ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি

পর্ব 39

লেখক: F. Tabassum

পুরো গানটা শেষ হওয়া পর্যন্ত অ্যারিস পাথরের মতো বসে রইল। তারপর হঠাৎ কী ভেবে সে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকল।
এক ঘণ্টা পর সে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। আয়নায় এক অন্য অ্যারিসকে দেখা গেল। অবিন্যস্ত লম্বা চুলগুলো কেটে সে আগের মতো ছোট করে নিয়েছে। গালে তিল তিল করে জমতে থাকা দাড়ি এখন ক্লিন শেভড। ইনায়ার পছন্দের সেই নীল জামা ছেড়ে সে আজ পরিপাটি পোশাক পরল। ছোট্ট আইরাকেও একটা সুন্দর লাল ফ্রক পরিয়ে দিল। ইনায়া ফিরে এসে নিশ্চয়ই তাকে এত বাজে অবস্থায় দেখতে চাইবে না। সে তার হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ড হয়ে থাকতে চায় !
যখন বাচ্চাকে কোলে নিয়ে একসাথে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল, বাড়ির সবাই অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
আইরাকে সুবার কোলে দিয়ে অ্যারিস ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে আফরিন সুলতানার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তার কণ্ঠে আজ কোনো চিৎকার নেই, আছে এক গভীর অপরাধবোধ।

"মা, আমাকে ক্ষমা করে দিন। সেদিন আমার ভুলের জন্যই সব হয়েছে। আমি যদি জোর নিয়ে বাইরে না যেতাম, তবে আজ ইনায়া আমাদের মাঝেই থাকত। আমার ভুল হয়েছিলো! আমি আর কোনোদিনও আমার জন্মদিন পালন করবো না।
আমি কত চেষ্টা করেছি চোখ দুটো খুলে রাখতে, কিন্তু আমার শরীরটা সেদিন আমার সাথে বেইমানি করেছিল, আমি পারিনি ঐ মুহূর্তে ইনায়াকে বাঁচাতে... আমি যদি সেদিন জেগে থাকতাম তাহলে ইনায়া ও থাকতো !
কিন্তু মা, ইনায়া ফিরে আসবে, আমার মন বলছে ওকে ফিরে আসতেই হবে।"
আফরিন সুলতানা কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, —"তোমার কোনো দোষ নেই বাবা, সব ভাগ্য........... ।"
—"যে ভাগ্যে ইনায়া নেই, সেই ভাগ্য আমি মানি না।" অ্যারিসের কণ্ঠে এক তীব্র জেদ।
আচমকা সে পাশের টেবিলে ফলের ঝুড়ি থেকে ধারালো ছুরিটা তুলে নিজের গলায় ধরল। সবাই চিৎকার করে তাকে এই সব বারণ করল। ঠিক তখনই আইরা চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
সেই কান্নায় অ্যারিসের হাতটা নামতেই থমকে গেল। ছুরির শীতল স্পর্শে সে যে বাস্তবে ফিরে এলো। সে কী করতে যাচ্ছিল? ইনায়া যদি ফিরে এসে আইরার এই কান্না দেখে, তবে ইনায়াকে কী জবাব দেবে? সে যে ইনায়ার আমানত।
অ্যারিস ছুরিটা ফেলে দিয়ে পাগলের মতো আইরাকে বুকের সাথে চেপে ধরল। সে বুঝল, মরলে চলবে না। ইনায়াকে খুঁজে বের করার জন্য তাকে বেঁচে থাকতে হবে। ইনায়া যেখানেই থাকুক, অ্যারিস তাকে ফিরিয়েই আনবে।

কয়েকদিন পর.....
আকাশের বুক চিরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে। বর্ষাকালের সেই চেনা সতেজ ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করছে। জানালার বাইরে কদম আর জুঁই ফুলের স্নিগ্ধ আভা আর ঝমঝম শব্দের তালে তালে পুরো শহরটা যেন এক অন্য রূপ ধারণ করেছে। রাস্তায় জল থৈ থৈ, মানুষ ছাতা মাথায় দিয়ে অফিস-আদালতে ছুটছে, কিন্তু এই বৃষ্টির অন্তরে লুকিয়ে থাকা বিষাদটুকু কেবল অ্যারিসই অনুভব করতে পারে।
ইনায়ার খুব পছন্দের সেই ছাদ— যার অর্ধেকটা ঢাকা আর অর্ধেকটা খোলা, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন সেখানে বসে ইনায়ার স্মৃতিগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তুলছে। অ্যারিস ঢাকা অংশে একটা আরামকেদারায় বসে আছে, কোলে তার ছোট আইরা। বাইরে বৃষ্টির ছাঁট এসে অ্যারিসের গায়ে লাগছে, কিন্তু তার দৃষ্টি সুদূর পানে নিবন্ধ।
সে নিচু গলায় আইরাকে বলতে শুরু করল, "জানো মা, তোমার মাম্মা ঠিক এই বৃষ্টির জন্য পাগল ছিল। প্রতি বছর ভিজত, তারপর জ্বরে কপাল আগুন হয়ে থাকতো, গাল গুলো লাল হয়ে যেত, কিন্তু তার বৃষ্টিতে ভিজা চাই-ই চাই। শুধু আগের বছর তোমার জন্য সে ভেজেনি। দেখেছ মা, তোমার মাম্মা তোমাকে কতটা ভালোবাসে? নিজের শখ বিসর্জন দিয়ে তোমাকে আগলে রেখেছিল সে।"
অ্যারিস পকেট থেকে ফোন বের করে ইনায়ার হাসিমুখের ছবি দেখাল আইরাকে। "দেখো মা, তোমার মাম্মা কত কিউট। তুমিও একদম ওর মতো হয়েছ।"
আইরা ফোনের স্ক্রিনে ইনায়ার ছবি দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল, যেন সে তার মাকে দেখতে পেয়েছে। অ্যারিস আবেগভরে মেয়ের গালে একটা চুমু খেল।
"তোমার মাম্মা বলত, বৃষ্টির দিনে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি খাওয়ার মজাই আলাদা। চলো মা, আজ আমরা খিচুড়ি রান্না করি।"
যেই ভাবা, সেই কাজ। আইরাকে নিয়ে অ্যারিস সোজা রান্নাঘরে চলে গেল। 'আলো' কে সরিয়ে দিয়ে সে নিজেই চাল-ডাল ধুয়ে চুলায় হাঁড়ি চড়াল। আইরাকে একটা নিরাপদ জায়গায় বসিয়ে রেখে সে রান্নাটা শেষ করল। খিচুড়ির ঘ্রাণ যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, অ্যারিসের মনে হলো এই তো একটু পরেই ইনায়া পেছন থেকে এসে বলবে— "উম্ম দারুণ গন্ধ বেরিয়েছে তো!"

রান্না শেষে অ্যারিস সবাইকে ডাইনিং টেবিলে ডাকল। অ্যারিসের এই রূপান্তরের সাথে বাড়ির সবাই এখন অভ্যস্ত। একসময় এই টেবিলে ইনায়ার হাসাহাসি আর খুনসুটিতে কান পাতা দায় হতো, আজ সেখানে শ্মশানের নীরবতা। একে একে সবাই এসে নিঃশব্দে খেতে বসল। কেউ কোনো কথা বলছে না, কেবল চামচের টুংটাং শব্দ হচ্ছে। অ্যারিসের এই অদ্ভুত অথচ করুণ চেষ্টা দেখে সবার গলা বুজে আসছিল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 39 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন