পরদিন দুপুর।
অ্যারিস তখন তার কর্পোরেট অফিসে এক ইন্টারন্যাশনাল মিটিংয়ে ব্যস্ত। রহমান ভিলার পেছনের বাগানের নিরিবিলি কোণটায় এসে দাঁড়াল ইনায়া আর সুবা। দুপুরের কড়া রোদ গাছের পাতার ফাঁক গলে তাদের ওপর এসে পড়ছে, কিন্তু দুজনের চোখেই তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা। সুবা চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে সাবধানে নিজের ওড়নার তলা থেকে একটা খাকি রঙের ফাইল বের করে ইনায়ার হাতে দিল। সুবার মুখটা কিছুটা ফ্যাকাশে, যেন ফাইলের ভেতরের তথ্যগুলো তাকেও বেশ চমকে দিয়েছে।
ইনায়ার দিকে তাকিয়ে সুবা একদম নিচু স্বরে বলল
— "তোর সন্দেহ একদম ঠিক, ইনায়া। তুই মনে মনে যে নাম আর চেহারার কথা ভেবেছিলি, এই ফাইলের ভেতরের প্রতিটা লিঙ্ক, লোকেশন আর সোর্স সরাসরি সেই মানুষটার দিকেই আঙুল তুলছে। লোকটা সত্যিই আমাদের চোখের সামনেই এক মস্ত বড় খেলা খেলছিল।"
ইনায়া ফাইলটা হাতে নিয়ে তার ওপর একবার হাত বুলাল। এতদিনের সেই ধোঁয়াশা আর মনের ভেতরের ছটফটানিটা যেন এই এক ফাইলে এসে এক্কেবারে স্থির হয়ে গেছে। শত্রুর আসল পরিচয় এখন তার হাতের মুঠোয়! ঠোঁটের কোণে এক ভয়ঙ্কর হাসি ফুটিয়ে ইনায়া ফাইলটা শক্ত করে চেপে ধরল।
— "এইবার জমবে আসল খেলা! মুখোশের আড়ালে থেকে ও অনেক চাল চেলেছে, এবার দাবার বোর্ডের চালটা দেবো আমি স্বয়ং। আর সুবা... থ্যাংক ইউ সো মাচ রে! ভাবী তোকে জাস্ট আই লাভ ইউ !"
সুবা মুচকি হেসে ইনায়ার হাতটা চেপে ধরল, "আই লাভ ইউ টু, কিন্তু প্লিজ সাবধানে থাকিস। অ্যারিস ভাইয়া জানার আগেই যা করার কর।"
ইনায়া মাথা নেড়ে সায় দিল। আসল মাস্টারমাইন্ডের সুতোটা এবার তার হাতে চলে এসেছে।
দুপুরের সেই ফাইলের তথ্যগুলো জানার পর থেকেই ইনায়ার মাথায় একটা আত্মঘাতী কার্যকরী প্ল্যান ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে খুব ভালো করেই জানত—এই ভিলেনকে তার খাঁচা থেকে বের করে আনার একটাই উপায় আছে, আর তা হলো নিজেকে একটা টোপ হিসেবে তার সামনে ছুঁড়ে দেওয়া।
সন্ধ্যা নামার পরপরই ফেং ভিলার ব্যস্ততার সুযোগ নিল ইনায়া। অ্যারিস তখনো অফিস থেকে ফেরেনি, আর বডিগার্ডরা গেটের বাইরে পাহারায় ব্যস্ত। ইনায়া পেছনের দরজা দিয়ে কোনো বডিগার্ড ছাড়াই, একাই কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। সে একটা লোকাল ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে এলো গুলশানের এক মাল্টি-ব্র্যান্ড শপিং মলে। সন্ধ্যার পর মলে বেশ ভালোই ভিড় থাকে। ইনায়া জাস্ট সাধারণ একজন কাস্টমারের মতো ঘুরে ঘুরে কয়েকটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস পছন্দ করল। তারপর শপিং মলের সবচেয়ে নিরিবিলি কোণায় থাকা থার্ড ফ্লোরের এক লাক্সারি ব্র্যান্ডের শো-রুমে ঢুকল। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে সে একটা ব্ল্যাক স্লিট ড্রেস হাতে নিয়ে ট্রায়াল রুমের দিকে পা বাড়াল। এই ফ্লোরটা বেশ ফাঁকা, আর ট্রায়াল রুমের করিডোরটা এক্কেবারে নির্জন। ইনায়া ট্রায়াল রুমে ঢুকে দরজাটা আটকে দিল।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেবল ড্রেসটা ট্রায়াল দেওয়ার জন্য জিপারটা খুলতে যাবে, আচমকা ট্রায়াল রুমের ভেতরের বাল্বটা হালকা কেঁপে উঠে দপ করে নিভে গেল। আর তার পরের সেকেন্ডেই জেনারেটরের ব্যাকআপে একটা টিমটিমে লাল রঙের ডিম লাইট জ্বলে উঠল। পুরো ট্রায়াল রুমটা এক রহস্যময়, রক্তিম আলো-ছায়ায় ঢেকে গেল।
ইনায়ার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কোনো শব্দ না করে ট্রায়াল রুমের লক করা ভারী দরজাটা জাদুকরী উপায়ে খুলে গেল। আর সেই লালচে অন্ধকারের বুক চিরে ভেতরে এসে দাঁড়াল সেই দীর্ঘদেহী পুরুষ অবয়ব আদি। আজ তার মুখে কোনো কালো মাস্ক নেই, মাথায় ক্যাপ নেই। ট্রায়াল রুমের দরজার লকটা আদি পেছন থেকে আটকে দিল। লাল আলোয় তার পিশাচিক সুন্দর চেহারাটা স্পষ্ট ফুটে উঠল। তার চোখে-মুখে তখন এক উন্মাদের মতো ভালোবাসার চাউনি। আদি অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে এসে ইনায়ার দুটো হাত দেওয়ালের সাথে শক্ত করে পিন করে ফেলল। তার ভারী, সুঠাম শরীর দিয়ে সে ইনায়াকে দেওয়ালের সাথে এক্কেবারে চেপে ধরল। আবার সেই চেনা পারফিউম আর সিগারেটের কড়া সুবাসে ট্রায়াল রুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আদি ইনায়ার খুব কাছাকাছি এসে, তার তপ্ত শ্বাস ইনায়ার ঠোঁটে আছড়ে ফেলে মাদকতা ভরা গলায় হেসে উঠল
—"কোনো বডিগার্ড ছাড়া, একা একা শপিং মলের ট্রায়াল রুমে... তুমি কি সত্যিই এতটা অসতর্ক, ইনায়া? নাকি আমার জন্য তোমার এই অবাধ্য মনটা বড্ড বেশি ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, তাই নিজেই ধরা দিতে এলে? মাই অবসেশন..."
ট্রায়াল রুমের সেই লালচে আলো-ছায়ার মায়াজালে ইনায়া আদির চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। সে কোনো চিৎকার করল না, এমনকি লোকটার শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য কোনো শারীরিক কসরতও করল না। কারণ ইনায়া এবার তার ব্যাগে কোনো ছুরি বা অস্ত্র কিছুই সাথে নিয়ে আসেনি। সে খুব ভালো করেই জানত, এই আদির সামনে কোনো শারীরিক শক্তি খাটবে না। তাকে বন্দি করতে হলে আগে নিজেকে তার ডেরায় পৌঁছে দিতে হবে। ইনায়ার এই অদ্ভুত শান্ত ভাব আর সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ দেখে আদির চোখের কোণে এক পলকের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল, যা পরক্ষণেই এক পিশাচিক আনন্দে রূপ নিল। আদি ইনায়ার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট এনে ফিসফিস করে বললো, "কোনো প্রতিরোধ নেই? কোনো লড়াই নেই? তবে কি তুমি মেনেই নিলে ইনায়া... যে অ্যারিস ফেং নয়, তোমার আসল ঠিকানা শুধু আমার এই বুকে?"
সে পকেট থেকে ক্লোরোফর্ম ভেজানো একটা সিল্কের রুমাল বের করে সে ইনায়ার নাক আর মুখে চেপে ধরল। ক্লোরোফর্মের সেই তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধটা নাকে যেতেই ইনায়ার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল, চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে এলো। ইনায়ার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে আদির চওড়া বুকে ঢলে পড়ল।
শপিং মলের পেছনের আন্ডারগ্রাউন্ড কার পার্কিংয়ে আগে থেকেই একটা কালো রঙের মার্সিডিজ ভ্যান স্টার্ট দিয়ে রাখা ছিল। লোকটা ইনায়ার অচেতন শরীরটাকে একটা বড় ট্রলিব্যাগের ভেতরে করে মলের সিকিউরিটি আর সিসিটিভি ক্যামেরা ফাঁকি দিয়ে গাড়িতে তুলে নিল। পুরো অপারেশনটা সম্পন্ন হতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় লাগল। ঢাকা শহরের রাতের ট্রাফিক জ্যাম কাটিয়ে গাড়িটি দ্রুত গতিতে ছুটে চলল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের সেই পরিত্যক্ত এবং কড়া পাহারা ঘেরা পুরোনো ডকইয়ার্ডের দিকে।
রাত তখন আনুমানিক ৮টা।
ইনায়ার যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক বিশাল জানলাবিহীন অন্ধকার ঘরের মাঝখানে। ঘরের চারদিকের দেওয়ালে নীল আলো জ্বলছে। সে একটা কিং-সাইজ বিছানায় শুয়ে আছে। তার হাত-পা কোনো দড়ি দিয়ে বাঁধা নেই, কিন্তু তার মাথাটা তখনো ক্লোরোফর্মের কারণে হালকা ঝিমঝিম করছে। সে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসতেই ঘরের কোণার অন্ধকার থেকে হাততালির শব্দ ভেসে এলো।
ধীর পায়ে অন্ধকারের বুক চিরে আলোর সামনে এসে দাঁড়াল আদি। তার হাতের কাঁচের গ্লাসে তখন বরফের টুকরো আর দামী হুইস্কি। সে মুখোশহীন মুখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে হাসল।
—"আমার রাজপ্রাসাদে স্বাগতম, ইনায়া। তোমার জন্য এই খাঁচাটা আমি গত কয়েক বছর ধরে নিজের হাতে সাজিয়েছি। এখানে কোনো অ্যারিস ফেং নেই, কোনো আইন আদালত নেই, কোনো বডিগার্ডের দেয়াল নেই। এখানে শুধু তুমি আছো... আর তোমার এই চিরকালের প্রেমিক আছে।"
ইনায়া বিছানার চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে চারপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে ঠিক কোন জায়গায় আছে। লোকটা যে তাকে একটা গোপন আস্তানায় পারফেক্টলি কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছে, তা বুঝতে আর বাকি রইল না। কিন্তু ইনায়ার ঠোঁটের কোণে তখন ভয়ের বদলে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—"তুই ভেবেছিস তুই আমাকে কিডন্যাপ করে তোর ডেরায় এনেছিস? কিন্তু তুই জানিস না, বাঘ যখন শিকার করতে বের হয়, তখন সে নিজেই নিজেকে টোপ বানিয়ে শত্রুর গুহায় ঢুকে পড়ে। খেলা তো এবার শুরু হবে!"
আদি ভেবেছিল ইনায়া তার পাতা ফাঁদে এক্কেবারে নিঃসহায় হরিণীর মতো আটকা পড়েছে। সে তার হাতের হুইস্কির গ্লাসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে, নিশ্চিত ভঙ্গিতে বিছানার দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে-মুখে তখন ইনায়াকে স্পর্শ করার উন্মাদনা।
সে বিছানার ওপর ঝুঁকে এসে ইনায়ার গালে নিজের হাতটা ছোঁয়াতে গেল। ইনায়া যে কোনো অস্ত্র সাথে আনেনি, সেটা সত্যি। কিন্তু তার চুলে গুঁজে রাখা মেটালিক হেয়ারপিন ছিলো। ওটা দেখতে সুন্দর হলেও, তার সুচালো মাথাটা ছিল এক্কেবারে সার্জিক্যাল ব্লেডের মতোই মারাত্মক ধারালো! এক সেকেন্ডের মধ্যে ইনায়া নিজের ডান হাতটা দিয়ে মাথায় হাত রাখলো। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সে পুরো শক্তি দিয়ে সেই ধারালো মেটালিক চুলের কাঠিটা আদির গলার এক পাশে গেঁথে দিল!
—"আহহহ...!!!"
তীব্র যন্ত্রণায় এক হাড়হিম করা চিৎকার দিয়ে উঠল আদি। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এলো তার গলা বেয়ে। সে দুই হাতে নিজের গলা চেপে ধরে বিছানার পাশে মেঝের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। তার চোখের সেই অহংকার এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যন্ত্রণায় রূপ নিল।
ইনায়া খাট থেকে নেমে টেবিলের ওপর থেকে সেই ক্লোরোফর্ম ভেজানো সিল্কের রুমালটা তুলে নিল। আদি যখন গলার ব্যথায় ছটফট করছে, ইনায়া পেছন থেকে তার ওপর চড়ে বসে পুরো শরীরের ওজন দিয়ে রুমালটা আদির নাক আর মুখে চেপে ধরল।
ইনায়া আদির কানের কাছে মুখ এনে হিংস্র বাঘিনীর মতো ফিসফিসিয়ে বলল, "তু্ই ভেবেছিলি তুই মাস্টারমাইন্ড? তুই আমার বাচ্চাদের হুমকি দিবি আর আমি তোর খাঁচায় এসে বন্দি হব? আমি তোকে চেনার জন্যই তোর ডেরায় পা রেখেছি!"
আদি তার হাত দিয়ে ইনায়াকে সরিয়ে দেওয়ার শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু গলার ক্ষত আর ক্লোরোফর্মের তীব্র ড্রাগের জোড়া আক্রমণে তার শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এলো। তার চোখের মণি দুটো উল্টে গেল এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে পুরোপুরি সেন্সলেস হয়ে মেঝের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল।
কয়েক ঘণ্টা পর
ঘরের সেই নীল আলোটা এখন নিভে গেছে। তার বদলে পুরো ঘরজুড়ে জ্বলছে সাদা ফ্ল্যাশলাইট।
আদির যখন ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল, তখন সে টের পেল তার হাত-পা একটা লোহার চেয়ারের সাথে এক্কেবারে শক্ত শিকল দিয়ে লক করা। গলার ক্ষতে একটা কাঁচা ব্যান্ডেজ করা, যেখান থেকে এখনো হালকা রক্ত চুইয়ে পড়ছে। তার পুরো শরীর অবশ। সে চোখ পিটপিট করে তাকাতেই তীব্র আলোর আড়ালে দুটো অবয়ব দেখতে পেল। তার চোখের ফোকাস ঠিক হতেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
তার ঠিক সামনে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া। আর ইনায়ার ঠিক পাশে, নিজের স্যুটের পকেটে দুই হাত গুঁজে, মুখে খুনে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং অ্যারিস ফেং। অ্যারিসের পেছনে তখন তার ব্ল্যাক-ক্যাট মাফিয়া স্কোয়াড পুরো ডেরার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একে-৪৭ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই ডেরার প্রতিটি পাহারাদারকে অ্যারিসের ফোর্স ইতিমধ্যেই খতম করে দিয়েছে। অ্যারিস এক কদম এগিয়ে এসে আদির চুলের মুঠিটা ধরে তার মুখটা ওপরের দিকে তুলল। তার গলার স্বর এতটাই ডেডলি শোনাল যে মনে হলো নরকের দরজা খুলে গেছে
—"কী রে শালা? অনেক তো লুকোচুরি খেললি। আমার বউকে তোর খাঁচায় বন্দি করার খুব শখ ছিল না? এবার দেখ... তোর এই পুরো ডেরাটাকেই আমি তোর কবরস্থান বানিয়ে দিয়েছি। খেলা তো এবার সামনাসামনি হবে, কী বলিস?"
তীব্র ফ্ল্যাশলাইটের সেই ধবধবে সাদা আলোয় লোহার চেয়ারে বাঁধা পড়া লোকটার রক্তাক্ত ফেসটা আরও বিভীষিকাময় লাগছিল। গলার ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত তার শার্টের কলার ভিজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই অবস্থাতেও তার ধূসর চোখ দুটোতে পরাজয়ের কোনো গ্লানি ছিল না, ছিল এক উন্মাদের জেদ।
ইনায়া এক কদম এগিয়ে এলো। সে আদির মুখের সামনে ঝুঁকে এসে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল
—"হেল্লোওওওওও ইষান শাহ! হাউ আর ইউ?? তা এখন তোকে কোন নামে ডাকবো শুনি? ইষান শাহ বলবো, নাকি আদি শেখ??? ছদ্মবেশটা তো বেশ ধরেছিলে!"
ইষান শাহ ওরফে আদি শেখের চোখের মণি দুটো কেঁপে উঠল। ক্লোরোফর্মের ঘোর আর গলার তীব্র যন্ত্রণা ছাপিয়ে তার বুকের ভেতর এক মস্ত বড় ধাক্কা লাগল। সে নিজের ভাঙা গলা দিয়ে কোনোমতে খসখসে স্বরে জিজ্ঞেস করল
—"তু-তুমি... আমাকে চিনে ফেলেছো??? কীভাবে?!"
— "পার্টিতেই চিনে ফেলেছিলাম... যখন তোমার ওই তীক্ষ্ণ চাউনিটা আমার আঙুলের ফ্রেমে ধরা পড়েছিল। তবে তখনো পুরোপুরি শিউর ছিলাম না। সুবার ফাইলটা জাস্ট আমার সন্দেহটাকে কনফার্ম করেছে।"
কথাটা শুনে ইষান শাহ এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। আর তারপরেই, সেই নিস্তব্ধ ঘর কাঁপিয়ে সে হাহা করে হাসতে শুরু করল। এ কোনো সাধারণ মানুষের হাসি নয়, এ ছিল এক খাঁটি সাইকোপ্যাথের পৈশাচিক হাসি! হাসতে হাসতে তার গলার ক্ষত থেকে আবার রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তার পাগল করা চোখ দুটো ইনায়ার মুখের ওপর স্থির করে উন্মাদের মতো ভালোবাসার সুরে বলে উঠল
—"চিনেছো তো কী হয়েছে?" একটু থেমে আবার বলে, "আমি নিজেকে বারবার বুঝিয়েছি যে তুমি আমার নও, তোমার ছোঁয়া পাওয়া আমার ভাগ্যে নেই। কিন্তু যতবার তোমার থেকে দূরে সরতে চেয়েছি, ততবার এই নিষিদ্ধ টান আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, ইনায়া! এই দহন সহ্য করা যায়, কিন্তু তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না... আমি বাঁচতে পারি না তোমাকে ছাড়া!"
ইষানের এই নিষিদ্ধ ভালোবাসার স্বীকারোক্তি ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলল। এতক্ষণ ধরে পাশে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা অ্যারিস ফেং-এর ভেতরের মাফিয়া সত্তাটা এবার জেগে উঠল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, চোখের মণি দুটো রাগে কুচকুচে কালো রূপ নিয়েছে। সে ইষানের সামনে এসে দাঁড়াল। তার পকেট থেকে হাত দুটো বের করে সে ইষানের কলারটা এক হাতে মুঠো করে ধরল। তার গলার আওয়াজ পুরো ঘরকে এক হাড়হিম করা ঠান্ডায় জমিয়ে দিল
— "তুইও ওকে চাস, আমিও ওকে চাই। পার্থক্য শুধু একটাই—ও তোকে ঘৃণা করে আর আমার ওই অন্ধকার দিকটাকেই ও সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে! মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেয়াল হওয়ার চেষ্টা করিস না ইষান শাহ... দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া আমার পুরনো অভ্যাস!"
ইষান অ্যারিসের এত কাছে এসেও এক চুল ভয় পেল না। সে অ্যারিসের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে আবার চিৎকার করে উঠল
— "আমি ইনায়াকে ভালোবাসি... ভীষণ ভালোবাসি! ও আমার ছিল, ও আমারই থাকবে!"
অ্যারিস ইষানের কলারটা ছেড়ে দিয়ে নিজের স্যুটের হাতাটা একটু গুটিয়ে নিল। তারপর ইনায়ার কোমরটা এক টানে নিজের শক্ত বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে ইষানের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
—"তুই ওর কাছে স্বর্গ খুঁজতে এসেছিলে ইষান শাহ ..... আর ও আমার সাথে নরকে যেতে রাজি!"
অ্যারিসের এই একটা কথা যেন ইষান শাহর বুকে তীরের মতো এসে বিঁধল। ইনায়া অ্যারিসের বুকে নিজের হাতটা রেখে ইষানের দিকে এক অবহেলার দৃষ্টিতে তাকাল, যা ইষানকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার জন্য যথেষ্ট ছিল।
ইষান শাহ ওরফে আদি শেখের পৈশাচিক হাসির রেশটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতেই সেখানে দমবন্ধ করা নীরবতা নেমে এলো। অ্যারিসের শক্ত বাহুডোরের ভেতর থেকে ইনায়া নিজেকে মুক্ত করল। তার চোখে এখন আর কোনো সংশয় নেই, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। আছে কেবল জ্বলন্ত ঘৃণা। সে ইষানের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ইষানের গলার ক্ষত থেকে টপ টপ করে রক্ত ঝরছে, কিন্তু ইনায়ার পাথুরে মুখাবয়বে তার জন্য এক ফোঁটা করুণার লেশমাত্র নেই। সে নিচুগলায় প্রশ্ন করল
—"কেন এলি আবার আমার জীবনে? আদি শেখ হয়ে তো আন্ডারগ্রাউন্ডের সব ক্ষমতা নিয়ে নিজের জীবনটা বেশ উপভোগ করতে পারতি... কেন আবার এই নরকে পা বাড়ালি?"
ইষান তার শিকলবদ্ধ শরীরটা নিয়ে একটু নড়ে ওঠার চেষ্টা করল। তার ধূসর চোখ দুটো টলমল করে উঠল আকুল কান্নায়। সে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে অসহায়, কাতর গলায় বলে উঠল
—"তোমাকে ভুলতে পারছিলাম না আমি, ইনায়া... কিছুতেই পারছিলাম না। অনেকটা... অনেকটা বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোমায়। বিশ্বাস করো ইনায়া... আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, অনেক!"
ইষানের মুখে 'ভালোবাসা' শব্দটা শুনে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে এক কদম আরও এগিয়ে এসে ইষানের চোখের দিকে চোখ রেখে বললো,
—"ভালোবাসা?! ভালোবাসলে বুঝি অন্যের সুন্দর সংসারটা এভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হয়, ইষান?"