ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 63

লেখক: F. Tabassum

ইনায়ার এই এক লাইনের কথা শুনে ড্রয়িংরুমের পুরো পরিবেশ যেন ফ্রিজ হয়ে গেল! সবার চোখ পুরো 'হা' হয়ে গেল। ইভান নিজের কফি মগটা টেবিল রাখতে গিয়েও হাত থামিয়ে দিল, আর আদিয়ান তো পুরো আকাশ থেকে পড়ল। যেখানে পুরো পরিবার এই মুহূর্তে বাচ্চাদের সেফটি, সিকিউরিটি আর ওই ভয়ঙ্কর গ্যাংস্টারদের নিয়ে টেনশনে কাঁপছে, সেখানে এই মেয়ে হঠাৎ করে নির্বাচন আর রাজনীতির কথা কোথা থেকে টেনে আনল?!
আনিসুর রহমান সাহেব নিজের কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে উঠলেন
—"গেলো... আমার মেয়ের মাথাটা আজ আসলেই গেছে! হসপিটাল থেকে রিলিজ পেয়েই ও এসব কী উল্টাপাল্টা বলছে?!"
—"আব্বু, আমার মাথা একদম ঠিক আছে। আমি সবদিক খুব ভালোমতো ভেবেচিন্তেই বলছি। আম্মু, এইবার ঢাকা-৮ আসন থেকে তুমিই নির্বাচনে দাঁড়াবে। এই এলাকার বর্তমান ক্ষমতাশালী আশরাফ শাহ যেন কোনোভাবেই এইবার আর জয়ী হতে না পারে, সেই ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। তাছাড়া তুমি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেছ আড়াই বছরেরও বেশি সময় হয়ে গেছে। আইনি দিক থেকে তোমার নির্বাচনে দাঁড়াতে এখন আর কোনো বাধা নেই!"
অ্যারিস ইনায়ার কোমরের বাঁধনটা একটু আলগা করে তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। সে জানে, ইনায়া যখন এই মেজাজে কথা বলে, তখন তার পেছনে কোনো সাধারণ চাল থাকে না। ইভান টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল
—"ভাবী! প্লিজ ধাঁধা রেখো না তো! তোমার মাথায় চলা ওই আসল প্ল্যানটা কী? এই আক্রমণের সাথে তার ইলেকশনে দাঁড়ানোর সম্পর্কটা কোথায়?!"
ইনায়া এবার বাকি সবার দিকে তাকিয়ে একটু কাছে আসার ইশারা করল। অ্যারিস, আদিয়ান, ইভান, ইরা, জিয়ান ফেং আর আনিসুর রহমান সাহেব—সবাই মাথা নিচু করে ইনায়ার মুখের কাছাকাছি কান এগিয়ে আনলেন।
ইনায়া এক্কেবারে ফিসফিসানি স্বরে তার মাথার ভেতর সাজানো সেই মাস্টারমাইন্ড প্ল্যানটা বলতে শুরু করল... ।
ইনায়ার পুরো প্ল্যানটা শোনা শেষ হতেই ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। কিন্তু এইবার আর কারো চোখে ভয় বা বিস্ময় ছিল না, সবার চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন। জিয়ান ফেং আর আনিসুর রহমান সাহেব একে অপরের দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। সবাই ইনায়ার এই প্ল্যান অনুযায়ী একযোগে কাজে নামতে রাজি হয়ে গেল।
.
.

পরদিন সকালে আদিয়ান, অ্যারিস আর আফরিন সুলতানা একসাথেই বাড়ি থেকে বের হলেন। ইনায়ার সাজানো ছক অনুযায়ী তারা সরাসরি দেশের একটি প্রথম সারির, তবে বর্তমানে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে থাকা রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগ করলেন। দলটির নীতি-নির্ধারকেরা আগে থেকেই আফরিন সুলতানাকে খুব ভালো করেই চিনতেন। সুপ্রিম কোর্টের সাবেক নামী ও সৎ বিচারপতি হিসেবে সমাজে তাঁর এক বিশাল গ্রহণযোগ্যতা আর সম্মান রয়েছে—সেটা তারা জানতেন। এমন একজন ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিত্বকে নিজেদের দলে পাওয়া মানে দলের ভাবমূর্তি এক ধাক্কায় অনেক ওপরে উঠে যাওয়া। তাই দলের হাই কমান্ড আফরিন সুলতানাকে বরণ করে নিতে এক পায়ে রাজি হয়ে গেল।
আদিয়ান ও অ্যারিসের ব্যাকআপে, আফরিন সুলতানা দলের তহবিলে বেশ মোটা অঙ্কের অনুদান দিলেন এবং দলের অন্যতম প্রধান নীতি-নির্ধারক ও নেত্রী পদে অভিষিক্ত হলেন। যদিও এই রাজনৈতিক দলটি এই মুহূর্তে প্রতিপক্ষ দল আশরাফের দলের মতো অতোটা পেশীশক্তি আর অর্থশক্তিতে শক্তিশালী না; তবে ইনায়া ঠিক এই জিনিসটাই চাচ্ছিল। একটা আন্ডারডগ দলকে সামনে রেখে পেছন থেকে পুরো গেমটা কন্ট্রোল করাই ছিল তাদের আসল স্ট্র্যাটেজি। তাই তারা এই দলটাকেই ঠিক করল। দলের প্রাথমিক সব অফিশিয়াল কাজ, মনোনয়ন নিশ্চিতকরণ আর আইনি কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে নিতেই দুপুরের রোদ গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। অ্যারিসের নিজস্ব সিকিউরিটি টিম পুরোটা সময় ছায়ার মতো তাদের চারপাশ আগলে রেখেছিল।
সব কাজ শেষ করে, একদম শেষ মুহূর্তে তারা গাড়ি বহর নিয়ে সরাসরি হাজির হলেন রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে। নির্বাচন কমিশনের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আফরিন সুলতানা ঢাকা-৮ আসনের জন্য নিজের অফিশিয়াল মনোনয়নপত্র জমা দিলেন। রিটার্নিং অফিসার সম্মানের সাথে সাবেক বিচারপতির সেই মনোনয়নপত্র গ্রহণ করে সই করলেন। মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে যখন তারা নির্বাচন কমিশনের বিশাল ভবন থেকে বাইরে বের হয়ে এলেন, ততক্ষণে আকাশের সূর্যটা পুরোপুরি ডুবে গিয়ে চারপাশ জুড়ে একদম সন্ধ্যা নেমে গেছে।
.
.

তিন দিন পর
নির্বাচন কমিশনের কঠোর যাচাই-বাছাই পর্ব শেষ হলো। সকাল গড়াতেই সব টেলিভিশন চ্যানেল আর অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল করতে শুরু করল:
"ব্রেকিং নিউজ: ঢাকা-৮ আসনে সাবেক বিচারপতি আফরিন সুলতানার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন।"
খবরটা টিভিতে দেখা মাত্রই রহমান সহ ফেং পরিবাবের ড্রয়িংরুমে খুশির হাওয়া বয়ে গেল। সুবা চট করে মিষ্টির প্লেট নিয়ে এলো, আর ইভান তো খুশিতে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল। আর মাত্র কয়েকটা দিন, এর পরেই নির্বাচন কমিশন থেকে অফিশিয়ালি প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। আর প্রতীক পেলেই পুরো দমে নির্বাচনী মাঠে প্রচারণার কাজ শুরু করতে পারবে রহমান ও ফেং পরিবার।
তবে প্রতীক পাওয়ার আগেই যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এই একটা সিঙ্গেল নিউজেই পুরো দেশ অলরেডি জেনে গিয়েছে যে, সাবেক বিচারপতি আফরিন সুলতানা এবার সরাসরি ভোটের ময়দানে নেমেছেন। আর এই হাইপটা তৈরি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে ইনায়া নিজে। গত কয়েক মাসে আফরিন সুলতানার কেস, হাসপাতালের ওই কেস, ফিনিক্স জুয়েলারির পুনরুত্থান , বেইজিংয়ের সেই অ্যাক্সিডেন্ট, ঝরনা বেগমের কেস এবং
তিন দিন আগের সেই হাড়হিম করা লাইভ কিডন্যাপিং ঘটনার কারণে ইনায়া বারবার মিডিয়ার হেডলাইনে এসেছে। দেশের আনাচে-কানাচে, সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় পাতায় ইনায়া এখন এক অতি পরিচিত নাম।
আর ঠিক এই চেনা-জানা পরিচিতিটাই আফরিন সুলতানার জন্য এখন এক মস্ত বড় প্লাস পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যখনই দেখছে এই সাহসী ইনায়ার মা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, তাও আবার একজন সাবেক সৎ বিচারপতি—তখনই সাধারণ জনগণের মনে আফরিন সুলতানার প্রতি ভরসা আর আগ্রহ এক ধাক্কায় আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। নির্বাচনী মাঠ না নেমেই যেন অর্ধেক মন জয় করে নিলেন তারা...
.
.
.

নির্বাচন কমিশনের সেই একটি ঘোষণায় ঢাকা-৮ আসনের বর্তমান মন্ত্রী আশরাফ শাহের এতদিনের অটল গদিটা এবার সত্যিই কিছুটা নড়ে উঠল। ক্ষমতার অলিন্দে আশরাফ শাহ এক চিরচেনা নাম হলেও, সাবেক বিচারপতি আফরিন সুলতানার সাথে তাঁর শত্রুতাটা কিন্তু আজকের নয়—বহু বছরের পুরোনো। আর আজ, সেই পুরোনো শত্রু যখন সরাসরি ভোটের ময়দানে এসে তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তখন আশরাফের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক। তবে আফরিন সুলতানার দল ছোট। তা দেখে আশরাফ শাহের হাসি চওড়া হয়। আর যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে তার ছেলের মৃত্যুর কেস তুলবে। যা অর্জন করবে, তা শেষ সাথে সাথেই।
.

মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ার ঠিক দুই দিনের মাথায় নির্বাচন কমিশন থেকে প্রতীক বরাদ্দ করা হলো। আফরিন সুলতানা তাঁর সততা আর আইনি জীবনের সাথে মিল রেখে প্রতীক হিসেবে পেলেন ‘কলম’।
প্রতীক হাতে পাওয়া মাত্রই আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করা হলো না। রহমান ও ফেং পরিবার পুরো দমে নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে নেমে পড়ল। ঢাকা-৮ আসনের অলিতে-গলিতে, মোড়ে মোড়ে তৈরি হলো নির্বাচনী ক্যাম্প। আফরিন সুলতানা জায়গায় জায়গায় জনসভা করতে লাগলেন। তাঁর প্রতিটি সভায় সাধারণ মানুষের ভিড় জমতে শুরু করল। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে স্রেফ সস্তা রাজনৈতিক স্লোগান দিলেন না, বরং একজন সাবেক বিচারপতির জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে আইনি অধিকার রক্ষা, এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার মতো বাস্তবমুখী ও ভালো ভালো কাজের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিলেন। তাঁর সেই ধারালো বক্তব্য মানুষের মন ছুঁয়ে যেতে সময় নিল না।
এদিকে সেই ভয়াবহ হামলার রেশ অ্যারিস এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যায়নি। সে খুব ভালো করেই জানত, আফরিন সুলতানার এই আকস্মিক উত্থান এবং ইনায়ার চালের কারণে শত্রুপক্ষ যেকোনো সময় আরও মরিয়া হয়ে আঘাত করতে পারে। তাই অ্যারিস নিজের পুরো নেটওয়ার্ক আর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্সকে কাজে লাগিয়ে ইনায়া, সুবাসহ পরিবারের বাকি সবার প্রোটেকশন এক ধাক্কায় ১০ গুণ বাড়িয়ে দিল। এখন তাদের বাড়ির চারপাশে ২৪ ঘণ্টা সশস্ত্র বডিগার্ড পাহারা দিচ্ছে, আর বাইরে বের হলেই ছায়ার মতো অনুসরণ করছে বুলেটপ্রুফ গাড়ির বহর।

অন্যদিকে, আইরা আর সিয়ানের মানসিক অবস্থা তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ভরদুপুরের ওই হিংস্র কুকুর আর বন্দুকের ট্রমা দুটো বাচ্চার মনের ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। তাই ইনায়া আর সুবা মিলে সিদ্ধান্ত নিল—মানসিকভাবে পুরোপুরি স্ট্যাবল না হওয়া পর্যন্ত আইরা আর সিয়ানকে কিছুদিনের জন্য স্কুলেই পাঠানো হবে না, তারা ঘরেই থাকবে। বাচ্চাদের এই থমথমে মনটাকে হালকা করার দায়িত্ব নিল ফেং পরিবারের সবচেয়ে ছোট এবং আদুরে সদস্য—আয়ান আর সাইভা। ছোট্ট গোলগাল আয়ান যখন ড্রেসিংরুমের কার্পেটের ওপর বসে তার তোতলামো গলায় আধো-আধো শব্দ করে হাসত, আর খেলনা গাড়িগুলো নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটত, তখন আইরা আর সিয়ান নিজেদের সব ভয় ভুলে তার সাথে খেলায় মেতে উঠে। চার জন মিলে যখন ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি খেত, তখন সিয়ান আর আইরার ভেতরের জমে থাকা ট্রমাটা আস্তে আস্তে কেটে হালকা হতে শুরু করল। বাচ্চাদের মুখের সেই চেনা হাসি ফিরে আসতে দেখে ইনায়া , সায়মা, ইরা আর সুবার বুকের ওপর থেকে যেন একটা মস্ত বড় পাথর নেমে গেল।

প্রচারণার কাজ যখন তুঙ্গে, তখন আফরিন সুলতানার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়ালেন তাঁর স্বামী আনিসুর রহমান এবং বড় ছেলে আদিয়ান রহমান।  ছেলে আর স্বামীকে দুই পাশে নিয়ে আফরিন সুলতানা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইতে শুরু করলেন। আফরিন সুলতানাকে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক নামী বিচারপতি হিসেবে সারা বাংলাদেশের মানুষ একনামে চিনলেও, একটা বড় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো রহমান পরিবারকে। পুরো দেশের মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা থাকা এক কথা, আর একটা নির্দিষ্ট আসনের ভোটারদের মন জয় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। ঢাকা-৮ আসনের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী আর বস্তি এলাকার ভোটারদের একটা বড় অংশ আফরিন সুলতানাকে দূর আকাশের নক্ষত্রের মতোই মনে করত; তাদের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখের সাথী হিসেবে ভাবার মতো চেনা জানা ওই আসনে খুব কম মানুষেরই ছিল। তার ওপর সবচেয়ে বড় বাধা ছিল আশরাফ শাহের শিকড়। বছরের পর বছর ধরে ওই আসন থেকে মন্ত্রী থাকায়, আশরাফ শাহ পুরো ঢাকা-৮ আসন নিজের হাতের মুঠোয় করে রেখেছিল। এলাকার পাতি নেতা, বাজার কমিটি থেকে শুরু করে স্থানীয় মাস্তান বাহিনী—সবাই ছিল আশরাফের পকেটে। সাধারণ মানুষ ভালোবেসে হোক কিংবা ক্ষমতার ভয়ে, দীর্ঘদিন ধরে আশরাফ শাহকেই সাপোর্ট করে আসছিল। ফলে আফরিন সুলতানা যতই সৎ হোন না কেন, আশরাফের এই নিরেট ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরানোটা ছিল রীতিমতো হিমালয় জয়ের মতো কঠিন।
নির্বাচনী ক্যাম্পের ভেতরে আনিসুর রহমান সাহেব আর আদিয়ান এই স্থানীয় সমীকরণ আর ভোটারদের হিসাব মেলাতে গিয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
আনিসুর রহমান: "ইনায়া, সারা দেশের মানুষ টেলিভিশনে আফরিনের প্রশংসা করছে ঠিকই, কিন্তু আমার তো পুরো বাংলাদেশের মানুষ লাগবে না। আমার লাগবে এই ৮ আসনের মানুষগুলোর ভোট। আর এখানকার ভোটারদের সিংহভাগই তো আশরাফের অন্ধ সাপোর্টার কিংবা ওর ভয়ে মুখ খোলে না। এই দেয়াল আমরা ভাঙবো কীভাবে?"
ইনায়া টেবিলের ওপর বিছানো ঢাকা-৮ আসনের মানচিত্রটার দিকে তাকাল। সে খুব ভালো করেই জানত, আশরাফ শাহের এই দীর্ঘদিনের সাজানো রাজত্ব এক বা দুই দিনের জনসভায় ভাঙা সম্ভব নয়।
"আব্বু, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আশরাফের সাপোর্ট দেখে আমাদের পিছু হঠলে চলবে না। আম্মুকে বলুন যেভাবে প্রচারের কাজ চালাচ্ছেন, ঠিক সেভাবেই যেন দ্বিগুণ উৎসাহে চালিয়ে যান। জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট সভা করা, মানুষের সাথে হাত মেলানো—সব যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলতে থাকে।"
সে আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে যোগ করল
— "শত্রু যখন ভাবে সে দুর্ভেদ্য দুর্গের ভেতরে সুরক্ষিত আছে, ঠিক তখনই তাকে বাইরে থেকে ব্যস্ত রাখতে হয়। আম্মুর এই লাগাতার প্রচার আশরাফকে ব্যস্ত রাখবে, তাকে ভাবাবে যে আমরা স্রেফ ভোটের লড়াই লড়ছি। ও আমাদের এই প্রকাশ্য প্রচারণার দিকে নজর আটকে রাখুক। আর ওদিকে পেছনের দরজা দিয়ে আমি আর অ্যারিস ওর দুর্গের কোন ইটটা খসিয়ে দেবো, সেটা ও টের পাওয়ার আগেই খেলা শেষ হয়ে যাবে। আম্মু শুধু মাঠ গরম রাখুক, বাকিটা আমরা দেখছি।"
ইনায়ার এই অটল আত্মবিশ্বাস দেখে রহমান ও ফেং পরিবারের সবাই আবার নতুন উদ্যমে কাজে নেমে পড়ল। ইনায়ার কথামতো আফরিন সুলতানা প্রতিদিন সকাল হলেই ‘কলম’ প্রতীক নিয়ে ঢাকা-৮ আসনের অলিগলিতে নিজের জনসংযোগের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন।

নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, ঢাকা-৮ আসনের রাজনৈতিক পারদ ততই যেন চড়চড় করে ওপরে উঠছিল। একদিকে সাবেক বিচারপতি আফরিন সুলতানার ‘কলম’ প্রতীকের মার্জিত কিন্তু ধারালো প্রচার, আর অন্যদিকে বর্তমান মন্ত্রী আশরাফ শাহের চেনা রাজত্ব ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা। নিজের এতদিনের সুরক্ষিত গদি নড়ে উঠতে দেখে আশরাফ শাহও তাঁর বিশাল ক্যাডার বাহিনী আর টাকার গরম নিয়ে রাজপথে নিজের নির্বাচনী প্রচারণার কাজ দ্বিগুণ জোরেশোরে শুরু করে দিলেন। পুরো এলাকা জুড়ে তখন দুই দলের পোস্টার, ব্যানার আর মাইকিংয়ের শব্দে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

বিকেলে সেই চাপা উত্তেজনাই রূপ নিল এক প্রলয়ংকরী সংঘাতে। ঢাকা-৮ আসনের একটি ব্যস্ত মোড়ে আফরিন সুলতানার শান্তিকামী কর্মী-সমর্থকদের একটি মিছিলের মুখোমুখি হয়ে যায় আশরাফ শাহের বিশাল মোটরবাইক বহর আর ক্যাডার বাহিনী। দুই দল মুখোমুখি হওয়া মাত্রই বাতাসের গতিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্লোগান-পাল্টা স্লোগানের মাঝেই আশরাফ শাহের উগ্র সমর্থকেরা আচমকা লাঠিসোঁটা আর ইটপাটকেল নিয়ে ‘কলম’ প্রতীকের মিছিলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বসে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় আর সাধারণ মানুষ প্রাণভয়ে ছোটাছুটি শুরু করে। খবর পেয়ে তেজগাঁও জোনের বিশাল পুলিশ ফোর্স সাইরেন বাজিয়ে স্পটে এসে পৌঁছায় এবং লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল ছুঁড়ে কোনোমতে সেই বিশাল ঝামেলা শান্ত করে।
ঘটনার পরপরই আশরাফ শাহের মিডিয়া সেল উল্টো আফরিন সুলতানার কর্মীদের ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু ইনায়া আর অ্যারিস আগে থেকেই অ্যালার্ট ছিল। ইনায়ার নির্দেশে তাদের নিজস্ব আইটি টিম এবং পুলিশ প্রশাসন ওই মোড়ের আশেপাশের সবকটি শপিং মল ও রাস্তার সরকারি সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করে তা চেক করে। ফুটেজে পরিষ্কার দেখা যায়—আফরিন সুলতানার কর্মীরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সাইড দিয়ে যাচ্ছিল, আর আশরাফ শাহের লোকজনই আগে উস্কানিমূলক আচরণ করে প্রথম আঘাতটা শুরু করেছে।
ইনায়া সেই সিসিটিভি ফুটেজ দেশের সবকটি নামী টেলিভিশন চ্যানেল আর সোশ্যাল মিডিয়ায় লিক করে দেয়। বলাই বাহুল্য, এই সত্যটা সামনে আসতেই তা আফরিন সুলতানার জন্য এক মস্ত বড় প্লাস পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ জনগণ ও নিরপেক্ষ ভোটাররা আশরাফ শাহের এই গুন্ডামির ওপর তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং সাবেক বিচারপতির প্রতি তাদের সহানুভূতি ও সমর্থন এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে যায়।

এই ঘটনার পর আফরিন সুলতানা নিজের মনোবল আরও শক্ত করে আবার নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এবার আর বড় জনসভা নয়, ইনায়ার স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী তিনি ‘ডোর-টু-ডোর’ বা প্রতি বাসায় গিয়ে গিয়ে জনসংযোগের ওপর জোর দেন। আদিয়ান আর আনিসুর রহমানকে সাথে নিয়ে তিনি ঢাকা-৮ আসনের প্রতিটি মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের ঘরে ঘরে, প্রতি বাসায় গিয়ে গিয়ে সবার সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে লাগলেন। তিনি প্রত্যেককে আশ্বস্ত করে বলে আসছিলেন যে—ভয়ের দিন এবার শেষ হতে চলেছে, ব্যালট পেপারে একটা ‘কলম’ প্রতীকের সিল এই এলাকার অন্ধকার চিরতরে মুছে দেবে।

এদিকে, গত কয়েকদিনের বিশ্রামে ইনায়ার হাতের আর পিঠের ক্ষতগুলো বেশ খানিকটা শুকিয়ে এসেছে, সে এখন অনেকটাই সুস্থ। তবে অ্যারিস ফেং-এর কড়া নজরদারির কারণে সে এখনই ঘরের বাইরে পা রাখতে পারছে না। অ্যারিস তাকে বাসার বাইরে বের হতে না দিলেও, সে বাসার ভেতরে নিজের স্টাডি রুমে বসেই ল্যাপটপ আর ফোনের মাধ্যমে কোম্পানি ও লিগ্যাল কাজ একাই সামলাচ্ছিল।

নির্বাচন যখন এক্কেবারে দোরগোড়ায়, তখনই ধুরন্ধর রাজনীতিবিদের মতো আশরাফ শাহ দাবার বোর্ডে এমন এক চাল চাললেন, যা পুরো রহমান ও ফেং পরিবারকে স্তব্ধ করে দিল। সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁসের পর নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ার যখন খাদের কিনারায়, তখন আশরাফ শাহ কোনো পেশীশক্তি ব্যবহার না করে সস্তা ‘সিমপ্যাথি কার্ড’ খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন।
তিনি হঠাৎ করেই এক জরুরি এবং সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। ক্যামেরার ফ্লাশলাইটের সামনে আশরাফ শাহ একজন ক্ষমতাশালী নেতার খোলস ছেড়ে, একজন অসহায়, সন্তানহারা পিতার রূপ ধারণ করলেন। গলার স্বরকে করুণ আর চোখ দুটোকে ছলছলে করে তিনি লাইভ টিভিতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
আশরাফ শাহ টেবিল চাপড়ে, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কাঁপানো গলায় বললেন
—"ঢাকা-৮ আসনের ভাই ও বোনেরা...  আমার সব শেষ হয়ে গেছে! আপনারা যাকে এত সম্মান দিচ্ছেন, সেই সাবেক বিচারপতি আফরিন সুলতানা আসলে আইনের আড়ালে একজন খুনি! কয়েক বছর আগে আফরিন সুলতানা আমার একমাত্র কলিজার টুকরো ছেলে, ইষান শাহকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছেন! আমার নিষ্পাপ ছেলেটাকে তিনি নিজের হাতে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছেন! আজ সেই খুনি আমার আসনে দাঁড়িয়ে আপনাদের কাছে ভোট চাচ্ছেন? আমি একজন সন্তানহারা পিতা হিসেবে আপনাদের কাছে আজ বিচার চাই!"
এই পুরনো অভিযোগকে কেন্দ্র করে, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে আশরাফ শাহের আইটি সেল আর পেইড মিডিয়া হাউজগুলো বাড়িয়ে আরও হাজারটা মুখরোচক কথা এবং মিথ্যা তথ্য যোগ করতে শুরু করল। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাতারাতি নিউজটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল—"বিচারপতির রায়ের আড়ালে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ! এমপির ছেলেকে হত্যার নেপথ্যে আফরিন সুলতানা!"
মিথ্যার শক্তি যে কত ভয়ঙ্কর, তা রহমান পরিবার হাতেনাতে টের পেল। সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে ঢাকা-৮ আসনের যে আবেগপ্রবণ সাধারণ ভোটাররা এতক্ষণ আফরিন সুলতানার ‘কলম’ প্রতীকের দিকে ঝুঁকছিল, তারা এই হাড়হিম করা ‘সন্তান হারানোর’ কান্না দেখে মুহূর্তের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল।

রাজনীতিতে একটা প্রবাদ আছে—"জনগণ উন্নয়ন ভুলে যায়, কিন্তু পিতার কান্না ভোলে না।"
দেখতে দেখতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আদিয়ান, আনিসুর রহমান সাহেব এবং পুরো টিমের দিন-রাত এক করা হাড়ভাঙা খাটুনি আর সমস্ত চমৎকার প্রচার প্রচারণা যেন এক নিমেষে মাটির সাথে মিশে গেল। আফরিন সুলতানার ক্লিন ইমেজে এক বিশাল বড় কালিমার দাগ লেগে গেল, ক্যাম্পগুলোতে ভোটারদের আনাগোনা এক ধাক্কায় শূন্যের কোঠায় নেমে এল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 63 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন