ইনায়ার প্রেগন্যান্সির তিন মাস পার হয়ে এখন চতুর্থ মাসে পা দিয়েছে। শরীরটা আগের চেয়ে একটু ভারী হয়েছে, আর পেটের কাছটা আলাদা করে ফুলে উঠেছে। ইনায়া এমনিতে খুব একটা শুকনা নয়, তাই এই পরিবর্তনটা ওর নিজের কাছে খুব স্পষ্ট মনে হয়। ভার্সিটি যাওয়ার সময় ও এখন খুব সতর্ক থাকে, বেছে বেছে ঢিলেঢালা কামিজ বা কুর্তি পরে, যাতে বাইরের কেউ হুট করে কিছু বুঝতে না পারে।
অ্যারিসের সাথে ইনায়ার সম্পর্কটাও এই কয়েক মাসে অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। সেই আগের অবহেলা করে না। অ্যারিস অফিস থেকে ফিরেই ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে, কপালে , গালে ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দেয়। ইনায়াও এখন আর আগের মতো বিরক্ত হয় না, বরং অ্যারিসের এই পাগলামিগুলোতে ও অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আজ সকালে ইনায়া ওজন মাপার মেশিনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। গত কয়েক সপ্তাহে তার ওজন ৩ কেজি বেড়ে গেছে! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অ্যারিস তখন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল। হাতে ঘড়ি পরতে পরতে ও আয়নায় ইনায়ার গম্ভীর মুখটা দেখল। "কী হয়েছে? মুখটা ওরকম হাঁড়ির মতো করে আছো কেন?" অ্যারিস হালকা হেসে জিজ্ঞেস করল।
ইনায়া গাল ফুলিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "আমি এই বাসায় আর এক মুহূর্তও থাকব না, আমি বাপের বাড়ি চলে যাব!"
অ্যারিস অবাক হয়ে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াল, "কেন? হঠাৎ কী হলো? কেউ কিছু বলেছে?"
"হ্যাঁ, তোমার পুরো চৌদ্দ গুষ্টি মিলে আমাকে সারাক্ষণ খাওয়ানোর ওপর রাখে। এটা খাও, ওটা খাও—এইসব করতে করতে তারা আমার ৩ কেজি ওজন বাড়িয়ে ফেলেছে!"
অ্যারিস হেসেই ফেলত, কিন্তু ইনায়ার সিরিয়াস মুখ দেখে হাসি চেপে বলল, "তো তারা দিয়েছে আর তুমিও সুবোধ বালিকার মতো সব সাবাড় করে দিয়েছ? ফিরিয়ে দিতে পারো নি?"
ইনায়া ঠোঁট উলটে বলল, "কী করব? আমার তো এখন সারাক্ষণ ক্ষুধা লাগে। খেতে বসলে আর হুশ থাকে না। সব দোষ তোমার বাড়ির লোকের!"
অ্যারিস ইনায়ার খুব কাছে এল, দুই কাঁধে হাত রেখে ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তুমি ৩ কেজি না, ৩০ কেজি বাড়লেও আমার কাছে তুমি সেই সুন্দরী ইনায়াই থাকবে। কিন্তু বউ, তোমাকে ছাড়া আমি এই বাসায় একা এক রাতও কাটাতে পারব না। প্লিজ, যাওয়ার কথা বলো না।"
ইনায়া আর কিছু বলতে পারল না। ও জানে, এই মানুষটা বাইরে যতই কঠোর হোক না কেন, ওর জন্য অ্যারিস কতটা পাগল। আর যদি চলে যাওয়ার কথা বলে তাহলে সে নিজেই নিজের ক্ষতি করে ফেলবে।
ইনায়া অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, "ওকে... ওকে! যেহেতু এত রিকোয়েস্ট করছ, তাহলে আর যাচ্ছি না।"
অ্যারিস চুলে জেল দিতে দিতে দুষ্টুমি ভরা হাসিতে বলল, "আমি আবার রিকোয়েস্ট করলাম কখন? আমি তো জাস্ট আমার অধিকারের কথা বললাম!"
ইনায়া আর তর্কে গেল না। মুচকি হেসে ও রেডি হতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এল হালকা গোলাপি রঙের একটা সিম্পল ডিজাইনের থ্রি-পিস পরে। জামাটা অ্যারিস নিজেই পছন্দ করে কিনে দিয়েছিল, তাই ওর গায়ের রঙে বেশ মানিয়েছে। ইনায়ার চুল তখন খোলা ছিল।
অ্যারিস মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। "বউ, খোলা চুলে তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে।"
ইনায়া চোখ তুলে অ্যারিসের দিকে তাকায়। অ্যারিস নিজের দুই হাত বুকের বাম পাশে চেপে ধরে বলে, "বউ তুমি আমার দিকে এভাবে তাকিও না, আমার তাহলে সত্যি সত্যিই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি সব সময় চুল বেঁধে রাখো কেন?"
ইনায়া চুল ঠিক করতে করতে বলে, "সারাক্ষণ সামনে চলে আসে, কাজে ডিস্টার্ব হয়। এখন তাড়াতাড়ি চলো।"
দুজন মিলে নিচে ডাইনিং টেবিলে এল। ইনায়া খেতে বসছে, মাহি কল দেওয়াতে অ্যারিস দূরে গিয়ে কথা বলছে। টেবিলে ইভান আপনমনে খাচ্ছে আর ফোনের স্ক্রিন দেখে মিটিমিটি হাসছিল। ইনায়া খেতে খেতে ইভানকে জিজ্ঞেস করে," তা প্রেম কতদিন ধরে চলছে?" ইভান অবাক হয়, ফিসফিস করে বলে, "ভাবী তুমি কিভাবে জানলে?"
ইনায়া বলল, "সায়মাকে দেখে। কিন্তু ওরে রাজি কীভাবে করালে?"
— "অনেক কষ্টে ভাবী, উফ, যে পরিমাণ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাকে! কতবার যে রিজেক্ট করেছে বলার বাইরে। তাও হাল ছাড়ি নি। শেষ পর্যন্ত রাজি করিয়ে ছেড়েছি।"
ইনায়া হাসল, "ইটস ওকে। তবে শোনো, সামনে ওর এক্সাম। ওকে এখন একদম প্রেশার দেবে না, পড়ার সময় ডিস্টার্ব করবে না কিন্তু।"
ইভান মাথা নাড়ল, "ওকে ভাবী, একদম না।"
ততক্ষণে অ্যারিস কথা শেষ করে ফিরে এসেছে। খাওয়া শেষ করে অ্যারিস নিজেই ড্রাইভ করে ইনায়াকে ভার্সিটি ড্রপ করে দিলো।
সন্ধ্যা ০৬:৩৪
রোহান ইনায়াকে কিছু ফুটেজ, ছবি, ভয়েস রেকর্ড, রিপোর্ট পাঠায়। ইনায়া সবকিছু চেক করে। রোহানকে ৫০ হাজার টাকা পাঠায়। মেসেজ দেয়- আর তোমার বেতন কালই ঢুকে যাবে। রোহান প্রথম থেকেই ইনায়ার সাথে বিজনেস সামলাতো। সে শুধু একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট নয়, বরং ইনায়ার সাফল্যের পেছনের মূল কারিগর বা রাইট হ্যান্ড বলা চলে। সে শুধু ফাইল বা ডিজিটাল সামলায় না, বরং ইনায়ার যাবতীয় সিক্রেট মিশন অত্যন্ত নিপুণভাবে লিড করে।
মার্চ মাসের তপ্ত রোদটা আজ যেন কোর্ট চত্বরে এক টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে। আজ ১ মার্চ, ২০২৬ মোহনার বিরুদ্ধে ইনায়ার করা সেই বহু প্রতীক্ষিত মামলাটি আজ এজলাসে উঠছে।
সকাল ঠিক ১০:০০ টা।
আদালত কক্ষটি কানায় কানায় পূর্ণ। সামনের সারিতে বসে আছেন আনিসুর রহমান, আফরিন সুলতানা, অ্যারিস, পেছনে ইভান, শামীমা বেগম, আদিয়ান ও উৎসর্গিত হয়েছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মহামান্য বিচারক এজলাসে প্রবেশ করলেন, সবাই সসম্মানে উঠে দাঁড়ালেন। বিচারক যখন নিজের আসনে বসতে যাবেন, তখন তার নজর পড়ল সামনের সারিতে বসে থাকা আফরিন সুলতানার ওপর। তিনি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন, আফরিন সুলতানা হাইকোর্টের একজন অত্যন্ত সম্মানিত বিচারক, তার মেধা আর সততা পুরো বিচার বিভাগে সুপরিচিত। বিচারক অত্যন্ত সঙ্কোচে আফরিন সুলতানাকে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আফরিন সুলতানা হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিলেন। বিচারক ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বিনীতভাবে নিজের আসনে বসে পড়লেন। আদালত কক্ষের নীরবতা ভেঙে বিচারক ডায়েরিতে এর নজর বুলিয়ে ঘোষণা করলেন: "মামলা নম্বর ৪০২/২৬, ইনায়া বনাম মোহনা। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের শুনানীর জন্য আহ্বান করা হচ্ছে। কার্যক্রম শুরু করা হোক।"
ইনায়া কাঠগড়ার একপাশে গিয়ে দাঁড়াল, তার পরনে মার্জিত পোশাক, চোখেমুখে কোনো ভয় নেই, অন্যপাশে মোহনা দাঁড়িয়ে আছে, যার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মোহনার সঙ্গের আইনজীবী হাজির হয়। বিচারক নথি দেখে মাথা তুললেন, "আপনার আইনজীবী কোথায়?" ইনায়া শান্ত গলায় বলল, "মাই লর্ড, আমি নিজেই পার্টি-ইন-পারসন হিসেবে আমার মামলা পরিচালনা করতে চাই।"
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মোহনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে, সে ভাবতেও পারেনি ইনায়া কোনো উকিল ছাড়াই নিজে নিজের কেস লড়বে। বিচারক চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকালেন, "নিজে লড়বেন? আপনি কি আদালতের নিয়মকানুন সম্পর্কে অবগত?"
ইনায়া বিনয়ের সাথে মাথা নিচু করে বলল, "জি মাই লর্ড, আমি শুধু তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কথা বলব।"
বিচারক মাথা নাড়লেন, "ঠিক আছে, আপনি শুরু করুন।"
ইনায়া সরাসরি মোহনার আইনজীবীর দিকে একবার তাকিয়ে বিচারকের দিকে ফিরল: "মাই লর্ড, আমার প্রমাণ হিসেবে আমি ল্যাবরেটরি রিপোর্ট এবং সেই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ পেশ করতে চাই। মোহনা আমাকে যে ড্রিংকসটি দিয়েছিল, তাতে মেশানো হয়েছিল এক ধরনের শক্তিশালী সিডেটিভ ড্রাগ, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে সাময়িকভাবে অবশ করে দেয় এবং প্রলাপ বকতে বাধ্য করে। আমার কাছে সেই গ্লাসের ফরেনসিক রিপোর্ট আছে, যাতে মোহনার আঙুলের ছাপ এবং ড্রাগের অস্তিত্ব—উভয়ই স্পষ্ট।"
মোহনার আইনজীবী আপত্তি করে উঠে দাঁড়ালেন, "অবজেকশন মাই লর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ টেম্পারড হতে পারে। আর আঙুলের ছাপ থাকলেই প্রমাণ হয় না যে আমার মক্কেল ড্রাগ মিশিয়েছেন।" ইনায়া মুচকি হাসল। ইনায়া শান্ত গলায় বলল, "মাই লর্ড, বিজ্ঞ আইনজীবীর অবজেকশন যৌক্তিক হতো যদি না আমার কাছে মোহনার কল রেকর্ড থাকত। ঘটনার ঠিক দশ মিনিট আগে তিনি ড্রাগ ডিলারের সাথে কথা বলেছিলেন এবং পেমেন্ট করেছিলেন ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে। আমি আদালতের অনুমতি নিয়ে সেই ট্রানজেকশন আইডি এবং কল ডিটেইলস স্ক্রিনে দেখাতে চাই।"
মোহনা কাঁপতে শুরু করেছে। আদালত কক্ষে উত্তেজনা তখন চরমে। মোহনার আইনজীবী মরিয়া হয়ে দাবি করতে করতে লাগলেন যে, সিসিটিভি ফুটেজ বা কল রেকর্ড দিয়ে প্রতিহিংসার প্রমাণ হয় না। মোহনা নিজে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করল, "মাই লর্ড, ইনায়া আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে, আমি কেন তাকে ড্রাগ দেব? আমরা তো বন্ধু ছিলাম।"
ইনায়ার ঠোঁটের কোণে তখন এক তাচ্ছিল্যের হাসি। সে শান্ত গলায় বলল, "বন্ধু? মাই লর্ড, বন্ধুত্বের সংজ্ঞা মোহনার কাছে আলাদা। ড্রাগ দেওয়ার ঘটনাটি ছিল কেবল শুরু। মোহনা যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার প্রমাণ আমার কাছে আরও আছে।" ইনায়া আদালতের প্রজেক্টরে আরেকটি ভিডিও ফাইল ওপেন করল, তারিখ দেখাচ্ছে— ৩০ অক্টোবর ২০২০। "মাই লর্ড, এই দিনটি ছিল আমার জন্মদিন। একটি রেস্টুরেন্টে আমি ছোটখাটো বার্থডে পার্টির আয়োজন করেছিলাম, মোহনাও সেখানে ছিল। মাঝপথে আমি যখন ওয়াশরুমে যাই, তখন ওত পেতে থাকা কয়েকজন ভাড়াটে গুণ্ডার কথোপকথন আমার কানে আসে, তারা বলছিল, আজই ইনায়াকে শেষ করার কন্ট্রাক্ট। আমি আতঙ্কিত হয়ে পালানোর চেষ্টা করি, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রেস্টুরেন্টের শর্ট সার্কিট থেকে ভয়াবহ আগুন লেগে যায়। চারদিকে কালো ধোঁয়া, চোখ জ্বালা করছিল, আমি যখন মেইন গেটের দিকে দৌড়ে যাচ্ছিলাম, তখন হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই এবং আমার পা কেটে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় যখন আমি সামনের দিকে তাকালাম, দেখলাম মোহনা আমার চোখের সামনে রেস্টুরেন্টের একমাত্র বের হওয়ার দরজাটি বাইরে থেকে আটকে দিচ্ছে! সে চেয়েছিল আমি আগুনেই পুড়ে মরি।"
ইনায়া ল্যাপটপ থেকে সেই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ আদালতের বড় স্ক্রিনে প্লে করল। সেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রেস্টুরেন্টের দরজাটা মোহনা বাইরে থেকে লক করে দিয়ে দ্রুত সটকে পড়েছে। ইনায়া বলতে লাগল, "সেদিন আমি বুঝেছিলাম ওখানে থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত। সেই সময় বের হওয়ার সমস্ত দরজা বন্ধ ছিল। আমি তখন কোনোভাবে বন্ধ জানালার কাছে যাই। নিজের পায়ের হিল খুলে কাচের জানালায় আঘাত করতে থাকি। এক পর্যায়ে জানালা ভেঙে যায়। আমি সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ি, কাঁচ লেগে আমার পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। মাথা তুলতেই দেখি সেই ভাড়া করা গুণ্ডারা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি রক্তাক্ত পা নিয়ে প্রাণপণে দৌড়াতে থাকি। কিন্তু এক পর্যায়ে তারা আমাকে ধরে ফেলে। একজন লাঠি দিয়ে আমার পায়ে এমন জোরে আঘাত করে যে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। অন্যজন আমার মাথায় আঘাত করলে মাথা ফেটে রক্ত চুইয়ে পড়তে থাকে।"
ভিডিওর পরের অংশে দেখা গেল, রক্তাক্ত ইনায়া রাস্তার পাশের এক গোলাপের স্তূপের ওপর গিয়ে পড়েছে। গুণ্ডারা সেই গোলাপের স্তূপের ওপর ফেলে মারতে শুরু করে।
"আমি কাউকে ডাকার জন্য হাত বাড়িয়েছিলাম তবে নিজের পুরো রক্তাক্ত হাত দেখে নিজেই ভয় পেয়েছিলাম।"
ইনায়ার সাদা পোশাক তখন রক্তে লাল। ইনায়ার রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা শুনে অ্যারিসের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। ইনায়া বলল, "ওদের একজনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পাশের খালে ঝাঁপ দিই। শরীর থেকে বের হওয়া রক্তে পানি পুরো লাল হয়ে যায়। ওরা ভেবেছিল আমি মারা গেছি, তাই চলে যায়। মাই লর্ড, এই ফুটেজগুলোই বলে দেয় মোহনা শুধু আমাকে ড্রাগ দেয়নি, সে বারবার আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।"
বিচারক গম্ভীর মুখে ফুটেজগুলো দেখছেন। মোহনা তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কাঠগড়া ধরে চিৎকার করে উঠল, "মাই লর্ড, এই ভিডিও সব এআই (AI) দিয়ে বানানো! ইনায়া জালিয়াতি করছে ও আমাকে ফাঁসাতে চাইছে।" ইনায়া এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। শান্ত অথচ ধারালো গলায় সে জবাব দিল, "মিস মোহনা, এখন ২০২৩ সাল চলছে। এআই প্রযুক্তি এখনও এতটা উন্নত হয়নি যে কেউ একদম নিখুঁতভাবে এমন হাই ডেফিনিশন আর বাস্তবধর্মী ভিডিও তৈরি করে ফেলবে। আপনার অজুহাতটা বড্ড সেকেলে হয়ে গেল।"
মোহনার উকিল এবার শেষ চেষ্টা হিসেবে একটা ছবি বের করে বিচারকের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ইনায়া, মোহনা এবং সেই গুণ্ডা চেহারার ছেলেগুলো—সবাই মিলে একটা রেস্টুরেন্টে হাসিমুখে পোজ দিচ্ছে। উকিল সাহেব আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, "মাই লর্ড, দেখুন, তারা সবাই এখানে বন্ধু হিসেবে বসে আছে। কেউ কি বলবে মোহনা বা এই ছেলেগুলো মিস ইনায়াকে মারতে পারে? ছবিই বলে দিচ্ছে তাদের সম্পর্ক কত মধুর ছিল।"
ইনায়া বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলল, "মাই লর্ড, বিজ্ঞ আইনজীবী যে ছবিটি দেখাচ্ছেন সেটা ২০২১ সালের। আমরা একসময় একই ফ্রেন্ড সার্কেলে ছিলাম। মিস মোহনা চেয়েছিল এই মার্ডারের ব্যাপারটা যাতে বাইরের কেউ সন্দেহ না করে, তাই তিনি আমার পরিচিত এই ছেলেগুলোকেই টাকার বিনিময়ে হায়ার করেছিলেন। ইনায়া আদালত কক্ষের স্পিকারের একটা ভয়েস রেকর্ড প্লে করল এবং বড় স্ক্রিনে কিছু স্ক্রিনশট প্রজেক্ট করল। সেখানে মোহনার সাথে সেই ভাড়াটে গুণ্ডাদের দর কষাকষির মেসেজ আর ইনায়াকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ পরিষ্কারভাবে শোনা গেল।
একের পর এক অকাট্য প্রমাণ দেখে মোহনা যেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। সে পাগলের মতো অট্টহাসি শুরু করল।
আফরিন সুলতানা বিড়বিড় করে বললেন, "এই না হলে আমার মেয়ে! বিপক্ষ মুখ খোলার আগেই প্রমাণ দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দিচ্ছে।"
বিচারক এবার হাতুড়ি পিটিয়ে গম্ভীর স্তরে বললেন, "অর্ডার! অর্ডার! মিস মোহনা, ভদ্রতা বজায় রাখুন। এটা আদালত, আপনার ব্যক্তিগত ড্রইংরুম নয়।"
মোহনা এবার হঠাৎ হাসি থামিয়ে রক্তবর্ণ চোখে ইনায়ার দিকে তাকাল। তারপর ফেটে পড়া কণ্ঠে স্বীকারোক্তি দিল — হ্যাঁ! হ্যাঁ! আমিই ইনায়াকে মারতে চেয়েছিলাম! আমিই লোক ভাড়া করেছি ওকে শেষ করার জন্য।
আদালত কক্ষের বাতাস যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। মোহনা বড় বড় চোখ করে বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল:
"আমরা হাইস্কুল থেকে একসঙ্গে ফুটবল খেলতাম। প্রতিটা ম্যাচে, প্রতিটা মুহূর্তে সব আলো থাকত ইনায়ার ওপর। শেষ মুহূর্তে ও গোল করে টিম জিতিয়ে দিত, আর সবাই ওকে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ত। তার আগে যে আমি হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে গোল করতাম, তা নিয়ে কেউ একটা কথাও বলত না! আমি কি ভালো খেলতাম না? তবে শুরুতে আমি এসব পাত্তা দিইনি। ভেবেছিলাম বড় জায়গায় গেলে ঠিকই কদর পাব। কিন্তু ভাগ্য আমার সাথেও বেইমানি করল। আমরা যখন জুনিয়র টিমে খেলার সুযোগ পেলাম, সেখানেও সেই একই গল্প। অবশেষে সুযোগ এল ন্যাশনাল টিমে যাওয়ার, তবে সেটা ১ জনই যেতে পারবে। আমি দিন-রাত এক করে প্র্যাকটিস শুরু করলাম, নিজের সবটুক উজার করে দিয়ে ইমপ্রুভ করলাম। কিন্তু একদিন আড়ালে দাঁড়িয়ে কোচের কথা শুনে আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। কোচ বলছিলেন, আমাদের টিম থেকে ন্যাশনাল টিমে যাওয়ার জন্য ইনায়াই পারফেক্ট। আমার মাথা তখন কাজ করছিল না। এত পরিশ্রমের পরও আমি কেন বাদ পড়ব? আমার মনে হলো, ইনায়াকে যদি কোনোভাবে মাঠ থেকে সরানো যায়, তবে জায়গাটা অটোমেটিক আমার হবে। তাই ওকে সেই ড্রাগ দিয়েছিলাম। ড্রাগের প্রভাবে ওর আচরণ বদলে গেল, আর ও নিজেই আপনমনে টিম থেকে বেরিয়ে গেল। আমি ভাবলাম এবার পথ পরিষ্কার। কিন্তু না! কোচ নাছোড়বান্দা, তিনি নাকি ইনায়াকেই বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনবেন। তখনই আমার ভেতরে জেদ চেপে বসল। সব সুযোগ কেন ইনায়াই পাবে? কেন ওকেই সবার পছন্দ হবে? তাই আমি ঠিক করলাম ওকে পুরোপুরি শেষ করে দেব। যদি ইনায়া এই পৃথিবীতে না থাকে, তবে ন্যাশনাল টিমে আমাকে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তাই ওকে মারার জন্য লোক ভাড়া করেছিলাম।"
মোহনার কথাগুলো শেষ হতেই আদালত কক্ষের সবাই শিউরে উঠল। স্রেফ একটা খেলার জায়গার জন্য একজন মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে? আফরিন সুলতানা বুঝতে পারে কেন তার মেয়ে জন্মদিন পালন করত না, সেদিন কেন বাসা থেকে অনেক দূরে চলে যেত। তবে তার কাছে মনে হচ্ছে এখনো অনেক কিছু গোপন রাখা হয়েছে। ওই বছরে ইনায়া কয়েকদিন বাড়ি আসেনি ।সুবা ফোন করে বলেছিল ইনায়া তাদের বাসায় থাকবে কিছুদিন। সামনে পরীক্ষা তাই। তখন কোর্টে ব্যস্ত থাকায় আবার ইরা ছোটো ছিল তাই রাজি হয়ে গিয়েছিল। তাহলে ওই সময়ে আসলেই সুবাদের বাসায় ছিলো? পরে কয়েক দিন পর বাসায় আসার পর থেকেই ইনায়ার আচরণ বদলে গিয়েছিল। দ্বিতীয় তলার ফ্লোর পুরোটা নিজের করে নেয়, কাউকে যেতে দেয় না। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। কেমন যেনো চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।
ইনায়া মোহনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, যা সবাইকে চমকে দিল। "আপনার ন্যাশনাল টিমে যাওয়ার পথে বাধা ছিলাম আমি, আমাকে মারতে চেয়েছিলেন, তার একটা বিকৃত যুক্তি আপনার কাছে আছে। কিন্তু মিস মোহনা... আপনি সুবাকে কেন মারতে চেয়েছিলেন? ও তো ফুটবল খেলত না, ও তো আপনার ন্যাশনাল টিমে যাওয়ার পথে কোনোদিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তবে তার ওপর আপনার এই আক্রোশ কেন?"
যদিও ইনায়া আগে থেকে সবটা জানত, প্রমাণ করার জন্য মোহনাকে এ কথা জিজ্ঞেস করে, মোহনা তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে শুরু করল: "সুবা? ওই মেয়েটা তো মাঝখান থেকে এসে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল। আমি একবার চায়নায় একটা টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলাম, সেখানে একদিন দেখি ইনায়া একটা ছেলের সাথে বসে নিভৃতে কথা বলছে। আমি কৌতূহলবশত তাদের ঠিক পেছনের সিটে গিয়ে বসি। ওদের কথা আড়ি পেতে শুনে আমি থমকে যাই - বুঝতে পারি ওই ছেলেটিই হলো ইনায়ার সেই হারিয়ে যাওয়া ভাই আদিয়ান। তখনই আমার মাথায় শয়তানি বুদ্ধিটা খেলে গেল। আমি ঠিক করলাম, ইনায়াকে তো মারতে পারি নি সেদিন তাই ওর জীবনের সব সুখ আমি একে একে কেড়ে নেব। ওকে আমি নিঃস্ব করে ছাড়ব। কিছুক্ষণ পরই ঘটে সেই ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট। আমি ঘটনাক্রমে ওখানেই ছিলাম। আদিয়ান ভীষণভাবে আহত হলো। সুবা ভার্সিটি যাওয়ার জন্য সেও একই বাসে ছিল। ও সুবা আদিয়ানকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়। সুবাও নিজেও আহত হয়েছিল, তবে আদিয়ানের মতো অতটা গুরুতর নয়। আমি ভাবলাম, সুবা বেঁচে থাকলে আদিয়ানকে ইনায়ার কাছে ফিরিয়ে দিবে, আর সুবাকে যদি সরিয়ে দিতে পারি, তবে আদিয়ানের কাছাকাছি যাওয়া আমার জন্য পানির মতো সহজ হয়ে যাবে। আমি ওর কেবিনে ঢুকে ওর গলা টিপে ধরি... মেয়েটা প্রায় মরেই যাচ্ছিল! কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একজন নার্সকে ওদিক আসতে দেখে আমি ওকে ছাড়তে বাধ্য হই। রুম থেকে বেরিয়ে আমি সরাসরি আদিয়ানের কাছে যাই। আদিয়ান তখন আধা-চেতন অবস্থায় ছিল। ও ভেবে নিল আমিই বুঝি ওকে বাঁচিয়েছি। আমিও ওর সেই ভুল ধারণা ভাঙানোর প্রয়োজন বোধ করিনি। পরে সুবার রুমে গিয়ে দেখি ও নেই, খোঁজ নিয়ে শুনলাম কে যেন নিয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম ও মারাই গেছে, তাই হয়তো বডি নিয়ে গেছে কেউ।"
আদিয়ান বুঝতে পারে কে তাকে সেদিন বাঁচিয়েছিল। তবে সে সুবাকে চেনে না। দেখে নি কখনো।
ইনায়া কিছু রিপোর্ট দেয় আর সাথে সুবার স্টেটমেন্ট দেয়। ইনায়া সামনে তাকিয়ে বলে, প্রথম রিপোর্টটা হলো, মোহনা যে সুবাকে গলা চেপে ধরেছিল সুবার গলায় মোহনার ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যায়। আর দ্বিতীয় রিপোর্টটা হলো, গলা চাপার সময় সুবার সাথে হাতাহাতি হয়, সুবার নখে মোহনার চামড়া পাওয়া যায়। আর সুবা এখন চায়নাতে থাকায় কোর্টে উপস্থিত হতে পারেনি, তাই স্টেটমেন্ট দিয়েছে।