দুই তলা বিল্ডিংয়ের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ইনায়া তার পছন্দের ২ টি বিড়াল (মুন ও স্টার) কে খাওয়াচ্ছিল। মুন একদম ধবধবে সাদা আর স্টার কিছুটা কমলা রঙের। মুনকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছিল। ইনায়াদের বিল্ডিংয়ের একটু দূরেই রেললাইন। এখন ভাদ্র মাসের প্রায় শেষের দিক, আকাশ একদম স্বচ্ছ ও গাঢ় নীল। আকাশে তুলোর মতো নরম সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। বাইরের অপরূপ দৃশ্য দেখে ইনায়া মুগ্ধ। রেললাইনের অপর পাশে জনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেই বিল্ডিংয়ের একটি ছাদে দাঁড়ানো একজন ২৭ বছর বয়সি যুবক। হাতে তার "রেমিংটন-৭০০" এর ওপর আবা হাই ম্যাগনিফিকেশন স্কোপ (10x জুম) দিয়ে ইনায়াকে দেখছে। সে লক্ষ্যস্থির করল এবং রাইফেলের নলের মুখে একটি সাইলেন্সার লাগিয়ে নিলো। লোকটি তার বাঁ চোখের পাতা বন্ধ করে লেন্সের সাথে ডান চোখ সেট করে নিলো। কাঁচের ভেতর দিয়ে ৭৩৭ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়াকে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে। সে তার কাস্টম "রেমিংটন-৭০০" এর বোল্টটি আলতো করে টেনে একটি .৩০৮ ক্যালিবর বুলেট লোড করল। সাইলেন্সারের কারণে রাইফেলের নলটি দেখতে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু লম্বা লাগছে। বাতাসের গতিবেগ মাপার জন্য সে লেন্সের ভেতরের ছোট ছোট দাগগুলোর দিকে তাকালো। ইনায়াকে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটি বুক বরাবর পয়েন্ট করল। তার তর্জনী আলতো করে ট্রিগারে চাপ দিল। সাইলেন্সারের ভেতর দিয়ে একটি মৃদু থুপ শব্দ হলো, যা বাতাসের ঝাপটায় ভেসে ভুলে যাওয়া যায়।
তাৎক্ষণিক মুহূর্তে মুন কোল থেকে নেমে যাওয়ায় কাঁধ কিছুটা নিচের দিকে নেমে যায়। যার ফলে গুলিটা ইনায়ার ডান হাতের নরম মাংসপেশি ভেদ করে দেওয়ালে ঢুকে যায়। ব্যাপারটা হঠাৎ হওয়াতে কয়েক সেকেন্ড কিছু বুঝে উঠতে পারে না।
ইনায়া রেললাইনের অপর পাশের বিল্ডিংয়ের দিকে তাকায়। ইরা ইনায়াকে খাবার খেতে ডাকতে এসে দেখে সারা ফ্লোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। লোকটা ইরাকে দেখে সরে যায়। ইরা চিৎকার দিয়ে আনিসুর রহমান, আফরিন সুলতানাকে ডাকে। তারা ও ছুটে আসে ইরার চিৎকার শুনে।
(ইরা ইনায়ার আট বছরের ছোটো। ছোট হওয়ায় বাসার সবার আদরের। আনিসুর রহমান ব্যবসার কাজে প্রায়ই বাইরে থাকেন।আফরিন সুলতানা হাইকোর্টের জজ, যার কারণে প্রায়ই তাকে কাজের জন্য বিজি থাকতে হয়। ইরা ছোটবেলা থেকেই ইনায়ার কাছে বেশি থেকেছে, তাই ইনায়াকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।)
আনিসুর রহমান ও আফরিন সুলতানা দৌড়ে এসে সারা ফ্লোরে রক্ত দেখে চোখ বড় হয়ে যায়। চোখ যায় ইনায়ার হাতের দিকে। রক্ত ঝরতে দেখে আফরিন সুলতানা এক চিৎকার দিয়ে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে। মায়ের চিৎকারে হুশ ফেরে ইনায়ার। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে হাতের কনুই বেয়ে, কব্জি ছাড়িয়ে আঙুলের ডগা দিয়ে উপচে মাটিতে পড়ছে। হাতের পাঁচটা আঙুল যখন আর চেনা যাচ্ছে না, পুরো হাতটা যেন একটি লাল দস্তানায় ঢাকা পড়ে গেছে। প্রতিটি আঙুলের ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়া সেই লাল ঝরনা ইনায়ার সাদা জামার হাতা বেয়ে এক বীভৎস আলপনা এঁকে দিচ্ছে।
ইনায়া ডান হাতটা চোখের সামনে আনে, এত রক্ত দেখে হাত কাঁপতে শুরু করে। হঠাৎ অতীতের কিছু স্মৃতি ভেসে আসে—
"গভীর রাত, ফাঁকা রাস্তা, ১৬ বছর বয়সি মেয়ে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় রক্ত ঝরছে। হাত বাড়িয়ে কাউকে ডাকছে, হাতে রক্তে ভেজা।
তবে সেই রাতে কেউ কোথাও ছিল না। শুধু দূর থেকে কয়েকটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক ভেসে আসছে।"
সেই সব কথা মনে পড়তেই এক চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। আনিসুর রহমান ফোন বের করে ৯৯৯-এ কল করে অ্যাম্বুলেন্সকে আসতে বলে। অ্যাম্বুলেন্স আসার সাথে সাথে ইনায়াকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
ডাক্তার ক্ষত জায়গা ভালোভাবে পরিষ্কার করে সেলাই করে দেয়, কিছু ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেয়। ডাক্তার রুম থেকে বের হতেই আনিসুর রহমান চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে আসে।
— ডক্টর, আমার মেয়ের কিছু হবে না তো? ঠিক হয়ে যাবে তো সব? এখন কেমন আছে?
ডক্টর— এত চিন্তা করবেন না, কিছু হয়নি ওর। শুধু ভয়ে অজ্ঞানে হয়ে গেছে। জ্ঞান ফিরলেই দেখা করতে পারবেন।
আনিসুর রহমান: ওকে ডক্টর।
ডক্টর চলে যায়। কিছুক্ষণ পর দুইজন পুলিশ আসে। আনিসুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলে, স্যার আমাদের ডেকেছিলেন?
আনিসুর রহমান চোখ তুলে তাকায়, "আরে রাকিব! হ্যাঁ ডেকেছিলাম।" অতঃপর সকল ঘটনা খুলে বললো।
রাকিব কপাল কুঁচকে এক ভ্রু উচু করে তাকিয়ে বলে,"সব শুনে মনে তো হচ্ছে, মেরে ফেলতে চেয়েছিল। তবে হয়তো কোনো কারণে মিস করে ফেলেছে।"
আনিসুর রহমান চিন্তিত হয়ে বলে, "আমার মেয়েকে কেন কেউ মারতে চাইবে? অনু খুব শান্ত, ভদ্র মেয়ে। বাইরের কারো সাথেই তেমন কথা বলে না। এমনকি কোনো বান্ধবী, বন্ধুও নেই। প্রায় সময়ই বাসায় নিজের রুমে থাকে। আমাদের সাথেও দরকার ছাড়া তেমন কথা বলে না।"
রাকিবের কপালটা শিথিল হয়ে যায়, "তাহলে এমন মেয়েকে কেন কেউ খুন করতে চাইবে? আচ্ছা ওর কোনো পুরনো শত্রু আছে? বা কোনো অপরাধে সাক্ষী হয়েছিল কখনো?"
আফরিন সুলতানা এগিয়ে আসে, "ইনায়ার কোনো শত্রু নেই আর না কোনো অপরাধের সাক্ষী দিয়েছিল কখনো। তবে অনেকদিন আগে আমার একটা কেইসে ইনায়া প্রমাণ বের করতে সাহায্য করেছিল। কিছু সিসি ক্যামেরার ফুটেজ রিকভার করে দিয়েছিল, আসামির সকল তথ্য বের করেছিল। ইনায়া ওইটা না করলে কেইসটা এমনি ক্লোজ হয়ে যেত। লোকটা তিন টা খুন করেছিল। যেদিন কোর্টের রায় দিয়েছিলাম সেদিন ইনায়া ভেতরেই ছিল। লোকটা ইনায়াকে অদ্ভুতভাবে দেখছিল। তবে লোকটার ফাঁসি অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে।"
রাকিব দু'বার মাথা উপর নিচ করলো, "আচ্ছা, মিস ইনায়া কি ঠিক আছে? তাহলে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতাম।"
আনিসুর রহমান শান্ত গলায় বললো, "সুস্থ আছে তবে জ্ঞান ফেরেনি।"
একটা সবুজ ইউনিফর্ম পরা ২৩ বছর বয়সি মেয়ে আনিসুর রহমানের দিকে এগিয়ে আসে।
—"আপনারা কি মিস ইনায়ার বাড়ির লোক?"
আনিসুর রহমান পিছনে ফিরে তাকায়, "হ্যাঁ। ইনায়ার কিছু হয়েছে নাকি?"
নার্স একটু মুচকি হেসে বলে, "না, না, কিছু হয়নি। পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। আপনারা চাইলে দেখা করতে পারেন।"
আনিসুর রহমান কথা না বলে কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়। তার পিছনে আফরিন সুলতানা, ইরা, রাকিব এগিয়ে যায়। ইনায়া উঠে আধশোয়া হয়ে বসে। রাকিব ইনায়ার কাছে এগিয়ে যায়,
—"আপনাকে কি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারি?"
ইনায়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
রাকিব: "আপনি কি কাউকে শুট করতে দেখেছেন?"
ইনায়া কিছুটা বিরক্তি সুরে বলে, "এইটা আমার চোখ, কোনো দূরবীন না যে ৭০০/৮০০ মিটার দূরে থাকা মানুষকে দেখবো।"
রাকিব: "আচ্ছা, আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?"
ইনায়া ঘাড় নেড়ে বলে, না।
রাকিব: "আচ্ছা, ওই বুলেটটা কোথায়? যেটা হাতে লেগেছিল?"
আনিসুর রহমান: "ওইটা দেওয়ালে আছে এখনো।"
রাকিব: "আচ্ছা, আমাদের ওইটা লাগবে পরীক্ষা করার জন্য।"
আনিসুর রহমান: "আচ্ছা।'
রাকিব কিছুক্ষণ আনিসুর রহমানের সাথে আলাদা কথা বলে চলে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর ইনায়াকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গাড়িতে বসে ইরা ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করে, "আপু তুমি কি আমার জন্য ব্যথা পাইছো?"
ইনায়া চোখ সরু করে ইরার দিকে তাকিয়ে কথাটার মানে খুঁজতে থাকে। তখনই হুট করে ইনায়ার মনে পড়ে গুলি খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার আগের ঘটনা। ইনায়া ফ্রিজে চকলেট রেখেছিল আর ইরা জিজ্ঞেস না করেই খেয়ে ফেলেছে। পরে যখন ইনায়া ফ্রিজ খুলে চকলেট না পেয়ে মায়ের কাছে বিচার দিলেও আফরিন সুলতানা তেমন কোনো বিচার করেনি। শুধু বলেছিল, ও তো বাচ্চা মানুষ একটু খেলে কি হয়? পরে আবার কিনে নিস।
ইনায়া অনেকটা রেগে যায় "তোমার আসকারা পেয়েই এমন হইছে। আমার কোনো জিনিস কেউ নিবে না, আর তোমার মেয়েরেও মানা করে দিবা।"
সব কথা ওরা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শুনে দৌড়ে রুমে চলে যায়। ইনায়া ও রুমে খেতে চলে যায়, তার কিছুক্ষণ পর ওই ঘটনা ঘটে।
ইনায়া চোখ ঘুরিয়ে অন্য পাশে তাকায়, "হ্যাঁ তোর জন্যই এইসব কিছু হয়েছে। আর একটু হলে তো আমি মরেই যেতাম।"
বড় বোনের মরার কথা শুনে ইরার চোখে পানি টলমল করছে। সে তো আপু কে অনেক ভালোবাসে। আপুর কিছু হলে তাকে কে ভালোবাসবে? কে আদর করবে?
ইনায়া আড় চোখে ইরাকে দেখে আবার বলে, "তোর জন্যই যেহেতু সব হয়েছে তাই তুই আমার সব কাজ করে দিবি।"
ইরা বাম হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, "আচ্ছা আমি সব কাজ করে দিবো, তাও তুমি মরার কথা বলো না। আর তোমার চকলেটও আমি খাবো না।"
ইনায়া অন্য দিকে তাকিয়ে মুখ চেপে হাসছে। আফরিন সুলতানা দুই বোনের খুনসুটি দেখে একটু আলতো হাসে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই বাসায় পৌঁছায়। ইনায়া সোজা ওপরে রুমে চলে যায় রেস্ট নিতে। আফরিন সুলতানা খাবার নিয়ে ওপরে যায় মেয়েকে নিজ হাতে খাওয়াতে। গিয়ে দেখে ইনায়া হাত নাড়ানোর চেষ্টা করছে। আফরিন সুলতানা রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে, "এখন এসব করতে হবে না, খেতে আয়।"
ইনায়া গিয়ে খাটে বসলো। ইনায়াকে খাইয়ে দিতে দিতে বলে, "মিস ইনায়া রহমান আপনার বিয়ের ব্যাপারে কি প্ল্যান?"
ইনায়া মায়ের কথায় খানিকটা বিরক্ত হয়। "আম্মু তুমিও! আমার কোনো বিয়ে করার প্ল্যান নাই। আগে নিজের পায়ে দাঁড়াই তারপর প্ল্যান করবো বিয়ের।"
আফরিন সুলতানা একবার ইনায়ার পায়ের দিকে তাকায়, "তো তুই কি এখন অন্যের পায়ে দাঁড়িয়ে আছিস? শোন, একটা ছেলে আছে, অনেক সুন্দর দেখতে, ব্যবসা করে । দেখতে চাও?
ইনায়া এবার প্রচণ্ড বিরক্ত হয়, "আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।"
আফরিন সুলতানা খাওয়া শেষ করে চলে আসে।
২ দিন পর...........
রাকিব ইনায়াদের বাসায় আসে। ইনায়া সিড়ি বেয়ে নামছিলো, রাকিবকে দেখে সোফাতে বাবার পাশে বসে, "কিছু জানতে পেরেছেন ?"
রাকিব মাথাটা উপর নিচ করে , " হ্যাঁ, আপনাকে যে রাইফেল দিয়ে মারা হয়েছিল সেটা ছিল "রেমিংটন-৭০০"। আমরা যে গুলিটা পেয়েছি সেটা .৩০৮ Winchester। এগুলো সাধারণত স্নাইপাররা ব্যবহার করে। এটা কিছুটা ব্যয়বহুলও। ওই বিল্ডিংয়ের সিসি ক্যামেরা চেক করেছি, এক লোককে দেখা গেছে। তাকে ধরার চেষ্টা করছি আমরা। আশা করছি খুব শীঘ্রই ধরে ফেলবো।"
ইনায়া সবটা শুনে লোকটার একটা ছবি নিজের কাছে রাখে। রাকিব আনিসুর রহমানের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে যায়।
--- ২ বছর আগে ---
চীনের বৃহত্তম শহর সাংহাই। এটি চীনের প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সাংহাইকে বলা হয় প্রাচ্যের নিউ ইয়র্ক। এখানে আকাশচুম্বী সব ভবন এবং বড় বড় করপোরেট অফিস। সাংহাই এর লাক্সারি হাসপাতাল United Family Healthcare (UFH)। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে ফোনে কথা বলছে। তার পরনে সাদা শার্ট, ব্ল্যাক কালার প্যান্ট, প্যান্টের সাথে ম্যাচিং করা একটি ওভারসাইজড কোট, কালো রঙের পয়েন্টেড হিলস, এক হাতে লেদার হ্যান্ডব্যাগ। চুলগুলো খোলা যা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে । ঠোঁটে নিউড রঙের লিপস্টিক। সব মিলিয়ে অসম্ভব সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে।
ফোনে কথা শেষ করেই প্রাইভেট কেবিন-১০ এ ঢোকে। বেডে একটা ছেলে শুয়ে ছিল যার পুরো মাথা কাঁধের অনেকটা জায়গা ব্যান্ডেজ করা ছিল। ছেলেটা তখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তার রুমে আসে। মেয়েটি ডাক্তারকে উদ্দেশ্য করে বলে, "হোয়েন হি রিগেইন কনশাসনেস (তার জ্ঞান ফিরবে কবে?)। "
ডাক্তার হাতের রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে বলে, "হোপফুলি ভেরি সুন (খুব শীঘ্রই আশা করা যায়)। "
মেয়েটি ওকে ডক্টর বলে রুম থেকে বের হয়ে ডঃ ওয়াং হে-র কেবিনে ঢোকে।
ডঃ ওয়াং হে মেয়েটিকে দেখে মুচকি হেসে ট্রিটমেন্ট টেবিলের দিকে ইশারা করে। মেয়েটি টেবিলে বসে নিজের গায়ের ওভারসাইজড কোট খুলে পাশে রাখে। সাদা শার্টটিও খুলে ফেলে। গায়ে শুধু ইনার ছিল। মেয়েটি পিছনে ঘুরে বসতেই পিঠে অনেকগুলো ক্ষত চিহ্ন দেখা যায়। ক্ষতগুলো বেশ গভীর ছিল। কাধের দিকে ক্ষত এতটাই গভীর ছিল যে অনেকগুলো সেলাই করতে হয়েছে। তবে এখন ক্ষতগুলো অনেকটাই শুকিয়ে গিয়েছে। আজ এসেছে লেজার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে সব দাগ মুছে ফেলতে। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা যাবৎ লেজার ট্রিটমেন্ট নিয়ে বের হয়। আগের কোনো দাগই শরীরে নেই। মেয়েটি ডক্টর ওয়াং হে-র সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে হাসপাতালের বাইরে বের হয়। কিছু খাওয়া-দাওয়া করে একটা ফুলের দোকানে যায়। সেখান থেকে একটা সাদা ও হালকা গোলাপি রঙের গোলাপ ফুল কেনে।
একটা ছোট চিরকুটে লেখে, "আমাকে বাঁচানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আর জ্ঞান ফিরলে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন।" নিজের নম্বরটা লিখে দেয়। আবার হাসপাতালে গিয়ে প্রাইভেট কেবিন-১০ এ যায়। ফুল আর চিরকুটটা টেবিলে রাখে। আনমনে কিছু কথা বলে চলে যায়।
পরদিন সকালে ফোন কলে ঘুম ভাঙে মেয়েটির। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই কল রিসিভ করে কানের কাছে এনে বলে "Hello"। অপরদিক থেকে লোকটা যা বলে তাতে মেয়েটি চোখ খুলে তাকায়। মেয়েটির একটি চোখ কালো রঙের হলেও অন্য চোখের মণিটি বাদামী রঙের।
ফোনটা পাশের টেবিলে রেখে তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে বের হয়। গাড়ি ড্রাইভ করে যায় United Family Healthcare এর সামনে। গাড়ি পার্ক করে চলে যায় প্রাইভেট কেবিন-১০ নম্বর রুমে। গিয়ে কাউকেই দেখতে পায় না। বেডে তিন বান্ডিল টাকা আর একটা ছোট চিরকুট। মেয়েটি খুলে দেখে, "থ্যাংক ইউ সো মাচ ফর দিস, ইট ইজ ইওর রিওয়ার্ড।"
মেয়েটা অনেকটা অবাক হয়। মনে মনে বলে, "যেখানে আমি তাকে ধন্যবাদ দিবো জীবন বাঁচানোর জন্য, উল্টো সে আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে। তার ওপর আবার এতগুলো টাকা রিওয়ার্ড দিয়ে গেলো। লোকটা তো অনেক বেশি মিস্টেরিয়াস।"
এইসব ভাবতে ভাবতেই চোখ পড়ে টেবিলের দিকে; কাল যে ফুল আর চিরকুট দিয়েছিলাম সেটা নেই। এর মানে লোকটা তা নিয়ে গেছে।
মেয়েটা চিরকুটটা নিজের কাছে রেখে দেয়। আর টাকা নিয়ে কাছের একটা অনাথ আশ্রমে দান করে দেয় কোনো নাম ছাড়াই।
একজন কালো স্যুট পরা লোক চেয়ারে বসা লোকের দিকে এগিয়ে গেলো, "বস মেয়েটা টাকাগুলো অনাথ আশ্রমে দান করে দিয়েছে।" অন্ধকারে বসা লোকটা হাত নাড়িয়ে তাদের চলে যেতে বলে। তারাও চলে যায়। লোকটা পিছনের দিকে ঘুরলে দেখা যায় সারা দেওয়াল জুড়ে ইনায়ার ছবি, ইনায়া রহমানের সমস্ত তথ্যও রয়েছে। পাশে বিশাল মনিটরে কয়েক জায়গার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ চলছে। লোকটির মুখে এক অদ্ভুত রকমের হাসি।
বর্তমানে ইনায়ার গুলি লাগার ১ মাস পর....
আজ ইনায়ার ভার্সিটির প্রথম দিন।
ইনায়া ভোর ৪:৩০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে। অজু করে নামাজ পড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
আফরিন সুলতানা ৮:৩০ মিনিটে এসে ইনায়াকে উঠিয়ে দেয় । ইনায়া খাবার খেয়ে রেডি হতে শুরু করে। একটা গ্রে রঙের থ্রি-পিস পরে, খোলা চুল বেঁধে নেয়। ভার্সিটির নোটিশ মোতাবেক ২১৫ নম্বর রুমে গিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ বাদেই একজন শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলো। সবার সাথে পরিচয় হওয়ার জন্য নাম আর বাসা জিজ্ঞেস করলো। ছেলেদের দিক দিয়ে শুরু করলো। ইনায়া তাকিয়ে এক একটা ছেলেকে দেখছে। তাৎক্ষণিক ইনায়ার ফোনে মেসেজ আসে, "আমি কিছু অনেক বেশি জেলাস হচ্ছি।"
ইনায়া অনেকক্ষণ মেসেজের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু কোনো রিপ্লাই করে না। কে হতে পারে তা ভাবছে তবে বুঝতে পারে না লোকটা কে..
ইনায়ার পাশের মেয়েটা বসার পর ইনায়া দাঁড়ায়। আমার নাম- ইনায়া রহমান, বাসা- মালিবাগ। বলেই বসে পড়ে। তবে সিট পিছনে বসা একটি ছেলে ইনায়ার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। কি মাত্রাতিরিক্ত সুন্দর .....
চারটা ক্লাস শেষ করেই ইনায়া ক্লাস থেকে বের হয় বাসায় যাওয়ার জন্য। তার ভীষণ বিরক্ত লাগছে, এত এত লেকচার শুনতে।
বারান্দা পার হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাচ্ছিল তখনই একটা ছেলে পিছন থেকে ডাকে, "হ্যালো
ইনায়া।"
ছেলেটার দিকে তাকায় ইনায়া, চিনতে না পারায় নিজের ফোনের দিকে তাকায়। ছেলেটি ইনায়ার ফোনের দিকে তাকানো দেখে নিজ থেকেই বলে, "আমরা একই ডিপার্টমেন্টে পড়ি, আমার নাম ইষান শাহ।" বলে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়ায়। ইনায়াও হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বলে, 'ইনায়া রহমান।'
সাথে সাথে হাত সরিয়ে নেয়। ইষান নিজ থেকেই সব কিছু বলতে শুরু করে। "আমার বাড়িতে বাবা, মা আর ছোট একটা বোন আছে। আমাদের বাসা হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ঠিক উল্টো পাশে যে ভবন আছে......."
কথা শেষ করার আগেই ইনায়া বলে উঠলো, "তুমি আশরাফ সাহেবের ছেলে?"
ইষান অবাক দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকায়, "তুমি কিভাবে জানো?"
ইনায়া ফোনের দিকে তাকিয়ে বলে, "আশরাফ সাহেবের বাসায় তার সাথে তোমার ছবি দেখেছিলাম। তবে মনে ছিলো না, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ঠিক উল্টো পাশের কথা শুনে মনে পড়লো।"
ইষানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়, "তুমি আমাদের বাসায় গিয়েছিলে?"
ইনায়া তখনও ইষানের দিকে তাকায় না, "আম্মুর সাথে একটা কাজে গেছিলাম।"
ইষান আরও অবাক হয়, :তাহলে আমি কোথায় ছিলাম?"
ইনায়া এবার ভ্রু কুঁচকে ইষানের দিকে তাকায়, "ওটা কি আমার জানার কথা ছিল?"
ইথান একটু হেসে বলে , "না।"
ইনায়া সিঁড়ি থেকে নামার জন্য পা বাড়াতেই ইথান যাওয়া আটকায়। "ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে একজন, দুজন আমার ফ্রেন্ড হয়েছিল, তাদের সাথে পরিচিত হবে?"
ইনায়া কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো, "আমার তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে।"
ইথান এগিয়ে এসে বলে, চলো তোমাকে গাড়িতে উঠিয়ে দেই।
রাগী চোখে ইনায়ার দিকে তাকায় ইষান। ইষান ইনায়ার চোখ দেখেই ইথান থেমে যায়। ইনায়া ও ভার্সিটি থেকে বের হয়ে বাসায় চলে যায়।
ইষান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইনায়ার চলে যাওয়া দেখছে। আর মনে মনে বলছে, "নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ সব সময়ই বেশি থাকে, আর তুমি তো আমার জীবনের সেই সবচেয়ে সুন্দর নিষিদ্ধ নেশা।"
ইষান আবার ক্লাসে চলে যায়। বাকি ক্লাস করতে।