ফন্ট সাইজ:
থিম:
আসবো ফিরে আবারো

১৫তম পর্ব

লেখক: সুরভী আক্তার

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_১৫ [ প্রথমাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

কোমরে চিলতে পরিমাণ ব্যথা পেয়ে মৃদু কুকিয়ে ওঠে মেঘা । এক হাত কোমরের ডান দিকে চেপে ধরে । চোখ খিচে রাখে এক মুহুর্ত । খট করে দরজা লাগানোর শব্দ পেতেই তড়িতে চোখ মেলে পরক্ষনে । রৌদ্র দরজা লাগিয়ে দিয়েছে । শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে কঠোর ভঙ্গিতে মেঘার দিকে এগোলো সে । মেঘা ভাবসাবে পরিবর্তন না দেখিয়ে ব্যাথা প্রকাশ করে খ্যাট খ্যাটে স্বরে ঝেড়ে উঠলো....

" ইউ রাইনো , পাগল হয়ে গেছেন আপনি ? এভাবে ছুড়ে মারলেন কেনো আমায় । ব্যাথা পাইনি আমি ?

" ইউ ইডিয়ট , নাটক করবি না একদম । যেখানে ফেলেছি , সেখানে ব্যাথা পাওয়ার হলে তোকে ফেলতাম না আমি ।‌

মেঘা থতমত খায় । বিছানার দিকে তাকায় । কোমল তুলতুলে নরম গদি । মেঘার ছিপছিপে শরীরের ভারে বসে দেবে গেছে তুলোর ন্যায় । মেঘা ব্যাথা পায় নি একটুও । বরং পড়ার সাথে সাথে বাউন্স করেছে তুলোর মতো মোলায়েম বিছানায় । সাদা ধবধবে একখানা বেডশিট । মেঘা মুহুর্ত পর দৃষ্টি সরিয়ে রাগ বজায় রেখে বললো....

" আমাকে এখানে এনেছেন কেনো আপনি ? কোন সাহসে ? বেশরম , অসভ্য লোক । লাজ লজ্জা নেই একটুও ? অতগুলো লোকের সামনে কোন স্পর্ধায় অসভ্যের মতো আমাকে ছুঁয়েছেন আপনি ?

রৌদ্র তেড়ে যায় । আঙ্গুল তুলে শাশ্বিয়ে বলে....

" তোকে ছোঁয়ার জন্য স্পর্ধা নয় , অধিকারের প্রয়োজন । যেটা আমার দিব্যি আছে । এভারমোর হিম্মত নিয়ে চলে রুডভিক কাবির রৌদ্র । অধিকারের পাশাপাশি হিম্মত দেখিয়ে তোকে ছুঁয়েছি আমি ।

মেঘাও রাগ দেখিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো বিপরীতে....

" আমাকে ছোঁয়ার কিসের অধিকার আপনার ?

" অধিকার ফলিয়ে দেখাবো কিসের অধিকার ? কি ? দেখাই ?

মেঘা মুখ বিকৃত করে নেয় । চোখ সরিয়ে দ্রুত নামে বিছানা থেকে । অমনি ভাঁজ খুলে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে শাড়ির আঁচল সহ এলোমেলো সব কুঁচি । চমকায় একবিংশীর হৃদয় । নিজের বেগতিক অবস্থা দেখে মুখ ফাঁক করে দ্রুত তাকায় রৌদ্রের দিকে ‌। সহসা ওষ্ঠ পিষে ফিচেল হাসে রৌদ্র । ওষ্ঠপূটে দাঁত চেপে ঘাড় ডলে হাসি ঠেলে মুখ ফিরিয়ে নেয় ডান দিকে । তড়িঘড়ি করে কুঁচি গুলো দুহাতে উদরের সাথে চেপে ধরলো মেঘা । কোনো রকমে কাপড় সামলে চটপট করে এগোলো দরজার দিকে । উপরের ছিটকিনি লাগানো । মেঘা না শাড়ি সামলাতে পারছে , আর না হাত উপরে তুলে ছিটকিনি খুলতে পারছে । উচ্চতাও কম তার । অদূরে হাত পৌঁছালেও ছিটকিনি খুলতে কসরত হবে বড্ড । এই অবস্থায় তো আরো পারবে না । পিছু ফিরে ঝাঁজ দেখিয়ে বললো তাই....

" বেয়াদব লোক , দরজা খুলে দিন । বেরোবো আমি ।

" খুলতে পারলে বেরোও ।

মেঘা পা উঁচিয়ে এক হাতে খোলার চেষ্টা করলো । পারলো না । ফের ঘাড় ঘুরিয়ে একই স্বরে বলল....

" খুলে দিন দরজা । অসভ্যের মতো সবার সামনে তুলে এনেছেন আমায় । সবাই কি ভাবছে কোনো আইডিয়া আছে আপনার ? ইরিটেটিং ম্যান....

রৌদ্র চোয়াল খিচে নেয় । দ্রুত এগিয়ে মেঘা কে টান মেরে ফের বিছানায় এনে ফেলে । রেগে বলে....

" রুম থেকে এক পা বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করলে পা একেবারে কেটে দেবো তোর । চাইছি না এই ইভেন্টে খারাপ কিছু হোক । নয়তো এতক্ষণে তোর ঐ বেয়াদবির শাস্তি মেপে মেপে বুঝিয়ে দিতাম তোকে । ইডিয়ট...

বলেই পিছু ফিরলো । খট করে দরজা খুলে বেরোলো বাইরে । মেঘা উঠে যাওয়ার আগেই মুখের উপর বাইরে থেকে ঠাস করে লাগিয়ে দিলো দরজা টা । চাবি ঘুরিয়ে লক করে দিলো একেবারে ।

ধুপধাপ করে দরজায় আঘাত করলো মেঘা । চেঁচালো গলা চিরে....

" রাইনো মুখো । দরজা খুলে দিন । বেরোবো আমি । অসভ্য, নির্লজ্জ, ইরিটেটিং, ডিজকাস্টিং, সেন্সলেস ম্যান...

সাউন্ড প্রুফ রুম রৌদ্রের । মেঘার একটা কথার সাউন্ড ও বেরোলো না বাইরে । বেরোলে গুনে গুনে পাঁচটা থাপ্পর খেতো এতক্ষণে ‌। রৌদ্র ডোর লক করে গটগটিয়ে নিচে নেমে গেছে । বাইরে বেরিয়ে কোনোদিকে তাকায় নি আর । গার্ডেন পেরিয়ে সোজা এগিয়েছে গেইটের দিকে । সিরাতের নজর এড়ায়নি সে । রৌদ্র কে না আটকে ভিড়ের মধ্য থেকে আদ্র কে টেনে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো সিরাত ‌। রৌদ্রের বেরিয়ে যাওয়ার খবর আদ্রকে জানিয়ে সোজা উপরে উঠলো মেঘার খোঁজে । নিজের রুমে নেই মেঘা । সিরাত ভ্রু নাচাতেই আদ্র ইশারায় বোঝালো প্রশ্ন সূচকে...

" রুডির রুমে ?

চোখ গোল করে দুজনে এগোলো ওদিকে । দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থমকালো । খোলার চেষ্টা করতেই বুঝলো ডোর লক করা । ফিসফিস করলো সিরাত.....

" মেঘা কি রুমে ?

" হবে হয়তো !

" রৌদ্র বেরিয়ে গেলো কেনো তাহলে ?

বোকা স্বরে আদ্র ঘাড় উঁচিয়ে বললো শ্বাস ফেলে....

" আপু । বোকার মতো কথা বলো না । আই থিংক মেঘকে রুমে আটকে বেরিয়ে গেছে । রুডি জ্বেলাস আপু....

সিরাত ঠোঁট চওড়া করলো ।

" জানি তো । তাইতো জ্বেলাসি বাড়াচ্ছি ওর ।

" বাট ওর রুম সাউন্ড প্রুফ । মেঘ ডাকলে আমরা শুনতেও পারবো না । রুমের চাবিও নেই কারোর কাছে । রুডি কখন আসবে না আসবে কে জানে ? মেঘ কতক্ষন থাকবে এই রুমে....

" যতক্ষণ না রৌদ্র আসে ততক্ষণ । তুই অতো ভাবছিস কেনো ? তুই না রৌদ্রের তেইশ সেকেন্ডের বড় ভাই । চল এখান থেকে...

আদ্র চোখ সরু করে বললো....

" আপু । তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছো , তুমি আমাদের দুজনেরই বড় ।

" সো হোয়াট ? আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেমেছি । বড় হওয়ার দরুন এটা আমার কর্তব্য । তবে ভিন্ন পথে আমি আমার কর্তব্য পালন করছি । রৌদ্র কে হাড়ে হাড়ে চিনি আমি । সোজা আঙ্গুলে ওকে কখনো সঠিক পথে আনতে পারবি না । তাই আঙ্গুল বাঁকিয়েই আনতে হবে ।

ওদের সম্পর্কটা ঠিক হওয়া প্রয়োজন আদ্র । অন্তত মেঘা আর রৌদ্র দুজনকে দুপথে যাওয়া থেকে আটকানোর জন্য হলেও ওদের সম্পর্ক টা ঠিক হওয়া প্রয়োজন । এতো বছরে মেঘা অনেকটা জড়িয়ে গেছে এ বাড়ির সাথে । হঠাৎ করে চলে গেলে কেউ মানতে পারবে না । আর না আবার রৌদ্র চলে গেলে কেউ সহ্য করতে পারবে । ওদের দুজনকেই একে অপরের সাথে জড়িয়ে তবেই আটকাতে হবে । রৌদ্র কে এপ্রিসিয়েট করাতে হবে । মেঘার প্রতি ঝোঁক বাড়াতে হবে । ইউ নো , ও কতটা পসেসিভ ? ওর জিনিসের উপর ও কারোর হস্তক্ষেপ সহ্য করে না । মেঘার সাথে আরো একটু জুড়তে দে ওকে , তার পর দেখবি রৌদ্র কি জিনিস !

" আই নো আপু । আমাকে বোঝাতে হবে না ।

বাট এখন মেঘা কে নিয়ে ভাবো । রৌদ্র ফিরতে লেট করে অনেক । ওর রুমের চাবি নেই কারোর কাছে ।

" ডোন্ট ওয়ারি । মেঘা থাকুক । বাড়িতে সামলে নেবো আমিই ‌। রৌদ্র আজ তাড়াতাড়ি ফিরবে , আই এম ড্যাম শিওর । চল এখন....

মেঘা মনি তার হাসবেন্ডের রুমে প্রথম বার পদার্পণ করেছে আজ । ওকে ঘরটা একটু বুঝে নিতে দে । দেখে নিতে দে নিজের ফিউচার ।

মেঘা গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে ক্লান্ত । শুকিয়ে এসেছে গলা । তবুও এক পশলা আওয়াজ দরজা চিরে বাইরে বেরোয় নি । ক্লান্ত হয়ে টেবিলের উপর থেকে ওয়াটার পট নিয়ে অর্ধ বোতল খালি করলো সে । এতক্ষণে এদিক ওদিকে চোখ বোলালো । পুরো দমে এসি চলছে । বাইরের গরমে ঘেমেছিলো শরীর । এখন ঠান্ডায় শিউরে উঠছে । বেরঙিন সব আসবাব এ ঘরে । সব একেবারে পরিপাটি । বেপরোয়া ছেলের গোছালো ঘর । রৌদ্র এলোমেলো করে রাখলেও রুবিনা কাবির গুছিয়ে রাখেন সবসময় । আজ প্রথম এ ঘরে আগমন মেঘার । এর আগে উঁকিও দেয় নি কভু । পুরো ঘরে চোখ বোলালো সে । রাগে গজগজ করে শাড়ি খামচে বিড়বিড় করলো....

" আই হেইট ইউ রাইনো মুখো । আই হেইট ইউ ,, আমি ছাড়বো না আপনাকে...

★

রাত্রি বারোটার কাছাকাছি । হলুদের সব ঝুট ঝামেলা শেষ হতে হতেই দশটা পেরিয়েছে । মোটামুটি অবিসন্ন সকলে । টুকটাক ডিনার সেরে অতিথিরা ঘরে উঠেছেন । রুবিনা কাবির, শাহিনা কাবির এর মধ্যেই হাজার বার মেঘার খোঁজ করেছেন । সিরাত এটা ওটা বলে থামিয়ে রেখেছে । ঘরে আছে বলতে গিয়ে ধরা খেয়েছে একবার । শাফাহ্ না বুঝে বিরুদ্ধচারন করে বোকার মতো বলে ফেলেছে মেঘা ঘরে নেই । সেই তখন থেকেই দেখা নেই মেঘার ।

তোফায়েল কাবিরের কানে এসব যায় নি এখনো । খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে যে যার ঘরে । মেঘা খায় নি সেই দুপুর থেকে । ওর চিন্তা হলেও ওর কাছে যাওয়ার উপায় নেই । খিদেয় পেট চুইচুই মেঘার । হাজার বার ডাকার পরও বাইরে থেকে কোনোরূপ সাঁড়া শব্দ না পেয়ে অসহায় হয়ে পেট চেপে বিছানায় পড়ে আছে মেয়েটা । এগারোটা হতে হতে ঘুমানোর অভ্যাস । আজও ব্যাতিক্রম হয় নি । শত বিরক্তি নিয়েও চোখ লেগে আসছিলো । বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই পুরোপুরি নিভে এসেছে দু'চোখ । ঘড়ির কাঁটা বারোটার দোর গোড়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছে মেয়েটা ।

রৌদ্র বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে বারোটা বেজেছে । ততক্ষণে ড্রইং রুম পুরো ফাঁকা । রুবিনা কাবির ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন আজ ‌। সব ঝামেলা চুকিয়ে কিচেনে টুকটাক কাজ করছিলেন একা একা । ছেলে আসা মাত্রই বিদ্যুতের গতিতে বেরিয়ে আসলেন তিনি । চঞ্চলা হয়ে বললেন রোজকার সেই এক কথা....

" রৌদ্র , খেতে দেবো তোকে ? খাবি না ?

তার বেপরোয়া ছেলেরও সেই একই জবাব গম্ভীর গলায়....

" খিদে নেই । খাবো না ।

সিঁড়ি উঠতে গিয়ে একটু থামে রৌদ্র । কিছু একটা ভেবে নিচে নেমে বলে....

" ডিনার সাজিয়ে দাও । রুমে গিয়ে খাবো ।

" তুই যা , আমি নিয়ে আসছি ।

" তোমাকে যেতে হবে না । আমাকে দাও....

রুবিনা কাবির অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন । তার ছেলে রাতে খাবে এই অনেক । বেশি কথা না বাড়িয়ে একটা ট্রেতে খাবার সাজিয়ে দিলেন তিনি ।

রৌদ্র উপরে উঠলো । দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে হাঁফ টেনে চাবি ঘুরিয়ে খুললো দরজাটা । এতক্ষণ ধরে ঐ মেয়েটাকে আটকে রেখেছে । না জানি কি করছে !

ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার । কপাল কুঁচকালো রৌদ্র । লাইট অন করলো প্রথমে ।

মুখোমুখি বিছানার উপর খুব আরাম ঘরে একবিংশী রমনী কে ঘুমোতে দেখে মুহুর্তেই শিথিল হলো কুঁচকানো কপাল ।

চাদর মুড়িয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছে মেঘা । রৌদ্র থমকালো । থমকানো দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দরজা আটকে দিলো । হাতের খাবারের ট্রে টা রাখলো টেবিলের উপর । ফের তাকালো । মেয়েটার মুখ খুব একটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না । শরীর ঢেকে আছে চাদরে , আর মুখশ্রী ঢেকে আছে কেশের আড়ালে । রৌদ্র এগোলো ধীর পায়ে । মুখ সম্মুখে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসলো । সেভাবেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে আলতো করে সরিয়ে দিলো গুচ্ছ কয়েক কেশরাশী । মেয়েটা নড়ে ওঠে একটু । আপনা আপনি মৃদু হাসে রৌদ্র । মেঘা কে গুটিয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকায় পরক্ষণে । বিড়বিড় করে....

" ইডিয়ট ।

উঠে দাঁড়িয়ে রিমোট হাতে তুলে এসির পাওয়ার কমিয়ে দেয় । কাবাড খুলে টাওয়েল নিয়ে দৃঢ় পায়ে এগোয় ওয়াশ রুমের দিকে ।

বেরোয় ঠিক ত্রিশ মিনিটের মাথায় । ভেজা শরীরে ধুসর একখানা টিশার্ট জড়ায় । গলায় টাওয়েল ঝুলিয়ে আধো আধো করে মুছে নেয় চুলগুলো । আসতে লেইট হয়ে গেছে একটু । ঐ মেয়ে তো না খেয়েই ঘুমিয়ে গেছে । এখন এই ঘুম গভীর থেকে জাগাবে কি করে ওকে ? ঘুম গভীরে তলিয়েছে । রৌদ্র জাগানোর চিন্তাও করলো না । ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই দেখতে পেলো সময় একটা বেজে বিশ মিনিট । রাত হয়েছে অনেক ।

ঘুরে এসে খাটের পাশে দাঁড়ালো সে । চাদর সরিয়ে ঘুমন্ত রমনীকে অতি আলগোছে কোলে নিলো । ঘুমের ঘোরে শূন্যে ভাসতেই আপনা আপনি রৌদ্রের গলা জড়িয়ে ধরলো মেঘা । নিমিত্তে মাথাটা এলিয়ে গলার নিকট রাখলো । ঘর ছাড়ার আগে কিছুক্ষণ ওকে এভাবে নিজের মাঝে অনুভব করলো রৌদ্র । মিষ্টি একটা আধো পরিচিত ঘ্রাণ পেতেই চোখ বুজে শ্বাস টানলো । সেই একটা অল্প পরিচিত ঘ্রাণ । রৌদ্র খানিক মাথা নামিয়ে মেঘার সিঁথি বরাবর ঝুঁকে আসে । চুলের কাছে নাক ডুবিয়ে লম্বা শ্বাস টানে । এভাবে পরপর কয়েকটা । অতঃপর চোখ খুলে নেয় । মৃদু ঠোঁট ফাঁক করে উচ্চারণ করে মেয়েটাকে জড়ানোর গভীরতা বাড়িয়ে....

" মাই সানি....

পরমুহূর্তে দ্রুত পায়ে নিজ ঘর হতে বেরিয়ে আসে মেঘাকে সেভাবে আগলে নিয়েই ।

★

আজ বিয়ে ।

বাজে সবে সকাল আটটা । নিচ হতে মৃদু কোলাহল কানে পৌঁছাতেই ঘুম হালকা হয় মেঘার । চোখ বুজেই কপাল কুঁচকে নড়েচড়ে ওঠে । পাশ ফিরে ঘুমে তলিয়ে যেতে চায় আবার । তবে বিরক্তি লাগে , ঘুমের মাঝে প্রচন্ড খিদে অনুভব করে সে । ডিস্টার্ব পেয়ে গা মুড়িয়ে উঠে বসে মেঘা । চোখ ডলে বিরক্তি নিয়ে উচ্চারণ করে ঘুম কাতর স্বরে...

" ডিজাগাস্টিং.....

নিভু চোখ মেলতেই নজরে আসে আশপাশ । এক মুহুর্ত পর ছ্যাঁত করে ওঠে । ভড়কে এদিক ওদিক তাকায় । এটা তো ওদের ঘর । ও এখানে এলো কি করে ?

কাল তো , ও সেই লোকটার ঘরে ছিলো ! এখন এখানে কি করে এলো ?

ছলকে এপাশ ওপাশ চাওয়া করে মেঘা । চোখ ডলে আবার তাকায় সন্দিহান হয়ে । নিজের দিকে তাকায়‌, এখনো সেই শাড়ি পড়নে । কাল যেভাবে ছিলো সেভাবেই । পাশে তাকাতেই ঘুমন্ত শাফাহ্ কে নজরে পড়লো এবার । মেঘা হুড়মুড়িয়ে ওকে ঝাঁকিয়ে ডাকলো সবটা পরিষ্কার ভাবে বোঝার জন্য....

" টুকটুকি , এই , ওঠ না । এই কুম্ভকর্ন ওঠ । আমি এ ঘরে কি করে এলাম ?

ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে জবাব দেয় শাফাহ্.....

" উফফফ মেঘা , প্লিজ ডিস্টার্ব করিস না । ঘুমোতে দে একটু । ভীষণ ঘুম পাচ্ছে...

" আমি এ ঘরে কি করে এলাম , সেটা তো বল আগে ।

" জানি না ।

মেঘা ধড়ফড়িয়ে বিছানা ছাড়ে । মিররের সামনে দাঁড়ায় । মুখে হাত বুলিয়ে নিজেকে দেখে , সব ঠিকঠাক আছে । কিন্তু মাথার এলোমেলো চুল গুলো আর এলোমেলো নেই । শিরদাঁড়া বরাবর লম্বা একটা বেনি ঝুলছে । ও তো বেনি করে ঘুমোয় নি । বেনিটা সামনে নিলো মেঘা । বেনি তো নয় ,‌কোনো রকমে চুল গুলো পেঁচিয়ে বেনি পাকানোর বড়জোর চেষ্টা করা হয়েছে । ফলাফল যা হয়েছে , সেটাকে বিনুনি বলা যায় না । বিননুনির অনুরূপ করে কোনো রকমে চুল গুলো আটকানো হয়েছে , যাতে এলোমেলো হয়ে ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে ।

মেঘা তাজ্জব বনে চেয়ে রইলো । সদ্য ঘুম ভাঙা এলোমেলো মাথায় কিছুই ডুকছে না । সেভাবেই ইনোসেন্ট ফেসে দ্রুত ঘর ছাড়লো মেঘা । দরজা মারাতেই মুখোমুখি আদ্র । মেঘা কে এ ঘর হতে বেরোতে দেখে সেও প্রথমত অবাক হলো । তবে বুঝতে না দিয়ে চোখ সরু করে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললো....

" গুড মর্নিং মেঘ !

মেঘা জিভে অধর ভিজিয়ে নেয়...

" গু... গুড মর্নিং ভাইয়া ।

" কি হয়েছে ? এখনো এভাবে আছিস ? সেই কাল থেকে ? এখনো চেঞ্জ করিস নি কেনো ?

মেঘার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবটা । তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে । অবুঝের মতো বুলি ফুটালো কোনো রকমে থেমে থেমে...

" না , মানে , আমি এই রুমে ? কি করে ? আমি তো কাল ঐ রাইনো মুখোর রুমেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম.....

তাহলে এই রুমে কখন এলাম ?

" হ্যাঁ ?

মেঘা থতমত খায় ‌। সবটা উড়িয়ে প্রসঙ্গ ঘাঁটতে বলে চটপট....

" না , কিছু না ভাইয়া । আমি চেঞ্জ করে আসছি । খিদে পেয়েছে ভীষণ ।

মেঘা উল্টো ফিরে রুমে ঢুকতেই ফিক করে হেসে উঠলো আদ্র । দুদিকে মাথা নাড়িয়ে নিচে নামলো অতঃপর ।

🟥 কাল বউভাত , অতঃপর বাড়ি ফিরবো পরশুদিন ‌। তার আগে আর ফেরা হচ্ছে না 😌 । আর গোলমাল মাথায় কি লিখছি আল্লাহ জানে । ঘুম প্রয়োজন , ঘুমাবো । আল্লাহ হাফেজ । 🟥

#চলবে……………

#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_১৫ [ শেষাংশ ]

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )

সকাল থেকে হাঙ্গামা শুরু হয়েছে আরো বেশি । সবাই ব্যস্ত । কেউই ফ্রি নেই । শাফাহ্ ঘুম থেকে উঠেছে দশটা নাগাদ । সেন্টার বাদে সায়ান'দের বাড়িতেই বিয়ের সব আয়োজন করা হয়েছে । এ বাড়ি হতে বরপক্ষ বেরোবে সন্ধ্যার পর পর । সন্ধ্যা গড়ানোর পরপরই ও বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ।

এখন বিকেল পেরোতে চললো । মেঘা আর শাফাহ্'র রুমে তাড়াহুড়ো পড়ে গেছে শাফাহ্'র সাজগোজ নিয়ে । বরপক্ষ বেরোবে ঘন্টা দুয়েকের অন্তরে । তারও কম সময় হাতে ।

সবাই যে যার মতো তৈরি হতে ব্যস্ত । শাফাহ্ একখানা অফ হোয়াইট রঙের গাউন কিনেছিলো সেদিন । কোনো কিছু পছন্দ হচ্ছিলো না তার । অপছন্দের তালিকা হতেই মনকে মানিয়ে দুটো ড্রেস কেনা হয়েছিলো । পরে সায়ান আলাদা করে ওকে নিজে পছন্দ করে আরো একটা ড্রেস কিনে দিয়েছিলো । এটাই সেই ড্রেস । গর্জিয়াস কাজের একটা গাউন । বাকি দুটো শাফাহ্'র মনে লাগছিলো না । এটা আজ একটু ভালো লাগলো । এটাই পড়বে এখন । চটপট করে চেঞ্জ করে আসলো সে ।

মেঘা সেই থেকে রৌদ্রের মুখোমুখি হয় নি এপর্যন্ত । সকাল থেকে দেখা মেলে নি রৌদ্রের ।

নিজের জন্য নিজে কেনা শাড়িটা গায়ে জড়িয়েছে সে । মিররের সামনে শাফাহ্ দাঁড়িয়ে । মেকআপ করতে ব্যস্ত । মেঘা ঠান্ডা হয়ে স্থির বসে রইলো কিছুক্ষণ ।

শীতল চোখে শাফাহ্'র দিকে তাকিয়ে রইলো । শাফাহ্ আনমনে কতো কি বলছে আর সাজগোজ করছে । ওর বকবক শুনে শব্দহীন হাসলো মেঘা ‌। বিছানা থেকে নামতে নামতে বললো....

" আমি একটু আসছি আপুর রুম থেকে । শাড়ির কুঁচি গুলো গুছিয়ে নিতে হবে । তুই তো ব্যস্ত । আমি বরং আপুর কাছেই যাই ।

" মেকআপ করবি না ?

" এসে করবো ।

" একেবারে করে তারপর বের হ । একসাথে বেরোবো প্লিজ । আমাকে রুমে একা রেখে যাস না ।

" তুই আমাকে জায়গা দিচ্ছিস ? পুরো মিরর টাই দখলে নিয়ে বসে আছিস । আমি বরং আপুর কাছেই যাই , গিয়ে দেখি বাবু কে নিয়ে রেডি হলো কি না ।

মেঘা টুকটাক ঝাড়ি দিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে আসলো । ঢুকলো সিরাতের ঘরে । সিরাত রুমে একা । রামিশা'কে নিয়ে বসেছে বিছানার একপাশে । মেঘা ঢুকেই এক গাল হেসে বললো....

" কি করছো আপু ? বাবু ঘুমিয়েছে ?

" ঘুমোচ্ছে । তুই এখনো রেডি হোস নি ?

" হয়েছি তো ? শুধু কুঁচি গুলো ঠিক করা বাকি । ঠিক করে দাও তুমি ।

সিরাত মুচকি হাসলো । মেয়েকে শোয়ালো একপাশে ।

" সাজবি না ?

" সাজগোজ ভালো লাগে না আমার । টুকটুকির সাজগোজ ও শেষ হবে না আজ । ও রুমে সিরিয়াল নেই । তুমি শাড়িটা ঠিক করে দাও শুধু । আমি চুল আঁচড়ে নিচ্ছি এখানেই ।

সিরাত মেঘা কে টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসালো । জোর খাটিয়ে বললো...

" চুপচাপ বসে থাক । তোকে কিছু করতে হবে না । আমি একটু সাজিয়ে দিচ্ছি তোকে ।

" হেভি মেকআপ ? না আপু , আমি ওসব মেকআপ করবো না । ফেসে প্রবলেম হয় আমার ।

" চুপ , সেটা আমি বুঝবো । তুই বসে থাক শুধু । হেভি মেকআপ করাবো না । কোনো প্রবলেম হবে দে দেখিস ।

মেঘা চুপসে বসে রইলো ।

সিরাত টুকটাক সাজালো ওকে ‌‌। বাঁকা সিঁথি করে চুল গুলো খোলা রেখে নিজেই আঁচড়ে দিলো অতিযত্নে । বাম কানের পাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুলগাছি গুঁজে দিয়ে একখানা তাজা গোলাপ আটকে দিলো কানের কাছে । খুব হালকা করে মেকআপ বসিয়ে দিলো নিখুঁত উজ্জ্বল মুখ খানায় । গত দিনের ন্যায় কাজল লাগিয়ে দিলো রমনীর টানা হরিণী দু চোখে । তবে আজ গাঢ় করে লাগিয়েছে ।

ঠোঁটেও গাঢ় ঠোঁট রঞ্জন । মেঘার কানে দুটো স্বর্ণের দুল ছিলো । সিরাত অনুমতি নিয়ে সে দুটো খুলে ছোট ছোট দুটো ঝুমকো পড়িয়ে দিলো ।

মেঘার পড়নের শাড়িটা হালকা রঙের । সেই সাথে মিলিয়ে হালকা করেই ওকে সাজালো সিরাত । সবশেষে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে হাঁফ ছেড়ে ঠোঁট প্রসারিত করলো ।

আয়নার সামনে থেকে সরে গিয়ে মেঘার মুখ প্রতিবিম্বে ভাসিয়ে বললো ভ্রু নাচিয়ে....

" নিজেকে কেমন লাগছে বল ?

দর্পনে ভেসে ওঠা নিজের প্রতিবিম্বের পানে তাকায় একবিংশী । সহসা শব্দহীন হাসে নিজেকে দেখে । সাজগোজ ওর কোন কালেই পছন্দ নয় । সেভাবে সাজগোজ করা হয় নি কখনো ।

আজ এটুকু সাজেই নিজেকে দেখতে নিজের কাছেই বেশ ভালো লাগলো । হাসি প্রসারিত করে বললো....

" উমমম , তুমি খুব সুন্দর সাজাতে পারো ?

" সাজাতে পারি না । চেষ্টা করেছি তোর উপর । তুই সুন্দর তো , তাই এটুকু সাজেই খুব খুব সুন্দর লাগছে তোকে । একেবারে পরীর মতো ।

মেঘা হেসে ফেলে । বলে আবারো নিজেকে খুটিয়ে দেখে....

" চুল গুলো খোলা রাখবো আপু ? ভীষণ গরম ! বেঁধে দাও না ।

" খোলা চুলে তোকে আরো বেশি সুন্দর লাগে । খোলাই থাক ...

মেঘা ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলে উঠতে উঠতে....

" আচ্ছা , তাহলে শাড়িটা ঠিক করে দাও এখন । এলোমেলো লাগছে , জড়িয়ে যাচ্ছে পায়ে । মনে হচ্ছে কালকের মতো খুলে যাবে আবার ?

সিরাত ভ্রু গুটায় , তীক্ষ্ণ স্বরে বলে না বোঝার ভঙ্গিতে....

" কাল তোর শাড়ি খুলে গেছিলো ?

ওওও হ্যাঁ তো , তাইতো রৌদ্র তোকে কোলে নিয়ে বাড়িতে এসেছিলো সবার সামনে দিয়ে । লক্ষ্য করেছি আমি । কিন্তু পরে কি হলো ? তোকে তো আর দেখিনি কাল ? খেয়াল ছিলো না । নিচেও নামিস নি বোধহয় । ডিনারেও দেখিনি তোকে । কোথায় ছিলি ?

মেঘার মুখখানা বদলে যায় অমনি । হাস্যোজ্জ্বল মুখে আঁধারের ছাপ নেমে আসে । কপালে পড়ে সূক্ষ্ম ভাঁজ । কন্ঠ চড়াও হয়....

" কোথায় আবার থাকবো । রুমেই ছিলাম । এখন আমি নিচে যাই একটু । বেরোনোর সময় হয়ে গেছে । এক্ষুনি তো বেরোবে সবাই । আমি গিয়ে দেখি কতদূর হলো ।

বলেই আর কিছুতে কান না দিয়ে সিরাতের ঘরে হতে বেরিয়ে আসলো মেঘা । সিরাত হাসলো ওষ্ঠ পিষে ।

শাড়ির কুচি খানিক উঁচু করে সিঁড়ি বেয়ে সাবধানে নিচে নামলো একবিংশী । ড্রইং রুমে নতুন বর কে ঘিরে রেখেছে সবাই । শুভ্রের সব ফ্রেন্ড'রা এসেছে । মোটে ছয় থেকে সাত জন হবে ‌। তবে বেস্ট ফ্রেন্ড অনুপস্থিত । সায়ানের শূন্যতা বড্ড অনুভব করছে শুভ্র । আদ্রও আছে ওদের সাথে । শুভ্র কে খুঁটিয়ে দেখছে সকলে ।

শুভ্রের পড়নে সাদা ধবধবে শেরোয়ানি । কাঁধ গলিয়ে খয়েরী পাতলা স্টোল ভাঁজ করা ।

সম্পুর্ন তৈরি সে । মেঘা ওকে দেখেই হাসি প্রগাঢ় করলো । এগিয়ে এসেও ফাঁক পেলো না কাছাকাছি যাওয়ার ‌। এতো গুলো ছেলের ভিড়ে যেতেও চাইলো না জড়তায় । দূর হতে ডাকলো চিকন স্বরে...

" ভাইয়া ??

আদ্র আর শুভ্র চকিতে চায় । সাথে বাকি ছেলে গুলোও । মেঘা এক চিলতে হেসে আর একটু এগোতেই আদ্র গলা চড়িয়ে বললো তৎক্ষণাৎ....

" এখানে কি চাই ?

ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মেঘা । দ্রুত থেমে মাথা চিবুক বরাবর নোয়ালো গুটিসুটি হয়ে । আদ্র পাশের বাকিদের দিকে এক পলক করে চাইলো । সকলের চাহনি মেঘার দিকে । সকলকে পরখ করে নিয়ে মেঘার প্রতি কন্ঠ একটু নরম করে বললো....

" উপরে যা মেঘ ।

সহসা বাধ্যের ন্যায় তড়িঘড়ি করে উঠতে লাগলো মেঘা ‌। আদ্রের ধারনা মোতাবেক ও পা বাড়াতেই ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বলে উঠলো মেঘার চলার পানে তাকিয়ে....

" আরে ভাই , এটা আবার কে ? নতুন আমদানি মনে হচ্ছে ? এলো টা কোথা থেকে ? আগে তো কখনো দেখিনি । ভাইয়া বললো , কি রে ? ও কি তোদের বোন ?

আদ্র খানিক গম্ভীর দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকায় ‌। শুভ্র এক মুহুর্ত চোখ বুজে দমন রেখে বলে কাঠ স্বরে.....

" হ্যাঁ , বোন হয় আমার ? তোকে বা তোদের ওদিকে নজর দিতে বলে নি কেউ । মাইন্ড ইউর আইসাইট ।

একই জন ঘাড় ডলে বললো বিপরীতে....

" সামলাবো কি করে ভাই । তোর বোনটাকে তো আগে দেখিনি । এটাই তাহলে তোর বোন ? অনেক শুনেছি ওর কথা । পুরোই জোস্ তো । এই জন্যই তাহলে সায়ান এতোটা পাগল হয়েছে তোর বোনের প্রতি ? মারকাটারি ফিগার বলতে হবে তোর বোনের ।

আদ্র দাঁত খিচে হাত মুঠো করে নেয় ‌। কুৎসিত ইঙ্গিত সূচক বাক্যের অর্থে ক্ষোভের তোটে দপ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার উপক্রম হয় ‌। শাফাহ্ , মেঘা , দুজনকেই খারাপ ইঙ্গিতে বর্ননা করা হলো উক্ত তুলনার দ্বারা । মেঘা কে শাফাহ্ ভেবে সায়ানের কথা উল্লেখ হলো এখানটায় । আদ্র এটাই ভেবেছিলো । এই ছেলেগুলোর মধ্যে গুটি দুয়েকের স্বভাব ওর জানা । শুভ্রর সব ফ্রেন্ড আদ্রের পরিচিত । এ দুটোর সাথে শুভ্রর সম্পর্ক গাঢ় নয় । ইনফ্যাক্ট এখানকার কারোর সাথেই তেমন ক্লোজ নয় সে । শুধুমাত্র সায়ান ওর জীবনের সব । বিয়ের খাতিরে এগুলোকে ইনভাইট করা হয়েছিলো দায় সারা । এরা যে এভাবে দলবেঁধে ডিরেক্ট বাড়িতে হামলা দেবে, তা শুভ্রর ধারনাতেও ছিলো না ।

এখন এই মুহূর্তে মেঘার উপর এমন কুৎসিত ইঙ্গিত সূচক তকমা লাগাতেই আদ্র ফোঁস করে উঠলো । বললো রাগ দেখিয়ে....

" ভাইয়া , নিজের ফ্রেন্ড দের সামলাও । দৃষ্টি সংযত করতে বলো ওদের । আদার-ওয়াইজ আমি ভুলে যাবো ওরা ইনভাইটেড ।

শুভ্র সংযত হয়ে বললো সব ছেলে গুলোর উদ্দেশ্যে....

" বাইরে যা তোরা ।

" হোয়াট হ্যাপেন্ড দোস্ত ? বাইরে যাবো কেনো ? আর আদ্র , তুই এভাবে কেনো কথা বলছিস ? রেগে গেলি কেনো হঠাৎ ? খারাপ ভাবে নিস না ব্রো , আমি তো শুধু তোদের বোনের প্রশংসাই করলাম । সিরিয়াসলি ও ভীষণ সুন্দ.....

বাকি কথা টুকু কন্ঠ নালি ভেদ করলো না ।

ছেলেটার বাহুতে টান পড়লো । শক্ত পোক্ত শরীরটা কেউ হিড়হিড়িয়ে টেনে ছুড়ে ফেললো সদরের বাইরে । ভড়কালো উপস্থিত সকলে ।

ছেলেটা পড়তে পড়তে বেঁচে গেলো , নিজেকে সামলে দাঁড়ালো কোনো রকমে । তাজ্জব নজরে চেয়ে বুলি ফুটালো বিরক্তি প্রকাশ করে....

" রুডি , এটা কি ধরনের বিহেভিয়ার ?

" শাট আপ ! বিহেভিয়ারের দেখেছিস টা কি ? এই মুহূর্তে বাড়ির ছেলের বিয়ে না হলে , বাড়ির বউয়ের ফিগার আর সৌন্দর্যের দিকে নজর দেওয়ার জন্য এতক্ষণে চোখ উপড়ে হাতে ধরিয়ে দিতাম । ইউ লেচার ,,, বাড়ির ভেতরে আর এক পা তুলে আনার চেষ্টা করলে ঠ্যাং ভেঙে রাস্তায় বসিয়ে দেবো । বিয়ে খেতে এসেছিস , বাড়ির বাইরে থেকেই আউট হবি । দ্বিতীয় বার ভুল করেও ওর দিকে চোখ তুললেও এবারের ফেলে রাখা কাজটা সেই দ্বিতীয় বারই সেরে ফেলবো বলে রাখলাম ।

কথা টুকু শেষ করেই সদর চাপিয়ে পিছু ফিরে গজগজ করে উপরে উঠে গেলো রৌদ্র । শুভ্র আর আদ্র চাওয়া চাওয়ি করলো একে অপরের দিকে ।

মেঘা উপরে উঠে একে একে সবার ঘরেই উঁকি দিয়েছে । সবাই তৈরি । ফিনিশিং টেনে এক্ষুনি বেরোবে । শাহিনা কাবির নিচে নেমেছেন । মেঘা তাকে দেখতে পায় নি ঘরে গিয়ে । তার ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে হাঁটা কালিন কয়েকজন অতিথির মুখোমুখি হয় সে । সবাই শুভ্রর নানু বাড়ির মেহমান । তৈরি হয়ে নিচে নামছিলেন সবাই । মেঘা কে দেখা মাত্রই আনতারা বেগম মুচকি হাসলেন । মুগ্ধ নয়নে চেয়ে উজ্জ্বল হেসে বললেন....

" বাহ্ মেঘা , তোমাকে তো ভারী সুন্দর লাগছে । কারোর নজর না লাগুক !

মেঘা লাজুক হাসলো । এ অবধি যার সামনে পড়েছে , সবাই এক কথাই বলেছে । সকলে স্নিগ্ধ প্রশংসায় পঞ্চমুখ রমনীর শুচি শুভ্র সৌন্দর্যে ‌। মেয়েটা হাসি লুকিয়ে বললো কোমল সুরে....

" থ্যাংক ইউ মামি । আপনারা তো রেডি ? নিচে যান , সবাই ওয়েট করছে ।

" তুমি যাবে না ? চলো ,

" আপনারা যান । আমি রুমে যাবো একটু । টুকটুকির হলো কি না দেখে আসি গিয়ে ।

আনতারা বেগমের দুই সন্তান । #সাবা আর #আয়াজ । আয়াজ তার ছোট ছেলে । বয়স বছর সাতেক হবে । মেঘা কে বেশ চেনে সে । আনতারা বেগমের হাত ছেড়ে মেঘার হাত ধরলো ছেলেটা । বললো বাচ্চা সুলভ স্বরে....

" আমিও তোমার সাথে যাবো আপ্পি । চলো....

মেঘা মুচকি হেসে ওকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো ।

শাফাহ্ ঘরে নেই । কপাল গুটিয়ে নিলো মেঘা । ঐ মেয়ে কি নিচে নেমে গেছে ?

কতক্ষন ধরে ঘরে আসা হয় নি । হয়তো রেডি হয়ে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে নেমে গেছে । আয়াজ কে নিয়ে আবার ঘর হতে বেরোলো মেঘা ।

নিচে হৈচৈ । শুভ্রর গাড়ি বেরিয়ে পড়েছে এতক্ষণে । বাকিরা একে একে বেরোবে । টুকটুকি নিচ হতে চেঁচিয়ে ডাকলো মেঘা কে । মেঘা সাঁড়া দিয়েই আয়াজের হাত চেপে তড়িঘড়ি করে নিচে নামতে লাগলো । করিডোরের শেষ প্রান্তে রৌদ্রের সম্মুখে পড়লো ওরা দুজন । এতক্ষণে মেঘা কে পুরোপুরি দেখলো রৌদ্র ।

নতুবা তখন মেঘা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় পেছন থেকে একটু আধটু দেখেছিলো শুধু । তবে ক্ষিপ্ত নয়নে । তখন ঐ ছেলেটার কথা শুনে নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়েছিলো । ওকে কিছু করতে না পারলেও মেঘা সহসা সামনে পেলে নিশ্চিত থাপ্পর মারতো ওভাবে সেজে গুজে সবার সামনে যাওয়ার জন্য । এই মেয়ে এতক্ষণ ধরে সেজে গুজে সবার সামনে টইটই করে ঘুরে বেড়িয়েছে । সবাই দেখেছে রৌদ্রের আগে । রৌদ্র দেখলো এই এতক্ষণে । মন শিথিল হলেও চোখ জোড়া হলো না । প্রকাশ করলো না চক্ষু দ্বয়ের প্রশান্ত শিথিলতা । মেঘার থেকে দৃষ্টি নামিয়ে নিচে তাকালো আয়াজের দিকে । পরক্ষনে মেঘার হাতের দিকে ‌। এই ছেলেটা ইভারার হাত ধরেছে ? তিরিক্ষি হয়ে জ্বলে উঠলো রাগান্বিত শিরা উপশিরা, একেই রেগে আছে সে । সেই রাগ বজায় রেখেই ধমকালো ....

" এইইই ব্যাঙের পোনা ,, হাত ছাড় ওর ।

চমকে এক নিমিষেই ঝট করে নিজের হাতটা মেঘার থেকে ছাড়িয়ে নিলো ছেলেটা । পিছিয়ে গেলো এক কদম । আবার সশব্দে ধমকালো রৌদ্র....

" যা এখান থেকে ।

মুহুর্তেই বাচ্চাটা ছোট ছোট পদক্ষেপে ছুটলো ভয় পেয়ে ।

মুখ কুঁচকালো মেঘা । বিব্রত হলো কিছুটা । এই লোকের হাবভাব বোঝা দায় হলেও বুঝতে যথেষ্ট সক্ষম তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক । তবে প্রকাশে অনিচ্ছুক ।

রৌদ্র এ পর্যায়ে আবার পূর্ণ দৃষ্টিপাত করলো মেঘার দিকে । রাগ দেখিয়ে গর্জালো.....

" ইডিয়ট , এভাবে কোথায় যাচ্ছিস তুই ?

মুখ বাঁকিয়ে মৃদু স্বরে ভেঙ্গিয়ে উত্তর করে রমনী.....

" জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাচ্ছি , যাবেন ? গেলে পরে চৌরাস্তা থেকে আপনাকে জাহান্নামের ভেতরে ধাক্কা দিয়ে আমি পালিয়ে আসবো । অন্তত এতে করে মুক্তি পাবো আপনার মতো ইরিটেটিং পার্সোনের থেকে । যত্তসব , কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে হঠাৎ হঠাৎ...

" ইডিয়ট , থাপ্পর মেরে জাহান্নামের চৌরাস্তার পথ ভুলিয়ে দেবো । যাতে করে আমার থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো চিন্তা না আসে মাথায় । চল এখান থেকে...

রৌদ্র হাত বাড়িয়ে খপ করে মেঘার ধরতে গেলে দ্রুত পিছিয়ে যায় মেঘা । ঝাইঝাই করে চিবিয়ে ওঠে....

" খবরদার ছোঁবেন না আমায় । কোথায় যাবো আমি আপনার সাথে ?

" উল্টো পথে । যে পথে আমার থেকে মুক্তি মিলবে না সে পথে । যে পথে দৌঁড়ালে আমার কাছাকাছি আসবি সে পথে । যে পথে নিয়ে গেলে অন্যের লোলুপ দৃষ্টির সীমানা থেকে দূরে সরে আমার তৃষ্ণার্ত দৃষ্টির সীমানায় সীমাবদ্ধ হবি সে পথে । খুব তো ঢ্যাং ঢ্যাং করে সেজে গুজে রং তামাশা দেখিয়ে বেড়াচ্ছিস ইডিয়ট , তোর এই সাজগোজ ছুটাবো আমি । চল আমার সাথে...

তৎক্ষণাৎ পালানোর পথ বন্ধ করে মেঘার ডান হাতের কব্জি শক্ত করে নিজের খড়খড়ে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে রৌদ্র । হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে যায় ঘরের দিকে । মেঘা পা চিপকে আটকাতে চাইলেও পারে না পুরুষালি শক্তির বিপরীতে । রৌদ্রের হাতের উপর নিজের অপর হাত রেখে আটকানোর চেষ্টা করে ঝেড়ে বললো....

" রাইনো মুখো , ছাড়ুন আমায় ।

সবাই ওয়েট করছে আমার জন্য । দেরি হয়ে যাচ্ছে । ছাড়ুন অসভ্য লোক ।

🟥 রেসপন্স করতে বলা লাগে ক্যান ? দ্রুত রেসপন্স পূর্ণ করবেন । 🟥

#চলবে.........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন