অ্যারিস সবার অলক্ষ্যে ইনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল। সে ইনায়ার মেহেদী রাঙা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল, সাবধানে যাতে রঙ নষ্ট না হয়ে যায়। তার চোখে নেশা ধরানো তীব্র চাউনি।
— "তোমার হাতের মেহেদীর গন্ধটা বেশি চড়া, ইনায়া। আর এই হাত যখন আমার বুকে লাগবে... আজ রাতের পরিবেশটা এক্কেবারে অন্যরকম হবে।"
ইভান এক ছুটে আদিয়ান আর জাওয়াদের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল এবং অ্যারিস আর ইনায়ার দিকে আঙুল তুলে করুণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল
—"আল্লাহ বাঁচাও আমাকে! এই জঘন্য রোমান্টিক সিন আমার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব নয়! এটা ছোট বেয়ানের মেহেদী অনুষ্ঠান, নাকি বড় ভাই আর ভাবির হানিমুনের প্রি-শুট চলছে, আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না!"
ইভানের এই হঠাৎ রিয়্যাকশনে জাওয়াদ নিজের মুখ চেপে হাসতে লাগল, আর আদিয়ান তো হেসেই খুন। ড্যান্স ফ্লোরে থাকা সুবা আর সায়মা কোমর থেকে হাত নামিয়ে ইভানের এই নাটক দেখতে শুরু করল।
ইভান— "জাওয়াদ ভাই, আপনি ভালো মানুষ, আপনিই এর একটা ইনসাফ করুন! এই যে দেখুন, পুরো ঘরের মানুষ ডেকোরেশন আর নাচ-গান নিয়ে ব্যস্ত, আর আমাদের বড় ভাই ভাবির মেহেদী লাগা হাত নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে কানে কানে কোন রোমান্স করছে! আমার সিঙ্গেল লাইফটা তো ওনারা আগেই শেষ করেছেন, এখন ম্যারিড লাইফেও শান্তিতে বাঁচতে দিচ্ছেন না!"
ইনায়া এবার লজ্জায় এক্কেবারে লাল-গোলাপী হয়ে অ্যারিসের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল।
অ্যারিস ইভানের দিকে এক পা এগিয়ে এলো, " আমার বউয়ের হাত আমি ধরব না তো কি তোর হাত ধরব? আর বেশি কথা বললে, তোকে এই মেহেদীর স্টেজ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছাদের পানির ট্যাংকের ভেতর চুবিয়ে রেখে আসব।"
বড় ভাইয়ের এই ঠান্ডা মাথার হুমকি শোনা মাত্রই ইভানের রোমান্টিক বিরোধী আন্দোলনের বেলুন এক সেকেন্ডে ফুস হয়ে গেল। সে চট করে সায়মার কাছে গিয়ে লুকিয়ে নিরীহ মুখে বলল
— "উফফ! এই দেশে বাক-স্বাধীনতা বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই! বউ, তুমি দেখলে? তোমার ভাসুর আমার ওপর কেমন ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন! আমি আর এই মেহেদী অনুষ্ঠানেই থাকব না, আমি চললাম সাইভার সাথে গিয়ে ড্যাডম ড্যাডম খেলতে!"
ইভান বাচ্চার মতো মুখ করে সোফার দিকে পালিয়ে যাওয়া দেখে সবাই মুখ চেপে হাসছে। এইসব তারা ইনায়া অ্যারিসের বিয়ের পর থেকেই দেখেছে, শুনছে। সুযোগ পেলেই ইভান অ্যারিস কে খোঁচা দিবে। অ্যারিস ও তাই। যদিও তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক নেই। তবুও তারা ভাই। অ্যারিস ছোটো থেকে ইভান কে নিজের ছোটো ভাইয়ের মতোই ভালোবেসে এসেছে, আদর করেছে, শাসন করেছে। ইভান ও অ্যারিস কে বড় ভাই হিসেবে সম্মান করে। যদিও বকা খায় কিন্তু পরে আবার সেই ভাই-ই ভালোবাসে। ছোটো থেকে আজ পর্যন্ত ইভানের কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখে নি।
মেহেদী রাতের সেই জমজমাট আড্ডা আর ইভানের নাটকের রেশ কাটতে না কাটতেই পরের দিন নেমে এলো এক অন্যরকম উন্মাদনা নিয়ে। আজ ইরার 'গায়ে হলুদ'। পুরো রহমান ভিলা আজ সেজেছে এক্কেবারে খাঁটি বাঙালি ঐতিহ্যে। সকাল থেকেই পুরো বাড়ি গাঁদা ফুল, গোলাপ, রজনীগন্ধা এবং রেশমি কৃত্রিম ফুল ও লতাপাতা দিয়ে ব্যাকড্রপ তৈরি করা হয়েছে। বাগানের মাঝখানের স্টেজটাকে সাজানো হয়েছে কাঠের বেঞ্চ, সুসজ্জিত তোশক, রঙিন কুশন। বাড়ির ছোট-বড় সবার পরনে আজ হলুদ আর বাসন্তী রঙের পোশাক।
সকালের পর থেকেই একে একে সবাই তৈরি হয়ে নিচে নামতে লাগল। সুবা আর সায়মা হলুদ রঙের সুতি শাড়িতে এক্কেবারে অনন্যা লাগছে। সায়মা তো আইরা আর সাইভাকেও হলুদ লেহেঙ্গা পরিয়ে দিয়েছে, আর সিয়ান-আয়ান দুই ভাই হুবহু আদিয়ানের মতো হলুদ পাঞ্জাবি পরে ঘুরঘুর করছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো ইনায়া। হলুদ রঙের এক কাঁথাস্ট্রিচ সিল্ক শাড়িতে, কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ আর চুলে বেলী ফুলের খোঁপা—ইনায়াকে দেখে অ্যারিস ড্রয়িংরুমের কোণায় দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। অ্যারিস নিজে আজ কালো স্যুট বাদ দিয়ে পরেছে এক্কেবারে কাস্টম-মেড বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি, যাতে তাকেও সুদর্শন দেখাচ্ছে।
সবাই মিলে আলাদা আলাদা কাজে ব্যস্ত। কেউ মেহমানদের আপপায়ন করতে ব্যস্ত, কেউ খাবার দাবার দেখছে, কেউ সাজানোর দিকটা দেখছে। কেউ আশেপাশের পাহারার দিকটা দেখছে। বাড়িতে মেহমান ভর্তি হয়ে আছে। সায়মার বাবা মা বড়ো বোন তার স্বামী সাথে ওদের ছেলে মেয়ে। সুবার বাবা মা বড় ভাই তার স্ত্রী তাঁদের ছেলে। মাহির বাবা মা, তার স্ত্রী তার মেয়ে। রোহান তার স্ত্রী তার মেয়ে। অর্ধেক লোক আদিয়ানের বাসায় বাকি অর্ধেক অ্যারিসদের বাসায়।
সবশেষে স্টেজ আলো করে নিয়ে আসা হলো কনে ইরাকে। ইরার পরনে সেই হলুদ জামদানি শাড়ি, হাত-কান-গলায় কাঁচা ফুলের গহনা। লজ্জায় মেয়েটার মুখ যেন এক্কেবারে পদ্মফুলের মতো ফুটফুট করছে। ইরাকে এনে বসানো মাত্রই বাড়ির মহিলারা দেখে বেশ প্রশংসা করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাওয়াদ চলে এলো। যদিও তার আসার ইচ্ছে ছিলো মনে মনে আবার অ্যারিস আদিয়ানের জোর করায় চলেই আসে। জাওয়াদের পরনেও ইরার শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা হলুদ পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। জাওয়াদ বাগানে ঢুকে ইরার পাশের এসে দাঁড়ালো। একে অপরকে এভাবে হলুদের সাজে সামনাসামনি দেখে দুজনেই যেন লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল।
হলুদ ছোঁয়ানোর পর্ব শুরু হতেই প্রথমে আফরিন সুলতানা আর শামীমা বেগম এসে দুজনের কপালে, গালে কাঁচা হলুদ ছুঁইয়ে দিলেন। এরপর এলো ইভানের পালা। ইভান তখন থেকেই একটা বড় বাটিতে একদম থকথকে করে বেশি করে হলুদ গুলে নিয়ে রেডি হয়ে ছিল। সে এক গাল চওড়া হেসে জাওয়াদের সামনে গিয়ে বসল
—"কী জাওয়াদ ভাই! কাল রাতে তো বড় ভাইয়ের হুমকিতে আমার মুখ বন্ধ ছিল, কিন্তু আজ তো গায়ে হলুদ! আজ নো নিয়ম-কানুন! এই সুন্দর গালে একটু হলুদ না মাখালে কি বিয়ে জমে?"
কথাটা বলেই ইভান এক থাবা হলুদ নিয়ে জাওয়াদের দুই গালে আর কপালে এমনভাবে মাখিয়ে দিল যে জাওয়াদের মুখটা এক সেকেন্ডে এক্কেবারে পাকা আমের মতো হলুদ হয়ে গেল! জাওয়াদ হেসে ফেলে বলল, "ইভান ভাই, এ তো অন্যায়!"
ইরা তো তা দেখে হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ার মতো অবস্থা, কিন্তু তার হাসি এক সেকেন্ডে উবে গেল যখন সায়মা আর সুবা মিলে পেছন থেকে এসে ইরার গালে এক্কেবারে কপাল পর্যন্ত হলুদ মাখিয়ে দিল। পুরো স্টেজ তখন আনন্দ আর হলুদের মাখামাখিতে এক এলাহী কাণ্ড।
অ্যারিস আর ইনায়া একসাথে স্টেজে উঠল জাওয়াদ আর ইরাকে হলুদ দিতে। ইনায়া ইরার আর জাওয়াদের গালে একটুখানি হলুদ ছুঁইয়ে দিল। কিন্তু অ্যারিস যখন হলুদ দিতে যাবে, ইভান পাশ থেকে ফোড়ন কাটল
—"বড় ভাই, শুধু দুলাভাইকে দিলে হবে না! ভাবি এত কষ্ট করে শাড়ি পরেছে, ভাবির গালেও একটু হলুদ দিয়ে দাও না! আমরাও একটু রোমান্টিক ডেমো দেখি!"
ইভানের এই উস্কানিতে সুবা আর সায়মাও একসাথে চেঁচিয়ে উঠল, "হ্যাঁ, হ্যাঁ! ভাইয়া, ভাবির গালে একটু হলুদ মাখিয়ে দাও!"
ইনায়া তো লজ্জায় এক্কেবারে চোখ বড় বড় করে অ্যারিসের দিকে তাকাল, ইশারায় বলল—সবাই দেখছে, একদম না!
কিন্তু অ্যারিস কি আর কারও বাধা শোনে? নিজের আঙুলে একটুখানি কাঁচা হলুদ নিয়ে সে ইনায়ার এক্কেবারে কাছে এগিয়ে গেল। পুরো বাগানের মানুষের সামনেই সে গভীর চাউনিতে ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে তার গালে নিজের আঙুল দিয়ে হলুদ মেখে দিল।
অ্যারিসের হাতের উষ্ণ ছোঁয়ায় ইনায়ার গালটা হলুদের রঙের চেয়েও বেশি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। পুরো বাগান জুড়ে তখন হাততালি আর হুল্লোড়ের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ইভান নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল, "উফ, আমি আবার চোখ বন্ধ করে নিলাম!"
ইনায়া বিড়বিড় করে বলে, " নির্লজ্জ একটা লোক। আশেপাশে কতো লোকজন তার মধ্যেও এর রোমাঞ্চ শেষই হয় না।"
অ্যারিস ফিসফিস করে বলে, " বউ আমার ডিউ আদর বাকি আছে ওইটা কখন দিবে?"
ইনায়া আশেপাশে তাকিয়ে আয়ানকে কাছে পেলো। ওকে কোলে নিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিলো। "এর সাথে থাকলে কখন কি করে বসবে তার ঠিক নেই। এতো বছরের জমানো মান সম্মান এই লোক দুই মিনিটের মধ্যে শেষ করে দিবে। এত রোমান্টিক মুড কোত্থেকে আসে তাই বুঝি না।"
অ্যারিস ও ইনায়ার পিছু পিছু যায়। ওদের দিকে এক পলক তাকিয়ে সবাই আবার আনন্দে- হুল্লোড়ে মেতে ওঠে। কেউ স্টেজে নাচ গান ব্যস্ত আবার কেউ খেতে।
হলুদের সেই জমজমাট পর্ব আর নাচ-গানের হইচই শেষ হতে হতে রাত প্রায় একটা বেজে গেল।
আত্মীয়-স্বজনরা বিদায় নেওয়ার পর পুরো বাড়ি শান্ত হয়ে এসেছে। সবাই যার যার রুমে চলে গেছে কালকের মস্ত বড় দিনের জন্য এনার্জি জমাতে।
.
পরদিন সকাল হতেই রহমান ভিলাজুড়ে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। কারণ আজই সেই কাঙ্ক্ষিত দিন—ইরা আর জাওয়াদের শুভ পরিণয়।
ভেন্যু হিসেবে বুক করা হয়েছে ঢাকার সবচেয়ে বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক কনভেনশন হল। সকাল থেকেই ডেকোরেটররা পুরো হলরুমটাকে রাজপ্রাসাদের মতো করে সাজিয়ে তুলেছে। মেইন গেট থেকে শুরু করে স্টেজ পর্যন্ত হাজার হাজার তাজা সাদা গোলাপ, অর্কিড আর ক্রিস্টাল ঝাড়বাতির আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। বিকেলের দিকে পার্লার থেকে সেজে যখন ইরা ভেন্যুর ব্রাইডাল রুমে এসে বসল, তখন তাকে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো এক দেশের রাজকন্যা। তার পরনে সেই প্যাস্টেল শেডের ভারী কাজের জমকালো লেহেঙ্গা, গলায় আর কানে হিরের কুন্দনের গহনা, মাথায় সূক্ষ্ম কারুকাজের ওড়না টানা।
ইনায়া, সুবা আর সায়মাও এক্কেবারে রেডি। রয়্যাল ব্লু সিল্কে ইনায়াকে বেশ সুন্দর লাগছিল, সুবার লেভেন্ডার আর সায়মার পিঙ্ক লেহেঙ্গাতেও পুরো উইমেন গ্যাং যেন ভেন্যুর সব আলো কেড়ে নিচ্ছিল। অ্যারিস, আদিয়ান আর ইভান—তিন ভাই পরেছে হুবহু ম্যাচিং করা নেভি ব্লু কালারের কাস্টম-মেড থ্রি-পিস স্যুট। তিন হ্যান্ডসাম ভাইকে একসাথে দেখে ডাইনিং হলের অনেকেই তাকিয়ে দেখছিল।
সন্ধ্যা নামতেই অ্যারিস, ইনায়া, আদিয়ানের বড় বড় বিজনেস পার্টনারদের আগমন ঘটে। সাথে ইনায়ার ল' ফার্মের কিছু মেম্বার আসে। ইরার ইউনিভার্সিটির কিছু বান্ধবী আসে, সুবার কিছু ডাক্তার কলিগ, আইরা-সিয়ানের অনেক গুলো ফ্রেন্ড, সাথে সবার আত্মীয়-স্বজনের পূর্ণ হয়ে গেছে হল রুম।
ইরার তিন বান্ধবী স্টেজে ইরার কাছে যায়। তানিয়া কিছুটা অবাক হয়ে বলে, "দোস্ত ল'য়ার ইনায়া ফেং, বিলিয়নার অ্যারিস ফেং তোর বড় বোন আর বোন জামাই?"
মেহজাবিন ও তাল মিলিয়ে বলে, "বিজনেস আদিয়ান রহমান, বেস্ট সার্জন সুবা রহমান তোর ভাই আর ভাইয়ের বউ?"
নিশা ও কিছুটা অবাক হয়ে বলে, " সাবেক হাইকোর্টের বিচারপতি আর বর্তমান আইন মন্ত্রী আফরিন সুলতানা আর জুয়েলার বিজনেসম্যান আনিসুর রহমান তোর মা বাবা?"
ইরা একটু হেসে বলে, "হ্যাঁ.."
তানিয়া রেগে বলে, " আমাদের আগে কেনো বলিস নি?"
ইরা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে, " হাই স্কুলে থাকতে এই পরিচয় জেনে কেউ ভয়ে বন্ধুত্ব করতে আসতো না তাই বলি নি।"
মেহজাবিন ইরার কাঁধে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলে, " আমরা কি তেমন নাকি বোকা মেয়ে।"
নিশা অনেক বেশি এক্সাইটেড হয়ে বলে, " আমার তো বিয়ের সাজানো দেখে মনে হচ্ছে কোনো প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের বিয়েতে এসেছি।"
আফরিন সুলতানা পাশ দিয়ে যেতে যেতে কথাটা শুনতে পেয়ে বলে, " প্রধানমন্ত্রী না হলেও মন্ত্রীর মেয়ে বলে কথা একটু তো রাজকীয় ভাইব থাকবেই।"
তানিয়া, মেহজাবিন, নিশা মিষ্টি হেসে এগিয়ে এসে কথাবার্তা বলে। ওদের আলাদা করে বসার খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় ইনায়া।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বরযাত্রী নিয়ে ভেন্যুতে এন্ট্রি নিল বর আবরার জাওয়াদ। তার পরনে অফ-হোয়াইট ডিজাইনার শেরওয়ানি, মাথায় পাগড়ি। জাওয়াদ গাড়ি থেকে নামতেই ইভান, সুবা আর সায়মা মিলে মেইন গেটে ফিতা কেটে দাঁড়াল মোটা অংকের 'গেট ধরা'র টাকার দাবিতে।
ইভান— "জাওয়াদ ভাই! ল' পড়ে যতই উকিলগিরি দেখান না কেন, আজ কিন্তু আমাদের এই গেটের আইনের কাছে আপনাকে হার মানতেই হবে! এক কোটি টাকার নিচে এক পা-ও এগোতে দেব না!"
জাওয়াদ হেসে অ্যারিসের দিকে তাকাল, "অ্যারিস ভাই, একটু হেল্প করুন!"
অ্যারিস ঠান্ডা গলায়, ইভানের দিকে তাকিয়ে বললো, "ইভান, গেট ছাড়। বরকে বেশি আটকালে তোর ভাগের কাচ্চির প্লেটটা আমি অন্য কাউকে দিয়ে দেব।"
বড় ভাইয়ের কাচ্চি কেড়ে নেওয়ার হুমকিতে ইভান এক সেকেন্ডে পথ ছেড়ে দিল, আর জাওয়াদ হেসে ইভানের পকেটে একটা মোটা খাম গুঁজে দিয়ে ভেতরে ঢুকল।
খানিক বাদে, দুই পরিবারের মুরুব্বি আর বন্ধুদের উপস্থিতিতে অফিশিয়াল নিয়মে ইরা আর জাওয়াদের বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা কবুল বলা আর সই পর্ব শেষ হলো। কাজী সাহেব যখন খাতা এগিয়ে দিলেন, ইরা কাঁপাকাঁপা হাতে সই করল। জাওয়াদও নিজের সই শেষ করে এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অবশেষে তারা আইনগত এবং সামাজিকভাবে এক সুতোয় বাঁধা পড়ল।
স্টেজ তখন আলো করে বসেছে নতুন দম্পতি। জাওয়াদ আর ইরা পাশাপাশি বসে আছে, দুজনের মুখেই হাসি। পুরো ভেন্যুজুড়ে তখন কাচ্চি বিরিয়ানি, জালি কাবাব আর জাফরানি ফিরনির সুবাস ম ম করছে। গেস্টরা সবাই খাবার দাবার আর ছবি তোলায় ব্যস্ত।
বিয়েবাড়ির সমস্ত আলো, আনন্দ, কাচ্চির সুবাস আর হইচই যেন এক নিমেষে এক ভারী নিস্তব্ধতায় রূপ নিল। রাত তখন গভীর। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে, এবার রহমান পরিবারের ছোট রাজকন্যাকে বিদায় জানানোর সময় এসে গেছে। ভেন্যুর মেইন গেটের সামনে জাওয়াদের গাড়িটা এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির চারপাশটা সাদা গোলাপ আর রজনীগন্ধা দিয়ে ঘেরা। জাওয়াদ শান্ত মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে বউকে নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি এই পরিবারের দুঃখটাকেও সে সম্মান দিয়ে অনুধাবন করতে পারছে। ইরা যখন ইনায়া আর সুবার হাত ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিল, এতক্ষণের চঞ্চল, হাসিখুশি মেয়েটার চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। তার ভারী লেহেঙ্গা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, আর চোখের জলে গালের মেকআপ ধুয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে গাড়িটার সামনে এসে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক ছুটে গিয়ে আফরিন সুলতানাকে জড়িয়ে ধরে একদম বাচ্চার মতো ডুকরে কেঁদে উঠল
—"আম্মু! আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না! আমি এই গাড়িতে উঠব না আম্মু... আমাকে তোমার কাছে রেখে দাও!"
আফরিন সুলতানা নিজের চোখের জল সামলাতে না পেরে মেয়েকে বুকে চেপে ধরে কেঁদে ফেললেন। আনিসুর রহমান সাহেব এতক্ষণ নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন, কিন্তু মেয়ের এই কান্না দেখে এই বাবার চোখের কোণ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি ইরার মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন, "সুখী হ মা, আমার লক্ষ্মী মা..."
ইরা এরপর সুবা আর সায়মাকে জড়িয়ে ধরল। সায়মা ইরার এই বিদায় দেখে সে-ও নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না, ইভানের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল। ইভানও মন খারাপ করে ইরার মাথায় হাত রাখল, "কান্দিস না পাগলী, জাওয়াদ ভাই তোকে ভীষণ ভালো রাখবে।"
সবার সাথে দেখা করে সবশেষে ইরা গিয়ে দাঁড়াল তার বড় আপু ইনায়ার সামনে। যে আপু তাকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে এতদিন, সব ঝড়-ঝাপটা থেকে বাঁচিয়েছে। ইরা ইনায়ার গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল
— "আপু... আমি তোমার থেকে দূরে কীভাবে থাকবো? আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে আপু!"
ইনায়ার নিজের বুকেও তখন এক মস্ত বড় পাথর চেপে বসেছে, সে নিজেকে শক্ত রেখে ইরার চোখের জলটা মুছে দিল। তার নিজের চোখও তখন জলে টলমল করছে। সে ইরার গালে হাত রেখে মিষ্টি করে হেসে বলল
— "আরে বোকা মেয়ে! কাঁদিস না। একটু আগেই না বললি এত কাছে শ্বশুরবাড়ি যে প্রতিদিন সকালে চলে আসবি? জাওয়াদ তো অলরেডি তোকে প্রতিদিন ড্রপ করার পারমিশন দিয়ে দিয়েছে। আর মাত্র তো ছয়টা বাড়ির দূরত্ব রে পাগলী! কাল সকালেই আমি নিজে গিয়ে তোকে নিয়ে আসবো, একদম কাঁদিস না।"
ইনায়ার এই আশ্বাসে ইরা জাওয়াদের দিকে তাকাল। জাওয়াদ নরম হেসে মাথা নাড়ল, যেন সে ইনায়ার কথার সাথে এক্কেবারে একমত।
অ্যারিস ফেং এক পা এগিয়ে এসে ইরার সামনে দাঁড়াল।গম্ভীর মুখে আজ বড় ভাইয়ের স্নেহ। সে জাওয়াদের দিকে একবার তাকিয়ে ইরার মাথায় নিজের হাতটা রাখল।
—"ইরা, মনে রেখ—তুমি রহমান ভিলার মেয়ে হতে পারো, কিন্তু তুমি অ্যারিস ফেং-এরও ছোট বোন। জাওয়াদ যদি কখনো তোমাকে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলতে দেয়, শুধু আমাকে একটা ফোন দিও। আমার ছেলেরা জাওয়াদকে সোজা ল' কোর্ট থেকে তুলে নিয়ে আসবে।"
অ্যারিসের এই মাফিয়া স্টাইলের বিদায়ী ডায়ালগ শুনে কান্নার সেই ভারী পরিবেশেও জাওয়াদ একটু ভড়কে গিয়ে হেসে ফেলল, আর ইরা-ও নিজের চোখের জল মোছার মাঝেই একটা মলিন হাসি দিল।
জাওয়াদ ইরার হাত ধরে তাকে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে দিল। নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে সে রহমান আর ফেং পরিবারের সবাইকে হাত তুলে বিদায় জানাল।
গাড়িটা যখন ধীরে ধীরে ভেন্যুর গেট পার হয়ে মেইন রোডের দিকে চলে যাচ্ছিল, ইরা গাড়ির কাচ নামিয়ে শেষবারের মতো তার আপু, আম্মু আর ভাইয়াদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছিল।
গাড়িটা মেইন গেট পার হয়ে যখন মূল রাস্তায় উঠল, তখন তাদের পেছনের সারিবদ্ধ গাড়িগুলো নিয়ে আত্মীয়-স্বজনরাও যার যার গন্তব্যে রওনা হয়ে গেল। ভেন্যুর সেই আলো ঝলমলে কোলাহল পেছনে ফেলে রাস্তাটা এখন বড্ড শান্ত।
মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব। মেইন রোডের ঠিক ছয়টা বাড়ি পার হতেই জাওয়াদের গাড়িটা এসে থামল নান্দনিক ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে। মেইন গেটের নেমপ্লেটে সুন্দর করে লেখা—'জাভেদ ম্যানশন'।