ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি

পর্ব 24

লেখক: F. Tabassum

মিমি দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌঁছাল খাবারের সেকশনে। সুস্বাদু কাচ্চি আর রোস্টের খাস গন্ধে চারপাশ মঁমঁ করছে। ঠিক তখনই মিমির চোখ পড়ল একজনের পিঠের ওপর। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল তেমন কেউ নেই এখানে। টলমলে একটা ছেলে প্লেটে খাবার বেড়ে নিচ্ছে। মিমির স্বভাবজাত সেই 'শিকারী' মন আবার জেগে উঠল। পেছন থেকে দেখেই ছেলেটিকে তার বেশ মনে ধরল। নিজের মনে মনে বলল, "কি সুন্দর ফিগার।"
ছেলেটা প্লেট হাতে ঘুরতেই মিমির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার জোগাড়। মিমি আদিয়ানকে চিনতে না পারলো না! সেই ছোটবেলাতে দেখেছিলো , এরপর আর দেখা হয় নি। হবেও কি করে আসতো না এই বাসায়।

আদিয়ান কিন্তু মিমিকে এক পলকেই চিনে ফেলেছে। আজ বাসায় মিমি আসার পরই ইনায়া দেখিয়ে দিয়ে দূরে থাকতে বলেছিলো। আদিয়ানের সাথে মামাতো ভাই বোনের এত গভীর সম্পর্ক নেই যে দেখলে হাই হ্যালো করবে , আড্ডা দিবে ।

আদিয়ান ভ্রু কুঁচকে রুক্ষ গলায় প্রশ্ন করল, "কী চাই?"
মিমি তার সেই চেনা ন্যাকামি মাখা হাসিতে বলল, "তোমাকে।"
আদিয়ানের চোখ ছানাবড়া, "কীইইইইই???"
মিমি পরিস্থিতি সামলাতে জিভ কেটে বলল, "আই মিন... এই খাবারটা।"
আদিয়ান অবজ্ঞার হাসি দিয়ে বলল, "তো নিয়ে যাও, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ কেন?"
মিমি আদিয়ানের প্লেটের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "এই খাবারটা বুঝি আমার জন্যই সাজিয়েছেন?"
আদিয়ান ঝট করে প্লেটটা সরিয়ে নিল, "আপনার জন্য না, একদমই না।"
মিমি এবার মরিয়া, সে ভাবল ইনায়া যদি অ্যারিসকে কলার ধরে কিস করে পটাতে পারে, সে কেন পারবে না? যেমনই ভাবা তেমনই কাজ! সে আদিয়ানের পাঞ্জাবির কলার খামচে ধরে যেই না কাছে এগোতে চাইল, অমনি বাতাসের বেগে আদিয়ানের হাতের এক 'ঠাস' করে থাপ্পড় এসে পড়ল মিমির গালে। ঠিক সেই মুহূর্তে সুবা সেখানে হাজির। আদিয়ান খাবার নিয়ে ফিরছে না দেখে সে আসছিল খোঁজ নিতে। মিমির এই বেহায়াপনা দেখে সুবার রক্ত মাথায় চড়ে গেল। সে তো আগে থেকেই জানত এই মেয়েটা ইনায়ার কত বড় শত্রু। তার উপর এখন আবার তার স্বামী কে লাইন মারছে।
সুবা গিয়ে মিমির চুলের মুঠি ধরে এক ঝটকায় দূরে ছিটকে ফেলে দিল। মিমির ফর্সা গাল তখন আদিয়ানের থাপ্পড়ে লাল হয়ে আছে। সুবা শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে রণচণ্ডী মূর্তিতে মিমির দিকে এগোতে এগোতে বলল, "আজকেই তোর শেষ দিন!"
মিমি দেখল অবস্থা বেগতিক। অ্যারিসের কাছে অ্যাম্বুলেন্স আর আদিয়ানের কাছে থাপ্পড় খাওয়ার পর সুবার হাতে মার খাওয়ার ঝুঁকি সে আর নিতে চাইল না। জুতো হাতে নিয়ে মিমি আবার উল্টো দিকে দিল এক দৌড়। তার দৌড় দেখে মনে হচ্ছিল অলিম্পিকে সোনা জয় করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
পেছন থেকে সুবা তখনও চিৎকার করছিল, কিন্তু মিমি ততক্ষণে পার্কিং লটের দিকে অদৃশ্য। মিমি পার্কিং লটে গিয়ে হাঁপাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার নজর পড়ল এক সুঠাম দেহের যুবকের ওপর। হাতে এক তোড়া সূর্যমুখী ফুল নিয়ে সে অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। মিমির মনে হলো, বাহ! হাইট তো একদম পারফেক্ট, স্টাইলটাও দারুণ। সে মনে মনে ভাবল, "এতক্ষণে একটা মনের মতো রাজপুত্রের দেখা মিলল!"
সে বিড়ালের মতো পা ফেলে ছেলেটির ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। গলার সুর যতটা সম্ভব কোমল করে বলল, "ফুলগুলো কি আমার জন্য?"
ইভান চমকে উঠে পেছনে তাকাল, "না তো।"
মিমি একগাল হেসে বলল, "আরে লজ্জা পেয়ো না, দাও দাও! আমি জানি এগুলো আমার জন্যই এনেছ।"

ইভান বিরক্তিতে নাক কুঁচকে বলল, "তোর জন্য এসব ফুল আনতে যাব কেন? তোরে দেখলে তো মনে হয় ৬০ বছরের বুড়ি, আইছে আমার সাথে লাইন মারতে... বেয়াদব মহিলা! যা এখান থেকে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে ইভানের পেছনে এসে সায়মা রাগে গিজগিজ করে উঠল, "তুই নিজে যাবি নাকি আমি আসব?"
মিমি তাকিয়ে দেখল সায়মা জুতো হাতে নিয়ে রেগে দাঁড়িয়ে আছে। মিমির আর বুঝতে বাকি রইল না যে কপাল আজ সত্যিই খারাপ, সে আবার জুতো হাতে নিয়ে সেখান থেকে এক দৌড় দিল।
একা হাঁটতে হাঁটতে মিমি কপাল চাপড়াচ্ছিল, "আমার জন্য কি কোনো ছেলে নেই? আমার কপাল এমন কেন! আল্লাহ, একটা সুদর্শন পুরুষই তো চেয়েছিলাম, ওটা অন্তত দিয়ে দাও।"
ভেতরে ইনায়া তখন আইরাকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে এসেছে। সে আর অ্যারিস সোফায় বসে মিমির আজকের কাণ্ডকারখানা নিয়ে হাসাহাসি করছে। এমন সময় আদিয়ান আর সুবা ঝগড়া করতে করতে ঘরে ঢুকল।
আদিয়ান: "ও আমার জাস্ট মামাতো বোন হয়. "
সুবা: "বোন আবার কলার ধরে টেনে কিস করতে চায় ?"
আদিয়ান: "করে তো নি. থাপ্পড় দিয়েছি দেখেছো তো !"
সুবা: "ওর সাথে গিয়ে থাকো যাও!"
ইনায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তোদের আবার কী হলো?"
আদিয়ান মিমির সেই কলার ধরার ঘটনা সব খুলে বলল। সব শুনে ইনায়া আর অ্যারিসও তাদের সাথে মিমির যা ঘটেছে তা শেয়ার করল। এর মধ্যেই ড্রইংরুমে ঢুকল সায়মা, আর তার পেছনে কাঁচুমাচু মুখে ইভান। ইভান অনুনয় করে বলছে, "প্লিজ সায়মা, রাগ কোরো না। আমি ওই মহিলাকে চিনিই না, একটু বোঝো প্লিজ।"
সায়মা: "ওর জন্য ফুল এনেছো না, যাও ওকে গিয়ে দাও.."
ইভান: "আমি ওইটা তোমার জন্য এনেছিলাম!"
অ্যারিস গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তোদের আবার কী হলো??"
ইভান যখন মিমির সূর্যমুখী ফুল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার কথা বলল, তখন আর কারো বুঝতে বাকি রইল না যে মিমি আজ বাড়ির সবকটা বরের ওপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দিয়েছে।
অ্যারিস দৃঢ় স্বরে বলল, "মেয়েটাকে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। নইলে ও যেভাবে পাগলামি শুরু করেছে, আমাদের সবার সংসার ভাঙতে ওর বেশি সময় লাগবে না।"
অ্যারিসের প্রস্তাবে সবাই একবাক্যে রাজি হলো। ছয়জন মিলে মিমির সেই 'সুদর্শন পুরুষ' খোঁজার নেশা চিরতরে ছাড়ানোর এক মাস্টার প্ল্যান ফেঁদে ফেলল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হলো। ইভানকে দায়িত্ব দেওয়া হলো মিমির কাছে একটা উড়ো খবর পৌঁছে দেওয়ার। ইভান মিমির সামনে দিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল, "হ্যাঁ রে, আমাদের ওই খালাতো ভাই 'রাজ' তো একটু পর পার্কে আসবে। ছেলেটা যেমন লম্বা, তেমনি ফর্সা আর কোটিপতি।"
মিমি আড়াল থেকে সব শুনে উত্তেজনায় নাচতে শুরু করল। তার মনে হলো, এটাই সেই 'সুদর্শন পুরুষ' যার জন্য সে এতদিন অপেক্ষা করছিল। তাড়াতাড়ি গিয়ে তার সবচেয়ে দামী মেকআপ আর জমকালো শাড়ি পরে পার্কে গিয়ে বসল। ঠিক তখনই দূর থেকে একজনকে দেখা গেল, লম্বা চওড়া শরীর, হুডি পরা, মুখে মাস্ক আর চোখে কালো চশমা। ইভানের কথামতো এটাই সেই 'রাজ' । মিমি এগিয়ে গিয়ে খুব ন্যাকামি করে বলল, "এক্সকিউজ মি, আপনি কি রাজ? আমি মিমি।"
রাজ কোনো কথা না বলে কেবল মাথা নাড়ল। মিমি ভাবল ছেলেটা গম্ভীর, সে পটাতে শুরু করল, "আপনার ব্যক্তিত্ব খুব সুন্দর। আমার রং ও কিন্তু আপনার মতোই ফর্সা। আমরা কি একটু হাঁটতে পারি?"
ঠিক সেই মুহূর্তে অ্যারিস আর ইনায়া পুলিশ ড্রেস পরা (আসলে কস্টিউম) কয়েকজনকে নিয়ে সেখানে হাজির হলো। আদিয়ান আর ইভান ও সাথে ছিল। পুলিশ গম্ভীর গলায় বলল, "এই যে মিস্টার রাজ! আপনি তো সেই কুখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল চোর, যে কিনা সুন্দরী আর ফর্সা মেয়েদের পটিয়ে তাদের কিডন্যাপ করে বিদেশে পাচার করে দেয়। আপনার সাথে এই মেয়েটি কে? এও কি আপনার গ্যাংয়ের সদস্য?"
মিমি তো পুলিশের কথা শুনেই পাথরের মতো জমে গেল। রাজ চট করে মিমির হাত ধরে চিৎকার করে বলল, "স্যার! এই মেয়েটিই তো আমার বস! ওই আমাকে বলেছে ফর্সা মেয়েদের কিডন্যাপ করতে।"
মিমি চিৎকার করে উঠল, "না! আমি কিছু জানি না। আমি তো একে চিনিই না! আমি শুধু এর সাথে লাইন মারতে এসেছিলাম।"
সুবা আর সায়মা পাশ থেকে সাধারণ মানুষের ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল। সুবা চিল্লে বলল, "আরে! এই মেয়েটাকে তো কিছুক্ষণ আগে আমাদের বাড়িতেও দেখেছি। এ তো বড় ঘরের ছেলেদের পটাতে ওস্তাদ! এর ব্যাগ চেক করুন, নির্ঘাত মাদক দেওয়া আছে।"
ইভান ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট (আসলে আটা মেশানো প্যাকেট) বের করে বলল, "স্যার! দেখুন, এ তো পাচারকারীর সাথে সাথে ড্রাগ ডিলারও!"
মিমি যখন সাজগোজ করতে ব্যস্ত ছিল, ইনায়া তখন চুপচাপ ব্যাগে রেখেছিল সেই প্যাকেটটা।
মিমি এবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে শুরু করল, "বাঁচাও! আমি আর কোনো ছেলের দিকে তাকাব না, আমাকে জেলখানায় নিও না।"
মিমি দেখলো তাকে কেউ দেখছে না সেই সুযোগে কোনো কথা না বলে, জুতো হাতে নিয়ে সেখান থেকে এক দৌড় দিল, এবার আর সে পেছনে ফিরে তাকাল না। ইভান হাসতে হাসতে বলল, "ভাবী, আমার মনে হয় মিমি এখন থেকে ছেলেদের দেখলে উল্টো দিকে দৌড় দেবে।"
আদিয়ান আর ইভান হাই ফাইভ করল একে অপরের সাথে।
"যাক, অন্তত একটা আপদ বিদায় হলো। এবার চলো, শান্তি মতো বাড়ি গিয়ে আইরার সাথে সময় কাটাই।"
সবাই হাসিমুখে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

বাসায় যাওয়ার পর আফরিন সুলতানা চিন্তিত মুখ করে বলে, "মিমির নাকি শরীর খারাপ তাই বাসায় চলে গেছে, মাত্র ফোন করে বললো!"
ইনায়া ও চিন্তিত মুখ করে বললো, "হ্যাঁ আম্মু, আমরা মাত্র গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসলাম!"
আফরিন সুলতানা ভ্রু কুঁচকে বলে, " একজন কে দিতে ছয়জন? কাহিনী কি?

উপর থেকে আইরার কান্না শুনে ইনায়া আর অ্যারিস পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আদিয়ান আমতা আমতা করে বলে, আমার ক্ষুধা লেগেছে বলে পিছন ঘুরে দুই পা দিয়ে আবার এসে সুবা কে টেনে নিয়ে যায়..
আফরিন সুলতানা ইভানের দিকে তাকায় | ইভান কাউকে ফোন দিয়ে বলে, "আমি আসছি!"
দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার এসে সায়মার হাত ধরে বলে, "আম্মু বললো সায়মাকে নিয়ে যেতে " — বলেই দুইজন বের হয়ে যায়।
আফরিন সুলতানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "এতদিন পর মেয়েটা এলো, আবার চলে গেলো।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 24 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন