। বাসার সবাই মিলে রহমান ভিলার দিকে এগিয়ে গেলো
কিন্তু ইনায়া দরজার সামনে গিয়ে কলিংবেলে হাত দেওয়ার আগেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে গেল। 'আলো' ইনায়াদের দেখতে পেয়ে বেশ অবাক হয়ে বলে উঠল— "আরে আফামনি! অ্যারিস ভাই! আপনারা এত সকালে?"
ইনায়া মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল— "আম্মু কোথায় আন্টি?"
— "সবাই ড্রয়িংরুমে আছেন গো আফামনি।"
সবাই একসঙ্গেই ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই যে দৃশ্যটা ইনায়ার চোখে পড়ল, তাতে সে নিজেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
ড্রয়িংরুমের সেন্ট্রাল সোফায় পাশাপাশি বসে আছেন আফরিন সুলতানা, আনিসুর রহমান, সুবা আর সোফায় পা দুলিয়ে খেলা করা ছোট্ট সিয়ান। সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা মার্বেল টপ ট্যাবলেটে সেই অনলাইন পোর্টালের ব্রেকিং নিউজটাই খোলা রয়েছে।
কিন্তু... ঘরের আবহাওয়ায় বিন্দুমাত্র আতঙ্কের ছায়া নেই! বরং পুরো ঘর জুড়ে আনন্দময় আড্ডার হাওয়া বইছে, সবাই যেন হাসিতে গড়িয়ে পড়ছে!
আফরিন সুলতানা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে ফুটে থাকা সেই ছবিটার দিকে নিজের অনামিকা আঙুলটা দেখিয়ে হেসে বললেন— "দেখেছো? এত বছরের জাজের ক্যারিয়ারে আমার সবচেয়ে বাজে ছবি বোধহয় এটাই!"
আনিসুর রহমান হো হো করে হেসে বললেন— "আমি তো নিউজ স্ক্রল করার সময় প্রথমে চিনতেই পারিনি! ভেবেছিলাম অন্য কারোর খবর!"
সুবা সোফার কুশনটা কোলে চেপে ধরে হাসতে হাসতে যোগ করল— "মা, এই ছবিটা ওনারা কোন পুরোনো ফাইল থেকে উদ্ধার করেছে বলো তো? দেখে মনে হচ্ছে সকালে ঘুম থেকে ওঠার ঠিক পাঁচ মিনিট পরের ছবি!"
ইনায়া ড্রয়িংরুমের মাঝখানে পা রাখতে রাখতে উচ্চস্বরে বলে উঠল— "একদম! ঠিক এই কথাটা তো আমি মাত্র পাঁচ মিনিট আগে অ্যারিসকে বলছিলাম!"
ঘরের সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল। ইনায়া সোফায় আরাম করে বসে নিজের ফোনটা পকেট থেকে বের করে বলল— "আম্মু, তোমার এত সুন্দর সুন্দর অফিশিয়াল আর গর্জিয়াস পোর্ট্রেট থাকতে নিউজে এই ছবিটা দিতে হলো? নিউজ এডিটরকে একবার আমাকে ফোন করতে বললেই তো হতো! আমি নিজেই তো ড্রাইভ থেকে তোমার একটা ফার্স্ট ক্লাস ছবি মেইল করে পাঠিয়ে দিতাম!"
আফরিন সুলতানা মেয়ের কথা শুনে হেসেই আকুল হয়ে মাথা নাড়লেন— "দেখেছো? আমার মেয়ে এসেও ঠিক আমার সুরেই কথা বলছে।"
আনিসুর রহমান মজার ছলে বললেন— "আশরাফ শাহের এত বড় মার্ডার কেসের অভিযোগ নিয়ে মেয়ের কোনো মাথাব্যথাই নেই! ওর সমস্ত চিন্তা এসে আটকে গেছে কেবল ওই ফটো কোয়ালিটির ওপর!"
আইরা বড়দের কথা কিছুই না বুঝে নানুর পাশে গিয়ে কৌতূহলী চোখে জিজ্ঞেস করল— "নানু, তোমার ছবি কি পচা এসেছে?"
আফরিন সুলতানা নাতনিকে কোলে তুলে নিয়ে গালে চুমু খেয়ে বললেন— "হ্যাঁ রে নানু ভাই, খুব পচা আর বাজে এসেছে।"
আইরা খুব গম্ভীর মুখ করে বলল— "তাহলে তুমি ওই পেপারওয়ালাদের বোকা বলে আবার একটা সুন্দর পুতুল ছবি তুলে দাও!"
আইরার এই নিষ্পাপ ও বিজ্ঞের মতো পরামর্শ শুনে ঘরে উপস্থিত সবাই মুখ চেপে হেসে ফেলল।
ইনায়া চোখ স্ক্রিনে স্থির রেখে শান্ত গলায় বলল— "আচ্ছা... এবার কাজের কথায় আসি। মজা বাদ।"
একটু থেমে সে আফরিন সুলতানা আর আনিসুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল— "আশরাফ শাহ এতদিন সম্পূর্ণ চুপচাপ আড়ালে বসে ছিল। হঠাৎ এত বছর পর সে প্রেস কনফারেন্স ডেকে এই অদ্ভুত অভিযোগটা কেন তুলতে গেল, আম্মু?"
আফরিন সুলতানা সোফায় হেলান দিয়ে নির্ভার ভঙ্গিতে নিজের চায়ের কাপে একটা মৃদু চুমুক দিলেন। তার চোখে-মুখে কোনো চাপের লেশমাত্র নেই। তিনি ধীর গলায় বললেন— "যা ইচ্ছা করুক ইনায়া। ওই আশরাফ শাহের সস্তা চক্রান্ত দেখা বা তা নিয়ে চিন্তা করার মতো বিলাসিতার সময় আমার নেই।"
আনিসুর রহমান স্ত্রীর এই অসম্ভব ঠান্ডা মাথার মানসিকতা দেখে হেসে মাথা নাড়লেন— "আফরিন, তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে খবরের শিরোনামে অভিযোগটা অন্য কোনো অচেনা মানুষের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তোমার বিরুদ্ধে নয়!"
আফরিন সুলতানা নিজের কাঁধ ঝাঁকালেন— "মেকি খবরের আড়ালে আসল সত্য কোনোদিন চিরতরে লুকিয়ে থাকে না। তাই ভিত্তিহীন মিথ্যা দেখে অযথা দৌড়াদৌড়ি করার কোনো মানেই হয় না।"
ইনায়া মায়ের এই মানসিক শক্তিতে আপ্লুত হয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল— "একদম নিখুঁত পয়েন্ট, আম্মু। ঠিক তাই।"
ড্রয়িংরুমের দরজা ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে তাড়াহুড়ো করে এসে দাঁড়াল আলো। তার মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক আর অস্থিরতার ছাপ।
সবাই একযোগে আলোর এই উস্কোখুস্কো রূপের দিকে তাকাল। আলো একটু হাঁপাতে হাঁপাতে তোতলা গলায় বলল— "ম্যা... ম্যাডাম... মহা বিপদ!"
— "কী হয়েছে আলো? অত হাঁপাচ্ছ কেন?" আনিসুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন।
— "ম্যাডাম, বাইরে... বাড়ির মেন গেটের বাইরে অগণিত লোকজন এসে ভিড় করেছে! গাদা গাদা মিডিয়ার রিপোর্টার, বড় বড় ক্যামেরা, মাইক হাতে ওনারা জটলা পাকাচ্ছেন। আর... আর গেটের মুখে পুলিশের গাড়িও এসেছে ম্যাডাম! সবাই আপনার সাথে এখনই দেখা করতে চাইছে!"
কথাটা শোনামাত্রই পাশে বসে থাকা সুবার মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছায়া নামল— "মা... পরিস্থিতি তো দেখা যাচ্ছে বেশ জটিল। এখন কী করবে তুমি? নিচে নামবে?"
আফরিন সুলতানা নিজের হাতের কবজি উলটে হাতঘড়িটার দিকে একবার শান্ত নজরে তাকালেন। তারপর ঠোঁটের কোণে চতুর হাসি ফুটিয়ে বললেন— "এত তাড়াতাড়ি ওদের সামনে গেলে তো খেলার মজাই নষ্ট হয়ে যাবে, সুবা।"
ইনায়া মায়ের এই মনস্তাত্ত্বিক চালটা বুঝে মাথা নেড়ে বলল— "হুমমম... একদম সেইটাই আম্মু! আর্লি অ্যাক্সেস দেওয়া একদম ঠিক হবে না।"
অ্যারিস সোফায় বসে হাত গুটিয়ে এই মা-মেয়ের ঠাণ্ডা মাথার চালবাজি দেখে মৃদু হেসে ফেলল— "তোমরা মা-মেয়ে সত্যিই এক ধাঁচে গড়া! বাইরে পুরো মিডিয়া আর পুলিশ অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তোলপাড় করার জন্য... আর তোমরা ভেতরের ড্রয়িংরুমে বসে শান্তিতে ওদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছ!"
আফরিন সুলতানা গম্ভীর গলায় বললেন— "যেসব সাংবাদিক বা মানুষ আসল সত্যটা জানার জন্য অনুরাগী হয়ে এসেছে, তারা ধৈর্য ধরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুক। আর যারা সস্তা নাটক দেখতে এসেছে..." একটু থেমে চায়ের শেষ শেষ চুমুকটা মুখে পুরে যোগ করলেন— "...তাদের তো জীবনে একটু ধৈর্য ধরা শেখাটা বড্ড বেশি দরকার।"
ইনায়া দুষ্টুমিভরা হেসে জিজ্ঞেস করল— "তাহলে আম্মু, পাঁচ মিনিট পরে কি মিডিয়াকে ফেস করবে?"
আফরিন সুলতানা নিজের মাথাটা দুই দিকে নাড়লেন— "না।"
— "তাহলে?"
— "আরও অন্তত দশ মিনিট। আমি আগে আমার সকালের নাস্তাটা শান্তিমতো শেষ করি, তারপর দেখা যাবে।"
ছোট্ট আইরা তখনও নিজের নানুর পাশে বসে সব দেখছিল। সে কিছু না বুঝে নানুর দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল— "নানু, বাইরের অত অত মানুষ কি তোমার সাথে দেখা করতেই ভিড় করেছে?"
আফরিন সুলতানা নাতনির তুলতুলে নাকটা ধরে টেনে দিয়ে বললেন— "হ্যাঁ, নানু ভাই। সবাই নানুর সাথে একটু কথা বলতে এসেছে।"
আইরা এবার খুব সিরিয়াস গলায় বলল— "ঠিক আছে নানু, তুমি আগে পেট ভরে নাস্তা খেয়ে নাও। খালি পেটে কি আর পুলিশ আর মিডিয়ার সাথে কাজ করা যায়?"
বাইরে তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিকতার সীমা ছাড়িয়ে তীব্র উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। লোহার গেটের ওপাশে মিডিয়ার একের পর এক ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট যেন অন্ধ করে দেওয়ার মতো জ্বলছে-নিভছে। বুম, মাইক্রোফোন আর উৎসূক মানুষের একটা প্রকাণ্ড ভিড় থিকথিক করছে পুরো রাস্তা জুড়ে।
প্রথমে শুধু এক ধরণের গুঞ্জন আর গুজবের মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে থাকা কিছু চেনা-অচেনা মানুষের গলা আশঙ্কাজনকভাবে চড়ে উঠল। তারা দরজার দিকে হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে স্লোগান দিতে শুরু করল—
— "খুনি!"
— "খুনি বিচারপতি আফরিন সুলতানা!"
— "বাসা ছেড়ে বের হয়ে আসুন! জবাব দিন!"
ড্রয়িংরুমের কাচের জানালা ভেদ করে সেই কুৎসিত শব্দগুলো ভেতরের ভেসে এলো।
আফরিন সুলতানা সোফা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। এক হাত দিয়ে পর্দাটা সামান্য সরিয়ে থমথমে মুখে এক নজর বাইরে তাকালেন। তার শান্ত চোখের মণিতে কিছু সময়ের জন্য রাগের ঝিলিক ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। তবে নিজের ভেতরের আত্মসংযম তিনি এক ফোঁটাও হারালেন না। তার মুখ থেকে বের হওয়া কণ্ঠস্বর ছিল পাথরের মতো সম্পূর্ণ শান্ত —
— "হুম..."
তিনি পর্দাটা ছেড়ে দিয়ে আবার এসে সোফায় নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় বসলেন। ইনায়া মায়ের মুখাবয়ব দেখেই সাথে সাথে বুঝে গেল—বাইরের ওই অসভ্য আর সস্তা শব্দগুলো সম্মানিত মানুষটির ব্যক্তিত্বে লেগেছে। ওনার মোটেও ভালো লাগেনি।
ইনায়া একটু এগিয়ে গিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল— "আম্মু... ওদের সামলাতে কি বাইরে যাবেন?"
আফরিন সুলতানা ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলেন— "না।"
ঘরের প্রতিটি মানুষ—আনিসুর রহমান, অ্যারিস, সুবা—সবাই একযোগে ওনার এই কঠোর সিদ্ধান্তের দিকে তাকাল।
— "ওরা শুধু সাংবাদিক ছিল, তখন আমার যাওয়ার ইচ্ছা ছিল," আফরিন সুলতানা বেশ শক্ত স্বরে বললেন। "কিন্তু এখন আর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই।"
আনিসুর রহমান সামান্য ভ্রু কুঁচকে স্ত্রীর মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করে বললেন— "হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলালে কেন আফরিন?"
আফরিন সুলতানা চোখের দৃষ্টিতে আত্মসম্মান ফুটিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় স্বরে বললেন— "যারা কোনো কিছু জানতে এসেছে বা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন করতে এসেছে, একজন সাবেক বিচারপতি হিসেবে তাদের উত্তর দিতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু যারা কোনো তথ্য, প্রমাণ বা আইনি তদন্তের আগেই একজন মানুষকে সস্তা রাস্তায় দাঁড়িয়ে 'খুনি' বলে রায় দিয়ে ফেলেছে, তাদের বিচারহীন মব-মেন্টালিটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে ব্যাখ্যা করার বা নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন আমি মনে করি না।"
অ্যারিসও শান্ত গলায় যোগ করল— "আইনগতভাবে যে কেউ যেকোনো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতেই পারে, তদন্তও হতে পারে। কিন্তু আদালত রায় দেওয়ার আগেই মিডিয়া ট্রায়াল চালিয়ে কাউকে অপরাধী বা খুনি বলে ঘোষণা করাটা চরম অসভ্যতা।"
আফরিন সুলতানা সোফা ছেড়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আলোর দিকে তাকিয়ে হাঁক দিলেন— "আলো।"
— "জি, জাজ ম্যাডাম?" আলো ভয়ে ভয়ে সামনে এলো।
— "বাইরে যারা এত চিৎকার করছে, তাদের আমার পক্ষ থেকে একদম ভদ্রভাবে আর স্পষ্ট ভাষায় বলে দাও..." আফরিন সুলতানা অত্যন্ত গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিলেন, "...আমি আজ কারও সঙ্গে কোনো কথা বলব না। কোনো ধরনের অডিও বা ভিডিও বাইট দেব না। যদি কিছু বলার থাকে, তবে যথাসময়ে আমার লিগ্যাল টিম আর আইনজীবীর মাধ্যমে অফিশিয়াল ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য মিডিয়াতে দেওয়া হবে। এর বেশি একটা শব্দও না।"
— "ঠিক আছে ম্যাডাম, আমি এখনই দারোয়ানকে দিয়ে পেছনের মাইকে খবরটা পাঠাচ্ছি।" আলো দ্রুত পায়ে দরজার বাইরে চলে গেল।
ইনায়া এবার মায়ের মুখোমুখি বসে চোখ দুটো নাচিয়ে হালকা হেসে বলল— "আচ্ছা আম্মু, আপনার সামনে দেশের টপ ব্যারিস্টার ইনায়া ফেং স্বশরীরে উপস্থিত, তখন আবার নতুন করে বাইরের অন্য কোন ল'ইয়ার খোঁজার কী দরকার?"
আফরিন সুলতানা নিজের একদিকের ভ্রু তুলে কৌতুকের চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর মুচকি হাসিটা ফুটে উঠল— "ওকে... দ্যাটস ফাইন। তাহলে এই স্টেট ভার্সেস আশরাফ শাহ ডিফেন্সের পুরো দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে আজ থেকে তোর।"
ইনায়া আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল— "ডান, আম্মু! কেস ফাইল লক করা হলো।"
তারপর সে সোফায় আরাম করে পিঠ ঠেকিয়ে যোগ করল— "তবে আইনজীবী হিসেবে আমার প্রথম টিপস হলো—আমরা এখন এই কেসে একদম রিঅ্যাক্ট করব না। কিচ্ছু করব না।"
সুবা ইনায়ার এই অদ্ভুত কৌশল শুনে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল— "কিচ্ছু করবে না মানে? ওরা বাইরে এত কাদা ছুড়ছে আর তুই হাত গুটিয়ে বসে থাকবি ইনায়া?"
ইনায়া মুচকি হেসে চোখের ইশারায় সুবাকে শান্ত হতে বলে বলল— "আরেহ সুবা, লিগ্যাল মাইন্ড সেট বুঝতে শেখ। আগে কিছুদিন আমাদের দেশের এই সস্তা আর রঙ-চঙে মিডিয়া সার্কাস আর বিনোদনটা শান্তিতে উপভোগ করো না!"
— "মানে?" সুবা বুজতে পারল না।
— "এই তো দেখন না, আজ রাত থেকেই নিউজ চ্যানেলগুলোতে এই কেস নিয়ে টক শো বসবে... ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে একের পর এক লাইভ আর থিওরির পোস্ট ঝড় তুলবে... ইউটিউবে শত শত ভুয়া ভিউ-খোর ক্রিয়েটররা রাতে বসে গভীর বিশ্লেষণ করবে... দেশের প্রতিটা ফেসবুক ইউজার নিজেকে অন-কোর্ট জাজ বানিয়ে ফেলবে।"
অ্যারিস সোফায় বসে ইনায়ার এই বাস্তবসম্মত সামাজিক বিশ্লেষণ শুনে জিজ্ঞেস করল— "তারপর ব্যারিস্টার ম্যাডাম? নাটক জমার পর কী হবে?"
ইনায়া অভিজ্ঞ স্বরে উত্তর দিল— "তারপর দেখবে... এই কাল্পনিক মিথ্যে অভিযোগের ফানুসটা একসময় নিজে থেকেই ফুস হয়ে ধসে পড়েছে। এই কেসটাই একটা সময় অটো বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ কোর্টে আসল চার্জশিটের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক শুনানি শুরু হওয়ার অনেক আগেই সাধারণ মানুষের আবেগ আর ফেক ইন্টারেস্ট অন্যদিকে মোড় নেবে। নতুন কোনো চটকদার ঘটনা বাজারে এলেই এই মিডিয়া আর পাবলিক আমাদের ভুলে গিয়ে সেটা নিয়ে মেতে উঠবে।"
আফরিন সুলতানা নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে গর্বে হেসে ফেললেন— "তুই তো দেখছি শুধু আইনের বড় বড় বই-ই গলধঃকরণ করিসনি ইনায়া... সাইকোলজি আর মানুষের মনটাও খুব নিখুঁত পড়তে পারিস!"
ড্রয়িংরুমের দরজা ঠেলে দ্রুত ও চঞ্চল পায়ে ভেতরে ঢুকল ইরা। এতক্ষণ সে বাগানে ছিলো। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের ছাপ।
— "আপু..." ইরা হাঁপাতে হাঁপাতে ডেকে উঠল।
ইনায়া সোফায় সোজা হয়ে বসে ওর দিকে তাকাল— "কী হয়েছে ইরা? ওভাবে হাঁপাচ্ছ কেন?"
ইরা নিজের ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল— "আপু... বাইরে পরিস্থিতির মোড় কিন্তু বেশ খারাপের দিকে যাচ্ছে! সাংবাদিকদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে... আর সবচেয়ে বড় কথা, আশরাফ শাহের ব্যক্তিগত লিগ্যাল টিমের চার-পাঁচজন কড়া আইনজীবীও মিডিয়া সাথে নিয়ে আমাদের গেটের সামনে এসে স্পট আইনি নোটিশ টাঙানোর অজুহাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে!"
আফরিন সুলতানার চেহারায় কোনো দুশ্চিন্তার লেশমাত্র ফুটল না। তিনি অসম্ভব শান্ত ভঙ্গিতে টেবিল থেকে আবার চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিলেন।
তারপর তিনি দরজায় দাঁড়ানো হাঁপাতে থাকা আলোর দিকে চোখ তুলে নরম গলায় বললেন— "আলো।"
— "জি, জাজ ম্যাডাম?" আলো ভীতি জড়ানো গলায় সাড়া দিল।
— "বাইরে গেটের কাছে যারা এতক্ষণ ধরে রোদে দাঁড়িয়ে আছে......ওদের সবাইকে ভালো করে চা-পানির ব্যবস্থা করে দাও।"
আলোর চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। সে পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল— "জি... কী বললেন ম্যাডাম? চা... চা দেবেন?"
আফরিন সুলতানা বিষয়টি সাধারণ এক বিষয় হিসেবে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো করে বললেন— "আহা, বেচারে কড়া রোদে কতক্ষণ ধরে ওই খোলা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে বলো তো? ভিড়ের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হচ্ছে, হাঁপিয়ে যাচ্ছে ওরা। আলো, রান্নাঘর থেকে বড় পাত্রে চা, ঠান্ডা পানি আর কয়েকটা বিস্কুটের বয়াম গেটের লোকজনকে দিয়ে ওদের আপ্যায়ন করার ব্যবস্থা করে দাও।"
কথাটা শোনামাত্রই ইনায়া নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে হাসি আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। পাশে বসা অ্যারিস অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে মৃদু হেসে নিজের গাম্ভীর্য বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল। আর সুবা তো নিজের দুই হাতে মুখ চেপে ধরে সোফায় প্রায় কুঁকড়ে গেল।
আনিসুর রহমান নিজের স্ত্রীর এই রসিকতা দেখে উচ্চস্বরে হেসে উঠে বললেন— "আফরিন! সত্যি, তোমার মতো ধৈর্যশীল আর অদ্ভুত মানুষ আমি আমার এত বছরের জীবনে দ্বিতীয়টা দেখিনি!"
জিয়ান ফেংও হো হো করে হেসে উঠলেন— " ঠিকই বলেন! ওরা এসেছে আপনাকে খুনের আসাম বানিয়ে গালিগালাজ করতে... আর আপনি ঘরের ভেতর বসে শান্তিতে ওদের গ্র্যান্ড আপ্যায়নের ব্যবস্থা করছেন!"
আইরা বড়দের এই কাণ্ডকারখানা কিছু না বুঝে নিজের নানুর আঁচলটা ধরে সরল গলায় জিজ্ঞেস করল— "নানু... তোমাকে বাইরে থেকে দুষ্টু লোকগুলো পচা গালি দিলেও চা-বিস্কুট খাওয়াতে হয়?"
ইনায়া হেসে গড়িয়ে পড়ে আইরাকে কোলে নিয়ে বলল— "আরে সোনা, নানুর কাছে অতিথি শত্রু হোক আর মিত্র হোক, বাড়িতে এলে অতিথি মানেই তো অতিথি!"
আফরিন সুলতানা নাতনির মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে হেসে বললেন— "শোনো নানু ভাই , জীবনে সবসময় মনে রাখবে—আমাদের নিজেদের ব্যক্তিত্ব আর আচরণ কখনো অন্য মানুষের বাজে ব্যবহারের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বাইরে দাঁড়িয়ে ওরা যেটা করছে, সেটা ওদের নিচু মনের পরিচয়। আর আমি এই পরিস্থিতিতে কী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি, সেটাই হলো আমার আসল পরিচয় আর শিক্ষা।"
ঘরের সবাই একদম নীরব হয়ে গেল। আফরিন সুলতানার ব্যক্তিত্ব আর জীবনদর্শনের এই গভীরতা যেন উপস্থিত প্রতিটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেল।
আনিসুর রহমান স্ত্রীর দিকে এক শ্রদ্ধাপূর্ণ নজরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন— "ঠিক এই বিরল ব্যক্তিত্ব আর চিন্তাধারণার কারণেই আফরিন... তোমাকে এত বছর ধরে এত কাছে থেকে চিনি, ভালোবাসি, তাও প্রতিদিন তোমার নতুন রূপ দেখে অবাক হই।"
সোফায় নিজের পা দুটো লম্বা করে ছড়িয়ে বসে থাকা ইভান একদিকের ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল— "আচ্ছা, এসব তো বুঝলাম। কিন্তু সত্যি সত্যি এখন আমরা কী করব? বাইরে তো শয়ে শয়ে মানুষ, গাদা গাদা প্রেসের ক্যামেরা আর পুলিশের গাড়ি প্যাট্রোল দিচ্ছে... আপনি কি সত্যিই আজ আর সারাদিনে এই বাসা ছেড়ে বাইরে এক পা-ও বের হবেন না?"
আফরিন সুলতানা নিজের হাতের ঘড়িটার দিকে এক নজর চোখ বুলিয়ে নির্বিকার গলায় বললেন— "একদমই না। আজ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছুটির দিন। আর আমার ছুটির দিনের শান্তি নষ্ট করার অধিকার আমি এই দুনিয়ার কোনো আশরাফ শাহ বা সংবাদমাধ্যমকে লিখে দিইনি।"
ইভান সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথাটা দুই দিকে নেড়ে স্যালুট ঠোকার মতো ভঙ্গিতে বলল— "বাহ! জাস্ট ওয়াও! আপনার এই রয়্যাল অ্যাটিটিউডটাই তো আমার সবচেয়ে বেশি দারুণ লাগে!"