অ্যারিস ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে ঠিক ইনায়াদের বাড়ির সামনে এসে ব্রেক করল। অ্যারিস নীলার হাতের বাঁধনটা খুলল না। গাড়ির দরজা খুলে অ্যারিস আবার নীলাকে কাঁধে তুলে নিল। নীলা খুব একটা বাধা দিল না, শুধু নিচু স্বরে বলল, "আরে, আবার কাঁধে কেন? আমি হাঁটতে পারি তো।" কিন্তু অ্যারিস শুনলে তো! সে গম্ভীর মুখে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ড্রয়িংরুমে তখন এক বিষণ্ণ পরিবেশ। সবাই মিলে অসুস্থ আফরিন সুলতানাকে আগলে বসে ছিল। অ্যারিসকে কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। নীলার মুখটা অ্যারিসের কাঁধে উল্টো হয়ে থাকায় বাড়ির কেউ আর চেহারা দেখতে পেল না। সবাই ভাবল, অ্যারিস হয়তো অন্য কোনো মেয়েকে এভাবে তুলে নিয়ে এসেছে।
রান্নাঘর থেকে শামীমা বেগম রাগে গরগর করতে করতে বেরিয়ে এলেন, তাঁর হাতে একটি ধারালো ছুরি। তিনি চিৎকার করে বললেন, "আজ তোর একদিন কি আমার একদিন । ইনায়ার শোক সইতে পারছি না, আর তুই কিনা অন্য মেয়েকে বুকে তুলে নিয়ে আসছিস ঘরে? আজ তোকে আমি মেরেই ফেলব।" — শামীমা বেগম ছুরি উঁচিয়ে ইনায়ার রুমের দিকে দৌড়ালেন, আর তাকে থামাতে বাকি সবাই পেছনে ছুটল।
অ্যারিস রুমে ঢুকে নীলাকে বিছানায় বসিয়ে দিল, নীলার হাত দুটো তখনও টাই দিয়ে বাঁধা, চুলগুলো কিছুটা অবিন্যস্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে শামীমা বেগম ঝড়ের মতো রুমে ঢুকলেন। কিন্তু বিছানায় বসা মেয়েটির দিকে তাকাতেই তাঁর হাতের ছুরিটা মেঝেতে পড়ে গেল ঝনঝন শব্দ করে। শামীমা বেগমের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু বললেন "ই...ইনায়া?"
পরক্ষণেই আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মাথা ঘুরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। পেছনে থাকা বাকি সবাই করিডোর দিয়ে রুমের সামনে এসে জমা হয়েছিল। শামীমা বেগমকে এভাবে পড়ে যেতে দেখে তারা আঁতকে উঠে রুমে ঢুকল। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই তাদের সবার অবস্থা হলো পাথরের মূর্তির মতো। সামনে ইনায়া বসে আছে, হুবহু তাদের ইনায়া!
ইভান অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল, "ভাবি?"
নীলা অবাক হয়ে সবার চোখের দিকে তাকাচ্ছিল। মনে মনে বলে, বাপরে! এ তো দেখছি পুরো সিরিয়ালের মতো সিন। ছুরি নিয়ে অ্যাটাক করতে এসে জ্ঞান হারালো? আর বাকি সবাই আমাকে এভাবে দেখছে কেন? মনে হচ্ছে আমি অমূল্য রতন , সবাই মিলে দেখছে !
অ্যারিস তখন মেঝেতে বসা মায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে সবাইকে চিৎকার করে বলল, "আম্মুকে দেখ, ইভান, ডাক্তারকে ফোন কর দ্রুত।"
আদিয়ান দ্রুত শামীমা বেগমকে পাঁজাকোলা করে তুলে পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল। ডক্টর এসে ড. মাইদুল দ্রুত চেক এলেন। তিনি শামীমা বেগমকে পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বললেন, "ভয়ের কিছু নেই, অতিরিক্ত শক পাওয়ার কারণে উনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে একদম ঠিক হয়ে যাবেন।"
পুরো রুম জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সবাই নীলার দিকে তাকিয়ে আছে। নীলা ক্লান্ত হয়ে একটা চেয়ারে বসে লাইভ রোমাঞ্চ দেখছে। ততক্ষণে হাতের বাঁধন খুলে ফেলেছে নীলা। অ্যারিস এক মুহূর্তের জন্যও নীলার হাত ছাড়ে নি, ডাক্তারের কথা শুনছে, আর নীলার হাতটা টাইট করে ধরে আছে।
ড. মাইদুল বিদায় নিতেই আফরিন সুলতানা টলমল পায়ে এগিয়ে গিয়ে নীলাকে জড়িয়ে ধরলেন, কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বললেন, "মা, তুই এতদিন কোথায় ছিলি? তোকে কোথায় কোথায় খুঁজেছি জানিস?"
আচমকা এক অপরিচিত মহিলার এমন আলিঙ্গনে নীলা বিরক্তিতে কুঁচকে উঠল। অ্যারিস এক হাত ধরে থাকায় সে অন্য হাত দিয়ে আফরিন সুলতানাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "আরে কী আপদ! কে আপনি? এভাবে হুটহাট এসে জড়িয়ে ধরছেন কেন? আজব তো সব লোকজন! সরুন সামনে থেকে"— আফরিন সুলতানা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ধাক্কা খেয়ে তিনি যেন শারীরিক আঘাতের চেয়েও বেশি মানসিক আঘাত পেলেন।
অ্যারিস দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলল, "চিনবে কী করে? ম্যাডামের তো নাকি 'হাজব্যান্ড' আছে।"
কথাটা শোনামাত্র আদিয়ান প্রায় চিৎকার করে উঠল, "হোয়াট! কী বললি অ্যারিস? হাজব্যান্ড মানে?"
অ্যারিস এবার নীলার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটু ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলল, "হ্যাঁ ভাইয়া, ঠিক শুনেছেন। ওনাকে খুঁজে না পেলে নাকি ওনার হাজব্যান্ড পাগল হয়ে যাবে! কী গভীর ভালোবাসা, তাই না?"