কয়েকটা দিন দেখতে দেখতে কেটে গেল। বেইজিংয়ে ইনায়ার ডেলিভারির সময় একদম ঘনিয়ে এসেছে। ইনায়া একাই সব সামলাচ্ছিল, তাই এই কঠিন সময়ে তার পাশে থাকার জন্য রোহান বাংলাদেশের সমস্ত জরুরি কাজ খুব দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে আবার বেইজিংয়ে চলে আসে। এখানে আসার পর থেকেই
আদিকে ইনায়ার আশেপাশে দেখলে রোহানের মেজাজ একদম সপ্তমে চড়ে যায়। রোহান আদিকে মনে-প্রাণে একদমই সহ্য করতে পারে না, তাকে গোনাতেই ধরে না সে। রোহানের স্পষ্ট কথা—ইনায়া ম্যামের পাশে একমাত্র অ্যারিস স্যারকেই মানায়, অন্য কাউকে সেখানে কল্পনা করাও পাপ! তাই আদি যখনই ইনায়ার যত্ন নিতে বা তার খোঁজ নিতে একটু অতিরিক্ত আদিখ্যেতা দেখাতে আসে, রোহান তখন নিজের রাগ কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারে না।
আর মাত্র দুই দিন পর ইনায়ার ডেলিভারি। কিন্তু তার আগেরবার একটা গর্ভপাতের ইতিহাস থাকায় এবারের প্রেগনেন্সিটা ডাক্তারদের মতে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো রকম রিস্ক না নেওয়ার জন্য ডাক্তাররা ইনায়াকে ডেটের দুদিন আগেই হসপিটালে ভর্তি করিয়ে নিয়েছেন। রোহানের মাথার ভেতর প্রচণ্ড টেনশন ঘুরপাক খাচ্ছে। সে ভুলতে পারে না, আগেরবার যখন মিসক্যারেজ হয়েছিল, তখন ইনায়া মানসিকভাবে কতটা ভেঙে পড়েছিলো। কেমন যেন একদম চুপচাপ, পাথর হয়ে গিয়েছিলেন তিনি; দিনের পর দিন কারো সাথে একটা কথাও বলেননি। ইনায়ার সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে করে রোহানের বুকটা কেঁপে উঠছে। সে দুই হাত জোর করে আল্লাহর কাছে বারবার আকুল হয়ে দোয়া করছে, যেন এই বাচ্চাটা একদম সুস্থ-সবলভাবে পৃথিবীতে আসে, ইনায়া ম্যামের কোল যেন এবার আর খালি না থাকে।
হসপিটালের কেবিনে ভর্তি থাকার মাঝেই হঠাৎ ইনায়ার তীব্র প্রসব বেদনা উঠতে শুরু করল। ব্যথায় ইনায়ার শরীর কাঁপতে দেখে নার্স আর ডাক্তাররা স্ট্রেচারে করে তাকে দ্রুত ওটি-র দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। জরুরি ভিত্তিতে ইনায়াকে ওটি-র ইমার্জেন্সিতে ঢুকিয়ে দেওয়ার পর বাইরের করিডোরে এখন ভারী নীরবতা। ওটি-র দরজার বাইরে রোহান আর আদি দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে। রোহান দেয়ালের এক কোণে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে আর মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছে, আর আদি অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ওটি-র বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রতিটা সেকেন্ড যেন অনন্তকালের মতো কাটছিল। ওপাশে আদিও অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল, কিন্তু রোহান তাকে এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য করতে পারছিল না। ইনায়া ম্যামের এই জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইতে তার আসল মানুষটা, অর্থাৎ অ্যারিস স্যার যে পাশে নেই—এই আফসোসটা রোহানকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।
ডাক্তারদের ভেতরে যাওয়ার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা কেটে গেল। হুট করেই ওটি-র ভেতর থেকে একটা হালকা কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। রোহান সোজা হয়ে দাঁড়াল, তার কান কি ভুল শুনল?
পরের মুহূর্তেই ওটি-র লাল লাইটটা নিভে গেল এবং প্রধান ডাক্তার হাসিমুখে বাইরে বেরিয়ে এলেন। রোহান আর আদি দুজনেই একসাথে ডাক্তারের দিকে ছুটে গেল। ডাক্তার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন,
"কনগ্র্যাচুলেশনস! ইটস আ বয়! মা এবং সন্তান দুজনেই একদম নিরাপদ ও সুস্থ আছে। আগের হিস্ট্রির কারণে আমরা কিছুটা চিন্তিত ছিলাম, কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ্, সবকিছু খুব চমৎকারভাবে সম্পন্ন হয়েছে।"
"ছেলে হয়েছে!"—শব্দটা শোনামাত্রই রোহানের চোখ দিয়ে আনন্দ আর স্বস্তির জল গড়িয়ে পড়ল। সে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিল। আগেরবারের সেই অন্ধকার অধ্যায় পার করে আজ ইনায়া ম্যামের কোল আলো করে এক রাজপুত্র এসেছে! আদিও বেশ খুশি হয়ে ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইনায়াকে শিফট করা হবে।
.
.
বিকেলের দিকে ইনায়ার জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে এলে তাকে কেবিনে আনা হলো। ইনায়া বেশ দুর্বল, কিন্তু তার চোখের কোণে এখন শান্তির ছোঁয়া। তার পাশেই শুয়ে আছে টকটকে ফর্সা, কালো চুলে ভরা এক ফুটফুটে এক রাজপুত্র—যার মুখের আদল ঠিক... ঠিক যেন অ্যারিসের মতো!
ইনায়া তার ছেলের গালে হাত রাখল। আদি কেবিনে ঢুকে বাচ্চার দিকে হাত বাড়াতে গেলেই রোহান বেশ কৌশলে মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল, "আদি, ম্যাম এখন রেস্ট নেবেন। আর বাচ্চার ইনফেকশন হতে পারে, দূর থেকে দেখাই ভালো।" রোহানের কড়া চাউনি দেখে আদি কিছুটা বিরক্ত হয়েই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
রুমের ভেতর তখন শুধু ইনায়া আর রোহান। রোহান এগিয়ে গিয়ে বাচ্চার দিকে তাকিয়ে আবেগঘন গলায় বলল, "ম্যাম, আলহামদুলিল্লাহ্। একদম সুস্থ হয়েছে আমাদের ছোট স্যার। দেখতে পুরো অ্যারিস স্যারের মতো হয়েছে..."
অ্যারিসের নামটা শুনতেই ইনায়ার চোখের পাতা মৃদু কেঁপে উঠল। সে ছেলের কপালে চুমু খেলো। অ্যারিস কে ভুলে থাকতে চেয়েছিল, এখন কিভাবে থাকবে সে???
ইনায়া ছেলেকে নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। ছোট্ট রাজপুত্রটা শান্তিতে মায়ের ওমে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। রোহান কেবিনের এক কোণে দাঁড়িয়ে বাচ্চার কয়েকটা ছবি তুলল। তার খুব ইচ্ছে করছিল ছবিগুলো এখনই অ্যারিস স্যারকে পাঠিয়ে দিতে, কিন্তু ইনায়ার কড়া নিষেধের কারণে সে নিজের আবেগকে চেপে রাখল।
.
.
.
দেখতে দেখতে জীবনের ক্যানভাস থেকে একটা পুরো বছর কেটে গেছে, আর এই একটা বছরে অনেক কিছুই ওলটপালট হয়ে গেছে। ইনায়ার সেই ছোট্ট রাজপুত্র, তাদের আদরের 'আয়ান' এখন পুরো ১ বছরের এক টলটলে শিশু! দিন দিন সে যেমন ভীষণ দুষ্টু হয়ে উঠছে, তেমনি তার গায়ের রঙ আর চোখের চাউনি অবিকল অ্যারিসের মতো হয়েছে। যে-ই দেখে, সেই বলে এ যেন ছোটখাটো একটা অ্যারিস চীনের মাটিতে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। আয়ান এখন গুটিগুটি পায়ে সারা ঘর মাথায় করে বেড়ায়, আর তার পেছনে পেছনে ছুটে ইনায়া আর রোহানের দিন পার হয়ে যায়।
এই এক বছরে ইনায়ার জুয়েলারি বিজনেস চীনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বেশ ভালো নাম কুড়িয়েছে। সে নিজের বিজনেস আর সন্তানকে নিয়ে এখন অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে নিজেকে। তবে বাংলাদেশের সাথে সুতোটা কিন্তু একেবারেই ছিঁড়ে যায়নি। প্রতিদিন নিয়ম করে যখন বাংলাদেশে রাত নামে, তখন আইরা তার বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ইনায়াকে ভিডিও কল দেয়। স্ক্রিনের ওপারে আইরা আসতেই আয়ান খুশিতে হাত-পা ছুড়ে "আপ্পি... আপ্পি..." বলে চিৎকার জুড়ে দেয়। আইরা স্ক্রিনের ওপার থেকে তার পুতুলের মতো ছোট ভাইটাকে দেখে, চুমু খায় আর আধো-আধো গলায় কথা বলে। আয়ানের দুষ্টুমি দেখে আইরা খিলখিল করে হেসে ওঠে, আর ইনায়া মুগ্ধ হয়ে দুই ভাই-বোনের এই ভালোবাসা দেখে।
রোহান এখনো ইনায়ার বিজনেস আর আয়ানের সব দেখভাল একা হাতে সামলায়। সে প্রতিদিন আয়ানের নতুন নতুন দুষ্টুমির ছবি আর ভিডিও নিজের ফোনে জমিয়ে রাখে। মনে মনে সে এখনো সেই দিনটার অপেক্ষা করছে, যেদিন সে অ্যারিস স্যারের সামনে গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে—"দেখুন স্যার, আপনার ছেলে আজ কতটা বড় আর হ্যান্ডসাম হয়ে গেছে!"
.
.
.
বেইজিংয়ের সেন্ট্রাল কোর্ট বিল্ডিংয়ের করিডোর থমথমে। আজকের মামলাটা মোটেও সহজ ছিল না। গত তিন মাস ধরে চলা একটা মার্ডার কেসের চূড়ান্ত শুনানি ছিল আজ। ফরেনসিক রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান আর অকাট্য সব তথ্য-প্রমাণ একে একে সাজিয়ে, বিপক্ষী উকিলদের সমস্ত যুক্তি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ ফাঁসির রায় আদায় করে নিয়েছে ইনায়া।
কোর্টরুমের দরজা ঠেলে যখন সে বাইরে বের হলো, তখন চারপাশ থেকে মিডিয়ার সাংবাদিকরা তাকে ছেঁকে ধরল। মাইক আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের তীব্র আলো উপচে পড়ছিল তার মুখে। সবাই চাচ্ছিল এই হাই-প্রোফাইল কেস নিয়ে ইনায়ার একটা বক্তব্য নিতে। কিন্তু ইনায়া আজ কোনো কথা বলল না। পুলিশের সহায়তায় সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে সে দ্রুত প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আজ তার বড্ড তাড়া। অ্যাপার্টমেন্টে তার কলিজার টুকরো আয়ান অপেক্ষা করছে মায়ের জন্য। আজ সকাল থেকে বাচ্চার শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে, তাই মনটা ওখানেই পড়ে আছে।
আদালতের বিশাল সিঁড়ির মাঝামাঝি আসতেই পেছন থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
"ভাবী!"
চেনা ভাষায় চেনা ডাকটা শুনে ইনায়ার পায়ের গতি আচমকাই থেমে গেল। বেইজিংয়ের এই ব্যস্ত আদালত প্রাঙ্গণে তাকে এই নামে ডাকার মতো তো কেউ থাকার কথা নয়! সে ঘুরে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।
"ইভান? তুমি... তুমি এখানে?"
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইভানের পরনের কাপড় কিছুটা উসকোখুসকো, চোখে-মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। ইভান দ্রুত ইনায়ার দিকে এগিয়ে এলো। তার মুখটা তখন উদ্বেগে ফ্যাকাশে হয়ে আছে।
"ভাবী! খুব বড় একটা বিপদ হয়ে গেছে। আপনার সাথে আমার এক্ষুণি একটা ইমার্জেন্সি কথা ছিল।"
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, সে অস্থির গলায় বলল, "কী হয়েছে ইভান? বাংলাদেশে কিছু হয়েছে? আইরা ঠিক আছে তো? অ্যারিস—"
ইভান জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলল, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সে নিজের কথাটা শেষ করতে পারল না।
আদালতের উঁচু সিঁড়ি দিয়ে পাঁচজন পুলিশ অফিসার আজ সাজাপ্রাপ্ত সেই আসামিকে হাতকড়া পরিয়ে নিচের প্রিজন ভ্যানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটার চোখ দুটো তখন প্রতিহিংসায় রক্তবর্ণ হয়ে আছে। সে দূর থেকে ইনায়াকে দেখল। নিজের নিশ্চিত মৃত্যু পরোয়ানা দেখার পর তার ভেতরের পশুটা যেন জ্যান্ত হয়ে উঠল।
হঠাৎ করেই সে পশুর মতো চিৎকার করে উঠে চীনা ভাষায় বলল —
"তুই! তুই আমার জীবন শেষ করেছিস! তোকে আমি বাঁচতে দেব না!"
সবকিছু এত দ্রুত, চোখের পলকে ঘটে গেল যে আশেপাশে থাকা নিরাপত্তারক্ষী বা সাধারণ মানুষ কেউ কিছু বুঝে ওঠার সুযোগই পেল না। লোকটা নিজের হাতকড়া পরা হাত দুটো ঝাঁকিয়ে পাশের পুলিশ অফিসারের কোমর থেকে সার্ভিস রিভলভারটা ছিনিয়ে নিল। পুলিশ অফিসাররা চমকে উঠে চিৎকার করে উঠলেন—
"স্টপ! ড্রপ দ্য গান!"
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। লোকটা কোনো বাধা না মেনে উন্মাদনায় সরাসরি ইনায়ার বুক তাক করে ট্রিগার চেপে দিল।
ধাম!
টানা দুটো গুলির বিকট শব্দে পুরো আদালত প্রাঙ্গণ আর বেইজিংয়ের আকাশ কেঁপে উঠল। ইভান তখন ইনায়ার সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। বুলেটটি ইভানের ডান হাতের ওপরের অংশ মাংস ভেদ করে তীব্র গতিতে বেরিয়ে গিয়ে আঘাত করল ইনায়ার বাম কাঁধের ঠিক নিচে, বুকের সামান্য ওপরে।
ইনায়া: "আহ্!"
একটা তীব্র যন্ত্রণার আর্তনাদ করে ইনায়া আর ইভান দুজনেই একসাথ ভারসাম্য হারিয়ে শক্ত পাথুরে সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ল।
মুহূর্তের মধ্যে চারদিকের শান্ত পরিবেশ এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে ছুটতে লাগল। পুলিশ ফোর্স ততক্ষণে অ্যাকশনে নেমে গেছে।
"অফিসার ডাউন! কল অ্যান অ্যাম্বুলেন্স, কুইক!"
"সিকিউর দ্য সাসপেক্ট! শুট হিম ইফ হি মুভস!"
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চার-পাঁচজন পুলিশ অফিসার মিলে সেই খুনিকে মাটিতে আছড়ে ফেলে তার হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিল এবং তাকে বুট দিয়ে চেপে ধরে লক করে ফেলল।
কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। মাটিতে পড়ে থাকা ইনায়ার পরনের ধবধবে সাদা শার্টটা বুক চিড়ে বের হওয়া তাজা রক্তে দ্রুত ভিজতে শুরু করেছে। লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে কোর্টের ধূসর মেঝে। পাশে পড়ে থাকা ইভানের হাত থেকেও ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। ইভান নিজের যন্ত্রণা চেপে ধরে ছটফট করতে করতে ইনায়ার দিকে হাত বাড়াল।
ইভান ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে, ভাঙা গলায়, "ভাবী... ও ভাবী! চোখ খোলেন... আপনি ঠিক আছেন?"
কিন্তু ইনায়া কোনো উত্তর দিল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার চোখের পাতা জোড়া ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে, সে সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাগুলো এবার অন্য এক উন্মাদনায় মেতে উঠল। একটু আগে যে আইনজীবীর জয়ের ছবি তোলার জন্য তারা অপেক্ষা করছিল, এখন তার রক্তাক্ত দেহের দিকে তাক করে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক অবিরাম জ্বলতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চীনের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল হতে লাগল—
"আজকের ব্রেকিং নিউজ! বেইজিং সেন্ট্রাল কোর্টের বাইরে আসামীর গুলিতে গুরুতর আহত খ্যাতনামা ল'ইয়ার ইনায়া রহমান! আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার!"
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সাইরেন বাজিয়ে দুটি ইমার্জেন্সি অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছাল ঘটনাস্থলে। প্যারামেডিকরা গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত স্ট্রেচার বের করে ইনায়া আর ইভানকে তুললেন। একজন প্যারামেডিক ইনায়ার গলায় হাত দিয়ে পাল্স চেক করে দ্রুত অন্য সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন—
"পাল্স স্টেবল বাট ড্রপিং! ইন্টারনাল ব্লিডিং হচ্ছে... মুভ নাও!"
ধড়াম করে অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের দরজা দুটো বন্ধ হয়ে গেল। এরপর সাইরেনের শব্দে চারপাশের বাতাস ভারী করে গাড়িটি বেইজিংয়ের ট্রাফিক পেরিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে চলল।
অন্যদিকে,
বেইজিংয়ের সেই শান্ত অ্যাপার্টমেন্টে তখনো বাইরের এই ঝড়ের কোনো আঁচ এসে পৌঁছায়নি। ড্রয়িংরুমের সোফায় আদি বসে আছে। তার কোলে ফুটফুটে ছোট আয়ান। আদি তাকে খেলনা দিয়ে ভোলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু বাচ্চাটা বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে তার 'মাম্মা'কে খুঁজছে। আর পাশের সিঙ্গেল সোফায় বসে রোহান তার ল্যাপটপে গভীর মনোযোগ দিয়ে বাংলাদেশের নতুন টেক্সটাইল অফিসের এই সপ্তাহের প্রোগ্রেস রিপোর্ট দেখছিল। অ্যারিস স্যার যে কতটা ভালভাবেই ব্যবসাটা আবার দাঁড় করাচ্ছেন, তা দেখে রোহানের মুখে হাসি ছিল।
.
.
বাংলাদেশ –
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁইছুঁই। ড্রয়িংরুমের রাখা টেলিভিশনের পর্দায় হঠাৎ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান কেটে গিয়ে লাল অক্ষরে দগদগে ‘Breaking News’ ভেসে উঠল। সংবাদ উপস্থাপকের কণ্ঠে এক অদ্ভুত জরুরি সুর:
"চীনে আদালত প্রাঙ্গণে এক ভয়াবহ সশস্ত্র হামলায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট আইনজীবী ইনায়া ফেং এবং তার দেবর ইভান ফেং গুরুতর আহত হয়েছেন। বেইজিংয়ের সেন্ট্রাল কোর্টের বাইরে দোষী সাব্যস্ত এক আসামি পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে আকস্মিক গুলি চালালে এই ঘটনা ঘটে। দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। দুজনকেই দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।"
একই খবর, একই লাল স্ক্রল বারবার টিভির পর্দায় ঘুরছে। ভিডিও ফুটেজে বেইজিংয়ের সেই বিশৃঙ্খল আদালত প্রাঙ্গণ দেখা যাচ্ছে—পুলিশের দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি, স্ট্রেচারে করে রক্তাক্ত দুজনকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সেই ঝাপসা শিউরে ওঠা দৃশ্য।
ফ্যামিলির সবাই টিভির সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। কারও মুখে কোনো রঙ নেই। শামীমা বেগম দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরে পাগলের মতো কাঁদছেন। তার বুক চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে—
"আমার ছেলেটা... ও আল্লাহ, আমার ইভান, আমার ইনায়া ! ওদের কী অবস্থা... ওরা বেঁচে আছে তো?"
পাশে বসা আফরিন সুলতানা টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপছেন। তার চোখ দিয়ে নোনা জল বাঁধভাঙা বন্যার মতো গড়িয়ে পড়ছে। তিনি বিড়বিড় করে বলছেন—
"আমার মেয়েটা... আমার কলিজার টুকরোটাকে আমি একবার দেখতে চাই..."
বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। ইনায়ার বাবা পাশে চুপচাপ পাথরের মতো বসে আছেন। কিন্তু তার হাত দুটো অনবরত কাঁপছে। তিনি বারবার কাঁপাকাঁপা হাতে চশমাটা খুলে চোখ মুছছেন আর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন—
"কিছু হবে না... আমার ইনায়ার কিছু হতে পারে না। ও খুব শক্ত মেয়ে..."
কিন্তু নিজের কণ্ঠেই তিনি কোনো ভরসা পাচ্ছেন না। নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছে না। তার মেয়ের এই অবস্থা সে নিতে পারছে না। সে ডুকরে কেঁদে উঠছে—কেন? সব ঝড় কেন ইনায়ার ওপর দিয়েই যায়? কেন আল্লাহ তাদের সাথে এমন করে?