ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 58

লেখক: F. Tabassum

আইরা পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে হুট করে নিজের দুই হাত কোমরে গুঁজে মুখটা বাংলা পাঁচের মতো বানিয়ে ফেলল।
—"সব আদর বুঝি ওই পুচকুটাকেই করছো বাবা? আমার বুঝি কোনো দাম নেই? আমায় বুঝি একটুও চুমু করবে না?"
অ্যারিস মেয়ের এই কিউট জেলাসি দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে এক হাত দিয়ে আয়ানকে ধরে অন্য হাত দিয়ে আইরাকে নিজের কোলের মধ্যে টেনে নিল। তারপর আইরার দুই গালে আর কপালে পটাপট কতগুলো শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল
— "আমার আম্মুটা কি কখনো বাবার কম আদরের হতে পারে? এই যে আমার প্রিন্সেস!"
আইরা এবার বাপের গলার সাথে ঝুলে পড়ে ভাইয়াকে একটা ভেঙচি কাটল।
বেডরুমের দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত বুকে বেঁধে এই অপূর্ব ফ্যামিলি মোমেন্ট  দেখছিল ইনায়া ।

তারপর সকাল গড়িয়ে দুপুর নামার মুখে সবাই মিলে একে একে ফ্রেশ হয়ে নিল। অ্যারিস আর ইনায়া বাচ্চাদের গোসল করিয়ে নিজেরাও গা ধুয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। রোহান আগেই ফ্ল্যাটের ফ্রিজে আর ডাইনিংয়ে খাবার দাবার গুছিয়ে রেখে গিয়েছিল। ডাইনিং টেবিলে বসে তিনজনে মিলে শান্তিতে অনেকদিন পর একসাথে দুপুরের খাবারটা খেল। দুই বছরের সব ক্লান্তি যেন ওই এক থালা ভাতের গ্রাসে মুছে যাচ্ছিল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অ্যারিস যখন আয়ান আর আইরাকে নিয়ে বেডরুমে একটু রেস্ট নেওয়ার জন্য শুতে যাবে, তখনই ফ্ল্যাটের মেইন দরজায় তীব্র শব্দে  কলিং বেলটা বেজে উঠল—টিং টং!
ইনায়া নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে ড্রয়িংরুম পার হয়ে গিয়ে মেইন দরজাটা খুলল। আর দরজাটা খোলামাত্রই তার পায়ের নিচে যেন এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা থমকে গেল।
সামনে পুরো দলবল একসাথে দাঁড়িয়ে আছে!
আফরিন সুলতানা, আনিসুর রহমান, আদিয়ান, সুবা, সিয়ান, ইরা, জিয়ান ফেং, শামীমা বেগম, ইভান, সায়মা আর কোলে সাইভা।
ইনায়া পুরো দুই সেকেন্ড একদম নিথর হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার ওই শক্ত  রূপটা নিজের চেনা মানুষদের মুখগুলো দেখা মাত্রই কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বিশেষ করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের জন্মদাত্রী মায়ের চোখের জল দেখে সে নিজেকে আর এক ফোঁটাও আটকে রাখতে পারল না।
সে সামনে এগিয়ে গিয়ে আফরিন সুলতানাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। দুই বছরের সমস্ত অভিমান, একাকীত্ব আর জমানো কষ্ট যেন মায়ের বুকের ওমে গিয়ে এক নিমেষে গলে জল হয়ে ঝরতে লাগল। কত কত দিন সে নিজের মাকে দেখেনি! চীনে থাকার সময় আইরার মুখে মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মাকে সামনাসামনি দেখেনি। আজ মাকে ছুঁতে পেরে ইনায়ার কান্না আর থামতেই চাচ্ছিল না। আফরিন সুলতানাও নিজের কলিজার টুকরা মেয়েকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা আনিসুর রহমান নিজের চোখের কোণের জলটা চশমা খুলে মুছে নিয়ে  আদুরে, অভিমানী গলায় বললেন
—"তা, শুধু মায়ের জন্যই বুঝি সব কান্না? এই বুড়ো বাবাটাকে কি এক্কেবারে ভুলেই গেলি, মা?"
ইনায়া মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে ঝাপসা চোখে তাকাল। সে আনিসুর রহমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আনিসুর রহমান মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। পেছন থেকে আদিয়ান একটু সামনে এগিয়ে এসে ইনায়ার মাথায় জোরে একটা গাট্টা মেরে হাত রাখল। সে নিজের চোখের জল লুকাতে একটু কড়া ভাব ধরে বলল
—"এই… এইবার এইসব কান্নাকাটির ইমোশনাল নাটক একটু বাদ দে তো ! আসল জিনিস কই, মানে আমার ওই পুচকু ভাগ্নে আয়ান কই—আগে সেইটা বল!"
ভাইয়ের এই চেনা স্বভাবের কথা শুনে ইনায়া চোখের জল মুছতে মুছতে হেসে দিল। সে ভেতরের বেডরুমের দিকে ইশারা করে বলল
—"ভেতরে আইরার কাছে আছে।"
ইনায়ার মুখ থেকে এই কথা বের হওয়া মাত্রই বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা রহমান আর ফেং পরিবার  ইনায়াকে পাশ কাটিয়ে প্রায় হুড়মুড় করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। পেছনে জিয়ান ফেং আর ইভানও চওড়া হাসি নিয়ে ভেতরে পা বাড়াল।
ইনায়া একাই করিডোরের দরজার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের ফ্যামিলির এই কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে বিড়বিড় করে বলল—
"কী অদ্ভুত! আমি এত বড় একটা কেস জিতে আসলাম, দুই বছর পর দেশে ফিরলাম… আর কেউ আমাকে পাত্তাই দিল না? সবাই আমার ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত! এইটা কোনো কথা?!"
ভেতরে তখন এলাহী কাণ্ড। শামীমা বেগম আর আফরিন সুলতানা—দুই দাদী-নানী মিলে আয়ানকে কোলের মধ্যে নিয়ে চুমুর বৃষ্টি বইয়ে দিচ্ছেন। ইরা আর সুবা পাশ থেকে পুচকুর গাল টেনে কুঁইকুঁই করছে, আর ইভান সামনে দাঁড়িয়ে নানারকম অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে তাকে হাসানোর চেষ্টা করছে। আইরা আর সিয়ান এক কোণে দাঁড়িয়ে সবাইকে ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছে, যেন তারাই এই বাচ্চার একমাত্র অভিভাবক!
ইনায়া মুখ কালো করে ভেতরে এসে দাঁড়িয়ে তাদের এই অবহেলা মার্কা আনন্দের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অ্যারিস ইনায়ার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। সে ইনায়ার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল
— "দেখেছ, তোমার আর আমার এখন কোনো ভ্যালু নেই এখানে। চলো, এই সুযোগে আমরা গিয়ে রুমে একটু ঘুমাই… বড্ড ক্লান্তি লাগছে।"
ইনায়া ঘুরে বিরক্ত চোখে অ্যারিসের দিকে তাকাল। সে গলা নামিয়ে তীক্ষ্ণ সুরে বললো
—"ভুলে যেও না মিস্টার অ্যারিস ফেং, আমাদের অফিশিয়ালি ডিভোর্স হয়েছে! আমি তোমার সাথে এক রুমে ঘুমাতে যাবো কেন, কিসের অধিকারে?"
ইনায়ার মুখে এই এক ‘ডিভোর্স’ কথা শুনতে শুনতে অ্যারিসের মেজাজ এবার একদম চড়ে গেল। বেইজিং থেকে ঢাকা—এই দীর্ঘ দুই বছর ধরে সে এই একটা শব্দের টর্চার সহ্য করে আসছে। সে কোনো কথা না বলে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। গম্ভীর মুখে মাহিকে কল দিয়ে আদেশসূচক গলায় বলল
—"মাহি, আমি গুলশানের ফ্ল্যাটে আছি। এখনই লিগ্যাল পেপার্সগুলো নিয়ে এখানে এসো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে!"
কথাটা বলেই সে ফোনটা কেটে দিল। ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু অ্যারিস তার দিকে আর চোখ ফেরাল না। ঠিক চার থেকে পাঁচ মিনিটের মাথায় ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজল। অ্যারিস নিজেই গিয়ে দরজা খুলে মাহির কাছ থেকে একটি সিলমোহরযুক্ত আইনি কাগজ হাতে নিল। মাহি বসের মুখের ভয়ঙ্কর থমথমে ভাব দেখে একটা কথাও না বলে চলে গেল।
অ্যারিস ফাইলটা হাতে নিয়ে ডাইনিং রুমে টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়াল। সে কাগজটা ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল
—"সাইন করো এটাতে।"
ইনায়া একটু থতমত খেয়ে গেল। সে কাগজের ওপরের লেখাটা পড়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেখতে গেল যে এটা কিসের পেপার। অ্যারিসের ভেতরের জমানো সব রাগ আর ক্ষোভ যেন এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল! সে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের পানির গ্লাসটা ফ্লোরে ছুড়ে মারল।

শব্দে পুরো গ্লাসটা ভেঙে চুরমার হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অ্যারিস প্রায় গর্জে উঠে চেঁচিয়ে বলল
—"আমি তোমাকে দেখতে বলেছি?! বললাম না সাইন করতে! জাস্ট সাইন ইট!"
তার এই আকস্মিক সিংহগর্জন আর কাঁচ ভাঙার চিল চিৎকার শুনে পুরো ড্রয়িংরুমের মানুষ একসাথে চমকে উঠল! এতক্ষণ সবাই আয়ানকে নিয়ে এতটাই মশগুল ছিল যে, তারা ওপাশে ইনায়া আর অ্যারিসের ভেতরের এই চাপা উত্তেজনা বিন্দুমাত্র খেয়ালই করেনি। কাঁচ ভাঙার শব্দে শামীমা বেগম আর আফরিন সুলতানা বুক চেপে ধরলেন। ইভান তো আয়ানকে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
অ্যারিস এবার ইনায়ার কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে কাগজটা ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখল। পকেট থেকে একটা কলম বের করে সে জোর করে ইনায়ার ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে গুজে দিল। ইনায়া জাস্ট শকড হয়ে তার এই রুদ্ররূপ দেখছিল। সে আবার যেই না কাগজের নিচের লেখাটা দেখার জন্য বাম হাত দিয়ে সেটা সরাতে চাইল, অমনি অ্যারিস নিজের এক হাত দিয়ে কাগজের মেইন বডিটা শক্ত করে চেপে ধরে রাখল—যাতে ইনায়া ভেতরের লেখাটা কোনোভাবেই পড়তে না পারে।
ইনায়ার ভেতরের জেদও কম নয়। সে কলমটা টেবিলে ঠুকে দিয়ে বলল, "আমি না দেখে কোনো কাগজে সই করি না —"
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই অ্যারিস টেবিলের ওপর রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে একটা ধারালো ফল কাটার ছুরি তুলে নিল! তার চোখ দুটো তখন রাগে একদম লাল হয়ে গেছে, কপালে আর গলায় রাগের রগগুলো দপদপ করে কাঁপছে। সে ছুরিটা ইনায়ার হাতের ঠিক ইঞ্চি খানেক দূরে টেবিলের ওপর শক্ত করে গেঁথে ধরে হিংস্র গলায় বলল
—"আমি শেষবারের মতো বলছি ইনায়া… সই করো! নইলে আজ এখানে অন্য কিছু ঘটবে!"
পুরো ফ্যামিলির সবাই এই দৃশ্য দেখে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো। আদিয়ান আর আনিসুর রহমান —দুজনেই সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবার মনে তখন একটাই তীব্র আতঙ্ক—অ্যারিস যদি রাগের মাথায় আবার ইনায়াকে ছুরি মেরে বসে! দুই বছর আগের সেই রক্তক্ষয়ী স্মৃতি সবার মনে দগদগে।
কিন্তু এই মুহূর্তে কেউ একটা পা বাড়িয়ে তাদের মাঝখানে গিয়ে বাঁধা দেওয়ার সাহস পেল না। কারণ অ্যারিস যখন এই হিংস্র আর উন্মাদ রূপে থাকে, তখন তার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস এই দুনিয়ার কোনো মানুষের নেই। পুরো ড্রয়িংরুমে এখন এক নীরবতা, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাঁপছে ।

ইনায়া নিজের চেনা জেদ বজায় রাখার শেষ চেষ্টা করল। সে অ্যারিসের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
—"কাগজটা দেখলে তোমার সমস্যাটা কী, ? আমি না দেখে সই—"
অ্যারিস দাঁতে দাঁত চেপে, ভয়ঙ্কর স্বরে বললো, "তোকে বলেছি না আমার রক্ত আর গরম করবি না? সই কর!"
বলেই সে হাতের সেই ধারালো ছুরিটা পাশে থাকা কাঠের ডাইনিং চেয়ারটার হাতলের ওপর গেঁথে দিল! ছুরিটা কাঠের বুকে অর্ধেক ঢুকে গিয়ে কাঁপতে লাগল।
তার এই হিতাহিত জ্ঞানহীন হিংস্র রূপ দেখে ড্রয়িংরুমে বসা দুই পরিবারের সবাই একযোগে কেঁপে উঠলেন। শামীমা বেগম তো ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন, আর আফরিন সুলতানা আদিয়ানের হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। সবার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি অ্যারিস কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে!
অ্যারিস ছুরিটা ওভাবেই কাঠের বুকে গেঁথে রেখে টেবিল থেকে কলমটা তুলে আবার জোর করে ইনায়ার কাঁপতে থাকা হাতের আঙুলে গুঁজে দিল। ইনায়া এতক্ষণ শক্ত ভাব ধরে রাখলেও, অ্যারিসের চোখের ওই চেনা উন্মাদনা আর পাগলামি দেখে মনে মনে এবার সে-ও ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। সে খুব ভালো করেই জানে, এই লোকটাকে আর এক সেকেন্ড উস্কে দিলে সে নিজের হাত কেটে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে, নয়তো ফ্ল্যাট মাথায় করবে। আগেরবার তো প্লান করা ছিলো, এইবারে কোনো প্রটেক্টশন নেওয়া নেই। যার কারনে ইনায়ার আরো ভয় করছিলো।ইনায়া আর কোনো রিস্ক নিল না; সে চুপচাপ কলমটা চেপে ধরে কাগজের নির্দিষ্ট লাইনে নিজের অফিশিয়াল সই করে দিল।

এক সেকেন্ড আগে যে অ্যারিস রাগে-ক্ষোভে নরকের শয়তানের মতো ফুঁসছিল, ইনায়াকে সই করতে দেখেই সে এক পলকে একদম গলে জল হয়ে গেল! তার মুখের সমস্ত হিংস্রতা আর চোয়ালের কঠোরতা কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে সেখানে ভালোবাসায় ভরা চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে ছুরিটার ওপর থেকে হাত সরিয়ে, ইনায়াকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল এবং তার গালে শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে বসল!
—"এই তো আমার লক্ষ্মী বউ! গুড গার্ল!"
অ্যারিসের এই ১-জিবি স্পিডের অবিশ্বাস্য মেজাজ পরিবর্তন আর ইউ-টার্ন দেখে পেছনের পুরো পরিবার আরও বড়সড় ধাক্কা খেল! সবার চোখ তখন চড়কগাছ। ইভান তো হা করা মুখে নিজের সানগ্লাস চোখ থেকে খুলে আবার পরল, যেন সে কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভি দেখছে! এক সেকেন্ডে বাঘ কীভাবে বিড়াল হয়ে গেল, তা কারও মাথায় ঢুকল না।
ইনায়াকে ছেড়ে দিয়ে অ্যারিস নিজেই এবার কলমটা হাতে নিল এবং নিজের নামের জায়গায় সই করল।
আদিয়ান এতক্ষণে কিছুটা সাহস ফিরে পেয়ে গলা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করল
—"আরে অ্যারিস…ওগুলো আসলে কিসের পেপার? আমাদের তো বলবি!"
অ্যারিস কাগজটা টেবিল থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গালভরা হাসি দিয়ে বলল
— "নতুন করে তৈরি করা আমাদের বিয়ের কাবিননামা!"
কথাটা শুনে রহমান আর ফেং পরিবারের সবাই এক মুহূর্তের জন্য অবাক হলেও, পরক্ষণেই সবার মুখে এক খুশির হাসি ফুটে উঠল। যাক, দুই বছরের এই আইনি বিচ্ছেদের তবে আজ অফিশিয়ালি এবং লিগ্যালি শেষ হলো!
ইভান এই খুশির আমেজে সবার আগে ডাইনিং টেবিলের দিকে ছুটে এলো।
— "বাহ্ ভাইয়া, সাবাশ! কিন্তু আইনের নিয়ম অনুযায়ী এই নতুন কাবিননামায় তো সাক্ষীদের সই লাগবে। তা, এক নম্বর সাক্ষীর জায়গায় কি আমি আমার এই ঐতিহাসিক সইটা দিয়ে দেবো?"
অ্যারিস চওড়া হাসি দিয়ে পেপারটা ইভানের দিকে এগিয়ে দিল।
ইভান কালবিলম্ব না করে সই করল। এরপর আদিয়ান, জিয়ান ফেং, এমনকী আনিসুর রহমান সাহেবও হেসেই এগিয়ে এসে সাক্ষীর ঘরে নিজেদের সই বসিয়ে দিলেন। পুরো ঘর তখন আনন্দে গমগম করছে।
সাক্ষী দেওয়া শেষ করে ইভান কাবিননামাটা ইনায়ার চোখের সামনে একটু নাচিয়ে, রসিকতা করে বলল
— "অভিনন্দন ভাবী! তবে একটা কথা না বলে পারছি না… তোমাদের এই আট বছরের সম্পর্কে তোমরা অলরেডি তিন-তিনবার অফিশিয়ালি বিয়ে করে ফেললে!আরেকবার করলে পুরো ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হয়ে যাবে।"
ইভান তো হেসেই কূল পাচ্ছিল না, কিন্তু ওদিকে ইনায়া রহমান—থুড়ি, ইনায়া ফেং ততক্ষণে পুরো স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে টোটালি শক্দ্ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! কারন সে কোনোদিনও ডিভোর্সই দেয় নি অ্যারিসকে । ওই পেপারে সে নিজেই অ্যারিসের সাইন নকল করে সাইন করেছিলো। বারবার ডিভোর্সের কথা বলতো যাতে অ্যারিস দূরে থাকে।
.
.
.

আজকের রাতটা দুই পরিবারের কেউই আর নিজেদের আলাদা বাসায় ফিরে যেতে চাইল না। সবার মনে এতদিনের জমানো আনন্দ আর স্বস্তি যে, সবাই ঠিক করল আজ এই গুলশানের ফ্ল্যাটেই একসাথে থাকবে। তবে ফ্ল্যাটে এত মানুষের ঘুমানোর মতো পর্যাপ্ত রুম থাকলে ও বিছানা নেই। ইনায়া আর আইরা আগে দুই রুমে ছিলো তাই ওই দুই রুমে খাট বালিশ আছে। বাকি রুম গুলো ফাঁকা। তাই ইভান আর আদিয়ান আর দেরি না করে বাইরে গেল কিছু অতিরিক্ত বালিশ আর তোষক কিনে আনতে, যাতে রাতে সবার ঘুমানোর জায়গাটা সুন্দরমতো হয়ে যায়।
এদিকে ড্রয়িংরুমের কাঁচের টুকরোগুলো পরিষ্কার করে দিয়ে শামীমা বেগম আর আফরিন সুলতানা—দুই বেয়াইন মিলে একসাথে রান্নাঘরে ঢুকলেন। এত বড় আনন্দের দিনে ঘরের সবাইকে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়ানোর চেয়ে তৃপ্তির আর কী-ই বা হতে পারে!

ভেতরের বড় বেডরুমের বিছানায় তখন এক চাঁদের হাট বসেছে। বিছানার মাঝখানে ছোট্ট আয়ান উপুড় হয়ে খেলা করছে, আর আইরা তার পিঠের ওপর নিজের পুতুলগুলো সাজিয়ে রাখছে। একপাশে সায়মা কোলে নিয়ে বসে আছে সাইভাকে, আর তার পাশে সিয়ান সুবা’র হাত ধরে বসে আছে। ইনায়া মাঝখানে আরাম করে বসে দুই বছর পর তার চেনা মানুষগুলোর সান্নিধ্য উপভোগ করছে।
সুবা আবেগপ্রবণ গলায় বলল—
"আমার প্রিয় বান্ধবী এবং একমাত্র ননদিনী! তুই তো ওখানে গিয়ে আমাদের ভুলেই গিয়েছিলি। এই দুইটা বছর তোকে যে কত মিস করেছি, তা তোকে বলে বোঝাতে পারব না।"
সায়মাও পাশ থেকে ইনায়ার কাঁধে মাথা রেখে আদুরে গলায় সুর মেলাল
—"ঠিক বলেছো আপু। ভাবী, শুধু উনি না, আমিও তোমাকে প্রতিটা দিন অনেক অনেক মিস করেছি। ভাইয়া তো তোমার ছবি দেখে মাঝেমধ্যে পুরো পাগল হয়ে যেত!"
ইনায়ার চোখের কোণটা আবার একটু নরম হয়ে এলো। সে সুবা আর সায়মা—দুজনকেই নিজের দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে হালকা হেসে বলল
—"আমিও তোদের অনেক মিস করেছিলাম রে। একলা একলা ওই ভিনদেশে যখন রাত হতো, তখন এই বাংলাদেশের মানুষ গুলো তাদের সাথে দেয়া আড্ডাগুলোর কথা মনে করে খুব একা লাগত। ভালো লাগছে যে, সব ঝড় শেষে আবার তোদের মাঝে ফিরে আসতে পেরেছি।"
ইরা এসে ইনায়ার গলা ধরে জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তার এত ভালোবাসা দেখে সুবা আর সায়মা খিলখিল করে হেসে উঠলো।

এদিকে ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা এখন বেশ শান্ত । ডাইনিংয়ের চেয়ার থেকে ছুরিটা সরিয়ে সেখানে নতুন করে চা আর নাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সোফায় বসে অ্যারিস, জিয়ান ফেং এবং আনিসুর রহমান সাহেব নিজেদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা বলছেন। অ্যারিস খুব মনোযোগ দিয়ে বাবা আর শ্বশুরের কথা শুনছে আর মাঝে মাঝে ভেতরের রুমের দিকে তাকাচ্ছে, যেখান থেকে তার জীবনে ফিরে আসা বসন্তের—অর্থাৎ ইনায়া আর বাচ্চাদের হাসির মিষ্টি শব্দ ভেসে আসছে।
.
.

একটু পরেই আদিয়ান আর ইভান হাপাতে হাপাতে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দুুজনের মাথায় বালিশ আর তোষকের মস্ত বড় বড় পোটলা, আর ইভানের এক হাতে বিশাল একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট—যার ভেতর থেকে আইসক্রিমের ঠাণ্ডা ভাপ বের হচ্ছে।
ইভানের গলা শুনে আইরা রুম থেকে এক লাফে ড্রয়িংরুমে এসে আইসক্রিম দেখেই হাততালি দিয়ে উঠল—"ওহ্ ইভান চাচ্চু! তুমি কত্ত ভালো! আমার ফেভারিট আইসক্রিম এনেছ!"
—"সবাই নাও, যার যার পছন্দের ফ্লেভার জলদি বেছে নাও!"
ইভান ড্রয়িংরুম আর ভেতরের বেডরুমের সবাইকে একটা একটা করে আইসক্রিম বিলি করে দিল।

আইসক্রিম পর্ব শেষ হতেই রান্নাঘর থেকে শামীমা বেগম আর আফরিন সুলতানা ডাক দিলেন—খাবার রেডি। কিন্তু ফ্ল্যাটের ডাইনিং টেবিলে একসাথে এত মানুষের বসার জায়গা হবে না। তাই আদিয়ান আর অ্যারিস মিলে ড্রয়িংরুমের কার্পেটের ওপর নতুন চাদর বিছিয়ে নিচে বিশাল এক দস্তরখানের আয়োজন করল। সবাই গোল হয়ে একসাথে নিচে খেতে বসল। যদিও আয়ান আর সাইভাকে আগেই খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাই দুই পিচ্চি ততক্ষণে বিছানায় পেট পুরে শান্তিতে ঘুমিয়ে কাদা। নিচে পোলাও, রোস্ট আর গরুর মাংসের বাটি ঘুরতে লাগল। জিয়ান ফেং আর আনিসুর রহমান সাহেব পাশাপাশি বসে গল্প করছেন, আর ইরা আদিয়ানের প্লেট থেকে মাংস চুরি করার চেষ্টা করছে। অনেক দিন পর পুরো পরিবারে এমন এক আদিম, অকৃত্রিম আনন্দের মেলা বসল।

খাওয়াদাওয়ার পর আড্ডা শেষ করে গভীর রাতে সবাই যার যার মতো ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল। ফ্ল্যাটে মোট ৫টি বড় বেডরুম আছে, বড় সোফা আছে, তাই তোষক আর বালিশ নিয়ে যে যার মতো আরামদায়ক জায়গা গুছিয়ে নিয়ে ঘুমাতে চলে গেল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 58 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন