ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 70

লেখক: F. Tabassum

ইভান নিজের ছোট্ট মেয়ে সাইভাকে কোলে নিয়ে রুমে ঢুকল। সাইভা ততক্ষণে ঘুমের ঘোরে ইভানের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইভানের পেছনেই সায়মা যেভাবে পা টেনে টেনে, মুখ কালো করে রুমে ঢুকল, তা দেখে ইভানের কপাল কুঁচকে গেল। সে সাইভাকে আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সায়মার দিকে তাকাল।
—"কী হলো বউ? মুখটা অমন বাংলা হাঁড়ের মতো করে রেখেছ কেন? এত বড় খুশির খবরেও তোমার মন খারাপ?"
সায়মা খাটের এক কোণায় ধপাস করে বসে দুই হাত গালে দিয়ে অভিমানী গলায় বলল
—"মন খারাপ হবে না? ইনায়া ভাবীর দুটো বাবু, এখন আবার সুবা আপুরও দুটো বাবু হতে যাচ্ছে... শুধু আমারই একটা! আমারও এখন আরেকটা বাবু চাই-ই চাই!"
সায়মার মুখে এই আকস্মিক আবদার শুনে ইভানের কলিজা শুকিয়ে এক্কেবারে কাঠ! সে মনে মনে দুই হাত তুলে মোনাজাত করার ভঙ্গিতে বলল—ইয়া আল্লাহ, বাঁচাও আমারে! পাগলটা আবার অসময়ে ক্ষেপছে!
তবে নিজের মনের ভয়টা চেপে মুখে একটা মস্ত বড় মিথ্যে সান্ত্বনা দিতে সে সায়মার পাশে এসে বসল
—"আহা! নিজের কত শান্তি, সেটা তো দেখছ না? সারাদিন আরামে ঘুমাও, খাও, ঘুরে বেড়াও, মাথায় কোনো টেনশন নেই। আর এইদিকে আমার অবস্থা দেখো—এই একটা বাচ্চাকে সামলাতে সামলাতেই আমার জান শেষ! রাত তিনটের সময় যখন ম্যাডাম উঠে চিল চিৎকার জুড়ে দেন, তুমি তো তখন নাক ডেকে ঘুমাও। আর আমাকে উঠে কোলে নিয়ে সারারাত নাচাতে হয়। এই ধকল সামলে আবার নাকি আরেকটা...! বাপরে, আমি গেলাম ঘুমাতে, আমার দ্বারা আর হবে না।"
কথাটা বলেই ইভান চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ার ভঙ্গি করতেই সায়মা বাচ্চার মতো দুই পা ছুড়ে একদম কান্না জুড়ে দিল
—"আহহহ! আমি কিচ্ছু জানি না, আমার এখনই আরেকটা বাবু চাই! "
সায়মার এই তুমুল কান্নাকাটিতেই ঘুমের ঘোরে থাকা সাইভা চোখ পিটপিট করে জেগে উঠল। সে বিছানায় বসে বড় বড় চোখ করে একবার তার কান্নারত আম্মুর দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার আব্বুর দিকে তাকাচ্ছে। সাইভার এই অবুঝ চাউনি দেখে ইভানও মেয়ের দিকে তাকাল। পুরো দৃশ্যটা এতটাই হাসির ছিল যে ইভান নিজের হাসি চেপে সায়মার দিকে আঙুল তুলল
— "এই দেখো! তোমার নিজের মেয়েও এখন এক্কেবারে কনফিউজড হয়ে গেছে যে এই ঘরের আসল বাচ্চাটা কে? সে নাকি তার আম্মু?"
সায়মা চোখের জল মুছতে মুছতে আরও জোরে গোঁ ধরে বললো, "যা-ই বলো তুমি, আমার বাবু চাই-ই চাই!"
এবার ইভান বুঝল, লজিকে কাজ হবে না। সে সায়মার খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে তার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তারপর একদম গলে জল হয়ে, গলার স্বর খাঁটি মধুর মতো নরম করে তোষামোদ করতে শুরু করল— "আরে আমার ময়না পাখি! আমার লক্ষ্মী বউ, আমার কলিজার পিঞ্জর, এই দুনিয়ায় আমার একমাত্র আদরের বউ... একটু শান্ত হও না প্লিজ। আগে আমাদের এই সাইভা মা একটু বড় হোক, নিজের পায়ে হাঁটুক, তারপর না হয় তোমার এই আবদার আমি মাথার তাজ করে রাখব। এখন অন্তত কেঁদো না, লক্ষ্মীটি!"
ইভানের মুখে তেলতেলে সংলাপ শুনে সায়মার কান্নার বেগটা একটু কমল। সে চোখ দুটো ছোট ছোট করে ইভানের দিকে তাকিয়ে হালকা একটা নাক টেনে কান্না থামাল। ঘরের আবহাওয়াটা অবশেষে শান্ত হতে দেখে ইভান মনে মনে একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাক, আজকের মতো ফেং পরিবারের ছোট ছেলের ওপর থেকে আসন্ন তুফানটা অল্পের জন্য টলে গেল!
সায়মা একটু শান্ত হতেই ইভান একটা মস্ত বড় ফাঁড়া কাটার মতো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে সায়মার চোখের কোণে লেগে থাকা জলের ফোঁটাটুকু নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে মুচকি হাসল।
—"এই তো আমার লক্ষ্মী বউ! এবার চলো, আর রাত না বাড়িয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ি।"
সায়মা ইভানের বুকেই মাথাটা রাখল। ঘরের মৃদু নীল আলোয় সায়মা আর সাইভাকে নিজের দুই বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরে ইভানও ঘুমের দেশে পাড়ি দিলো।

পরদিন সকাল
ফেং ভিলার বিশাল ডাইনিং টেবিলটা তখন সকালের নাস্তায় এক্কেবারে গমগম করছে। গরম লুচি, আলুর দম, আর সুজি-হালুয়ার সুবাসে পুরো ঘর ম ম করছে।
টেবিলের এক মাথায় জিয়ান ফেং আর আনিসুর রহমান বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর খবরের কাগজ নিয়ে আলোচনা করছেন। আফরিন সুলতানা আর শামীমা বেগম রান্নাঘর থেকে গরম গরম লুচি এনে সবার পাতে তুলে দিচ্ছেন।
সুবা আর আদিয়ান এক কোনায় বসে আড্ডা দিচ্ছে । নতুন অতিথির আগমনের খবরে আদিয়ান যেন সুবাকে চোখের আড়াল করতেই চাইছে না। আর আইরা, সিয়ান, আয়ান আর সাইভা—চার বাচ্চা টেবিলের নিচে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পুরো ডাইনিং রুম মাথায় তুলছে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো অ্যারিস আর ইনায়া। ইনায়ার পরনে এখন একটা হালকা গোলাপী রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ, চুলগুলো পিঠে ছড়ানো। আর অ্যারিস একটা সাদা ক্যাজুয়াল শার্ট পরেছে। তাদের দুজনকে একসাথে নামতে দেখেই ইভান এক গাল হেসে চেঁচিয়ে উঠল
— "আরেহ! গুড মর্নিং বড় ভাই, গুড মর্নিং ভাবি! তা কাল রাতের ক্লান্তি সব দূর হলো তো? নাকি কেক আনতে গিয়ে যে জ্যামে পড়েছিলে, সেই জ্যামের ঘোর এখনো কাটেনি?"
ইভানের এই ডাবল মিনিং কথা শুনে ইনায়া ডাইনিং টেবিলের চামচটা তুলতে গিয়েও থেমে গেল।
অ্যারিস ইভানের পাতে একটা আলুর দম ছুঁড়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো, "তোর মুখটা যদি সকাল সকাল একটু বন্ধ রাখিস ইভান, তবে তোর স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো হবে।"
শামীমা বেগম ইনায়ার পাশে এসে আদর করে তার মাথায় হাত রাখলেন।
— "বস ইনায়া মা, খেয়ে নাও। গত কয়েকটা দিন তোদের ওপর দিয়ে যে কী ঝড়ঝাপটা গেছে আমি জানি। আজ থেকে আমার আর কোনো চিন্তা নেই। আমার ছেলে আর আমার বউমা যখন একসাথে থাকে, তখন কোনো শয়তানের সাধ্য নেই এই পরিবারের দিকে চোখ তুলে তাকায়।"

অ্যারিস ইনায়ার কানের কাছে মুখ এনে চিলড গলায় ফিসফিসিয়ে বলল
—"কাল রাতে যে আদরটা ডিউ রয়ে গিয়েছিল ইনায়া... আজ রাতে কিন্তু কোনো ডিস্টার্বেন্স আমি সহ্য করব না। তোমার ওই নীল শাড়িটা তৈরি রেখো।"
ইনায়া টেবিলের নিচ থেকে অ্যারিসের পায়ে নিজের জুতো দিয়ে হালকা একটা চাপ দিয়ে মুখ টিপে হাসল। চোখ রাঙিয়ে বলল, " একটু ভদ্র হন!"

ইভান নিজের কপালটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে এক্কেবারে কান্নারত মুখে বললো
—"নাআআআআআআ! আবার?! এই সব আর সহ্য করা যাচ্ছে না! ইয়া আল্লাহ, তুমি আমারে তুলে নাও, না হয় ওই বুড়িগঙ্গার অ্যাসিডের ড্রামে আমারে চুবায় মারো! বড় ভাই আর ভাবির এই চব্বিশ ঘণ্টার রোমান্স আর এই ফ্লার্ট করার অত্যাচার আমি আর সহ্য করতে পারছি না!"
ইভানের এই নাটকীয়তা দেখে আদিয়ান আর সুবা নিজেদের মুখ চেপে হাসতে লাগল। ইরা তো সোজা টেবিল চাপড়ে হেসে খুন।
ইভান সায়মার হাত ধরে বড্ড করুণ গলায় বললো, "বউ, তুমি দেখলে? দেখলে তোমার ভাসুরের কাণ্ড? এখানে পুরো ফ্যামিলি বসে লুচি-হালুয়া খাচ্ছে, আর উনি ডাইনিং টেবিলের নিচে ভাবির পা ধরে রোমান্টিক ডায়ালগ দিচ্ছেন! এই অত্যাচার কি সহ্য করা যায়, বলো?"
ইনায়া এবার লজ্জায় এক্কেবারে লাল হয়ে গেল। সে চট করে নিজের পা-টা অ্যারিসের থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে টেবিলের ওপরে দুই হাত রেখে নিরীহ একটা মুখ করল।
অ্যারিস তখন চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। সে ইভানের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল
—"ইভান, তোর যদি আমার আর ইনায়ার রোমান্স দেখে এতই কষ্ট হয়, তবে তুই চোখ বন্ধ করে রাখতে পারিস। আর যদি বেশি কথা বলিস, তবে আজ রাতে তোকে এই বাসায় ঢুকতে দেব না। তোদের ওই পুচকে সাইভাকে তোর কাছে রেখে দেব, আর তোদের দুজনকে গুলশানের ফ্ল্যাটে লক করে রেখে আসব। তখন বুঝবি কার কত ধানি চাল!"
অ্যারিসের এই 'হুমকি' শুনে সায়মা এবার খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল
—"আরে! ওটা তো খুব ভালো হয় বড় ভাইয়া! তাহলে ইভান সারারাত জেগে আমার ওই বাচ্চার আবদার পূরণ করতে বাধ্য হবে! প্লিজ ভাইয়া, লক করে দিয়ে আসো!"
সায়মার এই উল্টো চাল শুনে ইভান এবার এক্কেবারে আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে দুই হাত ওপরে তুলল। সে নিজের লুচির প্লেটটা টেনে নিয়ে করুণ গলায় বলল
— "থাক ভাই, থাক! আমি আর একটা কথাও বলছি না। তোমরা টেবিলের নিচে পা টেপো, নাকি মাথার ওপর দিয়ে ওড়ো—আমি আর কিচ্ছু দেখব না। আমি জাস্ট এই লক্ষ্মী ছেলের মতো লুচি খাচ্ছি। !"
ডাইনিং টেবিলের এই হাসাহাসি আর ইভানের নাটকের মাঝেই আফরিন সুলতানা হঠাৎ একটু গম্ভীর হলেন। তিনি চায়ের কাপটা পাশে রেখে ইনায়ার দিকে তাকালেন। মায়ের মুখের চটজলদি এই পরিবর্তন ইনায়ার চোখ এড়াল না। ইনায়া মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল
— "কী হয়েছে আম্মু? সকাল সকাল হঠাৎ এত গম্ভীর হয়ে গেলে যে? কোনো সমস্যা?"
আফরিন সুলতানা একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তারপর গলাটা একটু নামিয়ে চিন্তিত অথচ আশাবাদী গলায় বললেন
— " মা, আসলে একটা জরুরি কথা ছিল। তোর ছোট বোন ইরা... দেখতে দেখতে তো মেয়েটা বড় হয়ে গেল। এইবার অনার্স ফাস্ট ইয়ারে উঠল, বয়সটাও উনিশ ছুঁয়েছে। গতকালই ওর জন্য খুব ভালো একটা ঘর থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।"
মায়ের মুখে ইরার বিয়ের কথা শুনে ইনায়া এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল। ইরা যে এত তাড়াতাড়ি বিয়ের বয়সে পৌঁছে গেছে, তা যেন সে ভাবতেই পারেনি। তার চোখে ভেসে উঠল সেই ছোট ইরা, যে সবসময় দিদির আঁচল ধরে ঘুরত।
— "বিয়ের প্রস্তাব? কিন্তু আম্মু, ও তো এখনো কেবল অনার্স পড়ছে। পড়াশোনাটা তো আগে শেষ হওয়া দরকার..."
—"আমিও প্রথমে সেটাই ভেবেছিলাম রে। কিন্তু ছেলে পক্ষ অনেক ভালো। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড এক্কেবারে নিখুঁত, ছেলেও খুব ভালো শিক্ষিত আর প্রতিষ্ঠিত। তারা জানিয়েছে, বিয়ের পরও ইরাকে তারা মনমতো পড়াশোনা করাবে, কোনো বাধা দেবে না। পাত্রের বাড়ির লোকজনও মার্জিত। তুই তো জানিস, এই যুগে এমন ভালো ঘর আর ভালো ছেলে সহজে পাওয়া যায় না। তাই ভাবলাম, তোর সাথে আর অ্যারিসের সাথে আগে একটু কথা বলে নিই। তোরা একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখলে আমার বুকটা শান্ত হতো।"
মায়ের মুখে বিয়ের কথা উঠতেই ইরা চট করে ইনায়া আর আফরিন সুলতানার দিকে তাকাল। যদিও মা ফিসফিস করে কথা বলছিলেন, কিন্তু 'বিয়ের প্রস্তাব' আর 'পাত্র পক্ষ' শব্দ দুটো ইরার কান এড়াতে পারেনি।
মুহূর্তের মধ্যে মেয়েটার গাল দুটো লজ্জায় এক্কেবারে টকটকে লাল হয়ে গেল। সে ধড়মড় করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ইরাকে এভাবে হঠাৎ লাল হয়ে ওলটপালট করতে দেখে ইভান আবার সুযোগ পেয়ে গেল। সে নাস্তার টেবিল থেকে একটা বড়সড় জোরদার হাসি দিয়ে বললো —"ড্রয়িংরুমে তো দেখছি একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাত! ইরা ম্যাডাম, আপনার গালের যা কালার হয়েছে, তাতে তো মনে হচ্ছে লাল টমেটোও আপনার কাছে ফেইল! তা ঘটনা কী? লুকিয়ে লুকিয়ে কোনো কবি সাহেবের সাথে কবিতা বিনিময় চলছে নাকি?"
ইরা লজ্জায় এক্কেবারে কুঁকড়ে গিয়ে, ইভানের দিকে চোখ রাঙানোর চেষ্টা করলো, "ইভান ভাইয়া! একদম ফালতু কথা বলবে না বলে দিচ্ছি! আম্মু কীসব বলছে আর আপনিও...!"
ইরা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের ওড়নাটা টেনে কোনোমতে মুখটা আড়াল করে সে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে আইরার রুমের দিকে পালিয়ে গেল। ইরা চলে যেতেই ইনায়া আর সুবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসতে লাগল। আদিয়ান অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে বলল
— "মেয়েটা তো দেখছি সত্যিই বড় হয়ে গেছে। লজ্জার বহর দেখেছ?"
অ্যারিস চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে ইনায়ার দিকে তাকাল।সে গম্ভীর অথচ নরম গলায় বলল
—"ইরা আমাদের ছোট বোন। ওর জীবনের সিদ্ধান্ত স্পেশাল হবে। ইনায়া, তুমি আম্মুর কাছ থেকে পাত্রপক্ষের সব ডিটেইলস নিয়ে নাও। আজ বিকেলের মধ্যেই ওই ছেলের চৌদ্দ গোষ্ঠীর আমলনামা আমার টেবিলে চলে আসবে। ফেং আর রহমান পরিবারের ছোট জামাই হওয়া এত সহজ নয়, আগে আমার টেস্টে পাস করতে হবে।"
ইরা আইরার রুমে গিয়ে দরজার পেছনে পিঠ ঠেকিয়ে তখনো জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে আর তার বুকের ভেতর এক অজানা নতুন অনুভূতির দোলাচল শুরু হয়েছে।

দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা পারিবারিক বৈঠক—ইরার বিয়ে নিয়ে নানারকম জল্পনা-কল্পনা, হুল্লোড় আর কথার মারপ্যাঁচ শেষে যখন দম ফেলার ফুরসত মিলল, অ্যারিস সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঘরে বসা সবার দিকে একবার শীতল দৃষ্টি বুলিয়ে সে শান্ত গলায় বলে উঠল,
— "আমি আর ইনায়া একটু বাইরে যাচ্ছি।"
ইনায়া চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। হঠাৎ এই অসময়ে বাইরে যাওয়ার কথা কেন উঠল? সে অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
— "কোথায়?"
অ্যারিস কোনো ব্যাখ্যা দিল না। সে কেবল ইনায়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত একটা আদেশ ছুঁড়ে দিল,
— "চলো।"
অ্যারিসের গলার সেই একটা শব্দের ভেতরে এমন গভীরতা ছিল, যা ইনায়ার প্রশ্নকে নিমিষেই গ্রাস করে নিল। সে আর দ্বিতীয়বার কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজনও বোধ করল না। কিছুক্ষণ পর তাদের গাড়ি এসে থামল বেসরকারি হাসপাতালের পার্কিংয়ে। ইনায়া গাড়ি থেকে নেমে চারপাশটা একবার দেখে নিল। সে কিছুটা থমকে দাঁড়িয়ে অ্যারিসের দিকে তাকাল, কণ্ঠে স্পষ্ট বিভ্রান্তি,
— "অ্যারিস, আমরা এখানে কেন?"
অ্যারিস একবারও পেছনের দিকে তাকাল না। সে সামনে হাঁটতে হাঁটতে শুধু নির্লিপ্ত গলায় বলল,
— "ভেতরে চলো।"
— "কিন্তু—"
— "সব জানতে পারবে।"
হাসপাতালের ভেতরে ঢোকার আগেই সব কিছু যেন সাজানো ছিল। মনে হচ্ছিল, অ্যারিস এখানে আসার অনেক আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। করিডোরের সাদা আলোর নিচে পা রাখতেই একজন সিনিয়র ডাক্তার এসে উপস্থিত হলেন। সময় নষ্ট না করে ডাক্তার ইনায়াকে নিয়ে সোজা এগোতে লাগলেন সার্জারি রুমের দিকে। দরজা খোলার শব্দে ইনায়া যাওয়ার আগে এক পলক পেছনে ফিরে তাকাল।
করিডোরের শেষ মাথায় অ্যারিস তখনো স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার দু'হাত কোটের পকেটে গোঁজা, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই—যেন সে এক মূর্ত প্রতীক। কিন্তু তার চোখ দুটো এক ফোঁটার জন্যও নড়েনি; সে একধ্যানে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকেই। কাঁচের দরজাটা স্লো-মোশনে বন্ধ হয়ে গেল, আর সেই সঙ্গে ইনায়ার ভেতরের দুনিয়াটা বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
বেশ দীর্ঘ একটা অপেক্ষার পর অবশেষে সার্জারি রুমের লাল বাতিটা নিভে গেল। দরজা খুলে স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনায়া বেরিয়ে এলো করিডোরে। তার ডান হাতের কনুইয়ের ঠিক ওপরের নির্দিষ্ট অংশে তখন সাদা গজ ও ব্যান্ডেজের প্রলেপ। তার পেছনেই হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার।
— "সার্জারি সফল হয়েছে। চিন্তার কোনো কারণ নেই," ডাক্তার শান্ত গলায় অ্যারিসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "কয়েকদিন শুধু হাতটাকে একটু সাবধানে রাখবেন, পানি লাগতে দেবেন না।"
অ্যারিস ধীরেসুস্থে মাথা নাড়ল।
— "ধন্যবাদ, ডাক্তার।"
ডাক্তার হেঁটে চলে যাওয়ার পর ইনায়া নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল। চামড়ার নিচে লুকানো যে বস্তুটাকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য আর কবচ বানিয়ে রেখেছিল, আজ তা তার শরীর থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে। সে মুখ তুলে অ্যারিসের দিকে তাকাল, তার কণ্ঠে তখন বিস্ময়
— "এটা তুমি কীভাবে জানলে?"
অ্যারিস কোনো উত্তর দিল না। সে আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা যেন হু হু করে উঠল। এতদিন সে বিশ্বাস করে এসেছে যে এই গোপনীয়তা কেবল তারই একার। সে তীব্র অনাস্থা নিয়ে আবার বলে উঠল,
— "আমার শরীরের ভেতরে একটা মাইক্রোচিপ ছিল—এই ব্যাপারটা আমি ছাড়া আর কেউ জানত না। ভাইয়ের সেই অন্ধকার অতীতের কথা জানার পরই আমি এটা নিজের শরীরে সেট করেছিলাম। আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজনীতি, শত্রু আর বিপদের জাল থেকে যদি কখনো চিরতরে হারিয়ে যাই তাই। আমার ল্যাপটপ , কম্পিউটারে সেট করা এই চিপের লোকেশনের মাধ্যমে পরিবার বা পুলিশ অন্তত আমার মৃতদেহটাও খুঁজে পাবে... সেইফটি গার্ড হিসেবে এই পথ বেছে নিয়েছিলাম। অথচ... অথচ এই কথাটা তুমি জানলে কীভাবে?"
অ্যারিস এতক্ষণে পা বাড়াল তার দিকে। সে ইনায়ার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত গভীর মায়া।
— "আমি জানতাম," অ্যারিসের গলাটা নরম শোনাল।
ইনায়া বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার গলা কাঁপছিল, "কীভাবে সম্ভব?"
অ্যারিস জানালার বাইরে উদাস দৃষ্টি ফেলে বলতে শুরু করল,
— "তুমি যখন চায়নায় ছিলে, সেই পরিস্থিতিগুলোতে একদিন তোমার সিক্রেট রুমে ঢুকেছিলাম। সেখানে তোমার পুরোনো সিস্টেমটা আমার চোখে পড়েছিল। তোমার ব্যাকআপ ট্র্যাকিং সিস্টেম আর লোকেশনের কারসাজি দেখেই আমি বুঝেছিলাম, তোমার মতো সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার মানুষ নিজের সুরক্ষার জন্য শরীরের ভেতরেই কোনো না কোনো ব্যবস্থা করে রেখেছে। তুমি এমনি এমনি নিজের শরীরের ওপর এমন ঝুঁকি নেবে না—যদি না সেটা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়। শুরুতে শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু তোমার প্রতিটা মুভমেন্ট আর পরিস্থিতি মিলিয়ে আমি ঠিকই বুঝে গিয়েছিলাম।"
ইনায়া নিচু স্বরে জানতে চাইল,
— "তাহলে এতদিন তুমি আমাকে এই নিয়ে একটা কথাও বলোনি কেন? কখনো জানতে চাওনি?"
অ্যারিস একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "কারণ তখন তোমার ওই চিপটাই দরকার ছিল, তুমি যখন চায়নায় ছিলে, চারদিকে যখন শত্রু আর অনিশ্চয়তা... কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের সব শত্রু নিশ্চিহ্ন। তুমি বা আমরা—কেউই আর অরক্ষিত নই। তোমাকে কোথাও হারিয়ে ফেলার সেই ভয়ানক দিনগুলো পেছনে ফেলে এসেছি আমরা। তাই তোমার শরীরের ভেতরে ওই ভিনগ্রহের কোনো ধাতব বস্তু বয়ে বেড়ানোর বিন্দুমাত্র কোনো প্রয়োজন আর নেই।"
ইনায়া অপলক তাকিয়ে রইল অ্যারিসের মুখের দিকে।
এত বছর ধরে সে যে ক্ষতগুলোকে একা একা বহন করেছে, যে ভয়ের সঙ্গে সে একা লড়েছে—অ্যারিস নিঃশব্দে সেই পুরো ইতিহাসটা শুধু মুখস্থই করেনি, সে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছে। সে ইনায়ার ওপর নিজের সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেয়নি; বরং সে অপেক্ষা করেছে কখন ইনায়া নিজে থেকে পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করবে। ইনায়া স্নিগ্ধ চোখে নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে আরেকবার তাকাল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিষ্ঠুর নিয়ম, রক্তপাত, গোপন চিপ আর মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা—সবকিছুর অবসান যেন এই সাদা ব্যান্ডেজের নিচে ঢাকা পড়ে গেল। সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে অ্যারিসের মুখের দিকে তাকাল। তার গলায় তখন সমস্ত অভিযোগ ধুয়ে মুছে একাকার,
— "তুমি... সত্যিই সবকিছু জেনে ফেলো কীভাবে, অ্যারিস?"
অ্যারিসের ঠোঁটের কোণে এবার মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। সে উত্তর দিল,
— "তোমাকে নিয়ে ব্যাপার হলে, ইনায়া... আমি একটু বেশিই খেয়াল রাখি। বড্ড বেশি খেয়াল রাখি।"
ইনায়া আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। সে কেবল কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণের সেই জমে থাকা বিস্ময় আর অবিশ্বাসের বরফ গলতে শুরু করেছে, তার জায়গায় আস্তে আস্তে জায়গা করে নিচ্ছে প্রশান্ত নিঝুম শান্তি। তারপর সে হালকা হেসে মুখ ফিরিয়ে নিল। অ্যারিস তার পাশে এসে দাঁড়াল, এবং দুজনে মিলে হাসপাতালের করিডোর ধরে বাইরে পার্কিংয়ের রোদের দিকে পা বাড়াল।
আজ সত্যিই আর কোথাও হারিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। চারপাশের এই পৃথিবীর যেকোনো কোণেই তারা থাকুক না কেন—তারা একে অপরকে ঠিক চিনে নেবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 70 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন