কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন নার্স এসে তাদের লিফটের দিকে নিয়ে গেল। পাঁচতলায় ওঠার সময় ইনায়া খেয়াল করে হাসপাতালের ভেতরের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর পজিশন, সিকিউরিটি গার্ডদের ডিউটি পোস্ট আর করিডোরগুলোর গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগল। ভেতরে ঢোকার পর ওর মগজ প্রতিটা কোণ স্ক্যান করে নিচ্ছে।
পাঁচতলার ভিআইপি জোনে এসে দেখা গেল, এখানে এক একটা কেবিন যেন ফাইভ স্টার হোটেলের লাক্সারি রুম। পাশাপাশি দুটো কেবিন বরাদ্দ হলো তাদের জন্য।
নার্সটি বিদায় নেওয়ার পর করিডোর ফাঁকা দেখে মাহিন ইনায়ার কেবিনের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। ওনার গলায় নিচু স্বর।
মাহিন: ইনায়া, আমরা সাকসেসফুলি ভেতরে ঢুকতে পেরেছি। আপাতত দিনটা আমাদের খুব নরমাল থাকতে হবে। নার্স বা ডাক্তাররা যখন যা টেস্ট করতে আসবে, একদম সাধারণ ক্লায়েন্টের মতো বিহেভ করব। আসল কাজ শুরু হবে রাত ১২টার পর, যখন এই ভিআইপি ফ্লোরে ভিজিটর আনাগোনা বন্ধ হয়ে যাবে।
—"একদম ঠিক, সিনিয়র। দিনের বেলা আমরা শুধু চোখ-কান খোলা রাখব। নার্সরা যখন ফাইল নিয়ে আসবে, আমি ওদের থেকে কথায় কথায় জানার চেষ্টা করব ওটি সেকশন আর মর্গের দিকের সিকিউরিটি কেমন। আপনিও আপনার কেবিন থেকে একটু নজর রাখবেন।"
দুজনে যার যার কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
প্রথম দিনের রুটিন টেস্টগুলোর বাহানায় ইনায়া আর মাহিনকে চারতলার প্যাথলজি আর রেডিওলজি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলো। রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে আর ইসিজি করার ফাঁকে ফাঁকে দুজনে খুব স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে লাগল। তাদের চোখে-মুখে এমন একটা ভাব, যেন তারা স্রেফ নিজেদের শরীর নিয়ে সচেতন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ।
টেস্টগুলো করার সময় তাদের সাথে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট আর একজন সিনিয়র নার্স ছিলেন, যাঁর নেমপ্লেটে লেখা ছিল 'সিস্টার রেবেকা'। রেবেকা বেশ অমায়িক আর বাচাল প্রকৃতির, যা ইনায়া আর মাহিনের জন্য একদম মোক্ষম সুযোগ তৈরি করে দিল।
ইআর রুমের পাশে ব্লাড প্রেশার মাপার সময় মাহিন খুব কৌশলে মাথা চেপে ধরে একটা হালকা নাটুকে অভিনয় শুরু করলেন।
মাহিন খানিকটা ক্লান্তির ভান করে জিজ্ঞেস করলো,"ওহ সিস্টার, ইদানীং কাজের এত প্রেসার থাকে যে ব্লাড প্রেশারটা প্রায়ই ফ্লাকচুয়েট করে। আচ্ছা, আপনাদের এই হাসপাতাল তো দেখি বিশাল বড়। জরুরি কোনো ওটি বা ক্রিটিক্যাল কেস আসলে আপনারা কোন ফ্লোরে হ্যান্ডেল করেন? আমার এক রিলেটিভের হার্ট সার্জারি করানো লাগতে পারে।"
সিস্টার রেবেকা ডিজিটাল প্রেশার মেশিনটা অন করতে করতে বললো,"ওহ স্যার, আমাদের ওটি সেকশনটা তো সম্পূর্ণ আলাদা। সাততলায় আমাদের মেইন কার্ডিয়াক আর নিউরো ওটি। ওখানে সাধারণ কাউকে যেতে দেওয়া হয় না। দেশের বেস্ট সার্জনরা ওখানে বসেন।"
ইনায়া পাশে দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সে এবার খুব স্বাভাবিক গলায় আড্ডার ছলে নার্সের সাথে কথা জোড়া দিল।
"সাততলায়? আচ্ছা সিস্টার, একদিন নিচে আসার সময় লিফটে দেখছিলাম বেজমেন্ট-২ এর বাটনটা লক করা। কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করছি, ওখানে কি আপনাদের কোনো স্পেশাল ল্যাব আছে? নাকি অন্য কিছু?"
সিস্টার রেবেকা প্রেশার মাপা শেষ করে স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝোলালেন। ওনার মুখে গর্বের হাসি।
"আরে না ম্যাম, বেজমেন্ট-২ তে আমাদের সেন্ট্রাল মর্গ (লাশকাটা ঘর) আর কোল্ড স্টোরেজ। আর ওটার ঠিক পাশেই একটা স্পেশাল আইসোলেশন ওটি আছে। কোনো এক্সট্রিম ইমার্জেন্সি বা কোনো আনক্লেমড বডি (বেওয়ারিশ লাশ) আসলে বা বিশেষ কোনো ক্রিটিক্যাল অর্গান রিলেটেড কেস হলে আমাদের বড় সার্জনরা রাতে সরাসরি ওখানেই যান।"
আইসোলেশন ওটি আর মর্গ একসাথে বেজমেন্ট-২ তে! ইনায়া আর মাহিন চোখের ইশারায় একে অপরকে ইঙ্গিত করল। তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত ক্লু পেয়ে গেছে।
মাহিন মুচকি হেসে বললো," ও আচ্ছা! তার মানে রাতের বেলা তো ওদিকটা পুরো ফাঁকাই থাকে? ডাক্তার-নার্সরা কি ওদিকে যান না?"
সিস্টার রেবেকা ফিসফিস করে, কিছুটা রহস্যের সুরে বললো," আরে স্যার, রাতের বেলা ওদিকে সাধারণ স্টাফদের যাওয়া একদম নিষেধ! শুধু স্পেশাল ডিউটির কয়েকজন ডাক্তার আর মাত্র দুজন ট্রাস্টেড নার্স ওই ফ্লোরে নামতে পারেন। ওখানকার সিকিউরিটি কোডও আলাদা। এমনকি লিফটে ওই ফ্লোরে যেতে হলেও বিশেষ পাঞ্চ কার্ড লাগে, যা শুধু অন-ডিউটি স্পেশাল সার্জনদের কাছেই থাকে। আমাদের মতো নরমাল নার্সদের ওদিকে যাওয়ার পারমিশনই নেই।"
ইনায়া মনে মনে চরম উত্তেজিত হলেও মুখে শান্ত ভাব রেখে বললো,"ওহ, সিকিউরিটি তো বেশ কড়া আপনাদের। ভালো, এক নম্বরের হাসপাতাল বলে কথা! থ্যাঙ্ক ইউ সিস্টার, প্রেশার তো এখন নরমাল মনে হচ্ছে?"
সিস্টার রেবেকা: "হ্যাঁ ম্যাম, একদম পারফেক্ট। আপনাদের আজকের টেস্ট শেষ। আপনারা এখন কেবিনে গিয়ে রেস্ট নিতে পারেন। লাঞ্চ কেবিনেই সার্ভ করা হবে।"
ইনায়া আর মাহিন সিস্টার রেবেকাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার পাঁচতলার ভিআইপি উইংয়ে ফিরে এল। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মাহিন ইনায়ার একদম কাছাকাছি এসে নিচু স্বরে বললেন—
মাহিন: "ইনায়া, গোলপোস্ট পেয়ে গেছি! বেজমেন্ট-২। আইসোলেশন ওটি আর মর্গ। রাতের বেলা সেখানেই আসল খেলাটা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, ওখানে যেতে স্পেশাল পাঞ্চ কার্ড লাগবে।"
ইনায়া: "পাঞ্চ কার্ড কীভাবে জোগাড় করতে হবে, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি সিনিয়র । আজ রাত ১২টার পর যখন সাততলার কোনো স্পেশাল সার্জন রাউন্ডে বা কফি ব্রেকে বের হবেন, ওনার কোট থেকেই আমাদের ওটা সরাতে হবে। আজ রাতেই আমরা বেজমেন্ট-২ তে নামছি!"
..
.
.
.
-*-
ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক রাত ১২টা ছুঁল, পাঁচতলার ভিআইপি করিডোর তখন একদম নিঝুম। ডিউটি স্টেশনের নার্সরা যার যার ডেস্কে ফাইলের কাজে ব্যস্ত, কেউ কেউ হালকা তন্দ্রাচ্ছন্ন।
পরিকল্পনা মতো ইনায়া আর মাহিন দুজনেই তাদের কেবিনের দরজা খুব আলতো করে লক করে বাইরে বেরিয়ে এল। তাদের পরনে এখন আর কর্পোরেট ড্রেস নেই, বরং হাসপাতালের সাধারণ স্টাফদের মতো হালকা নীল রঙের স্ক্রাব গলিয়ে নিয়েছে দুজনে, যা মাহিন বিকেলে ব্যাক-অফিস সোর্সের মাধ্যমে গোপনে আনিয়ে রেখেছিল। মাথায় সার্জিক্যাল ক্যাপ আর মুখে মাস্ক থাকার কারণে করিডোরের ঝাপসা আলোয় তাদের চট করে চেনার কোনো উপায় নেই।
তারা খুব নিঃশব্দে পা ফেলে সার্ভিস লিফটের পাশের সিঁড়িঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কারণ মেইন লিফট ব্যবহার করলে সিসিটিভিতে ধরা পড়ার ঝুঁকি ১০০%।
মাহিন মাস্কের আড়াল থেকে ফিসফিস করে বললো, "ইনায়া, সাততলার সেই স্পেশাল অন-ডিউটি সার্জনের কেবিনটা করিডোরের একদম শেষ মাথায়। সিস্টার রেবেকার চার্ট অনুযায়ী এই সময়ে ওনার কফি ব্রেকে যাওয়ার কথা। ওনার টেবিল বা কোট থেকেই আমাদের লিফটের বেজমেন্ট-২ এর ‘স্পেশাল পাঞ্চ কার্ড’ টা সরাতে হবে।"
ইনায়া মাথা নেড়ে বললো, "আপনি করিডোরের মোড়ে নজর রাখুন সিনিয়র। কেউ আসলে হালকা করে দুবার খাঁকারি দেবেন। আমি ভেতরে ঢুকছি।"
দুজনে সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে সাততলায় উঠে এল। করিডোরটা একদম শুনশান, কেবল ওটি সেকশনের বাইরের রেড লাইটটা টিমটিম করে জ্বলছে। মাহিন একটু দূরে দেয়ালের আড়ালে পজিশন নিলেন। ইনায়া বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে গিয়ে সেই স্পেশাল সার্জনের রুমের দরজায় হাত রাখল। ভাগ্য ভালো, দরজাটা পুরোপুরি লক করা ছিল না, জাস্ট ভেজানো ছিল।
ইনায়া সাবধানে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতর টেবিল ল্যাম্পের হালকা আলো। ঠিক যেমনটা ভাবা হয়েছিল—সার্জন সাহেব ওনার অ্যাপ্রন আর আইডি কার্ডটা চেয়ারের হাতলে ঝুলিয়ে ওয়াশরুমে গেছেন, ভেতর থেকে পানির আওয়াজ আসছে।
সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ড! ইনায়া চেয়ারের দিকে এগিয়ে গেল। খুঁজে নিল অ্যাপ্রনের পকেটে থাকা চকচকে ডিজিটাল পাঞ্চ কার্ডটি। সে কার্ডটি বের করে নিজের পকেটে পুরল এবং ঠিক যেভাবে ছিল, সেভাবেই অ্যাপ্রনটা গুছিয়ে রাখল।
পরের সেকেন্ডেই ওয়াশরুমের লক খোলার আওয়াজ হলো। ইনায়া ছিটকে দরজার বাইরে বেরিয়ে এল এবং কোনো শব্দ না করে দরজাটা আগের মতো ভিড়িয়ে দিল। করিডোরের মোড়ে দাঁড়ানো মাহিনকে ও দূর থেকে থাম্বস-আপ দেখাল। কার্ড জোগাড় হয়ে গেছে!
দুজনে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এল বেজমেন্ট-১ এ। সেখান থেকে সার্ভিস লিফটের সামনে গিয়ে ইনায়া পকেট থেকে সেই স্পেশাল পাঞ্চ কার্ডটি বের করল। লিফটের নিচে থাকা সিকিউরিটি সেন্সরের ওপর কার্ডটা টাচ করতেই একটা মৃদু ‘বিপ’ আওয়াজ হলো এবং এতক্ষণ লক হয়ে থাকা ‘B2’ (বেজমেন্ট-২) বাটনটার লাল আলোটা সবুজ হয়ে জ্বলে উঠল।
মাহিন আর ইনায়া লিফটের ভেতরে ঢুকে ‘B2’ প্রেস করল। লিফট যখন নিচের দিকে নামতে শুরু করল, তখন দুজনেরই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর থ্রিল। লিফটের ডিসপ্লেতে ‘B2’ লেখাটা ভেসে উঠল এবং একটা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে লিফটের স্টিলের দরজাটা খুলে গেল!
ইনায়া আর মাহিনের সামনে ভেসে উঠল এক অন্য জগত। হাসপাতালের ওপরের ফ্লোরগুলোর সেই ঝকঝকে তকতকে ভাবটা এখানে একেবারেই নেই। চারিদিকের দেওয়ালগুলো কেমন যেন ফ্যাকাশে, আর বাতাসটা অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ও ভারী। পুরো করিডোরে একটা অদ্ভুত রাসায়নিক আর ওষুধের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে আছে।
ইনায়া আর মাহিন পা টিপে টিপে লিফট থেকে বের হয়ে এল। করিডোরের লাইটগুলো খুব কম পাওয়ারের, যেন ইচ্ছা করেই ওদিকটা আবছা অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। দেওয়ালের এক কোণে সাইনবোর্ডে লেখা—‘সেন্ট্রাল মর্গ: বামে’, আর ‘আইসোলেশন ওটি: ডানে’।
মাহিন একেবারে নিচু স্বরে ইনায়ার কানের কাছে মুখ এনে বললো, "ইনায়া, মর্গটা তো বাম দিকে। সিস্টার রেবেকা বলেছিল আইসোলেশন ওটি-র দিকেই স্পেশাল সার্জনরা রাতে যাতায়াত করে। আমরা ডানের করিডোরটা ধরে এগোই।"
ইনায়া মাথা নেড়ে সায় দিল। দুজনে ডান দিকের অন্ধকার করিডোর ধরে এগোতে লাগল। কিছু দূর যাওয়ার পর ওনারা লক্ষ্য করল, করিডোরের একদম শেষ মাথায় একটা ভারী ডাবল-ডোর আইসোলেশন ওটি। দরজার ওপরের লাল লাইটটা জ্বলছে না, কিন্তু দরজার নিচের ফাঁক গলে ভেতরের উজ্জ্বল সাদা আলো করিডোরের মেঝেতে এসে পড়েছে। তার মানে, এই গভীর রাতেও ওটি-র ভেতরে কেউ আছে এবং কাজ চলছে!
দুজনে আরও কাছে এগিয়ে যেতেই ওটি-র ভেতর থেকে মেটালের জিনিসপত্রের মৃদু টুংটাং শব্দ আর দুজন মানুষের খুব নিচু স্বরে কথা বলার আওয়াজ শুনতে পেল।
ইনায়া দরজার পাশের ছোট কাঁচের উইন্ডোটার দিকে এগোল। সে নিজের অস্তিত্ব লুকিয়ে এক চোখে ভেতরের দিকে তাকাল।
ভেতরের দৃশ্যটা দেখামাত্রই ইনায়ার পুরো শরীর এক সেকেন্ডের জন্য জমে বরফ হয়ে গেল! ওটি-র মাঝখানের টেবিলে একটা ডেড বডি শোয়ানো। তার পাশে দুজন সবুজ গাউন পরা সার্জন দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু কোনো নরমাল সার্জারি সেখানে হচ্ছে না। একজন সার্জন একটা বিশেষ থার্মো-কন্টেইনার বক্সের ভেতর বরফের মাঝে একটা অর্গান (কিডনি) খুব যত্ন করে লক করছেন। ওনাদের পাশেই টেবিলে রাখা একটা ফাইলে বেশ কিছু লোগো আর সিল মারা কাগজ রাখা, যা দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এগুলো আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের শিপমেন্টের নথিপত্র!
ইনায়া ওর পকেটে হাত দিল। ভাগ্যিস, ও ওর ফোনটা সাইলেন্ট মোডে করে সাথে এনেছিলেন। সে ফোনটা বের করে কাঁচের ওপাশ থেকে ওই কন্টেইনার বক্স, ফাইলে থাকা হাসপাতালের লোগো আর সার্জনদের মুখের স্পষ্ট কয়েকটা ছবি আর একটা ছোট ভিডিও ক্লিপ তুলে নিল। হাত সামান্য কাঁপলেও ইনায়া নিজেকে শক্ত রাখল। এই ছবিগুলোই এই হাসপাতালের মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য প্রধান অস্ত্র।
দুর্ভাগ্যবশত ওটি-র ভেতরের একজন সার্জন দরজার দিকে ঘুরে তাকালেন। হয়তো ওনার মনে হয়েছিল বাইরে কোনো ছায়া নড়ে উঠেছে।
ভেতরের সার্জন ভারী গলায় অন্যজনকে বললো, "এই, বাইরে কেউ আছে নাকি দেখো তো? করিডোরে কোনো আওয়াজ পেলাম মনে হলো।
কথাটা শোনামাত্রই মাহিন ইনায়ার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল।
সার্জন করিডোরের দিকে এগোলেও একদম দরজার গোড়ায় এসে থেমে গেলেন। অন্য সার্জন ভেতর থেকে ডাক দিতেই তিনি অবহেলা ভরে মাথা নেড়ে আবার ওটি-র ভেতরে ঢুকে গেলেন।
করিডোরের আবছা অন্ধকারে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া আর মাহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাহিন ইশারায় ইনায়াকে ওখান থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেও ইনায়া মাথা নাড়ল। শুধু দুটো ছবি বা একটা ছোট ভিডিও দিয়ে এত বড় হাসপাতালের প্রভাবশালী মাথাদের আইনি জালে পুরোপুরি আটকানো যাবে না; আমাদের আরও অকাট্য আর অস্পর্শ্য প্রমাণ লাগবে।
ইনায়া আবার ওটি-র দরজার কাঁচের উইন্ডোটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফোনটা একদম কাঁচের কাছাকাছি এনে জুম অন করল।
ভেতরে তখন সার্জনরা কন্টেইনার বক্সটা সিলগালা করছেন। ইনায়া পুরো সিলিং প্রসেসটার ভিডিও করতে লাগল। এরপর তার প্রধান টার্গেট হলো টেবিলের ওপর রাখা সেই ফাইলটা। সার্জন যখন কন্টেইনারটা নিয়ে পাশের একটা ছোট টেবিলে রাখলেন, তখন মেইন টেবিলের ওপর থাকা ফাইলের পাতাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ইনায়া ওর ফোনের ক্যামেরা সর্বোচ্চ জুম করে ফাইলের ওপরের সেই কোড নম্বর, হাসপাতালের অফিশিয়াল সিল, আর শিপমেন্টের ডেস্টিনেশন—যেখানে একটি বিদেশি মেডিকেল এজেন্সির নাম লেখা ছিল, সেটার একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার কয়েকটা ছবি তুলে নিল।
ছবিগুলো এত স্পষ্ট এসেছে যে, হসপিটালের লোগো আর সার্জনদের আইডেন্টিটি কার্ডের নাম পর্যন্ত রিড করা যাচ্ছে।
এরপর, ওটি-র কোণায় রাখা একটা মনিটরে পেশেন্টের ডিটেইলস স্ক্রল করছিল—যার বডি থেকে অর্গান নেওয়া হয়েছে। ইনায়া ওর ফোনের অ্যাঙ্গেল ঘুরিয়ে সেই মনিটরের স্ক্রিনেরও একটা ছবি নিয়ে নিল, যাতে প্রমাণ করা যায় যে কোন মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে বেআইনিভাবে এই অর্গান সরানো হয়েছে।
সবগুলো ফাইল, ভিডিও আর ছবি ফোনের একটা সিকিউরড ফোল্ডারে সেভ করে ইনায়া মাহিনের দিকে তাকাল। ওনার মুখে এবার এক বিজয়ী হাসি।
ইনায়া একদম নিচু স্বরে বললো, "সিনিয়র, আমাদের কাজ শেষ। এবার আমাদের কাছে এমন প্রমাণ আছে যা সুপ্রিম কোর্টের কোনো জাজও ডিনাই করতে পারবেন না। এই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়া এখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার।"
মাহিন স্বস্তির হাসি হেসে বললেন, "অসাধারণ ইনায়া! এবার আর এক মুহূর্তও এখানে নয়। চলো, লিফট এসে গেছে।"
দুজনে সাবধানে পা ফেলে সার্ভিস লিফটে উঠে পড়ল। সেই স্পেশাল পাঞ্চ কার্ডটা আবার সুইপ করে লিফটের দরজা বন্ধ হতেই দুজনের বুক থেকে যেন মস্ত বড় একটা পাথর নেমে গেল। লিফট যখন আবার পাঁচতলার ভিআইপি ফ্লোরের দিকে উঠতে শুরু করল, সাথে গায়ে দেয়া অ্যাপ্রন খুলে ফেললো। ইনায়া ফোনটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। দেশের এক নম্বর হাসপাতালের পর্দার আড়ালের এই ভয়ানক অন্ধকার সত্যটা এখন ওনার হাতের মুঠোয়!
লিফটের দরজাটা যখন পাঁচতলার ভিআইপি ফ্লোরে এসে খুলল, ইনায়া আর মাহিন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে করিডোরে পা রাখল। কিন্তু সেই স্বস্তি এক সেকেন্ডও স্থায়ী হলো না। ওরা নিজেদের কেবিনের দিকে এগোতেই দেখল—৫১৩ আর ৫১৪ নম্বর রুমের দরজার সামনে দুজন ডাক্তার গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের একজনের হাতে সাততলার সেই স্পেশাল সার্জনের আইডি কার্ড আর অ্যাপ্রন!
চার জোড়া চোখ এক হয়ে গেল। ডাক্তারদের তীক্ষ্ণ চাউনি দেখেই ইনায়া আর মাহিন বুঝতে পারল—পাঞ্চিং কার্ড খোয়া যাওয়ার বিষয়টা হসপিটাল অথরিটি ধরে ফেলেছে এবং তারা ট্র্যাকিং করে সোজা এই ভিআইপি উইংয়ে চলে এসেছে!