"সায়মা, আমি একটা জরুরি কাজে কয়েকদিনের জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছি। আইরাকে তোমাদের কাছে রেখে গেলাম। আম্মু আর আব্বুকে (শামীমা বেগম আর জিয়ান ফেং) বোলো ওরা যেন আইরার দিকটা একটু খেয়াল রাখেন। ওর স্কুল আর এক্সাম চলছে।"
আইরা ওর মায়ের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকাল। ইনায়া আইরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ওর কপালে একটা চুমু খেল।
"আম্মু, তুমি তো লক্ষ্মী মেয়ে, তাই না? আম্মু জাস্ট কয়েকদিনের জন্য একটা কাজে যাচ্ছে, খুব তাড়াতাড়ি চলে আসব। তুমি এখানে দাদু আর নানুর সাথে একদম লক্ষ্মী হয়ে থাকবে, কেমন? কোনো দুষ্টুমি করবে না।"
আইরা প্রথমে একটু মন খারাপ করলেও মায়ের গলার দৃঢ়তা দেখে মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল, "আচ্ছা আম্মু, আমি লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকব। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।"
আইরাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে ইনায়া ইভানের দিকে তাকাল। ওর মুখটা এবার বেশ গম্ভীর হয়ে উঠল।
"অ্যারিস এখন জেলে আছে। তোমরা একটু ব্যবস্থা নিয়ে যত দ্রুত পারো ওকে ওখান থেকে ছাড়িয়ে এনো।"
ইনায়ার কথা শুনে ইভান আর সায়মা যেন আকাশ থেকে পড়ল। দুজনের চোখ পুরো চড়কগাছ!
ইভান হতভম্ব হয়ে বললো, "কী বলছেন ভাবী?! ভাইয়া জেলে মানে? আমরা তো ভাবছিলাম ভাইয়া আপনার রাগ ভাঙাতে আপনার ফ্ল্যাটেই আছে! ও জেলে কী করছে? পুলিশ ওকে কেন ধরল?"
ইনায়া একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের পেটের ব্যান্ডেজের ওপর হাত রেখে একদম শান্ত গলায় বলল— "ও আজ সকালে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। রাগের মাথায় ও আমার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছিল।"
ইভান আর সায়মা: "কীইইইইইইইইইই?!"
সায়মা আতঙ্কে নিজের মুখে হাত দিয়ে কেঁদে ফেলল, আর ইভানের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। অ্যারিস ভাইয়া ইনায়া ভাবীর পেটে ছুরি চালিয়েছে—এটা ওরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
ইনায়া ওদের আশ্বস্ত করে বললো, "শান্ত হও তোমরা, এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি একদম ঠিক আছি। ক্ষতটা গভীর নয়। তোমরা শুধু ওকে বেল করিয়ে নিয়ে এসো, বাকিটা আমি এসে দেখছি।"
কথাটা শেষ করেই ইনায়া ইভানের সাথে আলাদা কিছু কথা বললো। তারপর শেষবারের মতো ফেং ম্যানশনের দিকে তাকাল।
সোজা ওর নিজের বাপের বাড়ির দিকে গেলো ।
এই কয়েকটা দিনে বাসার সবাই জেনে গেছেন যে ইনায়া অ্যারিসকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে বাসা থেকে ও চলে গিয়েছে। ইনায়া যখন চেনা ড্রয়িংরুমে ঢুকল, তখন আফরিন সুলতানা সোফায় বসে ছিলেন। ইনায়াকে দেখামাত্রই ওনার মুখ-চোখ কঠিন হয়ে উঠল। নিজের মেয়ের ওপর ওনার তীব্র ক্ষোভ দলা পাকিয়ে বের হয়ে এলো।
"এই বাসায় আবার কেন এসেছ তুমি? যে মেয়ে নিজের এত বড় সংসারটা এক নিমেষে ভেঙে ছারখার করে দিতে পারে, তার এই মুখ আমি আর দেখতে চাই না! কেন এসেছ?"
ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসল। তার ভেতরের হাহাকারটা চেপে রেখে একদম নিস্পৃহ গলায় বলল—
"আমি এখানে থাকতে আসিনি, আম্মু..."
কথাটা বলেই সোজা দোতলায় নিজের সেই পুরনো রুমটার দিকে চলে গেল। রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। আলমারির সেকেন্ড ড্রয়ারটা টান দিয়ে খুলল। কিছু একটা রাখলো সেখানে। ড্রয়ারটা আটকে আরো কিছুক্ষণ ছিল সেখানে তারপর সে আবার শান্ত পায়ে নিচে নেমে এল। নিচে নামতেই আফরিন সুলতানা ওর দিকে তাকাতেই দুই জনের চোখাচুখি হয়।
"ভালো করে শুনে রাখো ইনায়া, এই বাড়ির দরজা আজ থেকে তোমার জন্য সারা জীবনের জন্য বন্ধ!"
ইনায়ার বুকের ভেতরটা যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। নিজের জন্মদাত্রী মায়ের মুখ থেকে এই কথা শোনার পর ওর বুক ফেটে কান্না আসছিল, গলার কাছে একটা কান্নার দলা আটকে আসছিল। কিন্তু ও ইনায়া ফেং! দুনিয়ার সামনে ও কখনো নিজের দুর্বলতা দেখায় না। ও সবার সামনে নিজেকে একদম স্বাভাবিক রাখল, চোখে এক ফোঁটা জলও আসতে দিল না। ও শক্ত মুখে মায়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সদর দরজা পার হয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।
কিন্তু লোহা দিয়ে গড়া ইনায়ার এই মুখোশটা বেশিক্ষণ টিকল না। বাসা থেকে বের হয়েই, রাস্তার এক কোণে একটা অন্ধকার ফুটপাতে ও ধপ করে বসে পড়ল। দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে ইনায়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। নিস্তব্ধ রাস্তায় ওর কান্নার আওয়াজটা এক অদ্ভুত হাহাকার তৈরি করল।
তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে... বুকটা যেন চিরে যাচ্ছে! দুনিয়ার সামনে, কোর্টরুমে সামনে সে নিজেকে যতটাই স্ট্রং দেখাক না কেন, আদতে সে তো রক্ত-মাংসের একটা সাধারণ মেয়ে! তারও একটা মন আছে, তারও ভীষণ কষ্ট হয়, সবার এই ভুল বোঝা আর অবহেলা ওকেও ভেতরে ভেতরে মেরে ফেলে। কিন্তু এই কান্না দেখার মতো, বা ওকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো আজ আর কেউ নেই। যেই মা একদিন অ্যারিস কে বলছিলো, আমার মেয়েকে কখনো বোঝা মনে হলে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিও। আজ সেই মা-ই কিনা বলছে এই বাড়িতে তোমার জায়গা নেই। আহা কত সুন্দর কথা! আর অ্যারিসও আজ ওর পাশে নেই। বেশ কিছুক্ষণ একনাগাড়ে কাঁদার পর ইনায়া ওখান থেকে উঠে দাঁড়াল। ওড়না দিয়ে চোখ-মুখ ভালো করে মুছে নিল। ওর চোখ দুটো তখন কান্নায় লাল হয়ে আছে। ও ধীর পায়ে গিয়ে ট্যাক্সিতে বসল এবং ড্রাইভারকে সোজা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে গাড়ি চালাতে বলল।
ট্যাক্সির জানালার বাইরে ঢাকার পরিচিত নিয়ন আলো আর চেনা রাস্তাগুলোর দিকে তাকিয়ে ইনায়া মনে মনে শূন্যতা অনুভব করল। এই দেশ, এই শহর তাকে শুধু আঘাত আর ভুল বোঝাবুঝির পাহাড় উপহার দিয়েছে। আজ সে দেশ ছাড়ছে... হয়তো বা আজীবনের জন্য...!!
এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে ইনায়া যখন চারপাশের কোলাহল দেখছিল, ওর ভেতরের শূন্যতা আর হাহাকারটা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। মাত্র পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে আইরাকে ও এভাবে ফেলে যাচ্ছে? বুকটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। যে মেয়েকে ও একটা মুহূর্ত চোখের আড়াল করে না, যাকে খাইয়ে দেওয়া, ঘুম পাড়ানো—সবকিছু ও নিজের হাতে করে, সেই আইরাকে অন্য এক দেশে রেখে ও কীভাবে থাকবে? শুধু আইরা কেন, নিজের বাপের বাড়ি, ভাই আদিয়ান, সুবা, সিয়ান এমনকি ফেং ম্যানশনের শামীমা বেগম—সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে ওর একটুও ইচ্ছে করছে না। এই মাটি, এই চেনা শহর, নিজের প্রিয় মানুষগুলোর মায়া কাটানো কি এতই সহজ? ইনায়ার মন বারবার চাতক পাখির মতো পেছনে ফিরে তাকাতে চাইছে। ইচ্ছে করছে সব প্ল্যান, সব ডিকোড করা ফাইল ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবার এক ছুটে গিয়ে আইরাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ও তো কোনো রোবট নয়, ও তো মা, ও তো একটা মেয়ে!
কিন্তু... ওর কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আজ সন্ধ্যায় নিজের মায়ের বলা সেই নির্মম কথাগুলো—“এই বাড়ির দরজা আজ থেকে তোমার জন্য সারা জীবনের জন্য বন্ধ!”
মায়ের ওই নিষ্ঠুর চেহারা আর পাথরের মতো কড়া গলার আওয়াজটা মনে পড়তেই ইনায়ার কষ্টে বুকটা ফেটে যেতে চাইল। যে মা ওকে জন্ম দিয়েছে, সে-ই কিনা পর করে দিল? একটা বারও জানতে চাইল না মেয়েটা কেন ডিভোর্সের কাগজ বানাল? কেন ও ঘর ছাড়ল? নিজের ভাইয়ের জন্য, পরিবারের সুরক্ষার জন্য ও নিজের জীবন বাজি রেখে মরণখেলা খেলছে, আর প্রতিদানে ও পেল কেবল ধিক্কার আর চিরকালের জন্য দরজা বন্ধের নিদান!
চোখের কোণ বেয়ে আবার এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ইনায়ার। ও হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জলটা মুছে ফেলল। মায়ের এই আঘাতটাই ওর ভেতরের নরম মনের সব মায়া-মমতাকে পাথর বানিয়ে দিল।
লাউঞ্জের অ্যানাউন্সমেন্টে ওর ফ্লাইটের সময় ঘোষণা করা হলো। ইনায়া ওর হ্যান্ডব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে পাসপোর্ট হাতে উঠে দাঁড়াল। আর পেছনে তাকাল না সে। বুকভরা কষ্ট আর মায়ের দেওয়া অপমানের আগুনকে নিজের শক্তি বানিয়ে ইমিগ্রেশনের বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেল।
.
.
Beijing Capital International Airport-এর বাইরে তখন কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল। ইনায়া যখন ইমিগ্রেশনের সব ফর্মালিটিজ শেষ করে ট্রলি ব্যাগটা টেনে এক্সিট গেট দিয়ে বের হলো, তখন তার ক্লান্ত চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। কিন্তু সেই শূন্যতা কেটে গেল সামনে পরিচিত একটা মুখ দেখে। ব্ল্যাক ওভারকোট পরে তার জন্য অপেক্ষা করছিল রোহান।
ইনায়া ঢাকা ছাড়ার আগেই রোহানকে চায়নাতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—চায়নাতে ওর থাকার জন্য একটা নিরাপদ আর স্থায়ী আবাসন তৈরি করা। রোহানও আস্থার পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছে। বেইজিংয়ের একটা অন্যতম সুরক্ষিত আর ভালো এলাকায় ইনায়ার নামে একটা ফ্ল্যাট কেনা থেকে শুরু করে, ঘরের ফার্নিচার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র—সবকিছু সে একাই গুছিয়ে রেখেছে।
রোহান এগিয়ে এসে ইনায়ার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বললো, "ওয়েলকাম টু বেইজিং, ম্যাম। ফ্লাইট কেমন ছিল? আপনি ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছেন। গাড়ি পার্কিংয়ে রেডি আছে, চলুন আগে ফ্ল্যাটে গিয়ে ফ্রেশ হবেন।"
ইনায়া শুধু একটা ক্লান্ত হিল্লোল তুলে মাথা নাড়ল।
এদিকে ঢাকায়, ফেং ম্যানশনে...
ইনায়ার নির্দেশ মেনে ইভান আর জিয়ান ফেং আইনি প্রক্রিয়ার সমস্ত পথ খাটিয়ে অবশেষে অ্যারিসকে বেল করিয়ে জেল থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে। পুরো রাস্তা অ্যারিস একদম নিশ্চুপ ছিল। ওর চোখের নিচে কালচে দাগ, মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। নিজের করা অপরাধের অনুশোচনায় ও ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। সে তো মারতে চায় নি, একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলো। এমন কিছু হবে জানলে সে ছুরি হতেই নিতো না। সে তার বউ কে কিভাবে আঘাত করলো? কিভাবে?
ইনায়া যাওয়ার আগে ইভানকে কড়া ভাষায় বারণ করে দিয়েছিল ওর চলে যাওয়ার কথা কাউকে না বলতে, তাই ইভান অ্যারিসকে কিচ্ছু জানায়নি।
ম্যানশনে ঢুকেই অ্যারিস কাওকে কোনো প্রশ্ন না করে সোজা নিজের অন্ধকার ঘরের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু আইরার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দরজার নিচ দিয়ে আলো জ্বলতে দেখে তারা পা দুটো থমকে গেল।
খটকা লাগায় অ্যারিস আইরার ঘরের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দেখল কলিজার টুকরো আইরা বিছানায় বসে একটা গল্পের বই উল্টাচ্ছে। এত দিন পর নিজের মেয়েকে এই ম্যানশনে দেখে অ্যারিস একাধারে চমকে গেল আর বুকটা স্বস্তিতে ভরে উঠল। ও দ্রুত গিয়ে আইরাকে বিছানা থেকে কোলে তুলে নিল। অ্যারিস আইরার কপালে চুমু খেয়ে, ব্যাকুল গলায় শুধাল, "আম্মু! তুমি এখানে? তোমার মাম্মা কোথায়? সেও কি এসেছে? ও কি নিজের রুমে আছে?"
আইরা বাবার গলার উৎকণ্ঠা দেখে বড় বড় চোখ করে তাকাল। তারপর ইনায়ার শিখিয়ে দেওয়া কথাটাই বলল—
"না বাবা, মাম্মা তো আসেনি। মাম্মা একটা খুব জরুরি অফিসের কাজে আমাকে এখানে দাদু আর নানুর কাছে রেখে গিয়েছে। বলেছে কিছুদিন পর কাজ শেষ করে এসে আমাকে নিয়ে যাবে।"
আইরার কথা শুনে অ্যারিসের মাথার ভেতরটা এক মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা দড়াম করে উঠল। কিসের কাজ? ইনায়া তো ল ফার্মের কাজ ছাড়া কোথাও যায় না, আর গেলেও আইরাকে কখনো এভাবে ফেলে যায় না! তবে আপাততঃ আইরা কে বেশ খানিকক্ষণ আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে। তারপর তাকে ঘুম পারিয়ে দিয়ে উঠে আসে। নিজের বেডরুমে ঢুকেই অ্যারিস দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। আর তার পরেই ভাঙা দেয়ালের মতো সে মেঝের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে ।
সে ওই কাজটা করতে চায়নি, সৃষ্টিকর্তা সাক্ষী ও ইনায়ার গায়ে একটা আঁচড়ও কাটতে চায়নি! সে তার ইনায়াকে ভালোবাসে—নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। কিন্তু ওই একটা মুহূর্তের অন্ধ রাগ... ও কীভাবে পারল নিজের হাতে নিজের কলিজার টুকরো বউটার রক্ত ঝরাতে? ইনায়ার ওই রক্তেভেজা জামা আর যন্ত্রণাকাতর চোখ দুটো ওর চোখের সামনে ভাসতেই তার পাগল পাগল লাগতে লাগল। তীব্র অপরাধবোধে অ্যারিস দেয়ালে এলোপাথাড়ি ঘুষি মারতে লাগল। হাতের আঙুলের চামড়া ফেটে রক্ত ঝরতে শুরু করল। দেয়ালের সাদা রঙের ওপর সেই তাজা রক্ত লেপ্টে যেতে লাগল। অ্যারিসের চোখের নোনা জল আর হাতের রক্ত যেন এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরের যে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, তার কোনো ব্যান্ডেজ ছিল না।
ওদিকে আদিয়ানের বাসায়...
হাতে বড় একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে আদিয়ান আজ ভীষণ খুশিতে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। ওর নতুন ডিলটা থেকে কোম্পানিতে বিশাল একটা অ্যামাউন্ট লাভ এসেছে। আদিয়ান চিল্লিয়ে সবাই কে ডাকলো, "সুবা! আম্মু! আব্বু! তাড়াতাড়ি আসো, সবাই একটু মুখ মিষ্টি করো। সুবা, আজ আমাদের কোম্পানির বিশাল সাকসেস! আর এই সবটাই কিন্তু ইনায়ার ওই সুন্দর প্রেজেন্টেশনের জন্য হয়েছে। আমি ভাবছি মিষ্টি নিয়ে আজই একবার ইনায়াকে নিজের হাতে মিষ্টি মুখ করাব।"
সুবা ড্রয়িংরুমে এসে সোফায় বসল। ওর মুখটা ভীষণ কালো। ও আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল—
"হয়তো মিষ্টি খাওয়াতে পারবে না, আদিয়ান। ও আর নেই..."
"কী বলছো সুবা? ও নেই মানে কী? অফিস থেকে কি কোথাও গেছে?"
সুবা চোখের জল মুছে বললো, "আদিয়ান....... আর আসবে না এই বাসায়... হয়তো কোনোদিনও না..."
আদিয়ান মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলে রেখে, হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। "কী বলছ এসব? কী হয়েছে খুলে বলো তো!?"
সুবা আজ সন্ধ্যায় ওর এই বাসায় আসা, আর আফরিন সুলতানা ওকে যেভাবে আজীবনের জন্য তাড়িয়ে দিয়েছেন—সবটা একদমে বলে দিল। সুবার কথা শেষ হতে না হতেই আদিয়ানের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে সোফায় বসে থাকা মায়ের দিকে তাকিয়ে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ল।
"আম্মু! তুমি ইনায়াকে ওই সব কথা কেন বললে? ও নিজের সংসার হারিয়ে, নিজের বাচ্চা হারিয়েছে, আরেক জন কে ও প্রায় হারাতে বসেছিল, এত কষ্ট বুকে চেপে এই বাড়িতে একটু আশ্রয়ের আশায় এসেছিল, আর তুমি ওকেই তাড়িয়ে দিলে?"
আফরিন সুলতানার এতক্ষণে তার ভেতরের মায়ের মমতা আর অপরাধবোধ একসঙ্গে জেগে উঠেছে, সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
"আমি তো ওরে শেষ করে দিতে চাইনি রে আদিয়ান! আমি ভেবেছিলাম এই বাসায় থাকতে না দিলে ও জেদ ভুলে আবার অ্যারিসের কাছে ফিরে যাবে, নিজের ঘরটা বাঁচাবে। কিন্তু পরে আমি ফেং বাড়িতে ফোন করে শুনলাম ও সেখানেও যায়নি... আইরাকে ইভানদের কাছে দিয়ে ও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! কেউ কিচ্ছু জানে না ও কোথায়! ওরে আমার মা রে... আমি তোকে কত বড় কষ্ট দিয়েছি! আমাকে মাফ করে দিস মা..."
আফরিন সুলতানা নিজের বুকে চাপড়ে মেঝেতে বসে কাঁদতে লাগলেন। এক কোণে এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবকিছু শুনছিলেন আনিসুর রহমান। ইনায়া তার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আদরের মেয়ে ছিল। মেয়ের এই পরিণতি আর নিজের স্ত্রীর এমন আচরণ শুনে তার বুকটা ভেঙে গেল। মুখ দিয়ে আর কোনো কথা সরল না। এক বুক কষ্ট আর শূন্যতা নিয়ে তিনি ওখান থেকে উঠে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। তার এই নীরবতা যেন পুরো বাড়ির কান্নার চেয়েও বেশি ভারী লাগছিল।
.
.
বেইজিংয়ের ফ্ল্যাটটিতে ঢুকে ইনায়া যখন ব্যাগটা সোফায় রাখল, তখন ওর পুরো শরীর আর মন যেন অবশতায় ডুবে গেছে। রোহান ওকে বারবার বলছিল ডিনারটা করে নিতে , ও নিজে সব খাবার রেডি করে রেখেছিল। কিন্তু ইনায়ার পেটে কোনো খাবারের ক্ষুধা ছিল না। সন্ধ্যায় ওর নিজের মায়ের মুখে বলা সেই বিষাক্ত কথাগুলোর বিষাদ যেন এখনো ওর জিভে লেগে আছে। মায়ের দেওয়া সেই অপমানের 'টেস্ট' এতটাই তিতা ছিল যে আর নতুন করে কিচ্ছু মুখে তুলতে ইচ্ছে করল না। সে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে সোজা বেডরুমের বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিল। চোখ বন্ধ করতেই আবার সেই ফুটপাতে বসে কাঁদার স্মৃতি, মায়ের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার দৃশ্যগুলো মনের ভেতর চাবুক মারতে লাগল। তবে ক্লান্তির চোটে কখন যে ওর চোখের জল শুকিয়ে ও ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল, ও নিজেও টের পেল না। এদিকে রোহান ইনায়ার সুরক্ষার কথা চিন্তা করে কোনো ঝুঁকি নেয়নি। সে ইনায়ার ঠিক পাশের ফ্ল্যাটটাই নিজের জন্য রেন্টে নিয়ে নিয়েছে। মাঝখানের দেয়ালটুকু ছাড়া ইনায়ার প্রতিটা মুভমেন্ট আর সেফটির দিকে নজর রাখার জন্য রোহান চব্বিশ ঘণ্টা একদম প্রস্তুত হয়ে রইল।
.
.
পরদিন সকাল...
ঘুম থেকে উঠেই ইনায়া আয়নার সামনে দাঁড়াল। রাতের সেই কান্নার দাগ, চোখের ফোলা ভাব—সব ও মুছে ফেলল। নিজের মেধা, ট্র্যাক রেকর্ড আর বেইজিংয়ের পুরনো লিগ্যাল কানেকশন ব্যবহার করে ইনায়া বেইজিংয়ের অন্যতম একটি নামকরা আন্তর্জাতিক ল ফার্মে জয়েন করল। কালো কোট আর পারফেক্ট প্রফেশনাল লুকে ইনায়া ওর নতুন অফিসের কেবিনে গিয়ে বসল !
.